প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ৩.৮ উপসংহার

উপসংহার

শান্তিনিকেতন, ২০২১

চার দিন পরে….

রাত নেমেছে শান্তিনিকেতনে।

কোপাইয়ের কাছে একটা বাড়িতে হাত ধরাধরি করে বসে আছে দুই ভাই-বোন।

বাকিদের মতো শতাব্দী আর মানিকও শুনেছে ঘটনাগুলো। বনমালা আর অরণ্য দুজনেই চলে গিয়েছে কলকাতা। আর জয়ন্ত নাকি জানিয়েছে, সে চারটে খুনই করেছে। সাত বছর আগেও দুটো খুন করেছিল। যা জানাজানি হওয়ার পরে আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে শান্তিনিকেতন।

দাদার দিকে ফিরে শতাব্দী প্রশ্ন করল, “তুই বিশ্বাস করিস, জয়ন্তদা খুনগুলো করতে পারে?’

মানিক একটু সময় চুপ করে রইল। তারপরে বলল, “না, জয়ন্ত তো ওই রকম ছেলেই নয়।”

আবার সামান্য নীরবতা। তারপরে শতাব্দীই আবার প্রশ্ন করল, “তাহলে কে করল খুনগুলো?”

অস্বস্তিকর এই প্রশ্নের জবাব কেউই দিল না। সাত বছর আগের দৃশ্য মাঝে মাঝে ফিরে আসছিল মানিকের মনে। খুন করার সুযোগ জয়ন্তর সামনে ছিল, কিন্তু কেন করবে খুন

আর প্রবীর সেন? লোকটা ভীষণই বদরাগী। মানিককে প্রায় আক্রমণই করে বসেছিল। কিন্তু তাও মানিক ঠিক করে রেখেছিল, পরে আরও একবার যাবে লোকটার কাছে। যদি কিছু জানা যায়। কিন্তু সেই সুযোগ আর পায়নি।

মানিকের মনে উঁকি দিচ্ছিল সাত বছর আগের ঘটনাগুলো। কোনওভাবেই সে খুনগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল না। বন্ধুদের সঙ্গে রাতে আড্ডা মেরেছিল। তারপরে একা একা মাল খেলে বাড়ি ফিরেছিল। কিন্তু পুলিশি জেরার মুখে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। শুধুই মনে হত, যদি তাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। সাত বছর সময় পার হয়ে গেলেও সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলো ভোলেনি মানিক।

চিন্তাগুলো মাথা থেকে মুছে ফেলতে চাইল মানিক। তারপরে বোনের হাতে আলতো চাপ দিয়ে বলল, “তুই কিন্তু কষ্ট পাসনা। কষ্ট পেয়ে জীবনটাকে নষ্ট করবি না কিছুতেই।”

শতাব্দী একটু হাসল, “না রে দাদা, আমি আর কষ্ট পাব না। আমি বুঝেছি, ঈশ্বর সবাইকে সব কিছু দেন না।”

ভাই-বোন আবার নীরব হয়ে গেল।

.

রাত বাড়ছে শান্তিনিকেতনে।

মিনতি রান্না করে দিয়ে চলে গিয়েছে। কতদিন যে এইভাবে চলবে, সে জানে না। অরণ্যর বাবা-মা চেষ্টা করছেন কাউকে জোগাড় করার যে সারাটা দিন দীনেন্দ্র সিংহের খেয়াল রাখবে।

টেবলে ঢাকা দেওয়া অবস্থাতেই পড়ে আছে খাবারের থালা। খাওয়ার সময় নেই দীনেন্দ্র সিংহের। তাঁর আজ অনেক কাজ।

রান্নাঘর থেকে একটা কেটলি নিয়ে তিনি শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। কেটলি থেকে পুরো জলটা ঢেলে নিলেন একটা বড়ো গ্লাসে।

তারপরে গ্লাস হাতে এসে দাঁড়ালেন কনকমালার ছবিটার সামনে। এক দৃষ্টিতে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গ্লাসে চুমুক দিলেন দীনেন্দ্ৰ সিংহ।

তাঁর বুকের ভিতরটা ছিঁড়ে-খুঁড়ে যাচ্ছে। এত যন্ত্রণা জীবনে কখনও পাননি। বুঝতে পারছেন, এ সবই তাঁর পাপের ফল।

ছবির পায়ের কাছে বসে পড়লেন দীনেন্দ্র সিংহ। তারপরে হাহাকার করে উঠলেন—

“আমি তো তোমাকে মারতে চাইনি কনক। আমি চেয়েছিলাম, ওই বাচ্চাটা যেন না জন্মায়। পাগল হয়ে গিয়েছিলাম এক মিথ্যে সন্দেহে। সে জন্য ওষুধের সঙ্গে মিশিয়ে বিষটা তোমাকে খাইয়েছিলাম। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।”

কনকমালার ছবির নীচে লুটিয়ে পড়ে রইলেন দীনেন্দ্র সিংহ।

.

পরেরদিন যখন কাজে এল মিনতি, দেখল দীনেন্দ্র সিংহের ঘরের দরজা বন্ধ। বিস্তর ডাকাডাকিতেও দরজা খুলল না কেউ।

ঘণ্টাখানেক বাদে পুলিশ এসে ঘরের দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখতে পেল দৃশ্যটা।

দীনেন্দ্র সিংহের শরীরটা নিথর হয়ে পড়ে আছে কনকমালার ছবির পাদদেশে। বমির চিহ্ন আশপাশে। বোঝাই যাচ্ছে, শরীরে আর প্রাণ নেই।

.

কয়েকদিন পরে টক্সিকোলজিস্টের রিপোর্টটা হাতে নিয়ে বসেছিলেন শর্মিষ্ঠা বসু। রিপোর্ট পড়ার প্রয়োজন ছিল না তাঁর। তিনি জানতেন, কী লেখা আছে রিপোর্টে।

দীনেন্দ্র সিংহের মৃত্যু হয়েছে বিষ খেয়ে। একটা বিশেষ গাছের বিষ। যাকে বলা হয় নেরিয়াম ওলিয়েন্ডার। অর্থাৎ-

করবী। রক্তকরবী!

***

4 Comments

আপনারা যদি পারেন তাহলে , বৃশ্চিক ভলিউম ১,২ এই বই গুলো একটু যদি দয়া করে শেয়ার করবেন। Kind Request । Thank You

Please upload kuhak kaal by ankita

দারুণ গল্প

সত্যি বলতে, যখন প্রথম গল্পটা পড়া শুরু করি, তখন বিশেষ কোনো উত্তেজনা অনুভব করিনি। প্রথম দিকে মাঝেমধ্যে ২–৩ দিন পড়তাম, তারপর আবার কিছুদিনের বিরতি দিয়ে ধীরে ধীরে ১.৬ পর্যন্ত এগোই।
কিন্তু প্রায় ২০–২৩ দিন পর হঠাৎ আবার গল্পটা পড়া শুরু করি, আর তখন যেন এক ধরনের নেশার মতো হয়ে যায়। তারপর আর থামতে পারিনি—একদিনেই পুরো গল্পটা শেষ করে ফেলি।
গল্পটা আমার কাছে সত্যিই অপূর্ব লেগেছে। বিশেষ করে আমি নিজেও একজন বোটানি স্টুডেন্ট হওয়ায়, সেই দিক থেকে একটা আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত গল্পের উপসংহারে পৌঁছানোর ইচ্ছাটা আরও বাড়িয়ে দেয়।
লেখক গল্পটিকে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন। শেষের অংশটা সত্যিই মনকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল। সব মিলিয়ে, এটা একটি অত্যন্ত সুন্দর ও মনে দাগ কাটা গল্প।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *