1 of 2

স্ট্রেঞ্জার – ৩৭

সাঁইত্রিশ

গাড়ি তলিয়ে গেলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত, চুপচাপ অপেক্ষা করা। হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকবে পানি। ওই ভয়ঙ্কর শক্তির সঙ্গে লড়াই করে কোনও লাভ হবে না। সুতরাং সিটবেল্ট খুলে ড্রাইভারের জানালার কাঁচ নামাল রানা। গবগব করে ভেতরে ঢুকছে কাদাভরা পানি। আগের চেয়ে দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। এটাই চেয়েছে রানা। এখন আর ওকে দেখছে না পুলিশ অফিসাররা।

প্রচুর পানি ঢুকতেই নাক নিচু করে বাইয়ুর তলদেশ লক্ষ্য করে রওনা হলো ফায়ারবার্ড। হাতে সময় নেই রানার। চট করে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ডানহাতে নিল ধনুকটা। ওটাই এখন ওর একমাত্র অস্ত্র। চুপ করে বসে থাকল ড্রাইভিং সিটে। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে ওর চিবুক তলিয়ে গেল পানির নিচে। বার তিনেক বড় করে দম নেয়া ও ছাড়ার পর শেষবারের মত বুক ভর্তি করে বাতাস নিল রানা। ডুবুরিদের কেউ কেউ প্রায় দশ মিনিট শ্বাস আটকে রাখতে পারে। ও পারবে বড়জোর সাড়ে চার মিনিট। তার পরেই ভেসে উঠতে হবে ওকে। প্রতিটা মুহূর্ত এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ভেতরটা পানিতে ভরে যেতেই আগের চেয়ে দ্রুত নেমে চলেছে গাড়ি। ওটা থেকে বেরিয়ে ওপরে উঠছে বড় বড় বুদ্বুদ। ওগুলো দেখবে পুলিশ অফিসাররা। ড্রাইভারের দরজা খুলে চারপাশে তাকাল রানা। কাদাপানির ভেতর দেখতে পাচ্ছে বড়জোর দু’ফুট। ধনুক হাতে নিমজ্জিত গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল রানা। সাঁতার কাটছে একহাতে। পা-দুটো অবশ্য দ্রুত লয়ে চলছে পিস্টনের মত।

আগেও এ ধরনের বিপদে পড়েছে। আর্মির কমাণ্ডো ট্রেইনিঙের সময় ভারী ব্যাগ পিঠে নিয়ে মাইলের পর মাইল সাঁতার কেটেছে ওরা। প্রতিদিন ওদেরকে বেদম খাটিয়ে নেয়ার সময় মুখে একরাশ হাসি নিয়ে বলত সার্জেন্ট সাদেক: ‘স্যর, এই যে আপনাদেরকে একটু খাটিয়ে নিচ্ছি, সেজন্যে একদিন মনে মনে কৃতজ্ঞ হবেন আমার প্রতি।’

বিড়বিড় করে সার্জেন্টকে গালি দিত রানার সহযোদ্ধারা। তবে পরে নানান মিশনে গিয়ে সবাই ওরা বুঝেছে, পানির ভেতর ওই এনডিয়োরেন্স ট্রেইনিং কতটা জরুরি ছিল।

প্রাণপণে সাঁতরে চলেছে রানা। ঠোঁট ফাঁক করে মাঝে মাঝে ছাড়ছে একটা-দুটো বুদ্বুদ। অবশ্য তাতে কেউ বুঝবে না নিচে আছে রানা। অনেক ওপরের কাদাপানি সমতল। রানা আবছাভাবে কানে শুনছে পুলিশের গাড়ির সাইরেন। মনের দৃষ্টিতে দেখছে, সেতুর ওপরে রেলিঙের ভাঙা জায়গা দিয়ে ঝুঁকে নিচের দিকে চেয়ে আছে একদল পুলিশ। সবার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। একবার পলাতক অপরাধী মাসুদ রানা উঠে এলেই অস্ত্র তাক করবে ওর দিকে। পাল্টা গুলি এলেই ঝাঁঝরা করবে ওকে।

রানার পেছনে বাইয়ুর তলদেশে ঠেকেছে ফায়ারবার্ড। ভক্ করে ছিটকে উঠেছে একরাশ কাদা। আঁধার হয়ে গেছে ওদিকটা। ওপর থেকে আসছে মৃদু আবছা আলো। ওই আভা দেখে এগিয়ে চলেছে রানা। এরই ভেতর পেরিয়ে গেছে দুই মিনিট। অক্সিজেনের অভাব হওয়ায় পেশিতে দ্রুত জমছে ল্যাকটিক অ্যাসিড। অভিজ্ঞ ডুবুরিদের ভেতর এসময় থেকেই শুরু হয় স্ট্রাগল ফ্যে। কমে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন। ধীর হয় মেটাবোলিযম। খেয়াল রাখে, অক্সিজেনেটেড রক্ত ঠিকভাবে পৌঁচ্ছে কি না মগজ ও ভাইটাল অর্গানে

পেরিয়ে গেল আড়াই মিনিট। দূর থেকে আসছে সাইরেনের আওয়াজ। পানির তলা দিয়ে নীরবে এগিয়ে চলেছে রানা। ওর জন্যে ধীর হয়েছে সময়, বায়োরিদম ও সাধারণ উপলব্ধি। ওকে দেখে বাউলি কেটে সরে যাচ্ছে ছোট-বড় হরেকরকম মাছ। তাতে সমস্যা নেই। তবে বড় সমস্যা হবে একরাশ দাঁতওয়ালা ভয়ঙ্কর মাংসাশী কোনও মাছ বা অ্যালিগেটর ওর খোঁজ পেলে।

পেরিয়ে গেল প্রায় তিন মিনিট। আর বড়জোর দেড় মিনিট দম রাখতে পারবে রানা। এরই ভেতর আগুনের মত জ্বলছে ফুসফুস। কঠিন হচ্ছে এগিয়ে যাওয়া। বারবার মন বলছে ভেসে ওঠা খুবই জরুরি। আরও কয়েক মুহূর্ত পর রানার হাতে লাগল লতাপাতার মত পিচ্ছিল কিছু। পরক্ষণে স্পর্শ করল কঠিন কিছু। রানা বুঝে গেল, পৌছে গেছে তীরে। নিজের মনটাকে নিয়ন্ত্রণ করল, যাতে বুক ভরে বাতাস পাওয়ার জন্যে সশব্দে পানির তলা থেকে কাঁধ ওপরে না তোলে। অগভীর পানিতে খুব ধীরে চিত হলো রানা। সাবধানে জাগিয়ে তুলল নাক ও মুখ। প্রথম ক’বার শ্বাস নেয়ার সময় মনে হলো, পৃথিবীতে এরচেয়ে ঐকান্তিক চাহিদা আর কিছুই নেই। অক্সিজেন পেয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে ওর দেহ।

সেতু থেকে দুই শ’ গজ দূরে ভেসে উঠেছে রানা। বাইয়ুর তীরের অগভীর পানিতে ভাসছে পচা ঘাসপাতা ও লতানো উদ্ভিদ। ওর চুল, ত্বক আর ভেজা পোশাকে আটকে গেছে গাঁজলা ভরা অ্যালজি। ফলে ভাল ক্যামোফ্লেজ পেয়েছে রানা। গা থেকে ওসব সরাতে গেল না। খেয়াল করল, কেউ চেয়ে নেই এদিকে। ফায়ারবার্ড যেখানে তলিয়ে গেছে, সেতুর ওপর থেকে ওখানেই চোখ রেখেছে একদল পুলিশ। তবে কিছুক্ষণের ভেতর তৎপর হয়ে উঠবে ওরা। তলিয়ে যাওয়া গাড়িতে রানার মৃতদেহ আছে কি না, তা দেখতে বাইয়ুতে নামবে ডুবুরি। মাথার ওপরে ডেকে আনবে হেলিকপ্টার।

অবশ্য ওর লাশ খুঁজতে শুরু করার আগেই এই এ থেকে সরে যাবে রানা। সবুজ থকথকে পানির ভেতর ধারে ধীরে সাঁতরে তীরের পাশ ঘেঁষে চলল ও।

একটু পর পৌঁছে গেল একটা বাঁকে। ওদিকে ঘন ঝোপঝাড়। সাবধানে তীরে উঠল রানা। এখন কেউ ওকে দেখলে ভাববে: অর্ধেক মানুষ, বাকি অর্ধেক পাঁকের দানব। গায়ে বাজে আঁশটে গন্ধ। ঝোপের ভেতর প্রতি পদক্ষেপে গা থেকে ঝরছে অ্যালজি।

রানার ধারণাই সঠিক। গাড়িতে লাশ নেই জানামাত ডেকে আনা হলো হেলিকপ্টার। শুরু হলো বড় জায়গা তল্লাসী।

সরু এক নদীর পার ধরে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে বহু দূরে সরে গেল রানা। মাথার ওপর হেলিকপ্টার হাজির হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগেই শুনল ওটার আওয়াজ। পানিতে নেমে তীরের পাশে ভাসমান সবুজ অ্যালজি ও পচা লতাপাতার ভেতর লুকিয়ে পড়ল রানা। ঝোপঝাড় দুলিয়ে আকাশ চিরে হেলিকপ্টার আসার আগেই বড় করে দম নিয়ে পানির তলায় ডুব দিল।

আজকাল বিনকিউলার হাতে অপরাধীকে খুঁজতে বেরোয় না আধুনিক এয়ার পুলিশ। সঙ্গে থাকে সর্বদর্শন থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা। যদিও বাইয়ুর পানি-সমতলে বাড়ি খেয়ে ফিরবে ইনফ্রারেড রে, ফলে চট্ করে ধরা পড়বে না রানার দেহের হিট সিগনেচার।

পুরো একমিনিট পর হেলিকপ্টার দূরে যাওয়ায় আবারও ভেসে উঠল রানা। আকাশ থেকে ওকে দেখবে কেউ, তা ভাবছে না। তবে বিপদ হবে অন্যদিক থেকে। বেলজিয়ান ম্যালিনোয়া বা জার্মান শেফার্ড কুকুরের সার্চ পার্টি এদিকে ছেড়ে দিলে ডাঙার কোথাও লুকাতে পারবে না রানা। সেক্ষেত্রে গায়ের গন্ধ গোপন করতে আবারও নামতে হবে অ্যালিগেটরে ভরা বিপজ্জনক বাইয়ুর পচা পানিতে।

জলার ভেতর তলা-চ্যাপ্টা ডোরি দেখেছে, মনে পড়ল রানার। ওগুলোতে চেপে নানাদিকের নদীতে ক্রফিশ, ক্যাটফিশ, গাম্বো ফিশ ইত্যাদি মাছ ধরে স্থানীয় জেলেরা।

এখন তীর ধরে গেলে যে-কোনও সময়ে খালি কোনও নৌকা পাবে রানা। এদিকের পুলিশের এত জনবল নেই যে ভাটির দিকে যাওয়া প্রতিটা নৌকার ওপর চোখ রাখবে তারা।

সুতরাং, পা চালাও, রানা।

কপাল ভাল, কুকুরের হিংস্র গর্জন কানে এল না ওর। বাইয়ুর সরু ক্রিকের পার ধরে এগিয়ে চলল। মাঝে মাঝে গাছের পাতার ঘন আচ্ছাদনের জন্যে ঢাকা পড়ছে মাথার ওপরের আকাশ। ঘনিয়ে এসেছে সন্ধ্যা। ধূসর হচ্ছে আলো। তবুও গাছপালার ফাঁক দিয়ে কখনও চোখে পড়ছে লালচে রোদ। একটু পর আঁধার নামলে বামহাতের তালু দিয়ে আড়াল করে টর্চ জ্বালল রানা। তিন-চার ফুটের বেশি দেখছে না। রাত নামতেই জঙ্গলে শুরু হলো নিশাচর প্রাণীর আনাগোনা। সরসর করে সরছে সরীসৃপ। টর্চের আলো দেখলেই উড়ে এসে ভোঁতা ফটাফট আওয়াজে ওটার ওপর আছড়ে পড়ছে মস্ত সব মথ। মাথার ওপরের আকাশে হেলিকপ্টার নেই, তবে আরও বড় বিপদ হচ্ছে তীরের ঝোপঝাড়ে বসবাস করা ভয়ঙ্কর বিষাক্ত কোনও সাপ!

জঙ্গলে বহুক্ষণ হাঁটল রানা, তারপর হঠাৎই গাছপালার ভেতর দিয়ে দেখল হলদেটে আলো।

ওটার উৎস হচ্ছে মাঝারি আকারের এক কেবিন। টর্চ নিভিয়ে নিঃশব্দে ওদিকে চলল রানা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *