প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ১.২

শান্তিনিকেতন, ২০১৪

আতঙ্কের মধ্যেও যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, টের পায়নি মেয়েটা। চোখটা যখন খুলল, বুঝতে পারছিল না কোথায় শুয়ে। মাথাটা কীরকম ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছিল, বুকের উপরে একটা বিশাল পাথর চেপে আছে।

তারপরে ধীরে ধীরে গতরাতের ঘটনাটা মনে পড়তে লাগল মেয়েটার। সেই ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন! ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল সে। দাদা কোথায়, দাদা?

বিছানায় কেউ নেই। দাদা কি তাহলে ভোর হতে না হতেই ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছে? দরজাটা ভেজানো, যে-রকম রোজই থাকে।

রাতের ভয়ংকর দুঃস্বপ্নটা কিছুতেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না ছোট্ট মেয়েটা। কোনওমতে খাট থেকে নেমে ধীর পায়ে দরজাটা খুলে বেরিয়ে এল বারান্দায়। ভোরের আলো ফুটছে। তাদের বাড়ির সামনে বেশ বড়ো বাগান। সেই বাগানের গাছ থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক। ভোরের মিষ্টি আলোর স্পর্শে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে শান্তিনিকেতন।

বারান্দার অন্য প্রান্ত থেকে এক মহিলা কণ্ঠ বলে উঠল, “মালা, তুমি উঠে পড়েছ? খুব ভালো। তৈরি হয়ে নাও। স্কুল যেতে হবে।”

কথাটা বলল মিনতি মাসি। এই বাড়ির গভর্নেস কাম গার্জিয়ান বলা যেতে পারে মহিলাকে। বাচ্চাদের তৈরি করে দেওয়া, স্কুলে পাঠানো, টিফিন তৈরি করে দেওয়া, সবই তার দায়িত্ব।

মালা বুঝল, তাকে দ্রুত তৈরি হয়ে নিতে হবে। এখন আর কিছু ভাবার নেই। গতকাল রাতের কথা আপাতত ভুলে যেতে হবে। দাদাকেও দেখা যাচ্ছে না। তৈরি হচ্ছে বোধহয়। মালা আবারও নিজের ঘরে ফিরে এল। এই ঘরটার সঙ্গেই লাগোয়া বাথরুম। সে দ্রুত স্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি হতে লাগল। এখনই মিনতি মাসি খেতে ডাকবে।

ঠিক সময়েই খেয়েদেয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ভাই-বোন। এখন আর সে দাদার সাইকেলে চাপে না। তার নিজেরই সাইকেল হয়েছে। সেই সাইকেলে চেপে দাদার পিছু পিছু শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন রোড ধরে এগিয়ে চলল স্কুলের দিকে।

মালা একবার ভাবছিল দাদাকে গতকাল রাতের কথা জিজ্ঞেস করবে। রাতে তার সঙ্গে শোওয়ার জন্য ধন্যবাদ দেবে। না হলে কাল যা ভয় পেয়ে গিয়েছিল! ওই রকম ভয়ানক স্বপ্ন সে আগে দেখেনি। কিন্তু দাদার গম্ভীর মুখটার দিকে তাকিয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেল না। কেন যে ওরকম গম্ভীর হয়ে আছে, কে জানে! এমনিতে তো বেশ হাসিখুশিই থাকে। আজ হঠাৎ কী হল, বোঝা যাচ্ছে না। তার দিকে তাকাচ্ছেও না ঠিক করে।

যাই হোক, আর ভাবার সময় পেল না মালা। স্কুল এসে গিয়েছে। স্ট্যান্ডে সাইকেল রেখে ভাই-বোন হাঁটা দিল যে যার ক্লাসের দিকে। তার ক্লাস এইট। দাদার ক্লাস ইলেভেন। তাই চাপ অনেক বেশি। হয়তো সে কারণেই গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। অনেকটা বাবার মতো। যা পড়ার চাপ

তাদের স্কুলের সময়টা বেশ ভালো। সকাল সাতটা থেকে দুপুর একটা। মাঝে মাঝে দাদাদের এক্সট্রা ক্লাস চলে, তখন সে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যায়।

এদিনও স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজতেই হুড়মুড় করে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এল তারা। তারা মানে চারমূর্তি। মজা করে সহপাঠীরা ওদের চারজনের নাম দিয়েছে ফোর মাস্কেটিয়ার্স।

অরণ্য নামের ছেলেটা তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “আজ খুব বাঁচিয়ে দিয়েছিস বনমালা। ভাগ্যিস উত্তরটা বলে দিয়েছিলিস টুক করে। নাহলে স্যারের কাছে খুব বকা খেতাম।”

“ঠিক করে পড়ে আসিসনি কেন?” ভ্রূ দুটো কুঁচকে বলল বনমালা নামের মেয়েটা। যাকে অনেকেই ডাকে মালা বলে।

“ওকে ম্যাডাম, এবার থেকে সব পড়া শিখে আসব,” মাথা ঝুঁকিয়ে বলে উঠল অরণ্য। তারপরেই খিলখিল করে হেসে উঠল চারজন।

“এই বোন, দাঁড়া,” পিছন থেকে গম্ভীর গলায় দাদার ডাকটা শুনে থমকে গেল মালা। সঙ্গে বাকিরাও। মালার দাদা জয়ন্তকে সবাই চেনে। খুব হাসিখুশি ছেলে। আজ অবশ্য বেশ গম্ভীরই লাগছে তাকে।

জয়ন্ত এসে দাঁড়াল চার বন্ধুর সামনে। তারপরে বলল, “শোন, আজ তোরা আর বেশি দেরি করিস না। যে যার বাড়ি ফিরে যা।” তারপরে মালার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি সাইকেল স্ট্যান্ডের ওখানে যাচ্ছি। তুই দেরি না করে চলে আয়।”

চারজনই একে অপরের দিকে তাকাল। আর একটা ব্যাপার লক্ষ করেছিল বনমালা। প্রত্যেক টিচারের মুখ কীরকম গম্ভীর। ফিশফাশ করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। শেষ পিরিয়ডের ম্যাম তো ভালো করে পড়াতেই পারলেন না। কিছুটা সময় পড়িয়ে, সবাইকে চুপ করে থাকতে বলে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

যাই হোক, সময় নষ্ট না করে সবাই হাঁটা দিল সাইকেল-স্ট্যান্ডের দিকে। মোটামুটি চার-পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেই সবার বাড়ি। শতাব্দী অবশ্য একটু দূরে থাকে। সাইকেল চেপেই যাওয়া আসা করে তারা। তবে বনমালার বাড়িটা একটু নিরিবিলি জায়গায়। ওই অঞ্চলটাকে বড়োলোকের জায়গা বলা হয়। বেশ কয়েকটা বড়ো বড়ো বাড়ি আছে, দু-একটা তো ফাঁকা পড়ে থাকে। ছুটিছাটায় কলকাতা থেকে লোকজন এসে থেকে যায়। বাকি বন্ধুদের কেউ থাকে কোপাইয়ের দিকে, কেউ শ্রীনিকেতনের দিকে। অরণ্যর বাড়িটা অবশ্য বনমালার বাড়ির বেশ কাছে।

কিছুদূর একসঙ্গে যাওয়ার পরে আলাদা আলাদা রাস্তা নিল বন্ধুরা। দাদার পিছনে পিছনে সাইকেল করে বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল বনমালা।

বাড়ির কাছে আসতেই চমকে উঠল সে। তাদের বাড়িটার ঠিক পরেই রয়েছে মজুমদার বাড়ি। সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশের গাড়ি। আর একটা কালো ভ্যান। আরও কাছে এসে দেখতে পেল, মজুমদার বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দুজন পুলিশ। রাস্তার ওপাশটায় বেশ কয়েকজন লোক জড়ো হয়ে গিয়েছে। উত্তেজিতভাবে কথা বলছে তারা।

প্যাডেলে একটু চাপ দিয়ে জয়ন্তর পাশে চলে এল বনামালা, “কী হয়েছে রে দাদা? মজুমদার জেঠুর বাড়ির সামনে পুলিশ কেন?”

বোনের দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর গলায় জবাব দিল জয়ন্ত, “কিছুই বুঝতে পারছি না, কিন্তু আমরা সোজা বাড়িতে ঢুকব। ওই দেখ, বাবা দাঁড়িয়ে গেটের সামনে।”

বনমালা দেখতে পেল। বাবাকে সে ভীষণই ভয় পায়। সবসময় মুখটা গম্ভীর করে থাকে। তার সঙ্গে কথা প্রায় বলেই না। তার যাবতীয় ভাব ভালোবাসার সঙ্গী ওই দাদা। দাদাকে ছাড়া সে এক মুহূর্ত ভাবতেই পারে না। দাদাও খুব ভালোবাসে তাকে। সে সামান্য অসুস্থ হলে বা চোট পেলে ভীষণ রকম অস্থির হয়ে ওঠে দাদা। মা এবং বাবার স্নেহ, মায়া, মমতা সব যেন ওই দাদার কাছ থেকেই পায় বনমালা।

সে আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির দিকে সাইকেল ঘোরাল। বাবা এমনিতেই গম্ভীর মানুষ। কিন্তু সেদিন বাবার মুখটা দেখে মনের মধ্যে গুড়গুড় করতে লাগল বনমালার। বাবা আর মজুমদার জেঠু ভীষণ ভালো বন্ধু। দুজনেই খুব পণ্ডিত মানুষ। বাবা যেমন বোটানির প্রফেসর, সেরকম মজুমদার জেঠু কলকাতার কোনও এক নামকরা কলেজে ইংরেজি পড়াতেন। চাকরি ছেড়ে শান্তিনিকেতনে বাড়ি কিনে চলে এসেছেন। এই বাড়িটায় মজুমদার জেঠু একাই থাকেন।

.

এখানে এসে জেঠু আবার পড়ানো শুরু করেছেন। একটা ব্যাচকে ইংরেজি পড়ান। ওই ব্যাচে তার বন্ধু শতাব্দীও পড়ে। বনমালাও সপ্তাহে তিন দিন মজুমদার জেঠুর কাছে ইংরেজি পড়তে যায়। তবে সে একা পড়তে যায়। বাবার বন্ধু বলে মজুমদার জেঠু তাকে আলাদা করে পড়ায়। যাতে বনমালার সুবিধে হয়।

বাবার কড়া নির্দেশ, একদিনও কামাই করা যাবে না। মজুমদার জেঠুর কাছে ইংরেজি শিখলে নাকি ওই ভাষাটা নিয়ে আর কোনও সমস্যাই হবে না।

গত ছ-মাস ধরে নিয়মিত মজুমদার জেঠুর কাছে ইংরেজি পড়তে যায় বনমালা। ভালো না লাগলেও যেতে হচ্ছে। বাবাকে কিছু বলার ক্ষমতাই নেই তার। বাবা যেন বনমালার কাছে দূরের কোনও এক গ্রহের প্রাণী।

ছেলে-মেয়েকে গেটের কাছে আসতে দেখে গম্ভীর মুখে বাবা বলে উঠলেন, “তোমরা এখনই নিজেদের ঘরে চলে যাও। আজ বাড়ি থেকে ভুলেও বার হবে না। মিনতি তোমাদের খেতে দিয়ে দেবে।”

কোনও কথা না বলে ভাই-বোন বাগান পেরিয়ে সাইকেল ঘোরালো বাড়ির পথে। গ্যারাজের পাশে সাইকেল রাখতে রাখতে বনমালা ফিশফিশ করে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে বল তো? বাবাকে খুব গম্ভীর দেখাচ্ছে। মজুমদার জেঠুর বাড়ির সামনেই বা অত পুলিশ কেন?”

দাদা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বোনের মুখের দিকে। তারপরে ধীরে ধীরে বলল, “কিছুই বুঝতে পারছি না রে মালা। কিন্তু তোকে আর ভাবতে হবে না বেশি। সবই জানা যাবে। ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। আমরা একসঙ্গে খেতে বসব।”

সাইকেলটা রেখে বনমালা হাঁটা দিল নিজের ঘরের দিকে।

.

মজুমদার বাড়িটাও বেশ বড়ো। বনমালাদের মতো দোতলা না হলেও বেশ কয়েকটা ঘর আছে। বাড়িটার চারপাশে বাগানও রয়েছে। বেশ বড়োসড়ো গাছগাছালি।

একশো মিটার মতো মোরামের পথ হেঁটে বাড়িটার সামনে পৌঁছোতে হয়। সামনে একটা বারান্দা। গেট খুলে সেই বারান্দা পেরোলেই ড্রয়িংরুম। বেশ বড়ো ড্রয়িংরুমের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই অফিসার।

বোলপুর থানার ইন্সপেক্টর এবং তাঁর সহকারী। দুজনেরই চোখ মেঝের দিকে। আধুনিক বাড়িগুলোর মতো এই মেঝেটা সাদা মোজাইক বা মার্বেল পাথরের তৈরি নয়। পুরোনো দিনের বাড়ির মতো লাল সিমেন্টের মেঝে।

সেই লাল মেঝে যেন আরও লাল হয়ে গিয়েছে গড়িয়ে আসা রক্তের ধারায়। রক্তের স্রোত বইছে ঘর জুড়ে। রক্তের ফোঁটা ছিটকে গিয়েছে এদিক-ওদিক।

মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে ইন্সপেক্টর জিভ দিয়ে একটু চুকচুক শব্দ করে বললেন, “কী নৃশংসভাবে মেরেছে লোকটাকে। যৌনাঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে দেখছি।”

সহকারীটির গা শিরশির করে উঠল দৃশ্যটা দেখতে দেখতে। এইরকম ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড তার পুলিশ জীবনে সে দেখেনি। শান্তিনিকেতনের মতো জায়গায় তো ভাবাই যায় না।

সিনিয়র অফিসারের দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন, “শান্তিনিকেতন এবার অশান্ত হতে চলেছে স্যার। এই মার্ডারটা নিয়ে ভীষণ জলঘোলা হবে।”

সহকর্মীর কথায় গম্ভীর হয়ে গেলেন ইন্সপেক্টর। ভুল কিছু বলেনি ও। সত্যিই ঝড় উঠবে।

.

খাবার টেবিলে কোনও কথাই হল না ভাই-বোনের। বাবা এখনও খেতে আসেনি। মিনতি মাসি খাবার দিচ্ছিল প্রচণ্ড উত্তেজিত মুখে। যেন কিছু বলতে চাইছে, অথচ বলার সাহস পাচ্ছে না।

খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ল ভাই-বোন। তারপরে জয়ন্ত বলল, “তুই সোজা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। বেরোস না একদম। আমি দেখে আসি কী ব্যাপার।” বলে বড়ো গেটটার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল জয়ন্ত।

বনমালাও চলে এসেছিল নিজের ঘরের দরজা পর্যন্ত। হঠাৎ সামনাসামনি পড়ে গেল মিনতি মাসির। আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না মেয়েটা। ফিশফিশ করে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা মিনতি মাসি, কী হয়েছে বলো তো? মজুমদার জেঠুর বাড়িতে পুলিশ কেন?”

মিনতি মাসি চট করে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিল। তারপরে গম্ভীর মুখ করে বলল, “তোমার শুনে কাজ নেই। তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো।”

“বলো না মাসি, কী হয়েছে?” আবদারের সুরে বলে উঠল বনমালা।

মাসি আর কথা চেপে রাখতে পারল না। বনমালার চেয়েও গলা নামিয়ে বলে উঠল, “মজুমদার বাবু খুন হয়ে গিয়েছে। কেউ ছুরি মেরে ওকে খুন করে চলে গিয়েছে। তুমি ঘরে যাও। কাউকে কিছু বোলো না।”

বলার মতো অবস্থাতেও ছিল না বনমালা। সে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। নিজের শরীরটাকে সে আবার মায়ের পেটে থাকা ভ্রূণের মতো গুটিয়ে নিয়েছে। মাথায় একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। মেয়েটার মনে পড়ে যাচ্ছে গতরাতের ভয়ংকর স্বপ্নটার কথা।

সেই স্বপ্নে মজুমদার জেঠুকেই খুন হতে দেখেছিল বনমালা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *