৩
শান্তিনিকেতন, ২০২১
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবলেন কমলেশ। তারপরে আবার মোবাইলটা কানে লাগিয়ে কাউকে যেন বললেন, “ঠিক আছে, তাহলে ওই কথাই হইল। পরে তোমাকে ফোন করে নেব।”
ছেলে-মেয়ে দুটিকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলতে চাননি কমলেশ। তাই আগে থেকে একটু সতর্ক করে দেওয়া আর কী!
কাকার গলার আওয়াজ পেয়েই ছিটকে সরে গেল অরণ্য। বনমালা একইভাবে মাথা নীচু করে বসে রইল।
ঘরে ঢুকে এলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “আচ্ছা, প্রায় নটা বাজতে চলল। এবার তোরা ঘরে যা। আমি একটু বিশ্রাম নেব।”
অরণ্য সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ কাকা। তোমার বিশ্রাম প্রয়োজন।” তারপরে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল, “চল মালা, আমরা এবার যাই।”
বনমালা কোনও উত্তর দিল না। সে যেন কিছু শুনতেই পায়নি।
“এই মালা, কী হল তোর? চল, আমরা যাই,” আরও একবার বলে উঠল অরণ্য। বনমালা এবারও শুনতে পেল না। গভীর কোনও ভাবনায় যেন ডুবে আছে মেয়েটা। অরণ্য এগিয়ে যাচ্ছিল বনমালার দিকে। তাকে থামালেন কমলেশ। তারপরে আস্তে আস্তে বললেন, “বনমালা শুনতে পাচ্ছ?” বার দুয়েক কথাটা বলার পরে মাথাটা ঝাঁকিয়ে ঘুরে তাকাল মেয়েটা।
“ওহ, কমলেশ কাকা! কিছু বলছেন? কী হয়েছে?”
“না না, কিছু না। আসলে ক্লান্ত লাগছে, একটু বিশ্রাম করতে চাই। সেটাই বলছিলাম।”
অরণ্য এগিয়ে এল, “চল, আমরা ঘরে যাই। কাকা একটু বিশ্রাম করুক।”
.
বনমালাকে দেখে খুব খারাপ লাগছিল অরণ্যর। মেয়েটার ওপর দিয়ে এত ঝড়- ঝাপটা যাচ্ছে, ভাবাই যায় না।
বনমালা উঠে দাঁড়াল, “আচ্ছা, কমলেশ কাকা, গুডনাইট।”
দুজনে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তখনই কমলেশ বলে উঠলেন, “অরণ্য, তুই একটু শুনে যা তো।”
অরণ্য আবার ঘরে ঢুকল।
“মালা কোথায়?” জানতে চাইলেন কমলেশ।
“ও নিজের ঘরে গেল।”
“ঠিক আছে, মিনতি ফিরেছে?”
“না, মিনতি মাসির ফিরতে ফিরতে রাত নটা বেজে যায়।”
“ঠিক আছে। শোন, তোকে একটা কাজ করতে হবে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মন দিয়ে আমার কথা শোন।”
অরণ্যর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিশফিশ করে কিছু বললেন কমলেশ।
শুনে মুখটা হা হয়ে গেল অরণ্যর। কিছুটা লজ্জা পেয়ে সে বলে উঠল, “ধ্যাৎ, কী যে বলো কাকা, এইসব করা যায় নাকি? ইয়ার্কি করছ নাকি আমার সঙ্গে?” অরণ্যর মনে হল, মিনিট পাঁচেক আগের দৃশ্যটা নিশ্চয়ই দেখে নিয়েছে কমলেশ কাকা। আর তাকে নিয়ে এখন ঠাট্টা করছে। যাকে বলে নিখাদ ‘লেগ পুলিং!”
অরণ্যর কাঁধে হাত রাখলেন কমলেশ। তারপরে ভাইপোর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আমি যা বলছি, ঠিকঠিক সেই কাজটা করবি। একটুও যেন এদিক-ওদিক না হয়। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজের দায়িত্ব দিলাম তোকে।”
কমলেশের চোখের দিকে তাকিয়ে অরণ্য বুঝে গেল কাকা ইয়ার্কি মারছে না। ভীষণ সিরিয়াস। কিন্তু এই সবের মানে কী! এই কাজের ফল কী হবে, ভগবান জানে। তার কপালে আজ দুঃখ আছে মনে হচ্ছে। কিন্তু কী আর করা যাবে! কাকার মুখ-চোখের যা ভাব, কাজটা না করলে তাকেই হয়তো একটা চড় কষিয়ে দেবে।
“ঠিক আছে, যা বলছ করছি। কিন্তু কোনও ঝামেলা হলে তুমি সামলাবে,” দ্বিধাজড়িত গলায় বলল অরণ্য। “তুই ঘাবড়াস না, আমি তো আছি। আমার উপরে ভরসা রাখ,” হাসিমুখে জবাব দিলেন কমলেশ।
একটুও ভরসা রাখতে পারছিল না অরণ্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
নিজের ঘরে একা বসেছিল বনমালা। খাটের উপরে দরজার দিকে পিছন ফিরে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এল অরণ্য। তারপরে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল বনমালাকে। কানের কাছে মুখটা নিয়ে বলতে লাগল, “তুই ভয় পাচ্ছিস কেন মালা? আমি তো আছি! কিছুই হবে না তোর।”
বনমালা যেন কিছুই শুনছিল না। তার শরীরটা অসাড় হয়ে গিয়েছে। আর একটু জোর দিয়ে আলিঙ্গন করে অরণ্য বলে উঠল, “কী রে কিছু বলছিস না কেন, মালা? ভয় কী তোর?”
তাও কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না। বনমালার কানে যেন কথাগুলো ঢুকছিলই না।
হঠাৎ অরণ্য টের পেল বনমালার শরীরটা কীরকম শক্ত হয়ে উঠল। হাতের পেশিগুলো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। খুব খুব চাপা স্বরে বনমালা কী যেন বলছে। কিন্তু কিছু বোঝা যাচ্ছে না। মনের কোনও এক গহিন কোণ থেকে যেন ভেসে আসছে শব্দগুচ্ছ। অরণ্য ভালো করে শোনার চেষ্টা করল। “কিছু বলছিস মালা?’
তখনই ঝটকাটা মারল বনমালা। একেবারেই প্রস্তুত ছিল না অরণ্য। বনমালার কনুইটা সোজা এসে তার বুকে আঘাত করল। যন্ত্রণাটা তার মস্তিষ্ক উপলব্ধি করার আগেই বনমালার ধাক্কায় বিছানার উপরে গড়িয়ে পড়ল লম্বা-চওড়া ছেলেটা।
তারপরে বনমালার মুখের দিকে নজর গেল অরণ্যর। সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, কী দেখছে। বনমালার মুখটা বিকৃত হয়ে গিয়েছে রাগে-ঘেন্নায়। চোখ দুটো লাল। খোলা চুল নেমে এসেছে কাঁধের দু- পাশে। বিজাতীয় রাগে মুখ থেকে ফেনা বেরিয়ে এসেছে।
হাড়হিম করা আতঙ্ক নিয়ে আরও একটা জিনিস দেখতে পেল অরণ্য। বনমালার ডানহাতটা নেমে আসছে তার তলপেট লক্ষ্য করে। সেই হাতে ধরা একটা ছুরি।
.
ভয়ে-আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলল অরণ্য। সে আর এই দৃশ্য সহ্য করতে পারছে না। প্রতিরোধ করার যাবতীয় ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে ছেলেটা। এখন শুধু শীতল মৃত্যুর স্পর্শের অপেক্ষা।
সেই স্পর্শ আর এল না। বনমালার হাতের ছুরি ছুতে পারল না অরণ্যকে। তার আগেই কমলেশ রায়ের জোরালো মুঠিতে আটকে গেল বনমালার কবজি
প্রচণ্ড আক্রোশে ঘুরে তাকাতে গেল বনমালা। কিন্তু পারল না। একটা হাত জখম থাকা সত্ত্বেও নিজের শরীরের ভারটা কাজে লাগিয়ে বনমালাকে বিছানায় ফেলে দিলেন কমলেশ। হাজার চেষ্টা করেও মুঠি ছাড়াতে পারল না বনমালা। অক্ষম রাগে সে তখন গরগর করছে। চেষ্টা করে চলেছে শরীরটাকে মোচড় দিয়ে মুক্ত করার।
ওই অবস্থাতেও কমলেশ একটুও উত্তেজিত হলেন না। বনমালাকে সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরে তিনি শুধু মেয়েটার কানে বলে যেতে লাগলেন, “শান্ত হও বনমালা, শান্ত হও বনমালা। আমার কথা শুনতে পাচ্ছ বনমালা? সাড়া দাও, সাড়া দাও।”
মন্ত্রোচ্চারণের মতো করে বনমালার নামটা ধরে ডেকে যেতে লাগলেন কমলেশ।
অরণ্য তখন চোখ দুটো খুলেছে। কিন্তু সামনের দৃশ্যটা তার শরীরের চলৎশক্তি যেন সম্পূর্ণ কেড়ে নিয়েছে। মৃতবৎ অবস্থায় পড়ে সে শুধু দেখে যেতে লাগল দৃশ্যটা।
কতক্ষণ অভিনীত হয়েছিল ওই করাল নাটক, তা অরণ্য কোনওদিনও বুঝতে পারেনি। ওই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিল, সময় যেন থমকে গিয়েছে। পৃথিবী যেন ঘোরা বন্ধ করে দিয়েছে। জীবন যেন থেমে গিয়েছে।
.
ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ল বনমালার শরীর। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল তার। তারপরে এলিয়ে পড়ল বিছানায়।
ইশারায় অরণ্যকে উঠে আসতে বললেন কমলেশ। যন্ত্রের মতো কাকার পাশে এসে দাঁড়াল অরণ্য। কমলেশ ততক্ষণে ছুরিটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছেন।
বনমালার মুখটা তখন আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এবার চোখের পাতা খুব দ্রুত কাঁপতে লাগল। যাকে চিকিৎসকরা বলে থাকেন, আর ই এম (রেম), র্যাপিড আই মুভমেন্ট। হাতের আঙুলগুলো কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। কমলেশ দ্রুত অরণ্যর দিকে ফিরে বললেন, “একদম স্বাভাবিক থাক। একটু আগে কী ঘটে গিয়েছে, সে কথা ভুলেও বনমালার সামনে বলবি না।”
ফ্যাকাশে মুখে মাথা নাড়ল অরণ্য। সে কথা বলবে কী! বাকশক্তিই যেন হারিয়ে ফেলেছে।
ধীরে ধীরে চোখ মেলল বনমালা। মাথাটা একবার ঝাঁকিয়ে নিল মেয়েটা। তারপরে অবাক দৃষ্টিতে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ দুটির দিকে তাকাল। ফের ঝাঁকাল মাথাটা। তারপরে ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়।
“কী ব্যাপার কমলেশ কাকা? কী হয়েছে অরণ্য? তোরা এখানে কী করছিস? “ তারপরে অরণ্যর মুখের দিকে তাকিয়ে বনমালা বলে উঠল, “তোর মুখটা ও রকম অদ্ভুত হয়ে আছে কেন? যেন ভূত দেখেছিস!”
ফ্যাকাশে মুখটা আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল অরণ্যর। তাও জোর করে একটা হাসি ফোটাল ঠোঁটের কোণে।
কমলেশ এবার কথা বললেন, “আসলে তুমি হঠাৎ জ্ঞান হারিয়েছিলে। অরণ্য তাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে। আমিও চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।”
বনমালা অবাক হয়ে বলল, “জ্ঞান হারিয়েছিলাম? আমি তো এই ঘরে এসে বসেছিলাম। তারপরে…।” জোর করে কী যেন ভাবার চেষ্টা করল বনমালা।
কমলেশ কোমল গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তারপরের কথা তোমার কিছু মনে আছে?”
মনে করার চেষ্টা করল বনমালা। তারপরে ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “না, মনে করতে পারছি না। মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে আছে। ওই সময় কি আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম কমলেশ কাকা?”
“ঠিক তাই। আর জ্ঞান হারাবেই বা না কেন? যা চলছে তোমার ওপর দিয়ে। মানসিক এবং শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছ। একটু অপেক্ষা করো। আমি ফোনে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি।”
বনমালা কোনও কথা না বলে চুপ করে বসে রইল। কমলেশ কাকা একবার অরণ্যর কাঁধটা চাপড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
অরণ্যর মুখের দিকে তাকাল বনমালা। ছেলেটার মুখ এখনও ফ্যাকাশে হয়ে আছে। সে জ্ঞান হারিয়েছিল বলে অরণ্য এরকম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে! কেউ যে তার জন্য এতটা ভাবে, এটা মনে হতেই শত কষ্টের মধ্যে একটু হলেও খুশির ছোঁয়া লাগল বনমালার মনে।
সে অরণ্যর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরে তুই এত ঘাবড়াচ্ছিস কেন? আমার কিছুই হয়নি। একদম ঠিক আছি।”
রুমাল বার করে মুখটা মুছে নিয়ে নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল অরণ্য। “হ্যাঁ, একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তোর ওই অবস্থা দেখে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। তবে এখন ঠিক আছি।”
ঘরের বাইরে গিয়ে শর্মিষ্ঠা বসুকে ফোনে ধরলেন কমলেশ। “ম্যাডাম, আর একটা রিকোয়েস্ট। আপনি সাদা পোশাকের দুজন লেডি কনস্টেবেল পাঠাতে পারবেন আমাদের বাড়িতে? তারা যেন নিজেদের নার্স বলে পরিচয় দেয়। বনমালার শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়েছে।”
অবাক হয়ে শর্মিষ্ঠা বললেন, “তাহলে ডাক্তারকে বলুন। নার্সের ব্যবস্থা করতে হবে। মেয়ে পুলিশ গিয়ে কী করবে?”
“ম্যাডাম, আমি থানায় এসে আপনাকে সব বলছি। কিন্তু প্লিজ, দুজনকে এখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।”
একটু ভাবলেন শর্মিষ্ঠা। এই ভদ্রলোক সম্পর্কে তিনি খোঁজখবর নিয়েছিলেন। কলকাতা পুলিশের উপর মহলে চেনাশোনা আছে লোকটির। বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট। শুনেছেন, নানা কেসে নাকি পুলিশকে সাহায্যও করে থাকেন কমলেশ রায়।
শর্মিষ্ঠা জবাব দিলেন, “ঠিক আছে, আমি বোলপুর মহিলা পুলিশ স্টেশন থেকে দুজন কনস্টেবলকে আপনাদের বাড়ি পাঠাচ্ছি।”
“থ্যাঙ্ক ইউ মিস বসু, ওরা এসে গেলেই আমি থানায় আসছি।” ফোনটা রেখে আবার ঘরে ঢুকলেন কমলেশ।
.
বনমালা চুপ করে খাটে বসে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে অরণ্য।
একটা চেয়ার টেনে বনমালার সামনে বসে পড়লেন কমলেশ।
“তোমাকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি? দু-একটা প্রশ্ন হয়তো আগেও করেছি। কিন্তু আবারও করব।”
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল বনমালা।
শুরু করলেন কমলেশ-
প্রশ্ন: কখনও তোমার মনে এমন ভাবনা-চিন্তা এসেছে, যেগুলো তোমার নয়। মানে ওই ধরনের চিন্তা তোমার মাথায় আসার কথাই নয়? ভাবনাটা যেন অন্য কারও?
বনমালা (একটু ভেবে নিয়ে): আপনাকে তো বলেছি, অনেক রকমই চিন্তা-ভাবনা আমার মাথায় চলে আসে। অনেক আগডুম বাগডুম কথা, যার মানে অনেক সময় আমিও বুঝতে পারি না।
প্রশ্ন: আচ্ছা ঠিক আছে। কখনও মনে হয়েছে, এমন কোনও কাজ করেছ, যা তোমার করার কথা নয়। তুমি সেসব করতে চাওনি?
বনমালা (আবারও অনেকটা সময় ভেবে নিয়ে): মানে ঠিক করে তো বলতে পারব না। কখনও কখনও মনে হয়েছে, আমি এখানে কী করছি? আমি কেন এই জায়গায় এলাম? তখন তো বেশ ছোটো ছিলাম। ঠিক স্পষ্ট মনে নেই এখন।
প্রশ্ন: কোনও ঘটনার কথা মনে পড়ে?
বনমালা: কয়েকবার বাড়ির স্টোররুমে নিজেকে আবিষ্কার করি। মানে মায়ের জিনিসপত্র যেখানে রাখা থাকত। কেন গিয়েছিলাম, মনে করতে পারি না। মাঝে মাঝে হঠাৎ দেখতাম, রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। রাতের বেলায়। বড়ো হওয়ার পরেও এইরকম হয়েছে কয়েকবার। মনে হত, ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস আছে নাকি আমার? তবে কাউকে কিছু বলিনি। কাকে বলব? মা বেঁচে থাকলে হয়তো বলতাম।
প্রশ্ন: মায়ের কথা খুব মনে পড়ে তোমার?
বনমালা: খুব। ছোটোবেলা থেকেই সুযোগ পেলে মায়ের ওই ছবিটা দেখতাম। মন খুব খারাপ হয়ে গেলে মায়ের ছবির সামনে বসে থাকতাম। কেউ তো আর ছিল না, যার সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নেওয়া যায়। দাদাকেও সব বলা যেত না। অনেক সময় মনে হত, মা যেন আমার সঙ্গেই আছে।
প্রশ্ন: কোনও সময় মনে হয়েছে, তোমার কিছু মনে পড়ছে বা কিছু বলতে চাইছ, কিন্তু বলতে পারছ না। মনের মধ্যে তোমাকে যেন কেউ বাধা দিচ্ছে?
বনমালা: মাঝে মাঝে এমন লাগে, যেন মাথাটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুতেই পারছি না। একটা টাইম গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে। ধরুন একটা দিনের কিছুটা সময় আমি কী করেছি, এটা মনে করতে পারি না। চেষ্টা করেও পারি না। তবে আমি ওইসব নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি।
প্রশ্ন: কখনও মাথার মধ্যে কারও কথা শুনেছ? যেন কেউ তোমাকে কিছু বলতে চাইছে?
বনমালা: হ্যাঁ, আপনাকে তো বলেইছিলাম ব্যাপারটা। ছোটোবেলাতেও ঘুম পাওয়ার আগে মনে হত, কেউ আমাকে ছড়া শোনাচ্ছে। মাথার মধ্যে কারও কথা যেন শুনতে পাচ্ছি। তাছাড়া স্বপ্নের ব্যাপারটা তো আছেই।
.
মাথা নাড়লেন কমলেশ। তারপরে প্রশ্ন করলেন, “সেই কণ্ঠস্বর কি তোমাকে কোনও কাজ করতে বলত বা অন্য কিছু? কোনও কাজ করতে বাধা দিত? তুমি কিছু বলতে চাও, কিছু মনে করতে চাও, কিন্তু করতে পারো না?”
আবার ভাবল বনমালা। সে যেন কিছু মনে করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। কিছু বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। বনমালার হাতটা কাঁপছে।
কমলেশ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বনমালার দিকে। তারপরে বললেন, “ঠিক আছে, বাদ দাও ওই সব কথা। একটা জিনিস বলো। তোমার কি কখনও কখনও মাথা যন্ত্রণা হয়? ব্ল্যাক আউট হয়ে যাও? শরীর খারাপ লাগে?”
“হ্যাঁ, ছোটোবেলাতেও আমার মাঝে মাঝে মাথা ধরে থাকত। অনেক কিছু ভুলে যেতাম। ব্ল্যাক আউট বলতেই পারেন। এই তো এই ঘরে ঢোকার পরে কী হয়েছে, ভুলে গিয়েছি। আপনারা বলছেন, অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।”
বনমালার কাঁধটা চাপড়ে দিলেন কমলেশ। “ঠিক আছে, কোনও সমস্যা নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এমন সময় বাইরে বেল বেজে উঠল। কমলেশ দ্রুত বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে। গেট খুলে তাঁদের ঘরে নিয়ে এলেন কমলেশ।
তাঁর দাদাও বেরিয়ে এসেছিলেন। অরণ্যর বাবার দিকে তাকিয়ে কমলেশ বললেন, “বনমালার শরীরটা একটু খারাপ হয়েছে। এই দুই ভদ্রমহিলা ট্রেন্ড নার্স। ওরা কিছুটা সময় বনমালার সঙ্গে থাকবে। আমাকে একটু বেরোতে হবে। তুমি কিছু চিন্তা কোরো না।” অরণ্যর বাবা আর কিছু বললেন না। ভিতরে চলে গেলেন। ভাইয়ের কাজে তিনি বিশেষ নাক গলান না।
.
দুটি মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন কমলেশ। ততক্ষণে মিনতি মাসিও চলে এসেছেন। কমলেশ বললেন, “বনমালা, দুজন নার্স এসেছেন। ওরা তোমার কাছে কিছুটা সময় থাকবেন। চিন্তা কোরো না। আমি একটু ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে আসছি।”
এরপরে অরণ্যকে বাইরে ডেকে নিলেন কমলেশ। “তুইও থাক বনমালার সঙ্গে। তবে একটা কথা মাথায় রাখিস। কোনওভাবেই ওকে ছুঁবি না। যা বলবি দূর থেকে।”
অরণ্য চুপ করে রইল। গাড়ির চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন কমলেশ। রাত তখন দশটা।
কমলেশ নিশ্চিত ছিলেন, আজ রাতে আর কারওরই ঘুম হবে না। কতদিন যে হবে না, সেটাই এখন প্রশ্ন।
