প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ২.৫

শান্তিনিকেতন, ২০১৪

“হোমোসেক্সুয়াল? সমকামী? বলছেন কী মশাই!” চেয়ার ছেড়ে প্রায় উঠেই পড়েছিলেন বোলপুর থানার ওসি।

পাড়ুইয়ের বন্ধুদের কাছ থেকে পুরো ব্যাপারটা ভালো করে জেনে নেন সমীরণ দত্ত। তারপরে এসে ব্রিফ করেন ওসি-কে।

“বাব্বা, শান্তিনিকেতনে তো এ সব ব্যাপার দেখাই যেত না। কী যে হচ্ছে এখন!” নিজের মনেই বলে উঠলেন ওসি। তারপরে ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের দিকে ফিরে বললেন, “বাকিটা বলুন।”

সমীরণ দত্ত সব বললেন।

ওই দুই মহিলাকে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে দেখে ফেলে পাড়ুই। সে প্রচণ্ড খেপে গিয়েছিল। বন্ধুদের কাছে এসে সব বলে। এইসব অনাচার শান্তিনিকেতনে সহ্য করতে পারছিল না। দুই মহিলার উপরেই প্রচণ্ড রেগে ছিল।

“সেই রাগে কি খুন করবে?”

সমীরণ দত্ত একটু ভাবলেন। তারপরে বললেন, “দেখুন, এই বোলপুর- শান্তিনিকেতনের মধ্যে একটা বিভাজন তো অনেকদিনেরই। তার উপরে এইরকম ঘটনা হয়তো ওর মাথাটা খারাপ করে দিয়েছিল। তাছাড়া হয়তো খুনের সঙ্গে আরও কিছু করার উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু পারেনি।”

তাঁর অফিসার কী ইঙ্গিত করছেন, বুঝতে সমস্যা হল না ওসি-র।

“মোডাস অপারেন্ডিটা কী বলে মনে হয়?”

“টক্সিকোলজিস্ট-রিপোর্ট এখনও হাতে পাইনি, কিন্তু মনে হচ্ছে, মদে ওই বিষটা পাওয়া যাবে। যে বিষটা চঞ্চল মজুমদারকে খাওয়ানো হয়েছিল।”

“খুনটা কখন হয়েছে? সকালে কি?”

মাথাটা একটু চুলকে নিলেন সমীরণ। “এখানে একটু সমস্যা আছে স্যার। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম। প্রাথমিকভাবে ওর ধারণা, বডি পাওয়ার পাঁচ-ছ’ঘণ্টা কী তারও আগে খুনটা হয়েছে। পেটে কোনও খাদ্য পাওয়া যায়নি। তাছাড়া রাইগর মর্টিস পুরো শরীরেই দেখা গিয়েছে।”

সাধারণত, মৃত্যুর এক-দু-ঘণ্টা পরে রাইগর মর্টিস শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ, শরীরের মাংসপেশি শক্ত হতে শুরু করে। প্রথমে মুখের অংশ থেকে, তারপরে রীরের বাকি অংশে ছড়িয়ে যায়। মৃত্যুর ছয় থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে পুরো শরীরে রাইগর মর্টিস সেট ইন করে যায়।

“তার মানে তো খুনটা রাত্তিরে হয়েছে। এদিকে আপনি অপরাধীকে সকালে পালাতে দেখেছিলেন। এই কেস দাঁড়াবে কী করে?”

“স্যার, আমার একটা থিওরি আছে। মনে হয়, রাতে খুনটা করে পালায় পাড়ুই। ও জানত, বাড়িতে মহিলা একাই থাকছে এখন। রান্নার মহিলাকেও ছুটি দেওয়া হয়েছে। তাই পরের দিন সকালে আবার হাজির হয়েছিল ওই বাড়িতে। যদি কিছু হাতানো যায়। যে ব্যাগে ঈপ্সিতা টাকা রাখতেন, সেই ব্যাগটা পুরো খালি। এটা শোভনা জানিয়েছে আমাদের।”

ওসি ভাবতে লাগলেন। এটা একটা বড়ো কেস হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরপর দুটো খুন একই ভাবে। দ্রুত খুনিকে ধরতে না পারলে তাঁর কপালে দুঃখ আছে। ইতিমধ্যেই এসপি-র ফোন এসে গিয়েছে। সমীরণের দিকে তাকিয়ে ওসি বললেন, “এই কেসে মার্ডার ওয়েপনটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। ওই অস্ত্রটা পাওয়া না গেলে কেস দাঁড়াবেই না।

“হ্যাঁ স্যার, সেটা বুঝতে পেরেছি। আমার আর একটা কথা মনে হচ্ছে।”

“কী?”

“পাড়ুই সম্ভবত তাড়াহুড়োয় অস্ত্রটা খুনের জায়গায় ফেলে এসেছিল। মনে পড়তে আবার সকালে ফিরে যায় নিয়ে আসতে।”

“পসিবল,” মাথা নাড়লেন ওসি, “তাহলে অপরাধীর স্বীকারোক্তি আর অস্ত্র, এই দুটো লাগবেই কেসটা তৈরি করতে।” কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন ওসি। সমীরণ দত্ত দাঁড়িয়েই ছিলেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে ওসি বললেন, “আমাকে এখনই এসপি-র ওখানে যেতে হবে। জরুরি তলব। সব কিছু জানাতে হবে। প্রয়োজনে হয়তো সাংবাদিক বৈঠক করে সাসপেক্টের কথাও বলতে হবে। আপনি এই দিকটা সামলান।”

“ওকে স্যার,” সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জবাব দিলেন ইন্সপেক্টর সমীরণ দত্ত।

“আর একটা কথা মনে রাখবেন দত্তবাবু,” অফিসারের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা শেষ করলেন ওসি, “অপরাধীকে আমার চাই। যেভাবেই হোক। আর খুব দ্রুত। বুঝতে পেরেছেন?”

“হ্যাঁ স্যার,” মাথা নাড়লেন সমীরণ দত্ত। তিনি বুঝে গিয়েছেন তাঁর সিনিয়র কী ইঙ্গিত করছেন।

ওসি বেরিয়ে যাওয়ার পরে সাব-ইন্সপেক্টর প্রণব দাসের দিকে ফিরে নির্দেশ দিলেন সমীরণ দত্ত, “প্রণববাবু, আপনি ওই ছবিটার প্রিন্ট করিয়ে আপনার লোকেদের দিয়ে দিন। বোলপুর-শান্তিনিকেতন আর তার আশপাশের এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজুক ওরা। ওই পাড়ুইকে আমার চাই।”

.

দ্বিতীয় খুনের পর থেকেই আতঙ্কের চাদরে ঢাকা পড়ে গেল শান্তিনিকেতন। বাচ্চাদের বাড়ি থেকে বেরোনো নিষিদ্ধ হয়ে গেল। ফতোয়া জারি হয়ে গেল, স্কুলেও আপাতত যেতে হবে না। সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা লাগল চার বন্ধুর মনে। বিশেষ করে অরণ্যর। তাহলে কী হবে? সে মালাকে দেখতে পাবে না আর? প্রচণ্ড একটা কষ্ট বুকের মধ্যে চেপে বসতে লাগল অরণ্যর।

প্রায় একই ধরনের কষ্ট পাচ্ছিল শতাব্দীও। অরণ্যকে সে দেখতে পাবে না। তবে একটু খুশিও হয়েছিল। ওই বনমালাও তো অরণ্যর কাছে আসতে পারবে না। ওরা দুজন কাছাকাছি এলে তার একটুও ভালো লাগে না।

বনমালার অবস্থা আরও সঙ্গীন। বন্ধুরা দূরে সরে যাওয়ার একটা যন্ত্রণা তো আছেই, তার চেয়েও বড়ো হয়ে চেপে বসেছে একটা আতঙ্ক। ঘুমোতে পর্যন্ত ভয় পাচ্ছে মেয়েটা। রাতে অনেকটা সময় জেগে থাকছে আর ভয়ে কাঁপছে। ঘুমোলে যদি স্বপ্নটা আবার দেখে!

এই সময় তাকে বুকে করে আগলে রাখল দাদা। প্রায় সব রাতেই চুপিচুপি এসে বোনের পাশে শুয়ে পড়ত। দিনের বেলাতেও কখনও চোখের আড়াল করত না। বাড়ি থেকে বেরোনোও বন্ধ হয়ে গেল বনমালা আর তার বন্ধুদের।

.

ছোটো ছেলেমেয়েগুলো বুঝলও না তাদের প্রিয় শহরে যে আগুন লেগেছে, তার আঁচ গিয়ে পড়েছে দেশের রাজধানীতেও।

.

খুনের চার দিনের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ধাক্কাটা খেলো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। আবার ফাঁস হয়ে গেল টক্সিকোলজিস্টের রিপোর্ট। গালাগালি করতে করতে কাগজগুলোয় চোখ বোলাচ্ছিলেন সমীরণ দত্ত। নিশ্চয়ই ডিপার্টমেন্টে তাঁর অ্যান্টি-পার্টির কেউ খবরগুলো পাচার করে দিচ্ছে প্রেসের কাছে।

.

সংবাদমাধ্যমে ওঠা একটা প্রশ্ন উত্তাল করে তুলল সাধারণ মানুষ থেকে নেতা, মন্ত্রীকে-

কবিগুরুর শহরে কি সিরিয়াল কিলারের আবির্ভাব হল?

‘রক্তকরবী মার্ডারস’ নামের শিরোনাম দিয়ে প্রকাশিত হতে লাগল একটার পর একটা শিহরন জাগানো প্রতিবেদন। তুলে ধরা হল করবী বিষের কথা। তুলে ধরা হল খুনের নৃশংসতার কথা। বলা হতে লাগল, দুজন নিরীহ কৃতি ব্যক্তিকে কী ভয়ংকর পদ্ধতিতে খুন করা হয়েছে। একজন শিক্ষাবিদ। অন্যজন নৃত্যশিল্পী।

মিডিয়া তোলপাড় ফেলে দিল সাড়া জাগানো সব প্রশ্ন তুলে—

কে এই ভয়ংকর, নরাধম, উন্মাদ খুনি? তার পরের শিকার কে হতে চলেছে?

.

প্রতিবেদনগুলো ঘুম ছুটিয়ে দিল পুলিশের। আর সাধারণ মানুষের মনে বইতে লাগল আতঙ্কের স্রোত। কেঁপে উঠল শান্তিনিকেতন।

.

এখানেই শেষ নয়। আন্তর্জাতিক নিউজ হয়ে গেল শান্তিনিকেতনের হত্যাকাণ্ড।

বিদেশের বেশ কয়েকটা কাগজে জায়গা করে নিল শান্তিনিকেতনের হত্যালীলা।

“টেগোর্স অ্যাবোড টেররাইজড বাই আ সিরিয়াল কিলার।” লিখল বিলেতের একটি নামী সংবাদপত্র।

ইংল্যান্ডের আর একটি বিখ্যাত সংবাদপত্র তো শিরোনামই করে দিল-–

ওলিয়েন্ডার মার্ডারস অ্যাট দ্য অ্যাবোড অব পিস!

.

জোড়া খুনের ধাক্কায় ততদিনে উত্তাল হয়ে উঠেছে শান্তিনিকেতন। রাজনীতিবিদ থেকে শিল্পী, গায়ক থেকে নায়ক, প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছেন সবাই। স্বপ্নের শান্তিনিকেতনকে অশান্ত হতে দেবেন না তাঁরা। পুলিশের ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি হতে লাগল। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে ফোন চলে এল বীরভূমের পুলিশ সুপারের কাছে। খুব দ্রুত ফল চাই। নাহলে রাজ্য সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এরই মধ্যে আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন স্বয়ং দেশের রাষ্ট্রপতি। শান্তিনিকেতনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

.

এইরকম টালমাটাল পরিস্থিতি সামলাতে রাজ্য সরকারের চাপ এবং পরামর্শমতো সাংবাদিক বৈঠক ডাকার কথা ঘোষণা করলেন বীরভূমের এসপি। তাঁর সামনে আর কোনও রাস্তা ছিল না। এখনই কিছু না বললে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। তার আগে অবশ্য সব কিছু খুলে বললেন রাজ্যের মুখ্য সচিবকে। উপরমহল থেকে সবুজ সংকেত আসতেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন এসপি।

.

“আমরা দোষীকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। দেশজুড়ে তার সন্ধান চলছে। তদন্তের স্বার্থে তার নাম জানানো যাচ্ছে না। কিন্তু আপনারা নিশ্চিত থাকুন, অল্পদিনের মধ্যেই দোষী ধরা পড়বে।”

এর পরে এসপি ব্যাখ্যা দিলেন, পুলিশের হাতে কী কী প্রমাণ আছে।

১) গভীর রাতে খুনটা হয়। মার্ডার ওয়েপন পাওয়া গিয়েছে। ঘটনাস্থলের কাছ থেকেই সেটা উদ্ধার করা হয়েছে। একটা মাঝারি সাইজের ছুরি। ছুরির রক্তের সঙ্গে ভিকটিমের রক্ত মিলে গিয়েছে।

২) ভিকটিমের ঘরে দুষ্কৃতীর হাতের ছাপ মিলেছে। এমনকী, মানিব্যাগেও। মার্ডার ওয়েপনেও একই ছাপ পাওয়া গিয়েছে।

৩) লোকটির গাছ-গাছড়ার সম্পর্কে জ্ঞান যথেষ্ট। যে কারণে রক্তকরবীর বিষের ব্যাপারটা জানা ছিল তার।

৪) দুটো খুনের ক্ষেত্রেই ভিকটিমের বাড়িতে অবাধ যাতায়াত ছিল লোকটির। ফলে কেউ কোনও সন্দেহ করেনি।

৫) অভিযুক্তের বাড়ি তল্লাশি করে করবী গাছের পাতা উদ্ধার করা গিয়েছে। একটি কেটলি পাওয়া গিয়েছে, যার মধ্যে পাতার টুকরোও পাওয়া যায়।

৬) দ্বিতীয় খুনের সময় ভিকটিমের বাড়ি থেকে পালাতে দেখা গিয়েছে অভিযুক্তকে।

.

ব্রিফিং শেষ হতে না হতেই সাংবাদিকদের তরফ থেকে একটার পর একটা প্রশ্ন আসতে শুরু করে।

“এটা কি তাহলে সিরিয়াল কিলিং?”

“পুলিশ সেটা মনে করছে না। একই রকমের মোডাস অপারেন্ডি হলেও এটা সিরিয়াল কিলিংয়ের ব্যাপার নয়। অভিযুক্ত লোকটি ওই দুই ভিকটিমের উপরে কোনও কারণে খেপে ছিল। রাগে প্রায় উন্মাদ হয়ে এই কাণ্ড ঘটায়।”

“রক্তকরবীর বিষ ব্যবহারের মতো অভিনব পদ্ধতি কী কারণে নেওয়া হয়েছে?”

“আগেই বলা হয়েছে, লোকটির গাছ-গাছড়া সম্পর্কে জ্ঞান আছে। জানত, করবী গাছের বিষ মারাত্মক। আর জোগাড় করতেও সমস্যা হবে না। যে কারণে ওই বিষটা বেছে নেয়।”

“রাগের বশে যদি এইরকম নারকীয় দুটো খুন করে, তাহলে তো এই লোক বদ্ধ উন্মাদ। এই উন্মাদকে ধরতে না পারলে তো শান্তিনিকেতনের মানুষ সন্ধ্যা নামলে রাস্তায় বেরোতেই পারবে না।”

এটা ঠিক প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু এটাই আপাতত শান্তিনিকেতনের মানুষের মনের ভাব। এসপি সবাইকে আশ্বস্ত করলেন— “আপনারা কেউ দুশ্চিন্তা করবেন না। অপরাধী ঠিক ধরা পড়ে যাবে।”

.

এসপি-র কথা পুরো ঠিক হল না। জয়দেব পাড়ুইকে জীবিত ধরতে পারল না পুলিশ। তার বদলে গুলিতে ঝাঁঝরা পাড়ুইয়ের শরীরটা শুয়ে রইল বোলপুর হাসপাতালের মর্গে।

.

সপ্তাহখানেক পরে আরও একটা সাংবাদিক বৈঠক ডাকলেন এসপি। যেখানে পুলিশের সাফল্যের কাহিনিটা ফলাও করে তুলে ধরলেন তিনি—

“অপরাধীর সন্ধান এই শান্তিনিকেতনের বুকেই পেয়ে যায় পুলিশ। কিন্তু সামান্য অসতর্কতার জেরে জাল কেটে পালিয়ে যাচ্ছিল জয়দেব পাড়ুই। বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও সে ধরা দিতে চায়নি। তখন বাধ্য হয়ে পুলিশের তরফে গুলি চালানো হয়। তাতেই মৃত্যু হয় জয়দেব পাড়ুইয়ের।”

সুপার আরও জানান, ফরেন্সিক রিপোর্ট অনুযায়ী, পাড়ুইয়ের বাড়ির কেটলিতে ওলিয়েন্ড্রিন পাওয়া গিয়েছে। ওই কেটলির জলে করবীর পাতা ফুটিয়ে বিষ তৈরি করা হয়েছিল। তারপরে সেটা মদের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

মার্ডার ওয়েপনে পাড়ুইয়ের হাতের ছাপও মিলেছে। কীভাবে ওই অস্ত্র উদ্ধার করা হয়, তাও জানায় পুলিশ। দ্বিতীয় ভিকটিমের বাড়ি থেকে কিছু দূরে ওই ছুরিটা পাওয়া যায়। পাড়ুই ভয় পেয়ে পালানোর সময় অস্ত্রটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। অস্ত্রে লেগে থাকা রক্তের সঙ্গে ভিকটিমের রক্তের ‘ব্লাড ম্যাচ’ হয়েছে।

.

যে কোনও অপরাধীকে শনাক্ত করার ব্যাপারে এই ‘ব্লাড ম্যাচিং’ অত্যন্ত জরুরি। যে কারণে ভিকটিমের রক্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে সংরক্ষিত করে রাখতে হয় তদন্তকারী দলকে। সাধারণত দু-রকম পদ্ধতিতে এই ব্লাড ম্যাচিং হয়। একটি, আরএফএলপি ডিএনএ অ্যানালিসিস— রেস্ট্রিকশন ফ্র্যাগমেন্ট লেংথ পলিমরফিজম। অন্যটি, পিসিআর ডিএনএ অ্যানালিসিস— পলিমেরেস চেন রিঅ্যাকশন।

খুব সোজা কথায়, এই দুটো পদ্ধতি দিয়ে দুটো ব্লাড স্যাম্পলের ডিএনএ ম্যাচিং হয়। যা আদালত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য করে।

.

“দুজন ভিকটিমই অপরাধীর খুব পরিচিত। বলা যায়, পাড়ুইকে তারা পছন্দ ও করত। ফলে কেউ কোনও সন্দেহ করেনি।”

খুনের সময় নিয়ে পুলিশ অফিসার বলেন, “দ্বিতীয় খুনটা গভীর রাতে হয়েছিল। মহিলা একাই বাড়িতে ছিলেন। সেই সুযোগে পাড়ুই তাঁকে খুন করে। পরের দিন ভোরে আবার সে ফিরে এসেছিল ঘটনাস্থলে। তখনই তাকে দেখে ফেলে ভিকটিমের বন্ধু।”

প্রশ্ন ওঠে, খুনি আবার কেন পরেরদিন সকালে ফিরে এল স্পটে?

এসপি: আমরা নিশ্চিত, রাতে খুন করে পালানোর সময় প্রকৃতিস্থ অবস্থায় ছিল না পাড়ুই। সম্ভবত মদ খেয়ে ছিল। ছুরিটা ফেলে যায়। পরের দিন মনে পড়ায় সকালে ফিরে এসেছিল। সে জানত, বাড়ি ফাঁকা। কেউ নেই। বাড়ির কাজের মাসি পাড়ুইয়ের পরিচিত। তার থেকেই ভিকটিমের একা থাকার খবরটা পেয়েছিল পাড়ুই।

.

তুমুল হট্টগোলের মধ্যে শেষ হল সাংবাদিক বৈঠক। প্রশ্ন আরও বাকি ছিল সাংবাদিকদের, কিন্তু করার সময় পাওয়া গেল না। সবাই ছুটল কপি ফাইল করতে।

পরের দিন সব কাগজের প্রথম পাতায় চলে এল খবরটা—

“রক্তকরবী মার্ডারসের পর্দা ফাঁস। পুলিশের গুলিতে নিহত খুনি!”

পুলিশ, প্রশাসন, শিল্পী, রাজনীতিবিদ— সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। যাক, খুনির শাস্তি হয়েছে!

শান্তিনিকেতন আবার শান্ত হয়েছে।

.

দুজন শুধু অনেক অনেক দিন পর্যন্ত মারাত্মক টেনশনে ছিল। দুজনেই প্রার্থনা করত, ওই ভয়ংকর সময়টা যেন আর ফিরে না আসে।

একজন, মধ্য পঞ্চাশের সমীরণ দত্ত। অন্যজন, বছর চোদ্দোর বনমালা সিংহ।

তাদের প্রার্থনা শুনেছিলেন ঈশ্বর। রক্তকরবী মার্ডারস ক্রমে ধূসর হয়ে এল মানুষের স্মৃতি থেকে। বনমালাও আর সেই স্বপ্নটা দেখল না।

লোকে ভুলে গেল সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলোকে। সমীরণ দত্ত আর বনমালা সিংহও।

দুজন শুধু ভুলল না। তাদের মনে দগদগে ঘায়ের মতো থেকে গেল শান্তিনিকেতনের এই হত্যাকাণ্ড।

.

সময় বয়ে চলল। সমীরণ দত্ত অবসর নিলেন। বনমালা সিংহ কলেজে ভর্তি হল। দুজনের জীবনই এগিয়ে চলল একটা নির্দিষ্ট গতিপথ ধরে।

তারপরে ঝড় উঠল! ২০২১ সালের এক রাতে। এক ভয়াল, ভয়ংকর ঝড়!

আর জীবনটাই বদলে গেল সবার!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *