প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ২.৯

শান্তিনিকেতন, ২০২১

ঘরের মধ্যে অস্থির হয়ে পায়চারি করছিল বনমালা। কী করবে সে? কাকে জিজ্ঞেস করবে ওই রাতের ব্যাপারে?

বাবার কাছে কিছু জানতে চাওয়া সম্ভবই নয়। প্রবীর সেনের নামটা শুনলে কী প্রতিক্রিয়া হবে, বনমালা ভাবতেই পারছে না। তার চেয়েও বাবাকে নিয়ে বড়ো একটা আশঙ্কা তার মনে উকি দিচ্ছে।

দাদাকে বলেও সম্ভবত লাভ হবে না। দাদা ওই সময় ছোটো ছিল। তাছাড়া দাদা সেদিন যে কথাটা বলল, সেটাও চমকে দিয়েছে বনমালাকে। এই সংসারে আর বিষ ঢোকাতে চায় না দাদা। ছোটোবেলা থেকে অনেক যন্ত্রণা সহ্য করে আসছে! তাহলে কি দাদাও কিছু জানে? তবে বনমালা এইটুকু বুঝেছিল, জানলেও তাকে কিছু বলবে না দাদা। সত্যিটা বুকের মধ্যেই চেপে রেখে দেবে।

তাহলে কীভাবে জানা যায় সত্যিটা? কে বলবে সেই রাতের ঘটনা?

হঠাৎ একটা নাম মনে পড়ে গেল বনমালার। একজন আছে, যে বলতে পারে। যে তাকে ভালোবাসে, যে সেই রাতে বাড়িতে ছিল।

সারদা মাসি!

কিন্তু কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে সারদা মাসিকে? মিনতি মাসি কিছু বলতে পারবে কি? একবার জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে।

একতলায় মিনতি মাসি রাতের রান্নায় ব্যস্ত। দাদা বেরিয়েছে। বাবা নিজেকে যথারীতি ঘরে বন্দি করে রেখেছে। বনমালা দ্রুত নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে। তারপরে সোজা চলে এল মিনতি মাসির কাছে।

“কী ব্যাপার মালা? আজ রান্নাঘরে কী মনে করে? তোমার পড়া নেই?” সুযোগ পেয়ে মিনতি মাসি একটু গার্জেনগিরি ফলিয়ে নিল।

“জানো মাসি, ছোটোবেলার কথা খুব মনে পড়ছে,” রান্নাঘরের মেঝেতেই বসে পড়ল বনমালা। মিনতি মাসি হাসিমুখে বলল, “কেন রে মেয়ে? হঠাৎ কী হল?”

“কিছু না,” বলে হাঁটুতে থুতনি রেখে একটু সময় ভাবল বনমালা। তারপরে বলল, “আমার ছোটোবেলায় একজন মাসি ছিল। আমাকে গল্প শোনাত, খাইয়ে দিত। তার কথা খুব মনে পড়ছে।”

“কে সারদা দিদি?” তরকারি কুটতে কুটতে প্রশ্ন ছুড়ে দিল মিনতি মাসি। ধক করে উঠল বনমালার বুকটা। “তুমি চেনো নাকি সারদা মাসিকে? কোথায় থাকে?”

“খুব ভালো করে চিনি না। তোমাদের এখানে কাজ করত বলে মুখটা চেনা। কোথায় বাড়ি জানি না।”

আশার আলোটা যেরকম জ্বলে উঠেছিল, সেরকমই নিভে গেল। তাও একটা চেষ্টা করল বনমালা, “তোমার সঙ্গে কোথায় দেখা হয়েছিল? সারদা মাসির সঙ্গে একবার দেখা হলে খুব ভালো হত।”

একটু ভেবে মিনতি জবাব দিল, “এখন তো কোথাও আর রান্না করে না বলেই শুনেছি। ওই শাড়ির কাজ করে বলে জানি।”

“শাড়ির ডিজাইন?”

চুপ করে গেল বনমালা। তার মনে একটা নাম ভেসে উঠেও উঠছে না। সারদা মাসির মুখে কয়েকবার শুনেছিল সে। দারুণ নাকি শাড়ির কাজ করে। তার মায়ের পরিচিত ছিল। কাছাকাছিই বাড়ি। কিন্তু নামটা কিছুতেই মনে পড়ছে না। কতদিন আগেকার কথা।

বনমালার মুখের দিকে তাকিয়ে মিনতি মাসি বলল, “আচ্ছা, আমি খোঁজ করে দেখব, ওর খবর কেউ জানে কি না।”

.

বুকের মধ্যে একটা চাপা যন্ত্রণা নিয়ে সে রাতে বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগল বনমালা। সে কি অন্ধকারেই থেকে যাবে?

পরের দিন সকাল নটা বাজতে না বাজতেই অরণ্যর ফোন, “কী রে কিছু ভাবলি? কী করতে চাস এখন?”

“কিছুই বুঝতে পারছি না। কোনদিক দিয়ে যে শুরু করব,” হতাশ গলায় বলল বনমালা।

“তুই একটা কাজ কর। দশটা নাগাদ ক্যাম্পাসের মেন গেটটার সামনে চলে আয়। আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। আলোচনা করা যাবে।”

.

ঠিক সময়ই ক্যাম্পাসের গেটে পৌঁছে গেল বনমালা। অরণ্য দাঁড়িয়েই ছিল। দুজনে একটু নিরিবিলিতে এলে কথা শুরু করল অরণ্য, “আমার মনে হয়, সবার আগে আমাদের হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। যদি ওখান থেকে কিছু জানা যায়।”

“হাসপাতাল?” বনমালার এটা কুঁচকে উঠল।

“হ্যাঁ, হাসপাতাল। যেখানে তোর মাকে ওই রাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যেখানে তোর জন্ম হয়েছিল। সেই সময় যে ডাক্তার তোর মাকে দেখেছিলেন, তার সঙ্গে কথা বলা দরকার।

বনমালা বুঝল, অরণ্য ঠিকই বলেছে। সেই রাতে কী হয়েছিল, সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে ডাক্তারই।

“বোলপুর হাসপাতাল। ওখানেই মাকে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার জন্মও ওখানে,” নিজের মনেই যেন কথাগুলো বলছিল বনমালা। তারপরেই অরণ্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আমাদের ওরা পাত্তা দেবে কেন? ডাক্তারের নাম বলবে বলে মনে হয় না।”

অরণ্য মাথা নাড়ল, “আমাদের বলবে না, কিন্তু একজনকে বলবে।

“কাকে?”

“কমলেশ কাকা। ওর অনেক চেনাশোনা। পুলিশের সঙ্গেও কাজ করে। কলকাতা পুলিশের বেশ কয়েকজন বড়ো অফিসার কাকার কাছ থেকে অনেক কেসে সাহায্যও নিয়েছে। কমলেশ কাকা চাইলে খবরটা বার করে ফেলবে।”

“তাই নাকি?” উত্তেজিত হয়ে উঠল বনমালা, “তাহলে তোর কাকাকে বল না। যদি উনি সাহায্য করতে রাজি হন।”

.

মিনিট পনেরো পরে অরণ্যদের ড্রয়িংরুমে বসে বনমালার সব কথা শুনলেন কমলেশ রায়। একটু গম্ভীর হয়ে গেল তাঁর মুখ। তারপরে বনমালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাকে একটা কথা বলি বনমালা। খুব ভেবে উত্তর দেবে।” একটু থামলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “মাঝে মাঝে অতীত খুবই যন্ত্রণাদায়ক হয়। সেই অতীত খুঁড়ে না দেখাই ভালো। হয়তো মিছিমিছি তোমাকে অনেক কষ্ট পেতে হবে। সেই অতীতের সন্ধান করা কি ঠিক হবে?”

বনমালা মুখ নীচু করে কমলেশের কথা শুনছিল। তারপরে চোখ তুলে তাকাল। সেই জেদি চোখের দৃষ্টি দেখে কমলেশ রায় বুঝে গেলেন, উত্তরটা কী হতে চলেছে। “আমার মায়ের কী হয়েছিল, আমাকে জানতেই হবে। তার জন্য যত কষ্ট পেতে হয় পাব।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন কমলেশ রায়, “তোমরা এখানে বোসো, আমি কয়েকটা ফোন করে নিই। মনে হয় না, ওই ডাক্তারের নাম-ঠিকানা পেতে সমস্যা হবে। বছর আর দিনটা তো আমরা জানি।”

২০০০ সালের ১৪ অক্টোবর।

মিনিট পনেরো বাদে ফিরে এলেন কমলেশ। দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মনে হচ্ছে, বিকেলের মধ্যে খবর চলে আসবে। তুমি এখন বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নাও বনমালা। খবর পেয়ে গেলেই তোমাকে জানাব। তারপরে দেখব, ওই ডাক্তারের পেট থেকে কীভাবে কথা আদায় করা যায়।”

.

বিকেল পাঁচটা নাগাদ চলে এল অরণ্যর ফোন। রীতিমতো উত্তেজিত ছেলেটা, “তোকে বলেছিলাম না, কাকার দারুণ সোর্স। পুলিশকে কাজে লাগিয়ে ঠিক ওই ডাক্তারের নাম-ঠিকানা জোগাড় করে ফেলেছে। কাল সকালে আমরা ওই ডাক্তারের কাছে যাব।”

“ঠিকানা কী? নাম কী ওই ডাক্তারের?” উত্তেজিত হয়ে পড়ল বনমালাও।

একটু থমকে গেল অরণ্য। তারপরে বলল, “ইয়ে, একটা কথা শোন বনমালা। কাকা আমাকেও নাম-ঠিকানা বলেনি। আমাদের ভরসা করতে পারছে না। যদি নিজেরাই চলে যাই। বলেছে, কাল বলবে।”

বনমালা আর কিছু বলল না। অরণ্যর কাকার মাথায় বুদ্ধি আছে। তার মনের যা অবস্থা, তাতে নাম-ঠিকানা পেলে আজই হয়তো চলে যেত।

“ঠিক আছে, কাল দশটার সময় তোদের বাড়ি যাচ্ছি।” মোবাইলটা নামিয়ে রেখে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল বনমালা। বারবার কমলেশবাবুর কথাটা তার মনে পড়ছে।

এমন কিছু অতীত আছে, যা ভুলেই যাওয়াই শ্রেয়। না হলে কষ্ট পেতে হয়।

দেখা যাক, অদৃষ্ট কত কষ্ট তাকে দেয়। সত্য জানার জন্য সব কিছু সহ্য করতে রাজি বনমালা। পরের দিন সাড়ে দশটা নাগাদ নিজের গাড়িতে দুই বন্ধুকে তুলে রওনা দিলেন কমলেশ রায়। ড্রাইভ করতে করতে তিনি প্রশ্ন করলেন, “তোমরা ভুবনডাঙা চেনো তো? ওখানেই যেতে হবে আমাদের।”

“হ্যাঁ কাকা। আমি দেখিয়ে দেব রাস্তা। ডাক্তার তাহলে ভুবনডাঙায় থাকে?” বলে উঠল অরণ্য।

“হ্যাঁ, অমর চৌধুরী নাম। এখন অবসর নিয়েছে।”

চুপ করে শুনে যেতে লাগল বনমালা। গাড়ি ছুটে চলল ভুবনডাঙার দিকে।

.

শর্মিষ্ঠা বসু জেরা করে যাওয়ার পরে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন অমর চৌধুরী। রুগি দেখা বন্ধ রেখেছিলেন তিনি। সকালেও বাড়ি থেকে বেরোতেন না। দুটো দিন কেটে গেলেও ঘরবন্দি অবস্থাতেই রয়েছেন প্রবীণ চিকিৎসক।

বেলা এগারোটা নাগাদ তার ঘরে হাজির হল কিঙ্কর। “বাবু, তিনজন আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।”

বিরক্ত চোখে কিঙ্করের দিকে তাকালেন অমরবাবু, “তোকে না বলেছি, আমি এখন রুগি দেখব না। তাও জ্বালাচ্ছিস? ভাগিয়ে দে।”

“আজ্ঞে, এরা রুগি নয়। একজন ভদ্রলোক সঙ্গে দুটো অল্পবয়সি ছেলে-মেয়ে।”

ভ্রূ কুঁচকে উঠল অমর চৌধুরীর। এরা আবার কারা!

একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিল কিঙ্কর, “এটা ওই বাবু আপনাকে দিতে বলল।”

কার্ডটা নিয়ে ভালো করে দেখলেন অমর চৌধুরী। এ তো ক্লিনিকাল সাইকিয়াট্রিস্ট। কমলেশ রায়। নামের পাশে লম্বা-চওড়া ডিগ্রি। বিদেশি ডিগ্রিও আছে। তার কাছে এই লোক কী করছে! সঙ্গে আবার দুটো ছেলে-মেয়েও রয়েছে। একবার ভাবলেন, ভাগিয়ে দেবেন। তারপরে ভাবলেন, দেখা যাক কী বলে।

“ডেকে নিয়ে আয় ওদের,” গুছিয়ে সোফায় বসলেন অমর চৌধুরী।

.

লম্বা চেহারার লোকটার মধ্যে একটা অভিজাত ব্যক্তিত্ব আছে, সেটা প্রথমেই খেয়াল করলেন অমর চৌধুরী। ছেলে-মেয়ে দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রী।

“কী ব্যাপার বলুন তো? হঠাৎ আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন আপনারা?”

কমলেশ একটু হাসলেন। তারপরে বললেন, “সামান্য ব্যাপার। আমরা একটা দিনের ঘটনার কথা জানতে চাইছি। যখন আপনি বোলপুর হাসপাতালে ছিলেন।”

দারুণ চমকে উঠলেন অমর চৌধুরী। আবার বোলপুর হাসপাতাল। আবার অতীত দিনের কোনও ঘটনা।

“আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। কী ব্যাপার জানতে চান আপনি?”

কমলেশ রায় চশমাটা খুলে কাচটা একবার ভালো করে মুছে নিলেন। তারপরে ডাক্তার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “হাসপাতাল থেকে আপনার নাম-ঠিকানা দিচ্ছিল না। যাই হোক, পুলিশমহলের উঁচুতলায় আমার একটু পরিচিতি আছে। সেই সুবাদে জোগাড় করতে পারলাম।”

চশমাটা আবার পরে নিলেন কমলেশ রায়। অমর চৌধুরীর মুখটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। লোকটা পুলিশের থ্রেট দিচ্ছে। ব্যাপারটা তাঁর ভালো লাগছে না।

অমর চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে কমলেশ রায় বলা শুরু করলেন—

“আমরা একটা দিনের কথা আপনার থেকে জানতে চাইছি। ২০০০ সালের ১৪ অক্টোবর।”

অমর চৌধুরী মনে করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সত্যিই তাঁর কিছু মনে পড়ল না। কত বছর আগেকার কথা। “আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না। কী হয়েছিল ওই দিন?”

“সেটাই আপনার কাছে জানতে এসেছি। ওই রাতে একজন সন্তানসম্ভবা মহিলাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে তিনি মারা যান। ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন আপনি। আপনার পেশেন্ট। মহিলার নাম কনকমালা সিংহ। স্বামীর নাম দীনেন্দ্র সিংহ। মনে পড়ছে?”

প্রশ্নটা করার আগেই অবশ্য উত্তর পেয়ে গিয়েছিলেন কমলেশ রায়। দীনেন্দ্র সিংহের নামটা শোনামাত্র ভীষণভাবে চমকে উঠলেন অমর চৌধুরী। চমকানোটা কারও দৃষ্টি এড়াল না।

পাংশু হয়ে এসেছে অমর চৌধুরীর মুখ। অতীত যে তাঁকে এইভাবে তাড়া করবে, ভাবতেও পারেননি তিনি

ঠান্ডা গলায় কমলেশ রায় বলে উঠলেন, “এই মেয়েটিকে দেখছেন, ওর নাম বনমালা সিংহ। সেই রাতে আপনার হাসপাতালে এই মেয়ের জন্ম দিতে গিয়েই মারা গিয়েছিলেন কনকমালা সিংহ। বনমালা এখন উত্তর চায়। উত্তর না নিয়ে আমরা যাব না।”

ফ্যাকাশে মুখে মেয়েটার দিকে একবার তাকালেন অমর চৌধুরী। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না কী বলবেন। কিছু না বলে এদের তাড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু…।

কমলেশ বোধহয় বুঝতে পারলেন ডাক্তারের মনের কথা। একটু সামনে ঝুঁকে এসে চিবিয়ে চিবিয়ে তিনি বললেন, “আপনি আমাকে চেনেন না। আমি কী করতে পারি, সে সম্পর্কে আপনার কোনও ধারণা নেই। আমি যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজি, তা না পেয়ে ছাড়ি না। তাই আপনাকে একটাই পরামর্শ দেব ডক্টর অমর চৌধুরী, যা জানেন বলে দিন। নাহলে আমি তোলপাড় করে ছাড়ব।”

লোকটার মুখ-চোখের দৃষ্টি দেখে ভয় পেয়ে গেলেন অমর চৌধুরী। দু-দিন আগে ওই পুলিশ অফিসার এসে অত কাণ্ড করে গেল। এখন এই কেস। কোনওভাবে যদি এইসব কথা বাইরে যায়, তাহলে তাঁকে আত্মহত্যা করতে হবে।

কাঁপা কাঁপা গলায় অমর চৌধুরী বললেন, “যা জানি, সব বলছি আপনাকে। কিন্তু দোহাই মোবাইলে রেকর্ড করবেন না।”

একটু অবাক হলেন কমলেশ রায়। তারপর বুঝলেন, সম্প্রতি এই অভিজ্ঞতা হয়েছে লোকটার। স্মিত হেসে নিজের মোবাইলটা বার করে সুইচ অফ করে দিলেন তিনি। সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমরাও মোবাইল সুইচ অফ করে দাও।” তিনটে মোবাইলই রাখা হল টেবলের উপরে।

“নিন, এবার শুরু করুন। যা জানেন, সব বলবেন।”

মাথাটা নীচু করে বলা শুরু করলেন অমর চৌধুরী—

১৩ অক্টোবর নাইট শিফট ছিল তাঁর। ১৪ তারিখ ভোররাতে একটা গাড়ি এসে ঢুকল হাসপাতালে। একজন নার্স এসে খবরটা দিল অমর চৌধুরীকে

“স্যার, একটু আসুন। একজন পেশেন্ট এসেছে। অবস্থা সংকটজনক।

“কে বলো তো?”

“দীনেন্দ্র সিংহের স্ত্রী। দীনেন্দ্র বাবুরা শান্তিনিকেতনের বনেদি বড়োলোক। অনেক প্রভাব-প্রতিপত্তি। আপনি শিগগির দেখতে চলুন।”

প্রথম দর্শনেই পরিস্থিতি ভালো মনে হল না অমরবাবুর। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে, বমি করেছে। হার্টবিট দ্রুত কমে আসছে। তার উপরে সন্তানসম্ভবা। দেখে মনে হচ্ছে বাচ্চা প্রসব করতে পারে যে কোনও মুহূর্তে।

অমর চৌধুরী বুঝতে পারলেন, সত্যিই সংকটজনক পরিস্থিতি। বাচ্চা-মা দুজনেই মারা যেতে পারে এই অবস্থায়। তাঁকে খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

দীনেন্দ্র সিংহকে ডেকে পাঠালেন ডাক্তার, “দেখুন, আপনাকে সত্যি কথাটা বলি। মায়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীরে শক্তি নেই বললেই চলে। হার্টবিট দ্রুত ফল করছে। বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম। এই অবস্থায় স্বাভাবিক প্রসব হওয়া অসম্ভব। আপনি রাজি থাকলে আমি সিজারিয়ান করব। মাকে হয়তো বাঁচাতে পারব না। তবে বাচ্চাটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারি।”

দীনেন্দ্র সিংহের মুখটা কালো হয়ে গেল। চোখ দুটো লাল হয়ে গিয়েছে। ডাক্তারের দেখে একটু ভয়ই করতে লাগল। ভদ্রলোক চাপা গলায় বললেন, “আপনি যা ভালো বুঝবেন, তাই করুন। আমার এ ক্ষেত্রে কিছু বলার নেই।”

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে দীনেন্দ্র সিংহ সই করার পরে কনকমালাকে ওটি- তে নিয়ে যাওয়া হল। সেখান থেকে বাচ্চাটা বেরিয়ে এলেও মায়ের আর ফেরা হল না।

অমর চৌধুরী জানতেন, এই পরিণতি এড়ানো সম্ভব ছিল না। মায়ের শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব ছিল। বাচ্চাটাকে যে বাঁচাতে পেরেছেন, সেটাই বড়ো ব্যাপার।

এবার যে প্রশ্নটা দানা বাঁধতে লাগল অমর চৌধুরীর মনে, তা হল— মায়ের এই অবস্থা হল কেন? তাঁর মনে একটা সন্দেহ উঁকি মারতে শুরু করেছে। তিনি ডেকে পাঠালেন দীনেন্দ্ৰ সিংহকে।

“দেখুন, যা পরিস্থিতি, তাতে এই মৃত্যুকে আনন্যাচারাল ডেথ বলতেই হবে। পুলিশকে জানাতে হবে। আমাকে পোস্ট মর্টেম করতে হবে।”

দীনেন্দ্র সিংহের অত বড়ো চেহারাটা যেন গুটিয়ে ছোটো হয়ে গেল। তিনি দু- হাতে ডাক্তারের দুটো হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, “দোহাই আপনার। ওই কাজটা করবেন না। আমার মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশে যাবে।”

“মানে কী? কী বলছেন এ সব?”

“আমি আপনাকে সব কথা খুলে বলছি। আমার স্ত্রী আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। রাগারাগি করে ও বিষ খেয়েছে।”

চমকে উঠলেন ডাক্তারবাবু। “আপনি এ সব কী বলছেন? তাহলে তো পুলিশকে জানাতেই হবে।”

প্রায় কেঁদে ফেললেন দীনেন্দ্র সিংহ, “ওর আত্মহত্যার ঘটনার কথা যদি জানাজানি হয়, তাহলে আমার মুখ দেখানোর অবস্থা থাকবে না। আমাকেও একই রাস্তা বেছে নিতে হবে। বাচ্চাগুলো ভেসে যাবে। আপনি দয়া করুন।”

“আর আমার চাকরির কী হবে? পুলিশ যদি কোনও সন্দেহ করে, আমাকে ছাড়বে?” বলে উঠলেন অমর চৌধুরী।

“পুলিশ নিয়ে আপনি ভাববেন না। বোলপুর থানার অফিসাররা সবাই আমাকে চেনে। কেউ কিছু বলবে না। শুধু আপনাকে ডেথ সার্টিফিকেটটা দিতে হবে। তাহলেই সব ঠিক থাকবে। বাকিটা আমি বুঝে নেব।” তারপরে ডাক্তারের হাতটা ধরে দীনেন্দ্র বলে উঠলেন,”আর এই কাজটা শুধু শুধু করতে বলছি না।

গলা নামিয়ে প্রস্তাবটা দিলেন দীনেন্দ্র সিংহ। টাকার অঙ্কটা বিশাল। অন্তত ওই সময়ের নিরিখে তো বটেই। মধ্য তিরিশের ডাক্তারবাবু বিয়ে করেছেন। তাঁরও দুটো ছেলে-মেয়ে। সরকারি মাইনেতে চলছে না। টাকার অঙ্কটা তাঁকে টলিয়ে দিল।

ডেথ সার্টিফিকেটটা লিখেই দিলেন ডক্টর অমর চৌধুরী। সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু। আ ন্যাচারাল ডেথ। স্বাভাবিক মৃত্যু!

কিছুদিন ভয়ে ভয়ে ছিলেন অমরবাবু। যদি কোনও কেলেঙ্কারি ঘটে। সময় বয়ে গেল। কিছুই আর হল না। কেউ কোনও প্রশ্ন তুলল না কনকমালা সিংহের মৃত্যু নিয়ে। ডাক্তারও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

.

কথা শেষ করে চুপ করে রইলেন অমর চৌধুরী। বাকি দুজনও পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। শুধু বনমালার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজটা শোনা যাচ্ছিল। তারপরে ডক্টর চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বনমালা বলে উঠল, “পাপের শাস্তি সবাইকে পেতে হবে। মায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী যারা, তাদের কাউকে আমি ছাড়ব না।

অরণ্য হাতটা বাড়িয়ে বনমালার কাঁধে একটু চাপ দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।

উঠে দাঁড়ালেন কমলেশ, ঘৃণার চোখে তাকালেন ডাক্তারের দিকে। বেরিয়ে আসছিলেন, হঠাৎ কী মনে হতে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, দীনেন্দ্র সিংহ তো বলেছিল তার স্ত্রী বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আপনি কি জানতে চেয়েছিলেন বিষটা কী?”

ডক্টর চৌধুরী ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর চোখের ভয়ার্ত ভাবটা নজর এড়াল না কমলেশের।

“জানতে চেয়েছিলাম। দীনেন্দ্রবাবু বলেওছিলেন। অদ্ভুত একটা বিষ। তখনই আমি প্রথম ওই বিষটার ব্যাপারে শুনি।”

“কী বিষ?” চাপা স্বরে প্রশ্নটা করলেন কমলেশ রায়।

“করবী গাছের বিষ!”

বিস্ফারিত চোখে তিনজনে তাকিয়ে রইলেন ডাক্তার অমর চৌধুরীর মুখের দিকে।

.

প্রান্তিকের কাছে তখন নিজের বাড়িতে বসে আঁকাটা প্রায় শেষ করে এনেছে রিঙ্কি। নাহ, নিজের আঁকায় নিজেই খুশি হল বাচ্চা মেয়েটা। স্যার যে মেয়েটার ছবি এঁকেছিলেন, প্রায় সে রকম ছবি রিঙ্কিও আঁকতে পেরেছে।

ওই খোঁপায় গোঁজা রক্তকরবী সমেত!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *