প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ৩.২

শান্তিনিকেতন, ২০২১

জয়ন্ত গ্রেফতার হওয়ার চার দিন পরে।

এই কদিনে বনমালা নিজেকে কোনওমতে সামলেছে। যতবার সে ঘটনাটা ভাবছে, ততবারই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।

সব কিছু শুনেছে বনমালা। আর যা শুনেছে, পুরোটাই দুঃস্বপ্নের মতো লেগেছে তার কাছে। দাদা একটা খুন শুধু করেনি, চার-চারটে খুন করেছে! দাদাকে নাকি সিরিয়াল কিলার বলা হচ্ছে!

যখনই কথাগুলো মনে পড়ছে, হতবাক হয়ে যাচ্ছে বনমালা। তার সেই দাদা এইরকম নৃশংসভাবে মানুষ খুন করেছে? সেই দাদা, যে ছোটোবেলা থেকে আগলে রাখত তাকে। দাদার কাছে শুয়ে শুয়ে কত গল্প শুনেছে বনমালা। বেশিরভাগই গোয়েন্দা গল্প। আর সে গল্প শুনে শুনে একটা সময় নিজেকে খুদে ডিটেকটিভ হিসেবেও কল্পনা করতে ভালোবাসত বনমালা।

অরণ্যদের বাড়িতে বসে জানলা দিয়ে আকাশটা দেখতে দেখতে নানা ভাবনায় তলিয়ে যাচ্ছে বনমালা।

তার দুই টিচারকে কেন মারল দাদা? চঞ্চল স্যার এবং ঈপ্সিতা ম্যাডামকে?

পরের দুটো খুনের পিছনে কারণ থাকলেও থাকতে পারে। হয়তো প্রবীর সেন মুখ খুলুক চায়নি দাদা। মুখ খুললে হয়তো ভয়ংকর কোনও সত্য বেরিয়ে পড়ত। সংসারে আর বিষ ঢোকাতে চায়নি দাদা। আর সজলের সঙ্গে তার আর অরণ্যর ঝামেলার কথা তো দাদার কানে গিয়েইছিল। ঘটনাটা শোনার পরে দাদার প্রতিক্রিয়াটাও মনে পড়ে যাচ্ছে বনমালার। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল দাদা। কিন্তু প্রথম দুটো খুন কেন?

কপাল টিপে বসে রইল বনমালা। তার মাথায় আরও একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

এইভাবে অরণ্যদের বাড়িতে কতদিন থাকবে সে? অরণ্যর বাবা-মা ভীষণই ভালো। তাকে মেয়ের মতোই দেখে। কিন্তু চার দিন হয়ে গেল। এবার তাকে বাড়ি ফিরে যেতেই হবে।

সকাল হয়ে গেলে মিনতি মাসি তাদের বাড়ি যায়। বাবার জন্য দু-বেলা রান্না করে দিয়ে আসে। মিনতি মাসি বিকেলেও একটা বাড়িতে কাজ ধরেছে। সেই কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে রাত ন-টা বেজে যায়। রাতে তার ঘরে এসে শোয়। কিন্তু সেই সিস্টেমও বেশিদিন চলতে পারে না। পুলিশও এবার সিংহবাড়ি থেকে পাহারা তুলে নেবে।

বনমালা বুঝেছিল, তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিণামটা বুঝতে পারছিল মেয়েটা। ওই সিংহবাড়িতে তাকে একাই ফিরে যেতে হবে। ওই দুঃস্বপ্ন ঘেরা বাড়িতে।

তাছাড়া তার যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। এক মাসের মধ্যে যে তার জীবনটা এইভাবে ভেঙেচুরে যাবে, ভাবতেও পারেনি বনমালা।

কমলেশ কাকা ঠিকই বলেছিলেন। সবসময় অতীতকে টেনে তুলে আনা ঠিক নয়। তাহলে যন্ত্রণা পেতে হয়। বনমালা নিজেকে তৈরি রেখেছিল যে কোনও পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য। কিন্তু পরিস্থিতি যে এরকম ভয়াবহ হয়ে উঠবে, যন্ত্রণা যে এত মারাত্মক হবে, তা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

আর সামলাতে পারল না বনমালা। বিছানায় উপুড় হয়ে কাঁদতে লাগল। কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠছে তার শরীর।

.

গত দু-দিন ধরে অনেক ভেবেছেন কমলেশ রায়। তার মনে হচ্ছে, কোথাও একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। সেই ফাঁক ভরাট করার জন্য কিছু তথ্য দরকার। সবচেয়ে আগে জানা দরকার, সাত বছর আগে দুজন নিরপরাধ মানুষকে কেন ওইভাবে মেরেছিল জয়ন্ত? মোটিভটা কী ছিল?

আর খুন হওয়া ওই দুই মানুষের অতীত সম্পর্কে কিছু তথ্য। কমলেশ জানেন, দুটোই খুব কঠিন কাজ। তিনি যত দূর শুনেছেন, জয়ন্ত আর কিছু বলতে চাইছে না। ছেলেটাকে নিয়ে মার্ডার স্পটে গিয়েছিল পুলিশ। সেখানে নাকি জয়ন্ত সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলেছে। কোথায়, কীভাবে খুন করেছে, সব বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার বাইরে আর কিছু বলছে না।

চঞ্চলবাবু এবং ঈপ্সিতার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করাও খুব কঠিন কাজ। তাঁদের পরিচিত কেউ আর শান্তিনিকেতনে থাকে না। ঈপ্সিতার বন্ধু শোভনা ওই ঘটনার পরেই কলকাতায় ফিরে যান। আর শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেননি। বাড়িটা তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। একই অবস্থা চঞ্চল মজুমদারের বাড়িরও।

এঁদের অতীত সম্পর্কে জানতে গেলে কলকাতায় খোঁজখবর নিতে হবে। কিন্তু সেই সময় কোথায়?

তাঁকে খুব তাড়াতাড়ি দেশের বাইরে যেতে হবে। লন্ডনে একটা সেমিনার আছে। তারপরে ঘুরতে হবে ইউরোপের কয়েকটা শহরে। দিন দুয়েকের মধ্যে তাঁকেও শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যেতে হবে।

কমলেশ শুধু ভাবছিলেন বনমালার কথা। মেয়েটার উপরে তাঁর এক রকম মায়া জন্মে গিয়েছে। বনমালার প্রতি অরণ্যর দুর্বলতা শুধু তাঁরই চোখে পড়েনি, তাঁর দাদা-বউদিও দেখেছেন। কিন্তু এইরকম পরিস্থিতিতে কী যে করণীয়, কেউ বুঝতে পারছেন না। তবে একটা ব্যাপার বুঝেছিলেন কমলেশ। সিংহবাড়িতে বনমালার ফিরে যাওয়া এখন একেবারেই ঠিক হবে না।

সন্ধ্যাবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন কমলেশ। একটু ফাঁকা জায়গায় ঘোরা দরকার। মাথাটা যদি খোলে।

আনমনে বিবেকানন্দ সরণি দিয়ে হাঁটছিলেন কমলেশ। বছরখানেক আগে এই রাস্তার সরকারি ভাবে উদ্ঘাটন হয়েছে। দু-পাশে গাছের সারি। একটু এগোলে ডান পাশে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে। সেই রাস্তা ধরে এগোলে মেলার মাঠটা পাওয়া যায়।

দু-চারজন ছেলে-মেয়ে সাইকেল করে কমলেশকে পেরিয়ে চলে গেল। কমলেশ ডান দিকে ঘুরলেন। লাল মাটির এই রাস্তাটা আরও নির্জন। সন্ধ্যা নামায় চারপাশটা অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে দ্রুত

কমলেশ আনমনে হাঁটলেও বুঝতে পারছিলেন পিছন থেকে একটা সাইকেল এগিয়ে আসছে।

মোবাইলটা বেজে উঠল ওই সময়। কমলেশ ফোনটা বার করে দেখলেন, অরণ্য কল করছে। কলটা রিসিভ করে কানে তুলতে যাবেন, তখনই পিছন থেকে একটা ধুড়ধাড় আওয়াজ হল। চমকে ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন, সাইকেল ফেলে আরোহী ছুটে আসছে তার দিকে।

ছুটে আসছে না বলে ঝাঁপিয়েই পড়ল বলা যায়। চেহারায় আততায়ীর থেকে কমলেশ অনেকটাই বড়োসড়ো হলেও ওই রকম আচমকা আক্রমণে ভারসাম্য ঠিক রাখতে না পেরে মাটিতে ছিটকে পড়লেন।

ওই অবস্থায় দেখতে পেলেন, আততায়ীর হাতটা শূন্যে উঠে দ্রুত নেমে আসছে তাঁর বুকের বাঁ-দিক লক্ষ্য করে। আধো-অন্ধকারেও বুঝতে অসুবিধে হল না, হাতে ধরা একটা ছুরি।

কমলেশ দ্রুত শরীরটা একটা দিকে মোচড় দিলেন অস্ত্রটাকে এড়ানোর জন্য। আততায়ী যে তাঁর হৃৎপিণ্ড লক্ষ্য করে ছুরি চালিয়েছে, তা বুঝতে অসুবিধে হল না কমলেশের। কিন্তু আঘাতটা পুরো এড়াতে পারলেন না। ছুরিটা নেমে এল কমলেশের বাঁ-কাঁধ লক্ষ্য করে। কাঁধে পুরোপুরি না বিধলেও হাতের একটা অংশকে ফালি করে দিয়ে মাটিতে গেঁথে গেল।

মাটিতে গাঁথা ছুরিটা তোলার চেষ্টায় কমলেশের ওপর থেকে নজর সরে গিয়েছিল আততায়ীর। কমলেশ বুঝে গেলেন, ওই কয়েকটা সেকেন্ডের মধ্যেই তাঁকে যা করার করতে হবে। তিনি শরীরটা সামান্য তুলে ডান-হাতে প্রচণ্ড একটা থাপ্পড় কষালেন লোকটার কানে।

এতটাই জোর ছিল সেই থাপ্পড়ে যে লোকটা আর্তনাদ করে ছুরি ছেড়ে কান চেপে ধরল। তার কান ভোঁ ভোঁ করছে। মনে হচ্ছে, কানের পর্দা ফেটে গিয়েছে। কানের ভিতরের পর্দাটা মানুষের শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখে। পর্দা জখম হলে শরীরের ব্যালান্সও নষ্ট হয়। ছেলেটার মাথাটা ঘোরাচ্ছিল। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে পারল না। কমলেশ ততক্ষণে অনেকটা সামলে নিয়েছেন। এবার তার জোরালো মুষ্টি আছড়ে পড়ল আততায়ীর চোয়ালে।

ধুপ করে মাটিতে পড়া চালের বস্তা মতো আততায়ীর শরীরটা গড়িয়ে পড়ল রাস্তায়।

উলটো দিক থেকে দুটো সাইকেল অকুস্থলের কাছে এসে পড়েছিল। এবার আরোহীরা দৌড়ে এল কমলেশের দিকে।

কমলেশ ততক্ষণে রাস্তায় পড়ে যাওয়া চশমাটা হাতে তুলে নিয়েছেন। কী ভাগ্যিস, ভাঙেনি।

মোবাইলটাও অক্ষত ছিল। দুটো লোকের একজন কমলেশের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার কাঁধ থেকে তো রক্ত পড়ছে মশাই।”

কমলেশ দেখলেন, সত্যিই রক্ত ঝরছে কাঁধের ক্ষতটা থেকে। তবে সেদিকে নজর দেওয়ার আগে দেখা দরকার আততায়ী কে। সে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে রাস্তায়।

মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে পড়ে থাকা লোকটার মুখে ফেললেন কমলেশ। চেনা চেনা লাগছে যেন। তারপরেই হঠাৎ মনে পড়ে গেল মুখটা। এই ছেলেটাকে তো পাড়ুই বাড়িতে দেখেছিলেন তিনি। রন্টি বলে ছেলেটার বন্ধু। মুম্বই থেকে এসেছে। কিন্তু সেই ছেলেটা খামোকা তাঁকে মারতে যাবে কেন?

আরও একবার মোবাইল-টর্চের আলোয় ছেলেটার মুখ ভালো করে দেখলেন কমলেশ। কীরকম যেন চেনা চেনা লাগছে। শুধু পাড়ুই বাড়িতে নয়, আরও কোথাও এই মুখটা দেখেছেন তিনি। কোথায়?

হঠাৎই স্মৃতির অতল থেকে ভেসে এল আর একটা মুখ। কমলেশের বুঝতে অসুবিধে হল না, কেন ছেলেটাকে তাঁর চেনা চেনা মনে হচ্ছে।

আততায়ীর আসল পরিচয় বুঝে গেলেন কমলেশ রায়।

.

রাত তখন প্রায় আটটা। থানা-পুলিশের ঝামেলা সামলে, কাঁধে ব্যান্ডেজ বেঁধে বাড়ি ফিরেছেন কমলেশ। সঙ্গে অরণ্য।

খবরটা পাওয়ার পরেই বেরিয়ে গিয়েছিল অরণ্য। বনমালাও সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু অরণ্যর বাবা-মা ছাড়েননি।

দুজনের ফেরার অপেক্ষায় বসেছিল বনমালা। কমলেশ আর অরণ্য ঢুকতেই উদ্বিগ্ন মুখে ছুটে এল সে।

“আপনি ঠিক আছেন তো কমলেশ কাকা?”

মেয়েটার গলায় যে উদ্বেগটা ঝরে পড়ছিল, তা ছুঁয়ে গেল কমলেশকে। তিনি অন্য হাতটা বনমালার মাথায় বুলিয়ে বললেন, “একদম ঠিক আছি। তুমি কিছু চিন্তা কোরো না।”

তিনজনে চলে এল কমলেশের শোওয়ার ঘরে। দাদা-বউদি, মানে অরণ্যর বাবা-মাও আশঙ্কায় জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন।

সবাইকে আশ্বস্ত করতে আরও মিনিট দশেক সময় নিলেন কমলেশ। তারপরে খুলে বললেন পুরো ঘটনা।

ছেলেটার আসল নাম রঘু। বছর পাঁচেক আগে উত্তরপ্রদেশে জোড়া খুনের মামলায় ধরা পড়ে। প্রথমে পাগলের অভিনয় করে শাস্তি এড়াতে চেয়েছিল। ছেলেটা প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ার কারণে ব্যাপারটা আরও জটিল হয়ে যায়।

ওই সময় উত্তরপ্রদেশে একটি সংস্থার সঙ্গে কাজ করছিলেন কমলেশ। তিনিই অভিনয়টা ধরে ফেলেন। তারপরে ছেলেটার কড়া সাজা হয়। তবে সে যে পালিয়েছিল, সেটা জানা ছিল না কমলেশের। বোলপুর থানার অফিসার উত্তরপ্রদেশে ফোন করে রঘুর আসল খবরটা বার করে আনে।

অদ্ভুতভাবে কমলেশ যখন শান্তিনিকেতনে, তখনই তার বন্ধুর সঙ্গে এখানে ছুটি কাটাতে আসে রঘু। এবং সেদিন পাড়ুই বাড়িতে কমলেশকে দেখার পরেই চিনে ফেলে।

তখন থেকেই প্রতিশোধ নেওয়ার প্ল্যানে ছিল সে। নজরও রেখেছিল কমলেশের উপরে। কিন্তু কখনওই একা পাচ্ছিল না। আজ একা পেতেই হামলা করে।

“এই হল পুরো ব্যাপার। শ্রীমান রঘু আবার শ্রীঘরে ফিরে যাবে। আগেকার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হবে কমলেশ রায়কে হত্যার চেষ্টার মামলাও।”

কমলেশের কথা শেষ হওয়ার পরে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন সবাই। তারপরে অরণ্যর মা বলে উঠলেন, “কী ভয়ানক কাণ্ড! কমলেশ, তুমি খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছ।”

একটু পরে ঘর থেকে চলে গেলেন অরণ্যর বাবা-মা। এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল বনমালা। অরণ্যর বাবা-মায়ের সামনে সে স্বপ্নের কথাটা বলতে চায়নি। ওঁরা কিছু জানেন না।

ঘর ফাঁকা হতেই বনমালা বলে উঠল, “তাহলে আমার স্বপ্নটা সত্যি হল, বলুন।”

একটু হাসলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।”

“তাহলে কি আমার মধ্যে সত্যিই কোনও অলৌকিক শক্তি আছে? কাছের মানুষদের উপরে কোনও বিপর্যয় আসন্ন হয়ে পড়লে, আমি সেটা দেখতে পাই?”

“হতেই পারে,” খাটের উপরে গুছিয়ে বসলেন কমলেশ। “এইরকম অনেক ঘটনার কথা আমরা নানা জার্নালে পড়েছি। একটা ঘটনার কথা তো অনেকেই জানে। স্যান্ডি হুক স্কুল শুটিং।”

.

২০১২ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানেক্টিকাটে স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে বর্বরোচিত এই আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল। আততায়ীর গুলিতে মারা যায় কুড়িটি শিশু।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, ঘটনার সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকে একটি বাচ্চা স্কুলে গেলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। প্রিন্সিপাল যতই বাচ্চাটাকে শান্ত করতে যেতেন, সে চেঁচিয়ে উঠত, “এই জায়গাটা ভালো নয়, নিরাপদ নয়। বিপদ হবে।”

বেশ কয়েকদিন এইরকম চলার পরে বাচ্চাটির মা তাকে স্কুল থেকে সরিয়ে আনে। হামলার দিন বাচ্চাটি স্কুলে যায়নি!

.

ঘটনাটা বলে থামলেন কমলেশ। “তাহলে বুঝতেই পারছ, এইরকম ঘটনা আগেও ঘটেছে। আসলে কী জানো, আমাদের মস্তিষ্কের রহস্য আমরা কিছুই ভেদ করতে পারিনি। বিজ্ঞান অনেক এগোলেও মানুষের মন এবং মস্তিষ্কে এমন অনেক স্তর আছে, যার হদিশ কেউ পায়নি। ইটস আ ভেরি ভেরি গ্রে জোন। ধূসর একটি জায়গা। এইরকম কোনও স্তর থেকে মাঝে মাঝে কোনও সিগনাল ভেসে আসে সচেতন সত্তায়। যা দেখলে-শুনলে মনে হয় কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটছে।” একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, “ওই রকম ঘটনা ঘটলে অনেকেই সেসব অলৌকিক বলে মনে করে। বলা হয়, কোনও অপার্থিব শক্তি এসে ভবিষ্যতের আভাস দিয়ে যাচ্ছে।”

বনমালা একটু কেঁপে উঠল। কে তাকে ভবিষ্যতের আভাস দিয়ে যাবে? তবে কি কেউ তাকে এখনও রক্ষা করে চলেছে…!

.

আবার একটু সময়ের নীরবতা। তারপরে কমলেশ জানতে চাইলেন, “এবারের স্বপ্নে তুমি ঠিক কী শুনেছিলে বলো তো?”

বনমালা একটু ভাবল। তারপরে বলল, “বাঁচতে দেব না। এইরকম একটা কথাই বারবার আমার কানে কেউ বলছিল।”

কমলেশ চুপ করে শুনলেন। তারপরে বললেন, “গলাটা পুরুষ না মহিলার, ঠিক বুঝতে পেরেছিলে?”

বনমালা আবার একটু ভাবার চেষ্টা করল। “সেটা ঠিক পরিষ্কার করে মনে করতে পারছি না। কীরকম যেন মাথার মধ্যে কথাগুলো ধ্বনিত হচ্ছিল। কানে শোনার মতো নয় ব্যাপারটা।’

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। তোমাকে অত ভাবতে হবে না।” বলে বনমালাকে থামিয়ে দিলেন কমলেশ।

কিন্তু বনমালার মনে একটা প্রশ্ন খচখচ করছিল। সে বলেই ফেলল, “কমলেশ কাকা, আপনার কি মনে হয় কোনও অলৌকিক শক্তি আমাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে? কোনও অপার্থিব শক্তি চায় না, আমার বা আমার ঘনিষ্ঠ মানুষদের কোনও ক্ষতি হোক?”

কমলেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “অপার্থিব বা অলৌকিক শক্তি ঠিক আমার কাজের আওতায় পড়ে না। আমি চেষ্টা করি যুক্তি, বিজ্ঞান আর কেস স্টাডির মধ্যে দিয়ে রহস্যের পর্দা তোলার।” একটু থামলেন কমলেশ। তারপরে ফের শুরু করলেন, “কিন্তু এটাও মানতে হবে, আমার কাজ এমন একটা ফিল্ডে, যেখানে লৌকিক আর অলৌকিকের মধ্যে সীমারেখাটা খুবই ক্ষীণ। খুব সতর্কভাবে তাই আমাদের পা ফেলতে হয়। নাহলে যে ঘটনা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, সেটাই অলৌকিক বলে চিহ্নিত হয়ে যাবে।”

আবার নীরবতা। এবার খাট থেকে উঠে পড়লেন কমলেশ, “তোরা বস। আমি একটু দাদার সঙ্গে কথা বলে আসি।”

ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

মিনিট দশেক পরে ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে গেলেন কমলেশ।

বিছানার উপরে ঘনিষ্ঠভাবে বসে আছে ছেলে-মেয়ে দুটি। অরণ্য এক হাতে জড়িয়ে রেখেছে বনমালাকে। দরজা থেকে দুজনের পিঠটাই শুধু দেখতে পাচ্ছিলেন কমলেশ। কিন্তু উলটো দিকের আয়নায় ধরা পড়ছিল তাদের প্রতিবিম্ব।

দুজনের মুখই আয়নায় দেখতে পাচ্ছিলেন কমলেশ। আর সেই প্রতিবিম্ব দেখে চমকে উঠলেন তিনি।

কয়েক মুহূর্ত আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলেন কমলেশ রায়। তারপরে ধীরে ধীরে সরে এলেন দরজার সামনে থেকে।

.

তাঁর উপরে আক্রমণটা হয়েছিল বোলপুর থানা এলাকায়। এফআইআর ওই থানায় হয়েছে। কিন্তু তিনি যেহেতু শান্তিনিকেতন থানার অন্তর্গত অঞ্চলে থাকেন, ওই থানার এসআইয়ের ফোন নম্বরও কমলেশকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। থানা থেকে একবার কথাও বলেছেন তিনি ওই মহিলা অফিসারের সঙ্গে।

ধীরে ধীরে মোবাইলটা বার করলেন কমলেশ। তারপরে ওই বিশেষ নম্বরটা ডায়াল করলেন। উলটো দিকে “হ্যালো” শুনতেই বলে উঠলেন, “মিস বসু, আমি কমলেশ রায় বলছি। সন্ধ্যার দিকে আপনার সঙ্গে কথা হয়েছিল আমার উপরে ওই অ্যাটাকটা নিয়ে।”

“হ্যাঁ, মিস্টার রায়, বলুন। কীরকম আছেন এখন?”

“আমি ঠিক আছি। আপনি কি এখন থানায় আছেন?”

“হ্যাঁ, তবে এই বেরোব।”

“আপনার কাছে একটা অনুরোধ আছে। আপনি আর এক ঘণ্টা থানায় থেকে যান। ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে।”

“কী ব্যাপার বলুন তো মিস্টার রায়? আপনার উপরে আবার অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা আছে নাকি?”

“একটা ঘণ্টা আমাকে সময় দিন ম্যাডাম। প্লিজ।”

শর্মিষ্ঠা কী যেন ভাবলেন। তারপরে বললেন, “ঠিক আছে। আমি এক ঘণ্টা থানায় অপেক্ষা করছি।”

ফোনটা পকেটে রেখে চশমাটা খুললেন কমলেশ রায়।

তাঁর চোখ দুটো উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *