1 of 2

স্ট্রেঞ্জার – ১৭

সতেরো

তীরের গতি সাপের চেয়ে ঢের বেশি। রানা তীর ছেড়ে দিতেই বাতাসে হিস্ আওয়াজে টার্গেটের দিকে রওনা হয়েছে ওটা। বাচ্চা শুয়োরের মত তীক্ষ্ণ আর্তচিৎকার করে উঠল ছোট ছেলেটা। ওদিকে ওর কিশোর সঙ্গী ভেবেছে নিজের তীরের আঘাতে মারা পড়তে চলেছে। ভয় পেয়ে পেছাতে গিয়ে তাল হারিয়ে হুড়মুড় করে ঘাস জমিতে চিত হয়ে পড়ল সে।

ঠিক জায়গায় বিঁধেছে রানার তীর। ঝপ্ করে মাটিতে পড়ল সাপের ফুটো হওয়া মাথা। কিলবিল করতে লাগল বিষাক্ত প্রাণীটা। তবে একমিনিট পেরোবার আগেই শিথিল হয়ে পড়ে থাকল দড়ির মত এঁকেবেঁকে। ভীষণ ভয়ে এখনও ফুঁপিয়ে চলেছে ছোট ছেলেটা। ধনুকটা হাতে নিয়েই তার সঙ্গীর দিকে পা বাড়াল রানা।

দীর্ঘ ঘাসের ভেতর নিথর পড়ে আছে কিশোর ছেলেটা। হাত থেকে ধনুক ফেলে দ্রুত এগোল রানা। বেচারার পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। ছেলেটার বাম হাঁটুর পেছনে একটু নিচে ফ্যাকাসে হয়েছে ফর্সা ত্বক। ওখানে ছোট দুটো ফুটো দেখল রানা। মাথা ফুটো হওয়ার আগে পায়ের ওই জায়গায় দুই দাঁত বিধিয়ে দিয়েছে পিট ভাইপার। তীর ছুঁড়তে দেরি হয়েছে রানার। প্রথম থেকেই ঠিক ছিল না ওর তাক। তার ওপর এতই দুর্বল, ঠিক মত ধনুক ধরতে গিয়েও সমস্যা হয়েছে। নইলে হয়তো বিষক্রিয়া থেকে বাঁচাতে পারত ছেলেটাকে।

একদম নড়ছে না বেচারা। কয়েক মুহূর্ত রানা ভাবল, মারা গেছে ছেলেটা। কিন্তু সাপের বিষে তো মুহূর্তে মরে না কেউ। জট পাকিয়ে যাওয়া মগজে রানা বুঝল, মাটিতে পড়ার সময় ঘাসের ভেতর থাকা পাথরে মাথা ঠুকে জ্ঞান হারিয়েছে ছেলেটা। মাথার তালুতে সামান্য রক্ত।

এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠল বাচ্চা ছেলেটা। ওর কনুই ধরতে রানা হাত বাড়িয়ে দিতেই ভয় পেয়ে লাফিয়ে সরে গেল সে। নরম সুরে বলল রানা, ‘আমি তোমার কোনও ক্ষতি করব না। তোমার নাম কী?’

পিচ্চির চোখ থেকে ঝরঝর করে নামছে লোনাজল। চোখ পিটপিট করে দেখল রানাকে। কয়েক মুহূর্ত পর কাঁপা গলায় বলল, ‘রব গুডরিচ।’

‘রব, তোমার বন্ধু ভালো নেই। এখুনি ওকে নিয়ে যেতে হবে হাসপাতালে।’

চোখ বড় বড় করে রানাকে দেখল পিচ্চি। দৃষ্টিতে ভীষণ আতঙ্ক। ওর সঙ্গী মাটিতে পড়ে আছে বলে এখনও রয়ে গেছে, নইলে একদৌড়ে পালিয়ে যেত। ‘রন আমার বন্ধু নয়, আমার ভাই।’ চোখ মুছে আঙুল তাক করল ওপরের জঙ্গলের দিকে। ‘আমরা ওদিকে থাকি। আমাদের মামা জানে কী করতে হবে। সবই মেরামত করতে পারে সে।’ কৌতূহলী চোখে রানাকে দেখল ছেলেটা। ‘তুমি আসলে কে, মিস্টার?’

‘আসলে আমি একজন ভূত শিকারি, বেসুরো স্বরে বলল রানা। ‘পেলেই চিবিয়ে পানি দিয়ে গিলে ফেলি।’

‘তো আজকে পেলে কোনও ভূত?’ শ্রদ্ধাভরা চোখে রানাকে দেখল পিচ্চি।

‘না।’ আফসোসের সঙ্গে মাথা নাড়ল রানা। এবার বলো তো, বাসায় পাব তোমাদের মাকে? ‘

গম্ভীর চেহারায় মাথা দোলাল ছেলেটা। ‘ইয়েস, স্যর।’ বলেই সতর্ক হয়ে উঠল পিচ্চি। ‘কিন্তু মাকে আবার খেয়ে ফেলবেন না তো?’

‘আরে, নাহ্। আমি মানুষ খাই না। ঠিক আছে, রব, তুমি আমাকে পথ দেখাবে,’ বলল রানা, ‘জলদি বাড়ি নিতে হবে রনকে।

একটু দ্বিধা করল পিচ্চি রব, তারপর দীর্ঘ ঘাসের ভেতর দিয়ে গ্যাজেল হরিণের গতি তুলে ছুট দিল। আহত রানা এতই ক্লান্ত, ওর মনে হলো যে-কোনও সময়ে ধুপ করে মাটিতে পড়বে। ঝুঁকে অচেতন রনের শিথিল দেহ কাঁধে তুলে টলমল পায়ে রবের পেছন পেছন চলল ও।

ঘাস ও ঝোপের মাঝে প্রায় অব্যবহৃত, আঁকাবাঁকা এক পথে ঢাল বেয়ে জঙ্গলের গাছের ভেতর দিয়ে চলল রানা। রনের ওজন বড়জোর এক শত পাউণ্ড। তবুও বারবার ভাঁজ হয়ে যেতে চাইছে বিসিআই এজেন্টের হাঁটু। বাড়তে বাড়তে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে পেটের ক্ষতের যন্ত্রণা। রানার মনে হচ্ছে, আবারও কাটা জায়গাটা ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। একটু পর পর রবকে গতি কমাতে বলছে। ওর ভয় লাগছে, জঙ্গলের বেশি গভীরে গেলে ছুটন্ত ছেলেটাকে আর খুঁজেই পাবে না। ধীরে ধীরে আবছা কালো আঁধার নামছে ওর চোখে। যে- কোনও সময়ে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। আর তখন কাঁধ থেকে খসে পড়বে আহত রন। অথবা, হয়তো ঢালু জমিতে গড়াতে গড়াতে ছেলেটার দেহ পৌঁছে যাবে সাপের আখড়ায়। ওখানে একাধিক সাপ থাকার কথা। বা, ঠিক সময়ে হয়তো ছেলেটাকে পৌঁছে দিতে পারল না বাড়িতে ওর মা’র কাছে।

রবের কথা মনে পড়ল রানার। ও বলেছে, ‘আমাদের . মামা জানে কী করতে হবে। সবই মেরামত করতে পারে সে।’

পিচ্চির কথা সত্যি হলেই হয়, চলতে চলতে ভাবল রানা। মহিলার কাছে বোধহয় অ্যান্টিভেনম কিট আছে। জঙ্গলে বাড়ি করলে বুদ্ধিমান যে-কেউ ওটা রাখবে। এদের বাড়ি থেকে শহরে যেতে লাগে কমপক্ষে একঘণ্টা। এক ঘণ্টার আগে কোথাও নেই ডাক্তার বা হাসপাতাল। আবার শহর থেকে যে এখানে আসবে অ্যাম্বুলেন্স, তাও বোধহয় সম্ভব নয়। পথের নানান জায়গা ধসে গেছে। ততক্ষণ কি বাঁচবে ছেলেটা?

ধুলোভরা, সরু, আঁকাবাঁকা, চড়াই পথে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অন্তত আধ মাইল ছুটল রানা। তারপর ছোট্ট হোমস্টিড দেখতে পেয়ে ওর মনে হলো, ওখানে কোনও দিনই পৌঁছুতে পারবে না। প্রাকৃতিক এক খোলা জায়গায় বাড়ি করেছে গুডরিচরা। চারপাশ প্রায় ঘিরে রেখেছে প্রকাণ্ড সব গাছের সারি। তারই মাঝে কাঠের তৈরি ছোট্ট বাড়ি। ওটার চারদিকে উঁচু বারান্দা। বাড়ির মত বারান্দার ওপরেও জং ধরা টিনের ছাত। একটু দূরে পুরনো, জীর্ণ বার্ন ও কয়েকটা ছাউনি। তীরবেগে কাঁচা মাটির উঠানে পৌঁছুল পিচ্চি রব। গলা চিরে বেরোল প্রাণপণ চিৎকার। ‘মামা! মামা! পাপা! সাপ! কামড় দিয়েছে রনকে! সাপে কামড় দিয়েছে রনকে ‘

হোঁচট খেতে খেতে বাড়ির কাছে পৌঁছুল রানা। অচেতন ছেলেটার ওজনে ছিঁড়ে পড়ছে দুই হাতের দুর্বল পেশি। উজ্জ্বল সাদা ড্রেস পরা ছোটখাটো আকৃতির কৃষ্ণাঙ্গ এক মহিলা বাড়ির স্ক্রিন ডোর ঠেলে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে। সে যে রনের মা নয়, বুঝে গেল রানা। তবে মহিলার চেহারার সঙ্গে অনেক মিল রবের।

‘মামা! মরে যাচ্ছে রন!’

রানাকে যেন দেখতেই পেল না মহিলা। তার চোখ শ্বেতাঙ্গ ছেলেটার শিথিল দেহের ওপর। অস্ফুট চিৎকার ছেড়েই বারান্দা থেকে উঠানে নেমে রানার দিকে ছুটে এল সে। ওই একই সময়ে রানা শুনল বুটের জোরালো ধুপ-ধাপ আওয়াজ। পরক্ষণে বার্ন থেকে ছিটকে বেরোল দাড়িওয়ালা প্রকাণ্ডদেহী এক শ্বেতাঙ্গ। লোকটার পরনে গ্রিস মাখা ওভারঅল। হাতে বড় একটা রেঞ্চ। কোনও যন্ত্র মেরামত করছিল, এমন সময় শুনতে পেয়েছে চেঁচামেচি। ভারী গলায় জানতে চাইল লোকটা, ‘কী হয়েছে? এত হৈ-চৈ কীসের?’

রানার কাছে আগে পৌঁছুল মহিলা। কাঁদতে শুরু করেছে। এত জোরে রনের হাতদুটো চেপে ধরেছে, ফুলে উঠল মহিলার চিকন কবজির শিরা। বিড়বিড় করে বলল, ‘হায়, ঈশ্বর!’ পরক্ষণে প্রথমবারের মত দেখল রক্তাক্ত রানাকে। ঝটকা দিয়ে পিছিয়ে গেল এক পা। এখনও ধরে রেখেছে সৎ ছেলের হাত। বেসুরো কণ্ঠে বলল মহিলা, ‘আপনি কে?’

‘নামটা বব অ্যালান,’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রানা। বেশিরভাগ সময় প্রতি ভোরে দশ মাইল দৌড়ায়। বুকডন দেয় অন্তত এক হাজারবার। কিন্তু নদীর তীর থেকে এপর্যন্ত আসতে গিয়ে ফুরিয়ে গেছে ওর সমস্ত শক্তি। ‘ওরা মাছ ধরছিল। এমন সময় ওই সাপটা ছোবল মেরেছে ছেলেটাকে।’

‘ওই ক্রিক কটনমাউথে ভরা,’ ভারী গলায় বলল শ্বেতাঙ্গ লোকটা। এ-ই রনের বাবা, ভাবল রানা। ‘ওদেরকে বারবার বলেছি, ওদিকে গেলে যেন সাবধানে থাকে।’

‘এই লোকটা সাপটাকে মেরে ফেলেছে, মামা,’ মা-র জামার আস্তিন ধরে রানাকে দেখাল রব। ‘রনের ধনুক দিয়ে।’

‘তাই?’ রানার কাছে জানতে চাইল ছেলেদের বাবা।

‘দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাম কাফ মাসলে কামড় খেয়েছে ছেলেটা।’

সাবধানে বারান্দার ওপর অচেতন রনকে শুইয়ে দিল রানা। ছেলেটার পাশে বসল মহিলা। মাথায় পাথরের বাড়ি খেয়ে অচেতন হলেও এইমাত্র জ্ঞান ফিরছে রনের। বিড়বিড় করে বলল, ওর আসলে কিছুই হয়নি।

‘তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো, আব্বু,’ আদর মাখা গলায় বলল কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। এখন চোখে অশ্রুজল নেই। শান্ত মাথায় ভাবছে এরপর কী করবে।

মহিলা দায়িত্বশীল কোনও কাজ করে, মনে হলো রানার।

‘আমি গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসছি, এলিসা,’ বাড়ির ভেতর গিয়ে ঢুকল মহিলার স্বামী।

সে চলে যেতেই মনোযোগ দিয়ে রনের পা দেখল মহিলা। রানার কাছে জানতে চাইল, ‘কতক্ষণ আগে কামড় দিয়েছে?’

‘এই দশ মিনিটের মত,’ বলল রানা।

সৎ ছেলের পাল্স্ দেখল এলিসা গুডরিচ। নানান প্রশ্ন করে বুঝতে চাইছে, এখন কেমন বোধ করছে রন।

‘আমি ঠিক আছি, মামা। কিচ্ছু হয়নি,’ উঠে বসে বলল কিশোর ছেলেটা।

এদিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল ওর বাবা। হাতে একটা ভায়াল ও সিরিঞ্জ।

‘দরকার ছাড়া অ্যান্টিভেনম দিতে চাই না, জোসেফ, ‘ বলল এলিসা গুডরিচ। ‘অ্যানাফাইলাক্সিসের ঝুঁকি আছে।’

‘তার মানে ওর অ্যান্টিভেনম লাগবে না?’ উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চাইল তার স্বামী।

‘বিষ শরীরে ঢুকলে কাটা জায়গাটা ফুলে উঠত। ফুটো হওয়া জায়গাটা দেখো। চামড়া পুরোটা ভেদ করেনি সাপের দাঁত। ওর পাল্স্ ঠিক আছে। মনে হচ্ছে ওটা ড্রাই বাইট ছিল।’

দুনিয়ার নানান জঙ্গলে মিলিটারি ট্রেইনিঙের সময় সব ধরনের সাপের ওপর পড়াশোনা করতে হয়েছে রানাকে। ড্রাই বাইট মানে কামড়ে দেয়ার সময় বিষ উগলে দিতে পারেনি সাপ। কপাল ভাল হলে কখনও কখনও এমনটা ঘটে। রনের পায়ে দাঁত বসিয়ে দেবে সাপটা, এমন সময় ওটার মাথা ফুটো করে দিয়েছে রানার তীর।

‘ঈশ্বর রক্ষা করেছেন,’ রনকে জড়িয়ে ধরল এলিসা। পর পর তিনটে চুমু দিল গালে-কপালে। ‘আর আপনাকে সত্যিই অনেক ধন্যবাদ, মিস্টার… অ্যালান, তা-ই না? আপনি সাপটাকে মেরে না ফেললে বিষক্রিয়ায় মারা যেত রন।’ চোখ সরু করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রানাকে দেখল মহিলা। ‘কেন যেন আপনাকে চেনা চেনা লাগছে। বলুন তো, আগে কোথায় দেখেছি?’

‘আগে কখনও কোথাও দেখেননি আমাকে,’ বলল রানা। ভাবতে শুরু করেছে, এবার সময় হয়েছে চলে যাওয়ার।

আরও কয়েক সেকেণ্ড রানার মুখ দেখল এলিসা গুডরিচ, তারপর নামিয়ে নিল চোখ। কুঁচকে গেছে ভুরু। দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে রানার জ্যাকেটের মাঝের অংশে। ওদিক দিয়ে দেখা যাচ্ছে রক্ত মাখা ড্রেসিং। ‘মনে হচ্ছে মারাত্মকভাবে আহত আপনি।’

‘রাস্তায় গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম,’ নরম সুরে বলল রানা। ‘সিরিয়াস কিছু নয়। আমি এখন আসি…’

মাথা নাড়ল এলিসা গুডরিচ। নিজেই ড্রেসিং করেছেন? আপনার তো ডাক্তার দেখানো উচিত।’

কেমন যেন দৃষ্টিতে রানাকে দেখছে মহিলার স্বামী। এগিয়ে এল এক পা। ‘কোথা থেকে যেন এসেছেন, মিস্টার…’

‘আমার নাম বব অ্যালান,’ ধীরে ধীরে বলল রানা।

‘কথা শুনে তো মনে হচ্ছে না আমেরিকান।

‘নানান দেশে ঘুরে বেড়াই। লোকটার চোখে সন্দেহ দেখে পরিস্থিতি সুবিধার লাগছে না রানার। পরিষ্কার বুঝতে পারছে, ওর উচিত এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাওয়া।

‘একটু অপেক্ষা করুন, আসছি,’ বলে বাড়ির ভেতর ঢুকল শ্বেতাঙ্গ লোকটা।

‘এবার রওনা হব,’ এলিসা গুডরিচকে বলল রানা। ‘ভাল লাগছে যে ছেলেটা সুস্থ আছে।’

‘আপত্তি না থাকলে আপনার ক্ষতটা একটু দেখব,’ বলল মহিলা। ‘দেখে আপনাকে খুবই অসুস্থ লাগছে।’

‘না, ঠিক আছি,’ বলল রানা। ‘কোনও সমস্যা নেই। কোনও…’

ডাহা মিথ্যা বলছে। বনবন করে ঘুরছে মাথা। কোথা থেকে যেন ঘিরে ধরছে কালো একটা চাদর। পা-দুটো যেন অন্য কারও। বারান্দার পিলার ধরে নিজেকে সামলে নিতে চাইল রানা।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল ছেলেদের বাবা। তবে এবার হাতে ওষুধ নেই। তার হাতে একটা পাম্প অ্যাকশন শটগান!

নলটা তাক করেছে সরাসরি রানার বুকে। ক্রাঞ্চ-ক্রাঞ্চ আওয়াজে পাম্প করে চেম্বারে গুলি পাঠাল জোসেফ গুডরিচ।

নলের দিকে চেয়ে গভীর এক কালো গহ্বর দেখল রানা। ‘খবরদার! এক পা-ও নড়বে না, স্ট্রেঞ্জার!’ ধমকে উঠল রনের বাবা। ‘মিথ্যা বলার জায়গা পাও না! তোমার নাম বব অ্যালান নয়! তোমার মুখেই জেনে নিতে চাই সত্যিকারের নামটা।’

চুপ করে থাকল রানা।

‘নীরবতা সবসময় সম্মতির লক্ষণ, বলল গুডরিচ।

স্বামীর হাতে বন্দুক দেখে চমকে গেছে এলিসা। কাঁপা গলায় বলল, ‘কী হয়েছে, জো?’

‘পুরো লুইথিয়ানার শত শত পুলিশ খুঁজছে এই লোককে! ওরা বলছে, এক মহিলাকে খুন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে এ।’

ডানহাতে নিজের মুখ চেপে ধরল এলিসা। অবাক চোখে দেখছে রানাকে। হঠাৎ করেই চিনে গেল। ‘ও, এজন্যেই চেনা চেনা লাগছিল। তুমিই সেই খুনি! টিভিতে একটু পর পর দেখাচ্ছে তোমার ছবি।

মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াল পিচ্চি রব। মুখ হাঁ করে রানাকে দেখছে রন। উঠে দাঁড়িয়ে এক পা পিছিয়ে গেল এলিসা।

আগের মতই পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে জোসেফ গুডরিচ। বন্দুকের নল থেকে মাত্র তিন ফুট দূরে রানার মুখ। সুস্থ থাকলে মুহূর্তে লোকটার হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে তার দিকেই অস্ত্রটা তাক করতে পারত রানা। কিন্তু এখন কিছুই করার নেই। ওর মনে হচ্ছে, বহু দূর থেকে কানে আসছে মানুষের কণ্ঠ। ক্রমেই আঁধার হচ্ছে চারপাশ। প্রাণপণে সচেতন থাকতে চাইছে রানা। কিন্তু ভেঙে পড়ছে পা-দুটো। সচেতন থাকার এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে ও।

এক পা পিছিয়ে হাত ওপরে তুলল রানা। বুঝিয়ে দিতে চাইল, আক্রমণ করতে এখানে আসেনি। আসলে সে সাধ্যই নেই ওর।

বিড়বিড় করে বলল রানা, ‘আমি খুন করিনি।

পরক্ষণে ওকে ছেয়ে ফেলল বমি-বমি ভাব। ঘিরে ধরছে আদাত এক ঘোর। ঝপ্ করে চারপাশ থেকে নেমে এল ঘন কালো পর্দা। আবছাভাবে টের পেল ও, কখন যেন দুই হাঁটুর ওপর ভর করে বসে পড়েছে বারান্দার মেঝেতে। তখনই সাঁই করে উঠে এল কাঠের তক্তা। জ্ঞান হারাবার মুহূর্তে কানের কাছে ঠাস্ করে একটা আওয়াজ শুনল রানা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *