প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ২.১১

১১

শান্তিনিকেতন, ২০২১

সারারাত ঘুমোতে পারেনি বনমালা। যখনই ঘুমোতে গিয়েছে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছে।

তার মা যন্ত্রণায় ছটফট করছে আর একটা লোক অট্টহাসি হেসে চলেছে। চোখের পাতা বন্ধ করলেই দৃশ্যটা দেখতে পায় বনমালা। পরের দিন সকালে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল জয়ন্ত, “তোর কী হয়েছে? চোখের কোণে কালি! শরীর-টরীর ঠিক আছে তো? ঘুম হয়েছে?”

“আসলে মাথাটা একটু ধরেছে। ঘুমটা ভালো হয়নি।”

“ডাক্তার দেখাবি একবার?” দাদার স্বরে উদ্বেগটা ধরা পড়ছে। বনমালা জানে, দাদা তাকে কতটা ভালোবাসে। তাই দাদার কাছে কোনও কথা গোপন করতে তার একেবারেই ভালো লাগে না। কিন্তু এবার কিছু করার নেই।

“আরে, না না, কিছু হয়নি। ঠিক হয়ে যাব।” জয়ন্ত আর কথা বাড়াল না। তার মনটা দুশ্চিন্তায় ভারী হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, একটা ঝড় আসছে।

.

সেদিন দুপুরে বাড়িতে খাবে না বলে বেরিয়ে এসেছিল বনমালা। তারপরে সোজা চলে যায় অরণ্যর বাড়িতে।

তিনটে নাগাদ ড্রয়িংরুমে বনমালা আর অরণ্যকে নিয়ে বসলেন কমলেশ। মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে কষ্ট হচ্ছিল কমলেশের। অতীত সত্যিই কত ভয়ংকর হতে পারে।

বনমালা চোখ তুলে তাকাল। অশ্রুভেজা দুটো চোখে যেন শপথের আগুন— “কমলেশ কাকা, আমি কিন্তু এর শেষ দেখে ছাড়ব। দরকার হলে পুলিশের কাছে গিয়ে সব বলব।”

বনমালাকে শান্ত করলেন কমলেশ, “আমাদের ঠান্ডা মাথায় এগোতে হবে বনমালা। তুমি কিছু ভেবো না। আমি তো আছি।” বনমালা একটু শান্ত হল।

কমলেশ এবার বললেন, “তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি? ওই স্বপ্ন দেখা নিয়ে।”

মাথা নাড়ল বনমালা।

“তুমি কি শুধু তিনবারই ওই স্বপ্ন দেখেছ?”

“হ্যাঁ, আর কখনও দেখিনি।”

“আর তারপরেই দেখেছ লোকগুলো মারা গিয়েছে।’

“হ্যাঁ, ছোটোবেলার স্মৃতি অনেকটাই ঝাপসা হয়ে এসেছে। ঘটনাগুলো সেভাবে মনে করতে পারি না। কিন্তু প্রবীর সেনের ব্যাপারটা মনে আছে। রাতে স্বপ্ন দেখলাম। পরের দিন সকালে গিয়ে দেখলাম, খুনটা হয়ে গিয়েছে।”

কমলেশ একটু ভাবলেন। তারপরে বললেন, “আচ্ছা, তোমার কখনও মনে হয়েছে, কেউ তোমাকে কিছু বলতে চাইছে। মাথার মধ্যে অন্য কারও স্বর শুনতে পাচ্ছ?”

“না তো। সেরকম কখনও হয়নি।”

“আচ্ছা, কখনও কি এমন অনুভূতি হয়েছে, যা তুমি বুঝতে পারছ না। মানে এমন কোনও ভাবনা মনে এসেছে, যার সঙ্গে তুমি কখনও জড়িয়ে ছিলে না?”

বনমালা সামান্য ভাবার চেষ্টা করল। তারপরে বলল, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনি কী বলতে চাইছেন? মনের মধ্যে তো নানা আগডুম বাগডুম ভাবনা চলে আসেই। সবারই আসে।”

কমলেশ মাথা নাড়ল, “ঠিকই, সবারই আসে।” একটু ভাবলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে চাই। যদি তুমি অনুমতি দাও।

“কী করতে চান বলুন না?”

“হিপনোটাইজ। সম্মোহন। তোমাকে হিপনোটাইজ করে দেখতে চাই। যদি অনুমতি দাও।”

অবাক হয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল অরণ্য আর বনমালা। তারপরে অরণ্য বলে উঠল, “কাকা, তুমি সম্মোহনও জানো নাকি? আমাকে কখনও বলোনি তো।”

কমলেশ হাসল, “আমাদের কাজে এই বিদ্যেটা লাগে। সাইকোলজিক্যাল থেরাপির অঙ্গ এটা। সম্মোহন বিদ্যা শেখার জন্য আমাকে ট্রেনিংও নিতে হয়েছে। একে বলে হিপনোথেরাপি।” একটু চুপ করে থেকে কমলেশ বললেন, “হয়তো তোমার অবচেতন মনে এমন কিছু রয়েছে, যা তোমাকে এই স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সেই দিকটা আলোয় আনার চেষ্টা করে দেখব একবার।”

দুজনে বিশেষ কিছু বুঝল বলে মনে হল না। কিন্তু বনমালা রাজি হয়ে গেল। “আমাকে কী করতে হবে বলুন। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য যা করা দরকার, আমি করব।”

বনমালা বা অরণ্যর জানার কথা নয় যে, আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ১৯৫৮ সাল থেকেই হিপনোথেরাপিকে বৈধ চিকিৎসা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ সুপারিশ করেছে, ক্রনিক পেন-এর চিকিৎসার জন্য হিপনোথেরাপির ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যাপারটা একটা অটো-সাজেশনের মতো। সম্মোহন করে একটা ভাবনা পেশেন্টের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া। যা তাকে মানসিকভাবে লড়াই করতে সাহায্য করবে।

.

“ওকে,” বলে উঠে দাঁড়ালেন কমলেশ। তারপরে ঘরের দরজাটা আটকে দিলেন। বন্ধ করে দিলেন জানলাগুলো। লাইটটাও নিভিয়ে দিলেন। ঘর অনেকটাই অন্ধকার হয়ে গেল।

তারপরে অরণ্যকে ইঙ্গিতে বনমালার পাশ থেকে সরে বসতে বললেন কমলেশ। আর বনমালাকে বললেন, “তুমি রিল্যাক্স করবে একদম। মনকে হালকা করে দেবে। নো টেনশন। আমি হয়তো বারবার একটা কথাই বলব। তোমার ঘুম পেতে পারে। ঘুমিয়ে পড়বে। শুধু মানসিকভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে না। তুমি যদি বাধা দাও, তাহলে আমি কাজটা ঠিকমতো করতে পারব না। ঠিক আছে?”

মাথা হেলিয়ে বনমালা বুঝিয়ে দিল সে তৈরি।

বনমালার সামনে বসে চশমাটা খুললেন কমলেশ। তাঁর দৃষ্টি যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। একজোড়া সার্চলাইট আলো যেন বনমালার মনের অন্ধকার ফুঁড়ে দেখতে চাইছে ভিতরে কী হচ্ছে।

আস্তে আস্তে বনমালার দিকে ঝুঁকে এলেন কমলেশ রায়। ধীরে ধীরে বাঁধা ছন্দে বলে যেতে লাগলেন, “আমার চোখের দিকে তাকাও বনমালা, আমার চোখের দিকে তাকাও। অ্যান্ড জাস্ট রিল্যাক্স।”

সেই দৃষ্টি আর একটা ঘুমপাড়ানি স্বর যেন বনমালাকে একটা অন্য জগতে নিয়ে যেতে লাগল। একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছিল মেয়েটা। চোখ খুলে রাখতে পারছিল না সে। কমলেশ এবার বলতে লাগলেন, “তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।”

চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল বনমালার। সে যেন অদ্ভুত একটা জগতে ভাসছিল। লৌকিক-অলৌকিক মাঝের এক জগৎ। তার মনে ভেসে উঠছে একটার পর একটা ছায়ামূর্তি, আর বুদবুদের মতো মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।

দূর থেকে একটা গলার স্বর ভেসে আসতে লাগল—

“স্বপ্ন দেখার আগে কী হত বনমালা? স্বপ্ন দেখার আগে কী হত?” বনমালা তলিয়ে যেতে লাগল।

কমলেশ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন। বনমালার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। তার চোখের পাতাগুলো দ্রুত কাঁপছে। র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট। এবার ডান হাতটাও কাঁপতে লাগল বনমালার। আঙুলগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে।

অরণ্যর ভয় ভয় করতে লাগল। মেয়েটার কিছু হয়ে যাবে না তো। কমলেশ কাকা এবার থামলে পারেন।

কমলেশ থেমে গেলেন। কথা বন্ধ করে দিলেন। তারপরে ধীরে ধীরে বললেন, “রিল্যাক্স বনমালা, রিল্যাক্স।” বনমালার শরীরটা শান্ত হয়ে এল। কমলেশ বলতে লাগলেন, “এবার খুব ধীরে ধীরে চোখ খোলো। ঘুম থেকে জেগে ওঠো।” বার কয়েক কথাটা বলার পরে চোখ মেলল বনমালা। প্রথমে যেন ঠিক বুঝতে পারল না, সে কোথায় আছে। তারপরে ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসল। “কী হল, আমি কী বলেছি? কী জানতে পারলেন আপনি?”

কমলেশ হাসল, “ব্যাপারটা এত সোজা নয় বনমালা। সিনেমা বা গল্পের বইয়ের মতো নয়। একবার হিপনোটাইজ করলাম আর তোমার মনের কথা বার করে আনলাম, সেরকম হয় না। তবে প্রথম দিনের পক্ষে খুব ভালো সেশন হয়েছে। পরে দরকার হলে আবার করব। ঠিক আছে?”

বাধ্য মেয়ের মতো মাথা হেলিয়ে সায় দিল বনমালা। তারপরে বলল, “কিন্তু এখন আমরা কী করব?”

একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “প্রবীর সেনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে রক্তকরবীর বিষ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, আমরা জানি না। কিন্তু তুমি খুনের দৃশ্যের যা বর্ণনা দিয়েছ, তাতে মনে হচ্ছে, বিষ প্রয়োগ হতেও পারে।”

“কিন্তু খুনি তো সেবার ধরা পড়ে গিয়েছিল। পুলিশের হাতে মারাও যায়। তাহলে?” প্রশ্নটা করল অরণ্য।

হাতে ধরা পেনটা দিয়ে কয়েকবার টেবলের উপরে টোকা দিলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে, একজনের বাড়ি যাওয়া দরকার। সেই বাড়ির লোকেদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”

“কার বাড়ি?” প্রায় একই সঙ্গে প্রশ্ন করে উঠল বনমালা-অরণ্য।

“যাকে খুনি বলে মেরেছিল পুলিশ। আমাকে কয়েকঘণ্টা সময় দাও। ওই লোকটার ঠিকানা বার করে ফেলব।”

অরণ্য ধীরে ধীরে বলে উঠল, “লোকটার নাম আমার মনে আছে। জয়দেব পাড়ুই। খুব সম্ভবত নতুনগীত গ্রামে থাকত। ওই সময়কার ঘটনাগুলো ভুলতে পারিনি কখনও।”

ভাইপোর পিঠটা চাপড়ে দিলেন কমলেশ। “দারুণ! তাহলে তো কাজ অর্ধেক হয়ে গেল। কাল আমরা একবার নতুনগীত গ্রামে গিয়ে পাড়ুই পরিবারের সঙ্গে কথা বলব।” তারপরে নির্দেশ দিলেন, “অরণ্য তুই বনমালাকে বাড়িতে ছেড়ে আয়। ছ-টা বাজতে চলল। দিনকাল ভালো নয়।”

দুজনেই উঠে পড়ল।

বেশি সময় লাগে না অরণ্যর বাড়ি থেকে বনমালার বাড়ি পৌঁছোতে। এক কিলোমিটারের কম দূরত্ব।

নিঃশব্দেই সাইকেল চালাচ্ছিল দুজনে। বনমালার বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দুজনে একই সঙ্গে দেখতে পেল দৃশ্যটা।

সিংহবাড়ির সামনে একটা পুলিশের জিপ দাঁড়িয়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *