৬
শান্তিনিকেতন, ২০২১
পুরো ঘটনাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শান্তিনিকেতন থানার ওসি প্রণব দাস। তারপরে বললেন, “এই খুনের রহস্যভেদ করতে হলে আপনাকে সম্ভবত অতীতে ফিরে যেতে হবে মিস বসু। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, সাত বছর আগেই এই ঘটনার বীজ বপন হয়েছে।”
শর্মিষ্ঠা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার বললেন, “পাড়ুইকে তাহলে এনকাউন্টার করে মেরে দেওয়া হয়? ঠিক কী হয়েছিল সেদিন, স্যার?”
“সেই রাতে আমি সমীরণবাবুর টিমে ছিলাম না। অন্য দুজন কনস্টেবল নিয়ে বেরিয়েছিলেন তিনি। পরে শুনেছি, খবর ছিল পাড়ুই নাকি বাড়িতে ফিরে আসবে। ওর এক বন্ধুই খবরটা দেয়।”
“তাহলে ওখানেই এনকাউন্টারটা হয়? একটু অবাক লাগছে স্যার। লোকটা হার্ডকোর ক্রিমিনাল নয়। ওকে ধরার জন্য পুলিশকে গুলি চালাতে হল? তাও গুলিটা পায়ে করা গেল না?”
শর্মিষ্ঠার প্রশ্নের কোনও জবাব দিলেন না ওসি। আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে বসলেন শর্মিষ্ঠা-
“এই এনকাউন্টার নিয়ে সেদিন কেউ কোনও প্রশ্ন তোলেনি?”
“পাগল হলেন নাকি আপনি,” এবার মুখ খুললেন প্রণববাবু, “ওই সময় শান্তিনিকেতনে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক মহল থেকে মারাত্মক চাপ তৈরি করা হয়েছিল। হাই প্রোফাইল ভিকটিম হওয়ার ফলে জল আরও ঘোলা হয়। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছিল।” দম নিতে একটু থামলেন অফিসার। তারপরে বললেন, “সারা দেশের নজর এসে পড়েছিল শান্তিনিকেতনে। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এই অবস্থায় খুনিকে চিহ্নিত করা গিয়েছে, এটাই তো বড়ো ব্যাপার। পাড়ুইয়ের মৃত্যু নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামায়নি। শান্তি ফিরে এসেছিল শান্তিনিকেতনে।”
থামলেন প্রণব দাস। আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন শর্মিষ্ঠা। তাঁকে দ্রুত চুপ করিয়ে ওসি বলে উঠলেন, “আপনাকে যা বলার বলেছি। এবার তদন্ত শুরু করে দিন। মনে রাখবেন, অনেকেরই কিন্তু ওই রক্তকরবী মার্ডারসের ব্যাপারটা মনে আছে। জানাজানি হলে আবার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে।
উঠে দাঁড়ালেন শর্মিষ্ঠা। বসকে একটা স্যালুট করে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। খুনি এবার ধরা পড়বেই।”
বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন এলএসআই। ওসি আবারও একটা দীর্ঘশাস ফেললেন। জীবনে শান্তি নেই।
.
কোপাইয়ের পাড়ে, সেই পরিচিত জায়গাটায় বসে হু হু করে কেঁদে যাচ্ছিল বনমালা। অরণ্য কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
বনমালার কাহিনিটা তার মনে ভীষণভাবে ধাক্কা দিয়ে গিয়েছে। তার বন্ধু অলৌকিক শক্তির অধিকারী? সে খুন হওয়ার আগে দেখতে পায় কে খুন হচ্ছে? এ কি সম্ভব? কিন্তু বনমালাকে বিশ্বাস না করারও কোনও কারণ নেই। এত বছর ধরে চেনে মেয়েটাকে। ওর মতো সরল, নিষ্পাপ মেয়ে আর হয় না। তাছাড়া এমন ঘটনা নিয়ে কেউ মিথ্যা কথা বলে নাকি?
অরণ্য বুঝে উঠতে পারছিল না কী বলবে।
বনমালা একটু সামলে নিল নিজেকে। তার বুকে যে পাথরটা ভারী হয়ে বসেছিল, তা এখন একটু হালকা হয়েছে। তার কাহিনিটা কাউকে খুলে না বললে সে পাগল হয়ে যেত।
.
এবারের স্বপ্নের কথাটা দাদাকে বলতে চায়নি বনমালা। দাদা আবারও বলবে, কাউকে কিছু বলিস না। কিন্তু কতদিন সে চুপ করে থাকবে? এখন তো সে আর বাচ্চা নেই!
.
প্রবীর সেনের খুনের ঘটনাটা শোনার পরেই দাদার মুখটা সাদা হয়ে গিয়েছিল। সোজা বনমালার ঘরে এসে বলেছিল, “তুই কি এবারও কোনও স্বপ্ন দেখেছিস?”
বনমালা স্থির করে নিয়েছিল, কিছুতেই এবার বলবে না দাদাকে। মিথ্যে সে বলে না। মিথ্যে বলতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছিল তার। বিশেষ করে দাদাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জোরালোভাবে মাথা নাড়িয়ে বলেছিল, “না রে দাদা। এবার কোনও স্বপ্নই দেখিনি।” কিছুটা সময় বোনের মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল জয়ন্ত। আর কোনও প্রশ্ন করেনি।
.
চোখ মুছে অরণ্যর দিকে তাকিয়ে বনমালা প্রশ্ন করল, “আমি এবার কী করব বল! আর তো সহ্য করতে পারছি না।”
অরণ্য ধীরে ধীরে হাত রাখল বনমালার হাতে। তারপরে শান্ত গলায় বলল, “তুই চিন্তা করিস না। যত কঠিন সময় আসুক না কেন, আমি সব সময় পাশে থাকব তোর। তোকে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম।”
দুজনে আবার একটু সময় চুপ করে রইল। তারপরে কথা বলল অরণ্যই—
“কখন তুই স্বপ্নটা দেখিস?”
“তিনটে স্বপ্নই রাতে দেখেছিলাম। আর পরের দিন সকালে উঠে খুনের খবরটা পাই।”
“শুধু তিনবারই দেখেছিলি?”
“হ্যাঁ।”
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তেই চমকে সোজা হয়ে উঠল অরণ্য, “তুই তো খুনের দিন সকালে ওই প্রবীর সেনের বাড়িতে গিয়েছিলিস। এর আগেও একবার গিয়েছিলিস। তখন আমিও গিয়েছিলাম তোকে ফলো করে।”
“তাতে কী হল?” বুঝতে পারল না বনমালা।
“তোর হাতের ছাপ ওই বাড়িতে পেয়ে যাবে পুলিশ।”
ভয়ে মুখটা সাদা হয়ে গেল বনমালার।
“তাহলে কী হবে? পুলিশ তো আমাকেই সন্দেহ করবে? কী করব আমি?”
বন্ধুকে শান্ত করল অরণ্য। একটু ভেবে নিয়ে জবাব দিল, “পুলিশ যদি তোর কাছে আসে, তাহলে স্বীকার করবি তুই গিয়েছিলিস। কিন্তু খুনের দিন নয়, তার দু-দিন আগে।”
বনমালা তাকিয়ে রইল। অরণ্য বলে যেতে লাগল, “পুলিশকে বলবি, ভদ্রলোক তোকে মায়ের আঁকা পেন্টিং দেখিয়েছিল। কয়েকটা পেন্টিং উপহার দেওয়ার কথা বলে। যে কারণে তুই ওর বাড়িতে গিয়েছিলিস। তাহলে তোর অ্যালিবাই পাকা। তোর হাতের ছাপ পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠবে না। আমিও বলব, তোর সঙ্গে ওখানে ছিলাম। বাইরে অপেক্ষা করছিলাম।”
বনমালা কিছু ভাবতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, ক্রমে একটা মাকড়সার জালে জড়িয়ে যাচ্ছে সে। এই জাল থেকে মুক্তি নেই।
“একটা কাজ করবি। তোর ওই লাল জ্যাকেটটা আমাকে দিয়ে দিবি চল। আমি ওটা পুড়িয়ে ফেলব।”
উঠে দাঁড়াল অরণ্য। সঙ্গে বনমালাও। সাইকেল করে বাড়ির দিকে যেতে যেতে বনমালার মনে তখন একটার পর একটা প্রশ্ন এসে ধাক্কা মারছে-
খুনটা করল কে? কেনই বা খুন করল? এত বছর কিছু হয়নি। কিন্তু যে মুহূর্তে প্রবীর সেন অতীতে চাপা পড়া একটা সত্যকে মাটি খুঁড়ে বার করে আনতে চাইল, সেই মুহূর্তে খুন হয়ে গেল? তার মানে কি খুনি খুবই পরিচিত? সে জানে কী ঘটছে?
শেষ প্রশ্নটা বনমালার অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বারবার একটা মুখ ভেসে উঠছে তার মনে। আর জোর করে সেই মুখকে সরিয়ে দিচ্ছে সে। না, সে বিশ্বাস করে না। মানুষটার হাজার দোষ থাকতে পারে, কিন্তু খুন করবে না।
আর সবচেয়ে মারাত্মক প্রশ্নটার জবাব তো অন্ধকারেই লুকিয়ে-
তার এই অলৌকিক শক্তির রহস্য কী?
বনমালার বাড়ি থেকে একটু দূরে থেমে গেল অরণ্য। তারপরে বলল, “তুই জ্যাকেটটা নিয়ে আয় লুকিয়ে। আমি এখানে অপেক্ষা করছি। তোর বাড়ির লোকেরা আমাকে না দেখলেই ভালো হয়।”
বনমালা কথা না বাড়িয়ে রওনা দিল বাড়ির দিকে। মিনিট দশেক পরেই একটা প্ল্যাস্টিকে ব্যাগে ভরে জ্যাকেটটা নিয়ে অরণ্যর হাতে তুলে দিল।
অরণ্য এতক্ষণ একটা কথা ভাবছিল। এবার বলল, “শোন মালা, তোকে একজন ভদ্রলোকের কাছে নিয়ে যাব। আমাদের বাড়িতে এসেছেন। আত্মীয়, খুব বুদ্ধিমান মানুষ। মনে হয় তোকে সাহায্য করতে পারবেন।”
বনমালা শুধু “ঠিক আছে” বলল। আর কীই বা করতে পারে সে। কাউকে না কাউকে তো বিশ্বাস করতেই হবে। সবার ওপর থেকে বিশ্বাসটা চলে গেলে এক ভয়ানক অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে সে। যেখান থেকে হয়তো কোনওদিনই ফিরতে পারবে না।
.
নিজের দফতরে বসে পুরোনো ফাইলগুলো ঘাঁটছিলেন শর্মিষ্ঠা বসু। প্রণববাবু ঠিকই বলেছেন। এই খুনের রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে অতীতে।
তিনটে খুনের মধ্যে বেশ কয়েকটা সামঞ্জস্য দেখতে পাচ্ছেন তিনি।
খুনগুলো রাতে হয়েছিল। পরের দিন জানা যায়। বাড়িতে ভিকটিম একাই ছিল। প্রত্যেকে মদ্যপান করত। এবং, মদের বোতলেই বিষ মেশানো হয়েছিল। তারপরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। আর বিষের ব্যাপারটা তো আছেই। করবী গাছের বিষ!
তিনটে ঘটনাকে একসূত্রে বাঁধতে সমস্যা হয় না। কিন্তু খুনিকে যদি অতীতে ধরে ফেলা হয়ে থাকে তাহলে বলতে হবে, এটা কোনও কপিক্যাট কিলারের কাজ। যে পুরো ব্যাপারটা জানে। আর পুরোনো চিত্রনাট্য অনুযায়ী কাজ করেছে।
কিন্তু এখানেও দুটো প্রশ্ন আসছে। প্রবীর সেনের মতো এইরকম অতি সাধারণ একটা লোককে এত কাণ্ড করে মারতে গেল কেন? এমনি মেরে দিয়ে চলে গেলেই তো হত। জলঘোলা হত না।
তাহলে কি খুনি কোনও বার্তা দিতে চাইছে পুলিশকে? সাত বছর আগের কোনও ঘটনাকে ফিরিয়ে আনতে চাইছে? কোনও বিশেষ ঘটনার দিকে আঙুল তুলতে চাইছে? সাত বছর আগের মতো কি আরও খুন হবে?
তাছাড়া ওই মেয়েটার ছবির ব্যাপারটাও আছে। খুন যদি আগের রাতে হয়, তাহলে পরেরদিন কেন কেউ ওই বাড়িতে গেল? ছবিগুলো সরাতেই কি?
কার ছবি ওগুলো? কী সত্যি লুকিয়ে আছে ছবিগুলোর পিছনে?
শর্মিষ্ঠা উঠে পড়লেন। তিনি জানেন, এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে তাঁকে অতীতে ফিরে যেতে হবে।
প্রবীর সেনের অতীতে। রক্তকরবী মার্ডারসের অতীতে।
.
দু-দিন পরে অরণ্যর সঙ্গে ওর বাড়িতে হাজির হল বনমালা। তাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে অরণ্য ভিতরে গেল সেই আত্মীয়কে ডেকে আনতে।
মিনিটখানেক পরেই এক ভদ্রলোককে নিয়ে ঘরে ঢুকল অরণ্য। তারপরে আলাপ করিয়ে দিল-
“আমার বন্ধু মালা। ওর ভালো নাম বনমালা। আর এই আমার কাকা
দু-হাত বুকের সামনে জড়ো করে নমস্কার করলেন লম্বা-চওড়া চশমা পরা ভদ্রলোক, “তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে খুবই ভালো লাগল বনমালা। আমার নাম কমলেশ রায়।”
