১৫
শান্তিনিকেতন, ২০২১
খুব ভালো করে চারদিকটা দেখে নিলেন শর্মিষ্ঠা বসু।
লাশ এখনও সরানো হয়নি। বোতলটা পড়ে আছে পাশে। অর্ধেক মদ সাবাড় কিছুটা গড়িয়ে পড়েছে মাটিতে।
লাশের মুখের দিকে তাকাল শর্মিষ্ঠা। এই লাশের মুখে কোনও গ্যাঁজলা নেই। বমি করার কোনও চিহ্ন নেই। শুধু মাথায় একটা থ্যাঁতলানো আঘাতের চিহ্ন। মনে হয় পাথরের টুকরো দিয়ে কেউ আঘাত করেছিল। আশপাশে পাওয়া যেতে পারে পাথরটা।
ছুরির আঘাতের দাগগুলো অনেকটা একই লাগছে। একই অস্ত্র কি না সেটা আরও পরীক্ষার পরে ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
“বডিটা কার, জানা গেল?” সহকারীর দিকে ফিরে জানতে চাইলেন শর্মিষ্ঠা।
“হ্যাঁ ম্যাডাম। সজল পাল নামের একটা ছেলের। বাজারে মুরগির মাংসের দোকান আছে। ওর এক বন্ধু আইডেন্টিফাই করেছে।”
“নিয়ে এসো সেই ছেলেটাকে।”
একটা ছেলেকে টেনে সামনে এনে দাঁড় করাল কনস্টেবল।
“তুমি এখানে কী করছিলে?”
হাতজোড় করে ছেলেটা বলল, “সজল আর আমি খুব ভালো বন্ধু। কাল সন্ধ্যায় সজল বলল, কোপাইয়ের এখানে একজনের সঙ্গে দেখা করতে আসবে। ভালো দাঁও আছে। মোটা টাকার ব্যাপার।”
“কার সঙ্গে দেখা করতে আসবে বলেছিল?”
“না ম্যাডাম। শুধু বলেছিল, নামটা পরে বলবে আর এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চলেছে। রাত থেকে ওকে মোবাইলে পাচ্ছিলাম না। সকালে দেখলাম ফোন বন্ধ। বাড়িতেও নেই। তাই খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে আসি।
ভ্রূ কুঁচকে উঠল শর্মিষ্ঠার। এক ঢিলে দুই পাখি…!
“আচ্ছা, সজলের কোনও শত্রু ছিল? মানে সম্প্রতি কারও সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল?”
ছেলেটা একটু ভেবে নিয়ে বলল, “কিছুদিন আগে এই কোপাইয়ের পারেই কথা কাটাকাটি হয়েছিল। সজল খেপে ছিল ঘটনাটার পর থেকে।”
“কার সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল?”
“ওই যে সিংহবাড়ির মেয়েটা আছে না, ওর সঙ্গে। আর ওর এক ছেলে বন্ধু, ওই লম্বা করে ছেলেটা। ওদের সঙ্গে ঝামেলা হয়ে যায়। প্রায় মারামারি হতে বসেছিল। ছেলেটা হুমকি দিয়েছিল, এরপরে ঝামেলা হলে মেরে কোপাইয়ে ভাসিয়ে দেবে।”
শর্মিষ্ঠা একটু ভাবলেন। তারপরে কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন, “এই ছেলেটিকে থানায় নিয়ে যাও। ওর স্টেটমেন্ট লাগবে।”
শর্মিষ্ঠা বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁকে দ্রুত অ্যাকশনে নামতে হবে। নাহলে মার্ডার ওয়েপন হারিয়ে যেতে পারে, যদি না খুনি ইতিমধ্যেই কোপাইয়ের জলে ফেলে দিয়ে থাকে সেটা। তবে এই ধরনের খুনি সাধারণত একটা অস্ত্র ব্যবহার করেই খুনগুলো করতে চায়। দেখা যাক মানসিকতাটা যদি সে রকমই হয়।
ওসি-কে ফোনে ধরলেন শর্মিষ্ঠা, “এখনই দুটো সার্চ ওয়ারেন্ট লাগবে স্যার। একটা সিংহবাড়ির জন্য, আর একটা অরণ্য রায়ের জন্য। আমি টিম নিয়ে প্রথমে সিংহবাড়িতে যাচ্ছি। আপনি ওয়ারেন্টের ব্যবস্থা করুন।
তিনি যে থিওরিটা সাজিয়েছিলেন, তা ক্রমে ঠিক প্রমাণিত হচ্ছে। এখন শুধু মার্ডার ওয়েপনটা দরকার। নাহলে সমস্যা। সমীরণ দত্তের মতো তিনি তো আর প্রমাণ তৈরি করতে পারবেন না।
.
মিনিট পনেরোর মধ্যেই সিংহবাড়ির সামনে এসে থামল পুলিশের জিপ।
গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত বাড়ির মধ্যে ঢুকলেন এলএসআই শর্মিষ্ঠা বসু।
পুলিশকে আসতে দেখেই সন্ত্রস্ত মিনতি মাসি এগিয়ে এল।
“বাড়িতে কে কে আছে?” কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন শর্মিষ্ঠা।
“শুধু বড়োবাবু। দুই ভাই-বোনই বেরিয়েছে।”
“ঠিক আছে, আমাদের সঙ্গে উপরে চলুন,” বলে দোতলায় উঠে গেলেন শর্মিষ্ঠা। সঙ্গে তাঁর টিম।
“এবার বলুন জয়ন্তের ঘর কোনটা?”
মিনতি মাসি দেখিয়ে দিল। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। “চাবি আছে?” মাথা নেড়ে না বলল মাসি।
“ভাঙো তালা,” নির্দেশ দিলেন শর্মিষ্ঠা।
তালা ভাঙার আওয়াজে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন দীনেন্দ্র। হতচকিত হয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, “কী হচ্ছে এ সব?”
“আপনি চুপ করে ওখানে দাঁড়ান,” গলার স্বর বদলে গিয়েছে শর্মিষ্ঠার, “আমরা পুরো বাড়ি সার্চ করব। আমাদের কাছে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে।”
পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন দীনেন্দ্র সিংহ।
মিনিট খানেকের চেষ্টায় ভেঙে গেল তালা। ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে পা রাখলেন শর্মিষ্ঠা।
তৈরি হয়েই এসেছিলেন তিনি। গ্লাভস পরে ধীরেসুস্থে তল্লাশি শুরু করলেন। বাকিদের বললেন দরজার সামনে অপেক্ষা করতে।
টেবলের উপরে রাখা ছিল একটা পিঠে নেওয়ার ব্যাগ। যে রকমটা এখন দেখা যায়। ব্যাগটা ধরে খাটে উপুড় করে দিলেন শর্মিষ্ঠা। একটা একটা করে জিনিস বাইরে পড়তে লাগল।
তারপরে হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল শর্মিষ্ঠার মুখ।
যে জিনিসটা তিনি খুঁজছিলেন, তা যে এত সহজে পেয়ে যাবেন, ভাবতে পারেননি।
বিছানার উপরে পড়ে আছে একটা রক্তমাখা ছুরি!
হঠাৎ দরজার সামনে থেকে কে চেঁচিয়ে উঠল, “কী হচ্ছে আমার ঘরে? আমার অনুমতি না নিয়ে কে ঢুকেছে?”
ধাক্কাধাক্কি করে ঘরের ভিতরে ঢুকে এল জয়ন্ত সিংহ। তারপরে নজরে পড়ল খাটের উপরে পড়ে থাকা ছুরিটার উপরে।
জান্তব একটা চিৎকার করে বাইরের দরজার দিকে ছুটল জয়স্ত। কিন্তু কয়েক পায়ের বেশি এগোতে পারল না। বেশ কয়েক জোড়া শক্তিশালী হাতের বেষ্টনীতে আটকে গেল সে।
ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল শর্মিষ্ঠা। তারপরে বলল, “মিস্টার জয়ন্ত সিংহ, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট ফর দ্য মার্ডার অব সজল পাল।” তারপরে ধীরে ধীরে বললেন, “এই তালিকায় আরও নাম যোগ হবে পরে।”
জয়ন্ত কোনও উত্তর দিল না। শুধু গোঁগোঁ করে যেতে লাগল। যেন উন্মত্ত কোনও এক পশু।
হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা দেখলেন দীনেন্দ্র সিংহ।
.
একঘণ্টার মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল শান্তিনিকেতনে। জয়ন্ত সিংহকে অ্যারেস্ট করেছে পুলিশ।
খবরটা শুনে হতবাক হয়ে গেল শতাব্দী আর মানিক। জয়ন্ত?? তারা ভাবতেও পারছে না পুলিশ শেষ পর্যন্ত জয়ন্তকে ধরেছে! তার মানে তো বনমালা বেঁচে গেল! মেয়েটার তো কিছুই হবে না। অক্ষম আক্রোশে গুমড়োতে লাগল ভাই-বোন।
রাগে প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিল মানিক। সে বুঝতেই পারছিল না জয়ন্তকে কী করে ধরল পুলিশ। বিকেলের দিকে আরও খবর আসতে লাগল। প্রকাশ্যে চলে এল সজলের হত্যাকাণ্ড। এও জানা গেল, সজলকে খুন করার অপরাধেই নাকি জয়ন্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
তাহলে প্রবীর সেনের কেসটা কী হল? মানিক বুঝতে পারছিল না। ওই কেসের কোনও প্রমাণ কি এখনও পায়নি পুলিশ? বনমালাকে কি ঘটনার সঙ্গে জড়াতে পারেনি?
মানিক কিছু ভাবতে পারছিল না। আবারও, আবারও ওই বড়োলোকের ছেলে-মেয়েরা তাদের টেক্কা মেরে বেরিয়ে যাবে! যাকে সে সরাতে চেয়েছিল,
সে সরল না। সরে গেল অন্য একজন। এবার তো অরণ্য আর বনমালা আরও কাছাকাছি চলে আসবে।
অসহ্য রাগে চিৎকার করে উঠল শতাব্দীর দাদা।
.
ওসি-র সামনে থানায় বসে শর্মিষ্ঠা বসু বলছিলেন, “ছুরিতে হাতের ছাপ পাওয়া যাবে। ভিকটিমের সঙ্গে ব্লাড ম্যাচও হয়ে যাবে। আমি নিশ্চিত।”
ওসি ঘাড় নাড়লেন, “আমারও তাই মনে হয়। জয়ন্ত ছেলেটা তো অপরাধ প্রায় স্বীকারই করে নিয়েছে।”
“আরও একটা ব্যাপার স্যার,” বললেন শর্মিষ্ঠা, “ছেলেটার ব্যাগে একটা ছোটো কাচের শিশির মধ্যে লিকুইড পাওয়া গিয়েছে। পরীক্ষা করলে বোঝা যাবে, করবী গাছের ফুল-পাতা জলে ফুটিয়েই ওই বিষটা তৈরি করা হয়েছে।”
“ব্রেভো শর্মিষ্ঠা,” তারপরেই কী মনে হতে ওসি বললেন, “জয়ন্ত তাহলে কপিক্যাট কিলার? আগের খুনি তো ধরা পড়ে গিয়েছিল।
“সেটা দেখতে হবে স্যার। জয়ন্ত স্বীকারোক্তিতে কী বলে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
গম্ভীর হয়ে গেল ওসি-র মুখ, “ঠিক আছে, আপনি রিপোর্ট তৈরি করুন।
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার,” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন শর্মিষ্ঠা বসু।
.
অরণ্যদের বাড়িতে বসেই খবরটা পেয়েছিল বনমালা। এই শক সে নিতে পারেনি। তখনই জ্ঞান হারায়। কমলেশ দ্রুত চিকিৎসা শুরু করেন। ডেকে আনা হয় বনমালাদের পারিবারিক চিকিৎসককেও।
কমলেশ একটা কথা বুঝেছিলেন। এই অবস্থায় কখনোই সিংহবাড়িতে ফেরত পাঠানো যাবে না বনমালাকে। এখানে রাখা যেতে পারে। অরণ্যর বাবা-মা ছোটোবেলা থেকেই চেনেন বনমালাকে। মেয়ের মতো ভালোবাসেন। তাঁরাই আগ বাড়িয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু কমলেশ জানেন, তার আগে পুলিশের অনুমতি নিতে হবে।
আরও একটা সমস্যা দেখা দিল। ওই বাড়িতে কিছুতেই থাকতে রাজি হল না মিনতি মাসি। শেষ পর্যন্ত পুলিশের হস্তক্ষেপে একটা জায়গায় আসা গেল।
মিনতি মাসিকে এনে রাখা হল অরণ্যদের বাড়িতে। সে বনমালার সঙ্গে একই ঘরে থাকবে। আর সিংহবাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করা হল। সারারাত বাড়িতে পুলিশ প্রহরা থাকবে। দীনেন্দ্র সিংহের ঘরের সামনেও। তাঁকে পরিষ্কার বলে দেওয়া হল, ঘরের দরজা বন্ধ করা চলবে না।
শর্মিষ্ঠা বুঝতে পারছিলেন, পুরো রহস্যের পর্দা ওঠা এখনও বাকি। বিশেষ করে জয়ন্তর মোটিভটা জানতেই হবে। কী কারণে খুনগুলো করেছে ছেলেটা? সাত বছর আগেও কি সে খুন দুটো করেছে? নাকি অন্য কেউ? এই অবস্থায় দীনেন্দ্র সিংহ আত্মহত্যা করে বসলে বড়ো ঝামেলা হয়ে যাবে। সেই ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।
.
বনমালার শরীরের হাল এমন হল যে বাধ্য হয়ে স্যালাইন চালাতে হল ডাক্তারবাবুকে। নার্ভের ওষুধ এবং সেডাটিভও দিলেন তিনি।
আধো-আচ্ছন্নের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অরণ্যের বাড়িতে শুয়ে রইল বনমালা।
রাতের দিকে হুঁশ ফিরল তার। পাশে বসে মিনতি মাসি। একটু দূরে অরণ্য এবং কমলেশ রায়। বনমালার জ্ঞান ফিরেছে দেখে দুজনে এগিয়ে এলেন খাটের ধারে।
কমলেশ বললেন, “এখন তুমি বিশ্রাম নাও। কোনও ভাবনাচিন্তা নয়। কাল আমরা কথা বলব। তুমি চিন্তা কোরো না।”
কোনও কথা না বলে খাটের পাশে দাঁড়িয়ে বনমালার মাথায় হাত বোলাতে লাগল অরণ্য। দরদর করে চোখ দিয়ে জল পড়ছিল বনমালার। মেয়েটা চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।
.
রাত তখন কটা ঠিক বলতে পারবে না বনমালা।
ভীষণ আতঙ্কে সে জেগে উঠেছে। তার হাত-পা কাঁপছে। গলা শুকিয়ে এসেছে। কোনও এক জান্তব শক্তি যেন তার বুকে চেপে বসেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
আবার সেই স্বপ্নটা দেখেছে বনমালা। সেই ভয়ংকর স্বপ্ন। তবে এবার একটু অন্যরকম। যে খুন হচ্ছে তার শরীরটা সে দেখতে পাচ্ছে না। মুখটা দেখতে পাচ্ছে না। শরীরটা যেন ছায়ায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে।
আর তার কানে ভেসে আসছে একটা স্বর। সেই গলা যেন এই পৃথিবীর নয়, এই সময়ের নয়। কেউ একজন বলে চলেছে….
“বাঁচতে দেব না, বাঁচতে দেব না।”
