প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ১.৭

শান্তিনিকেতন, ১৯৯৩

“আরে কনক, কোথায় চললি?”

পিছন থেকে ডাকটা শুনে ঘুরে তাকাল কনকমালা। হাসিমুখে এগিয়ে আসছে প্রবীর।

কলাভবন থেকে বেরিয়ে কনকমালা শ্রীনিকেতনের দিকে হাঁটছিল। ওখানে একজনের বাড়ি যেতে হবে। প্রবীরের ডাক শুনে থেমে গেল।

“কী ব্যাপার, তুই এখানে? ক্লাস নেই?” প্রবীরও কলাভবনে পড়ে। তার সাবজেক্ট পেন্টিং। কনক পড়ছে টেক্সটাইল ডিজাইন নিয়ে।

প্রবীর একগাল হেসে জবাব দিল, “না রে, আপাতত নেই। তাই তো বেরিয়ে এসেছি। এদিকে এসেছিলাম একটা কাজে। হঠাৎ তোকে দেখতে পেয়ে গেলাম।” প্রবীর আর ভাঙল না, কনকমালাকে সে ক্যাম্পাস ছাড়ার সময়ই দেখতে পেয়ে গিয়েছিল। তারপরে পিছু পিছু এসেছে। সুযোগ পেতেই ডাক দিয়েছে।

“তা এদিকে কোথায় চললি?”

কনকমালার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল প্রবীর।

সুযোগ পেলেই সে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এত অপরূপ মুখ সে কখনও দেখেনি। যেন দেবী দুর্গার মুখ কেটে বসানো আছে। উজ্জ্বল গায়ের রং, দীর্ঘাঙ্গী। ছিপছিপে, ঋজু চেহারা। একটা আভিজাত্য ঝরে পড়ছে চেহারায়। নিজেকে যেন সবসময় একটা অদৃশ্য গণ্ডির মধ্যে আটকে রেখেছে মেয়েটা। সেই গণ্ডির কাছে আসা যায়, কিন্তু ভিতরে পা রাখা যায় না।

কতদিন ধরে এই গণ্ডির ভিতরে আসার চেষ্টা করছে প্রবীর। কিন্তু পারছে না। কোনওদিন পারবে কি না, বুঝতেও পারে না। কিন্তু সে হাল ছাড়বে না। কনক তাকে পাগল করে দেয়। তাকে জেগে থাকতে দেয় না, ঘুমোতেও দেয় না।

দুজনে পাশাপাশি হাঁটছিল বলে বোঝা যায়, কনক প্রায় ইঞ্চিখানেক লম্বা প্রবীরের থেকে। শ্যামবর্ণ একটু রোগাটে চেহারার প্রবীরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু হল দুটো চোখ। একটা গভীর দৃষ্টি যেন মানুষের মনের ভিতরটা দেখে নিতে পারে।

প্রবীরের দিকে না তাকিয়েই কনক জবাব দিল, “আমাকে একটু বনানীদির বাড়িতে যেতে হবে। কয়েকটা শাড়ির ডিজাইন নিয়ে কথা বলার ছিল।”

“চল চল, আমিও যাই তোর সঙ্গে। এখন কোনও কাজ নেই। দেখি, কীরকম ডিজাইন করিস তোরা।”

কনকমালা আপত্তি করল না। দুজনে একটু এগিয়ে শ্রীনিকেতন মোড় থেকে ডান দিকের রাস্তাটা নিল।

প্রবীর ভালোই জানে, কনকমালার দুটো নেশা। এক, জামাকাপড় ও শাড়ির নিত্যনতুন ডিজাইন করা। কনকের অনেকদিনের স্বপ্ন এই শান্তিনিকেতনে একটা বুটিক খুলবে। যেখানে থাকবে তার নিজের ডিজাইন করা শাড়ি। লোককে সস্তায় ভালো জিনিস দিতে পারবে।

দ্বিতীয় নেশাটা থিয়েটারের। সুযোগ পেলেই নাটকে অভিনয় করতে নেমে পড়ে মেয়েটা। গানের গলাও ভালো। এখন যেমন একটা নাটকের রিহার্সাল চলছে জোরকদমে।

রক্তকরবী!

স্বাভাবিকভাবেই নন্দিনীর চরিত্রে অভিনয় করছে কনক। দূর থেকে প্রবীর দেখেছে কীভাবে খোঁপায় রক্তকরবী গুঁজে অভিনয় করে চলেছে কনকমালা। চরিত্রটাকে যেন জীবন্ত করে তুলেছে। মেয়েটা স্টেজে থাকলে কারও আর অন্যদিকে চোখ ফেরানোর উপায় নেই। এতটাই আকর্ষণীয় শক্তি।

দূর থেকেই দেখেছে প্রবীর। এই নাটকে অভিনয় করার যোগ্যতা তার নেই। সে শুধু একটাই কাজ পারে, আঁকতে।

প্রান্তিকের কাছে তাদের যে ছোট্ট একতলা বাড়িটা আছে, সেখানে সে আর তার মা থাকে। পেন্টিং নিয়ে মাস্টার্স করছে প্রবীর। সে ভালোবাসে পোর্ট্রেট আঁকতে। তার ছোট্ট ঘরটায় নানা মানুষের পোর্ট্রেটের ছড়াছড়ি। কিন্তু কয়েকটা পোর্ট্রেটকে সে আলাদা করে যত্নের সঙ্গে লুকিয়ে রেখেছে। সেগুলো কারও জন্য নয়। সেগুলো শুধুই তার। একান্তে সেই সব ছবিগুলো নিয়ে বসে থাকে প্রবীর। আর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে নিজের সৃষ্টির দিকে। এই সৃষ্টি তার নিজস্ব, এই সৃষ্টিতে আর কারও ভাগ বসানোর অধিকার নেই।

পোর্ট্রেটগুলো কনকমালার। কনকের মুখটা তাঁর মনে চিরকালের জন্য গেঁথে গিয়েছে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে। তাই মেয়েটার থেকে দূরে বসেও সে নিখুঁত ছবি এঁকে দিতে পারে।

.

মোড়টা থেকে আরও মিনিট দশেক এগিয়ে এসে ছোটো কাঁচা রাস্তাটা ধরল কনকমালা। তারপরে এসে দাঁড়াল একটা দোতলা বাড়ির সামনে। প্রবীর জানে, এটা বনানীদির বাড়ি। এর আগেও কনকমালা এখানে এসেছে। সে দূর থেকে দেখেছে। কিন্তু কাছে যেতে পারেনি। কনক তখন একা ছিল না!

.

বনানীদির ঘরে বসে একটার পর একটা শাড়ি দেখে যেতে লাগল কনক। তারপরে ব্যাগের মধ্যে থেকে বার করে আনল কয়েকটা কাগজ।

“বনানীদি, এই ডিজাইনগুলো একটু দ্যাখো। কী মনে হয় তোমার?”

কাগজগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন মধ্য তিরিশের ভদ্রমহিলা। তাঁর কাজ এটাই, বিভিন্ন ডিজাইন সংগ্রহ করে গ্রামের মেয়েদের দিয়ে শাড়িতে কাজ করানো।

বনানী মাহাতো বল্লভপুরের কাছে একটি গ্রাম থেকে এসেছেন। তিনি নিজেও এইরকম শাড়ি ডিজাইন করতেন। শাড়ি, জামা-কাপড়ের উপরে সেলাই করে নকশা বানানোর কাজ। তারপরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দিতে থাকেন নিজের সৃষ্টিকে।

এখন তিনি প্রায় চারশো মেয়ের অন্নসংস্থান করার ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর গ্রামের প্রায় প্রতিটা মেয়েই এখন স্বাবলম্বী। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও পেয়েছেন বনানী।

ডিজাইনগুলো ভালো করে দেখে বনানীদি বলে উঠলেন, “খুব সুন্দর হাতের কাজ তোর। শাড়িতে দারুণভাবে ফুটে উঠবে।” তারপরে কনকমালার গালটা টিপে দিয়ে বললেন, “আমি বলছি, তুই বুটিক খুলে ফেল। দেখবি, খুব ভালো চলবে। আমি শাড়ি ডিজাইন করে আনব, তুই নিজেও করবি। দারুণ হবে ব্যাপারটা।”

কনকমালার সঙ্গীর দিকে এবার যেন চোখ পড়ল বনানীদির।

“একে তো আগে দেখিনি। তোর বন্ধু বুঝি?”

প্রবীর কিছু বলার আগেই কনক বলে উঠল, “হ্যাঁ দিদি। আমরা কলাভবনে পড়ি। ওর নাম প্রবীর। পেন্টিং নিয়ে মাস্টার্স করছে। খুব ভালো ছবি আঁকে।”

কনকমালার কথাটা শুনে প্রবীরের মনে সাত রংয়ের রামধনু জেগে উঠল। বনানীদিও হাসিমুখে বললেন, “বাহ, খুব ভালো। তা তুমিও তো কনকের শাড়ির জন্য ভালো ডিজাইন বানিয়ে দিতে পারো।”

কনকমালাই আবার বলে উঠল, “ওর সময় কোথায় দিদি। পোর্ট্রেট আঁকতেই ব্যস্ত।”

প্রবীর প্রায় লাফিয়ে উঠল, “কী যে বলিস তুই! তোর জন্য এই কাজটা করতে পারব না? আমাকে ভাবিস কী?”

উত্তেজিত প্রবীরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল কনকমালা, “আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন শান্ত হয়ে বোস। পরে এঁকে দিলেই চলবে।”

প্রবীর একটু লজ্জিত হয়ে বসে পড়ল।

বনানীদি সামান্য হেসে আবার শাড়িগুলোয় নজর দিলেন।

.

ঘণ্টাখানেক বাদে যখন দুজনে বনানীদির বাড়ি থেকে বেরোল সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। হালকা ঠান্ডা পড়ছে। শাড়ির আঁচলটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল কনকমালা।

দুজনেই চুপচাপ হাঁটছিল। প্রবীর একটু অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছে। শাড়ি ডিজাইনের ব্যাপারটা শুনে তার অতটা উত্তেজিত হয়ে পড়া উচিত হয়নি। এখন একটু লজ্জাই লাগছে। কনক কী মনে করল কে জানে।

হাঁটতে হাঁটতে মোড়ের কাছে চলে এসেছিল দুজনে। সাহস করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল প্রবীর, তার আগেই থেমে গেল একটা গলা শুনে।

“তোরা দুজনে এখানে কী করছিস?”

.

দুজনেই মুখ তুলে তাকাল। রাস্তার ওপাশ থেকে কথাটা বলেছে একটা লম্বা- চওড়া ছেলে।

ছেলেটাকে দেখতে পেয়েই প্রবীরের মুখ থেকে চাপা স্বরে বেরিয়ে এল কথাগুলো— “ব্যস, প্রফেসর সাহেব হাজির হয়ে গিয়েছে। কিছুতেই পিছু ছাড়বে না।”

কনকমালা অবশ্য প্রবীরের কথা শুনতে পায়নি। সে উলটো দিকের ছেলেটাকে দেখেই হাত নাড়ল। তারপরে রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে গেল।

.

প্রবীরের মুখটা ততক্ষণে কালো হয়ে গিয়েছে। ছেলেটাকে দেখে তো বটেই, কিন্তু তার থেকে আরও একটা ব্যাপার প্রবীরের মনের জ্বলুনিটাকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

দীনেন্দ্র সিংহকে দেখতে পেয়েই যে কনকমালার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, সেটা দৃষ্টি এড়ায়নি ছেলেটার।

নিজের অজান্তেই হাতটা মুঠো হয়ে গেল প্রবীর সেনের!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *