১৪
কানপুর, উত্তরপ্রদেশ, ২০১৬
কানপুর নগরে অ্যাডিশনাল সিপি (হেডকোয়ার্টার অ্যান্ড ক্রাইম)-র দফতরে বৈঠকটা বসেছিল। সামনে বসে থাকা দুই অফিসারের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে অ্যাডিশনাল সিপি বললেন, “আপনারা কী বলছেন, আমার নাথায় ঢুকছে না। ছেলেটাকে ভূতে ধরেছে? আপনাদের রিপোর্টে এইসব থাকবে?”
.
চন্দনপুরের এই কেসটা তাঁর কাছে আসার কথাই নয়। কিন্তু এমন কয়েকটা ব্যাপার উঠে এসেছে, সিপি-র অফিস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে কেসটা।
প্রথমত, কেসটা জুভেনাইল অ্যাক্টে পড়ছে। তার উপরে জোড়া খুনের কেস। তাই খুব সতর্কভাবে এগোতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অদ্ভুত ব্যাপার! ছেলেটা নাকি পাগলের মতো আচরণ করছে। নিজেকে অন্য কেউ বলে পরিচয় দিচ্ছে। রিপোর্টটা তাঁর কাছে আসার পরে সংশ্লিষ্ট থানার আধিকারিকদের ডেকে পাঠান অ্যাডিশনাল সিপি।
.
প্রশ্নটা শুনে একটু থতোমতো খেয়ে গেলেন থানার স্টেশন হাউস অফিসার (এসএইচও) এবং ইনভেস্টিগেটিং অফিসার। এসএইচও একবার অনিল দুবের দিকে তাকিয়ে বলা শুরু করলেন, “স্যার, ছেলেটাকে দেখলে কিন্তু আপনি চমকে যাবেন। একেবারে অন্য মূর্তি ধারণ করেছে। ওই সময় ওকে সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
“কানের গোড়ায় একটা থাবড়া মারলেই ওইসব ভূতপ্রেত পালিয়ে যাবে, বলে নিজেই টেবলের উপরে একটা কিল বসিয়ে দিলেন অ্যাডিশনাল সিপি।
“বিশ্বাস করুন স্যার, আমরা সবকিছু চেষ্টা করেছি,” হড়বড় করে বলে উঠল আইও অনিল দুবে, “কিন্তু কিছুতেই তল পাচ্ছি না। ছেলেটা যেন অন্য কেউ হয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে।”
ঊর্ধ্বতন অফিসার একটু শান্ত হলেন। বললেন, “ঠিক আছে, আপনারা যান। আমি দেখছি কী করা যায়।”
ঘর ফাঁকা হতে একটু তলিয়ে বিষয়টা ভাবতে বসলেন অ্যাডিশনাল সিপি। একে জুভেনাইল কেস। তার উপরে ষোলো বছরের বেশি বয়স। মানে এমনিতেই ওই একজন মনোবিদের সাহায্য লাগবে। সেই মনোবিদের মতামতের উপরেই ছেলেটার শাস্তির মাত্রা নির্ভর করবে।
মিনিটখানেক ধরে কয়েকটা নাম মনে করার চেষ্টা করলেন অফিসার। তারপরে মোবাইল বার করে একটা নম্বর ডায়াল করলেন।
.
মোহন রোড, লখনউ
জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টের আওতায় থাকা ডিপার্টমেন্ট অব উওমেন অ্যান্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্টের অন্তর্গত বেশ কিছু চাইল্ড কেয়ার ইনস্টিটিউশন আছে উত্তরপ্রদেশে। তার মধ্যে একটা রয়েছে লখনউয়ের মোহন রোডে। কানপুর থেকে ঘণ্টা আড়াই দূরে।
.
“কমলেশজি, কাহা হ্যায় আপ? ইয়ে ফোন আপকে লিয়ে,” একটু দূরে বসে থাকলেও মহিলার উচ্চগ্রামের ডাকটা ঠিক শুনতে পেলেন ভদ্রলোক। টেবলের উপরে খুলে রাখা চশমাটা পরে ফোনটা ধরতে এগিয়ে গেলেন বছর চল্লিশের মানুষটি।
“হ্যাঁ বলুন, কমলেশ রায় বলছি।”
উলটো দিক থেকে হিন্দিতে একটি মহিলা কণ্ঠ বলে উঠল, “আপনাকে একবার কানপুরে আসতে হবে। একটা কেসে আপনার সাহায্য চাই।”
“আপনার দফতরেই আসব তো?”
“হ্যাঁ, আপনি গাড়ি নিয়ে চলে আসুন। তারপরে আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।” ফোনটা রেখে নিজের ডেস্কে ফিরে গেলেন কমলেশ। সময় নষ্ট করে লাভ নেই। এখন সকাল এগারোটা। আশা করা যায় দুপুর আড়াইটে-তিনটের মধ্যে কানপুরে পৌঁছে যাবেন। তাঁর মন বলছিল আজ রাতে আর কানপুর থেকে ফেরা যাবে না।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস করার পরে সাইকিয়াট্রি নিয়ে পড়া শুরু করেন কমলেশ। লন্ডনে অনেক বছর প্র্যাকটিস করেছেন তিনি। তাঁর ফিল্ড ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রি। সাধারণত, তাঁর মতো কোয়ালিফায়েড ডক্টররা এই ধরনের ইনস্টিটিউটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন না। তাঁদের নিজস্ব চেম্বার থাকে। প্রচুর পসার। কিন্তু কমলেশ রায় একটু অন্যরকমের মানুষ। বিয়ে-থা করেননি। উত্তরাধিকার সূত্রে ভালোই সম্পত্তির মালিক। টাকাপয়সার কমতি নেই। এমন সমস্ত জায়গায় কাজ করেছেন, যেখানে উচ্চডিগ্রিধারী চিকিৎসকরা যাওয়ার কথা ভাববেনও না।
দেশের অনেক জায়গা ঘুরে তিনি এখন উত্তরপ্রদেশের এই সরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করছেন। প্রধান কাজ, চাইল্ড কাউন্সেলিং। বাচ্চাদের মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের সাহায্য করা। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকেও সাহায্য করেন। যে কারণে দেশের বিভিন্ন শহরের পুলিশ উপরমহলের সঙ্গে তাঁর বিশেষ খাতির আছে।
জুভেনাইল অ্যাক্টে পরিবর্তন আসার পরে সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোবিদদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এইসব কেসে। কমলেশ বুঝতে পারছিলেন, এবারও সম্ভবত পুলিশকে সাহায্য করতেই যেতে হবে তাঁকে।
.
বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ কানপুর নগরের অ্যাডিশনাল সিপি-র ঘরে ঢোকার আগেই কমলেশ জেনে যান তাঁর কাজটা কী হতে চলেছে। সিপি আরও পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন ব্যাপারটা।
“এমনিতেই আপনাকে কেসটা হ্যান্ডেল করতে হত। ব্যাপারটা হিনিয়াস ক্রাইমের আন্ডারে পড়ে গিয়েছে। আপনি তো আগেও আমাদের সাহায্য করেছেন। কিন্তু এই ব্যাপারটা একটু অন্যরকম।”
চুপ করে শুনে যেতে লাগলেন ডক্টর কমলেশ রায়। অফিসার থামার পরে বললেন, “ছেলেটা তাহলে দু-রকম আচরণ করছে।
“হ্যাঁ, ওরা বলছে ভূতে পেয়েছে। আমি নিশ্চিত ছেলেটা অভিনয় করছে। গোটা দুয়েক চড় খেলেই ভূত নেমে যাবে।”
কমলেশ একটু হাসলেন, “ঠিক আছে। ব্যাপারটা আমি দেখি। ছেলেটার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। কোথায় আছে ছেলেটা?”
“কানপুরেই একটা জুভেনাইল হোমে। এখানেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের রাখা হয়। তবে ওকে আলাদা একটা ঘরে রাখা হয়েছে।”
“ঠিক আছে। কখন দেখা করা যাবে?”
“আমি বলে দিচ্ছি। আপনি এখনই চলে যান।”
.
আধঘণ্টা মতো সময় লাগল জুভেনাইল হোমে পৌঁছোতে।
নিজের পরিচয় দিতেই হোমের ভারপ্রাপ্ত ভদ্রলোক তড়িঘড়ি এগিয়ে এলেন, “ছেলেটাকে একটা ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। কাছে গেলেই গোঁগোঁ করে চিৎকার শুনছি। বেশ ভয় লাগছে আমাদের।”
কমলেশ একটু ভাবলেন। তারপরে বললেন, “দূর থেকে কোনও শব্দ শোনা যায়? মানে আপনারা যখন ওই ঘরের কাছে থাকেন না, তখন?”
ভদ্রলোক একটু ভাবলেন। তারপরে বললেন, “সেরকম তো কিছু শুনিনি।”
কমলেশ আর কথা বাড়ালেন না, “চলুন, একবার দেখে আসি ছেলেটাকে।”
করিডরের শেষ প্রান্তে ঘরটা। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। কমলেশ ইশারায় তার সঙ্গীকে বোঝালেন কোনও শব্দ নয়। তারপরে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলেন ঘরটার দিকে। ভিতরে কোনও সাড়াশব্দ নেই।
এবার হঠাৎ কমলেশ বেশ জোর গলায় বলে উঠলেন, “ছেলেটার বয়স কত হবে বলে মনে হয়?”
ভদ্রলোক জবাব দেওয়ার আগেই ঘরের ভিতর থেকে একটা গোঁগোঁ আওয়াজ শোনা গেল। যেন কোনও জন্তু চিৎকার করছে, ছটফট করছে বেরিয়ে আসার জন্য। পাশের ভদ্রলোকের মুখটা পাংশু হয়ে গেল, “শুনছেন তো স্যার, কীরকম করছে। ভয় লেগে যায়।”
কমলেশ নির্বিকার মুখে বললেন, “হ্যাঁ, ভয় পাওয়ারই কথা। তবে আপনি চিন্তা করবেন না। দরজাটা খুলুন।
“বলছেন কী স্যার, দরজা খুলব মানে। দেখছেন না ছেলেটা কীরকম করছে। দরজা খুললে কিছু একটা করে বসবে।’
“আপনি চিন্তা করবেন না, খুলুন দরজাটা, আমি তো আছি,” কমলেশের ঠান্ডা গলা আর লম্বা-চওড়া চেহারাটার দিকে তাকিয়ে বোধহয় ভরসা পেলেন ভদ্রলোক। তবে দরজা খোলার আগে ইঙ্গিতে ডেকে নিলেন এক সঙ্গীকে তারপরে খুলে দিলেন দরজা।
.
খাটের উপরে বসে ছিল ছেলেটা। দরজা খোলার আওয়াজ পেয়েই মুখ তুলে তাকাল। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল, “কে তোরা? কী করে এত সাহস পেলি আমার ঘরে ঢোকার? কেটে ফেলে দেব।”
ছেলেটার মূর্তি দেখে সঙ্গের লোক দুটো চৌকাঠের মুখেই দাঁড়িয়ে রইল। কমলেশ কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন ছেলেটার সামনে।
রঘু তখনও গোঁগোঁ করে চলেছে। যে কেউ দেখলে ভয় পেয়ে যাবে। আঁচড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে দুটো হাত তুলে খাট থেকে উঠে দাঁড়াল ছেলেটা। কমলেশ একদৃষ্টে ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছু সময়। তারপরে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলেন, “নাম কী তোমার?”
কমলেশের ঠান্ডা গলা ছেলেটাকে কয়েক মুহূর্ত অস্বস্তিতে ফেলে দিল। তারপরে আবার বিকৃত গলায় বলতে লাগল, “আমার নাম কালু কসাই। তোদের সব কটাকে কেটে ফেলে দেব।”
কমলেশ ঘুরে তাকালেন অন্য দুজনের দিকে, “কালু কসাই বলে কাউকে চেনেন নাকি?” লোক দুটো মাথা নাড়ল।
ছেলেটা তখনও মুখ দিয়ে বিকৃত আওয়াজ করছে। কমলেশ দুটো হাত রাখলেন ছেলেটার কাঁধে। তারপরে চাপ দিয়ে বসিয়ে দিলেন বিছানায়।
কয়েক মুহূর্ত রঘুর মুখে দিকে তাকিয়ে কমলেশ বললেন, “চলুন, যাওয়া যাক।” এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল অন্য দুজন। দ্রুততার সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে এল তারা। কমলেশ বেরোতেই আবার বাইরে থেকে টেনে দেওয়া হল হুড়কো।
“কিছু বুঝলেন স্যার?”
কমলেশ আনমনে মাথা নাড়লেন, “একটু একটু পারছি। আর একটু খোঁজখবর নিতে হবে। ছেলেটার বাড়ি কোথায়?”
“শুনেছি চন্দনপুর।”
কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলেন কমলেশ।
.
সন্ধ্যায় ফোন করলেন চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট শাখার আধিকারিককে, যাঁর ফোন পেয়ে কানপুরে আসতে হয়েছে তাঁকে।
“আপনার ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম মিস্টার রায়। কী মনে হয়, এটা কি ডিড-এর ব্যাপার?”
‘ডিড’ বলতে ওই আধিকারিক কী বোঝাতে চাইছেন, তা বুঝতে সমস্যা হল না কমলেশের। DID, অর্থাৎ, ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার, একটি বিশেষ মানসিক রোগ, যে রোগে একজন মানুষের মধ্যে একাধিক ব্যক্তিত্ব বা সত্তা ফুটে ওঠে।
কমলেশ একটু ভাবলেন। তারপরে বললেন, “এখনই নিশ্চিত হতে পারছি না। আমাকে আরও কয়েকটা ব্যাপার খতিয়ে দেখতে হবে। যে কারণে ছেলেটার বাড়িতে যাওয়া খুবই প্রয়োজন। ওর বন্ধু, চেনা-পরিচিতদের সঙ্গেও কথা বলতে হবে।”
“ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করে দেব।”
.
কানপুর নগর থেকে থেকে চন্দনপুর জায়গাটায় পৌঁছোতে মিনিট পঁয়তাল্লিশেক সময় লাগল কমলেশের। মাঝে রাস্তায় তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন ইনভেস্টিগেটিং অফিসার অনিল দুবে।
“স্যার, আপনার কি মনে হয় ছেলেটা পাগল হয়ে গিয়েছে?”
“না না, পাগল কেন হবে?” দুবের প্রশ্নের জবাবে বললেন কমলেশ, “তবে কোনও মানসিক রোগ আছে কি না, সেটা দেখতে হবে।”
“ওহ আচ্ছা।” একটু থেমে পরের প্রশ্নটা করল অফিসার, “যদি মাথার ব্যামো থাকে, তাহলে কি শাস্তি পাবে না?”
“সেটা নির্ভর করছে রোগটা কীরকম, তার উপরে। দেখা যাক।”
গাড়িটা এসে দাঁড়াল একটা বাড়ির সামনে। গেটের সামনে কয়েকটা লোক দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে গোটা চারেক ছেলের বয়স অল্প। সবাই রঘুর বন্ধু। পুলিশের নির্দেশে জড়ো হয়েছে।
কমলেশের জন্য একটা চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চেয়ারে বসে তিনি বললেন, “আমি তোমাদের কয়েকটা প্রশ্ন করব। ভালো করে ভেবে জবাব দেবে।”
কমলেশ ঠিক করে নিয়েছিলেন, টেক্সট-বুক পদ্ধতিতে জেরা করবেন। অর্থাৎ, মেডিক্যাল স্কুলে পড়ার সময় ‘ডিড’ কেসে তাদের যে সব প্রশ্ন করতে বলা হত, তারই কয়েকটা এই ছেলেগুলোকে করবেন। কমলেশ শুরু করলেন-
প্রশ্ন: রঘু কি তোমাদের কখনও বলেছে, ওর মাথার মধ্যে কেউ যেন কথা বলে? অন্য কেউ?
জবাব: না, না, এরকম কখনও শুনিনি। একদম স্বাভাবিক ছিল।
প্র: রঘুকে কখনও দেখেছ অন্যরকম ব্যবহার করতে? মানে হঠাৎ পুরো বদলে গিয়েছে। অন্য কারও গলায় কথা বলছে?
জবাব: কখনওই দেখিনি। আমাদের সঙ্গে সবসময় স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছে। আড্ডা দিয়েছে।
প্র: রঘু কি কখনও তোমাদের বলেছে, আয়নার সামনে দাঁড়ালে ও মাঝে মাঝে নিজেকে না দেখে অন্য কাউকে দেখে?
জবাব: কী যে বলেন স্যার! আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে ছাড়া আর কাকে দেখবে। রঘু কখনওই ওইসব কিছু বলত না।
একটু সময় ভাবলেন কমলেশ। তারপরে প্রশ্ন করলেন, “কালু কসাই কে?” এবার লোকগুলো চমকে উঠল। একটা ছেলে বলে উঠল, “কালু মারাত্মক লোক ছিল। খুন-জখম কী না করত! মাস দুয়েক আগে আর একটা গ্যাং ওর মুণ্ডুটা নামিয়ে দিয়ে চলে যায়।”
কমলেশ উঠে পড়লেন, “রঘুর ঘরটা একবার দেখা দরকার।”
ঘরের ভিতরে সেরকম কিছুই পাওয়া গেল না। এই ধরনের জায়গায় এই বয়সি ছেলের ঘরে যা পাওয়া স্বাভাবিক, সেসবই পাওয়া গেল। কয়েকটা হিন্দি সিনেমার ম্যাগাজিন। পর্নোগ্রাফির একটা চটি বই আর গোটা দুয়েক কন্ডোম।
বেরিয়ে এসে আবার ছেলেগুলোর মুখোমুখি হলেন কমলেশ, “রঘু কী পছন্দ করত? মানে গান শোনা, সিনেমা দেখা, খেলাধুলো, এইসব আর কী।”
ছেলেগুলো প্রায় তারস্বরে বলে উঠল, “সিনেমা স্যার, সিনেমা। পোকা ছিল একেবারে। আমাদের হলে যে সব সিনেমা আসত, দু-তিন বার করে দেখত। নিজেকে নায়ক ভাবত।”
স্বাভাবিক। এই বয়সের একটা ছেলে ঠিক যে-রকম আচরণ করে থাকে, রঘুর মধ্যেও তার কোনও ব্যতিক্রম নেই।
কমলেশ ঘুরে তাকালেন অফিসারের দিকে, “একটি মেয়ে আছে না, যার সঙ্গে রঘুর বিয়ে হওয়ার কথা হচ্ছিল। ওর সঙ্গেও কথা বলতে হবে।”
কিন্তু সেখানেও কোনও লাভ হল না। মেয়েটাও প্রায় একই কথা বলল। সঙ্গে রঘুর সিনেমাপ্রেমের কথা। “আমিও কয়েকবার ওর সঙ্গে হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছি,” বাবার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে ফেলল মেয়েটা।
জেরা শেষ করে বেরিয়ে এসে কমলেশ বললেন, “আমার এখানকার কাজ শেষ। এবার ফিরে যাব।
একটা মোড় মতো জায়গায় এসে গাড়িটা গতি কমাতেই সিনেমা হলটা দেখতে পেলেন কমলেশ। রাস্তার পাশেই। তারপরে হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটা পোস্টারে।
“গাড়িটা একটু থামান তো, নামতে হবে।”
দ্রুত হলের দেওয়ালের সামনে এসে দাঁড়ালেন কমলেশ। একটা আধছেঁড়া পোস্টার দেখা যাচ্ছে। মাস কয়েক আগে এসেছিল সিনেমাটা। অনেক আগের সিনেমা। এইসব হলে অবশ্য পুরোনো সিনেমাই আবার দেখানো হয়।
সিনেমাটির নাম— দিওয়াঙ্গি।
পোস্টারটার সামনে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন কমলেশ। তারপরে গাড়িতে এসে উঠলেন।
.
পরের দিন সকাল দশটা। হোমের সেই ঘরে রঘুর সামনে বসে আছেন কমলেশ। তাঁর পাশে অ্যাডিশনাল সিপি। একটু পিছনে অনিল দুবে এবং সর থানার এসএইচও।
রঘু চুপ করে বসেছিল। কমলেশই প্রশ্ন করলেন, “খুনের রাতের কথা তোমার কিছু মনে আছে?”
“সাইকেলটা বাইরে রেখে ঘুমোতে চলে যাই। পরের দিন সকালে মা-বাবার দেহ দেখার পরে চেঁচিয়ে লোক জড়ো করি।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। আর একটা প্রশ্ন, তোমার মাথায় কি যন্ত্রণা হয়? মনে হয় কেউ কথা বলছে?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ স্যার, ঠিক বলেছেন, হয়, হয়।”
“তোমার বন্ধুরা কিন্তু বলল এইরকম কিছু ওদের কখনও বলোনি।”
“হ্যাঁ স্যার, কিছু বলিনি, বললে আমায় পাগল বলত।”
“সে তো বটেই। তুমি খুব বুদ্ধিমান রঘু। আর একটা কথা। তোমাদের বাড়ির কাছাকাছি থাকা একজন লোক বলেছে, সেই রাতে তোমার বাবাকে ‘খুন খুন’ বলে চেঁচিয়ে উঠতে শুনেছিল।”
“কে বলেছে স্যার? ফালতু কথা। বাবাকেই তো আগে…।” বলেই হঠাৎ থেমে গেল রঘু। ঘরের সবাই হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠল ছেলেটা। “শুয়োরের বাচ্চা, আমার সঙ্গে চালাকি,” হুংকার দিয়ে কমলেশের গলা টেপার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল রঘু। কিন্তু পৌঁছোতে পারল না। তার আগেই কমলেশের একটা বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় ছিটকে ফেলে দিল রঘুকে।
“এই আপনার ক্রিমিন্যাল। পরিপক্ক মস্তিষ্ক। শুধু ঠান্ডা মাথায় খুন করা নয়। অসম্ভব একটা ভালো পরিকল্পনা করেছিল রেহাই পাওয়ার। নিজেকে মানসিক রুগি সাজানোর। ভাবা যায়!” বলে উঠে পড়লেন কমলেশ। তারপরে অ্যাডিশনাল সিপি-র দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “আপনার কথা মতো থাপ্পড়টা লাগিয়েই দিলাম। তবে আগে লাগালে বোধহয় আরও দ্রুত ফল পাওয়া যেত।”
.
এরপরে পুলিশের বাকি কাজ করতে সমস্যা হল না। জেরার সামনে ভেঙে পড়ে সব স্বীকার করে নিল ছেলেটা। অস্ত্রটাও পাওয়া গেল। একটা খুরপি, যেটা দিয়ে মাটি কোপানো হয়। কীভাবে ঘটনাটা ঘটেছে, তাও জানিয়ে দেয় রঘু
রাত একটার সময় ফিরে এসে বাবা-মায়ের ঘরে চলে যায় সে। জানত দরজা বাইরে থেকে খোলাই থাকবে। প্রথমে বাবার মুখটা চেপে ধরে গলায় পরপর কয়েকটা কোপ বসিয়ে দেয়। ওই সময় মা উঠে পড়ে। রঘুকে দেখে প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। তারপরে বাবার অবস্থা দেখে চিৎকার করতে গিয়েছিল। কিন্তু একবারের বেশি পারেনি। মায়ের মুখ চেপে গলায় একইভাবে কোপ বসিয়ে দেয় সে।
কাজ শেষ করে ওই রাতেই দূরে গিয়ে খুরপিটা পুঁতে আসে। তারপরে আবার ফিরে যায় জলসায়।
“মারলি কেন বাবা-মাকে?”
পুলিশের প্রশ্নের জবাবে রঘু বলে, “মালতীর সঙ্গে আমার বিয়েটা কিছুতেই দিতে রাজি হচ্ছিল না। তাই সরিয়ে দিই।”
জুভেনাইল কোর্টে বিচার চলছিল রঘুর। সাক্ষী দিতে উঠে পুরো ব্যাপারটা খোলসা করে বললেন কমলেশ।
“রঘু একটা দারুণ প্ল্যান করেছিল। ও সিনেমার পোকা। ওদের ওই হলটায় কয়েক মাস আগে একটা সিনেমা এসেছিল। নাম দিওয়াঙ্গি। সাবজেক্টটা অন্যরকম বলে আমি জানতাম সিনেমাটা সম্পর্কে। দিওয়াঙ্গি- যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি নাকি স্প্লিট পার্সোনালিটি রোগে আক্রান্ত। অর্থাৎ, সে নয় খুনটা করেছে আর একটা সত্তা। পরে বোঝা যায় শাস্তির হাত এড়ানোর জন্য অভিনয় করছে। রিচার্ড গেরের ‘প্রাইমাল ফিয়ার’ সিনেমার অনুকরণে বইটি হয়। রঘু সম্ভবত ওই হিন্দি সিনেমাটা দেখেই প্ল্যানটা করেছিল।
একটু থামলেন কমলেশ। অন্যদিকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিষদৃষ্টিতে তাঁকে দেখে যাচ্ছিল ছেলেটা। কমলেশ বলতে শুরু করলেন, “কিন্তু এইরকম অভিনয়ের অনেক ঝামেলা। এই অভিনয় স্পট করার ব্যাপারেও আমাদের কোর্সে নির্দিষ্ট করে রাস্তা দেখানো আছে। যেমন, এরা অভিনয়টা তখনই করে যখন কাছে ধারে লোক থাকে। কেউ কাছে না থাকলে করে না। তার উপরে বারবার জেরার মুখে একবার সত্যি কথাটা বলে দেবেই। ঠিক যেমন রঘুর কেসে হল।”
কোর্টরুমে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন কমলেশ। তারপরে ধীরেসুস্থে বললেন, “একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি এই রায় দেব যে, মানসিক দিক দিয়ে রঘু সম্পূর্ণ সুস্থ। পুরোটাই ওর অভিনয়। ঠান্ডা মাথায় খুন দুটো করেছে ও। এই অপরাধের গুরুত্ব কতটা, সে সম্পর্কে ও ভালো মতোই ওয়াকিবহাল।
কমলেশ রায় নেমে এসে বসলেন নিজের বেঞ্চে। আরও মিনিট কুড়ি জেরা চলার পরে রায় শোনানোর জন্য তৈরি হলেন বিচারপতি। ষোলো বছরের উপরে বলে রঘুকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবেই ধরা হচ্ছে। কিন্তু তাও মৃত্যুদণ্ড এবং যাবজ্জীবন দেওয়া আইনত সম্ভব নয়। কিন্তু যাবজ্জীবন দিতে না পারলেও শাস্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা বলে দেন বিচারপতি। এ ক্ষেত্রেও তিনি তাই করলেন। রায় শোনালেন—
রঘুর পনেরো বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হল। আঠারো বছর না হওয়া পর্যন্ত তাকে কোনও জুভেনাইল হোমে থাকতে হবে। আঠারো বছর হয়ে গেলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে জেলে।
.
দুই কারারক্ষীর সঙ্গে আদালত কক্ষ ছাড়ার মুহূর্তে হঠাৎ করে কমলেশের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল রঘু। কিন্তু কমলেশ তৈরি ছিলেন। ডান হাত দিয়ে প্রতিহত করে দিলেন আক্রমণ।
ছুটে এল আরও কয়েকজন পুলিশ। তারা টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে গেল রঘুকে। কিন্তু তার কথাগুলো শুনতে অসুবিধা হল না কমলেশের—
“শুয়োরের বাচ্চা, তোকে আমি ছাড়ব না। যেদিন আমি জেল থেকে বেরোব, সেদিন তোকে খুন করব। খুঁজে ঠিক বার করব তোকে। আমার জীবনটা শেষ করে দিলি তুই।”
নিজের ব্রিফকেসটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে আদালত থেকে বেরিয়ে গেলেন কমলেশ রায়।
.
কানপুর ছেড়ে আসার আগে আর একবার অ্যাডশনাল সিপি-র ঘরে গিয়েছিলেন কমলেশ। অফিসার প্রথমেই জানতে চাইলেন, “কখন আপনার সন্দেহ হল বলুন তো?”
“যখন দেখলাম ছেলেটা আমার গলার আওয়াজ পাওয়ার পরে ওই রকম শব্দ শুরু করল। ডিড এইভাবে ট্রিগার করে না। তখনই বুঝেছিলাম, কিছু একটা ফাঁক আছে।
“তারপরে?” অফিসার শুনে যেতে লাগলেন।
“যখন অন্য কোনও পার্সোনালিটি আপনার শরীর দখল নেবে, তখন আপনার শারীরিক শক্তিও সেভাবে বদলে যাবে। বাচ্চার পার্সোনালিটি হলে বাচ্চার মতো হাবভাব করবে। আবার খুনির হলে, সেরকম। আমি ওকে যখন জোর করে খাটে বসিয়ে দিই, রঘু বাধা দেয়নি। কালু কসাই হলে বাধা দিত। আসলে ছেলেটার পক্ষে অত খুঁটিনাটি জানা সম্ভব ছিল না। সিনেমাটা দেখে অভিনয় করার চেষ্টা করেছিল।”
“এত সব কাণ্ড করতে গেল কেন?” এটা কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন পুলিশ অফিসার। “রঘু সম্ভবত ভেবেছিল, ধরা পড়ে যাবে। বিশেষ করে বন্ধুরা যখন ওই আগে চলে আসার ব্যাপারটা বলে দিয়েছে। সেই জন্যই ওই চালটা চালে। অসম্ভব ধূর্ত ছেলে। পড়াশোনাটা আর একটু জানা থাকলে হয়তো জাল কেটে বেরিয়েও যেত। হি ইজ ইভিল বাই নেচার।”
“আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল যে ছেলেটা অভিনয় করছে, “ আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বললেন অ্যাডিশনাল সিপি।
.
মাস ছয়েক উত্তরপ্রদেশে কাজ করে বাংলায় ফিরে এলেন কমলেশ রায়। যুক্ত হয়ে গেলেন স্থানীয় এক সংগঠনের সঙ্গে। কানপুরের ঘটনা প্রায় ভুলেই গেলেন তিনি।
.
ঠিক এক বছর পরে উত্তরপ্রদেশের সংবাদপত্রগুলোয় বেরোল খবরটা—
“কানপুরের একটি জুভেনাইল হোম থেকে বেশ কিছু কিশোর অপরাধী পালিয়ে গিয়েছে। যাদের মধ্যে একজনের নাম রঘু। গত বছর বাবা-মাকে খুন করার অপরাধে যার ষোলো বছরের কারাদণ্ড হয়। পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে।”
