প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ১.৬

শান্তিনিকেতন, ২০১৪

পরের দিন থানায় এসে কিছুটা সময় চুপ করে বসেছিলেন সমীরণ দত্ত। সত্যি, কত কী অদ্ভুত বিষ আছে! তাঁর জানা ছিল না করবী গাছ এত বিষাক্ত। রাস্তাতেও তো দেখেন। হাত দিলেই কি অসুস্থ হয়ে পড়বেন? ডাক্তারের কাছে আরও বিশদে জানতে হবে।

তাঁর চটকা ভাঙিয়ে কনস্টেবলটি এসে জানাল, চঞ্চল মজুমদারের বাড়ির লোক এসেছেন দেখা করতে। সমীরণবাবু ডেকে নিলেন ঘরে।

ভদ্রমহিলাকে দেখেই মনে হল, চঞ্চল মজুমদারের স্ত্রী। চেয়ারে বসার ইঙ্গিত করে অফিসার বললেন, “এইরকম পরিস্থিতিতে আপনাকে শান্তিনিকেতনে ডেকে আনার জন্য দুঃখিত। এমন যে হবে, কল্পনা করা যায় না।”

“আমাকে কী করতে হবে এখন?” ভদ্রমহিলার শান্ত স্বর শুনে একটু চমকে উঠলেন অফিসার। স্বামীর মৃত্যুতে বিশেষ আঘাত পেয়েছেন বলে তো মনে হচ্ছে না। সম্পর্ক কি এতটাই খারাপ ছিল?

“পোস্ট মর্টেম হয়ে গিয়েছে। বডি মর্গে আছে। আপনার হাতে দেহ তুলে দেওয়া হবে। আপনি চাইলে দেহ কলকাতায় নিয়ে গিয়ে সৎকার করতে পারেন।”

“তার প্রয়োজন নেই। আমি যা কাজ করার এখানেই করে যেতে চাই।”

সমীরণবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, “উনি তো প্রায় মাস ছয়েক হল শান্তিনিকেতনে এসে থাকছিলেন। একাই থাকছিলেন। আপনারা কেউ আসেননি। কোনও বিশেষ কারণ?”

ভদ্রমহিলা জবাব দিলেন, “দেখুন, সংসারে তো অশান্তি লেগেই থাকে। এটা কোনও নতুন ব্যাপার নয়। আমাদের মধ্যেও ব্যক্তিগত কারণে একটু রাগারাগি চলছিল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। আবার ঠিক হয়ে যেত।”

ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে সমীরণবাবু আর একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “খুনটা খুব ভয়ানকভাবে হয়েছে। প্রথমে বিষ খাইয়ে, তারপরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তলপেটে আঘাত করে। চুরি-ডাকাতির কেস নয় এটা। দেখে মনে হচ্ছে, কেউ প্রতিশোধ নিয়েছে।”

একটু চুপ করে ভদ্রমহিলার প্রতিক্রিয়াটা লক্ষ করলেন অফিসার। তারপরে বললেন, “ওঁর কোনও শত্রু ছিল বলে জানেন? এমন কোনও শত্রু যে বদলা নেওয়ার জন্য এতটা খেপে থাকবে?”

ভদ্রমহিলা সামান্য সময় চুপ করে থাকলেন। যেন কিছু ভাবার চেষ্টা করছেন। তারপরে বললেন, “দেখুন, উনি তো কিছুদিন হল শান্তিনিকেতনে এসে থাকছিলেন। কয়েক বছর হল এই বাড়িটা কেনেন। কিন্তু আমি এই বাড়িতে আসিনি। শান্তিনিকেতনে এসেছিলাম বহু বছর আগে। তাও কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে। এখানে এখন কী ঘটেছে, আমার জানা নেই।”

“আর কলকাতায়? সেখানে কোনও শত্রু তৈরি হয়েছিল কি?”

“না, না। আমি তো কোনওদিন শুনিনি বা টের পাইনি,” জবাব দিলেন ভদ্রমহিলা।

“ঠিক আছে। আপনি আগে সৎকারটা সেরে ফেলুন। তারপরে আপনার থেকে অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট নিতে হবে।”

.

ভদ্রমহিলা চলে যাওয়ার পরে ওসি-র ঘরে ঢুকলেন সমীরণবাবু।

“কত দূর এগিয়েছে আপনার তদন্ত?”

“পোস্ট মর্টেমের চূড়ান্ত রিপোর্টটা নিয়ে একটু কথা বলতে যাব ডাক্তারের সঙ্গে। বিষ প্রয়োগের ব্যাপারটা তো জানাই গেল। এবার দেখি মার্ডার ওয়েপনটা কী? মৃত্যুটা তো বিষ খেয়ে হয়নি।”

“সত্যি, অদ্ভুত একটা বিষ খাওয়ানো হয়েছিল। কজন লোক জানে বলুন তো রক্তকরবীর ব্যাপারটা।”

“সেই,” জবাব দিলেন সমীরণবাবু, “এছাড়া আমার মনে হয়, ভদ্রলোকের অতীত নিয়েও একটু খোঁজখবর নিতে হবে। এই ধরনের খুনের পিছনে বড়ো কোনও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মোটিভ থাকে, দেখা যাক।”

তদন্তকারী অফিসার উঠে পড়তে যাচ্ছিলেন। ওসি তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “একটা কথা মাথায় রাখবেন সমীরণবাবু। এই কেসটার দ্রুত নিষ্পত্তি চাই। ওপরমহল থেকে চাপ আসা শুরু হয়েছে। একটু হাই-প্রোফাইল কেস তো।” একটা ডায়রি টেনে নিয়ে কথা শেষ করলেন ওসি, “আর একটা ব্যাপার। এই বিষের ব্যাপারটা যেন মিডিয়ার কাছে ফাঁস না হয়ে যায়। ওরা জানলে চূড়ান্ত নাটক শুরু হয়ে যাবে।”

“ইয়েস স্যার,” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন সমীরণবাবু।

.

বোলপুর হাসপাতালে অমর চৌধুরীর ঘরে বসে পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টটা দেখছিলেন আইও।

“বিষ প্রয়োগে মৃত্যুটা তাহলে হয়নি বলছেন?’

“না, ইন্সপেক্টর। ইনজুরিগুলো সব অ্যান্টেমর্টেম, পোস্ট মর্টেম নয়। মানে, মৃত্যুর আগে ধারালো কোনও বস্তু দিয়ে ভদ্রলোককে আঘাত করা হয়। ওই আঘাতেই মৃত্যু। অ্যান্টেমর্টেম আঘাত বলেই অত রক্তক্ষরণ হয়েছে, পোস্ট মর্টেম ইনজুরিতে হয় না।” সমরীরণবাবু একটু ভাবলেন। তারপরে প্রশ্ন করলেন, “ওই বিষটার ব্যাপারে আর একটু বিশদে বলতে পারবেন?

ডাক্তার একটু ভেবে নিলেন। তারপরে বলতে শুরু করলেন-

“করবী গাছে কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড বলে একটা বস্তু থাকে। যার মধ্যে দুটো বিষাক্ত অংশ হল ওলিয়েনডারিন এবং নেরিন। এই গ্লাইকোসাইড পয়জনিং হার্টের সোডিয়াম-পটাসিয়াম পাম্পে প্রভাব ফেলে। যার ফলে ভেগাটনিয়া (vagotonia) বেড়ে যায়।”

অফিসার ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন। ডাক্তার দ্রুত বোঝানো শুরু করলেন-

“আমাদের শরীরে ভেগাস (vagus) নার্ভ বলে একটা নার্ভ আছে। এই নার্ভের কাজ হল ব্রেনের সিগন্যালটা হার্ট এবং পাকযন্ত্রে পৌঁছে দেওয়া। এই নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলে গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিস দেখা দিতে পারে। ইনটেস্টাইনে খাবার চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সহজ কথায় গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিস মানে, আপনার স্টমাকের প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়া!”

সমীরণবাবু রুমাল বার করে মুখটা একবার মুছে নিলেন। শালা, স্টমাকেরও প্যারালাইসিস! আরও কত কী যে জানা বাকি। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, বাড়ি ফিরে ভালো করে তল্লাশি চালাবেন। কোনও করবী গাছ দেখলেই দূর দূর করে বিদায় করতে হবে।

পুলিশ অফিসারকে দেখছিলেন ডাক্তারবাবু। নিজের জ্ঞান জাহির করতে পেরে তাঁর ভালোই লাগছিল। এই করবী বিষ নিয়ে অতীতেও তাঁকে একবার খোঁজখবর নিতে হয়েছিল। যখন নামটা কানে গিয়েছিল তাঁর। একটু আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে অমর চৌধুরী বলতে লাগলেন, “ভদ্রলোক যে মৃত্যুর আগে বমি করেছেন, তার সম্ভাব্য কারণ ওই গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিস। এতেই শেষ নয়, আরও কিছু আছে।”

সমীরণবাবু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

“সোডিয়াম-পটাসিয়াম পাম্পেও এই বিয প্রভাব ফেলে। যার জেরে হার্টবিট অনিয়মিত হয়ে পড়ে। মাথা ঘোরায়, শরীরের পেশি দুর্বল হয়ে যায়। প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কমে যায়। চিৎকার করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে পেশেন্ট।” ডাক্তারবাবু থামলেন। তিনি বুঝেছেন, এর বেশি বললে ইনস্পেক্টর নিতে পারবেন না, গুলিয়ে ফেলবেন। যতটুকু জানানোর তিনি জানিয়ে দিয়েছেন।

একটু ভেবে সমীরণবাবু জানতে চাইলেন, “এই বিষ শরীরে কতক্ষণের মধ্যে প্রভাব ফেলে বলে মনে হয়?”

“দেখুন, সবকিছুই নির্ভর করে কতটা পরিমাণ বিষ শরীরে গিয়েছে তার উপরে। সাধারণত দেখা যায় ঘণ্টা আটেকের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে না গেলে পেশেন্টের জীবন সংকটে পড়ে যেতে পারে। একজন সুস্থ-সবল, অল্পবয়সি মানুষ চার ঘণ্টার মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।

ডাক্তার চৌধুরী একটা ডায়রি টেনে নিলেন টেবল থেকে। তারপরে বিশেষ একটা পাতায় গিয়ে বললেন, “রিপোর্টে ওই বিষটার কথা জানার পরে আমি একটু কেস স্টাডি করছিলাম। কয়েকটা কেসের কথা শোনাই আপনাকে। এটা ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের একটা রিসার্চ পেপারের অন্তর্গত কেস।”

ডাক্তার পড়তে শুরু করলেন-

২১ বছর বয়সি এক মহিলাকে এমার্জেন্সি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছিল। মেয়েটির মাথা ঘোরাচ্ছিল আর ক্রমাগত বমি হচ্ছিল। জানা যায়, করবী গাছের গোটা দশেক পাতার রস তিনি খেয়েছিলেন। মেয়েটিকে কেউ একজন পরামর্শ দিয়েছিল, করবী পাতার রস খেলে নাকি গর্ভপাত হয়। পেশেন্ট সিগারেট খেত না, ড্রিঙ্ক করত না। বয়সটাও অল্প ছিল, সে কারণে বাঁচানো গিয়েছিল।

ডায়রির কয়েকটা পাতা উলটে একটা বিশেষ জায়গায় এসে থামলেন ডাক্তার।

“আর একটা কেস। এই ঘটনাটা বিদেশের। জার্নাল অব ফরেন্সিক সায়েন্সে এই কেসটার উল্লেখ আছে।”

পড়তে শুরু করলেন তিনি—

ভদ্রলোকের বয়স সত্তরের কাছাকাছি ছিল। তিনি প্রতিদিনের মতো কেটলিতে জল ফুটিয়ে চা বানিয়ে খেয়েছিলেন। এক ঘণ্টার মধ্যে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। বমি, জ্ঞান হারানো। হাসপাতালে নিয়ে এলে দেখা যায় হার্টবিট তিরিশে নেমে এসেছে। কোমায় চলে যান ভদ্রলোক। অনেক চেষ্টার পরেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।

পরে জানা যায়, চা করার আগে ওই কেটলিতে নাকি ওলিয়েন্ডার বা করবী গাছের পাতা ফুটিয়েছিলেন ভদ্রলোক। কেটলিতে সেই পাতার অংশও পাওয়া যায়। সন্দেহ করা হয়েছিল, আত্মহত্যা করার জন্যই ওই গাছের পাতা ফুটিয়ে জল বানিয়েছিলেন তিনি। গাছটা ভদ্রলোকের বাগানে পাওয়া যায়। তারপরে সেই জলে চা করে খান। মেডিক্যাল জার্নালে কেসটা ওলিয়েন্ডার পয়জনিং বা করবী বিষক্রিয়ায় মৃত্যু বলেই উল্লেখ করা আছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়রিটা বন্ধ করলেন ডাক্তার। তারপরে ইনস্পেক্টরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জানতে চাইলেন, “তাহলে আমরা কী বুঝলাম?”

“কী বুঝলাম?” জুলজুল চোখে তাকিয়ে পালটা প্রশ্ন করলেন সমীরণবাবু। যেন নিরেট এক ছাত্রকে বোঝাচ্ছেন, এই ভঙ্গিতে অমর চৌধুরী বলে যেতে লাগলেন-

“মোদ্দা কথা হল, করবী গাছ খুবই বিষাক্ত। গাছের ডালপালা, পাতা, ফুল, শিকড়— যাই মুখে দিন না কেন, বিষক্রিয়ার শিকার হতে পারেন। দ্বিতীয় ব্যাপার, এই গাছ পোড়ানোটাও ঝুঁকির। কারণ, গাছ পোড়ানোর যে ধোঁয়াটা বেরোবে, সেটা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে বিষক্রিয়ার কাজ করবে।”

ডাক্তার একটু দম নিলেন, “আর একটা ব্যাপার। এই গাছ গরম জলে ফোটালেও কিন্তু বিষক্রিয়া বন্ধ হবে না। গরম জলে ফোটালে ওলিয়েন্ড্রিনের প্রভাব নষ্ট হয় না। বরং, ওই ফোটানো জলটাই তখন বিষে পরিণত হবে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এইরকম অনেক কেস আছে। করবী গাছের পাতা ফুটিয়ে জল বানিয়ে খেয়ে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছে লোকজন। সাধারণত, সুইসাইড করার ক্ষেত্রে বা আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসেবে এই গাছের পাতার রস খেতে গিয়েই বিপত্তি হয়।”

ডাক্তার তাঁর ক্লাস শেষ করলেন। সমীরণবাবুর মাথা তখন ভোঁ ভোঁ করছে। ডাক্তার আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মজার ব্যাপারটা কী জানেন, এই করবী গাছের পাতা থেকে অনেক ওষুধও তৈরি হয়। আবার এই গাছ প্রাণঘাতীও।” একটু থেমে তাঁর কথা শেষ করলেন ডাক্তার, “অনেক রকম করবী গাছ হয়— সাদা, হলুদ, গোলাপি। আর রক্তকরবী!”

এতক্ষণে যেন হুঁশ ফিরে পেলেন অফিসার, “এই গাছ তো রাস্তাঘাটেও হয়। তাহলে তো মশাই এটা ভীষণ বিপজ্জনক!”

“তা তো বটেই। তবে গাছ-গাছড়া নিয়ে যারা ঘাঁটাঘাঁটি করে, তারা ব্যাপারটা জানে। তাছাড়া এই গাছের পাতা খুব তেতো। খাওয়া যায় না। জন্তু-জানোয়াররাও এড়িয়ে চলে। তা সত্ত্বেও অনেক জায়গায় করবী গাছ খেয়ে গরু-ছাগলের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। আর বাচ্চারা মাঝে মাঝে এই বিষক্রিয়ার শিকার হয়।

“তার মানে বলছেন, এই পাতার রস কাউকে না জানিয়ে খাওয়ানো যাবে না? মানে তেতো বলে ধরে ফেলবে?’

“দেখুন, আপনাকে একটা কথা বলি। ওই যে গল্প-উপন্যাস বা সিনেমায় দেখেন না যে বিষ খাইয়ে মারা হচ্ছে, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। বিষের একটা আলাদা স্বাদ থাকেই। তাছাড়া যখন ওটা শরীরে প্রবেশ করে, তখন বড়ির ডিফেন্স সিস্টেম কাজ করতে শুরু করে। এক ঢোঁক বিষ খাওয়ার পরেই আপনার গলা চোক করে যাবে। বিষ প্রয়োগটা বেশি হয় আত্মহত্যার ক্ষেত্রে। হ্যাঁ, ড্রাগ ওভারডোজে মৃত্যু আমরা দেখতে পাই। কিন্তু সেটাকে টেকনিক্যালি বিষক্রিয়ায় মৃত্যু বলা ঠিক নয়।”

“তাহলে এই ক্ষেত্রে বিষটা দেওয়া হল কীভাবে? ভদ্রলোক তো আর নিজে বিষ খেয়ে আততায়ীকে গিয়ে বলেননি যে, এসো আমাকে ছুরি মারো।”

ডাক্তার একটু ভাবলেন। তারপরে বললেন, “ভদ্রলোক সম্ভবত হুঁশে ছিলেন না। মদ্যপান করছিলেন, হয়তো বা প্রচণ্ড উত্তেজিত ছিলেন কোনও কারণে, তাই বিষের স্বাদটা বুঝতে পারেননি। হুইস্কির স্বাদও করবী পাতার তিতকুটে স্বাদটাকে ঢেকে দিতে পারে। আচ্ছা, ওই হুইস্কির গ্লাস আর বোতলটা পরীক্ষা করেছিলেন?”

“অবশ্যই, “ জবাব দিলেন ইন্সপেক্টর, “আপনার ধারণটাই সম্ভবত ঠিক। বোতল এবং গ্লাস, দু-জায়গাতেই বিষ পাওয়া গিয়েছে। মদেই বিষটা মেশানো ছিল।”

“তাহলে তো পরিষ্কার। কেউ অজান্তে মদের বোতলে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। খাওয়ার কিছু সময় পরেই প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। যখন নেতিয়ে পড়ে লোকটা, তখন খুনটা করা হয়।”

“বিষ না খাইয়ে একবারে অস্ত্রটা দিয়ে মারল না কেন?”

“হতে পারে আওয়াজ হবে বলে ঝুঁকি নিতে চায়নি বা কোনও পালটা প্রতিরোধ চায়নি আততায়ী। বিষটা কাজ করা শুরু হওয়ার পরে ভদ্রলোক জ্ঞান হারান বা ঝিমিয়ে পড়েন। চিৎকার বা প্রতিরোধ করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। সেই সুযোগে মুখ চেপে আঘাত করতেই ঝামেলা খতম।”

ডাক্তার থামলেন। ইন্সপেক্টর ভাবতে লাগলেন। তারপরে যেন নিজের মনেই বললেন, “রক্তকরবীর বিষ! কী ভয়ংকর!”

ডাক্তার বাধা দিয়ে বললেন, “টেকনিক্যালি করবী গাছের বিষ। রক্তকরবী কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।’

দুজনেই সামান্য সময় চুপ করে রইলেন। ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন, “আপনার খুনি কিন্তু গাছের ব্যাপারে অভিজ্ঞ। সবার পক্ষে এই বিষের হদিশ পাওয়া সম্ভব নয়।”

সমীরণ দত্ত মাথা নাড়ালেন। ঠিকই বলেছেন ডাক্তারবাবু।

আবার সামান্য সময়ের নীরবতা। তারপরে অমরবাবু জানতে চাইলেন, “হাতের ছাপ কিছু পাওয়া গেল ঘরে?”

“হ্যাঁ, কাজের লোকেদের পেয়েছি। আর কয়েকটা বাচ্চার হাতের ছাপ।”

“স্বাভাবিক, যখন বাচ্চাদের পড়াতেন। ছাপগুলো মিলিয়েছিলেন?”

“কাজের লোকেদের ছাপ মিলিয়ে দেখা হয়েছে। বাচ্চাদের ছাপগুলো এখনও মেলাইনি। পরে একবার মিলিয়ে নেব। তবে এক্সপার্ট বলল, ওগুলো বাচ্চাদেরই আঙুলের ছাপ। এছাড়া ঘরে আর কোনও ছাপ পাওয়া যায়নি। যে খুনটা করেছিল, সে পাকা লোক। হাতের ছাপ রেখে যায়নি। সম্ভবত মুছে দিয়েছে।”

ডাক্তার জানতেন, ফিজিক্যাল এবং কেমিক্যাল প্রপার্টি দিয়ে বাচ্চা আর বড়োদের হাতের ছাপ আলাদা করে বোঝা যায়। তবে সেটা ওই বাচ্চাদের বারো-চোদ্দো বছর হওয়া পর্যন্ত।

হাতের আঙুলে যে ‘রিজ’ অর্থাৎ, অতি সামান্য উঁচু-নীচু রেখা থাকে, তা প্রাপ্তবয়স্কদের একরকম, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আর একরকম। প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে ওই রিজের মধ্যে পার্থক্য থাকে ৪৫০-৫০০ মাইক্রন। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তা অনেক কম। এক মাইক্রন মানে এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগের এক ভাগ!

এ ছাড়া কেমিক্যাল প্রপার্টি দিয়েও দুটো হাতের ছাপের তফাত করা যায়। আঙুলের ছাপে পাওয়া যায় সেবাম বলে একটি পদার্থ। বয়ঃসন্ধির আগে পর্যন্ত বাচ্চাদের আঙুল আর বড়োদের আঙুলের ছাপে সেবামের পরিমাণ আলাদা থাকে। এই পদ্ধতিতেও বাচ্চা আর প্রাপ্তবয়স্কদের হাতের ছাপের তফাত করা যায়। তদন্তকারী অফিসার এবার জানতে চাইলেন, “মার্ডার ওয়েপনটা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী? ছুরি?

“এটা যে স্ট্যাব উন্ড, সে সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই। তলপেটের কাছে স্কেলিটাল প্রোটেকশন না থাকায় আঘাতগুলো অনেক গভীরে গিয়েছে। প্রচুর শক্তি দিয়ে কেউ একটা ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে বারবার আঘাত করেছে। ফলাটা ছুঁচালো। আঘাতটা ওপর থেকে নীচে নেমেছে, সমান্তরালভাবে হয়নি।”

ডাক্তার অভ্যাসবশত চশমাটা খুলে হাতে নিলেন। তারপরে কাচ দুটো মুছতে মুছতে বললেন, “স্লাইস উন্ড নয়। খুব সম্ভবত মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় কেউ ধারালো অস্ত্রটা দিয়ে আঘাত করেছে। অস্ত্রটার মাথার দিকটা ছুঁচালো। ফলাটা ওপর থেকে নীচে নেমেছে। আড়াআড়িভাবে আঘাত করা হয়নি। ফলাটা খুব গভীরে ঢুকেছে। উন্ডের স্কিন প্যাটার্ন আর আঘাতের গভীরতা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ইন্টার্নাল অর্গ্যানও ড্যামেজ হয়েছে। আঘাত দেখে মনে হচ্ছে, আক্রোশ মিটিয়েছে খুনি।”

“অস্ত্রটা কী?” একটু অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন পুলিশ অফিসার, “ছুরি তো নিশ্চয়ই।”

ডাক্তার একটু দাড়ি চুলকে নিলেন। তারপরে বললেন, “দেখুন, ছুরি দিয়ে এই ধরনের আঘাতের ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হয়। সেটা হল, হিল্ট মার্ক। অর্থাৎ ছুরির ফলা আর হাতলের সংযোগস্থলের অংশকে হিল্ট বলা হয়। সেটা কাঠের হতে পারে বা কোনও ধাতুর।”

কোনও কথা না বলে তাকিয়ে রইলেন ইন্সপেক্টকর। তিনি আন্দাজ করছিলেন, ডাক্তার আরও কিছু বলবেন। তাই হল।

“এক্ষেত্রে কোনও হিল্ট মার্ক কিন্তু পাইনি। যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ধরে নেওয়া যেতে পারে, সাধারণ ছুরির ফলা পুরো ঢুকে যাবে আর হাতলের একটা চিহ্ন থাকবে শরীরে। বাট দেয়ার ইজ নো হিল্ট মার্ক ইন দিস কেস। এটাই আমাকে অবাক করছে।

“তাহলে অস্ত্রটা কী হতে পারে?” হা করে তাকিয়ে রইলেন অফিসার।

‘এমন অস্ত্র যার ফলাটা খুব লম্বা। মানে ফলাটা গভীরে ঢুকলেও হাতলটা শরীর স্পর্শ করল না। আর একটা ব্যাপার, ফলাটা কিন্তু খুব চওড়া নয়।” একটু ভেবে ডাক্তার তার রায় দিলেন, “এই ধরুন বড়ো একটা ভোজালি। তবে ভোজালির ফলা আবার সাধারণত চওড়া হয়।”

“ভোজালি না হলে কী?” ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন সমীরণবাবু।

“আর একটা অস্ত্রের কথা মাথায় আসছে,” বলে চুপ করে গেলেন ডাক্তার। যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন অস্ত্রটার কথা বলতে।

“আরে বলুন না কী বলবেন,” এবার অধৈর্য হয়ে পড়লেন সমীরণ দত্ত।

“অস্ত্রটা সরু তলোয়ার জাতীয় কিছু হতে পারে।”

ইন্সপেক্টরের হা আরও বড়ো হয়ে গেল!

.

সেই রাতে, কোনও এক জায়গায়…

অন্ধকার ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিল মূর্তিটা। ভীষণ রাগে তার বুকটা ওঠা- নামা করছে। এত সাহস, এত সাহস! দুর্বলের উপরে সবাই অত্যাচার করে। তাই তো তাকে আসতে হয়েছে। সে ছাড়বে না, কাউকে ছাড়বে না। সে জানে, কীভাবে এদের শাস্তি দিতে হয়। কীভাবে নিজেকে আড়ালে রেখে কাজ করে যেতে হয়।

এক্ষেত্রে সে-ই হল জাজ, জুরি অ্যান্ড এক্সিকিউশনার। একদিকে বিচারক এবং জহ্লাদ। খলখলিয়ে হেসে উঠল মূর্তিটা। যে হাসি শুনলে কোনও সাহসী মানুষেরও বুকের রক্ত শুকিয়ে যাবে।

.

অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও মিডিয়ার কাছ থেকে বিষের ব্যাপারটা গোপন রাখা গেল না। দিন কয়েকের মধ্যে পুলিশেরই কেউ খবরটা ফাঁস করে দিল সাংবাদিকদের কাছে। আর মোটামুটি সব কাগজে একই ধরনের শিরোনাম ছড়িয়ে পড়ল-

শান্তিনিকেতনে রক্তকরবী মার্ডার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *