৬
শান্তিনিকেতন, ২০২১
“ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার সম্পর্কে আপনারা কী জানেন? যাকে সংক্ষেপে বলা হয় ‘ডিড’।”
কমলেশের প্রশ্নে কেউ কোনও জবাব দিলেন না। কমলেশ আর একটু সহজ করে বললেন, “আমরা যাকে বলি স্প্লিট পার্সোনালিটি কেস। এই নিয়ে তো অনেক সিনেমাও আছে।”
এবার মুখ খুললেন শর্মিষ্ঠা, “স্প্লিট পার্সোনালিটির ব্যাপারটা শুনেছি। কখনও কখনও মানসিক যন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচার চেষ্টায় কেউ কেউ দ্বিতীয় একটি সত্তা তৈরি করে নেয় নিজেদের মধ্যে। এই ব্যাপারটাই বলছেন তো আপনি?”
“ঠিকই বলেছেন আপনি। তবে শুধু দ্বিতীয় সত্তা, ব্যক্তিত্ব বা পার্সোনালিটির মধ্যেই ব্যাপারটা আটকে থাকে না। কখনও একই মানুষের মধ্যে নানা সত্তার জন্ম নেয়। যাকে আমরা বলি মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার। একই মানুষের মধ্যে বহু মানুষের অবস্থান!”
কমলেশ থামলেন। ঘরের আর কেউ কথা বলছিল না। শর্মিষ্ঠাই প্রশ্নটা করলেন, “আপনি কি বলতে চান বনমালা এই স্প্লিট পার্সোনালিটির শিকার?”
কমলেশ কয়েক সেকেন্ড ভাবলেন। তারপরে বললেন, “বনমালার কাহিনিটা বলার আগে আমি আপনাদের একটা বিশেষ ঘটনার কথা বলতে চাই। বছর দুয়েক আগে সিডনিতে এই ঘটনা নিয়ে তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল। ভদ্রমহিলার নাম ছিল জেনি হেইন্স (Jeni Haynes)।”
.
জেনি হেইন্সের কাহিনি শুধু অস্ট্রেলিয়াতে নয়, বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছিল। কারণ সেই প্রথম কোনও আদালত অনুমতি দিয়েছিল মাল্টিপল পার্সোনালিটিদের সাক্ষী দেওয়ার। অর্থাৎ, জেনি যে রকম নিজের উপরে হওয়া শারীরিক অত্যাচারের কথা বলেছিলেন, সেরকমই তাঁর মনের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকা ছ-টি পার্সোনালিটি বেরিয়ে এসে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিল।
ছোটোবেলায় বাবার হাতে ভয়ংকর যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরে নিজের মধ্যে আড়াই হাজার পার্সোনালিটি তৈরি করেন জেনি! শুধু নিজেকে রক্ষা করার তাগিদে।
.
অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন শর্মিষ্ঠা। কমলেশ বলে যেতে লাগলেন, “শেষ পর্যন্ত আদালতে নিজের বাবার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিলেন জেনি। জেনি শুধু নিজেই দেননি, তার মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আরও ছ-টি পার্সোনালিটিকে বার করে এনেছিলেন সেদিন। উইটনেস বক্সে দাঁড়িয়ে একের পর এক সেই পার্সোনালিটি ফুটে ওঠে জেনির মধ্যে। এবং, ছোটোবেলার সেই বর্বর অত্যাচারের কথা জানায় সবাইকে।”
জয়ন্ত মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল। দীনেন্দ্র সিংহকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, তার মাথায় কিছু ঢুকছে কি না। শ্রোতাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলা শুরু করলেন কমলেশ, “আদালত শেষ পর্যন্ত শাস্তি দিয়েছিল জেনির বাবাকে। এই কেসটা তোলপাড় ফেলে দেয় সারা বিশ্বে। বিবিসি স্টোরি করেছিল জেনিকে নিয়ে। আপনারা চাইলে দেখে নিতে পারেন।”
.
জেনির কাহিনির সবচেয়ে অভাবনীয় দিক হল মেয়েটির মধ্যে জন্ম নেওয়া বিভিন্ন পার্সোনালিটি। যাদের মধ্যে একজন ছিল চার বছরের একটি শিশু।
.
জেনির বাবা যখনই জেনির উপরে শারীরিক অত্যাচার করত, তখনই জেনির মধ্যে ফুটে উঠত ওই চার বছরের বাচ্চার সত্তাটা। যার নাম জেনি দিয়েছিলেন সিম্ফনি। পরে বিবিসিকে জেনি বলেছিলেন, “ওই সময় বাবা আমার উপরে নয়, সিম্ফনির উপরে অত্যাচার করত।” এগারো বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত জেনির উপরে ওই পাশবিক অত্যাচার চলে। তারপরে বিচ্ছেদ হয়ে যায় তার বাবা-মায়ের। কিন্তু কেউ জানতে পারেনি ওই ভয়ংকর অত্যাচারের কথা। এমনকী, জেনির মা-ও নয়।
“সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপারটা কী জানেন? জেনির চার বছর বয়স থেকেই তার বাবা ওই পাশবিক অত্যাচার চালাতে শুরু করে মেয়ের উপরে, এবং কেউ সেটা জানতে পারেনি। না জেনির মা, না জেনির ভাই-বোনেরা।
কমলেশ এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছিলেন, যদি জলের গ্লাস-টাস দেখা যায়। কিছুই পেলেন না। তিনি আবার কথা বলা শুরু করলেন, “জেনির ঘটনাটা আপনাদের বললাম দুটো কারণে। প্রথমত, বুঝতেই পারছেন যে আদালতও মান্যতা দিয়েছে জেনির বিভিন্ন পার্সোনালিটিকে। এবং, এই কাহিনির পটভূমিকায় আপনাদের বনমালার ঘটনাটা বুঝতে সমস্যা হবে না।”
.
কমলেশ রায় এর পরে শুরু করলেন বনমালা সিংহ নামে একটি মেয়ের কাহিনি-
জন্ম থেকেই মাকে হারানো অভিশাপ হয়ে নেমে আসে বনমালার জীবনে। দাদা তাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসত। কিন্তু মা যে রকম মেয়ের কাছে আসতে পারে, সেরকম ভাবে জয়ন্তর পক্ষে আসা সম্ভব ছিল না।
বনমালার মানসিক কষ্টটা মারাত্মক বেড়ে যায় বাবা ওইভাবে অবহেলা করায়। মা নেই, বাবার কাছে ঘেঁষতে পারত না মেয়েটি। দাদাই তার জীবনে একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু মায়ের ছবিটা সে দেখতে পেত। নিশ্চয়ই মায়ের অনেক গল্পও ছোটোবেলায় শুনেছে কারও কারও কাছ থেকে। নিজের মনে মায়ের একটা মূর্তি কল্পনা করে নিয়েছিল মেয়েটা। হয়তো এই ঘটনার আগে থেকেই বনমালা নিজের মনে জন্ম দিয়েছিল এক সত্তার- তার মায়ের, কনকমালার। এই অবহেলা, এই একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতে।
তারপরে এল সেই ভয়ংকর সময়। যখন চঞ্চল মজুমদার শান্তিনিকেতনে চলে এল দীনেন্দ্র সিংহের প্রতিবেশী হয়ে। নিশ্চয়ই বনমালার কাহিনিটা জেনে ফেলেছিল লোকটা। বুঝেছিল, মা হারা এক মেয়ে সংসারে ভীষণরকম অবহেলার সঙ্গেই বেড়ে উঠছে। ফলে খুব সহজ শিকার হয়ে উঠেছিল মেয়েটা।
বনমালার কৈশোর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ওই কামুক পশুটার থাবায়। আর তখনই নিজের মনের গহিন কোণ থেকে মায়ের সত্তাকে টেনে বার করে আনে বনমালা। তৈরি করে এক অল্টারনেট পার্সোনালিটি। যখন ওই লোকটা তার উপরে অত্যাচার করত, তখন বনমালা নিজের মধ্যে থাকত না। বেরিয়ে আসত কনকমালার পার্সোনালিটি। যখন কনকমালা দখল নিত বনমালার মনন, তখন সেই সময়ের ঘটনা কিছুই মনে রাখতে পারত না বনমালা। সাপ্রেসড মেমরি হয়ে থেকে যেত ব্যাপারটা। সে যখন আবার নিজের চেতনায় ফিরে আসত, তখন ওই ঘটনার স্মৃতি তার মন থেকে মুছে গিয়েছে। একটা ব্ল্যাঙ্ক জোন তৈরি হয়ে গিয়েছে বনমালার মনে।
.
অভ্যাসবশত চশমাটা আবার খুলে নিলেন কমলেশ। তারপরে চশমা নাচাতে নাচাতে বললেন, “ওই কারণেই পুলিশি জেরার মুখে বেফাঁস কোনও কথা বলেনি বনমালা। তার স্মৃতিতে তো ওই ঘটনাটাই নেই। বলবে কী করে মেয়েটা!”
“কিন্তু অস্ত্র জোগাড় করা, বিষ জোগাড় করা আর ওইভাবে মারা কি অল্টারনেটিভ পার্সোনালিটির পক্ষে সম্ভব?” প্রশ্ন করলেন শর্মিষ্ঠা।
“অবশ্যই সম্ভব। আমাদের কেরিয়ারে আমরা এইরকম ঘটনা অনেক দেখেছি। মনে রাখতে হবে, বনমালা মায়ের ঘরে ওই কাঁচি দেখেছিল। বিষের কথাটা বাবার মুখে শুনেছিল। ওর অবচেতন মনে ওগুলো চাপা পড়ে ছিল।”
“আমি ওকে অনেক ডিটেকটিভ গল্পও বলতাম। কীভাবে খুনিরা প্রমাণ লোপাট করত, খুন করত, এইসব,” আনমনে বলে উঠল জয়ন্ত।
কমলেশ সেদিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “বনমালার মনের গহিন কোণে এই তথ্যগুলো চাপা পড়েছিল। তারপরে যখন কনকমালার পার্সোনালিটি তার মধ্যে মাথা চাড়া দেয়, তখন এক এক করে এইসব জিনিসও ভেসে উঠতে থাকে।”
“আরও একটা ব্যাপার মাথায় রাখবেন,” যোগ করেন কমলেশ, “আমরা বিভিন্ন কেস স্টাডিতে দেখেছি, যখনই কোনও অল্টারনেটিভ পার্সোনালিটি শরীরের দখল নেয়, তখন সেই শরীরও সেই পার্সোনালিটির মতো আচরণ করে।”
নির্বাক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে শুনে যাচ্ছিল শ্রোতারা। কমলেশ বললেন, “আপনাদের একটা উদাহরণ দিই। একজন প্রাপ্তবয়স্কের মনে যদি চার-পাঁচ বছরের শিশুর পার্সোনালিটি জেগে ওঠে, তাহলে সে শিশুর মতোই ব্যবহার করবে। বনমালার মধ্যে যখন কনকমালার সত্তা জেগে উঠত, তখন বনমালা প্রাপ্তবয়স্ক লোকের মতোই ভাবত, কাজ করত। মেয়েটার শারীরিক শক্তিও বেড়ে যেত।”
.
শর্মিষ্ঠা প্রশ্ন করলেন, “আপনি কখন থেকে ওকে সন্দেহ করা শুরু করেছিলেন?”
“স্বপ্নের কথাটা যখন বলছিল, তখনই আমার মাথায় ধারণাটা জন্মায়। বুঝতে পারছিলাম, ওর অবচেতন মনে কিছু একটা রয়েছে, যা সচেতন মনকে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে। বিশেষ করে খুনের ঘটনার পরে মানসিক অবস্থা এমনই থাকত যে ওই দৃশ্যগুলো স্বপ্নের মধ্যে ভেসে আসত। কিন্তু নিজের মুখ তো স্বপ্নে দেখতে পেত না। এর বাইরে ওর আর কিছু মনে থাকত না।”
“বনমালা কি একবারের জন্যও টের পায়নি ও এই খুনগুলো করেছে?” সন্দেহের আঁচটা ধরা পড়ছিল শর্মিষ্ঠার গলায়। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে কমলেশ জবাব দিলেন, “দেখুন, আমরা বিজ্ঞানের যে দিকটা নিয়ে কাজ করি, সেখানে টু প্লাস টু ফোরের মতো সহজ সরল ব্যাপার কিছু নেই। এটা একটা রহস্যে ঢাকা জগৎ। আমরা কেস স্টাডি করে, অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত পৌঁছোই। আর সেই সিদ্ধান্ত বলছে, দ্বিতীয় পার্সোনালিটির কাজের কথা মনে রাখতে পারে না আসল পার্সোনালিটি বা তাকে মনে রাখতে দেয় না ওই দ্বিতীয় বা তৃতীয় পার্সোনালিটি।”
একটু ভাবলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “আমি বনমালাকে প্রথমে হিপনোটাইজ করে একটা চেষ্টা করেছিলাম। তখন বুঝেছিলাম, ওর মনের মধ্যে কেউ ওকে বাধা দিচ্ছে। যে স্মৃতিটা ও অন্ধকার কুঠুরিতে ভরে রেখেছে, সেটাকে বার করে আনতে দিচ্ছে না। ইটস অ্যান আইডিয়াল কেস অব স্প্লিট পার্সোনালিটি।”
“তখন থেকেই আপনি নিশ্চিত হয়ে যান বনমালাই অতীতের খুনগুলো করেছে?”
“আমি একটা থিওরি খাড়া করেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, খুনের পরে বনমালা স্বপ্নগুলো দেখছে, আগে নয়। কিন্তু সজলের খুনটা সব হিসেব গোলমাল করে দেয়। জয়ন্ত খুনটা করে। বনমালা কোনও স্বপ্ন দেখে না। বুঝতে পারছিলাম, কোথাও একটা গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কী সেটা, ধরতে পারছিলাম না। বোনের প্রতি জয়ন্তর আকাশছোঁয়া ভালোবাসার হদিশ আমি প্রথমে পাইনি ভাবতে পারিনি, কেউ এত বড়ো আত্মত্যাগ করবে।’
একটু থেমে আবার শুরু করলেন কমলেশ, “তারপরে বনমালা এসে বলে কেউ ওর কানে কানে বলছে, ‘বাঁচতে দেব না, বাঁচতে দেব না।’ কিন্তু তখনও খুনের কথা জানতে পারেনি। তখন একবার মনে হল, বনমালার ব্যাপারটা কি তাহলে প্রিমনিশেন? আগাম আঁচ পাচ্ছে ঘটনার? এইরকম উদাহরণ আছে। তারপরে আমার উপরে আক্রমণের ঘটনা ঘটল। তখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম, প্রিমনিশনের কেস এটা। স্প্লিট পার্সোনালিটির নয়। তারপরে…।” বলতে বলতে থেমে গেলেন কমলেশ।
“তারপরে কী হল?” অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন শর্মিষ্ঠা।
“তারপরে আমি ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখলাম, অরণ্য জড়িয়ে ধরে আছে বনমালাকে। ওরা আমার দিকে পিছন করে বসে ছিল। কিন্তু আয়নায় মুখগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। বনমালার মুখটা দেখে আমি চমকে যাই। মেয়েটার মুখে অপরিসীম ঘৃণা ফুটে উঠেছে। একটা হিংস্র ভাব বদলে দিয়েছে সুন্দর মুখটাকে। ওই মুহূর্তে বুঝে যাই, বনমালা স্প্লিট পার্সোনালিটির শিকার। আর একজন পুরুষের স্পর্শে ওই দ্বিতীয় সত্তা তখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। আপনাকে ফোন করেই দ্রুত ঘরে ঢুকে ব্যাপারটা সামলাই।”
“ওই সেক্সুয়াল অ্যাবিউসের ব্যাপারটাও কি সন্দেহ করেছিলেন?”
“অরণ্যর স্পর্শে যখন বনমালার মধ্যে পরিবর্তনটা এল, তখনই বুঝেছিলাম, সেক্সুয়াল অ্যাবিউসের কেস এটা। আরও নিশ্চিত হতে পরে আবার অরণ্যকে বলি বনমালাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে। তখনই সব পরিষ্কার হয়ে গেল, নিশ্চিত হয়ে গেলাম।”
একটু থামলেন কমলেশ। তারপরে বলে চললেন, “দেখুন ম্যাডাম, আমাদের কাছে যদি চাইল্ড অ্যাবিউসের দশটা কেস আসে, তাহলে তার মধ্যে আটজনই মেয়ে আর তাদের বয়স খুব বেশি হলে ওই বারো-তেরো-চোদ্দো। বেশিরভাগই আরও কম। এই ধরুন চার-পাঁচ বছর। এই ধরনের যৌন বিকৃতির শিকার মেয়েরাই বেশি হয় বিশ্বজুড়ে স্প্লিট পার্সোনালিটির কেসে দেখা গিয়েছে যৌন অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে ভিকটিম আর একটা পার্সোনালিটি তৈরি করে ফেলেছে। সেই পার্সোনালিটি যদি ভায়োলেন্ট নেচারের হয়, তাহলে এইরকমই পরিণতি দেখা যায়।”
“এই পার্সোনালিটি ট্রিগার্ড হয় কী করে?”
“বনমালা যে-হেতু যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছিল, তাই ওর ক্ষেত্রে কোনও অবাঞ্ছিত শারীরিক স্পর্শ ব্যাপারটা ট্রিগার করত। কনকমালা জেগে উঠত। তারপরে প্ল্যান করত, কীভাবে প্রতিশোধ নেবে। অরণ্যর ক্ষেত্রে দ্রুত ঘটেছিল ব্যাপারটা। ঘরে থাকা ফল কাটার ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে বনমালা বা কনকমালা।” চুপ করলেন কমলেশ। তারপরে স্বগতোক্তি করলেন, “কনকমালার পার্সোনালিটিটা ক্রমে হিংস্র হয়ে উঠছিল। আর বনমালার উপরে কর্তৃত্ব করা শুরু করছিল। যেজন্য অরণ্যের উপরে ওরকম হঠাৎ আক্রমণ।” একটু থামলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, কনকমালার সত্তা নিশ্চয়ই অরণ্যের ওপর বেশ কয়েকদিন ধরে রুষ্ট ছিল। যে কারণে অবচেতন মনে অরণ্যের বিপদ আশঙ্কা করে শেষ স্বপ্নটা দেখেছিল বনমালা।”
ঘরে আর কেউ কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।
.
শর্মিষ্ঠা প্রচণ্ড দোটানায় পড়ে গিয়েছিলেন। এখন কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। বনমালাকে গ্রেফতার করবেন? কিন্তু প্রমাণ কোথায়?
শর্মিষ্ঠার মনের কথা বুঝতে পেরে কমলেশ বলে উঠলেন, “আপনার সামনে একটাই রাস্তা মিস বসু। যেভাবে কেসটা সাজিয়েছেন, সেভাবেই রাখুন। জয়ন্ত দোষ স্বীকার করেছে। এর মধ্যে আপনি বনমালাকে কোনওভাবেই জড়াতে পারবেন না। কোনও প্রমাণ নেই ওর বিরুদ্ধে। আর জেরা করেও লাভ নেই। লাই ডিটেক্টরের সামনে বসিয়েও ফল হবে না। বনমালার মনেই নেই ওই খুনের ঘটনাগুলো। মনে থাকত না বলেই জয়ন্ত ওর বোনের মধ্যে কোনও বিকার লক্ষ করেনি।”
শর্মিষ্ঠা বুঝতে পারছিলেন, কমলেশের কথা মানা ছাড়া উপায় নেই। একে জয়ন্তর স্বীকারোক্তি যখন প্রকাশ্যে আসবে তোলপাড় পড়ে যাবে পুলিশ-প্রশাসন মহলে। সাত বছর আগের ঘটনা নিয়ে মিডিয়া ঝড় তুলে দেবে। তার মধ্যে তিনি যদি বনমালা আর ওর স্প্লিট পার্সোনালিটির ব্যাপার টেনে আনেন, তাহলে আর দেখতে হবে না। নিশ্চিতভাবে তাঁর চাকরি যাবে। এটা অস্ট্রেলিয়া নয়, পশ্চিমবঙ্গ। এখানে মানুষের ধ্যান-ধারণা একটা জায়গাতেই আটকে। বদল চায় না এরা।
কমলেশ এবার তাকালেন জয়ন্তর দিকে, “তুমি কী বলবে?”
জয়ন্ত দৃঢ় স্বরে বলে উঠল, “আমি এতদিন যা বলে এসেছি, সেটাই বলব। চারটে খুন আমিই করেছি।”
কমলেশ জানতেন, ছেলেটা এই কথাই বলবে। তারপরে জয়ন্তর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তোমার কাছে একটাই অনুরোধ। কেন খুনগুলো করেছিলে, সেটা সকলের সামনে বোলো। আদালতে বোলো। বিশেষ করে সাত বছর আগের দুটো খুনের কারণটা।”
চমকে উঠল জয়ন্ত, “কী বলছেন আপনি? তাহলে আমার বোনের সম্মান কি থাকবে? ও কি আর মুখ দেখাতে পারবে?”
শান্ত স্বরে জয়ন্তকে বোঝাতে লাগলেন কমলেশ, “আমাদের এই ধারণা থেকে বার হয়ে আসতে হবে। মেয়েটার তো কোনও দোষ নেই। তাহলে ও কেন মুখ লুকিয়ে থাকবে? আর তুমি যদি সব জানাও, তাহলে অভিভাবকেরা সতর্ক হবে। তোমার আরও অনেক বোন এইরকম নরাধম কীটের শিকার হওয়া থেকে বাঁচবে। আমার কথাটা একটু ভেবে দেখো।”
থামলেন কমলেশ। তারপরে কিছুটা আনমনে বললেন, “শিশুদের সবচেয়ে বেশি নিপীড়ন করে ওদের কাছের মানুষেরা। আত্মীয়স্বজন, পারিবারিক বন্ধুবান্ধব, এইরকম কিছু নরাধম। যাদের আমরা ভরসা করি। তাই আমাদের সবাইকে ভীষণ সতর্ক থাকতে হবে।”
.
জয়ন্ত মাথা নীচু করে রইল। কোনও জবাব দিল না।
শর্মিষ্ঠা বসুর সামনে এসে দাঁড়ালেন কমলেশ। লেডি সাব-ইন্সপেক্টর উঠে দাঁড়ালেন।
“আপনি এবার জয়ন্তকে নিয়ে যান। বুঝতেই তো পারছেন, আজ যদি এখানে না আসতেন, তাহলে কত বড়ো সত্যিটা আড়ালে থেকে যেত।”
কমলেশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন শর্মিষ্ঠা। করমর্দন করে বললেন, “অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আজ আমি সম্পূর্ণ অন্য এক জগতের সঙ্গে পরিচিত হলাম।”
তারপরে একটু ইতস্তত করে শর্মিষ্ঠা জিজ্ঞেস করলেন, “বনমালার কী হবে?”
“বনমালার ব্যাপারটা আমার উপরে ছেড়ে দিন। ওকে নিয়ে কী করতে হবে, আমি ঠিক করে ফেলেছি।”
“ওকে স্যার, ইউ আর দ্য বেস্ট জাজ,” বলে জয়ন্তর দিকে ফিরলেন শর্মিষ্ঠা। পুলিশ অফিসারের দৃষ্টিতে ছেলেটির প্রতি মায়া এবং শ্রদ্ধা, দুটোই ফুটে উঠছিল, “জয়ন্তবাবু, এবার তো আমাদের যেতে হবে।”
শর্মিষ্ঠার কথা শুনে উঠে দাঁড়াল জয়ন্ত।
দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে পিছু ডাকলেন কমলেশ রায়, “মিস বসু, একটা কথা। দেখবেন, জয়ন্তর যেন জয়দেব পাড়ুইয়ের মতো অবস্থা না হয়। ছেলেটার যদি কোনও ক্ষতি হয়, তাহলে আমি ঝড় তুলে দেব। সেই ক্ষমতা আমার আছে। বিশ্বাস করুন, সেই ঝড় আপনারা সামলাতে পারবেন না।”
কমলেশের শীতল দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে শর্মিষ্ঠা বসু বুঝে গেলেন, লোকটা যা বলছে, তা করে দেখানোর ক্ষমতা রাখে।
