প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ১.১

শান্তিনিকেতন, ২০২১।

বিশ্বভারতীর কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের বড়ো বাড়িটা থেকে প্রায় উড়তে উড়তে বেরিয়ে এল বনমালা সিংহ। মনটা ফুরফুরে হয়ে আছে। আর হবেই বা না কেন! আপাতত পরীক্ষা শেষ। ঠিক রাস্তাতেই এগোচ্ছে সে। এইভাবে চললে সেমেস্টার পর্ব শেষ করে পিএইচ ডি করার দিকে এগোতে পারবে। তারপরে আরও উঁচুতে উড়তে চায় মেয়েটা। শান্তিনিকেতন থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। উড়ে যেতে চায় সাগর পেরিয়ে দূরের কোনও দেশে। যেখানে সে গবেষণা করবে, নিজেকে নতুন করে চিনবে।

সেই রাস্তায় প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছে বনমালা। সে বরাবরেরই ভালো ছাত্রী। এবারও বেশ ভালোই রেজাল্ট হবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত বনমালা। কিন্তু আগামী কয়েকটা সপ্তাহ সে চুটিয়ে ছুটি উপভোগ করতে চায় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে, তার শান্তিনিকেতনের বন্ধুদের সঙ্গে, তার ছোটোবেলাকার বন্ধুদের সঙ্গে।

ছোটোবেলার বন্ধু! ওদের সঙ্গে তার মনের টানটা বড়োই গভীর। সেই স্কুল- জীবন থেকে ওরা চারজন প্রায় একসঙ্গে বড়ো হয়ে উঠেছে। পড়ত স্থানীয় একটি নামী স্কুলে। তিনজন মেয়ে এবং একটি ছেলে। চারজনকে অনেকেই মজা করে ডাকত ‘ফোর মাস্কেটিয়ার্স’ বলে।

ক্লাস টুয়েলভের পরে অবশ্য তাদের গ্রুপটা ভেঙে যায়। তিনজন শান্তিনিকেতনে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছে কিন্তু অরণ্য বাইরে চলে যায়। সে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। তবে এই ছুটিতে সে-ও ফিরে এসেছে ঘরে। এইরকম ছুটিছাটাতেই তারা এখন দেখা করে। সেই ছুটি আবার এসেছে। বেশ কিছুদিন তারা আবার একসঙ্গে থাকবে। ভাবতেই মনটা নেচে উঠল বনমালার। সাইকেল-স্ট্যান্ড থেকে সাইকেলটা নিয়ে সে সোজা ছুটল মিটিং পয়েন্টে। বিশ্বভারতী ক্যান্টিন।

.

দূর থেকেই বনমালাকে আসতে দেখেছিল তার দুই বন্ধু। অময়া আর শতাব্দী। হইহই করে উঠল মেয়েগুলো।

“আরে এত দেরি করে ফেললি যে! কখন থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করে আছি।” কপট রাগের ভঙ্গিতে বলল অময়া

“আর বলিস না, স্যার ছাড়তেই চাইছিল না। এরপরে কী করব, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী, এইসব নিয়ে প্রশ্ন করে গেল আধঘণ্টা ধরে। কী আর বলব!”

“তা তো করবেই,” ভ্রূ বেঁকিয়ে বলে উঠল শতাব্দী, “তুই তো সব প্রফেসরের প্রিয় ছাত্রী। একে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, তার উপরে দেখতে শুনতেও দারুণ। তোর সঙ্গে কথা বলবে না তো কি আমাদের সঙ্গে কথা বলবে?”

“ধ্যাৎ, বাজে বকিস না তো!” হেসে উঠল বনমালা। তারপরে বলল, “অরণ্য কোথায়? ও তো এখনও আসেনি দেখছি। ও-ই তো দেরি করিয়ে দিচ্ছে।”

“ওই যে আসছে ছেলেটা,” আঙুল দেখিয়ে বলে উঠল শতাব্দী। বাকি দুজনও ঘুরে তাকাল সে দিকে।

সাইকেল চালিয়ে আসছে দীর্ঘদেহী ছেলেটা। লম্বা-চওড়া ছেলে অরণ্য। রংটা একটু চাপা। ওই যাকে বলে টিডিএইচ, তার আদর্শ উদাহরণ এই একুশ বছর বয়সের ছেলেটা— টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম!

তিনটি মেয়েই তাকিয়ে রইল এগিয়ে আসা সাইকেল আরোহীর দিকে। আর বনমালা ফিরে যাচ্ছিল সেই অতীতে যখন সে প্রথম দেখেছিল অরণ্যকে। কত

বয়স হবে তখন তাদের? বছর এগারো-বারো। কত দ্রুত যে সময় বয়ে যায় …

.

…তাদের স্কুলটা কো-এডুকেশন ছিল। ক্লাস সিক্স থেকে অনেক নতুন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছিল স্কুলে। তার দাদাও এই স্কুলে পড়ত। দাদার সঙ্গেই সাইকেলে চেপে সে স্কুলে আসত।

স্কুলের নতুন বর্ষ সবে শুরু হয়েছে। অনেক বাচ্চা ভর্তি হয়েছে। তাদের সবার সঙ্গে আলাপ হয়নি বনমালার। তবে তার নার্সারি ক্লাসের দুই বান্ধবী একই সেকশনে রয়েছে। এতেই দারুণ খুশি বনমালা।

সেদিন দাদার সাইকেল থেকে নেমেই জোর ছুট দিয়েছিল সে। কতক্ষণে যে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে! আর তাতেই বিপত্তিটা ঘটে যায়। একটা গাছের শিকড়ে পা বেঁধে দুম করে পড়ে যায় মেয়েটা। ব্যাগ, জলের বোতল সব ছিটকে পড়ে দূরে।

কোনওমতে চোখের জল সামলে উঠে দাঁড়ায় বনমালা। ব্যাগটা তুলে নেওয়ার পরে যখন জলের বোতলটা খুঁজছে, মিষ্টি গলায় কে যেন বলে উঠল, “এই নাও তোমার বোতল।”

সেদিনই প্রথম অরণ্যকে দেখেছিল বনমালা। একটা মিষ্টি দেখতে বাচ্চা ছেলে তার জলের বোতলটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। বোতলটা বনমালার হাতে তুলে দিয়ে ছেলেটা বলেছিল, “তোমার লাগেনি তো?”

.

…পুরোনো কথাগুলো মনে পড়তে নিজের মনেই হেসে ফেলল বনমালা। ছোটোবেলাটাই ভালো ছিল। আর তারপরে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল— সত্যিই কি ভালো ছিল? তাহলে ওই দিনগুলো কেন আসবে, কেন?

অরণার কথায় চটকা ভেঙে বাস্তবে ফিরে এল বনমালা।

“কী রে, আমার জন্য তোরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলি নাকি? সরি, তোদের ওয়েট করালাম।

মেয়ে তিনজন হইহই করে উঠল। তারপরে চারটে সাইকেল রওনা দিল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের বড়ো গেটটার দিকে। তারা এখন সদলবলে যাবে বোলপুর স্টেশনের দিকে। ওখানটায় মেলার মাঠের কাছাকাছি দারুণ এক ফুচকাওয়ালা বসে। ওর কাছ থেকে ফুচকা না খেলে ক্যাম্পাসের মেয়েদের মন ভালো থাকে না। চারটে সাইকেল উড়ে চলল সেদিকে।

অল্প সময়ের মধ্যেই ফুচকাওয়ালাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গেল চারজন। বেশ ভিড় আছে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কোনওমতে চারটে শালপাতার বাটি হাতে পেল ‘ফোর মাস্কেটিয়ার্স’। তারপরেই শুরু হয়ে গেল গপাগপ ফুচকা গলাধঃকরণ।

বরাবর যা হয়ে থাকে, এবারও তাই হল। ফুচকা খাওয়ার ব্যাপারে বনমালা বাকিদের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে থাকে। এদিনও গোটা দশেক খেয়ে হাত তুলে দিল।

“আমার হয়ে গিয়েছে। আর পারব না।”

“সত্যি মালা, তোর দ্বারা কিসসু হবে না। আমাদের শান্তিনিকেতনের সেরা ফুচকা আর তুই কি না দশটা খেয়ে হাত তুলে দিলি!”

“বোলপুরের সেরা ফুচকা,” পাশ থেকে একটা লম্বা মতো ছেলে বলে উঠল, “এটা বোলপুরের সেরা ফুচকা!” চারজনের কেউই জবাব দিল না। জানত, জবাব দিতে গেলেই কথায় কথা বাড়বে।

বনমালা বাটিটা ফেলে রুমালে মুখটা মুছে নিয়েছে, “না রে, সত্যি বলছি আর পারব না।”

মেয়ে দুটো কোনও জবাব না দিয়ে ফুচকা খাওয়া চালিয়ে যেতে লাগল। শুধু থেমে গিয়েছিল অরণ্য। সে এবার এগিয়ে এল বনমালার দিকে।

“খাবি না মানে? আরও একটা তোকে খেতেই হবে,” তেঁতুলজল ভরা একটা ফুচকা মেয়েটার মুখের সামনে এনে ধরল অরণ্য।

“আরে কী করছিস, বলছি তো পারব না। দশটাই বেশি হয়ে গিয়েছে।”

“পারবি না মানে? আমি একটা খাওয়াচ্ছি আর তুই খেতে পারবি না? এত নিষ্ঠুর হয়ে গেলি কবে থেকে?”

উফ, ছেলেটাকে নিয়ে আর পারা যায় না। এই একটা ফুচকা না খেলে নাটক চালিয়েই যাবে। বনমালা আর দেরি করল না। অরণ্যর হাত থেকে ফুচকাটা খেয়েই নিল।

বাকিদের কাউকে টাকা দিতে না দিয়ে নিজেই ফুচকাওয়ালার হাতে টাকাটা গুঁজে দিল অরণ্য। তারপরে চারজন আবার রওনা দিল বোলপুর বাজারের দিকে। কয়েকটা জিনিস কেনার আছে।

চারজনের মধ্যে একজনের মুখটা তখন কিছুটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছে।

.

বাজারের কাছে একটা দোকানের সামনে গিয়ে চারজনেই নেমে পড়ল সাইকেল থেকে।

তারপরে দোকানির কাছে গিয়ে বনমালা জানতে চাইল, “ওই যে পার্কার পেনের সেটটা রাখা আছে, ওটার কত দাম?”

লোকটা একবার ভ্রূ কুঁচকে তাকাল বনামালার দিকে। কিন্তু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। বনমালা আবারও একই প্রশ্ন ছুড়ে দিল। লোকটা এবার বিরক্ত মুখে তাকাল অরণ্যর দিকে। তারপরে জবাব দিল, “সাড়ে তিনশো টাকা।” অরণ্য ঠান্ডা গলায় বলে উঠল, “আমি তো আপনাকে দাম জিজ্ঞেস করিনি। যে জিজ্ঞেস করেছে, তাকে বলুন না দামটা।”

দোকানি এবার একটু গলা চড়াল, “তুমিই বলে দাও না। তাছাড়া আমি যথেষ্ট জোরেই বলেছি, সবাই শুনেছে।”

হঠাৎ করে থমথমে হয়ে উঠল পরিবেশটা। অরণ্যর মুখের দিকে তাকিয়ে বনমালা বুঝে গেল, ঝামেলা লেগে যেতে পারে। সে আর দেরি করল না। সাইকেলে উঠে পড়ে বলল, “ঠিক আছে, আমার লাগবে না। চল এখান থেকে।”

অরণ্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চুপ করে গেল। তারপরে সাইকেলে উঠে পড়ল।

ঘটনাটা চারজনের কাউকেই খুব একটা অবাক করেনি। কিন্তু অরণ্যকে বেশ ধাক্কা দিয়েছিল। সে সাইকেল চালাতে চালাতে প্রশ্ন করল, “এই ব্যাপারটা এখনও কমেনি?”

শতাব্দী জবাব দিল, “না, বিদ্বেষটা এখনও রয়ে গিয়েছে কারও কারও মধ্যে। আমাদের এখনও সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে মেয়েদের।”

কেউ কোনও কথা না বলে ফিরে যেতে লাগল শান্তিনিকেতনের দিকে বোলপুর মিউনিসিপ্যালিটি এলাকা ছেড়ে।

.

দোকানে বসা আরও কয়েকটা লোক ঘটনাটা দেখছিল। তাদের একজন বলে উঠল, “শান্তিনিকেতনের এই ছেলে-মেয়েগুলোর জন্য আমাদের এলাকাটা ডুবতে বসেছে।”

আর একজন সায় দিয়ে বলল, “ঠিকই বলেছ। ওই রকম সব জামাকাপড় পরে ঘুরবে। সিগারেট, বিড়ি, গাঁজা এইসব তো হরদম চলছে। সঙ্গে বাইরে থেকে আরও কত যে নেশার জিনিস আমদানি করছে ওখানকার পড়ুয়াগুলো, কে জানে! এত ভালো একটা জায়গার সর্বনাশ করে দিচ্ছে।”

বছর তিরিশেকের একটা ছেলে চুপ করে বসে দেখছিল ব্যাপারটা। তারপরে একদলা থুতু ছিটিয়ে বলে উঠল, “ওগুলো জন্মভরের ন্যাকা। ওদের মধ্যে একটা মেয়ে তো ছোটোবেলায় আমার দোকানে মুরগি কাটা দেখতে দেখতে কত ন্যাকামিই না করছিল। এখনও ভুলতে পারিনি। তোরা মুরগির মাংস খেয়ে উড়িয়ে দিস আর মুরগি কাটা দেখতেই আপত্তি। যত হারামির দল।”

সবার মুখ থেকেই একরাশ ঘৃণা ঝরে পড়ছিল। ছেলেটার মুখ থেকে একটু বেশি।

1 Comment

এর আগেও একটি অংশ আছে , দয়া করে সেটি যোগ করে দেবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *