প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ৩.১

শান্তিনিকেতন, ২০২১

জয়ন্ত গ্রেফতার হওয়ার দু-দিন পরে। আদালতের নির্দেশে ১৪ দিন পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে আসামিকে।

.

নিজের ঘরে শর্মিষ্ঠা বসুকে ডেকে নিয়েছিলেন ওসি প্রণব দাস। তারপরে জানতে চাইলেন, “আপনার কি কোনও কারণে সন্দেহ হয়েছিল জয়ন্তের উপরে? নাকি ইনস্টিংক্টের উপরে নির্ভর করে এগিয়েছিলেন?

অল্প হেসে শর্মিষ্ঠা জবাব দিলেন, “পুলিশ ইনস্টিংক্ট তো একটা কাজ করেই। তাছাড়া আমার সন্দেহটাও বাড়ছিল।” এরপরে শর্মিষ্ঠা তাঁর তদন্তের গতিপ্রকৃতি বুঝিয়ে বলেন—

সিংহবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পরে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে যায়। এই বাড়ির সদস্যরা অনেক কথা গোপন করছে। ফলে সন্দেহের তিরটা ওইদিকে ছিলই। বিশেষ করে যখন প্রবীর সেনের সঙ্গে দীনেন্দ্র সিংহের অতীতের পরিচয়টা সামনে চলে আসে।

এরপরে খুনের সার্কল আর অস্ত্রের উপরে নজর যায়। সাত বছর আগের দুটো খুন হয় সিংহবাড়ির কয়েক কিলোমিটার রেডিয়াসের মধ্যে। কিন্তু বর্তমানে খুন দুটো হয়েছে বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে। কেন?

অস্ত্রটাও বদলে গেল কেন? তার মানে কি সেই অস্ত্রটা আর খুনির কাছে ছিল না? ছুরি দিয়ে যদি এখনই খুন করতে হয়, তাহলে আগে ছুরির ব্যবহার করা হয়নি কেন?

এই দুটো প্রশ্নের জবাব একটাই হতে পারে।

সাত বছর আগে যে খুনগুলো করেছিল, তার বয়স বেশি ছিল না। সে তাই বাড়ির কাছাকাছিই থাকত। সাত বছর পরে সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে। বাড়ি থেকে দূরে যেতে সমস্যা হয় না।

অস্ত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা। তখন ছুরি হাতে পায়নি। এমন একটা অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যেটা সে সহজে পেয়েছিল। বিষটাও তাই।

এই থিওরির উপরে নির্ভর করে তিনজনের নাম সামনে চলে আসছিল জয়ন্ত, অরণ্য এবং বনমালা। তবে শেষ দুজনের বয়স খুবই কম ছিল। ওই রকম নৃশংসভাবে খুন করা ওই বাচ্চাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তার উপরে মদে বিষ মিশিয়ে খাওয়ানো।

কিন্তু ওই তিনজন অতীতে ছিল, বর্তমানেও আছে। আরও একটা ব্যাপার মাথায় ছিল। অরণ্য ফিরে আসার পরেই শান্তিনিকেতনে আবার দুটো খুন হয়। আর এখন ও প্রাপ্তবয়স্ক। শক্তিশালী ছেলে। তাই ওর নামটা আমার মাথায় ছিল। সেক্ষেত্রে মনে হয়েছিল, অতীতের খুনগুলো অরণ্য করেনি। কিন্তু এই দুটো করেছে। আর জয়ন্ত তো সন্দেহভাজন তালিকায় একেবারে উপরেই ছিল।

তারপরে কোপাইয়ের তীরে যখন সজল পালের বন্ধু বনমালা আর অরণ্যের নাম করে, তখন ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। সজল বলেছিল, ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারব।’ অরণ্য ওকে আলাদা করে ডাকবে না। আর ডাকলেও সজল একা যাবে না। এমন কেউ ডেকেছিল, যে ওকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ করে দিত। পাশাপাশি টাকাটাও পেত। তাই লোভ সংবরণ করতে না পেরে চলে আসে সজল। এক ঢিলে দুই পাখি মারতে। টোপটা দারুণ ফেলেছিল জয়ন্ত।

দুটো বাড়িতেই রেইড করতাম। কিন্তু জয়ন্তর বাড়ি থেকেই অস্ত্রটা পেয়ে যাই। আর আসামিকে।

“বাহ, খুব ভালো ডিডাকশন,” বলে উঠলেন প্রণববাবু। তারপরে বললেন, “তবে কাজ এখনও শেষ হয়নি। আপনার থিওরি অনুযায়ী, সাত বছর আগের খুন দুটোও জয়ন্ত করেছে। এর মানেটা বুঝতে পারছেন আপনি?”

“পারছি।”

শর্মিষ্ঠার দিকে একটু সময় তাকিয়ে প্রণব দাস বললেন, “যদি সাত বছর আগের খুনগুলোও জয়ন্ত করে, তাহলে বড়ো ঝামেলা হয়ে যাবে। তোলপাড় পড়ে যাবে গোটা দেশে। কাঠগড়ায় চড়বে তখনকার বীরভূমের এসপি আর সমীরণ দত্ত।”

শর্মিষ্ঠা জানতেন, জয়ন্তের স্বীকারোক্তির উপরে অনেককিছু নির্ভর করছে। জানতে হবে মোটিভটাও। কেন খুনগুলো করেছিল জয়ন্ত? কেস দাঁড় করাতে গেলে সেটা জানাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জয়ন্তকে এখন আবার জেরা করতে হবে।

.

একটা টুলের উপরে বসেছিল জয়ন্ত। তার উলটো দিকে শর্মিষ্ঠা আর ওসি। সঙ্গে আরও দুজন। জয়ন্তর বক্তব্য নথিবদ্ধ করার জন্য। ক্রাইম সিনগুলোও রিকনস্ট্রাক্ট করতে হবে। এখন মৌখিকভাবে, পরে স্পটে গিয়ে।

শর্মিষ্ঠার কেন জানি না মনে হচ্ছিল, জয়ন্ত কোনও কিছু গোপন করবে না। সবই বলে দেবে।

জেরা শুরু করলেন শর্মিষ্ঠা।

“কী ভাবে সজল পালকে মেরেছিলে তুমি?

একবার অফিসারের মুখের দিকে তাকাল জয়ন্ত। তার চোখে একরাশ শূন্যতা।

তারপরে বলা শুরু করল—

“সজলের উপরে আমার অনেকদিনের রাগ ছিল। জানতাম, মালা আর অরণ্যের সঙ্গে ওর ঝামেলা লেগেছিল। ছেলেটা খুবই খারাপ প্রকৃতির। অরণ্যকে ও ছেড়ে দিত না। হয়তো মালারও ক্ষতি করত। সেই ঝুঁকিটা আমি নিতে চাইনি। ওকে টোপ দিয়ে সন্ধ্যার পরে কোপাইয়ের পাড়ে ডেকে আনি। তারপরে খুনটা করি। ওকে বলেছিলাম, অরণ্য ছেলেটাকে মারার জন্য মোটা টাকা দেব।”

“মদে কি করবীর বিষ মেশানো ছিল?”

“হ্যাঁ মিশিয়েছিলাম। কিন্তু সজল সুস্থ-সবল ছেলে। বিষের প্রতিক্রিয়া ওর উপরে ভালোভাবে হচ্ছিল না। তাই পাথর দিয়ে আঘাত করে ওকে অজ্ঞান করে দিই। তারপরে ছুরি দিয়ে খুনটা করি।”

“খুনের পরে ছুরিটা সঙ্গে রেখেছিলে কেন?”

“খুনটা করার পরে আমি দূর থেকে কয়েকজনের কথার আওয়াজ পাই। তাই আর ঝুঁকি নিইনি। ব্যাগে ভরে পালিয়ে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, পরে ফেলে দেব।” কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপরে শর্মিষ্ঠা প্রশ্ন করলেন, “প্রবীর সেনকেও তুমি মেরেছ?”

“হ্যাঁ এবং একই পদ্ধতিতে। প্রবীর সেন এমনিতেই মাতাল ছিল। বয়স হয়েছিল। দ্রুত বিষের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। তারপরে মারতে অসুবিধে হয়নি। পরে ছুরিটা আমি কোপাইয়ের জলে ফেলে দিই।”

“ছবিগুলো তুমি নিয়ে এসেছিলে?”

“হ্যাঁ, যাতে ছবিগুলো দেখে কেউ বনমালার খোঁজ না পায়। আমিই লাল জ্যাকেট পরেছিলাম। পরে নষ্ট করে দিই জ্যাকেটটা। ছবিগুলোও।”

স্থিরদৃষ্টিতে জয়ন্তের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন শর্মিষ্ঠা। তারপরে ধীরে ধীরে বললেন, “আর সাত বছর আগের দুটো খুন? সে দুটোও তুমি করেছিলে?”

“হ্যাঁ, আমিই খুন করেছিলাম। চঞ্চল আর ঈপ্সিতাকে আমিই মেরেছিলাম।”

শর্মিষ্ঠা বাদে চমকে উঠলেন ঘরে থাকা বাকি সবাই।

প্রণববাবু উত্তেজিত ভাবে বললেন, “কী করে মারলে? তোমার তো তখন বোধহয় বছর ষোলো বয়স!”

“সতেরো হয়ে গিয়েছিল। ওদের খুন করার পক্ষে যথেষ্ট।” জয়ন্তর নির্বিকার, ঠান্ডা গলা সবাইকে কাঁপিয়ে দিল।

এ তো সাইকোপ্যাথের গলা। চারটে খুন করার পরেও এইরকম নির্বিকার। মনে কোনও ছাপই পড়েনি।

প্রণববাবু ভাবছিলেন অন্য কথা। জয়ন্তর এই স্বীকারোক্তি সামনে চলে এলে বীরভূম পুলিশের আর মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না। একজন নিরপরাধ লোককে গুলি করে মারা হয়েছিল সেদিন!

“কীভাবে মেরেছিলে?” প্রশ্ন করলেন শর্মিষ্ঠা।

“ওই একইভাবে। ছোটোবেলা থেকেই আমি খুন করার ওই পদ্ধতিটা বেছে নিই। প্রথমে সুযোগ পেয়ে মদের সঙ্গে করবীর বিষ মিশিয়ে দিতাম। ওরা নেতিয়ে পড়ত। তারপরে খুনটা করতাম। চঞ্চল এবং ঈপ্সিতার ক্ষেত্রে একই ব্যাপার হয়েছিল। ওরা শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল ছিল, অসুস্থ ছিল। ওদের শরীরে বিষক্রিয়া খুব তাড়াতাড়ি শু হয়ে যায়। আমি যখন ছিন্নভিন্ন করছিলাম চিৎকার করে ওঠার ক্ষমতাও ছিল না ওদের।

“মদে বিষ মেশানোর সুযোগ পেয়েছিলে?”

“হ্যাঁ পাব না কেন। যখন মেশাই, তখন ওরা প্রায় নিজেদের মধ্যে ছিল না। কী হচ্ছে না হচ্ছে, খেয়ালও করছিল না। বিষটা মিশিয়ে আমি অপেক্ষায় থাকতাম। তারপরে সুযোগ পেলেই কাজটা করতাম। আর দুজনের বাড়িই আমাদের বাড়ির খুব কাছে। নজর রাখতে সমস্যা হয়নি।”

আবার সেই ঠান্ডা গলা। শর্মিষ্ঠার মনে হচ্ছিল, জয়ন্ত মানসিকভাবে পুরো তৈরি হয়ে আছে।

“করবীর বিষের ব্যাপারটা বাবার থেকে শুনেছিলে?”

শর্মিষ্ঠার প্রশ্নে মাথা নেড়ে জয়ন্ত বলল, “হ্যাঁ, ছোটোবেলা থেকে বাবা যে কতবার ওই বিষাক্ত গাছটা নিয়ে সতর্ক করে দিয়েছিল, ইয়ত্তা নেই। বিষের ব্যাপারটা তাই আমার মাথায় ছিল।”

“আর অস্ত্র? কী দিয়ে মেরেছিলে?”

“কেন, ছুরি দিয়ে। আপনি তো ছুরিটা পেয়েই গিয়েছেন। প্রথমটা আমি নদীর জলে ফেলে দিয়েছি। ওটা পাবেন না।”

শর্মিষ্ঠা একটু ভাবলেন। তারপরে প্রশ্নটা করলেন—

“প্রত্যেকবার এই ধরনের ছুরি দিয়েই খুন করতে?”

প্রশ্নটা করে শর্মিষ্ঠা তাকিয়ে রইলেন জয়ন্তর মুখের দিকে। অতীতের খুনগুলো নিয়ে ছেলেটা সত্যি বলছে না মিথ্যে, এবার বোঝা যাবে। জয়ন্তর উত্তরের উপরে অনেকের জীবন নির্ভর করছে। আর পুলিশের সম্মান।

“নাহ, ছোটোবেলায় অন্য অস্ত্র ব্যবহার করেছিলাম।” শর্মিষ্ঠা বুঝতে পারলেন, পুলিশের সম্মান ধুলোয় মিশতে চলেছে।

“কী অস্ত্র ব্যবহার করেছিলে?”

“মায়ের সেলাইয়ের কাঁচি। একটা বড়ো কাঁচি ছিল মায়ের। কাপড়ের পিস কেটে আমার জন্য জামা বানিয়ে দিত ছোটোবেলায়। আমাদের স্টোররুমে রাখা ছিল। ওই কাঁচি দিয়েই মারি ওদের দুজনকে।

বিস্ফারিত চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন প্রণব দাস এবং শর্মিষ্ঠা বসু। তারপরে নিজেকে সামলে আরও একটা প্রশ্ন করলেন শর্মিষ্ঠা—

“সেই কাঁচিটার কী হল? এখনও তোমাদের বাড়িতে আছে?”

“নাহ, কবে কোপাইয়ের জলে ভাসিয়ে দিয়েছি,” বলে হেসে উঠল জয়ন্ত। মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বইয়ে দেওয়ার মতো হাসি।

আবার ক্ষণিকের নীরবতা। তারপরে শোনা গেল শর্মিষ্ঠার গলা-

“কেন মেরেছিলে ওই দুজনকে? কী দোষ করেছিল চঞ্চলবাবু আর ঈপ্সিতা?” এবার জয়ন্ত ঠান্ডা চোখে তাকাল শর্মিষ্ঠার দিকে। আর সে রকমই ঠান্ডা স্বরে জবাব দিল, “ইচ্ছে হয়েছিল, তাই মেরেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, ওরা ভালো লোক নয়, তাই মেরেছিলাম। আমি সমাজেরই ভালো করেছিলাম।”

.

লকআপ থেকে বেরিয়ে আসার পরে প্রণবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী মনে হয়, জয়ন্ত সত্যি বলছে?”

“হ্যাঁ স্যার। না হলে ওইভাবে খুনের কথাগুলো বলতে পারে না। বিশেষ করে অস্ত্র বদলের ব্যাপারটা। আর কারও পক্ষে তো জানা সম্ভবই নয়, যে অতীতে একরকম অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে আর বর্তমানে আর একরকম। আর অস্ত্রটাও দেখুন। ওর মায়ের কাঁচি। যে কারণে হিল্ট মার্ক পাওয়া যায়নি।”

“তার মানে আর কোনও দ্বিতীয় ব্যক্তি এই ঘটনায় জড়িয়ে নেই বলছ?”

দৃঢ় গলায় শর্মিষ্ঠা বললেন, “একমাত্র খুনির পক্ষেই এত কথা জানা সম্ভব। চারটে খুনই জয়ন্ত করেছে, আর ঠান্ডা মাথায় করেছে।”

ঘাম মুছে নিলেন প্রণববাবু। এই স্বীকারোক্তির পরে একটা ঝড় আছড়ে পড়ল বলে। সেই ঝড় সব কিছু লন্ডভন্ড করে দেবে। কেন যে ওই জয়ন্ত শুয়োরটা বছর দুয়েক পরে খুনগুলো করল না! ততদিনে তাঁর চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যেত!

শর্মিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে প্রণববাবু বলে উঠলেন, “এ তো পাকা সাইকোপ্যাথ। একেবারে জানোয়ার। কীভাবে নিরীহ মানুষগুলোকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। আর কোনও অনুতাপও নেই।”

সায় দিলেন শর্মিষ্ঠা, “সত্যিই তাই। আদর্শ সাইকোপ্যাথ সিরিয়াল কিলারের প্রোফাইল। এই ছেলেটা ধরা না পড়লে আরও খুন করত। ‘

“তবে মোটিভটা পরিষ্কার হল না,” একটু খুঁতখুঁত করে উঠলেন প্রণববাবু।

“আসলে কী জানেন স্যার,” বোঝানোর চেষ্টা করলেন শর্মিষ্ঠা, “একজন সাইকোপ্যাথ কিলারের মনের খোঁজ পাওয়া খুবই কঠিন। ওদের চোখে কে দোষী আর কে নয়, সেটা ওরা ছাড়া কেউ জানে না।”

“ঠিকই বলেছেন আপনি,” মানতে বাধ্য হলেন সিনিয়র অফিসার।

“আপনি খুব ভালো কাজ করেছেন,” বলে শর্মিষ্ঠার পিঠটা চাপড়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন প্রণব দাস।

.

জয়ন্তর যখন জেরা চলছে, প্রায় একই সময় তখন অরণ্যের বাড়িতে বনমালাকে নিয়ে বসেছেন কমলেশ রায়। তাঁর মনেও অনেকগুলো প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে। সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নটা হল—

বনমালা কি সাইকিক?

.

বনমালা তখন অন্য একটা জিনিস বোঝানোর চেষ্টা করছে দুজনকে।

“আপনারা কেন বিপদটা বুঝতে পারছেন না? আবার কেউ খুন হবে। মুখটা আমি দেখতে পাচ্ছি না শুধু।”

“আমি বা অরণ্য যে খুন হব, এটা তুমি বলছ কী করে? স্বপ্নে তো এবার মুখ বুঝতে পারোনি!”

“মুখ দেখিনি তো কী হয়েছে,” কাতর স্বরে বলে উঠল বনমালা, “বাকি যারা খুন হয়েছে, তারাও আমার খুবই পরিচিত ছিল। একটা মনের যোগ গড়ে উঠেছিল তাদের সঙ্গে। আর তাদেরকেই খুন হতে দেখি। এই শান্তিনিকেতনে আপনারা দুজন ছাড়া এখন আর কারা আছে, যাদের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে?” চোখটা নামিয়ে বলল বনমালা।

এইরকম অন্ধকার সময়ও অরণ্যের মনটা আলোকিত হয়ে উঠল। বনমালা তাহলে স্বীকার করছে, তাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে! এর মানে হল, তার লক্ষ্যপূরণ হতে চলেছে। সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “তুই ঘাবড়াস না। আমাকে কেউ খুন করতে পারবে না। আর যে খুন করতে আসবে, তাকেই খুন করে দেব।”

অরণ্যকে পাত্তা না দিয়ে কমলেশের দিকে তাকিয়ে বনমালা বলে উঠল, “আপনার উপরে যদি হামলা হয়?”

কমলেশ ভরসা দিলেন, “তুমি একদম ভেবো না। আমার উপরে আগেও হামলা হয়েছে। নিজেকে রক্ষা করতে জানি আমি। আর তুমি তো আমাদের আগেই সতর্ক করে দিলে। আমরা সতর্ক থাকব।”

তার সন্ত্রস্ত চোখ দেখে বোঝা গেল না বনমালা কতটা ভরসা পেয়েছে।

অরণ্য হঠাৎ বলে উঠল, “কিন্তু এখন কে খুন করবে? জয়ন্তদা তো…,” বলেই বুঝল বিশাল ভুল করেছে। কথাটা শোনামাত্রই বনমালার মুখটা যেন দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে গেল।

কমলেশ দ্রুত প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললেন, “আচ্ছা বনমালা, তোমার ছোটোবেলার গল্প বলো। কীভাবে তুমি বড়ো হয়ে উঠেছ। কী করতে ছোটোবেলায়, এইসব।”

নিজেকে সামলে নিল বনমালা। যত দূর মনে আছে, তা কমলেশকে বলল। সব শুনে কমলেশ বললেন, “তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করার আছে।”

“হ্যাঁ, বলুন।”

“সজল বলে ছেলেটার খুন হওয়ার দৃশ্যটা তুমি স্বপ্নে দেখোনি এবার?”

“না, কোনও রকম ইঙ্গিতই পাইনি।”

কমলেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। তিনি একটা থিওরি সাজাচ্ছিলেন মনে মনে। কিন্তু এই সজল খুনের ঘটনাটা সব ওলটপালট করে দিয়েছে। বিশেষ করে জয়ন্তর ধরা পড়াটা।

এবার কেন স্বপ্নটা দেখল না বনমালা? কারণটা কী হতে পারে?

“সজলকে তো তুমি আগে দেখেছ? মানে ওর মুখটা তো চিনতে, তাই না?”

কমেলেশের প্রশ্নে “হ্যাঁ” বলল বনমালা। “তাহলে কেন স্বপ্নে কিছু দেখলে না?” নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলেন কমলেশ।

একটা ব্যাখ্যা বনমালাই দিল, “আগের যে তিনজন খুন হয়েছিল, তাদের সঙ্গে আমার অন্যরকম একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ওরা আমার মনে একটা ছাপ ফেলতে পেরেছিল। কিন্তু সজল ছেলেটাকে নিয়ে আমি কখনও ভাবিইনি। হয়তো সে কারণে স্বপ্নটাও দেখিনি।”

কমলেশের মনে হল, বনমালা হয়তো ঠিক বলছে। মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে দেখতে গেলে এই ব্যাখ্যাটা সম্ভব।

কিন্তু এবার যে স্বপ্নটা দেখেছে, তার ব্যাখ্যা কী?

জয়ন্ত তো জেলে। তাহলে কে তাঁদের আক্রমণ করতে পারে? কে এমন শত্ৰু আছে অরণ্যর? আর তিনি তো অনেক বছর পরে এলেন শান্তিনিকেতনে। এর আগে এখানে কোনও কেসও হ্যান্ডল করেননি। তাহলে?

.

নাকি টার্গেট অন্য কেউ? দীনেন্দ্র সিংহ কি?

হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বনমালার মনে সবচেয়ে বেশি ছাপ কেউ যদি ফেলে থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তি হল মেয়েটির বাবা— দীনেন্দ্র সিংহ!

কমলেশ রায়ের মনে হচ্ছিল, জবাবটা খুব দ্রুতই পেয়ে যাবেন!

.

রাতে দাদার ঘরে যখন এসে ঢুকল শতাব্দী, জানলার গ্রিলটা ধরে বাইরে তাকিয়েছিল মানিক। ঘন কালো অন্ধকারে ছেলেটা কী দেখছিল, সে ছাড়া আর কেউই বলতে পারবে না। কিন্তু শতাব্দীর বুকটা দুরুদুরু করছে। সে তার দাদাকে ভালোই চেনে।

বোনের জন্য সব করতে পারে মানিক। শতাব্দীর মনে একটা আতঙ্ক উকি মারতে শুরু করেছে। দাদা কি কিছু করেছে? দাদা কি কিছু করবে?

শৈশব এবং কৈশোর জুড়ে থাকা স্মৃতিগুলো যেন সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো খেলে যাচ্ছিল শতাব্দীর মনের পর্দায় …

বাচ্চাবেলায় যখনই বাবা-মা তাকে বকা দিত, ঢাল হয়ে এসে দাঁড়াত দাদা… খেলতে গিয়ে কারও সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে, এগিয়ে এসেছে দাদা… একটু বড়ো হওয়ার পরে দাদা হয়তো সেভাবে সামনে আসত না, কিন্তু নজরে নজরে রেখে দিত। আর তাই তো বারবার বলত, ওই ছেলেমেয়েগুলো থেকে দূরে থাক, ওরা শুধু তোকে কষ্টই দেবে…

দাদার সব কথা শুনে চললেও এই কথাটা শতাব্দী মেনে নিতে পারেনি। আর পারেনি বলেই প্রতিনিয়ত দগ্ধ হয়ে চলেছে সে। শুধু সে নয়, তার দাদাও।

ধীরে ধীরে দাদার পিঠে হাত রাখল শতাব্দী। একটু চমকে বোনের দিকে তাকাল মানিক। তারপরে অস্ফুটে বলল, “তুই কিছু ভাবিস না বোন, সব ঠিক হয়ে যাবে। সব ঠিক করে দেব আমি।”

দ্রুত দাদার হাতটা চেপে ধরল শতাব্দী। তারপরে দৃঢ়স্বরে বলল, “তুই আর কিছু করিস না দাদা। আমার ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। আমি ওদের ভুলে যাব। দূরে সরে যাব ওদের থেকে। তুইও ওদের ভুলে যা।”

মানিক কোনও জবাব দিল না। একটু সময় দাদার পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল শতাব্দী। দুজনের কেউই কোনও কথা বলছিল না। তারপরে পিছন ফিরে দরজার দিকে হাঁটা লাগাল শতাব্দী।

দরজার সামনে এসে আবার ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটা। তারপরে ধীরে ধীরে বলল, “অরণ্য আর বনমালার যেন কোনও ক্ষতি না হয় দাদা। ওদের ছেড়ে আমি থাকতে পারব। কিন্তু তোকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।”

মানিক মুখ ফিরিয়ে তাকাল শতাব্দীর দিকে। নিষ্পলক দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল ভাই-বোন। তারপরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল শতাব্দী। অন্ধকার থেকে মুখ ফিরিয়ে বিছানায় এসে বসল মানিক।

তার চোখটা ছলছল করছে। বোনটা তার বড্ড ভালো!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *