1 of 2

স্ট্রেঞ্জার – ২১

একুশ

পাথর ও ধুলো ভরা ট্র্যাকে জিপ রেখে লোকগুলোর পিছু নিল রানা, জোসেফ ও এলিসা। সারাদিন গাড়িতে করে এত দূরে আসতে হতক্লান্ত হয়ে পড়েছে ওরা। ঘন জঙ্গলে প্রায় প্রবেশই করছে না সোনালি রোদ। একটু পর চারপাশে ঘনিয়ে আসবে সন্ধ্যার আঁধার। হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলেছে এলিসা ও জোসেফ। নার্ভাস হয়ে উঠেছে বেচারি এলিসা। আত্মবিশ্বাসের মুখোশ পরে গম্ভীর চেহারায় হাঁটছে জোসেফ।

হাঁটার গতি বাড়িয়ে দলনেতার পাশে পৌছল রানা। সহজ সুরে বলল, ‘আমরা বরং পরিচিত হয়ে নিই। আমার নাম মাসুদ রানা।’

ঘাড় কাত করে ওকে দেখল দলনেতা। সামান্য দ্বিধার পর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আমি চার্লস।’ সন্দেহের চোখে দেখছে রানাকে।

তাকে পাত্তা দিল না রানা।

আধ মাইল এবড়োখেবড়ো ট্র্যাক পেরোবার পর সামনে জঙ্গলের ভেতর দেখা গেল বেশ কিছু কুঁড়েঘর। চারপাশ কেটে পরিষ্কার করা হয়নি জঙ্গল। যারা এখানে থাকে, প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য রেখেই বাস করে। আমাযনের জঙ্গলের স্মৃতি মনে পড়ল রানার। ওখানে দেখেছে এ ধরনের উপজাতীয় গ্রাম।

কাছাকাছি হয়ে রানা দেখল, সব কুঁড়ে একইরকম হলেও মাঝেরটা আকারে দ্বিগুণ। ওখানে বোধহয় বাস করেন এবি পামবো। ছোট এক কুঁড়েঘরে ঢুকতে গিয়েও রানার দিকে তাকাল এক তরুণী। লজ্জা ভরা মুখে হাত নাড়ল ওদের উদ্দেশে। তারপর দৌড়ে গিয়ে ঢুকল লাঠি ও খড় দিয়ে তৈরি বড় কুঁড়েঘরে।

ওরা কোন্ ঘরে চলেছে, বুঝে গেছে রানা। হাতের ইশারায় এবি পামবোর ঘর দেখাল দলনেতা চার্লস। নিচু দরজা দিয়ে কুঁজো হয়ে কুঁড়েঘরে ঢুকল রানা। ভেতরে আবছা আলো। মাঝখানে জ্বলছে আগুন। খড়ের ছাত ফুঁড়ে ওপরে গেছে পাথরের চিমনি। ওটা দিয়ে ওপরে বেরোচ্ছে ধোঁয়া কাঠ ও খড় পোড়ার গন্ধ ঘরে। চুলোর ওপরে কাঁচা লোহার তৈরি হাঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চামচ দিয়ে ভেতরের তরল নাড়ছে সেই তরুণী।

‘মামবো, ওরা এসেছে,’ জানাল দলনেতা। গলার স্বর এখন মোলায়েম।

ছায়া থেকে এল খসখসে কণ্ঠ: ‘ওদের আসতে দাও।’

আগুনের আবছা আলোয় চোখ সয়ে যেতেই রানা দেখল, শাল গায়ে মাটিতে বসে আছেন আলুবোখারার মত শুকিয়ে যাওয়া এক মহিলা। চুলগুলো শনের মত সাদা। আগে কখনও এত বয়স্কা কাউকে দেখেনি রানা। তাঁর পরনে বস্তার মত কর্কশ কাপড়ের পোশাক। গলায় ও করজিতে কাঠের মালা ও কবচ। আরও দু’পা এগিয়ে রানা দেখল, আগুনের আলোয় চকচক করছে বৃদ্ধার দুই কৌতূহলী চোখ

‘এসো, ছেলেমেয়েরা,’ নরম সুরে বললেন বৃদ্ধা। ‘ভয়ের কিছু নেই। কাছে এসে বোসো, যাতে ভাল করে দেখতে পাই তোমাদেরকে।’

আবেগে আপ্লুত হয়েছে এলিসা। ‘জী, বড়মা, প্রায় বিড়বিড় করে বলল সে। ‘বহুদিন পর আবার এলাম আপনার এখানে। হয়তো আমার কথা আপনার মনে আছে।’

‘বড়মা সবই মনে রাখে, মৃদু হাসলেন এবি পামবো। অন্তর্ভেদী চোখে রানাকে দেখলেন। ‘ও, বুঝতে পেরেছি। তোমাকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায় ভয়ঙ্কর সব বিপদ অভিশাপ দিয়েছে ক’জন বাজে জাদুকর। তাদের ভেতর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর লোকটার নাম ডাক্তার শিকদার। অন্ত আত্মা পুষে যা খুশি করত সে। তুমি বাধা দিয়েছ তাকে। তবে আবারও শয়তানের পূজা করে ক্ষমতা অর্জন করছে সে। এরপর আবারও তার সঙ্গে লড়তে হবে তোমাকে। … এবার বলো, আমার কাছে কী চাও তুমি?’

‘পিশাচ দ্বীপ’-এর অশুভ সেই সাধক ডাক্তার শিকদারের কথা মনে পড়তেই চমকে গেছে রানা। ওকে আসার অনুমতি দিয়েছেন বলে বৃদ্ধাকে ধন্যবাদ দিল।

জবাবে মৃদু মাথা দোলালেন এরি পামবো।

‘বহু বছর আগে ক্লোভিস প্যারিশে বাস করত এক মহিলা,’ সরাসরি কাজের কথায় এল রানা। ‘তার নাম ছিল শেলি লং ল্যান্স। খুন হয়। এখন জরুরি এক কারণে তার বিষয়ে আপনার কাছ থেকে জানতে চাই। আমার কাছে খুব বেশি টাকা নেই, তবে জরুরি তথ্য পেলে উপযুক্ত টাকা দিতে দ্বিধা করব না।’

‘বাছা, তোমার টাকা তোমার কাছেই রাখো,’ বললেন এবি পামবো। ‘টাকার প্রয়োজন পড়ে না আমার।’

‘বড়মা, আপনি কি রানাকে সাহায্য করবেন? প্রায় ফিসফিস করে বলল এলিসা।

চোখ বুজে দেয়ালে হেলান দিয়ে পাথরের মত নিথর হলেন বৃদ্ধা। কেন যেন রানা ভাবতে শুরু করল, মারা গেছেন মানুষটা। কিন্তু তখনই আবার চোখ মেললেন এবি পামবো। দৃষ্টি আগের চেয়েও পরিষ্কার। কী যেন দেখছেন রানার ভেতর।

‘বলো তো, কেন শেলি লং ল্যান্স নাম হলো তার?

‘আমার মনে হয় ওটা তার ডাকনাম,’ বলল রানা ‘ওই নামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বর্শার।’ মৃদু হাসল। ‘অথবা, মহিলার বাবা হয়তো কামার ছিল।’

কাগজ নাড়াচাড়া, করার মত খসখসে আওয়াজে হাসলেন এবি পামবো। ‘ভালই বলেছ, চালাক ছেলে! কিন্তু এই কাহিনীর একটা দিক তুমি জানো না।’

‘আপনিই তা হলে বলুন না কী হয়েছিল?’ বলল রানা।

‘বহু বছর আগের মানুষ শেলি লং ল্যান্স,’ বললেন বৃদ্ধা। ‘তখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় চালানে এ দেশে আনা হয়েছিল আফ্রিকা থেকে কালোদেরকে। তখনও বদলে যায়নি তাদের নাম। কিন্তু ওদের নাম উচ্চারণ করতে পারত না সাদারা। অথবা, দরিদ্র কালোদেরকে তাচ্ছিল্য করার জন্যেই নাম পাল্টে দিত তারা। আগেই তো কেড়ে নিয়েছিল স্বাধীনতা। এরপর বদলে দিয়েছে তাদের নাম আর বংশ পরিচয়।’

ওই আমলের কঠিন বাস্তবতা সহজেই তুলে ধরেছেন বৃদ্ধা, বুঝল রানা। ভারত উপমহাদেশেও নিজেদের ইচ্ছে মত নেটিভদের নামের উচ্চারণ পাল্টে ফেলত ইংরেজরা। ‘আপনি তা হলে বলতে চাইছেন, ওই মহিলার আফ্রিকান বংশ বা পদবীর বদলে শেলি লং ল্যান্স নাম রাখে শ্বেতাঙ্গরা?’

‘হ্যাঁ, পরে নাম’ দেয়া হয়েছিল শেলি লং ল্যান্স,’ বললেন এবি পামবো।

‘আপনি তাকে চিনতেন?’ হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল রানার। এবার হয়তো খোলাসা হবে এ রহস্য। এলিসার দিকে তাকাল ও।

বলেছিলাম না?— এমন দৃষ্টিতে রানাকে দেখল এলিসা। আস্তে করে মাথা নাড়লেন এবি পামবো। ‘না, আমি তাকে চিনতাম না।’

দমে গেল রানা। ‘চিনতেন না?’

‘না, বাছা, আমি তো অতটা বুড়ি নই,’ বললেন বৃদ্ধা। আঙুল তাক করলেন তরুণী মেয়েটার দিকে। হাঁড়ি থেকে কাঠের বড় এক চামচে করে তরল এনে এবি পামবোর নাকের কাছে ধরল সে। গভীরভাবে তরলের গন্ধটা নাকে টেনে নিলেন বৃদ্ধা।

ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করছে রানা। তিলতিল করে পেরিয়ে চলেছে সময়। ঘরের ভেতর থমথমে নীরবতা।

‘তবে তার যমজ বোনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল,’ বেশ কিছুক্ষণ পর বললেন এবি পামবো। ‘তার নাম ছিল জিলিয়ান লং ল্যান্স।

‘তারপর?’ একটু ঝুঁকে বসল রানা।

‘বিয়ের পর তার নাম হলো রিটা গোমেজ। সেসময়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। ভুল না হলে উনিশ শ’ পঁয়ত্রিশ সালে বার্ধক্যজনিত রোগে মারা যায় সে। তাও বহু আগের কথা। তখন আমার বয়স মাত্র ষোলো বছর। আর তার অষ্টাশি। এখন আমি তার চেয়েও বেশি বুড়ি হয়ে গেছি।’ খসখসে শুকনো হাসি দিলেন এবি পামবো। আনমনে বললেন, ‘এদিকের এলাকায় বিখ্যাত ছিল রিটা।’

চট্ করে হিসাব কষল রানা। উনিশ শ’ পঁয়ত্রিশ সালে রিটার বয়স অষ্টাশি হলে তার জন্ম আঠারো সাতচল্লিশ সালে। জানতে চাইল ও, ‘বিখ্যাত হওয়ার মত কী করেছিল রিটা?’ টের পাচ্ছে, শেলি লং ল্যান্সের দিক থেকে অন্যদিকে সরে গেছে আলাপের স্রোত। কে জানে, তার ব্যাপারে জরুরি কোনও তথ্য দিতে পারবে কি না বৃদ্ধা মহিলা।

মাথা নাড়লেন বড়মা। ‘বিখ্যাত হওয়ার জন্যে নিজে কিছু করেনি। তবে সে ছিল শেলি লং ল্যান্সের যমজ বোন। আর সেজন্যেই ছড়িয়ে পড়েছিল নামটা। শেলি ছিল কিংবদন্তি যদিও বহু বছর আগেই তরুণ বয়সে আঠারো শ’ তেয়াত্তর সালে খুন হয়েছিল। তাকে নিয়ে নিজেদের ভেতর আলাপ করত দক্ষিণের শ্বেতাঙ্গরা। তার বহু বছর পর রিটার সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। সে শেলির বোন বলে তাকে দু’চোখে দেখতে পারত না শ্বেতাঙ্গদের অনেকে। কিন্তু জনপ্রিয় ছিল ও কালোদের কাছে। আজও হয়তো শেলি লং ল্যান্স আর রিটা গোমেজকে নিয়ে গল্প করে তারা।’

‘কী নিয়ে গল্প করে, বড়মা?’ জানতে চাইল রানা। ‘শেলি কিংবদন্তি হলে তাকে অপছন্দ করত কেন শ্বেতাঙ্গরা?’

অসহায় চোখে ওকে দেখলেন এবি পামবো। ‘বাছা, তুমি কি এদিকের ইতিহাস কিছুই জানো না? ওই শেলি লং ল্যান্সের কারণেই গৃহযুদ্ধে জিতে যায় ইয়াঙ্কিরা।’

‘তা-ই?’ চমকে গেল রানা। আবার হিসেব কষল। ওই দুই যমজ বোনের জন্ম আঠারো শত সাতচল্লিশ সালে। পঁয়ষট্টিতে গৃহযুদ্ধ শেষে তাদের বয়স ছিল আঠারো। মনের চোখে দেখল, ঘোড়ায় চেপে কনফেডারেট সৈনিকদের তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে কালো এক তরুণী। পেছনে ইউএস ক্যাভালরি। সামনের জনের হাতে পতাকা। পেছনে সেইবার দোলাতে দোলাতে আসছে দলের সৈনিকরা।

রানা কী ভাবছে, বুঝতে পেরেছেন এবি পামবো। মাথা নাড়লেন তিনি। না, বাছা, যুদ্ধে অংশ নেয়নি শেলি লং ল্যান্স। সে ছিল ক্রীতদাসী। কাজ করত ধনী এক শ্বেতাঙ্গের প্ল্যান্টেশনে।’

‘তা হলে ইউনিয়ান আর্মিকে কীভাবে সাহায্য করল?’

‘কেন, গুপ্তচরবৃত্তি করে,’ বললেন এবি পামবো, ‘অবাক হচ্ছ কেন? তোমার কি মনে হচ্ছে, কালোরা উত্তরের হয়ে ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট হতে পারে না? তাদের অনেকেই তো এমন ছিল। তাদেরকে বলা হতো ব্ল্যাক ডিসপ্যাচ। তাদের ভেতর কেউ কেউ ছিল মহিলা। সন্দেহজনক সব জায়গায় গিয়ে কান পাতা সহজ ছিল তাদের জন্যে। এদের ভেতর বেশি বিখ্যাত হ্যারিয়েট টুবম্যান। বিদ্রোহীদের মারাত্মক ক্ষতি করে সে। তারপর আছে মেরি এলিযাবেথ। সে কাজ করত কনফেডারেটদের প্রেসিডেন্ট জেফ ডেভিসের সরকারি ভবনে। নানাধরনের জরুরি তথ্য পাচার করে ইউনিয়ান আর্মির কাছে।’ আনমনে হাসলেন এবি পামবো। আবারও শুরু করলেন, ‘গুপ্তচরদের ভেতর আরেকজন হচ্ছে মেরি টুভস্ট্রে। সে-ই প্রথম ইউনিয়ান আর্মিকে জানায় লোহার যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে বিদ্রোহীরা। এ খবর পেলে ইউনিয়া ফোর্স তৈরি করতে থাকে নিজেদের লোহার রণতরী।’

নিরানব্বুই বা এক শ’ বছর বয়সী এবি পামবোর স্মৃতির বহর দেখে মনে মনে প্রশংসা না করে পারল না রানা। ইতিহাসের বিখ্যাত বহু কিছুই মনে আছে তাঁর।

‘কীভাবে মরল শেলি?’ জানতে চাইল ও।

‘ভয়ঙ্করভাবে,’ বললেন এবি পামবো, ‘ওটা ছিল খুব দুঃখজনক।’ গলা থেকে নিয়ে একটা কবচ কপালে ছোঁয়ালেন তিনি। চোখ বুজে বিড়বিড় করে কী যেন বললেন।

‘খুন হয়েছিল?’ জিজ্ঞেস করল রানা।

চোখ বন্ধ রেখেই মাথা দোলালেন বৃদ্ধা।

‘গৃহযুদ্ধের পর প্রতিশোধ নিতে খুন করা হয় তাকে?’ আবারও জানতে চাইল রানা।

ধীরে ধীরে চোখের পাতা খুলে ওকে দেখলেন বৃদ্ধা। ‘কারও কারও জন্যে যুদ্ধ থামেনি। অনেকে আছে, যারা এখনও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়।’

‘সেইবার দিয়ে গেঁথে খুন করা হয় তাকে?’

আস্তে করে মাথা দোলালেন এবি পামবো। ‘তখন তার বয়স বড়জোর ছাব্বিশ। এরপর ষাট বছর পেরিয়ে গেলেও তার কথা উঠলে চোখ দিয়ে বন্যা বইয়ে দিত রিটা গোমেজ। যমজরা বোধহয় এমনই হয়।’

‘ধরা পড়েছিল খুনি?’

‘না, বাছা। আঠারো শত তেয়াত্তর সালে ভয়ানক অবস্থা ছিল লুইযিয়ানায়। ওই বছরেই গ্র্যান্ট প্যারিশের কোলফ্যাক্সে ইস্টার সানডের অনুষ্ঠানে দেড় শ’র বেশি কালোমানুষকে ম্যাসাকার করে শ্বেতাঙ্গরা। মুক্ত একদল ক্রীতদাস খুন হলে তা নিয়ে আপত্তি তোলেনি কেউ। এসব খুনিদেরই কেউ হত্যা করে শেলি লং ল্যান্সকে। বহু আগের কথা। এ রাজ্যে উনিশ শত পঞ্চাশ সালেও কালোমানুষদেরকে লিঞ্চ করেছে শ্বেতাঙ্গরা।’

একের পর এক প্রশ্ন করা ঠিক হচ্ছে না, বুঝতে পারছে রানা। তবে এ ছাড়া উপায়ও নেই ওর। আরও তথ্য চাই। ‘খুনি আসলে কে, বুঝতে পেরেছিল কেউ? কোনও গুজব ছড়িয়ে পড়েনি? বোনের খুনি হিসেবে কাউকে সন্দেহ করেনি রিটা গোমেজ?’

‘আমার ধারণা, সবই বুঝেছিল রিটা। আরেকটু হলে নিজেও খুন হতো। তার বোন খুন হওয়ার কয়েক মাস পর একরাতে তার বাড়িতে ঢোকে কয়েকজন লোক। তাদের সঙ্গে তলোয়ার ছিল। খুন করত রিটা লং ল্যান্সকে। কিন্তু তখন তার সঙ্গে ছিল তার প্রেমিক। বন্দুক দিয়ে গুলি করে সে। চেম্বারে ছিল পাখি মারার ছররা গুলি। পালিয়ে যায় লোকগুলো। এরপর ভয় পেয়ে আরকানসাসে চলে যায় রিটা আর তার প্রেমিক। বিয়ে করে। ওখানে কেউ চিনত না তাদেরকে। তবে বহু বছর পর আবারও ফিরে এসেছিল রিটা গোমেজ।’

‘নিশ্চয়ই আপনাকে বলেছিল, কাকে সন্দেহ করে সে?’

‘বলে থাকলেও মনে নেই,’ বললেন বৃদ্ধা। ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখলেন। চেহারায় পড়ল লাখদুয়েক ভাঁজ। ‘একটা কথা, বাছা, এত বছর পর এসব জেনে তোমার কী লাভ?’

‘কারণ, মামবো, আপনার কথাই ঠিক,’ বলল রানা, ‘সর্বক্ষণ আমার বিরুদ্ধে কাজ করছে বাজে জাদুকরের জাদু। এ মুহূর্তে খুনের দায়ে আমাকে খুঁজছে এই প্যারিশের পুলিশ আর সশস্ত্র শত শত মানুষ। অথচ, লিয় বাউয়ারকে আমি খুন করিনি। এখন নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করতে ওর খুনিকে খুঁজছি। কৌতূহলও কাজ করছে মনে। তার চেয়েও বড় কথা, আমি পছন্দ করতাম লিযকে। সুযোগ হলে ছাড়ব না ওর খুনিকে।

দীর্ঘক্ষণ ওকে দেখলেন বড়মা। কী যেন ভাবছেন। তারপর বড় করে শ্বাস ফেলে বললেন, ‘বাছা, আমার বয়স হয়েছে। খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। স্মৃতিশক্তিও আগের মত নেই। মনে তো হয় না আর কিছু জানাতে পারব তোমাকে।’

এতক্ষণ ঘরের দরজার কাছে ছিল দেহরক্ষী দলনেতা চার্লস। এবার কয়েক পা এগিয়ে এল সে। গুড়গুড় করে উঠল কণ্ঠস্বর: ‘যথেষ্ট সময় দিয়েছেন বড়মা। রানা, তুমি বলেছিলে মাত্র একটা প্রশ্ন করবে। সে তুলনায় অনেক কিছুই তো জানলে। এবার বিদায় হও এখান থেকে।’

কিছুই বলার নেই রান্নার। এবি পামবোকে ধন্যবাদ দিয়ে উঠে দাঁড়াল ও। বৃদ্ধার হাত ধরল এলিসা। ‘এত বছর পর আপনার সঙ্গে আবারও দেখা হয়ে খুব ভাল লেগেছে, বড়মা।’

‘পরে তোমার সঙ্গে আবার আমার দেখা হবে, বাছা, ‘ ক্লান্ত স্বরে বললেন এবি পামবো। ‘তবে বেশি দেরি কোরো না। নইলে আমি হয়তো এখানে থাকব না।’

‘এসব বলবেন না, বড়মা, প্লিয,’ দুঃখ পেয়ে বলল এলিসা।

‘আবারও দেখা হবে,’ বললেন বৃদ্ধা, ‘হয় এই পৃথিবীতে, নইলে অন্য কোনও জগতে।’

কঠোর চোখে ওকে দেখছে দলনেতা চার্লস, টের পেল রানা। তবে শেষ চেষ্টা করল। জ্যাকেটের পকেট থেকে পুরনো একটা রিসিট নিয়ে ওটার ওপর পেন্সিল দিয়ে লিখল বার্নার ফোনের নম্বর। বাড়িয়ে দিল বৃদ্ধার দিকে। ‘পরে কিছু মনে পড়লে ফোন করতে পারবেন এই নম্বরে।’

কাগজটা ছোঁ দিয়ে নিল চার্লস। ভুরু কুঁচকে দেখছে রানাকে। ‘বড়মার ফোন নেই। মেসেঞ্জারও ব্যবহার করেন না।’

কথা আসলে শেষ। এবার ফিরতে হবে রানাকে।

কুঁড়েঘর থেকে ওদেরকে বের করে আনল দলনেতা চার্লস। মশালের আগুনে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে জিপের দিকে চলল ওরা।

আধঘণ্টা পর বেরিয়ে এল সন্ধ্যার মরা আলোয়।

রানা, এলিসা ও জোসেফ জিপে উঠতেই বিদায় নিল দেহরক্ষীরা। গাড়ি ঘুরিয়ে হেডলাইট জ্বেলে বাড়ির দিকে চলল জোসেফ। সরু ট্র্যাকের দু’পাশে গাছের দেয়াল। ওপরে পাতার ঘন ছাউনি। ঘুরে তাকাল রানা। অন্ধকার জঙ্গলে দেখল মশালের কয়েকটা টিমটিমে কমলা শিখা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *