প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ৩.৭

শান্তিনিকেতন, ২০২১

৪৮ ঘণ্টা পরে…

ভোর ছ-টা।

গাড়ির ডিকিতে মালপত্র তোলা হয়ে গিয়েছে।

অত সকালেও অরণ্যদের বাড়িতে চলে এসেছেন শর্মিষ্ঠা বসু।

তাঁকে আলাদা করে একটা ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন কমলেশ।

“আপনার উপরে কিন্তু অনেক কিছু নির্ভর করে আছে মিস বসু। বিশেষ করে জয়ন্তর নিরাপত্তার ব্যাপারটা। অনেকেই চাইবে না জয়ন্ত আদালতে দাঁড়িয়ে সত্যি কথা বলুক।”

“আপনি চিন্তা করবেন না মিস্টার রায়। আমি এসপি সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছি। আপনার কথাও বলেছি। এসপি-র পুরো সাপোর্ট পাব। আমি লড়ে যাব। সত্যিটা সামনে আসবেই।”

“ওই দুটো লোকের কী হবে? ডাক্তার অমর চৌধুরী আর সমীরণ দত্ত?”

“কেউ রেহাই পাবে না। শাস্তি ওরা পাবেই।”

“অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার মতো পুলিশ অফিসারই আমাদের দরকার,” করমর্দন করার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিলেন কমলেশ।

হাতে হাত মিলিয়ে শর্মিষ্ঠা বলে উঠলেন, “আর বনমালার কী হবে?”

বনমালার নামটা শুনেই কমলেশের মুখটা কোমল হয়ে গেল। তিনি বললেন, “বনমালাকে আমি একটা রিহ্যাব সেন্টারে পাঠাব। তামিলনাড়ুর একটা রিহ্যাব সেন্টার। বিশ্বের নানা জায়গা থেকে ওখানে লোকে চিকিৎসা করাতে আসে। ওয়ান অব দ্য বেস্ট সেন্টার্স ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। মানসিক রোগমুক্তির অন্যতম সেরা কেন্দ্র। বনমালার দায়িত্ব এখন থেকে আমার।”

প্রশ্নটা করবেন কি না, বুঝতে পারছিলেন না শর্মিষ্ঠা। শেষ পর্যন্ত করেই ফেললেন-

“আচ্ছা, বনমালা কি কখনও সুস্থ হতে পারবে? এই স্প্লিট পার্সোনালিটির রোগ কি কোনওদিন সারে?”

একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “ওই ভয়ংকর কৈশোর বনমালার মনে খুব গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। যে কারণে কেউ ওকে একটু অন্যভাবে স্পর্শ করলেই ওর অন্য পার্সোনালিটিটা ট্রিগার্ড হয়ে যাচ্ছে। বনমালার মধ্যে কনকমালা ফুটে উঠছে।”

জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন কমলেশ। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য আর বনমালা। ওই ভয়ংকর রাতে বনমালাকে কয়েকটা কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন কমলেশ।

.

সেই রাতে কমলেশ বাড়ি ফেরার পরে তাঁর কাছে এসে কেঁদে পড়ে বনমালা।

“কমলেশ কাকা, কী হয়েছে আমার? কিছু যে হয়েছে, তা বুঝতে পারছি। আপনি দয়া করে সত্যি কথা বলুন।”

মেয়েটাকে শান্ত করে কমলেশ বললেন, “তোমার যে সমস্যাটা হচ্ছে, তাকে বলে ডিসোসিয়েটিভ পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার। মানে হল, মাঝে মাঝে তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলো। নিজের মধ্যে থাকো না। তখন তোমার মধ্যে অন্য একটা পার্সোনালিটি জেগে ওঠে। সেই পার্সোনালিটির কথা পরে আর তোমার মনে থাকে না।”

অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বনমালা প্রশ্ন করে, “কার পার্সোনালিটি জেগে ওঠে আমার মধ্যে?”

“তোমার মায়ের। কনকমালার ছবিটা তোমার মনে এতটাই গেঁথে আছে, যে মাঝে মাঝে তুমি তোমার মায়ের মধ্যে হারিয়ে যাও।”

বনমালা যতটা ধাক্কা খাবে বলে মনে হয়েছিল কমলেশের, ততটা ধাক্কা খেলো না। বরং, মেয়েটার মুখে একটা বিষাদের ছায়া খেলে গেল।

“জানেন কমলেশ কাকা, ছোটোবেলায় আমি সুযোগ পেলেই মায়ের ছবিটার সামনে বসে থাকতাম। মায়ের শাড়িগুলো দেখতাম। স্টোররুমে গিয়ে মায়ের জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতাম। মনে হত, মা যেন আমার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে।”

“মায়ের অভাবটা তোমার মনে এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছিল যে তুমি কল্পনায় মাকে তৈরি করে নিয়েছিলে। এইরকম উদাহরণ আরও আছে।”

“মাঝে মাঝে আমি কোথাও হারিয়ে যেতাম। ওই সময়ের কথা কিছুই মনে পড়ত না। মনে হত, একটা অন্ধকার কুঠুরির মধ্যে বসে রয়েছি। কয়েকবার মাঝরাতে আমি নিজেকে মায়ের শাড়ি পরা অবস্থায় আবিষ্কার করি। কখন যে পরলাম, কীভাবে যে ওই স্টোররুম থেকে মায়ের শাড়ি আমার কাছে চলে এল, তা কখনও বুঝিনি। কাউকে বলিওনি ওই সব ঘটনা।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করল বনমালা।

“একজ্যাক্টলি। এই ব্যাপারটার কথাই আমি বলছি। এটা কোনও রোগই নয়। সামান্য একটা মানসিক সমস্যা। দ্রুত সারিয়ে তুলব তোমাকে।

“এখন আমি কী করব? অরণ্যদের বাড়িতে তো থাকা সম্ভব নয়। আর ওই বাড়িতে আমি ফিরে যেতে চাই না।” চোখ দুটো ছলছল করে উঠল বনমালার।

“তোমাকে ফিরে যেতে হবে না। এই বাড়িতেও থাকতে হবে না। তুমি আমার সঙ্গে যাবে।”

“কোথায়?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল বনমালা।

“তামিলনাড়ুর একটা জায়গায়। একটা সুপার এক্সক্লুসিভ রিহ্যাব সেন্টারে। সেখানে কিছুদিন থাকবে। পড়াশোনাও চালিয়ে যাবে। তারপরে নিজের জীবনের গতিপথ নিজেই ঠিক করবে।”

“সত্যি? পারব আমি?” কথাগুলো যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না বনমালার। তারপরেই একটু ম্রিয়মাণ হয়ে গেল তার চোখ-মুখ। “কিন্তু টাকা পয়সা কোত্থেকে পাব? আমার নিজের বলে তো কিছু নেই। বাবা কি ওই টাকাটা দেবে আমাকে?”

মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন কমলেশ, “ওই সব নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। আমি তোমার বাবার সঙ্গে পরে কথা বলব। যদি নাও দেন তিনি, আমি তো আছি। ভাবছ কেন? পরে তুমি চাকরি পেয়ে শোধ করে দিও, তাহলেই হবে।”

দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল বনমালার। সে ঝুঁকে প্রণাম করল কমলেশকে। এই মানুষটার ঋণ সে কোনওদিন শোধ করতে পারবে না।

.

…জানলা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে শর্মিষ্ঠার দিকে তাকালেন কমলেশ।

“আপনার প্রশ্নের কোনও সহজ উত্তর নেই। এই ধরনের কেসে পেশেন্টকে কখনও সুস্থ বলা চলে না, আবার অসুস্থও বলা চলে না। বনমালার মধ্যে সাত বছর কোনও প্রভাব লক্ষ করা যায়নি। তারপরে হঠাৎ জেগে ওঠে কনকমালা। সেরকমই কখন কী হবে, কেউ বলতে পারে না। তবে…।”

“তবে?” অধীর আগ্রহে জানতে চাইলেন শর্মিষ্ঠা।

“বনমালার এই ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারে শুধুমাত্র ভালোবাসা, কোনও ওষুধ নয়। ভালোবাসাই পারে মেয়েটাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলতে। দেখা যাক, সেই ভালোবাসা বনমালাকে আমরা দিতে পারি কি না।”

বাইরে থেকে অরণ্য ডাকল, “কাকা চলে এসো। এরপরে দেরি হয়ে যাবে।”

.

অরণ্যও ফিরে যাচ্ছে কলকাতা। তার ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। গত দু-দিনে শুধু বনমালা নয়, অরণ্যকেও বোঝাতে হয় কমলেশকে। তার ছোটোবেলার বন্ধুর এই ভয়ংকর পরিবর্তনটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না অরণ্য। যখনই ছুরি হাতে বনমালার মুখটা মনে পড়ছিল, শিউড়ে উঠছিল ছেলেটা।

অরণ্যকে ডেকে আলাদা করে কথা বলেন কমলেশ। বোঝাতে হয় বনমালার সমস্যাটা। বোঝাতে হয়, মেয়েটাকে সুস্থ করতে হলে তাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ধীরে ধীরে কিছুটা স্বাভাবিক হয় অরণ্য।

.

কমলেশ ঠিক করে রেখেছেন, দিন কয়েক কলকাতায় থেকে বনমালাকে নিয়ে তিনি উড়ে যাবেন চেন্নাই। সব ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে।

ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন শর্মিষ্ঠা আর কমলেশ।

গাড়ির সামনে তখন ছেলে-মেয়ে দুটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে অরণ্যর বাবা-মা। তাঁরা নানা পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। আর মন দিয়ে সেসব শুনছে বনমালা। অরণ্যর বাবা-মায়ের কানে আর সেই রাতের ঘটনাটা তোলা হয়নি।

ড্রাইভারের আসনে গিয়ে বসলেন কমলেশ। অরণ্য উঠে পড়ল পিছনের সিটে।

বনমালার পাশে এসে দাঁড়ালেন শর্মিষ্ঠা। তারপরে বললেন, “তোমাকে কিন্তু আবার শান্তিনিকেতনে ফিরে আসতেই হবে। তোমার এক দিদি তোমার জন্য এখানে অপেক্ষা করে থাকবে।”

শর্মিষ্ঠাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলল বনমালা। তারপরে গাড়িতে গিয়ে উঠল।

.

গর্জন করে উঠল গাড়ির ইঞ্জিন। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে মিলিয়ে গেল দিগন্তে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *