প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ২.১৩

১৩

শান্তিনিকেতন, ২০২১

আর একটা রাত। আর একটা যন্ত্রণার প্রহর গোনার পালা। তবে এই রাতে যন্ত্রণাটা শুধু বনমালাই পায়নি। একই রকম যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন হচ্ছিল আরও কয়েকজন মানুষ।

দীনেন্দ্র সিংহ, জয়ন্ত তো ছিলই। ঘুম আসছিল না অরণ্যরও। অস্থির হয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল সে। চোখ দুটো কখন লেগে এসেছিল, সে বোঝেনি। ভয়ংকর একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুমটা ভেঙে গেল তার। একটা চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে সে। যত ছটফট করে বাঁচার চেষ্টা করছে, ততই সে মৃত্যুফাঁদ তাকে কাছে টেনে নিচ্ছে। তার কানে ভেসে আসছে একটা ভয়ংকর অট্টহাসি। খলখল করে কে হাসছে। যে হাসি অতি বড়ো সাহসীরও বুকের রক্ত জমিয়ে দেবে।

ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসল অরণ্য। এই হালকা শীতেও সে কুলকুল করে ঘামছে।

.

ঘুম আসছিল না কমলেশ রায়েরও। নিজের ঘরে অনেক রাত পর্যন্ত ল্যাপটপের সামনে বসে চ্যাট করছিলেন তিনি। বিদেশি এক বন্ধু চিকিৎসকের সঙ্গে। পাশাপাশি কয়েকটা রিসার্চ পেপারের উপরেও চোখ বুলিয়ে নিয়েছেন।

বনমালা মেয়েটা তাঁকে চমকে দিয়েছে। এরকম স্বপ্ন দেখাটা সত্যিই একটা বিরল ব্যাপার। মেয়েটা স্বপ্নে ভিকটিমকে দেখতে পাচ্ছে বলেছে। ভিকটিম মেয়েটার পরিচিত বলেই হয়তো সহজে চিহ্নিত করতে পেরেছে। পরিষ্কার মুখ না দেখলেও। অজানা কেউ হলে হয়তো পারত না।

মেডিক্যাল কেস হিস্ট্রিতে এইরকম ঘটনা সেভাবে লিপিবদ্ধ নেই। যদিও প্রিমনিশনের কথা কয়েক জায়গায় বলা আছে। প্রিমনিশন। অর্থাৎ, কোনও ঘটনা ঘটার আগে আগাম ইঙ্গিত পাওয়া। সেটা স্বপ্নের মাধ্যমেও হতে পারে।

সবচেয়ে বিখ্যাত প্রিমনিশনের কেস হল আব্রাহাম লিঙ্কন। নিজের মৃত্যুর ঘটনা তিনি নাকি আগেই দেখতে পেয়েছিলেন।

বাংলাতেও এর উদাহরণ আছে। বলা হয়ে থাকে, কিংবদন্তি সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি মৃত্যুর আগে নিজের মৃতদেহ দেখেছিলেন। এও এক রকমের প্রিমনিশন।

এই দুই বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নিজের মৃত্যুর ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। কিন্তু অন্যের মৃত্যুর ইঙ্গিতও পায় কেউ কেউ।

১৯৬৮ সালের ৫ জুন হত্যা করা হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ভাই রবার্ট কেনেডিকে। সেই বছর মার্চ মাস থেকেই ক্যাথলিন মিডলটন বলে এক ভদ্রমহিলা নিয়মিত স্বপ্নে রবার্ট কেনেডির হত্যাকাণ্ড দেখতেন। ওই সময় মার্কিন প্রশাসন প্রিমনিশনস ব্যুরো নামে একটি সংস্থা তৈরি করেছিল। যাদের কাজ ছিল এইসব অতিপ্রাকৃতিক ব্যাপার খতিয়ে দেখা। সেই ব্যুরোয় তিনবার ফোন করে নিজের স্বপ্নের কথা বলেছিলেন ক্যাথলিন। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। ৫ জুন গুলি করা হয় রবার্ট কেনেডিকে।

চুপ করে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েছিলেন কমলেশ রায়। প্রিমনিশেনের ঘটনা নতুন নয়। কারও কারও মধ্যে এই অতিপ্রাকৃতিক শক্তি জন্ম নেয়। কীভাবে নেয় তার কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। হয়তো খুব সংবেদনশীল মন হলে ভবিষ্যতের ছাপ তাতে পড়ে। মানুষের মস্তিষ্ক এমন একটা জিনিস যার তল এখনও পায়নি বিজ্ঞানীরা। কোথায় কী রহস্য লুকিয়ে আছে, কেউ জানে না।

কমলেশ জানেন, ধূসর একটা জগৎ নিয়ে কাজ করতে হয় তাদের। যেখানে কোনও সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বনমালাকে নিয়েও একটা থিওরি দাঁড় করানোর চেষ্টায় ছিলেন কমলেশ রায়। কিন্তু তার জন্য আরও কিছু ডেটা লাগবে। বিশেষ করে বনমালার অতীত নিয়ে, শৈশব নিয়ে। তবে সময় বড়ো কম।

অরণ্যর মুখে পুলিশের ব্যাপারটা শুনেছেন কমলেশ। কোনও সন্দেহ নেই, বনমালাও সন্দেহভাজনের তালিকায় থাকবে। তাঁদেরও অত্যন্ত দ্রুত উত্তর খুঁজে পেতে হবে। আর দেরি নয়। কাল সকালেই যেতে হবে জয়দেব পাড়ুইয়ের বাড়ি।

.

রাতেই ফোন করে মালার সঙ্গে সময়টা ঠিক করে নিয়েছিল অরণ্য। সেইমতো সকাল দশটা নাগাদ বনমালা চলে আসে অরণ্যর বাড়ি।

বেরিয়ে আসার সময় নিজেদের বাড়িটার দিকে একবার তাকিয়েছিল বনমালা। বিশাল বাগানওয়ালা বড়ো বাড়িটা কীরকম যেন নিঝুম হয়ে গিয়েছে। একটা অভিশাপ যেন চেপে বসেছে সিংহবাড়ির উপরে। বাবা যে সেই রাতে গিয়ে ঘরে ঢুকেছে আর বেরোয়নি। সকালে খাওয়ার টেবলে বাবা-দাদা কাউকেই দেখেনি বনমালা। সে চুপচাপ খেয়ে বেরিয়ে চলে এসেছে। শুধু মিনতি মাসিকে বলে এসেছে। মিনতি মাসিও যেন কীরকম থম মেরে গিয়েছে।

.

নতুনগীত গ্রামে গিয়ে জয়দেব পাড়ুইয়ের বাড়িটা খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না তাঁদের। এই লোকটার নাম কেউ ভোলেনি।

কমলেশরা যখন পাড়ুই বাড়িতে এলেন, তখন ঘরে প্রায় সবাই রয়েছে। জয়দেব পাড়ুইয়ের স্ত্রী। বড়ো ছেলে, বড়ো ছেলের এক বন্ধু। ছোটো ছেলে শুধু বাড়িতে ছিল না।

কমলেশ নিজের পরিচয় দিলেন, “আমি একজন সাংবাদিক। জানি, সাত বছর আগে জয়দেব পাড়ুইয়ের সঙ্গে কী হয়েছিল। পুলিশের বক্তব্য আমরা সবাই শুনেছিলাম। কিন্তু কিছু কিছু প্রশ্ন মনে জেগেছে। আমি সত্যিটা বার করতে চাই। আপনারা সাহায্য করলে সত্যিটা সামনে আনতে পারব।”

মা কিছু বলার আগেই বড়ো ছেলে বলে উঠল, “আপনারা কিছুই করবেন না। নিজেদের পেপারের বিক্রি বাড়ানোর জন্য আমার বাবাকে নিয়ে রঙ্গতামাশা করবেন। আপনারা এখান থেকে ফুটুন তো।”

কমলেশ একটুও চটলেন না। অল্প হেসে বললেন, “আপনার রাগের কারণটা আমি বুঝতে পারছি। আপনার জায়গায় আমি থাকলেও রেগে যেতাম। কিন্তু আমার কোম্পানি আপনাদের ব্যাপারটাও দেখবে।” বলে পকেট থেকে একটা খাম বার করে আনলেন কমলেশ। তারপরে এগিয়ে দিলেন পাড়ুই-পত্নীর দিকে। “এতে পাঁচ হাজার টাকা আছে। আমাকে বেশ কয়েকবার আসতে হবে আপনাদের কাছে। প্রতিবার ফি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা করে দেবে আমার কোম্পানি।”

মা নেওয়ার আগে ছোঁ মেরে খামটা ছিনিয়ে নিল বড়ো ছেলে। তারপরে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে বলল, “ঠিক আছে। আপনার কী জানার আছে, বলুন।”

কমলেশ তার দিকে ফিরলেন, “আপনি বুঝি বড়ো ছেলে?”

“হ্যাঁ, আমার নাম রন্টি। আমি মুম্বইয়ে একটা সোনার দোকানে কাজ করি। ও আমার বন্ধু। ছুটিতে আমাদের বাড়িতে এসেছে,” বলে পাশে দাঁড়ানো লম্বা মতো দাড়িওলা একটা ছেলেকে দেখিয়ে দিল রন্টি। কমলেশ আলগোছে তাকিয়ে পাড়ুল পত্নীর দিকে ফিরলেন। তারপরে বললেন, “আপনি কি বিশ্বাস করেন আপনার স্বামী ওই দুটো খুন করেছেন?”

চোখ দুটো জ্বলে উঠল মহিলার, “আমার স্বামী খুন করেনি। পুলিশ ওকে ফাঁসিয়েছে। উনি আমাদের বলেছিলেন, কী হয়েছিল।”

“কখন বলেছিলেন?”

“পুলিশ যখন ওঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে, তখন উনি এক রাতে বাড়িতে ফিরে আসেন। তখনই আমাদের সব খুলে বলেছিলেন।” চুপ করে শুনে যেতে লাগলেন কমলেশ।

.

…জয়দেব পাড়ুই সে রাতে বাড়ি ফিরে এসেছিল। স্ত্রীর সামনে কেঁদে পড়ে বলেছিল, “বিশ্বাস করো, আমি খুন করিনি। ওই দিন সকালে ওদের বাড়িতে কাজ ছিল আমার। ওখানে গিয়ে দেখি দরজা হাট করে খোলা। ঘরে ঢুকে দেখি ওই মহিলা মরে পড়ে আছে। তখন আমার মাথায় ভূত চেপে যায়। সামনে টাকার ব্যাগটা দেখেছিলাম। ওই ব্যাগটা থেকে টাকা বার করে যখন বেরিয়ে আসছি, অন্য মহিলা ফিরে আসেন। পালানোর সময় আমাকে দেখে ফেলেন। কিন্তু আমি খুন করিনি।

.

ঘটনার কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন পাড়ুই-পত্নী, “তখনই গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যায়। আমার স্বামী ভয় পেয়ে পালাতে যায়। পুলিশ তাড়া করে। একটু পরে দূর থেকে আমরা পুলিশের গুলির আওয়াজ শুনি।”

কমলেশ চুপ করে শুনছিলেন। এবার জিজ্ঞেস করলেন, “একটা গুলির আওয়াজ না অনেকগুলো গুলির আওয়াজ?”

একটু মনে করে স্ত্রী জবাব দিল, “বেশ কয়েকটা গুলির আওয়াজ আমরা পেয়েছিলাম। তখনই বুঝে যাই, কী হয়েছে। পুলিশ ওঁকে মেরে ফেলেছে। আমরা গরিব তো, তাই আমাদের উপরে দোষ চাপিয়ে দেওয়াটা সহজ হয়েছিল। কেউ কিছু বলেনি।”

উঠে আসার আগে কমলেশ বলে এলেন, “সত্যিটা যাতে সামনে আসে, সেই চেষ্টা করব আমি।”

.

পাড়ুই-বাড়ি থেকে একটু দূরে রাখা ছিল কমলেশের গাড়িটা। সেদিকে এগিয়ে গেল তিনজন। উলটো দিকের চায়ের দোকানে বসে থাকা লোকগুলো দেখছিল তাদের। তার মধ্যে দু-জোড়া চোখ যেন বিঁধছিল বনমালা আর অরণ্যকে।

একটা ছেলে আর একটা ছেলের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “আরে সজলদা, সেই ছেলেটা আর মেয়েটা না?” সজল ঘৃণাভরা চোখে ওদের দেখছিল। কোপাইয়ের সেই অপমানটা সে ভোলেনি। বিষাক্ত স্বরে বলে উঠল, “এখানে অনেক লোক, তাই কিছু করতে পারলাম না। এরপরে যে দিন সুযোগ পাব ওই ছেলেটার গলা নামিয়ে দেব। আর ওই মেয়েটাকে…..” কথা শেষ করল না সজল। তার চোখে একরাশ ঘৃণা ফুটে উঠেছে।

.

তিনজনে বেরিয়ে যাওয়ার পরে রন্টির বন্ধু জিজ্ঞেস করল, “ওই লোকটাকে তোর সাংবাদিক বলে মনে হয়?”

“কেন? তোর কী লাগছে?” অবাক হয়ে বন্ধুকে প্রশ্ন করল রন্টি।

দুজনে মুম্বইয়ের ওই সোনার দোকানে বছর দুয়েক হল একসঙ্গে কাজ করছে। বীরু বলে ছেলেটা পরে এসেছে। রন্টি তার আগে থেকেই ওই দোকানে ছিল তারা দুজন একই বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া করে থাকে।

রন্টির দিকে তাকিয়ে বীরু বলল, “আমার তো পুলিশ বলে মনে হল।”

রন্টি একটুও ঘাবড়াল না, “আরে হলে হবে, কে পাত্তা দিচ্ছে। আমাদের কী করবে! আসল কথা হল, পাত্তি হাতে এসে গিয়েছে। রাতে জোরদার মাল খাওয়া হবে,” বলে বন্ধুর কাঁধটা চাপড়ে দিল রন্টি।

.

ফেরার সময় অরণ্যই প্রশ্নটা করল কমলেশকে, “পাড়ুইয়ের স্ত্রী সত্যি কথা বলছে কাকা?”

সামনে রাস্তা থেকে নজর না সরিয়ে কমলেশ জবাব দিলেন, “হুঁ, সত্যি কথাই বলছে। মানে পাড়ুই ওকে যা বলেছে, সেটা আমাদের ঠিকঠাক বলেছে। তবে পাড়ুই সত্যি বলেছে কি না, সেটাই হল প্রশ্ন।”

“তোমার কী মনে হয়?”

“আমার মনে হয় জয়দেব পাড়ুইও সত্যি কথা বলেছিল। খুনটা করলে ও ফিরে আসত না কিছুতেই।”

কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপরে বনমালা আস্তে আস্তে বলল, “তার মানে তো একটাই দাঁড়ায় কমলেশ কাকা।” গাড়ি চালাতে চালাতেই জবাব দিলেন কমলেশ, “হ্যাঁ, এর মানে একটাই। রক্তকরবী-খুনি আবার ফিরে এসেছে। সে আসলে ধরাই পড়েনি!”

.

বাড়িতে ঢোকার সময় আবার যেন বনমালার বুকে সেই পাথরটা চেপে বসল। গেট পেরিয়ে মোরামের পথটা ধরে এগোতে এগোতে দু-পাশের বাগানগুলো দেখছিল বনমালা। এখন আগাছায় ভরে গিয়েছে। একটা সময় যে বাগানে আলো খেলে বেড়াত, সেখানে এখন অন্ধকার।

ঘরে ঢুকে অল্পসময় থম মেরে বসে রইল বনমালা। তারপরে সংবিৎ ফিরল মিনতি মাসির ডাকে, “মালা, ঘরে আছ?”

“হ্যাঁ, মাসি,” বলে দরজা খুলে দিল বনমালা।

মিনতি ঘরে এসে ঢুকল। “মনটা বড্ড খারাপ হয়ে আছে। কী যে কাণ্ড হচ্ছে বাড়িটায়,” বিছানায় বসে কথাগুলো বলছিল মিনতি। বনমালা বুঝতে পারল, মিনতি মাসি মন থেকেই কথাগুলো বলছে।

“যাই হোক, তোমাকে যে কথাটা বলব বলে এসেছি। তুমি সারদা দিদির খোঁজ করছিলে না, ওর একটা খোঁজ পেয়েছি।

লাফিয়ে উঠল বনমালা, “তাই নাকি? কোথায় আছে সারদা মাসি?”

“সেটা ঠিক জানি না। তবে এখানে এক ভদ্রমহিলা আছেন। কাছেই থাকেন। ওই শ্রীনিকেতনের মোড়ের কাছে। বনানী মাহাতো নাম। ওর সঙ্গে নাকি এখন শাড়ির ব্যবসা করে।

“বনানী মাহাতোর ঠিকানাটা দাও।”

ঠিকানাটা শুনে নিয়েই দুদ্দাড় করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল বনমালা।

বনানী মাহাতোর বাড়ি খুঁজে পেতে দেরি হল না বনমালার। ওখানকার লোকজন ভালো করেই চেনে। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত মানুষ কজন আছে এলাকায়!

বেল বাজাতে এক অল্পবয়সি ভদ্রমহিলা এসে দরজা খুলে দিলেন।

“আমি একটু বনানী মাহাতোর সঙ্গে দেখা করতে চাই। খুব দরকার।”

“আসুন আমার সঙ্গে,” মেয়েটির সঙ্গে পিছন পিছন উপরে উঠে এল বনমালা।

“দিদি তোমার সঙ্গে একটি মেয়ে দেখা করতে এসেছে।”

ঘরের ভিতর থেকে জবাব এল, “পাঠিয়ে দে।”

বনমালা ঘরে ঢুকতেই চমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন বনানী। তারপরে অস্ফুটে বললেন, “ঠিক যেন মায়ের মুখ বসানো।”

বনমালা এক পা এগিয়ে এসে বলল, “আপনি আমার মাকে চিনতেন?”

বনমালার মাথায় হাত বুলিয়ে বয়স্ক মহিলা বলে উঠলেন, “হ্যাঁ রে মা, খুব ভালো করে চিনতাম। তোকেও আমি রাস্তাঘাটে দেখেছি। কিন্তু কথা বলে উঠতে পারিনি। তোকে দেখলেই বোঝা যায়, তুই কনকমালার মেয়ে।”

ছলছল করে উঠল বনমালার চোখ।

আরও মিনিট দশেক পুরোনো দিনের কথা বলার পরে বনানী জিজ্ঞেস করলেন, “এবার বল তো, আমার কাছে কেন এলি?”

“ছোটোবেলায় একজন মহিলা আমাকে মানুষ করেছিলেন। তাকে সারদা মাসি বলে ডাকতাম। সেই মাসিকে খুঁজছি। শুনেছি, আপনার কাছে সারদা মাসি শাড়ির ব্যবসার জন্য আসে। যদি আপনি ওঁর ঠিকানাটা দেন।”

“ঠিকানা দিতে হবে না,” বনানী মোবাইল বার করলেন, “সারদা কাছেই থাকে। আমি ডেকে আনাচ্ছি।”

.

ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হল বনমালাকে। আর তারপরেই ঘরে এসে ঢুকলেন সারদা মাসি।

বছর তেরো আগে শেষবার দুজন দুজনকে দেখেছিল। তখন বনমালার বয়স আট। ওই সময় সারদাকে কাজ থেকে সরিয়ে দেন দীনেন্দ্র সিংহ। অতীতের কোনও চিহ্ন তিনি বাড়িতে রাখতে চাইছিলেন না।

এত বছর পরে হলেও চিনতে কারওই অসুবিধে হল না। বনমালাকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন সারদা মাসি। চোখে জল চলে এসেছিল বনমালারও। সারদা মাসির বুকে মাথা রেখে সে যেন মায়ের স্পর্শ পেল।

স্বাভাবিক হতে একটু সময় নিল দুজনে। তারপরে বনমালা বলল, “মাসি, তোমার থেকে একটা কথা জানতে চাই। তুমি ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না।”

“বল না, কী জানতে চাস?”

“আমার জন্ম আর মায়ের মৃত্যুর রাতে ঠিক কী হয়েছিল?”

চমকে উঠলেন সারদা মাসি, “হঠাৎ ওই কথা কেন জানতে চাইছিস মেয়ে? সে তো কত বছর হয়ে গিয়েছে। ভুলে যা ওই দুঃখের স্মৃতি।”

“না মাসি,” সারদার হাতটা চেপে ধরল বনমালা। “আমাকে জানতেই হবে সেই রাতে কী হয়েছিল। তুমি বলো।”

সারদা বিপন্ন চোখে তাকাল বনানীর দিকে। তিনি মাথাটা সামান্য হেলিয়ে ‘হ্যাঁ” বললেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা শুরু করলেন সারদা মাসি।

“শোন তবে। সেই ভয়ংকর রাতটা আমি কোনওদিন ভুলতে পারব না।”

ধীরে ধীরে সেই রাত আর পরের দিনের পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন সারদা।

“তোর বাবা ফিরে আসার পরে ঘরে ঢুকে ভাঙচুর করা শুরু করেছিল। জন্তুর মতো মুখ দিয়ে আওয়াজ করছিল। আর তার মধ্যে একটা কথা বারবার বলছিল— কনক, কেন এমন করলে? কেন এমন করলে?”

“মানে, বাবা কেন ওই রকম কথা বলছিল?”

আবার চুপ করে গেলেন সারদা মাসি। ব্যাকুল হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল বনমালা। মেয়েটার হাত চেপে ধরে ফিশফিশ করে সারদা মাসি বলে উঠলেন, “তোর মা যে সেদিন রাতে বিষ খেয়েছিল।”

ক্ষিপ্ত স্বরে বনমালা বলে উঠল, “হতেই পারে না। মা আত্মহত্যা করতে পারে না। বাবা মিথ্যে কথা বলেছিল সবাইকে।”

সারদা মাসি একটু সময় চুপ করে রইলেন। তারপরে বললেন, “সেটা তো জানি না। আমি যা শুনেছিলাম, সেটাই বলছি। কয়েকদিন পরে ব্যাপারটা লোকের কানে গিয়েছিল। কিন্তু প্রভাব আর টাকার জোরে তোর বাবা পুরো ঘটনা চাপা দিয়ে দেয়। স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে, এটা জানাজানি হলে যে মুখ দেখাতে পারবে না। তাও যে মেয়েকে ছোটোবেলা থেকে ভালোবেসে এসেছে, সেই মেয়ে!”

সারদা মাসি থামলেন। উত্তেজিত বনমালা থামতে চাইছিল না, “কিন্তু মা কেন আত্মহত্যা করতে যাবে? তখন তো আমি মায়ের পেটে!”

সারদা মাসি চোখ নামিয়ে নিলেন। তাঁর মুখে যন্ত্রণার চিহ্ন স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তিনি যেন আর কিছু বলতে চাইছিলেন না।

“কেন মাসি, কেন?” হাহাকার করে উঠল বনমালা। মা কি তাকেও মেরে ফেলতে চেয়েছিল?

“তোর বাবার জন্য,” চোখ দুটো জ্বলে উঠল সারদা মাসির, “সন্দেহ করে করে মেয়েটার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। কনক আর সহ্য করতে পারছিল না। একদিন তো সব সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। পরে কাঁদতে কাঁদতে কনক আমায় সব বলেছিল।”

“কী বলেছিল মা?”

“সে কথা শুনে তোর কাজ নেই। তুই জানতে চাস না দয়া করে।”

বনানী চুপ করে বসেছিলেন। তিনি জানতেন, আজ সব কথা না জেনে বনমালা এই বাড়ি ছেড়ে যাবে না।

তাই হল। সারদা মাসির দুটো কাঁধ আঁকড়ে ধরে বনমালা বলল, “ঘটনাটা না জেনে আমি এই বাড়ি ছেড়ে যাব না। তোমাকেও যেতে দেব না।

সারদা মাসি চমকে উঠলেন। মেয়েটার মধ্যে মাঝে মাঝে যেন কনকমালার তেজটাও দেখতে পান তিনি। চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে সারদা মাসি বললেন, “তোর বাবা সন্দেহ করত, তুই ওর মেয়ে নোস। তোর বাবা অন্য কেউ

ছিটকে উঠে দাঁড়াল বনমালা। কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইল, “কাকে সন্দেহ করত বাবা? কাকে আমার আসল বাবা মনে করত?”

“প্রবীর সেনকে। তোর বাবার ধারণা ছিল, তুই প্রবীর সেনের মেয়ে।”

সপাং করে কেউ যেন একটা চাবুক কষিয়ে দিল বনমালার পিঠে। তার মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল। কাঁপতে লাগল সারা শরীর।

দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটাকে বুকে টেনে নিলেন সারদা মাসি। তারপরে মেয়েটার সারা গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “পুরোটাই তোর বাবার বাজে সন্দেহ। কনক আমাকে বলেছিল, সেই বিয়ের রাতের পরে আর কোনওদিন প্রবীর সেনের সঙ্গে ওর দেখা হয়নি। তোর বাবার মিথ্যে সন্দেহের আগুনে মেয়েটা জ্বলে-পুড়ে মরল। তারপরে নিজের জীবনটাও শেষ করে দিল।”

বনমালার মাথাটা ঘুরে গেল। চোখের সামনে অন্ধকার দেখছে সে।

.

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অসম্ভব এক যন্ত্রণায় ছটফট করছিল বনমালা। এই যন্ত্রণা কোনও শারীরিক কষ্টের মাপকাঠিতে মাপা সম্ভব নয়। এই যন্ত্রণা তাকে পাগল করে দিচ্ছে। বিছানায় মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল মেয়েটা।

সে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে একটা প্রশ্নে—

আমি কে? আমি কে? আমি কে?

.

সে রাতে ঘুম আসছিল না আরও কয়েক জনের। বিশেষ করে কোপাইয়ের কাছে থাকা দুই ভাই-বোনের।

মানিক একটা অঙ্ক কষছিল মনে মনে। বনমালা যদি এই খুনের জালে জড়িয়ে যায়, তাহলে কি এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব হবে? মেয়েটাকে রাস্তা থেকে হঠিয়ে দেওয়া হল আবার বোনের পথটাও ফাঁকা হয়ে গেল! অরণ্য কি তখন শতাব্দীর দিকে ঝুঁকবে? যদি না ঝোঁকে, তাহলে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। সেরকম ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা মানিকের আছে। সেক্ষেত্রে টার্গেটটা তখন অরণ্য হবে।

একটা ক্রুঢ় হাসি খেলে গেল ছেলেটার মুখে।

ঘুমিয়ে পড়ার আগে একটা রঙিন ভবিষ্যৎ কল্পনা করছিল শতাব্দীও। যেখানে সে আর অরণ্যই শুধু থাকবে। আর কেউ না। কতদিন ধরে সে এই ভবিষ্যতের অপেক্ষা করে আছে। কতদিন!

.

জেগে ছিল আরও একজন। চামড়ার বেল্টের উপরে একমনে ছুরির ফলাটা ঘষে যাচ্ছিল সে। এইরকম সুযোগ যে সামনে চলে আসবে, কখনও ভাবেনি।

সুযোগটা কাজে লাগাতেই হবে। তাতে যা হয় হোক। কিছুতেই ছাড়বে না সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *