ত্রয়োদশ অধ্যায়—পথ খোঁজা একাকী নেকড়ের মতো
জর্জ উইলিয়ামসনের মৃত্যু এতই অস্বাভাবিক, আকস্মিক আর অত্যাশ্চর্য, যে, তারিণীও ভয়ানক হকচকিয়ে গেল। যদি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে হয়, তবে এই মৃত্যুর কোনও জাগতিক ব্যাখ্যা মেলে না। তবে কি নলিনীবাবুই ঠিক? এই পাহাড়ে এমন কোনও শক্তি ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা আমাদের সভ্য জগতের চিন্তার বাইরে? চোখ বন্ধ করলেই বারবার দৃশ্যটা ঘুরে ঘুরে আসছিল তারিণীর মাথায়। সাহেব ওদের দেখে ঝুড়িতে এসে বসলেন, ওদের দিকে চেয়ে হাত নাড়লেন, কপিকলের চাকা ঘোরাতেই ঝুড়ি চলা শুরু করে দিল। সব কিছু সবার চোখের সামনে। সবার সামনেই সাহেব আচমকা ঢলে পড়লেন ঝুড়ি থেকে। তখনই তাঁর বুকে বেঁধা সেই ছোরার ঝলকানি চোখে পড়েছে তারিণীদের। চারিদিক খোলা। ধারে কাছে কেউ নেই। তারপরেও এই খুন হল কেমন করে? তারিণী বারবার ভেবে চলে। তার সামনে পড়ে থাকা জর্জ উইলিয়ামসনের চোখ খোলা। সেই চোখে বিস্ময় আর ভয়ের ছায়া। বোঝা যায় মৃত্যু নেমে এসেছে অতর্কিতে। বাজের মতো। কিছু বোঝার আগেই। ঝুড়িটাও ভালো করে দেখল তারিণী। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ খুব জোর অটিসাঁট হয়ে বসতে পারে। যেমনটা সাহেব বসেছিলেন। সুতরাং আগে থেকে সেখানে কেউ বসে থাকার সম্ভাবনা নেই। ঝুড়িতে চেপে আসার সময় সাহেবের সামনে যে কেউ ছিল না, এ কথা তারিণী দিব্যি গেলে বলতে পারে।
নলিনীবার এমনিতেই ভীতু প্রকৃতির। একের পর এক মৃত্যু ক্রমাগত তাঁর স্নায়ুকে দুর্বল করে দিচ্ছিল। চোখের সামনে এই মৃত্যুদৃশ্য সে সব কিছুকে ছাপিয়ে গেল। ভদ্রলোক সহসা অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। জ্ঞান আসার পরে দেখা গেল সারা গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত বিড়বিড় করছেন আর ভুল বকছেন। পুলিশ কনস্টেবলরা তাঁকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেল। গোটা চা বাগানে এখন সব কাজকর্ম বন্ধ। কুলি কামিনরা যে যার মতো ঘরে ফিরে যাচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে বাগানের দুই মালিকই রহস্যজনকভাবে মারা গেলেন। কাল আবার বাগান খুলবে তো? কেউ জানে না। একটা বড়ো গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কুমুদরঞ্জন তাদের কিছু বোঝাচ্ছিল। গোল করে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল তারা। কুমুদ কথা শেষ করে ক্যাশিয়ারকে বলল ওদের রোজের টাকা মিটিয়ে দিতে। ক্যাশিয়ার টেবিল পেতে বাক্স খুলে সবাইকে একে একে টাকা দিতে লাগল। প্রথমে কিন্তু কিন্তু করেও কুমুদ তারিণীর দিকে নিজেই হেঁটে এল। একটা কাষ্ঠহাসি হেসে বলল, “আমারও বুঝি চাকরি গেল। কাল থেকে অন্য কোথাও উপায় দেখতে হবে। এদিকে তো কোনও আশা দেখছি না। ভাগ্যের কী ফের দেখুন। সেদিন ট্রেনে আপনাকে চাকরি দেব বলছিলাম। এখন আমারই চাকরি নেই। আপনার হাতে কিছু আছে নাকি?”
তারিণীও না হেসে পারল না।”থাকলে কি আমার নিজের এমন দশা হয় কুমুদবাবু? আপনি বরং নলিনীবাবুকে বলে দেখতে পারেন। বড়ো মানুষ। হাতে চাকরি থাকলেও থাকতে পারে।”
“ভাবী শ্বশুরকে দিয়ে তদ্বির করাতে বলছেন? তাতে সম্মানের কিছু অবশিষ্ট থাকবে কি? এমনিতেই উনি বিরাট বড়ো মাপের মানুষ। জমিদারবাড়ির ছেলে। এই চাকরিতে না এলেও পূর্বপুরুষের যা আছে, বসে খেতে পারতেন। নেহাত কল্যাণী আমায় পছন্দ করে, তাই জামাই হিসেবে মেনে নিয়েছেন। না হলে আমার মতো ছাপোষা মধ্যবিত্ত কি ওর জামাই হবার যোগ্য? আমি ভাবছি পাহাড় ছেড়ে আবার কলকাতায় চলে যাব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এখানে আমার আর কোনও ভবিষ্যৎ নেই।”
“ভালো কথা, সেদিন আপনার সেই ব্যাগ আপনি ফেলে এসেছিলেন। ওটা আমি সযত্নে রেখে দিয়েছি। নলিনীবাবু বাড়ি ফিরলে আপনি নিশ্চয়ই দেখা করতে যাবেন, আমি আপনাকে ব্যাগটা দিয়ে দেব।”
“ব্যাগ হবেখন। আগে একটা ভালো চাকরি জুটিয়ে কল্যাণীর সামনে দাঁড়াবার উপযুক্ত হই। তবে না?”
চা বাগান থেকে বাড়ি এল না তারিণী। রাস্তা খুঁজে চলে গেল দাজিলিং হাসপাতালে। খবর পেল একটু আগেই নলিনীবাবুকে প্রাথমিক চিকিৎসা করে ছেড়ে দিয়েছেন ডাক্তার। ছাড়তে চাননি। কিন্তু তাঁর মেয়ে এসে পীড়াপীড়ি করায় ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তারিণী ডাক্তার হান্টারের বসবার ঘরটা জেনে নিল। নিজের ঘরে গম্ভীর বসে ছিলেন ডাক্তার হান্টার। তারিণী”মে আই কাম ইন স্যার?” বলতে একটু যেন অবাক হলেন। তারিণীকে ঠিক এইখানে, এই সময় আশা করেননি তিনি। মুখের গাম্ভীর্য পুরোমাত্রায় বজায় রেখেই বললেন, “কাম ইন।”
তারিণী ঘরে ঢুকে সোজা কাজের কথায় এল।”দেখুন ডাক্তার সাহেব, আপনি আমায় খুব একটা পছন্দ করেন না জানি, কিন্তু আপনার বন্ধু নলিনীকান্ত চক্রবর্তী ভয়ানক অসুস্থ। আর তিনি অসুস্থ কী কারণে, সেটাও আপনি জানেন। গত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ের এই ছোট্ট শহরে আপনাদের ঘিরে যা চলছে, আমি জানি, সাধারণ বুদ্ধিতে তার ব্যাখ্যা মেলে না। বিশেষ করে গত তিন-চার দিনে যা হল, এক কথায় ইনক্রেডিবল।”
“তুমি কি এসব বলতেই এখানে এসেছ?” বিরক্তির সুর ফুটে উঠল ডাক্তারের গলায়।
“আজ্ঞে না। বলতে এসেছি, আমার কাছে প্রায় প্রতিটা ঘটনার সমাধান আছে। প্রায় বললাম, তার কারণ গোটা গল্পটা একটা ছেঁড়া ছবির মতো টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। দুই-একটা টুকরো হাতে আসা শুধু বাকি। আর তার জন্য আপনার সাহায্য ছাড়া আমি অপারগ।”
“কীরকম সাহায্য?”
“কয়েকটা প্রশ্ন। আপনাকে নিয়ে।”
“কোনও পার্সোনাল প্রশ্নের জবাব দিতে আমি বাধ্য নই।”
“আমি শুধু জানতে চাইছি, আপনি কত বছর হল দার্জিলিং-এ আছেন?”
“আমার জন্ম এখানেই। ১৮৩০-এ। পড়াশোনা কলকাতায়। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে আবার এখানে ফিরে এসে প্র্যাকটিস শুরু করি। ইংল্যান্ডে গেছিলাম তিনবার। একবার ১৮৫০-এ বাবার সঙ্গে। দ্বিতীয়বার ১৮৬২-এ। সেই বছরই মেরিকে বিয়ে করে নিয়ে আসি। আর লাস্টবার ১৮৯৩-এর ডিসেম্বরে। ছয় মাসের জন্য। ইংল্যান্ডে আমার কিছু সম্পত্তি ছিল। সব বেচে দিয়ে এই দেশে চলে এসেছি। আর কিছু? আমার দ্বারা এর থেকে বেশি সাহায্য সম্ভব না। তুমি এখন এসো। আগের দিনও বলেছিলাম। ইউ নো নাথিং ।”
“এখন বোধহয় কিছুটা জানি”, মৃদু হেসে বলল তারিণী।
“কী জানো?”
“বলতে পারলে বাকি সাহায্যগুলো করবেন তো?”
ডাক্তার কিছু বললেন না। শুধু কাঁধ ঝাঁকালেন।
তারিণী বলল, “এটুকু জানি, শুধুমাত্র বন্ধুর জন্য আপনি নিজের স্ত্রীর মৃত্যু নিয়ে মিথ্যে রটনাটা স্বীকার করে নিয়েছেন।”
ডাক্তার হান্টারকে দেখে মনে হল এক্ষুনি তিনি রাগে ফেটে পড়বেন। কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না। তিনি উঠে গিয়ে বেসিন থেকে এক আঁজলা জল নিয়ে চোখে মুখে ছেটালেন। তারপর মুখ ডুবিয়ে দিলেন সাদা তোয়ালেতে। মুখ উঠিয়ে, তোয়ালে একপাশে ছুড়ে ফেলে বললেন, “জানি না কেমন করে এই কথা জানলে তুমি। এখন জিজ্ঞাসাও করব না। কথা দিলাম। তবে আমি আমার কথা রাখব। বলো কী সাহায্য করতে পারি? আমার শর্ত একটাই। যদি এ রহস্যের সমাধান করতে পারো, তবে সবটা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েই পাহাড় থেকে নামতে পারবে। নচেৎ নয়।”
“রাজি। প্রথমেই যাব প্ল্যান্টার্স ক্লাবে। ওখানে আপনি ছাড়া আমায় ঢুকতে দেবে না।”
“কার কাছে? ওর ম্যানেজার অলিভার আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।”
“তবে তাঁর কাছেই যাওয়া যাক।”
***
প্ল্যান্টার্স ক্লাবে তখনও তেমন ভিড় জমেনি। আসলে ভিড়টা জমে বিকেল থেকে। আর এখন ভরদুপুর। তবে তাদের ভাগ্য ভালো, ম্যানেজার অলিভার স্মিথ ক্লাবেই ছিলেন। ডাক্তার তারিণীকে পরিচয় করালেন ‘ডিটেকটিভ ফ্রম ক্যালকাটা অ্যান্ড ফ্রেন্ড অফ ইনস্পেক্টর চাকরাভারতি’ বলে। ম্যানেজার সাহেব ডাক্তার হান্টার আর তারিণীকে সসম্মানে নিজের চেম্বারে নিয়ে বসালেন। প্রথমে খানিক সময় কাটল হান্টারের সঙ্গে জর্জ উইলিয়ামসনের স্মৃতিচারণায়। জর্জের মৃত্যুর খবর তাঁর কানে এসেছিল খানিক আগেই।
অদ্ভুত ছেলে ছিল এই জর্জ। খারাপ বলব না। একদিকে প্রচণ্ড মেধাবী। দারুণ অভিনেতা। ক্লাবে যত শেক্সপিয়র ট্র্যাজেডি হত, সবার লিড রোল ওর বাঁধা। হ্যামলেটে হ্যামলেট, ম্যাকবেথে ম্যাকবেথ, এমনকী ওথেলোতে কালিঝুলি মেখে ও-ই ওথেলো সাজত। আর যা সাজত, অবিকল তেমন লাগত। মেয়েরা সাধে ওর প্রেমে পড়ত! ওফেলিয়াকে বিয়ে করেছিল সম্ভবত টাকার জন্যে। ভেবেছিল সব সম্পত্তি ওর হবে। ওফেলিয়া চালাক মেয়ে। সবটা দেয়নি। পাহাড়ে চড়তে ভালোবাসত। কোটের পকেটে পাহাড়ে চড়ার সরঞ্জাম নিয়ে ঘুরত। যেখানে পথ আছে, সেখানেও পাহাড় বেয়ে উঠে যেত। পাগল ছেলে একটা!
বদ অভ্যেস? বদ অভ্যেস বলতে একটাই। যাকে আমরা বলি ট্রিক্সস্টার, তেমন ছিল। প্র্যাকটিক্যাল জোক করতে ভালোবাসত। অনেক সময় সেসব মাত্রা ছাড়িয়েও যেত। আমার সই নকল করে লোকের বাড়ি টার্মিনেশন লেটার পাঠানো, মহিলাদের গায়ে মাকড়সা ছেড়ে দেওয়া, খেলনা পিস্তল নিয়ে ভয় দেখানো, এমন সব। সবাই ওকে একটু সমঝেই চলত। তবে নিষ্ঠুর ছিল ভিতরে ভিতরে। বোঝা যেত।
২৯ মার্চ? হ্যাঁ, মনে আছে তো। সেদিন সকাল সকাল এসে গেছিল ক্লাবে। সারাদিন ধরে মদ খেল। বিকেলের দিকে তিন-চারটে গোর্খা ওর ম্যানেজারকে ধরে আনল। দুজনে মিলে ওই কোশের ঘরে ঢুকে গেল। আর বেরোয়নি। সন্ধেয় ক্যামেলিয়া থেকে কয়েকজন এসে জানালে ওফেলিয়া মারা গেছে। আমি দরজায় নক করলাম। ও খুলল। ভিতরে সেই ম্যানেজারও ছিল। আমিই খবরটা দিলাম। ও বলল, ‘ড্যাম হার। গো টু হেল’। পরে বাধ্য হয়ে গেল। ম্যানেজারটাও পিছন পিছন পালাল।
ঘর দেখবেন? চলুন। হ্যাঁ, ওই ডানদিকেরটা।
আসুন। এই ঘর। ওটা? ওটা টয়লেট। হ্যাঁ, জানলাটা খোলা বটে, কিন্তু ওদিক দিয়ে তো খাড়া পাহাড়। কোনও রাস্তা নেই। নাহ, আর কোনও দরজা নেই। থ্যাংক ইউ। না, না। আবার এলেও ডাক্তার হান্টারের সঙ্গেই আসবেন। আসলে এখানে নন-ইউরোপিয়ান… বোঝেনই তো। নিয়ম মানে নিয়ম।
