৪
শান্তিনিকেতন, ২০২১
ঘরটা খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন শর্মিষ্ঠা বসু।
বডিটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আগেই। ক্রাইম স্পটের ছবিও তোলা হয়ে গিয়েছে। এভিডেন্স সংগ্রহ করা হয়েছে। হাতের ছাপ নেওয়া হয়েছে। সিল করে দেওয়া হয়েছে ক্রাইম স্পট।
কিন্তু তাও ঘরটা আরও একবার খুঁটিয়ে দেখছিলেন শর্মিষ্ঠা। তিনি বড়োই খুঁতখুঁতে। কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে চান না শান্তিনিকেতন থানার লেডি সাব-ইন্সপেক্টর।
আগে শুধু বোলপুর থানার অধীনেই পুরো জায়গাটা পড়ত। তারপরে মূলত বিশ্বভারতীর দাবিতে আলাদা একটা পুলিশ স্টেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাদের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জায়গাগুলো পড়বে। প্রান্তিকের এই জায়গাটাও সেই শান্তিনিকেতন থানার অন্তর্গত। ২০১৫ সাল থেকে কাজ শুরু করে শান্তিনিকেতন থানা। আরও একটা পুলিশ চৌকি হয়েছে কাছে। ২০১৮ সাল থেকে। বোলপুর উওমেন পুলিশ স্টেশন।
মাস ছয়েক হল এই থানায় এসেছেন শর্মিষ্ঠা। আর তার মধ্যেই এইরকম একটা কেস।
স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে স্পটে আসতে সময় নেননি তিনি। ঘটনার ভয়াবহতা দেখে একটা জিনিস বুঝতে সমস্যা হয়নি। যে-ই খুনটা করুক, প্রচণ্ড রাগ ছিল এই লোকটার উপরে। আর খুব সম্ভবত অপরিচিত কেউ নয়। মদ খেতে খেতেই খুনটা হয়েছে। তবে গ্লাস একটাই পাওয়া গিয়েছে।
মনে মনে ছবিটা আঁকছিলেন শর্মিষ্ঠা।
১) ঘরে অন্তত আরও একজন ছিল যার সঙ্গে পরিচয় ছিল মৃত ব্যক্তির।
২) মদ খাওয়ার একটাই গ্লাস। তাহলে ধরে নিতে হয় বাকিরা মদ খায় না।
৩) স্ট্রাগলের ছাপ সেভাবে নেই। কিন্তু গ্লাসটা ছিটকে পড়ে গিয়েছে। ধরেই নেওয়া হচ্ছে ওই সময় কিছু ধস্তাধস্তি হয়েছিল। কিন্তু ভদ্রলোক কি চিৎকার করেনি? বাড়িটা একটু ফাঁকা জায়গায়। নির্জনে। তাই হয়তো কেউ শুনতে পায়নি
৪) খুনটা চুরি-টুরির জন্য বলে মনে হচ্ছে না। শুধুই কি প্রতিহিংসা চরিতার্থ? নাকি অন্য কোনও কারণ আছে?
পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টটা হাতে পেলে সুবিধে হবে। ভিসেরা রিপোর্টটাও যাতে দ্রুত পাওয়া যায়, সে জন্য তিনি ওসি-কে অনুরোধ করেছেন।
এবার দেখতে হবে এই লোকটা সম্পর্কে প্রতিবেশীরা কী জানে। বাড়িতে তো একাই থাকত শুনেছেন। দরজার বাইরে থেকে একজন কনস্টেবল গলা খাঁকারি দিল। শর্মিষ্ঠা মুখ তুলে তাকালেন।
“ম্যাডাম, যে লোকটা প্রথম বডি দেখেছিল, তাকে পেয়েছি। বাইরে অপেক্ষা করছে।”
“ঠিক আছে, চলো,” বলে বেরিয়ে এলেন তিনি।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা জোড়হাতে নমস্কার করল শর্মিষ্ঠাকে দেখে। লোকটিকে একবার ভালো করে দেখে শর্মিষ্ঠা বললেন, ‘কী দেখেছিলেন আপনি?”
“দিদি, আমি যখন বাড়ির কাছাকাছি আসি, তখন দেখি একটা লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে বেরিয়ে যাচ্ছে। সাইকেলে করে পালাচ্ছে। আমার কেমন সন্দেহ হওয়ায় বাড়ির মধ্যে ঢুকি। ভেবেছিলাম, চুরি হয়েছে। তারপরে দেখি ওই কাণ্ড।”
“যে লোকটা পালাচ্ছিল সাইকেল করে, তার মুখ দেখেছিলেন?”
“না, মুখটা দেখতে পারিনি। আসলে মাথা ঢাকা ছিল।”
“চাদর গায়ে দিয়ে এসেছিল নাকি?”
“না দিদি। একটা লাল জ্যাকেট মতো পরেছিল। ওই যে সব জ্যাকেটের মাথায় টুপি থাকে, সেগুলো।”
শর্মিষ্ঠা একটু ভাবলেন। তারপরে জানতে চাইলেন, “সাইকেলটা খেয়াল করেছেন? কী রং বা কী ধরনের?”
“যেরকম সাইকেল হয়, সেরকমই,” একটু অবাক হয়ে জবাব দিল লোকটা, “কালো রঙের। শান্তিনিকেতন-বোলপুরের প্রায় সবার কাছেই ওরকম সাইকেল আছে। আমার কাছেও।”
একটু ভাবলেন শর্মিষ্ঠা, “ভদ্রলোক কীরকম মানুষ ছিলেন?”
“আজ্ঞে খুবই ভালো। মাটির মানুষ। কারও সঙ্গে ঝগড়াঝাটি ছিল না। সুন্দর আঁকতেন।”
ভদ্রলোক যে শিল্পী মানুষ, তা ঘর দেখে বুঝেছিলেন শর্মিষ্ঠা। ইজেল, পেন্ট, ব্রাশ, পেনসিল— এ সব পাওয়া গিয়েছে। কিছু পেন্টিংও
“ওর ঘরে চুরি যাওয়ার মতো কিছু ছিল নাকি? ওর বাড়ির ভিতরে যাতায়াত ছিল আপনার?”
লোকটি মাথা চুলকে বলল, “আজ্ঞে, আমি তো মাত্র কয়েকবার এসেছি। আমার মেয়ে আসত সপ্তাহে তিনদিন। আঁকা শিখত স্যারের কাছে।”
“তাই নাকি?” উৎসুক হয়ে উঠলেন শর্মিষ্ঠা, “মেয়ে আছে বাড়িতে? একবার ডেকে আনা যাবে?”
“আছে দিদি। মাস্টারের মৃত্যুতে মেয়ে খুবই দুঃখ পেয়েছে। এত ভালো আঁকা শেখাত…।” বলতে বলতে লোকটা এগিয়ে গেল নিজের বাড়ির দিকে।
মেয়েটাকে একবার বাড়ির ভিতরটা দেখাতে হবে। ও যদি বলতে পারে কিছু হারিয়েছে কি না।
মিনিট দশেকের মধ্যেই মেয়েটিকে নিয়ে হাজির হয়ে গেল বাবা।
বছর দশেকের বাচ্চাটার গাল টিপে শর্মিষ্ঠা প্রশ্ন করলেন, “কী নাম তোমার?”
“রিঙ্কি, দিদি।”
“বাহ, রিঙ্কি শোনো। তোমাকে একটা কাজ দেব। খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তুমি স্যারের ঘরগুলো দেখো ভালো করে। তারপরে আমাকে বলো, কিছু হারিয়েছে কি না।”
মেয়েটা মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল, সে বুঝেছে কী করতে হবে। সবাই আবার বাড়ির মধ্যে চলে এল।
মিনিট কুড়ি সময় লাগল মেয়েটির সব ঘর ঘুরে দেখতে। তারপরে শর্মিষ্ঠার দিকে ফিরে রিঙ্কি বলল, “এমনিতে তো কিছু হারায়নি বলেই মনে হচ্ছে। স্যারের কাছে বেশি কিছু ছিলও না। তবে…।”
“তবে কী?”
যে ঘরে খুনটা হয়েছিল, তার দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল রিস্কি। কোণের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ওখানে কতগুলো পেন্টিং ছিল। সেগুলো দেখছি না।”
“হ্যাঁ, আমরা দেখেছি, গোটা তিনেক পেন্টিং পড়েছিল ওখানে। ওগুলো পুলিশ নিয়ে গিয়েছে হাতের ছাপ দেখবে বলে। আরও কয়েকটা আঁকার সরঞ্জাম নেওয়া হয়েছে।”
রিঙ্কি বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। তারপরে বলল, “ওই জায়গাটায় কিন্তু অনেকগুলো পেন্টিং ছিল। তিনটে নয়। আমার মনে হয়, গোটা দশেক হবে।”
“তুমি কবে শেষ দেখেছ?”
“আমি তো গতকাল বিকেলেও আঁকা শিখতে এসেছিলাম। তখনও ছিল।”
“কতক্ষণ ছিলে?”
“পাঁচটা পর্যন্ত।”
“তারপরে কেউ এসেছিল কি না জানো?”
“না দিদি, আমি তো বাড়ি চলে গিয়েছিলাম।”
শর্মিষ্ঠা বুঝলেন, তারপরে কোনও একটা সময় খুনটা হয়েছে। হয়তো অন্ধকার নামার পরে।
ভ্রূটা একটু কুঁচকে গেল শর্মিষ্ঠার। “কীসের পেন্টিং মনে আছে তোমার?”
“হ্যাঁ, দিদি। বেশিরভাগ পেন্টিংগুলো ছিল একটা মেয়ের। খুব সুন্দর একটা মেয়ের মুখ। আমি দেখেছি। ওই একটা মেয়েরই মুখ এঁকেছিল স্যার। বাকি সব তো মাঠ-ঘাট-পুকুর-জন্তুজানোয়ারের ছবি।”
শর্মিষ্ঠা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপরে মেয়েটার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বললেন, “আমার সঙ্গে একটু থানায় যেতে পারবে? তোমাকে কয়েকটা ছবি দেখাব। যদি মেয়েটাকে চিনতে পারো।
.
মিনিট কুড়ির মধ্যেই রিঙ্কি আর তার বাবাকে নিয়ে জিপ পৌঁছে গেল শান্তিনিকেতন থানায়।
একটা ব্যাগে আলাদা করে রাখা ছিল ছবিগুলো। গ্লাভস পরে নিয়ে ব্যাগটা খুললেন শর্মিষ্ঠা। রিঙ্কিকেও গ্লাভস পরে নিতে বললেন। তারপরে শুরু হল ছবিগুলো দেখার কাজ।
তিনটে ঘর মিলিয়ে গোটা পনেরো ছবি উদ্ধার হয়েছিল। বেশিরভাগই প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। একটা ফুলের ছবি বেশ কয়েকবার আঁকা হয়েছে। রক্তকরবী!
গোটা দুয়েক মেয়ের ছবিও পাওয়া গেল। সেগুলো একবার দেখে নিয়ে রিঙ্কি বলে উঠল, “এই ছবিগুলোর একটাও নয়। সেই মেয়েটা অনেক সুন্দর ছিল। আমি গতকালও মেয়েটির ছবি দেখেছিলাম। এত সুন্দর মুখ, আমি সুযোগ পেলেই দেখতাম। আর ভাবতাম, ইশ, আমি যদি এরকম আঁকতে পারতাম।”
“নিশ্চয়ই পারবে,” বলে মেয়েটাকে আদর করে দিলেন শর্মিষ্ঠা। তারপরে একজন কনস্টেবলকে নির্দেশ দিলেন জিপে করে বাবা ও মেয়েকে বাড়ি পৌঁছে দিতে।
মুখটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছে শর্মিষ্ঠার। ব্যাপারটা দেখেই মনে হচ্ছিল সহজ নয়। এখন আরও জটিল লাগছে। একটা মেয়ের ছবি কেন নিয়ে গেল আততায়ী? তার মানে কি ওই ছবিটা দেখলে অনেক কিছু সামনে চলে আসত?
গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন শর্মিষ্ঠা। এখন পোস্ট মর্টেম আর টক্সিকোলজিস্টের রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে দ্রুত এই রিপোর্টগুলো পাওয়া যায়। স্বয়ং এসপি-কে দিয়ে অনুরোধ করানো হয়েছে কলকাতার ল্যাবরেটরিতে। এর মধ্যে আশপাশের লোকেদের জেরা করতে হবে ভালো করে।
বিকেলের মধ্যে আরও একটা খবর পেয়ে গেলেন শর্মিষ্ঠা।
দিন পাঁচেক আগে, সন্ধ্যার দিকে একটা মেয়েকে দেখা গিয়েছিল ওই বাড়ি থেকে বেরোতে। সঙ্গে একটি লম্বা-চওড়া ছেলেও ছিল। পরে আরও একটি ছেলে নাকি ওই বাড়িতে এসেছিল। তবে সেই ছেলেটি অন্য।
এই ঘটনা একজন নয়, জনা তিনেক লোক দেখেছে। পরে আরও একজন জানিয়েছে, প্রথম ছেলেটাকে আরও একবার প্রবীর সেনের বাড়ির কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করতে দেখা গিয়েছে।
.
পরেরদিন দুপুর নাগাদ পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট হাতে পেলেন শর্মিষ্ঠা। সংক্ষেপে যা বুঝলেন, তা হল-
কোনও ধারালো অস্ত্র দিয়ে মারা হয়েছে। সম্ভবত মাঝারি সাইজের ছুরি। হিল্ট মার্ক পাওয়া গিয়েছে। শরীরের অন্য অংশে আঘাতের কোনও চিহ্ন নেই। শুধু তলপেট আর যৌনাঙ্গে ছাড়া। মুখ বা মাথা কেউ চেপে ধরেছিল— এইরকম চিহ্নও নেই। একজনের পক্ষে এই আঘাত করা সম্ভব, বিশেষ করে সে যদি শক্তিশালী হয়।
রিপোর্টটা দেখে যে প্রশ্ন প্রথমেই মাথায় এল শর্মিষ্ঠার, সেটা হল, ভদ্রলোক যথেষ্ট বাধা দিলেন না কেন?
এর উত্তর একটাই হতে পারে। ভদ্রলোক ঠিক হুঁশে ছিলেন না। কেন হুঁশে ছিলেন না? কারণ, তাঁকে কিছু খাওয়ানো হয়েছিল। সম্ভবত মদের সঙ্গে মিশিয়ে
মদের বোতল, গ্লাস আর তরল পানীয় ইতিমধ্যেই পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছে। এই রিপোর্টগুলো হাতে পাওয়াটা খুবই জরুরি।
.
প্রায় একই সময় তখন শতাব্দীর বাড়িতে…
খুনের পরের দিনই প্রবীর সেনের ছবি-সহ ঘটনাটা ফলাও করে বেরিয়ে গিয়েছে খবরের কাগজে।
দুপুরের দিকে নিজের ঘরে বসে একটা কবিতার বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছিল শতাব্দী। সে খবরের কাগজ-টাগজ বিশেষ পড়ে না। কবিতার বইটাতেও মন বসাতে পারছিল না। অময়া এখন শান্তিনিকেতনে নেই। মা-বাবার সঙ্গে তাকে কলকাতায় যেতে হয়েছে। তারা তিন বন্ধু শুধু এখানে।
তিন বন্ধু! নিজের মনেই কষ্টের হাসি হাসল শতাব্দী। সে আর নিজেকে এই ফোর মাস্কেটিয়ার্সের অংশ মনে করে না। হয়তো কোনওদিনই ছিল না। কিন্তু অরণ্যের কাছে আসার তাড়নায় বন্ধুত্বের অভিনয়টা তাকেও করে যেতে হয়েছে।
যতবার বইয়ের পাতায় মনোনিবেশ করতে যাচ্ছিল শতাব্দী, ততবারই সামনে ভেসে উঠছিল দৃশ্যটা। মালা আর অরণ্য পাশাপাশি সাইকেল চালিয়ে আসছে। দৃশ্যটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না শতাব্দী। একটা কথা সে ভালোই বুঝতে পেরেছে যে অরণ্য তাকে কোনওদিন চোখ তুলে ভালো করে দেখেওনি। পছন্দ করা তো দূরের কথা!
দেখবেই বা কী করে! বনমালার রূপের ছটায় যে সব কিছু ঢাকা পড়ে গিয়েছিল!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বইটা খাটের উপরে ছুড়ে ফেলে দিল শতাব্দী। আর তখনই ঘরে এসে ঢুকল মানিক
দাদাকে উত্তেজিত অবস্থায় দেখে কিছুটা ঘাবড়েই গেল শতাব্দী।
“কী রে হাঁফাচ্ছিস কেন?”
“প্রবীর সেনের খুনের ব্যাপারটা তুই জানিস?”
“প্রবীর সেনটা কে?” অবাক হয়ে গেল শতাব্দী।
“আরে যে লোকটা কাল খুন হয়েছে। আজ তো কাগজে বেরিয়েছে,” একটু অধৈর্য হয়ে উঠল মানিক।
“আমি কাগজ দেখিনি,” নিস্পৃহভাবে জবাব দিল শতাব্দী। কে কোথায় খুন হয়েছে, তাতে তার কোনও আগ্রহ নেই।
মানিক এবার খাটে বসে পড়ল। তারপরে বোনের কাঁধে হাত রেখে বলল, “কয়েকদিন আগে ওই লোকটার সঙ্গে আমি বনমালাকে কথা বলতে দেখেছি।”
“মানে? কোথায় দেখেছিস?” চমকে সোজা হয়ে বসল শতাব্দী।
“ওই শ্রীনিকেতন মোড়ের কাছে একটা দোকানে। লোকটা একটা বড়ো কাগজ দিয়েছিল বনমালাকে।”
“কী কাগজ?” পুরো ব্যাপারটা বোধগম্য হচ্ছিল না শতাব্দীর।
“কী কাগজ কী করে বলব?” একটু বিরক্তই হল মানিক, “চার্ট-পেপারের মতো কাগজ। ওটা খুলে বনমালা দেখেওছিল।”
শতাব্দী বুঝতে পারছিল না এ সব জেনে তার কী হবে। বোনের সরলতা দেখে একটু করুণাই হল মানিকের। তারপরে বলল, “যে খুন হয়েছে, তাকে বনমালা চেনে। খুনের দিন কয়েক আগে লোকটা একটা কাগজ দিয়েছিল বনমালাকে। ঘটনাটা পুলিশ জানলে কিন্তু ওই মেয়েটা ঝামেলায় পড়ে যাবে।”
ধীরে ধীরে ব্যাপারটা বোধগম্য হল শতাব্দীর। তারপরে উত্তেজিত মুখে বলল, “তাহলে আমরা কী করব এখন? পুলিশকে জানাব?”
মানিক একটু ভাবল, “দেখি আর কয়েকটা দিন। শুধু শুধু এই খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়া ঠিক হবে না। আগে থেকে কিছু বলতে গেলে সমস্যা হতে পারে। যা করতে হবে আড়ালে থেকে।”
মানিকের মনে ভেসে উঠছিল সাত বছর আগের স্মৃতি। ওই জোড়া খুন। একটা মারাত্মক সময় পার করে এসেছে সে। অনেক কিছুই হতে পারত সেই সময়। পুলিশ দ্রুত খুনিকে ধরে ফেলায়, জল আর গড়ায়নি।
.
শতাব্দী হঠাৎ জানতে চাইল, “তুই কি ওই প্রবীর সেনকে আগে থেকে চিনতিস?”
একটু চমকে উঠল মানিক। তারপরে বলল, “চিনতাম মানে, ওই মুখ চিনতাম। কথা-টথা কখনও বলিনি।”
“কীভাবে চিনতিস?” শতাব্দী নাছোড় ভঙ্গিতে বলল। সে তার দাদাকে ভালোই চেনে। রগচটা বদমেজাজি হলে কী হবে, তাকে বড্ড ভালোবাসে। বোনের জন্য সব কিছু করতে পারে।
“আরে, লোকটা এক নম্বরের মালখোর। মদ খেয়ে থাকত সারাদিন। ভালো মাল কেনার তো আর টাকা ছিল না। ওই হাড়িয়া, তাড়ি, দেশি মদ এইসবই বেশি খেত। আমারও তো একটু-আধটু খাওয়ার অভ্যাস আছে। ওই দোকানেই দেখেছি কয়েকবার।” সাফাই দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে গেল মানিক
“তুই কি ওর বাড়ি চিনতিস?” নাছোড় ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল শতাব্দী।
“তুই বড্ড বাজে প্রশ্ন করিস,” একটু ঝাঁঝিয়ে উঠল মানিক।
দুজনেই একটু সময় চুপ করে রইল। উঠেই পড়তে যাচ্ছিল মানিক। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়াতে বলল, “সেদিন ওই বনমালা আর অরণ্য কোথায় গিয়েছিল জানিস?”
“কোথায়?” শতাব্দী বুঝতে পারল কবেকার কথা বলছে দাদা।
“কোপাইয়ের পাড়ে একটা নির্জন জায়গায় বসে গুজুরগুজুর করছিল। সজল বলে একটা ছেলের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে তারপরে। সজল কিন্তু খুব ডেঞ্জারাস ছেলে। আমি শুনলাম, অরণ্যর উপরে সজল খুব খেপে আছে।”
দাদার কথাটা শুনে প্রথমে সেই কষ্টটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল শতাব্দীর মনে। তারপরে শঙ্কিত হয়ে পড়ল মেয়েটা, “অরণ্যর কোনও ক্ষতি হবে না তো রে দাদা?”
করুণ চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল মানিক। তারপরে আস্তে আস্তে বলল, “তোকে না বলেছি ওই ছেলেটাকে ভুলে যা। ওই রকম ছেলে তোকে কষ্টই দেবে শুধু।”
শতাব্দী চোখ নামিয়ে নিল। মানিকের মনেও তখন আবার জ্বলুনিটা শুরু হয়েছে। এই দুটো ছেলে-মেয়ে তাদের জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলেছে সেই ছোটোবেলা থেকেই। বোনটা কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না ওদের জন্য।
মানিক নিশ্চিত, একদিন এই ছেলে-মেয়ে দুটোকে সরে যেতেই হবে শতাব্দীর জীবন থেকে। আর তখন তার বোনটা শান্তি পাবে।
আর কোনও কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মানিক।
.
কয়েকটা দিন লেগে গেল সব রিপোর্ট পেতে।
সেই রিপোর্ট হাতে নিয়ে অবাক হয়ে নিজের টেবলে বসে রইলেন শর্মিষ্ঠা বসু।
রিপোর্টে একটা বিষের কথা বলা হচ্ছে। বিষটা এসেছে ওলিয়েন্ডার বা ওলিয়েন্ডা (যে যে-রকম উচ্চারণ করে) গাছ থেকে। মোদ্দা কথায় করবী গাছ। আর শান্তিনিকেতনে দাঁড়িয়ে করবী গাছের কথা বললে একটা শব্দই মাথায় আসে-
রক্তকরবী!
হঠাৎ আরও একটা কথা মনে পড়ে গেল লেডি পুলিশ অফিসারের।
প্রবীর সেনের আঁকা বেশ কয়েকটা ছবিতে রক্তকরবী ফুলটা রয়েছে।
এই খুনটার সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে আছে গাছটা? আর করবী গাছের বিষ? এ তো ভীষণ অভিনব ব্যাপার। আরও একটা কথা আবছা মনে পড়ছে তাঁর। কোথায় যেন এই করবী গাছের বিষের ব্যাপারটা পড়েছিলেন তিনি। এখন ঠিক মনে পড়ছে না। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা।
আর দেরি না করে রিপোর্টগুলো নিয়ে দ্রুত ওসি-র ঘরের দিকে এগোলেন শর্মিষ্ঠা।
সিনিয়র অফিসারের সামনে বসে রিপোর্টে পাওয়া তথ্যগুলো খুলে বললেন শর্মিষ্ঠা। মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল প্রণব দাসের। বিড়বিড় করে বললেন, “রক্তকরবী! রক্তকরবী!”
“হ্যাঁ স্যার। ভীষণ অদ্ভুত, তাই না। রক্তকরবীর বিষ ব্যবহার করা হয়েছে!”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওসি প্রণব দাস তাকালেন এল এস আই শর্মিষ্ঠা বসুর দিকে। তারপরে বললেন, “এই বিষ নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়েছিল অনেকদিন আগে। সাত বছর হয়ে গেল সেই ঘটনার। এই শান্তিনিকেতনের ঘটনাই।”
হঠাৎ পর্দাটা সরে গেল শর্মিষ্ঠার মন থেকে। তার মনে পড়ে গিয়েছে কোথায় শুনেছিলেন এই করবী বিষের ব্যাপারটা!
আপনা থেকেই শর্মিষ্ঠা বসুর মুখ থেকে বেরিয়ে এল শব্দগুলো—
“মাই গড! ওলিয়েন্ডার মার্ডারস!”
