1 of 2

স্ট্রেঞ্জার – ৪৩

তেতাল্লিশ

পরিত্যক্ত পেট্রল স্টেশনের সামনে পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে চার্লসের জানালার কাঁচে টোকা দিল রানা।

হ্যাণ্ডেল ঘুরিয়ে কাঁচ নামাল লোকটা। ‘কিছু বলবেন?’

‘চলে যাওয়ার আগে একটা প্রশ্ন।’

‘বলে ফেলুন।’

‘জঙ্গলে আপনাদের সঙ্গে যেসব অস্ত্র দেখেছি, সত্যিই কি ওগুলোর ভেতর গুলি আছে? কেন যেন আমার মনে হয়েছে, অচেনা কাউকে ভয় দেখাবার জন্যেই ওগুলো রেখেছেন। ‘

কথাটা শুনে চিন্তায় পড়ে গেল চার্লস। তবে কয়েক মুহূর্ত পর সত্যি কথাই বলল, ‘না, ম্যান, আপনার কথাই ঠিক। অস্ত্র শুধু ভয় দেখাবার জন্যে। ভেতরে গুলি নেই। আমি জীবনেও গুলি চালাইনি।’

‘বুঝলাম। ঠিক আছে, পরে দেখা হবে, চার্লস।’

লোকটা বিদায় নিতেই ফোর্ড টরাস গাড়ির সামনে থামল রানা। রোদের ভেতর পড়ে থেকে কয়লার আগুনের মত গরম হয়েছে গাড়িটা। জ্বলন্ত আভেনে বসে পুরো এক মাইল যাওয়ার পর রাস্তা থেকে নেমে কয়েকটা ম্যাগনোলিয়া গাছের নিচে থামল রানা। জানালা খুলল বাতাসের আশায়। অনেকক্ষণ ধরে দেখল এবি পামবোর দেয়া ম্যাপ।

যুম ক্যামেরার মাধ্যমে ছবি নেয়া হয়েছে অন্তত দুই হাজার ফুট ওপর থেকে। কোনও সেতু, বাড়ি বা কাউকে দেখা না গেলেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ওটা একটা দ্বীপ। ওখানে আছে বড়জোর পনেরো একর জমি। বাইয়ুর একদিকে বাঁক নিয়েছে দ্বীপ। ওদিকটায় মাটি খসিয়ে নিয়েছে বাইয়ুর পানির ধীর স্রোত। তীরের সঙ্গে এখন আর কোনও সম্পর্ক নেই, সত্যিই ওটা দ্বীপের মতই। চারদিকে কাদাপানি ভরা পরিখা। রানা একবার ভাবল, ওখানে হয়তো বাস করে একগাদা অ্যালিগেটর।

এবি পামবোর কথা মনে পড়ল রানার।

‘অনেকটা সময় নিয়ে ওই মোজো ব্যাগের ওপর নিজের সব জাদু খাটিয়ে দিয়েছি। কিন্তু একবার গলায় পরার পর ওটা খুলবে না।’

আনমনে গলার কাছে ঝুলন্ত মোজো ব্যাগ স্পর্শ করল রানা। ঠিক করেছে হামলা করবে রিচি, হ্যাঙ্ক ও তাদের লোকজনের ওপর। এরই ভেতর হয়তো ওকে খুঁজতে শুরু করেছে নোভাকরা। আপন ভাইকে চিরকালের জন্যে হারিয়ে প্রতিশোধ নিতে চাইছে। তার ওপর ধ্বংস করে দিয়েছে রানা ওদের এত সাধের ডিসটিলারি: ওদের ক্ষমতার উৎস।

অবশ্য তারা ওকে খুঁজে বের করার আগে নিজেই হাজির হবে ও নোভাক দ্বীপে। বন্দি করবে রিচি আর হ্যাঙ্ককে। তা যদি না পারে, বাঁচতে দেবে না তাদেরকে। তাতে হয়তো শান্তি পাবে লিযের আত্মা।

দ্বীপে দলের সবাইকে নিয়ে তৈরি থাকবে তারা। সহজ হবে না চোখ এড়িয়ে ওখানে পা রাখা। আগেও বহুবার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে শত্রু এলাকায় ঢুকেছে রানা। তবে নিজের সমস্ত দক্ষতা প্রয়োগ করলেও হয়তো রিচি বা হ্যাঙ্ককে চমকে দিতে পারবে না। ধরে নিল, ঢিল ছুঁড়ছে বোলতার চাকে। কাজটা আসলে আরও কঠিন। কারণ, রিচি আর হ্যাঙ্ককে জীবিত ধরতে না পারলে নিরপরাধ হিসেবে আইনের চোখে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে না রানা।

রানা নিজে আহত। ভাল হতো পাশে ঘনিষ্ঠ ক’জন অভিজ্ঞ যোদ্ধা বন্ধুকে পেলে।

কিন্তু এখানে সাহায্য নেবে কার?

এবি পামবোর দেহরক্ষী দলনেতা চার্লস স্বীকার করেছে, অস্ত্রের ব্যাপারে তাদের কোনও অভিজ্ঞতা নেই। জঙ্গলে বৃদ্ধা মহিলার ওপর হামলা করবে না কেউ, সেটা জেনেই নিশ্চিন্তে জীবন পার করছে চার্লস ও তার দলবল।

ওরা নিরীহ মানুষ। দ্বীপে তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

রানা এজেন্সির ছেলেরা অবশ্য ট্রেইণ্ড, কিন্তু ওদেরকেও এই ঝামেলায় জড়ানো ঠিক বলে মনে হচ্ছে না।

বাদ থাকল ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব।

সোহেল, সলীল, জাহিদ যে যার কাজে ব্যস্ত। তবে ডাকলেই যত দ্রুত সম্ভব এসে হাজির হবে।

কিন্তু বিসিআই এজেন্টরা আমেরিকায় পা রাখলেই সতর্ক হয়ে যাবে সিআইএ। কঠিন হবে সোহেলদের সঙ্গে গোপনে সাক্ষাৎ করা। তাছাড়া… এটা তো আসলে ওর একার যুদ্ধ।

আর হাতেও সময় নেই। মনে মনে বলল রানা, ‘না রে, ভুলে যা তুই আহত। যা করার তুই নিজেই করবি, আর দেখিস ঠিকই পারবি।’

ইগনিশনের দিকে হাত বাড়াতেই বাজল মোবাইল ফোন পকেট থেকে ওটা নিল রানা। ধারণা করছে আবারও ফোন করেছে চার্লস। হয়তো বলবে, দলবল নিয়ে যেতে চায় নোভাক দ্বীপে। সেক্ষেত্রে এককথায় তাকে মানা করে দেবে ও। কল রিসিভ করল রানা। না, ফোন চার্লসের নয়।

একমুহূর্ত পর জোসেফ গুডরিচের কণ্ঠস্বর চিনল রানা।

‘রানা! রা… না… আমার মস্ত বড় বিপদ!’ কেমন ভেঙে গেছে মানুষটার গলা। কী যেন হয়েছে তার।

‘জোসেফ, শান্ত হও। যা বলার ধীরেসুস্থে খুলে বলো। …কী হয়েছে?’

হড়বড় করে বলতে গিয়েও রানার কথায় থমকে গেল জোসেফ। কয়েক মুহূর্ত পর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওদেরকে কিডন্যাপ করেছে, রানা! আমার পরিবারের সবাইকে!’

হঠাৎ রানার মনে হলো, বরফের মত শীতল একটা হাত মুচড়ে ধরেছে ওর হৃৎপিণ্ডটা। ‘কারা কিডন্যাপ করেছে, জোসেফ? খুলে বলো কী হয়েছে।’

‘আজ সকালে… ছিলাম শহরে… বাড়ির দিকে ফিরছি, সেসময়ে পাশ কাটিয়ে গেল পুলিশের একটা গাড়ি। ওটার ভেতর দেখলাম এলিসা আর বাচ্চাদেরকে। ভীষণ ভয় পেলাম। গাড়ি ঘুরিয়ে পিছু নেয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার পুরনো গাড়িটা পুলিশের ক্রুয়ারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারল না। রানা, ওদেরকে ধরে নিয়ে গেছে!’

‘কিন্তু কেন তোমাদেরকে এসবে জড়াবে পুলিশ?’ জানতে চাইল রানা। ‘তাদের তো কিছুই জানা নেই। এলিসাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ?’

‘গ্রেফতার করেনি, রানা, শ্বাস আটকে ফেলল জোসেফ। ‘লোকটা কিডন্যাপ করেছে ওদেরকে!

‘একমিনিট, জোসেফ, কেন ভাবছ কিডন্যাপ করেছে?’

ওই পুলিশের ক্রুযার চালাচ্ছিল বিলি এস. কনরাড। তার সঙ্গে অন্য আর কোনও অফিসার ছিল না। আমার বাড়িতে গিয়ে এলিসা আর বাচ্চাদেরকে কিডন্যাপ করেছে।’ থরথর করে কাঁপছে জোসেফের কণ্ঠ। ‘আমি এখন কী করব, রানা?’

ডেপুটি শেরিফ বিলি এস. কনরাডের নাম শুনে চমকে গেছে রানা। নিচু গলায় বলল, ‘মাথা ঠাণ্ডা রাখো, জোসেফ। কিডন্যাপ না-ও হতে পারে। নিশ্চিত না হয়ে…’

‘কিডন্যাপ করেছে তা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি,’ রানাকে থামিয়ে দিল জোসেফ। ‘ঘণ্টাখানেক আগে ফোন করেছিল রিচি নোভাক।’

শিরশিরে শীতল অনুভূতি নামল রানার মেরুদণ্ড বেয়ে। এত জোরে ধরেছে মোবাইল ফোন, চাপ খেয়ে মৃদু মুড়মুড় আওয়াজ তুলল পলকা জিনিসটা। ‘রিচি নোভাক তোমাকে কী বলেছে, জোসেফ?’

‘বলেছে এলিসা আর বাচ্চাদেরকে গোপন জায়গায় নিয়ে গেছে। ওদেরকে খুঁজে পাবে না কেউ। বাঁচাতেও পারবে না। …তারপর বলতে লাগল, কীভাবে নির্যাতন করে খুন করবে ওদেরকে। তবে…’ গলা ভেঙে যেতেই চুপ হয়ে গেল জোসেফ। ফুঁপিয়ে উঠল কয়েকবার।

‘আর কী বলেছে রিচি?’ অসম্ভব গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল রানা।

জবাব দিল না জোসেফ গুডরিচ 1

‘কী বলেছে সেটা বলো, জোসেফ।’

গুঙিয়ে উঠল প্রাক্তন উকিল, ‘সে বলেছে বাচ্চাদের সামনে ধর্ষণ করবে এলিসাকে। তারপর এলিসার চোখের সামনে বাচ্চাদেরকে ছুঁড়ে ফেলবে অ্যালিগেটর ভরা বাইয়ুর ভেতর। প্রথমে মরবে টিনা। তারপর রব। আর শেষে রন। এরপর নাকি পা বেঁধে এলিসাকে ফেলবে রিচির প্রিয় অ্যালিগেটরের মুখে। … রানা, ওর প্রতিটা কথা বিশ্বাস করেছি! চিনি ওদেরকে! আমার আর কিছুই করার নেই! এলিসা আর বাচ্চাদের কিছু হলে আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না আমার।’

‘আরও কিছু বলেছে রিচি, সেটা বলো,’ বলল রানা। অন্তরের ভেতর বুঝে গেছে, জোসেফের কাছে কী চেয়েছে নোভাকরা।

‘ওরা তোমাকে চায়, সেটাই একমাত্র শর্ত। আত্মসমর্পণ করবে তুমি। সেক্ষেত্রে এলিসা আর বাচ্চাদেরকে ছেড়ে দেবে।’ তিক্ত হয়েছে জোসেফের কণ্ঠ। ‘একটা লোকেশনে তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে। ওই মোটেলের নাম এন সার্কেল।’

‘আমি চিনি ওটা,’ বলল রানা।

‘ওখানে তোমার জন্যে রিচির দলের লোক অপেক্ষা করবে। রিচি বলে দিয়েছে, রাত নামার আগেই তুমি ওখানে না গেলে…’ বাচ্চাদের মত হু-হু করে কেঁদে ফেলল জোসেফ। ‘রানা, আমি শেষ হয়ে গেলাম! আর কিছুই করার নেই! কাউকে কিছু বলার নেই! জানি না এখন কী করব!’

ভীষণ শীতল অনুভূতি রানার বুকে। মোবাইল ফোন ধরা শক্ত মুঠিতে ঢিল দিল। চাপা স্বরে বলল, ‘আমার কথা শোনো, জোসেফ। মন দিয়ে শুনবে।’

‘শুনছি…’

‘একদম চিন্তা করবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার কথা বুঝতে পেরেছ? নিরাপদ থাকবে তোমার পরিবার।’

‘কিন্তু…’

‘এর ভেতর কোনও কিন্তু নেই। রিচি নোভাক আমাকে চায়। তা সে পাবে। বদলে এলিসা আর বাচ্চাদেরকে ছেড়ে দেবে। যেমন চেয়েছে সে। তোমাকে শপথ করে বলছি, এলিসা আর বাচ্চাদেরকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাবে তুমি।’

‘সেজন্যে আমাকে কী করতে হবে?’

‘চুপচাপ অপেক্ষা করো। তুমি কি বাসায়?’

‘না। ওখানে এখন গিজগিজ করছে পুলিশ। গেলেই বোধহয় গ্রেফতার করবে। যেভাবেই হোক, আমাদের সঙ্গে তোমার সম্পর্কের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে।’

রানা ভাবছে, কেউ না কেউ জেনেছে গুডরিচদের ওখানে উঠেছিল ও। পুলিশে যোগাযোগ করেছে সে। সেই লোক বোধহয় নোভাকদের দলের কেউ। সে বা তারা যোগাযোগ করেছে বিলি এস. কনরাডের সঙ্গে। ওই এলাকাতেই ছিল সে। পুলিশের কেউ যাওয়ার আগেই এলিসা আর বাচ্চাদেরকে কিডন্যাপ করেছে হারামি লোকটা। শেরিফ স্যাম শেরিড্যান হয়তো এখন ভাবছে কোথায় গেল তার ডেপুটি।

দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকল রানা। ভাবছে প্রতিটি দিক।

একটা সময়ে বেসুরো কণ্ঠে জানতে চাইল জোসেফ, *রানা? তুমি কি এখনও লাইনে আছ, বাড়ি?’

‘আছি,’ বলল রানা, ‘ঠিক আছে, এবার জেনে নাও তোমার কী করতে হবে। আমি চাই দেরি না করে এক্ষুণি বাড়ি ফিরবে তুমি। যাতে তোমাকে গ্রেফতার করে পুলিশের লোক।’

‘তুমি কি পাগল হলে, রানা? তাতে কী উপকার হবে আমার পরিবারের?’

‘তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো, জোসেফ?’ জানতে চাইল রানা।

‘তা করি।’

‘গুড। তা হলে মন দিয়ে শোনো আমার কথা। মনের মাঝে গুছিয়ে নেয়া প্ল্যান জোসেফকে বলতে লাগল রানা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *