প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ১.৯

শান্তিনিকেতন, ২০১৪।

চঞ্চল মজুমদার খুনের ১৫ দিন পরে।

“বসুন সমীরণবাবু।” সিনিয়র অফিসারের ইঙ্গিতে সামনের চেয়ারটায় বসলেন চঞ্চল মজুমদার মার্ডার কেসের তদন্তকারী অফিসার।

“কেসটা কিন্তু ঝুলে যাচ্ছে,” গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লেন ওসি, “১৫ দিন হয়ে গেল, কোনও ব্রেক পাওয়া গেল না। অ্যারেস্টও হল না।”

সমীরণবাবু মুখটা একটু কাঁচুমাচু করে বললেন, “সব দিক দিয়ে চেষ্টা করলাম। কোনও দিক দিয়ে একটা ব্রেক পাচ্ছি না।”

“কত দূর কী করেছেন, একবার আমাকে বলুন তো।”

সমীরণবাবু ফিরিস্তি দিতে লাগলেন—

১) বাড়ির কাজের লোকেদের প্রত্যেককে বারবার করে জেরা করা হয়েছে। কিন্তু সবাই একই কথা বলেছে। রাঁধুনি, কাজের লোক এবং বাগান দেখাশোনার জন্য যে লোকটাকে রাখা হয়েছে, তাদের সবার বক্তব্য মোটামুটি এক — বাবু খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তাদের বিপদে-আপদে সাহায্য করতেন। এই কমাসে কখনও টাকা-পয়সা নিয়ে ঝামেলা হয়নি। বাবুর কাছে কেউ আসতও না। সেই দিন কাউকে দেখেনি তারা। রাতে তারা কেউ ওই দিকে যেত না। প্রত্যেকের বক্তব্য ক্রস চেক করে দেখা হয়েছে। বক্তব্যে কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়েনি।

২) তিনজনের পিছনেই লোক লাগানো হয়েছিল। কিন্তু কোনও সন্দেহজনক কিছু দেখা যায়নি। এমনকি, মার্ডার ওয়েপনটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি বহু চেষ্টা করে।

৩) বাচ্চাটার সঙ্গেও আবার কথা বলা হয়েছে। সেই একই জবাব দিয়েছে। স্যারের কাছে পড়া শেষ করে সাড়ে আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরে আসে মেয়েটি। যে বইটা টেবলে ছিল, সেটা স্যারের বই। পেনসিলটা সেদিন ভুলে ফেলে এসেছিল সে। কাউকে দেখেনি। শুধু সেদিন কেন, যে কদিন পড়তে গিয়েছে, বাড়িতে স্যার ছাড়া আর কেউ ছিল না। কেউ কখনও দেখা করতেও আসেনি। শুধু বাচ্চাটাই নয়, ওই বাড়ির আশপাশে কোনও অজানা লোককে কখনও ঘুরঘুর করতেও কেউ দেখেনি। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে তো নয়ই।

৪) কোচিংয়ে পড়তে আসা ছেলে-মেয়েদের চিহ্নিত করা গিয়েছে। দুটি ছেলে এবং দুটি মেয়ে পড়তে আসত। তাদের সবার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। শতাব্দীর দাদা মানিককেও জেরা করা হয়েছে। সবাই বলেছে, ঘটনার দিনে ওরা ওদিকে আসেনি। কারণ পড়া ছিল না। বাড়ির লোকেরাও একই কথা বলেছে। বাচ্চারা বাড়িতেই ছিল। আর শতাব্দীর দাদা মানিক ওর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে গিয়েছিল সন্ধ্যার দিকে। বন্ধুরাও একই কথা বলেছে। বাড়ি ফেরে রাত করে। মানিকের পিছনে লোক লাগানো হয়েছে, কিন্তু এখনও সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি।

৫) যে কটা হাতের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল বাড়িতে, সব কটা মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সব মিলে গিয়েছে। তিনজন কাজের লোক এবং বাচ্চাদের হাতের ছাপ। এর বাইরে মৃত ভদ্রলোকের ছাপ মিলেছে। হুইস্কির গ্লাস এবং বোতলে ভদ্রলোকের হাতের ছাপ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি।

ফিরিস্তি দেওয়া শেষ করে সমীরণবাবু তাকালেন ওসি-র দিকে। “খুব পাকা হাতের কাজ, স্যার। বিষ মিশিয়েছে, কিন্তু গ্লাসে বা বোতলে হাতের ছাপ নেই। ঘরে কোথাও নেই। মানে জানত, কীভাবে হাতের ছাপ লুকাতে হবে। হয় গ্লাভস পরে এসেছিল বা সব মুছে দিয়ে গিয়েছে।

“মার্ডার ওয়েপনটাও তো পেলেন না!”

সমীরণবাবু মুখটা নামিয়ে বললেন, “না স্যার। বাড়ির চারপাশে আমরা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। আশপাশের বাড়ির বাগানগুলোও দেখেছি। কোথাও কিছু পাইনি। আশপাশের বাড়িতে বলেও এসেছিলাম যদি রক্তমাখা কোনও অস্ত্র চোখে পড়ে, জানাতে। সেদিকেও লাভ হয়নি।”

“ওখানে খুঁজে আর কী হবে! খুনি কি আপনাদের জন্য অস্ত্রটা ওখানে সাজিয়ে রেখে যাবে! বুদ্ধিমান লোক হলে ওটা এতক্ষণে কোপাইয়ের জলে ডুবিয়ে দিয়েছে।”

খোঁচাটা চুপচাপ হজম করে গেলেন সমীরণবাবু। ওসি আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন-

“তাহলে এখন কীভাবে এগোবেন?”

“আর একটা রাস্তা নেওয়া বাকি আছে।”

“কী সেটা?”

“আপনাকে বলেছিলাম না, ভদ্রলোকের অতীতটা দেখা প্রয়োজন। হয়তো অতীতের কোনও কাণ্ডের জেরে কেউ এই বদলাটা নিয়েছে।”

“কী করতে চান আপনি?”

“কলকাতার লোকাল থানায় একবার কথা বলি। ওরা যদি কোনও ইনফর্মেশন দিতে পারে। তারপরে একবার ভদ্রলোকের কলেজে গিয়েও দেখতে চাই।”

“ঠিক আছে, কিন্তু যা করার একটু তাড়াতাড়ি করবেন। এসপি চাপ দিচ্ছেন। দ্রুত এই কেসটা ক্লোজ করতে হবে।”

সমীরণবাবু বিরস মুখে বিদায় নিলেন।

.

সেদিন বিকেলে শান্তিনিকেতনের আর এক প্রান্তে…

ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন ঘরের ঠিক মাঝখানে। তাঁকে ঘিরে ১২-১৪ বছরের সাত-আটটা ছেলেমেয়ে। তারা একমনে দেখে যাচ্ছে কী করছেন তাদের গুরুজি।

ভদ্রমহিলা ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, “মণিপুরী হল এমন একটা নাচ, যা মানুষকে পবিত্র করে তোলে, শুদ্ধ করে তোলে। যে কারণে একটা সময় এই নৃত্য পরিবেশন করা হত শুধুমাত্র পবিত্রস্থলে।”

কথা থামিয়ে বাচ্চাদের মুখের উপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন ভদ্রমহিলা। তারপরে বলতে শুরু করলেন, “মণিপুরী নৃত্য হল এমন এক নৃত্য যা নদীর মতো ছন্দে বয়ে যাবে। পা ফেলবে, কোনও শব্দ হবে না। ছন্দের তালে তালে তোমাদের শরীর ভেসে বেড়াবে।”

একটু থেমে তিনি হাতের আঙুলের সাহায্যে কয়েকটি মুদ্রা তৈরি করে দেখাতে লাগলেন, “একটা জিনিস তোমাদের খেয়াল রাখতে হবে। মণিপুরী নৃত্যে মুদ্রার আধিক্য নেই। কিন্তু তাও কিছু কিছু মুদ্রা আমরা সৃষ্টি করি।” এরপরে হাতের বিভিন্ন ভঙ্গিমা করে ভদ্রমহিলা দেখাতে লাগলেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের।

মিনিট পনেরো শেখানোর পরে তিনি গিয়ে বসলেন একটা চেয়ারে। তারপরে বললেন, “এবার তোমরা দুজন করে জুটি বেঁধে নাচটা করো।”

বনমালা এগিয়ে গেল শতাব্দীর দিকে। তারপরে দুজনে জুটি বেঁধে নাচ শুরু করল।

আরও এক ঘণ্টা চলল বাচ্চাদের নাচের ক্লাস। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বাচ্চাদের নাচের ভঙ্গিমা দেখে যাচ্ছিলেন ভদ্রমহিলা। ভুল হলে এগিয়ে এসে শুধরে দিচ্ছিলেন।

বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে একমনে শিক্ষিকা আর ছাত্রীদের দেখে যাচ্ছিলেন আর এক মহিলা। শিক্ষিকাকে তিনি ভালোই চেনেন। পরিচয় দীর্ঘদিনের। দুজনেই এক কলেজের। তারপরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। প্রায় হরিহর আত্মা ছিল দুজনে। মাঝের অনেকটা সময় বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছিল তাঁদের। কিন্তু ভাগ্য আবার এক স্রোতে নিয়ে এসেছে দুজনকে।

নৃত্যরত ঈপ্সিতার দিকে একমনে তাকিয়ে ছিলেন শোভনা। নাচ মেয়েটার হৃদয় জুড়ে, জীবন জুড়ে আছে। যখন সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এসে মেয়েটাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, তখন এই নাচকেই ঢাল হিসেবে বেছে নিয়েছে ঈপ্সিতা। নিজেকে আড়াল করতে চেয়েছে সমাজের রক্তচক্ষুর থেকে। কখনও পেরেছে, কখনও পারেনি।

শোভনার এখন একটাই প্রার্থনা। দুঃসময় যেন আর ফিরে না আসে। মেয়েটা যেন সুখের সন্ধান পায়। আর সে যেন সবসময় পাশে থাকতে পারে ঈপ্সিতার।

.

বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করার পরে দুজন দু-রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলেন দু-প্রান্তে। ঈপ্সিতা বিদেশেও চলে যান একটা সময়। নাচ নিয়ে ওয়ার্কশপ করতে। আর শোভনা ডুবে যান সাংসারিক জীবনে। ঈপ্সিতা জড়াতে চাননি সংসারের জালে। তাই তিনি চিরকুমারী থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

শোভনা বিয়ে করে সংসারী হন। কিন্তু অদৃষ্টের অদ্ভুত অঙ্গুলি হেলনে তাঁরা আবার এক রাস্তায় চলে এসেছেন। অবশ্য উদ্যোগটা নিয়েছিলেন শোভনাই।

আবার ঘরের দিকে তাকালেন শোভনা। বাচ্চাগুলোকে হাতে ধরে নাচ শেখাতে ডুবে গিয়েছেন ঈপ্সিতা।

শোভনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের দিনগুলি মনে পড়ে যাচ্ছিল। একটা সময় স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে দিনগুলি কেটে যাচ্ছিল। তারপরে আঁধার নেমে আসে।

একটা সময় শোভনার মনে হয়েছিল আর কোনওদিন হয়তো ঈন্সিতার দেখা তিনি পাবেন না। তারপরে হঠাৎ করে জীবনের চাকাটা ঘুরতে থাকে।

শোভনার স্বামী যথেষ্ট বিত্তশালী ছিলেন। কলকাতায় যেমন তাঁদের বাড়ি আছে, সেরকম শান্তিনিকেতনেও আছে। একমাত্র ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গিয়েছে বেঙ্গালুরুতে। ওই সময় হঠাৎ বজ্রপাতের মতো মৃত্যু হয় তাঁর স্বামীর। চোখের সামনে অন্ধকার দেখছিলেন শোভনা। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তখনই আবার তাঁর জীবনে ফিরে আসেন ঈপ্সিতা।

তাঁর বন্ধু বরাবরই শক্ত ধাতের মেয়ে। সহজে ঘাবড়ায় না। অনেক বছর দূরে থাকলেও তাঁদের মধ্যে দূরত্বটা তৈরি হয়নি। ঈপ্সিতা ফিরে আসায় শোকের ধাক্কা কিছুটা কাটিয়ে উঠেছিলেন শোভনা। টাকা-পয়সার চিন্তা তাঁকে কোনওদিনই করতে হয়নি। এখনও করতে হয় না। ছেলে বেঙ্গালুরু চলে যাওয়ার পরে একা বাড়িতে যেন দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিল শোভনার। তিনি চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। আর তারপরে ডেকে নেন ঈপ্সিতাকে।

তাঁদের এই বড়ো বাড়িটা তো ফাঁকা পড়েই আছে। ঈপ্সিতার এসে থাকতে কোনও সমস্যাই নেই। দুজন মহিলার একসঙ্গে থাকাটাও অনেক সুবিধের। মাঝবয়সি, আকর্ষণীয় চেহারার মহিলা একা এইরকম একটা বাড়িতে থাকলে নানা প্রশ্ন উঠতে পারে। দুই মহিলা থাকলে আর কে কী প্রশ্ন করবে!

পরিচিত কিছু বাচ্চাকে ডেকে নিয়েছেন শোভনা। কোনওরকম পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদেরই নাচ শেখায় ঈপ্সিতা।

.

“আজ আপাতত এই পর্যন্ত থাক,” ঈপ্সিতার কথায় চটকা ভাঙল শোভনার। সে এসে ঢুকল ঘরের মধ্যে।

ক্লাস শেষ হয়ে গিয়েছে। সবাই বেরিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে শোভনা বলে উঠলেন, “মালা, তুই কিন্তু যাবি না। তোর দাদা এসে নিয়ে যাবে।”

বনমালা মুখ ভার করে বসে পড়ল মাটিতে। বাইরে থেকে একটা আওয়াজ পেয়ে শতাব্দী বলে উঠল, “মালা, আমার দাদা এসে গিয়েছে। তুই বোস, আমি চললাম।” ছুটে বেরিয়ে গেল শতাব্দী। বসে রইল বনমালা।

ঈপ্সিতা একটু অবাক হয়ে তাকালেন শোভনার দিকে, “কেন রে? ওর বাড়িটা কি অনেক দূরে? এখনও তো সন্ধ্যা হয়নি। ও যেতে পারবে না একা?”

“না না, অতি কষ্টে তোর এই নাচের ক্লাসে ভর্তি করিয়েছি ওকে। মালাকে অনেকদিন থেকে চিনি। ওর বাড়ির লোকেদেরও। মেয়েটা একটু ধাক্কা খেয়েছিল। বাড়ি আর স্কুলের বাইরে কোথাও যাচ্ছিল না। আমি প্রায় জোর করে এখানে নিয়ে আসি।” গলা নামিয়ে বললেন শোভনা।

ঈপ্সিতা আর বেশি কিছু না বলে বনমালাকে কাছে ডেকে নিলেন। তারপরে সোফায় বসিয়ে গায়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “বাহ, কী মিষ্টি দেখতে রে তোকে! নাচও খুব সুন্দর করেছিস। তুই কিন্তু একদম ক্লাস কামাই করবি না। তোকে আমি সবকিছু শিখিয়ে দেব।” কথাটা শেষ করে বনমালার থুতনিটা ধরে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে ঈপ্সিতা বললেন, “আসবি তো আমার কাছে?”

“হ্যাঁ আন্টি, নিশ্চয়ই আসব।”

ঈপ্সিতা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, বাইরে থেকে সাইকেলের বেল বেজে উঠল। দাদা এসে গিয়েছে।

ভাই-বোন চলে যাওয়ার পরে শোভনার পাশে বসে ঈপ্সিতা জিজ্ঞেস করলেন, “মেয়েটাকে কেন আটকে রাখে বাড়িতে?”

শোভনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জন্মের সময় ওর মা মারা গিয়েছে। বাবা কতটা ভালোবাসে, আমার সন্দেহ আছে। দাদা-ই ওকে দেখে। দিন পনেরো আগে একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটে যায় ওদের বাড়ির পাশে।”

ঈপ্সিতা বুঝেছিলেন, শোভনা কোন ব্যাপারটার কথা বলছেন, “সেই রক্তকরবী মার্ডার?”

“হ্যাঁ, যে ভদ্রলোক ওইভাবে খুন হয়ে যায়, সে মেয়েটার টিচার ছিল। ওই দিনে বনমালা আবার পড়তেও গিয়েছিল ভদ্রলোকের কাছে। ও চলে আসার পরে খুনটা হয়। চিন্তা কর। আমি তো ভাবতেই আতঙ্কে শিউরে উঠছি। মেয়েটা যদি আর কিছুটা সময় বাড়িতে থাকত, তাহলে কী যে হয়ে যেত!” কেঁপে উঠলেন শোভনা, “তুই তখনও শান্তিনিকেতনে আসিসনি। তোর আসার দিন কয়েক আগের ঘটনা। এই অবস্থায় কে আর মেয়েকে একা বাইরে ছাড়বে বল?”

“ঠিকই। মালার বাড়ি কি এখান থেকে অনেক দূরে?”

“আরে না না। এই শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন রোড দিয়ে এক কিলোমিটার এগোলেই ওদের বাড়ি। সাইকেলে মিনিট দশেকও লাগে না।”

দুই বন্ধু চুপ করে বসে রইলেন সোফায়। দুজনের কেউই দেখতে পেলেন না, আবছা অন্ধকারে একটি ছায়ামূর্তি উঠে এসেছে বারান্দায়!

.

…সন্ধ্যার অন্ধকার তখন সবে নামছে। ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই চলে গিয়েছে। বনামালাও চলে গিয়েছে মিনিট পাঁচেক হল।

দুজনে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইলেন সোফায়। তারপরে শোভনার হাতটা নিজের বুকে টেনে নিলেন ঈপ্সিতা। অন্য হাতে বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে টেনে আনলেন কাছে।

শোভনার মুখটাও নেমে এল ঈপ্সিতার ঘাড়ে। জিভ বার করে ধীরে ধীরে সঙ্গিনীর ঘাড়ে বোলাতে লাগলেন তিনি। ঈপ্সিতার হাতটা তখন খেলা করছে শোভনার বুকে।

তারপরে দুজন দুজনের দিকে তাকালেন। পরস্পরের সেই গভীর দৃষ্টিতে আবার হারিয়ে ফেললেন নিজেদের। অতীতে যেমন বহুবার হারিয়েছেন। কখনও সেই কলেজ জীবনে, কখনও সেই ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের একটা কোণে বা কোনও ছোটো রেস্তোরাঁর বদ্ধ কেবিনে।

দুটো অধর মিলে যেন এক হয়ে গেল। গভীর চুম্বনে ডুবে গেলেন ঈন্সিতা আর শোভনা!

.

ঘরের মধ্যে অভিনীত হতে থাকা পুরো দৃশ্যটাই চোখে পড়ল বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামূর্তির। নিজেকে একটু আড়ালে রেখে দেখতে লাগল সে। ঘরের মধ্যে দুই নারী তখন মিলন সুখে এতটাই নিমজ্জিত ছিলেন যে, বুঝতেও পারেননি এক জোড়া চোখ বাইরে থেকে তাঁদের দেখছে।

একরাশ ঘৃণা নিয়ে।

লোকটা আর দাঁড়াল না। বাগানের ঘাস কাটার জন্য হাতে রাখা খুরপিটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে বেরিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *