1 of 2

স্ট্রেঞ্জার – ২

দুই

গতকাল সকালে আমেরিকার লুইযিয়ানার রাজধানী নিউ অর্লিন্সের লুই আর্মস্ট্রং ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমেছে মাসুদ রানা। বিকেলে ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু হ্যারি জন্সটনের বিয়ের অনুষ্ঠান। রাত হয়ে গেল কমিউনিটি সেন্টার থেকে বেরোতে। তাই রানা ঠিক করল হোটেলে উঠবে। তবে কিছুতেই রাজি হলো না বন্ধু হ্যারি। বাধ্য হয়ে রাতটা ওর বাড়িতেই কাটিয়ে দিতে হলো।

আজ ভোরে হ্যারি-দম্পতিকে জ্যামাইকার পথে হানিমুনে রওয়ানা করিয়ে দিয়ে বসে আছে রানা এয়ারপোর্টেই। ওর প্লেন ছাড়বে সকাল দশটায়। এয়ারপোর্টেই সময়টা কাটিয়ে দেবে মনে করে রেন্টাল কোম্পানির গাড়িটা ফেরত দিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দিল। কিন্তু স্থানীয় এক দৈনিক পত্রিকা কিনেই খবর দেখে চমকে গেল ও: আগামী পরশু লুইযিয়ানায় আসছেন দুনিয়া-সেরা বংশীবাদক পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া। রাতে পারফর্ম করবেন ক্লোভিস প্যারিশের সিভিক সেন্টারে।

মুহূর্তে স্থির করে ফেলল রানা: এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। ছুটিতে আছে, হাতেও জরুরি কোনও কাজ নেই, দুটো দিন থেকে যাবে এখানেই— শুনবে প্রিয় বাঁশুরিয়ার লাইভ পারফরমেন্স। রেন্টাল কোম্পানি থেকে আবার গাড়িটা ভাড়া নিয়ে ফিরতি পথ ধরল ও শহরের দিকে। গাড়ির জানালাগুলো সব খুলে দিল ও। আর্দ্র, ভাপসা, গরম পরিবেশ মনে করিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের জৈষ্ঠ্যের কথা। বেচারা যদি বুঝত কীসের ভেতর পড়তে চলেছে, দেরি না করে দৌড়ে গিয়ে বিমানে উঠত!

কিছুক্ষণ পর হাইওয়ের দু’দিকে দেখা দিল সারি সারি আখের খেত, একটু পর পর চোখে পড়ছে আখ মাড়াবার প্ল্যান্টেশন আর তেলের রিফাইনারি। পিচ ঢালা মসৃণ পথের দু’পাশে রানা দেখল বাইয়ু- প্রায়-স্থির জলের থকথকে সবুজ জলা। ওগুলোর তীরে একটা-দুটো জীর্ণ কুটির। নদী, খাল আর বাইয়ুর মাধ্যমেই প্রধানত আয়-রোজগার হয় এদিকের মানুষের। চ্যাপ্টা তলির নৌকা দেখা যাচ্ছে পানিতে ওগুলোকে এখানে ডোরি বলে। ওতে চড়ে মাছের জাল আর লবস্টারের ফাঁদ তুলতে-নামাতে পরিবারের প্রধানকে সাহায্য করছে ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এদিকটার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকটভাবে চোখে পড়ে। দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী দেশটির বিরাট এক অংশ জুড়ে বিরাজ করছে সীমাহীন বঞ্চনা ও দারিদ্র্য। পড়ে আছে মাইলের পর মাইল ফাঁকা জমি। এদিকের গ্রামাঞ্চল থেকে অন্তত এক শ’ মাইল উত্তরে প্রথম আধুনিক শহর শিভপোর্ট। পুবে মিসিসিপির ন্যাচেযের সঙ্গে ভিলেনিউভ শহরটাকে যুক্ত করেছে হাইওয়ে ৮৪। ওটা ধরে গেলে পৌঁছুনো যায় পশ্চিমে টেক্সাসের লুফকিনে। জমির অভাব নেই, চারপাশে পড়ে আছে লাখ লাখ একর অনাবাদি জমি, জঙ্গল, খাল, বিল ও পাহাড়।

গাইড বুক ঘেঁটে রানা জেনেছে, বিশাল এই লুইযিয়ানা রাজ্যে রয়েছে সাতষট্টিটা প্যারিশ বা জেলা। সেই তুলনায় জনসংখ্যা নিতান্তই কম। ক্লোভিস প্যারিশের আয়তন ছয় শ’ বর্গমাইল, অথচ মানুষ মাত্র নয় হাজার। পণ্ডিত চৌরাশিয়ার বাঁশি শুনতে যে ভিলেনিউভে চলেছে রানা, ওটা প্যারিশের প্রধান শহর। আজ থেকে বহু বছর আগে আঠারো শ’ চৌষট্টি সালে গৃহযুদ্ধের সময় রেড রিভার ক্যাম্পেইনে এসে ওটাকে জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়েছিল ইউনিয়ান আর্মি।

তারও অনেক আগে থেকেই এ এলাকায় ছিল চরম বিশৃঙ্খলা। ফ্রেঞ্চরা জায়গাটার নাম দিয়েছিল লুইযিয়ান, বা নতুন ফ্রান্স। মিসিসিপি থেকে সেই রকি মাউন্টেন এবং কানাডার বড় একটা অংশ নিয়ে ছিল তাদের রাজত্ব। বর্তমান ইউএস-এর পনেরোটা স্টেটের সমান এলাকা নিয়ে চরম লুঠপাট করেছে ফ্রেঞ্চ কলোনিস্টরা… কয়েক শতাব্দী ধরে জাহাজে করে আফ্রিকা থেকে ধরে এনেছে হাজার হাজার কালো মানুষকে। তাদের দিয়ে পেটে-ভাতে অমানুষিক পরিশ্রম করিয়ে নিয়েছে দক্ষিণের সমস্ত প্ল্যান্টেশনে। ঠিক ইংরেজরা যা করেছিল ভারতবর্ষে এসে। চরম নিষ্ঠুরতায় ফ্রেঞ্চ, ইংরেজ, স্প্যানিশ, আইরিশ— কেউ কারও চেয়ে কম যায়নি। তারপর সতেরো শ’ তেষট্টি সালে যুদ্ধ বাধল ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে রেড ইণ্ডিয়ানদের। মার খেয়ে ফ্রেঞ্চ রাজা লুই পনেরো সটকে পড়লেন নিজেদের দখল করা এলাকা স্প্যানিশ আর ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিয়ে। শুরু হলো নতুন কলোনি গড়ে তোলা। আবার আঠারো শ’ সালে স্প্যানিশদের তাড়িয়ে দিয়ে নতুন ফ্রেঞ্চ নর্থ আমেরিকান রাজ্য গড়তে গেলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। তবে যুদ্ধে অসফল হবেন টের পেয়ে আঠারো শ’ তিন সালে বিশাল এ এলাকা বিক্রি করলেন নব গঠিত ইউনাইটেড স্টেটস্-এর কাছে। তার মাত্র কয়েক বছর পর ব্রিটিশ সেনাদেরকে ঘাড় ধরে এ জায়গা থেকে বিদায় করল শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা। সেসময়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে চোখ ধাঁধানো মূল্য পনেরো মিলিয়ন ডলার দিয়ে তারা কিনল ফ্রেঞ্চদের কাছ থেকে লুইযিয়ানা রাজ্যের স্বত্ব। ফলে একলাফে আমেরিকার জমি হলো এক মিলিয়ন বর্গমাইল। এবং সেজন্যে দুনিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম দেশ হয়ে উঠল স্টেট্স্ অভ আমেরিকা। এর ষাট বছর পর নিজেদের ভেতর গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে নিল শ্বেতাঙ্গরা। ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই, প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে প্রতিবেশী— ওই ভয়ানক যুদ্ধে মরল সাড়ে সাত লাখ মানুষ। ধুলোয় মিশে গেল একের পর এক শহর-গ্রাম। এরপর যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় জন্মাল নতুন আরেক সভ্যতা।

শত শত বছর ধরে জগাখিচুড়ি এক মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে নতুন এই লুইযিয়ানা রাজ্যে। মানচিত্র খুললে দেখা যাবে এখনও এখানে-ওখানে রয়ে গেছে এলাকার ফ্রেঞ্চ নাম। সেগুলোরই একটা ভিলেনিউভ শহর। ওই প্যারিশের নাম দেয়া হয়েছে ফ্র্যাঙ্কিশ এক রাজার নামে। আজও অদ্ভুত ধাঁচের ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলে ক্যাজুনদের অনেকে। তবে ইদানীং হারিয়ে যাচ্ছে তাদের সেই সংস্কৃতি। এসব ভাবতে ভাবতে ড্রাইভ করছে রানা। একসময়ে দেখল সরু হয়েছে রাজপথ। দু’পাশে ছুটে পিছিয়ে যাচ্ছে খেত, কাঁচা রাস্তা, জলাভূমি, ছোট ছোট ফার্মস্টেড আর মাঝে মাঝে পড়ছে একটা-দুটো পরিত্যক্ত পেট্রল স্টেশন। নানাদিকে গেছে বাইয়ু। তারই একটার তীরে রানা দেখল লেখা রয়েছে:

ডিকি’য ক্রফিশ কেবিন।
জলদি আসুন!
গেল ফুরিয়ে সব!

সেই সকালে হালকা নাস্তা করলেও কেন যেন ডিকির ক্রফিশ খাওয়ার আগ্রহ বোধ করল না রানা। আরও এগিয়ে যাওয়ার পর রাস্তার ধারে আবার সাইনবোর্ড:

জনির তাজা কুনের মাংস!
মাত্র আধ মাইল দূরে!
চলে আসুন, চলে আসুন!

ওটাও এড়িয়ে গেল রানা। কয়েক মাইল পেরোবার পর সামনে পড়ল বড় সাইনবোর্ড:

স্বাগতম!
আপনি পা রেখেছেন ক্লোভিস প্যারিশে!

ভিলেনিউভ শহর আর বেশি দূরে নেই, রানা বুঝল, পৌঁছে গেছে সঠিক জায়গায়। পশ্চিম আকাশে জমেছে ঘন কালো মেঘ। ওদিক থেকে ধেয়ে আসছে তপ্ত, ভেজা হাওয়া।

এয়ারপোর্ট থেকেই ইন্টারনেট ঘেঁটে ভিলেনিউভ শহরের একমাত্র মোটেল বাইয়ু ইন-এ কামরা বুক করেছে রানা। মোটেলটা সিভিক সেন্টার থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরে। আগামী পরশু ওই সিভিক সেন্টারেই বাঁশি বাজাবেন ভারতের পদ্মবিভূষণ পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া।

মোটেলে নিজের রুমে ব্যাগ রেখে শহর ঘুরতে বেরোল রানা। দক্ষিণের এদিকটাই অপেক্ষাকৃত ধনীদের এলাকা। এখানে রয়েছে স্প্যানিশ মস-এ ছাওয়া প্রাচীন আমলের ওক গাছের সারি। সাদা রঙের কলোনিয়াল বাড়িগুলোর চারপাশে চওড়া বারান্দা। উত্তরদিকে একমাইল দূরে টাউন স্কয়্যার। ওখানেই রয়েছে জর্জিয়ান কলাম দেয়া চমৎকার, ছোট প্যারিশ কোর্টহাউস। ওটার একদিকে ক্লক টাওয়ার। রাস্তার ওদিকে সারি সারি দোকানের ভেতর রয়েছে হার্ডওয়্যার স্টোর, গ্রোসারি শপ ও একাধিক গান শপ। অস্ত্রের দোকানগুলোর সামনের জানালায় ঝুলছে কনফেডারেট ফ্ল্যাগ। এ ছাড়া, রয়েছে ফার্মেসি, গ্যাস স্টেশন ও বড়সড় একটা বার। এটার গেটে লেখা: ক্যাজুন স্টেকহাউস; অর্থাৎ, এটা রেস্তোরাঁও।

ডিকির ক্রফিশ বা জনির তাজা কুনের মাংসের চেয়ে ভাল!

স্টেকহাউসের সাইন দেখে রানার মনটা খুশি হয়ে উঠল।

সামনে অপ্রশস্ত রাস্তার দু’দিকে এম্ গাছের ছায়ায় সারি সারি বসতবাড়ি। কোনও-কোনটা পাতলা ক্ল্যাপবোর্ড দিয়ে তৈরি। নিয়মিত যত্ন নেয়া হয় বেশকিছু মাঝারি বাড়ির। অন্যগুলো রয়েছে ধসে পড়ার অপেক্ষায়। বাড়িগুলোর উঠানে রানা দেখল পুরনো, জংধরা সব গাড়ি, মরচে ধরা প্রোপেন ট্যাঙ্ক, ভাঙাচোরা মুরগি পোষার নেটের খাঁচা। এখানে ওখানে ছায়ায় শুয়ে আধ হাত জিভ বের করে হাঁফিয়ে চলেছে কিছু কুকুর। আকস্মিক বন্যার ভয়ে ইঁটের পিলারের ওপর উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে প্রতিটা বাড়ি। বারান্দায় উঠতে হলে ভাঙতে হবে কয়েক ধাপ সিঁড়ি। দরজা ও জানালায় রয়েছে মশা ও পোকা ঠেকাবার মেশ স্ক্রিন।

ঘণ্টাখানেক ঘুরে আবারও বাইয়ু ইনে ফিরল রানা। মোটেলের মালিক মধ্যবয়সী এক দম্পতি, নাম টম আর রিটা মর্টন। রানা ভেতরে পা রাখতেই মহিলা বলল, ‘আপনি নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত? বহু দূর থেকে এসেছেন। এবার মুখে কিছু দিয়ে বিশ্রাম নিন!’

জবাবে মৃদু হেসে সোজা নিজের রুমে ফিরল রানা। ব্যাগ ঘেঁটে বের করে নিল ডেনিম শার্ট ও কালো জিন্সের প্যান্ট। আরও অনেক টুকটাক জিনিসপত্র রয়েছে ওর ব্যাগে বাথরুমে ঢুকে পনেরো মিনিট মনের সুখে ভিজল রানা। তারপর নতুন পোশাক পরে রুমের ওদিকের ছোট্ট ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে প্রায় নির্জন রাস্তা। কিছুক্ষণ চারপাশ দেখে নিয়ে রুমের সোফার পাশে এসে থামল ও। কয়েক জায়গায় মেসেজ পাঠাবে রলে ব্যাগ থেকে নিল ওর দামি স্মার্টফোন। লেটেস্ট জিনিস, মাত্র এক সপ্তাহ আগে কিনেছে। কিন্তু গত কয়েক ঘণ্টার ভেতর কোনও এক অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ করে অক্কা পেয়েছে ওটা— একেই বলে আধুনিক টেকনোলজি!

নিচে নেমে মোটেলের মালকিন রিটা মর্টনের কাছে রানা জিজ্ঞেস করল, ভরসা করার মত কোনও মোবাইল ফোন কোন্ দোকান থেকে কিনতে পারবে।

সামনেই একটা দোকান আছে, জানাল মহিলা। ওখানে নাকি নানান ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়। মোবাইল ফোনও থাকতে পারে।

মোটেল থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই দোকানটা পেল রানা। তবে ভেতরে ঢুকে দেখল, এ দোকানে বিক্রি হয় অতি সস্তা প্রি-পেইড সিম ও মোবাইল ফোন। একটু ব্যবহার করলেই আগুনের মত গরম হয়ে ওঠে বলে ওরা নাম দিয়েছে ‘আভেন’। এমন কী গায়ে প্রস্তুতকারী কোম্পানির নামটাও লেখা নেই। চাইলেও ওর কল ট্রেস করতে পারবে না কেউ। বিশ ডলারে মোবাইল ফোন কিনে রানা দেখল, এই উনুনেও ওয়েব অ্যাকসেস রয়েছে। বাহ্! আরও বিশটা ডলার দোকান মালিককে দিতেই ব্যবহারোপযোগী হলো ফোনটা। ঘরে ফিরে বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের হেডঅফিস ও বিদেশে কয়েকটা শহরের রানা এজেন্সিতে কল করে রানা জানিয়ে দিল, খুব জরুরি প্রয়োজন হলে ওকে পাওয়া যাবে লুইযিয়ানার ক্লোভিস প্যারিশে।

এদিকে গড়িয়ে চলেছে বিকেল। ছুঁচোর দৌড়ঝাঁপ আর ডাকাডাকি শুরু হয়েছে রানার পেটের ভেতর। সময় লাগল না ভিলেনিউভ টাউন হলের কাছে ক্যাজুন স্টেকহাউসে পৌঁছুতে। ভেতরে খদ্দের নেই বললেই চলে। এক তরুণী এসে মেনু দিল। খাবার বলতে ফিল গাম্বো, এস্‌ উইদ শ্রিম্প অ্যাণ্ড গ্রিস্‌, ক্রিয়োল জাম্বালায়া অ্যাণ্ড ক্রফিস বয়েল ধরনের খাবার। নিজেকে নিরাপদ রাখতে টি-বোন উইদ ফ্রাইড পটেটো অ্যাণ্ড ডিক্সি বিয়ারের অর্ডার দিল রানা।

‘তুমি শুধু একটু ধৈর্য ধরে বসে থাকো, হ্যাণ্ডসাম, দেখবে দশ মিনিটেই তোমার জীবনে এসে হাজির হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু স্টেক,’ অর্ডার নিয়ে দারুণ মিষ্টি একটুকরো হাসি উপহার দিয়ে কিচেনের দিকে উধাও হলো তরুণী।

না, পাক্কা দেড়ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো না, সত্যিই দশ মিনিটে এল টি-বোন। এমন মজাদার এত বিরাট স্টেক আগে কখনও চেখে দেখেনি রানা। পেট ভরে মাংস আর আলুভাজা খেতে খেতে দুটো হিম-শীতল বিয়ার সাঁটিয়ে দিল। আপাতত কোনও কাজ নেই বলে মনের কোণে উঁকি দিল স্কচ উইস্কির স্বাদের কথা। কিন্তু না। হার্ড লিকার কিছুদিনের জন্যে বাদ দিয়েছে ও। তাছাড়া তরুণী ওয়েটারের কাছ থেকে আগেই জেনেছে, তাদের কাছে স্কটল্যাণ্ডের কোনও লিকার নেই।

আবার ফিরল ও মোটেলে নিজের রুমে। একটু গড়িয়ে নিল আরামদায়ক বিছানায়। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, নিজেও বলতে পারবে না।

ঘুম ভাঙল রাত এগারোটার দিকে। মুখ-হাত ধুয়ে ফিরল সেই স্টেকহাউসে। এবার হাফ স্টেক ও পটেটো ফ্রাই নিল। খাবার আর দুটো ডিক্সি বিয়ার শেষ করে বেরিয়ে এল বার অ্যাণ্ড রেস্টুরেন্ট থেকে।

থমথম করছে শহর। মাঝে মাঝে ফুটপাথ ধরে আসছে- যাচ্ছে একজন-দু’জন মানুষ। নতুন করে শহরটা ঘুরে দেখছে রানা। এ গলি ও গলি ঘুরে মাঝারি এক রাস্তায় পড়ে আবারও ফিরে চলল মোটেলের দিকে।

তবে মিনিট দশেক পর থমকে দাঁড়াল এক দোকানের সামনে। আবারও ফিরেছে ক্লোভিস প্যারিশের সদর রাস্তায়। সামনের মদের দোকানে বেশ জোরে বাজছে কেনি রজার্সের গান। কান্ট্রি মিউযিকের রাজা মানুষটা। বেহালা, গিটার, ড্রাম আর স্যাক্সোফোনের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে দূর-দূরান্তরে। দোকানের বাইরে বড় এক নিয়ন সাইনবোর্ডে লেখা:

টিমোথি য লিকার কর্নার
এখানে সব ধরনের মদ্য বিক্রয় হয়
সকাল এগারোটা থেকে রাত দুইটা পর্যন্ত খোলা

মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিল রানা। বন্ধুর বিয়েতে কী দেবে বুঝতে পারছিল না, হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মত মাথায় খেলে গেল: খুব দামি এক বোতল শ্যাম্পেন উপহার পেলে দারুণ খুশি হবে হ্যারি জন্সটন। জ্যামাইকায় ওদের মোটেলে পাঠাতে পারলে আরও ভাল হয়। পরমুহূর্তে মনে পড়ল হ্যারির বউয়ের আবার শ্যাম্পেনের চেয়ে উইস্কিই বেশি পছন্দ। ঠিক আছে, দেখাই যাক না, কী পাওয়া যায় এখানে!

দোকানে পা রেখে রানা দেখল, এখানেও ও একমাত্র খদ্দের। তাতে অবাক হলো না। এ ধরনের দোকানে যা হয়, বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্তে বোতল কিনতে ছুটে আসে খদ্দের।

দোকানটা মাঝারি আকারের। মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত ছয় সারিতে ঠাসা রয়েছে র‍্যাকভর্তি বোতল। এই ঘরে যে পরিমাণ মদ আছে, সব ঢাললে তাতে ভাসিয়ে দেয়া যাবে ছোটখাটো একটা আস্ত জাহাজ। হাসি হাসি মুখ করে যার যার তাকে দাঁড়িয়ে আছে থরে থরে বিয়ার, জিন, ভোদকা, কালো আর সাদা রামের পাশাপাশি নানান ধরনের বারবন উইস্কি। এ ছাড়া, রয়েছে নানান জাতের স্থানীয় ওয়াইন। কয়েকটা র‍্যাকে চোখ রেখে রানা বুঝল, ও যা খুঁজছে, এখানে সেটা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

গায়ে পুরনো চেক শার্ট, জিন্সের প্যান্ট আর মাথায় ক্যাপ পরে কাউন্টারের ওদিকে বসে আছেন খুনখুনে এক বৃদ্ধ। মুখ আর হাতে হাজার হাজার ভাঁজ। একটা মাছ সংক্রান্ত পত্রিকায় সমস্ত মন, আর কোনও দিকে খেয়াল নেই।

‘এত আওয়াজের ভেতর আপনার মাছটা পালাবে না তো আবার?’ জোরালো বাজনার ওপর গলা চড়িয়ে জানতে চাইল রানা।

হঠাৎই খদ্দেরকে দেখে পত্রিকা কাউন্টারে রাখলেন বৃদ্ধ। ছলছলে চোখে রানাকে দেখলেন। ‘কী বললে, বাছা?’

রানা দেখল, দাদুর বয়স নব্বুইয়ের বেশি, মুখে একটা দাঁতও নেই। তাঁর দোকানে ভাল স্কচ উইস্কি আছে কি না জানতে চাইল ও। ফলে হাঁ করে ওর দিকে চেয়ে রইলেন বৃদ্ধ মানুষটা। দ্বিতীয়বার জানতে চেয়ে রানা টের পেল, বুড়ো দাদুর যে শুধু একটা দাঁতও নেই তা-ই নয়, তিনি কানেও ভাল শুনতে পান না। সেজন্যেই এই জোরালো বাজনা তাঁকে ডিস্টার্ব করতে পারছে না।

অবশ্য তৃতীয়বারে দোকানের দূরের একটা দিক দেখালেন তিনি। ‘তৃতীয় সারিতে। এক্কেবারে পেছনে। ওখানে বোধহয় পছন্দের জিনিস পাবে।’ আগে লুইযিয়ানার উপকূলবর্তী জলাভূমি এলাকায় এমন ক্যাজুন উচ্চারণে কথা বলতেন বয়স্করা। আজকাল আমেরিকার নতুন প্রজন্ম এভাবে কথা বলে না।

তাঁকে ধন্যবাদ দিল রানা।

তাতে ভুরু কুঁচকে ওকে দেখলেন বুড়ো। তাঁর দোকানে যেন পা রেখেছে কালো চুল, বাদামি ত্বকের ভিনগ্রহ থেকে আসা এক যুবক। ‘একটা কথা, তুমি কোন্ দেশ থেকে এসেছ, পাডনাহ্! আগে তো কখনও তোমাকে এদিকে দেখিনি!’

বহুদিন পর পার্টনার বলে ওকে সম্বোধন করল কেউ, ভাবল রানা। গলা চড়িয়ে বলল, ‘বহু দূরের দেশ থেকে।’

কানের কাছে হাত রেখে নাক কুঁচকে ফেললেন বৃদ্ধ। ‘কোথায় যেন বললে?’

আলাপ করতে চান তিনি, বুঝে গেল রানা। তবে সমস্যা হচ্ছে, আমেরিকার এতটা দক্ষিণে বোধহয় হিয়ারিং এইড পৌঁছায় না। এখন গল্প জুড়তে হলে গলা ফাটিয়ে কথা বলতে হবে রানাকে। কণ্ঠনালী অক্ষত রাখার জন্যে মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে তৃতীয় সারির র‍্যাকগুলোর দিকে চলল ও। পেছন থেকে চেয়ে রইলেন বুড়ো। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবারও নাকের কাছে তুললেন মৎস্যশিকারের পত্রিকা।

শেষ র‍্যাকের নিচের তাকে রয়েছে নানান ধরনের চ উইস্কি। সব ধুলো মেখে ভূত। এদিকের মানুষ বোধহয় স্কচ উইস্কিতে অভ্যস্ত নয়। চোখ বোলাতেই রানা দেখল নকাণ্ডো, জনি ওয়াকার, কাটি সার্ক, গ্লেনমোরেঞ্জি ছাড়াও আরও বেশ কিছু ভাল মাল। এগুলোর পিছনে লুকিয়ে উঁকি দিচ্ছে এক বোতল ল্যাফ্রোইগ কোয়ার্টার কাস্ক সিঙ্গেল মল্ট। বিশ বছরের পুরনো। ঘন কালচে, ধোঁয়ার গন্ধ মেশানো জিনিসটা বরাবরই রানার প্রিয়।

র‍্যাকের কোণে বোতলটা রানার জন্যে এত বছর ধরে অপেক্ষা করেছে যে, ধুলো ও মাকড়সার ঝুলে ভাল মত দেখা যাচ্ছে না লেবেল। বোতলটা তুলে ঝুল ও ধুলো মুছল রানা। বুঝে গেছে, এ জিনিস এক রাতের ঘুম হারাম করে দেবে জন্সটন দম্পতির। নিজের জন্যে এক বোতল কাটি সার্ক নেবে কি না ভেবেও কড়া এক ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল ইচ্ছেটাকে। আরেকবার বোতলটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিয়ে কাউন্টারের দিকে চলল রানা। শুনতে পেল বাজনার ওপর দিয়ে কথা বলছে কারা যেন। র‍্যাকের বাঁক ঘুরে এক পা এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল রানা।

কাউন্টারের সামনে মোষের মত দুর্বোধ্য, নিচু, তেরছা দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিশমিশে কালো এক বিশালদেহী নিগ্রো। পিঠে হলুদ রঙে লুইযিয়ানা মোটর সাইকেল লেখা কালো এক জ্যাকেট। করোটি আঁকা রয়েছে মাথার হেলমেটের পেছনে। রানা বুঝে নিল, খুব ধীরে নড়াচড়া করে পাহাড়টা। মুখে সারাক্ষণ লেগে আছে আত্মবিশ্বাসী হাসি।

তবে তার সঙ্গীটা চটপটে, হালকা শরীরের এক ধূর্ত শেয়াল। পরনে ডেনিম শার্ট আর ফ্যাকাসে নীল হাঁটু-ছেঁড়া জিন্সের প্যান্ট। রাগী চোখে বৃদ্ধকে দেখছে সে। চোখ দেখেই রানা বুঝল, এ-লোক কোকেনের অন্ধভক্ত।

লোকদু’জনকে খদ্দের বলে মনে হলো না রানার। একজনের হাতে নলকাটা দোনলা বন্দুক। অন্যজনের নাভির কাছে বেল্টে গোঁজা একটা ম্যাগনাম রিভলভার।

দুধের শিশুও বুঝতে পারবে, এদের উদ্দেশ্য কী।

দেরি না করে দুই পা পিছিয়ে ডিক্সি বিয়ারের র‍্যাকের আড়ালে সরে গেল রানা। চোখ রাখল আড়াল থেকে।

গ্রিযলি ভালুকের মত বামহাতের বিশাল পাঞ্জা দিয়ে বুড়ো মানুষটার সরু গলা পেঁচিয়ে ধরেছে মোটা মোষ। আরেক হাতে বেচারার বুকে ঠেসে ধরেছে বন্দুকের নল।

ভীষণ ভয় পেয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছেন বৃদ্ধ। যে-কোনও সময়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা পড়বেন।

হালকা গড়নের লোকটার প্যান্টে ওভাবে কক করা .৩৫৭ স্মিথ অ্যাণ্ড ওয়েসন ম্যাগনাম রিভলভারটা গুঁজে রাখা ঠিক হয়নি, ভাবল রানা একবার।

কাউন্টার টপকে ক্যাশ রেজিস্টারের সামনে থামল চিকন লোকটা। খচমচ শব্দে টাকাগুলো ঘাঁটছে সে। পরক্ষণে রাগত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, ‘অই, ব্যাটা! আর টাকা কই? বুড়া শালা! কোথায় রেখেছিস সব?’

বিস্ফারিত চোখে তাকে দেখছেন বৃদ্ধ। কথা বলার সাহস নেই। যে-কোনও সময়ে তাঁর বুক-পেট ঝাঁঝরা করবে বন্দুকওয়ালা মোষ।

হালকা গড়নের সাইকো, না ভারী মোষ, দুই শয়তানের মধ্যে কে বেশি বিপজ্জনক, বুঝতে চাইছে রানা। ধীরে ধীরে শ্বাস নিল। এবার বোধহয় সময় হয়েছে কিছু করার।

রাত এখন এগারোটা পঞ্চান্ন মিনিট।

র‍্যাকের আড়াল থেকে বেরিয়ে অসতর্ক দুই ডাকাতের দিকে গুটি গুটি পায়ে এগোল রানা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *