সপ্তম অধ্যায়–কথোপকথন
এতবার উইলিয়ামসন সাহেবের নাম শুনে শুনে সাহেব সম্পর্কে তারিণীর একটা আবছা ধারণা গড়ে উঠছিল। কিন্তু সিঁড়ি থেকে নেমে কৌচে যে ছোকরাটিকে বসে থাকতে দেখল, তার সঙ্গে তারিণীর কল্পনার বিন্দুমাত্র মিল নেই। সাহেবের বয়স তারিণীর চেয়ে কম বই বেশি হবে না। হলেও চেহারায় এমন একটা অদ্ভুত শিশুসুলভ ভাব আছে যে দেখলে কিশোর বলে ভ্রম হয়। ছোটো করে ছাঁটা বাদামি চুল, চকচকে কামানো গাল আর ছিপছিপে চেহারার এই সাহেবকে কলেজের ছোকরা বলে নিশ্চিন্তে চালিয়ে দেওয়া যাবে। সাহেব ধূসর একটা ফ্রক কোট পরে সিগারেট ফুঁকছিলেন। হাবেভাবে মনে হয় আশেপাশে ঘটে যাওয়া এত কিছুর কোনোটাই যেন তাঁকে স্পর্শটুকুও করতে পারছে না। তিনি এক অনাবিল উচ্চতায় বসে দুনিয়াদারি দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছেন। যাঁর স্ত্রীর এমন অপঘাত মৃত্যু ঘটেছে, যে দেহ এখনও এই বাড়িতে একই ছাদের তলায় শুয়ে রয়েছে, সেখানে এই স্বাভাবিক আচরণকেই অত্যন্ত অস্বাভাবিক, অন্যায্য, অন্যায় বলে মনে হল তারিণীর।
দারোগাবাবু অত্যন্ত নম্রভাবে গুড ইভনিং জানাতে সাহেব বললেন, “ভেরি গুড ইভনিং। কিন্তু প্ল্যান্টার্স ক্লাব থেকে আমাকে এইভাবে তলব করে কে নিয়ে এল? আপনি? আপনার সাহস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি।”
সাহেবের কথা সামান্য জড়ানো, গা থেকে ভকভক করে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। তারিণী দেখল দারোগাবাবু দৃশ্যতই অস্বস্তিতে। তাও যেন একটু সাহস সঞ্চয় করে বললেন, “স্যার, আসলে আপনার স্ত্রী ম্যাডাম উইলিয়ামসনকে নিজের ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাই…”
“আমি শুনেছি। যারা আমায় ডাকতে গেছিল, তারা সব বলেছে। কিন্তু এতে আমার কী করার আছে? যা করার আপনারা করুন। ইউ অল আর দ্য ল মেকারস, নো?”
“তা তো বটেই। আর সেইজন্যেই আপনার প্রয়োজন। বডি পোস্টমর্টেমে নিয়ে যেতে হবে। ম্যাডামের নিয়ারেস্ট রিলেটিভ বলতে আপনি। আপনার কনসেন্ট ছাড়া…”
“নিয়ারেস্ট? রিলেটিভ?” হো হো করে হেসে উঠলেন সাহেব। “এটা শোনাই বাকি ছিল বোধহয়। ওকে, নো ইস্যুজ। কোথায় সাইন করতে হবে বলুন, করে দিচ্ছি। কিন্তু এর জন্য আমায় ডেকে আনার কী দরকার ছিল? কাউকে ক্লাবে পাঠিয়ে দিলেই তো আমি সাইন করে দিতাম।”
পকেট থেকে ঝরনা কলম বার করে ডাক্তার হান্টারের বাড়িয়ে দেওয়া কাগজে খসখস করে সই করেই ওঠার উদ্যোগ করলেন উইলিয়ামসন। হান্টার সাহেব
হাসপাতাল থেকে দেহ নিতে আসা কর্মচারীদের নির্দেশ দিতে উপরে উঠবেন, একবার শুধু পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি শেষ দেখা দেখবেন না?”
সামান্য হেসে সাহেব উত্তর দিলেন, “দেখে কী হবে? হোয়ারস দ্য ফান? শেষ দেখা একমাস আগে আমাদের হয়ে গেছে। নতুন করে আর শেষ দেখে লাভ নেই। আমি গেলাম।”
“সাহেব…” পিছন থেকে ডাকলেন দারোগা নলিনীকান্ত। বোঁ করে একপাক ঘুরে দারোগার মুখোমুখি দাঁড়ালেন সাহেব। “প্ৰে টেল…”
“কিছু প্রশ্ন ছিল। যদি সামান্য সময় দিতেন…”
“কী প্রশ্ন?”
“আজকে দুপুরের পর থেকে সন্ধে অবধি আপনি কোথায় ছিলেন?”
“ওহ! ইন্টেরোগেশন! আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন মিস্টার নেটিভ দারোগা, যে, এই দেশের আইনে প্রপার অর্ডার ছাড়া একজন ইউরোপিয়ানকে একজন নেটিভ ইন্টারোগেট করতে পারে না। অ্যান্ড ইফ হি ডাজ সো, আমি তাকে হ্যারাসমেন্ট আর কনটেম্পট-এর নামে কোর্টে স্যু করে তার চাকরি খেতে পারি। কী, তাই তো?”
তারিণী দেখতে পেল অপমানে দারোগাবাবুর ফর্সা চোখমুখ একেবারে লাল হয়ে গেছে। তিনি উত্তর দিলেন না। কিন্তু এই উইলিয়ামসন ছাড়ার পাত্র নয়। আবার প্রশ্ন করলেন, “ইয়েস অর নো?”
দুবার উপরে নিচে মাথা নাড়লেন নলিনী। সাহেব তাতেও সন্তুষ্ট নন। কানের কাছে হাত রেখে যেন কিছু শুনতে চাইছেন এমনভাবে প্রায় চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাভ আই বিকাম ডেফ? অর ইউ হ্যাভ বিকাম ডাম্ব? ইয়েস অর নো? আটার ইট!”
নলিনীর মাথা নিচু। ধীর কণ্ঠে জবাব দিলেন, “ইয়েস।”
ফিচ করে একগাল হেসে দিলেন উইলিয়ামসন। ঝকঝকে সাদা একসারি দাঁত ঝিকিয়ে উঠল। যেন একটা জেদি বাচ্চা অনেক চাইবার পর একটা পছন্দের খেলনা পেয়েছে।”দ্যাটস লাইক এ গুড বয়। প্রপার ওয়ারেন্ট নিয়ে আমার বাংলোতে আসুন। দেন উই মে টক ওভার এ কাপ অফ টি অর এ বটল অফ ওয়াইন। বাট ফর নাও, আই শ্যাল টেল ইউ নাথিং।”
পাশেই একটা বেতের ছড়ি রাখা ছিল। সেটা হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন সাহেব। দরজা খুলে আবার পিছন ফিরে দারোগার দিকে চেয়ে বললেন, “ওয়েল। আজ দুপুর থেকে এখানে আসা পর্যন্ত আমি প্ল্যান্টার্স ক্লাবেই ছিলাম। মদ খাচ্ছিলাম আর একজনকে শায়েস্তা করছিলাম। অত খান কুড়ি সাক্ষী আছে। আমি আপনাকে নামের লিস্ট দিয়ে দেব। গুড নাইট।”
সাহেব বেরিয়ে যাবার পরেও খানিক থম মেরে বসে রইলেন নলিনী দারোগা। তারিণী সদ্য পরিচিত। তার সামনে এমন অপমানিত হতে হবে, তার আভাসটুক পেলেও তিনি তারিণীকে সঙ্গে নিয়ে আসতেন না। এদিকে ডাক্তার হান্টার তাঁর দলবল সহ মৃতদেহ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন হাসপাতালের উদ্দেশে। তারও বেশ খানিক পরে তারিণী মৃদুস্বরে শুধাল, “বাড়ির কাজের লোকদের বয়ানগুলো নেবেন না দারোগাবাবু? রাত অনেকটা হয়ে এল যে।”
যেন একটা প্রগাঢ় ঘুমের মধ্যে থেকে জেগে উঠলেন তিনি।”হ্যাঁ হ্যাঁ। সে তো বটেই, সে তো বটেই”, বলে একজন গোর্খা কনস্টেবলকে ডেকে বিজাতীয় ভাষায় কিছু নির্দেশ দিলেন। সেও দুজন পুরুষ আর সেই মেয়েটিকে এনে হাজির করল। মেয়েটির চোখ তখনও কান্নায় ফুলে আছে। দারোগাবাবু এক এক করে প্রশ্ন করতে থাকলেন। তারিণী এই কথোপকথনের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝছিল না। সব শেষ হলে দারোগাবাবু তারিণীর দিকে ফিরে বললেন, “সবাই মোটামুটি একই কথা বলছে। সাহেব আর মেমসাহেবের বনিবনা ছিল না। মাসখানেক আগে ঝামেলাটা এমন জায়গায় পৌঁছোয় যে সাহেব এই বাংলো ছেড়ে পাশেই টিউলিপ নামে একটি বাংলোতে থাকা শুরু করেন। তার আগেও অবশ্য দুজন দুই ঘরে থাকতেন।”
“মেমসাহেবের ঘরে সিঙ্গল বেড। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল।” বিড়বিড় করে বলল তারিণী।
দারোগাবাবু শুনতে পাননি। তিনি বলেই চলছিলেন, “আজ কোনও কারণ ছাড়াই মেমসাহেব বাড়ির সব চাকরদের ছুটি দিয়ে দেন। আগেও দিয়েছেন কয়েকবার। বেশিরভাগের বাড়ি আশেপাশেই। তারা বাড়ি চলে যায়, পরদিন সকালে ফেরে। এই তিনজনের বাড়ি কালিম্পং। একদিনের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া অসম্ভব। ফলে দুপুরে ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যায় আবার ফিরে এসেছিল তিনজনই। ভানু ব্যস্ত ছিল ঘোড়াকে দলাইমলাই করতে, আর পাসান গেছিল রাতের খাবার বানাতে। ফুলি সারা বাড়ির আলো জ্বেলেও যখন দ্যাখে মেমসাহেব ঘর থেকে বেরোচ্ছেন না, তখন সে বাকিদের ডাকে। তারাই দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে।”
“ডাক্তারকে কে খবর দেয়?”
“পাসান। সে দৌড়ে সাহেবের বাংলো টিউলিপে যায়। সেখানে সাহেব ছিলেন না। তবে চাকররা সবাই ছিল। তাদেরই একজন সাহেবকে ডাকতে প্ল্যান্টার্স ক্লাবে যায়, অন্যজন ডাক্তার হান্টারকে ডেকে আনে।”
“যে ছুরিটা দিয়ে হাতের শিরা কাটা হয়েছে, সেটা নিয়ে কিছু জানে এরা?”
“জানে বইকি! সাহেবের বিয়ের অনুষ্ঠানে ক্লাব থেকে একটা হাতির দাঁতের বাক্সে এই ছুরি উপহার দেওয়া হয়। স্লাইসার। মেমসাহেবের ড্রেসিং টেবিলে থাকত। এটা সেটাই।”
“আর কিছুর সন্ধান পাওয়া গেল?”
“খুঁজে দেখতে হবে। আজকে রাতের মতো আমি বাড়ি সিল করে দিয়ে দুটো পুলিশ মোতায়েন করে যাচ্ছি। এই তিনজনকে বাকি রাতটুকু টিউলিপে কাটাতে বলি। কাল দিনের আলোতে এসে খোঁজাখুঁজি করা যাবে। চলো ওঠা যাক ।”
“শেষ প্রশ্ন, মেমসাহেব ডানহাতি না বাঁহাতি?”
দারোগাবাবু এটা ভুলেই গেছিলেন। সামনে মাথা গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনকেই নেপালিতে তিনি প্রশ্ন করতে মেয়েটি মৃদু স্বরে কী যেন জানাল। দারোগাবাবু তারিণীর দিকে ফিরে একটা ম্লান হাসি হেসে বললেন, “ওফেলিয়া সব কাজ বাঁ হাতেই করত। শুধু লিখত ডান হাতে। এটা অস্বাভাবিক না। অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। কারও আবার এর উলটোটাও হয়… তোমার থিয়োরি ফসকে গেল হে তারিণী।”
