1 of 2

স্ট্রেঞ্জার – ২২

বাইশ

পেছনে পড়েছে জঙ্গুলে ট্র্যাক। কথা বলছে না রানা, এলিসা বা জোসেফ। সামনে ফাঁকা অন্ধকার রাস্তা।

প্রথমে মুখ খুলল জোসেফ, ‘রানা, কিছু তথ্য তো পেলে।’

পেছন সিট থেকে বলল রানা, ‘ভাল হয়েছে বড়মার ওখানে গিয়ে। সেজন্যে ধন্যবাদ এলিসাকে। আবারও কৃতজ্ঞ হয়ে গেলাম।’

মুখে কথাগুলো বললেও বুকে গভীর হতাশা রানার।

বড়মা পামবোর সঙ্গে রিটা গোমেজের পরিচয় ছিল, এ ছাড়া আর কিছুই জানতে পারেনি। অবশ্য জানা গেছে, বহুকাল আগে ইউনিয়ান আর্মির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করত শেলি লং ল্যান্স। আর একইভাবে সেইবার দিয়ে খুন করা হয়েছে লিয বাউয়ারকে। কিন্তু এই দুই খুনের মধ্যে কীসের সম্পর্ক তা অজানা। তার চেয়েও বড় কথা, তদন্ত করার মত নেই রানার কাছে। ভেবেছিল জরুরি তথ্য পাবে, তবে এখন বুঝে গেছে, আগের মতই রয়ে গেছে অন্ধকারেই।

সামনের সিট থেকে ঘুরে ওকে দেখল এলিসা। দুই হাতের ওপর রেখেছে চিবুক। হতাশ রানাকে দেখে নিয়ে বলল, ‘জানি কী ভাবছ। তবে ভদ্রলোক বলে মুখ ফুটে কিছুই বলছ না। তোমার মনে হয়েছে, বড়মার ওখানে গিয়ে সময় নষ্ট করেছ। তিনি বলতে পারেননি কে শেলি লং ল্যান্সের খুনি। … আমি কি ঠিক বললাম, রানা?’

সত্যিই মন বোঝার ক্ষমতা আছে এলিসার।

নরম সুরে বলল রানা, ‘খুনি কে, সেটা জানতে পারলে ভাল হতো।’

খুনির নাম জানাতে পারেননি বলে বড়মাকে দোষ দেব না।’

‘তিনি বলতে পারলেন না, নাকি বললেন না?’ বলল রানা, ‘খুনের আগের সবই মনে আছে। সবার নাম, তারিখ, জায়গা, কে কী করেছে, সবই বললেন। তারপর হঠাৎ করেই যেন হয়ে গেলেন প্রতিবন্ধী।’

‘বয়স হলে যা হয়, প্রিয় মানুষটাকে সমালোচনা থেকে বাঁচাতে চাইল এলিসা। এই একই হাল হয়েছিল আমার মিলি আন্টির। অথচ তাঁর বয়স ছিল মাত্র সাতানব্বুই।’

‘এবার কী করবে, রানা?’ জানতে চাইল জোসেফ।

‘আঠারো শত সত্তরের দশকে যা ঘটেছে, তার সঙ্গে গত দু’দিন আগে লিষ বাউয়ারের খুনের সম্পর্ক থাকলে, ধরে নেব বহু বছর ধরেই প্রতিশোধ নিতে চাইছে কারা যেন,’ বলল রানা। ‘অচেনা কারও হাতে অজানা কারণে খুন হয়েছে লিয। তবে এ হত্যার সঙ্গে জড়িত শেলি লং ল্যান্সের হত্যাকাণ্ড। একই কারণে তার বোনকে খুন করতে চেয়েছে একাধিক শ্বেতাঙ্গ। এখন জানতে হবে, কোন্ কারণে শেলি লং ল্যান্সের হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত লিয বাউয়ারের খুন। এ থেকে বেরোবে কে বা কারা জড়িত। আর তা জেনে নেয়া হবে আমার পরের কাজ।’

‘তুমি ভাবছ, লিযের মা তার মেয়েকে কিছু বলেছিল, যে কারণে শেষে খুন হয় লিয বাউয়ার,’ বলল জোসেফ। ‘ওটা ছিল পরিবারের গোপন কোনও তথ্য।’

‘শেলি লং ল্যান্স আর লিয বাউয়ার হয়তো আত্মীয় ছিল,’ বলল রানা। ‘যদি জানা যায় তারা আত্মীয় ছিল না, সেক্ষেত্রে হাতে আর কোনও সূত্র থাকবে না।’

‘আর তারা যদি রক্ত সম্পর্কিত হয়?’

‘তো বুঝব, প্রায় দেড় শ’ বছর ধরে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চাইছে একদল বর্ণবাদী লোক। সেজন্যেই হামলা হয়েছিল রিটা গোমেজের ওপর। চেয়েছে মহিলার বংশ নিশ্চিহ্ন করতে। আর সেটা ভাল করেই জানতেন লিয়ের মা। তাই সতর্ক করেন মেয়েকে, যাতে ওই তথ্য কাউকে না জানায়।’

‘ভাবা যায় না এরা কত বড় পশু!’ বলল জোসেফ।

‘লিযের খুনের মাধ্যমে শেষ হয়েছে প্রতিহিংসা,’ বলল রানা। ‘ওর কোনও ভাই-বোন বা সন্তান ছিল না।’

‘কিন্তু তাকে যদি খুনই করতে চায়, তো এতদিন দেরি করল কেন?’ জানতে চাইল জোসেফ।

‘যে কারণেই হোক, লিযের পূর্বপুরুষদেরকে মুঠোয় পায়নি এরা,’ বলল রানা। ‘বিপদ বুঝে ডুব দিয়েছিল তারা। তবে তারপর এক শ বছরেরও বেশি পেরিয়ে যাওয়ার পর বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গরা জানল, কেউ না, কেউ বেঁচে আছে ওই বংশের।’

‘মাঝের এ সময়ে কী করেছে তারা?’

‘জানা নেই। তবে সবসময় প্রতিশোধ নেয়ার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ছিল খুনিদের মনে। গত কিছু দিনের ভেতর তারা জেনেছে, চিটিমাচায় আছে লিয বাউয়ার। গৃহযুদ্ধের আমলের বর্ণবাদী সেই শ্বেতাঙ্গের উত্তরপুরুষ এরা। হয়তো ইতিহাসে নাম আছে প্রথম লোকটার। তাকেই অনুকরণ করেছে তার বংশধররা। নইলে সেইবার ব্যবহার করত না। হয়তো সেই পূর্বপুরুষ নিজের তলোয়ার দিয়েই খুন করে শেলি লং ল্যান্সকে। পরে ওর বোনের ওপরেও হামলা করে। আমার ধারণা, ওই লোকের সেইবার দিয়েই লিযকে মেরেছে খুনি। সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, লিয় হত্যার মাধ্যমে শেষ হয়েছে তাদের প্রতিশোধস্পৃহা।’

স্টিয়ারিং হুইল ধরে সামনের কালো রাস্তার দিকে চেয়ে আছে জোসেফ গুডরিচ। কী যেন ভাবছে। একটু পর বলল, ‘তোমার কথা যৌক্তিক বলেই মনে হচ্ছে।’

‘আমার এটাও মনে হচ্ছে, গত তিন বছরের ভেতর সেই খুনির উত্তরপুরুষরা নতুন করে খুঁজে নিয়েছে লিযকে,’ বলল রানা। ‘সময়টা কখন, সেটা জানলে ভাল হতো।’

রাস্তা থেকে চোখ সরাল না জোসেফ। ‘সেটা জানবে কী করে?’

‘গত তিন বছর ইউরোপে ঘুরে বেড়িয়েছে লিয। সেসময়ে ওকে খুঁজে বের করা কঠিন ছিল। তবে তারপর কয়েক মাস আগে চিটিমাচায় ফিরলে খুনিদের টার্গেটে পরিণত হয় লিয। কিন্তু কথা হচ্ছে, ওকে টার্গেট করল কে বা কারা?’

চুপ করে বসে আছে এলিসা। হঠাৎই বলল, ‘তা হলে আমাদের প্রথম কাজ শেলি লং ল্যান্স আর লিযের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক আছে কি না, তা জেনে নেয়া। তাই না?’

মাথা নাড়ল রানা। ‘ভুল বললে। ওই কাজটা আমার। এসবে তোমাদেরকে আর জড়াতে চাই না।’

‘পরে এসব নিয়ে আলাপ করব,’ বলল এলিসা, ‘স্টেট আর্কাইভ আছে ব্যাটন রোউগ-এ। ওখানেই আছে সবার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, বিয়ে, জমি-জিরাত আর আইনি কাগজের কয়েক শত বছরের রেকর্ড। লিযের পরিবারের দরকারি সব তথ্য ওখানে পাব। এ-ও বেরোবে সে শেলি লং ল্যান্সের আত্মীয় ছিল কি না। এরপর স্থির করব পরের কাজ। ‘

‘তা হলে ওখানেই যাব,’ বলল রানা।

এলিসার কথায় দ্বিধা ভরে বলল জোসেফ, ‘তোমরা বোধহয় ভুল করছ। প্রথম কথা, ব্যাটন রোউগ এখান থেকে পুরো এক শ’ আশি মাইল দূরে। প্রতিটা বড় সড়ক পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। এই প্যারিশের সীমান্ত পেরোবার আগেই ধরা পড়বে রানা।’

‘যাতে ধরা না পড়ি, সেদিকে খেয়াল রাখব,’ বলল রানা।

‘এবার দ্বিতীয় কথা: কীভাবে পার হবে শত শত মাইল? হাজার হাজার পুলিশকে ফাঁকি দেয়া এতই সহজ? তুমি এখন গোটা লুইযিয়ানার সবচেয়ে বিপজ্জনক ওয়ান্টেড ম্যান। ভাবছ, হাসতে হাসতে ঢুকবে কড়া পাহারা দেয়া সরকারি ভবনে? কী করে? আর ঢুকতে পারলেও লাখ লাখ কাগজের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজটা কীভাবে খুঁজে নেবে?’

‘আমি দরজা ব্যবহার করব না,’ বলল রানা। ‘ছাত বা সুয়েরেজ সিস্টেমের মাধ্যমে ঢুকব ওই বাড়িতে।’

‘কিন্তু এধরনের ঝুঁকি নিলে ছিন্নভিন্ন হবে গুলি খেয়ে। তাতে কারও কোনও লাভ হবে না। তা ছাড়া, ওখানে পাবে না কিছুই।’

‘রানা পাবে না কেন ভাবছ, জো?’ জানতে চাইল এলিসা।

ধৈর্যের সঙ্গে বলল জোসেফ, ‘কারণ, ডার্লিং, ভুলে গেলে আগে আমি উকিল ছিলাম? স্টাডির জন্যে আরবন আর মেরি ওয়াইফ রিসার্চ লাইব্রেরির চেয়ার ক্ষয় করে ফেলেছি। সেসময়ে বহুবার গেছি স্টেট আর্কাইভে। আর সেজন্যেই জানি, উনিশ শ’ আঠারো সালের আগে লুইযিয়ানার কারও জন্ম নিবন্ধন করা হয়নি। নিয়মই ছিল না।’

‘ও!’ চুপ হয়ে গেল এলিসা।

‘এটা তো দক্ষিণের রাজ্য, নিউ ইয়র্ক নয়, ডার্লিং।’

নীরবতা নামল গাড়ির ভেতর। আঁধার রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে জোসেফ গুডরিচ। সামনে মাইলের পর মাইল জঙ্গল, যেন শেষ নেই।

রানা ভাবছে, ওর জন্যে বন্ধ হচ্ছে প্রতিটা পথ!

তখনই হঠাৎ মুখ খুলল এলিসা, ‘একটা কথা, আমরা তো কথা বলতে পারি প্রফেসর জ্যাক ম্যাকগাইভারের সঙ্গে।’

মাথা নাড়ল জোসেফ। ‘বাদ দাও, ডার্লিং। ওই লোক তো চিরকালের বদ্ধ মাতাল লোকটা কথাও বলতে পারবে না।’

‘মাতাল তা ভাল করেই জানি,’ একটু রেগে গিয়ে বলল এলিসা, ‘নইলে আগেই তার কথা বলতাম। এখন হয়তো কম মদ গেলে। কপাল ভাল হলে তাকে সুস্থ অবস্থায় পাব। – কপাল খুলতে পারে না?’

‘এই প্রফেসর আসলে কে?’ জানতে চাইল রানা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *