প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ১.১০

১০

শান্তিনিকেতন, ১৯৯৩

উলটো দিক থেকে দীনেন্দ্রর ডাকটা শুনেই কনকমালা আগে রাস্তা পার হয়ে ওপারে চলে গেল।

“আরে তুই এখানে! বলিসনি তো এদিকে আসবি?” হাসিমুখে বলল কনক।

“কোনও প্ল্যান ছিল না। বাবার জন্য একটা ওষুধ কিনতে এসেছিলাম।”

কনকমালা জানত, দীনেন্দ্রর বাবা খুবই অসুস্থ। প্রায় মরণাপন্ন। সে গলা নামিয়ে জানতে চাইল, “কেমন আছেন মেসোমশাই?”

“ওই একরকম। জানিসই তো সব।” বলে প্রবীরের দিকে তাকাল দীনেন্দ্র। প্রবীর ততক্ষণে রাস্তা পার হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

“তোরা দুজনে এদিকে কোথায় গিয়েছিলিস?”

কনকমালাই জবাব দিল, “আমি বনানীদির বাড়ি যাচ্ছিলাম। রাস্তায় প্রবীরের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তারপরে দুজনে মিলে বনানীদির বাড়ি ঘুরে ফিরছি।”

“বাহ, প্রবীর তো বেশ দায়িত্ববান ছেলে!” দীনেন্দ্রর কথায় ব্যঙ্গের ছোঁয়াটা কনকমালা বা প্রবীর, কারওরই কান এড়াল না। প্রবীরকে কথা বলতে না দিয়ে কনকমালাই বলে উঠল, “এখন চল, বাড়ির দিকে যাই। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ঠান্ডা লাগছে। মা ওদিকে বাড়িতে একা।”

তিনজনই হাঁটতে লাগল ইউনিভার্সিটির দিকে।

.

সেই ছোটোবেলা থেকেই একসঙ্গে পড়েছে তিনজন। তবে দীনেন্দ্র ওদের চেয়ে বছর দুয়েকের বড়ো। দুটো ক্লাস উপরে পড়ত। দীনেন্দ্র আর কনকমালার বাড়ি দুটো কাছাকাছি। প্রবীরের বাড়িটা একটু দূরে। যত বয়স বেড়েছে, তত যেন পরস্পরের কাছাকাছি এসেছে তারা। তবে দুজন একটু বেশি কাছাকাছি চলে এসেছিল। যা প্রবীরের কখনও পছন্দ হয়নি। কিন্তু একান্তে গুমড়ে মরার চেয়ে আর বেশি কিছু করার ক্ষমতা ছিল না তার। দেখতে শুনতে বা আর্থিক দিক দিয়ে দীনেন্দ্রর চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল প্রবীর। কিন্তু তাও কনকমালা তাকে উপেক্ষা করত না। হেসে কথা বলত, দেখা করত, গল্প করত। প্রবীরের মনেও যেন একটা ক্ষীণ আশা হারিয়ে যেতে যেতেও ভেসে ছিল।

দীনেন্দ্র আবার একটু রাশভারী মেজাজের ছেলে। গলা উঁচিয়ে কথা বলে। কাউকে সেরকম পাত্তা দেয় না। প্রবীরকে তো নয়ই। ছোটোবেলাতেও হেলাফেলা করত, এখন তো আরওই করে। শুধু কনকমালার জন্য প্রবীর সবকিছু সহ্য করে যায়। সবকিছু!

গ্র্যাজুয়েশনের পরে শুরু হয়ে যায় মাস্টার্সের ক্লাস। দীনেন্দ্রর ছিল বোটানি। ছাত্র হিসেবে সে বাকি দুজনের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। ফলে সহকারী প্রফেসর হিসেবে বিশ্বভারতীতে জায়গা করে নিতে সমস্যা হয়নি তার। পাশাপাশি চলছে আরও উচ্চতর বিদ্যা অন্বেষণের প্রচেষ্টাও। যতটা মেধাবী, ততটাই উচ্চাকাঙ্ক্ষী দীনেন্দ্র। সে প্রবীরের মতো ছেলের সঙ্গে মেশার কথা ভাবতেই পারে না। স্রেফ কনকের জন্য এই ছেলেটাকে সহ্য করছে। না হলে কবে ভাগিয়ে দিত!

.

তিনজনে কিছু দূর যাওয়ার পরে প্রবীরের দিকে ফিরে দীনেন্দ্র বলল, “তুই তো প্রান্তিকের দিকে যাবি। ওই তো সামনে অটো আছে, উঠে পড় ওটায়। আমরা হেঁটে বাড়ি চলে যাব।” ঝট করে কনকের মুখটা একবার দেখে নিয়ে কোনও কথা না বলে অটোয় উঠে পড়ল প্রবীর। তার মনের মধ্যে একটা আগ্নেয়গিরি কাটার অপেক্ষায় ধিকিধিকি করে জ্বলছে।

অটোটা ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যাওয়ার পরে দুজনে আবার হাঁটা দিল বাড়ির দিকে।

কিছুটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতেই দীনেন্দ্র বলে উঠল, “এই ছেলেটাকে তুই এত পাত্তা দিস কেন রে? সেই ছোটোবেলা থেকে তোর পিছনে ঘুরঘুর করে।”

কনক হেসে ফেলল, “তুই পারিসও বটে! প্রবীর কী ক্ষতি করেছে বল তো! ওর দোষটা কোথায়? নিরীহ ছেলে একটা!”

দীনেন্দ্র বয়সে একটু বড়ো হলেও তিনজনের মধ্যে সেই ছোটোবেলা থেকে একটা তুই-তোকারি সম্পর্ক। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্কের সমীকরণটা বদলে গেলেও তুই-তোকারিটা এখনও চলে আসছে।

“দোষটা হল, ও তোর প্রতি একটু বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ওকে সাবধান করে দিস। বেশি বাড়লে ফল কিন্তু ভালো হবে না।” দীনেন্দ্র যে খুব সিরিয়াসভাবেই কথাটা বলেছে, তা বুঝতে অসুবিধা হল না কনকমালার। সে প্রসঙ্গ পালটানোর চেষ্টা করল। “আমাদের নাটকটা কিন্তু শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। মনে আছে তো, সামনের সপ্তাহেই হবে।”

“হ্যাঁ, মনে আছে।”

“তুই কিন্তু আমার রিহার্সাল দেখতে আসিসনি এখনও। কাল আয় না নাট্যঘরে। ওখানেই তো হচ্ছে আমাদের রিহার্সাল।” আবদারের ভঙ্গিতে বলল কনকমালা।

“আচ্ছা, ক্লাস শেষ হলেই কাল চলে আসব। তোকে না দেখে কি থাকতে পারি!” বলে কনকের হাতটা আলগোছে নিজের হাতে নিয়ে নিল দীনেন্দ্ৰ।

পুরুষালি স্পর্শে শরীরে সামান্য একটা কাঁপুনি উঠল কনকের। তারপরে দুজনে হাঁটতে লাগল অন্ধকার রাস্তা দিয়ে।

.

বিশ্বভারতীর মধ্যে যে কটা খোলা স্টেজ আছে, তার মধ্যে নাট্যঘর একটা। খোলা আকাশের নীচে ইট দিয়ে বানানো স্টেজে চলছে কনকমালাদের ‘রক্তকরবী’ নাটকের রিহার্সাল।

দূর থেকেই স্টেজে কনককে দেখতে পেয়েছিল দীনেন্দ্র। আর একটু কাছে আসতেই শুনতে পেল নাটকের ডায়লগ—

কিশোর: তুমি যে বলেছিলে, রক্তকরবী তোমার চাই-ই চাই। আমার আনন্দ এই যে, রক্তকরবী এখানে সহজে মেলে না। অনেক খুঁজে পেতে এক জায়গায় এখানকার জঞ্জালের পিছনে একটি মাত্র গাছ পেয়েছি।

নন্দিনী: আমাকে দেখিয়ে দে, আমি নিজে গিয়ে ফুল তুলে আনব…

আর একটি দৃশ্য….

অধ্যাপক: নন্দিনী, তোমার ডান হাতে ওই যে রক্তকরবীর কঙ্কণ, ওর থেকে একটি ফুল খসিয়ে দেবে?

নন্দিনী: কেন, কী করবে তুমি?

অধ্যাপক: কতবার ভেবেছি, তুমি যে রক্তকরবীর আভরণ পরো তার একটা কিছু মানে আছে।

নন্দিনী: আমি তো জানি নে কী মানে।

অধ্যাপক: হয়তো তোমার ভাগ্যপুরুষ জানে। এই রক্ত-আভায় একটা ভয়- লাগানো রহস্য আছে, শুধু মাধুর্য নয়।

.

দীনেন্দ্র চুপ করে দেখে যেতে লাগল রিহার্সাল। কনক অভিনয়টা খুবই সুন্দর করে। গানের গলাও ভালো। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে কথোপকথন শুনতে শুনতে নিজের অজান্তেই একবার কেঁপে উঠল দীনেন্দ্র। কোনও এক ‘রঞ্জন’ হঠাৎ এসে হাজির হবে না তো কনকমালার জীবনে! তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে না তো এই অমূল্য রতন?

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীরের উপরে চোখ পড়ল দীনেন্দ্রর। চোয়ালটা কঠিন হয়ে গেল তার।

ঘণ্টাখানেক পরে রিহার্সালের বিরতি। স্টেজ থেকে নেমে এল কনকমালা। ঠান্ডা-ঠান্ডা আমেজটা আসে সন্ধ্যার দিকে। দুপুরের দিকটায় এখনও ভালোই রোদের তেজ। কনকের নাকের ডগায় মুক্তো বিন্দুর মতো ঘামের ফোঁটা জমেছে। রুমাল দিয়ে চট করে মুখটা মুছে এগিয়ে এল কনক।

দীনেন্দ্র কিছু বলার আগেই শুনতে পেল কে একজন বলছে, “দারুণ করেছিস কনক! কী অভিনয়!”

মুখটা না দেখেও দীনেন্দ্র বুঝতে পারল, কথাটা কে বলেছে। প্রবীর সেন। তার মুখটা থমথমে হয়ে উঠল।

কনকমালা প্রবীরের দিকে তাকিয়ে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে দীনেন্দ্রর দিকে ফিরল, “কী রে, কেমন লাগল আমার অভিনয়?”

“অভিনয়টা দারুণ করেছিস, কিন্তু…।”

“কিন্তু কী?” ভ্রূ দুটো আকাশে উঠে গেল কনকমালার।

“সমস্যাটা এই রক্তকরবী বা করবী নিয়ে।”

“ওটা নিয়ে তোর আবার কী সমস্যা? কী আবোলতাবোল বলছিস!!” সত্যিই অবাক হয়ে গেল কনক।

হতাশায় মাথা নেড়ে দীনেন্দ্র বলল, “তোকে তো আগেও বলেছি, করবী গাছে বিষ আছে। ডালপাতা, ফুল, বীজ, শিকড়, সবকিছুতে। তোরা এই ফুল আবার খোঁপায় লাগাস, হাতে ধরিস। মানছি, করবী গাছের ফুল খুব আকর্ষণীয়। কত রকমের উজ্জ্বল রং কিন্তু আবার মারাত্মকও। ওই যাকে বলে সুন্দরের মধ্যে ভয়ংকর।

হি হি করে হেসে উঠল কনকমালা, “বোটানি পড়ে পড়ে তোর মাথাটাই গিয়েছে। কোথায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী অভিনীত হচ্ছে আর সেখানে তুই কি না বোটানির রক্তকরবী নিয়ে চলে এলি। সত্যি, তোকে নিয়ে আর পারা যায় না।” হাসতে হাসতে আবার স্টেজের দিকে চলে গেল কনকমালা। খোঁপায় গোঁজা সেই রক্তকরবী।

হতাশ ভাবে মাথা নাড়ল দীনেন্দ্র। রক্তকরবীর প্রতি প্রেম এই মেয়েটার কিছুতেই যাবে না। সে ফুলই হোক, কী নাটক!

একটু দূরে দাঁড়িয়ে দুজনের কথোপকথন শুনছিল প্রবীর। কনকমালা স্টেজের দিকে চলে যেতে সে-ও দীনেন্দ্রর থেকে দূরে সরে গেল।

.

সপ্তাহখানেক বাদে দারুণভাবে মঞ্চস্থ হল কনকমালাদের ‘রক্তকরবী’। নন্দিনীর ভূমিকায় অভিনয় করে সাড়া ফেলে দিল কনক। প্রফেসর থেকে সহপাঠী, সবাই এসে অভিনন্দন জানিয়ে গেল তাকে। একটু দূর থেকে সবকিছু দেখে যেতে লাগল দীনেন্দ্র। কনকমালার পাশে এত ছেলেদের ভিড় কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। এই ভিড়ে সে হারিয়ে যাবে না তো! মনের মধ্যে একটা অশনিসংকেত বেজে উঠতে থাকল দীনেন্দ্রর। সে বুঝতে পারছিল আর দেরি করা চলবে না।

.

দিন দুয়েক পরে দুপুরের দিকে ফাঁক পেতেই কলাভবনে হাজির হয়ে গেল দীনেন্দ্র। কনকমালা ক্লাস সেরে বেরোতেই এগিয়ে এসে বলল, “কনক, তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে। তোর ছুটি কটায় আজ?”

কনক চট করে সময়টা দেখে নিয়ে বলল, “পাঁচটার মধ্যে ফ্রি হয়ে যাব।”

“ঠিক আছে। আমি ওই সময় কলাভবনের গেটে চলে আসব।”

.

পাঁচটার আগে থেকেই দীনেন্দ্র অপেক্ষা করেছিল গেটের সামনে। তার বুকের ধুকপুকুনিটা বেড়ে গিয়েছে। কনকমালাকে এগিয়ে আসতে দেখে ঘাম ঝরতে শুরু করল। তারপরে নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে।

.

গেট দিয়ে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটু ফাঁকা জায়গায় চলে এল দুজনে। তারপরে কনকমালা জিজ্ঞেস করল, “কী বলবি বল? কেন আমায় ডেকে আনলি?”

সে স্মার্ট, ডাকাবুকো ছেলে। কিন্তু এই সামান্য কথা কটা বলতে গিয়ে যেন নার্ভাস হয়ে যাচ্ছিল। একটু সময় নিল নিজেকে গুছিয়ে নিতে। তারপরে বলল—

“কনক, আমাদের ব্যাপারটা নিয়ে কী ভেবেছিস তুই?”

“কোন ব্যাপারটা?” দীনেন্দ্রর মুখের দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল কনকমালা।

ভ্রূটা সামান্য কুঁচকে দীনেন্দ্র বলে উঠল, “কেন, আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারটা। এর শেষ পরিণতিটা কী, তুই ভেবেছিস তা?”

মুখ ঘুরিয়ে দীনেন্দ্রর দিকে তাকাল কনক। সে নিজে পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা দীনেন্দ্র আরও ইঞ্চি তিনেক বেশি। চোখে চোখ রেখে বলল, “তুই কী ভাবছিস?”

নিজেকে সোজা করে নিল দীনেন্দ্র। তারপরে কনকমালার হাতটা ধরে বলল, “কনক, তোকে ছাড়া আমি বাঁচব না। তুই আমাকে ছেড়ে কোথাও যাস না। আমি তোকে বিয়ে করতে চাই। তুই আপত্তি করিস না।”

কনক কোনও জবাব দিল না। সে দীনেন্দ্রর হাত ধরে হাঁটতে লাগল।

“কী রে, কিছু বলছিস না কেন?” একটু অধৈর্য হয়ে পড়ল দীনেন্দ্র। এই ধৈর্য জিনিসটা তার বরাবরই কম। তাই সে চট করে রেগে ওঠে, মাথা গরম করে ফেলে। তবে এখানে নিজেকে ভীষণভাবে সংযত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কনকমালা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমাকে একটু সময় দে। আমরা নিঃসন্দেহে খুব ভালো বন্ধু। হয়তো বা তার থেকেও বেশি। কিন্তু বিয়ে একটা জীবনভরের অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার ঠুনকোভাবে নিতে নেই, শুধু আবেগের বশেও নিতে নেই। ভেবেচিন্তে নিতে হয়। আমার একটু সময় লাগবে।”

হাতটা ছেড়ে দিল দীনেন্দ্র। তারপরে একটু রূঢ়ভাবে প্রশ্ন করল, “তোর জীবনে আর কেউ আছে নাকি? মানে ওই প্রবীর ছেলেটার প্রতি তুই কি দুর্বল?”

কনকলতা আহত দৃষ্টিতে তাকাল দীনেন্দ্রর দিকে। তারপরে বলল, “ এইসব বলিস না তুই। খুব খারাপ লাগে শুনতে। ক্ষুদ্র মানসিকতার মানুষেরাই এই ধরনের কথা বলে।”

দুজনে আবার নীরবে হেঁটে যেতে লাগল শান্তিনিকেতনের রাস্তা দিয়ে।

.

দিন তিনেক কেটে গিয়েছে। দীনেন্দ্র আর দেখা করেনি কনকমালার সঙ্গে। হয়তো আঘাত পেয়েছে, কিন্তু কনক কী করবে? জীবনভর অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আগে তাকে আরও ভাবতে হবে। সময় লাগবে।

সেদিন ক্লাস শেষ হওয়ার পরে হঠাৎ হাজির হয়ে গেল প্রবীর। কনকমালার সামনে এসে বলল, “মায়ের শরীরটা খুব খারাপ হয়েছে, জানিস? মনটা খুব খারাপ।”

“কেন রে, কী হয়েছে?” উদ্বেগ ফুটে উঠল কনকের চোখে-মুখে।

“আর বলিস না, কদিন থেকে জ্বরটা খুব আসছে। কাশি হচ্ছে। মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছে।”

কনকমালার খারাপই লাগল। সত্যি, ছেলেটা নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ প্রবীর বলে উঠল, “একবার আমার বাড়ি যাবি কনক? খুব বেশি দূরে তো নয়। অটোয় মিনিট পনেরো লাগবে।”

কনকমালা অবাক হয়ে গেল। “তোর বাড়ি যাব? কেন রে, হঠাৎ?”

“চল না। মাকে তোর কথা অনেক বলেছি। একবার দেখা করে আসবি। কোন দিন হয়তো আর থাকবে না। তা ছাড়া তুই তো কোনওদিন আমার বাড়িতে যাসওনি।”

কনকমালা একটু ভেবে বলল, “ঠিক আছে, চল।”

.

আধঘণ্টার মধ্যে প্রবীরের বাড়িতে পৌঁছে গেল কনকমালা। মাসিমা খুবই অসুস্থ। সেই অবস্থায় কনকের হাত ধরে অল্প কয়েকটা কথা বললেন। কিন্তু কাশির দমকে বেশি সময় কথা চালাতে পারলেন না। বৃদ্ধার মাথায় হাত বুলিয়ে কনক বলল, “আপনি বিশ্রাম নিন মাসিমা। আমি আবার আসব।”

দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পরে প্রবীর বলে উঠল, “আমার ছোটো স্টুডিওটা একবার দেখবি না?”

“চল,” বলে প্রবীরের দেখানো ঘরে গিয়ে ঢুকল কনকমালা।

উত্তেজিত প্রবীর তখন বেশ কয়েকটা পোর্ট্রেটের ছবি কনকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতে লাগল, “কীরকম হয়েছে বল?”

কনকমালা দেখে যেতে লাগল। সবগুলোই তার ছবি। কোনও সন্দেহ নেই, দুর্দান্ত হয়েছে। তার মুখের প্রতিটি রেখা জীবন্ত হয়ে উঠেছে প্রবীরের প্রতিভার গুণে। কাগজগুলো আবার প্রবীরের হাতে তুলে দিয়ে কনক বলল, “শুধু কি আমার ছবিই এঁকেছিস, আর কারও নয়?”

প্রবীর চট করে ঘুরে দাঁড়াল কনকমালার দিকে। তার দু-কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল, “তোকে ছাড়া আর কার ছবি আঁকব বল? তুই ছাড়া আমার জীবনে আর কেউ নেই!” প্রবীরের শরীরটা তখন থরথর করে কাঁপছে।

প্রবীরকে বাধা দিয়ে কনকমালা বলার চেষ্টা করল, “নিজেকে সামলা প্রবীর। এ সব করিস না…” কিন্তু কথা শেষ করার সুযোগ পেল না। তার আগেই কনকমালাকে বুকে টেনে নিল প্রবীর। তার ঠোঁট দুটো নেমে এল কনকমালার গোলাপের পাপড়ির মতো কোমল ঠোঁটে।

তারপরেই প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল প্রবীর। কনকমালার চোখ দুটো ধকধক করে জ্বলছে। ক্রুদ্ধ বাঘিনীর মতো চাপা স্বরে গর্জে উঠল মেয়েটা-

“আর কোনওদিন এই ভুলটা করার চেষ্টা করবি না প্রবীর। আর কোনওদিন আমার সামনেও আসবি না। তাহলে ফল ভালো হবে না।”

ঝড়ের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কনকমালা। উত্তেজনা আর রাগে তার বুকটা উঠছে-নামছে।

মেঝেতে পড়ে থাকা প্রবীরের শরীরটা যেন লজ্জায়, ঘৃণায়, রাগে কুঁকড়ে যেতে থাকল। চোখ দুটো বন্ধ করে অসহায় পশুর মতো আর্তনাদ করে উঠল ছেলেটা।

.

দু-দিন পরে দীনেন্দ্রর সামনে গিয়ে দাঁড়াল কনকমালা। তার মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “তোর প্রস্তাবে আমি রাজি। কিন্তু এই মুহূর্তে নয়। আমার সময় লাগবে। লেখাপড়াটা আগে শেষ করতে চাই।”

মেয়েটার দু-কাঁধে হাত রেখে দীনেন্দ্র সিংহ বলে উঠল, “ঠিক আছে, তুই সময় নে। আমি অপেক্ষা করে থাকব। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখিস। তুই আমার। আমাকে ছাড়া আর কারও কথা কখনও ভাববি না। কথা দে আমাকে।

হাতটা বাড়িয়ে দিল দীনেন্দ্র। বলিষ্ঠ করতালুর উপরে নিজের কোমল আঙুলগুলো রেখে কনকমালা বলে উঠল—

“কথা দিলাম।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *