1 of 2

স্ট্রেঞ্জার – ৮

আট

ওই পাঁচ যুবককে মেপে নিয়েছে রানা। গতরাতে খাওয়াটা বেশি হয়ে গিয়েছিল, এবার সুযোগ এসেছে খানিকটা ব্যায়াম করে নেয়ার। কিন্তু অন্য কারণে দ্বিধা এল মনে- ও তো চলে যাবে দু’দিন পর! এরপর লিয়ের ওপর নানাভাবে হামলা হলে সেটা ঠেকাবে কী করে?

এই চিন্তা থেকেই পিছিয়ে যেতে চাইলেও রানা বুঝে গেল, এখন বোধহয় লড়াই না করে উপায় নেই।

ওর হয়ে লড়তে গিয়ে বেদম মার খাবে রানা, বুঝতে পেরেছে লিয। নীরবে কাঁদছে ও। চোখ থেকে দরদর করে গালে নামছে তপ্ত অশ্রু। বিড়বিড় করল, ‘কেন যে এখানে এসেছিলাম…’

এক পা এক পা করে আসছে পাঁচ যুবক। এখনও করেনি হামলা করবে কি না। হঠাৎ তাদের একজন বলে উঠল, ‘আরেহ্! আগেও তো একে দেখেছি! খবরের কাগজে ছবি বেরিয়েছে ওর!’

বাঁকা হাসি নিয়ে সঙ্গীকে দেখল ডয়েল। ‘তাই? চাপা মারার আর জায়গা পাও না! এই গাধার ছবি পত্রিকায় ছাপবে কেন?’

‘ঠিকই দেখেছি। এ ওই একই লোক! পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে দিয়েছে জর্জি ডানের! ওর সঙ্গে আরেকজন ছিল, সে-ও হাসপাতালে।’

রানাকে দ্বিধা নিয়ে দেখল ওরা।

‘কথা কি সত্যিই?’ রানার কাছে জানতে চাইল ডয়েল। ‘অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে না। ডান তো সবসময়েই কাপুরুষ ছিল। আমার বুড়ি দাদীও বেত মেরে ওর ফোলা পাছা লাল করে দিতে পারবে।’ মারামারির আগ্রহের চেয়ে বেশি কাজ করছে তার মনে কৌতূহল। ‘এটা সত্যিই যে তাকে পিটিয়েছ তুমি, মিস্টার?’

‘বাদ দাও,’ রাস্তা থেকে ব্যাগদুটো তুলে নিল রানা। চলল লিযের দিকে। পেছন থেকে এল মোরগের কোরাস। রানাকে একজন কাপুরুষ ধরে নিয়ে ডানা ঝাপ্টানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়ছে তারা। জানেও না, আজ ওদের কপাল কতটা ভাল।

‘চলো, বাড়ি ফিরি, রানার কনুই ধরে গাড়ির দিকে চলেছে লিয। চেহারায় স্বস্তি। গাড়ির চাবিটা গুঁজে দিল রানার পকেটে। ‘সমানে-সমান লড়াই হতো না। পাঁচজনের বিরুদ্ধে তুমি মাত্র একজন!’

‘তা ঠিক,’ বলল রানা। কুরিয়ার পত্রিকার সাংবাদিকের চেহারা ভেসে উঠেছে ওর মনে। ভাবল, সত্যিই ওই ফোটোগ্রাফারের গলা দিয়ে ক্যামেরাটা ভরে দেয়া উচিত ছিল। গাড়ির কাছে পৌঁছে রিপার দিয়ে পেছনের ডালা খুলল ও। একে একে বাজার ভরা ব্যাগ তিনটে রাখল ভেতরে। উঠে বসল গাড়িতে।

ফিরতি পথে রানার বাহুতে হাত রাখল লিয। মুখে মিষ্টি হাসি। ‘সত্যিই অবাক করলে, রানা। আমি তো ভাবতে শুরু করেছিলাম এখন আর দুনিয়ায় ভদ্রলোক বলতে কেউ নেই। আমার জন্যে রুখে দাঁড়াতে গিয়েছিলে বলে তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।’

‘কীসের জন্যে ধন্যবাদ?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল রানা। ‘পালিয়ে আসা ছাড়া আর তো কিছুই করিনি আমি!’

‘কী যে বলো! কালো, মোটা এক মাঝবয়সী মহিলাকে অপমান করেছে বলে পাঁচজনের বিরুদ্ধে একা রুখে দাঁড়িয়েছ। অথচ, আমাকে তুমি ভাল করে চেনোই না। এটা কম কথা হলো! আমি সাধারণ একটা….’

‘তুমি কথা দিয়েছ আমাকে ডিনার তৈরি করে খাওয়াবে, বলল রানা, ‘সাধারণ কেউ তো অপরিচিত লোকের জন্যে এটা করত না। করত?’

মাথা নাড়ল লিয। ‘লজ্জা দিয়ো না। তুমি মণ্টি ডয়েলের মত বাজে লোকের হাতে মার খেলে মনে খুব কষ্ট পেতাম।’

‘মার খাওয়ার কথা উঠছে কেন?’ ভুরু কুঁচকে লিযকে দেখল রানা। তারপর মৃদু হেসে ফেলল। ‘কে জানে, আমিই হয়তো ওদের সবক’টাকে পিটিয়ে শুইয়ে দিতাম।’

‘তার চেয়ে থাক্ এসব কথা,’ দূরে তাকাল লিখ।

চিটিমাচায় পৌঁছানোর আগেই রানার মন থেকে বিদায় নিল তিক্ত চিন্তা। বাড়ি পৌঁছে লিযের মালপত্র কিচেনে নিতে সাহায্য করল ও। অবাক হয়ে দেখল, কতটা যত্ন করে নানান তাকে মশলা আর মাল-সামান গুছিয়ে রাখছে লিয। আগে কখনও কারও কিচেন এতটা ঝকঝকে পরিষ্কার দেখেনি রানা।

সব সাজিয়ে রাখার পর পোশাকের হাতা গুটিয়ে নিল লিয। রঙ লাগা অ্যাপ্রন পরে রানাকে দেখল। ‘এবার আসল মজা! তুমি গিয়ে স্যালোনে বোসো। পত্রিকা-টত্রিকা দেখো। আমার বেশিক্ষণ লাগবে না।’

বৈঠকখানার সোফায় বসে দৈনিক পত্রিকা কোলে টানল রানা। প্রথম পাতায় দেখা যাচ্ছে বড় করে ছাপা হয়েছে ওর ছবি। সঙ্গে মদের দোকানের ফাঁপিয়ে তোলা সেই কাহিনী। মন্টি ডয়েলের সঙ্গী যে ওকে চিনে ফেলেছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিরক্তি নিয়ে বসে থাকল রানা। তবে সন্ধ্যার দিকে চমকে উঠল। ধোঁয়া ওঠা, সুগন্ধী ছড়ানো মস্ত দুটো ডিশ হাতে দরজার কাছ থেকে ওকে ডাকল লিয। ‘চলে এসো, রানা, খাবার রেডি।’

লিযের পিছু নিয়ে ডাইনিং টেবিলে গেল রানা। পরি- বেশনের সুবিধে হবে বলে টেবিলের এক ধারেই পাশাপাশি বসানো হয়েছে দুটো চেয়ার। সাজানো ডিশগুলোর দিকে চেয়ে বুঝল রানা, প্রতিটা পদ তৈরি করা হয়েছে অতি যত্নের সঙ্গে। দারুণ সুবাস আসছে খাবার থেকে।

দু’জনের সামনে বড় দুটো প্লেট রেখে ডিশ থেকে খাবার বাড়তে লাগল লিয।

‘তা হলে এটাই সেই বিখ্যাত গাম্বো?’ জানতে চাইল রানা।

‘না, এটা লিযের বিশেষ গাম্বো,’ হেসে শুধরে দিল লিয়। ‘অন্য কেউ এটা এভাবে তৈরি করবে না। ব্যস, এখন থেকে কথা বন্ধ। নাও, খাওয়া শুরু করো।’

আপত্তি না তুলে চামচ হাতে প্লেটের ওপর হামলা চালাল রানা। গাম্বো একধরনের মাংসের স্টু। তাতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে লিযের বক্তব্য অনুযায়ী ধুলোভরা ভাত। তবে এই খাবার যদি ধুলোভরা হয়, বাকি জীবন রোজ সকাল-সন্ধ্যায় গাম্বো খেতে আপত্তি করবে না রানা। রাক্ষসের মত গিলছে স্টু। মনে হলো, আগে কখনও এত সুস্বাদু খাবার খায়নি ও।

খেতে খেতে কোন্ ডিশে কী আছে, বর্ণনা দিচ্ছে লিখ। রানার খেতে ভাল লাগছে বুঝে খুশি। আদর করে বেড়ে দিচ্ছে এক পদ শেষ হলেই আরেক পদ। রানার হাতের পাশে রাখল এক গ্লাস হোয়াইট ওয়াইন। ‘মাঝে মাঝে এক-আধ চুমুক দাও। স্বাদ বাড়বে।’

স্টুর সঙ্গে মাঝে মাঝে এক চুমুক করে হোয়াইট ওয়াইন গিলল রানা। সমান তালে নিজেও খাচ্ছে, রানাকেও তুলে দিচ্ছে লিয। পঁয়তাল্লিশ মিনিট একটানা খাওয়ার পর রানা যখন ভাবছে আর পারা যায় না, এবার থামা উচিত, ঠিক তখনই কিচেন থেকে আরও দুটো ডিশ নিয়ে এল লিখ। প্রমাদ গনল রানা, কিন্তু লিযের সাদর অনুরোধ আর নিজের লোভের কারণে খাওয়া বন্ধ করতে পারল না। অবশেষে খাওয়া শেষ করে ফোলা পেটে হাত দিয়ে টের পেল ও, এখন কারও সাহায্য ছাড়া চট করে চেয়ার থেকে উঠতে পারবে না।

‘খুব খারাপ হয়নি তো?’ কপট বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইল লিখ।

অকৃত্রিম তারিফ উঠে এল রানার অন্তর থেকে।

ঝকঝকে সাদা দাঁত সবক’টা বেরিয়ে পড়ল লিযের। এবার চলল চকোলেট সস, মাখন, ডিমের কুসুম ও মধু দিয়ে তৈরি করা ডেয়ার্ট আনবে বলে। হাত জোড় করে মাফ চাইল রানা, পরিষ্কার বাংলায় বলল, ‘সত্যিই আর পারব না, বুবুজান! মাফ করে দে!’

মানে না বুঝলেও রানার বক্তব্য ঠিকই বুঝতে পারল লিয, কারণ তার নিজের অবস্থাও তথৈবচ।

‘ঠিক আছে, এটার ব্যবস্থা হবে পরে। বহু দূর থেকে এসেছ,’ বলল লিয, ‘এবার স্যালোনে একটু বসে দুই ঢোক উইস্কি খেয়ে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো। কাল তোমার জন্যে রাঁধব চাইনি কুইযিন। দেখো, ওটাও স্পেশাল!’

‘আমি বোধহয় এ শহর ছেড়ে কোথাও যাব না,’ বিড়বিড় করল রানা। ‘খেয়ে খুন হতে চাইলে এটাই আসল জায়গা।’

‘বালাই ষাট!’ মাথা নাড়ল লিয। ‘খুন হয়ে কাজ নেই! আমিও খুব খুশি তোমার মত ছোট একটা ভাই পেয়ে। রয়ে যাও এখানে। ভাই-বোন মিলে দাঁড় করিয়ে ফেলব দারুণ এক রেস্টুরেন্ট।’

‘জরুরি কাজ না থাকলে সত্যিই থেকে যেতাম, ‘ হাসিমুখে বলল রানা। –

দু’এক ঢোক ড্রিঙ্ক নেবে বলে স্যালোনে চলে এল ওরা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *