১১
চন্দনপুর, কানপুরের কাছে একটি আধা-গ্রাম। ২০১৬
জলসা তখন পুরোদমে জমে উঠছে। স্টেজের উপরে একটা মেয়ে গান ধরেছে—
‘চুমমা এক দিলওয়া দেনা’।
আর নীচে থাকা জনতা উত্তাল হয়ে নেচে চলেছে। মেয়েটার শরীরী ভঙ্গি যত উদ্দাম হয়ে উঠছে, তত উত্তেজিত হয়ে পড়ছে জনতা। ঘনঘন সিটি, চটুল অঙ্গভঙ্গি আর বিশ্রী আওয়াজে ভরে উঠছে পুরো জলসা প্রাঙ্গণ।
আরও ঘণ্টাখানেক চলার পরে স্তিমিত হয়ে এল নাচ-গানের দাপট। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল জায়গাটা। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় দুটো।
গোটা চারেক ছেলে একসঙ্গে বেরিয়ে সাইকেল চেপে রওনা দিল চন্দনপুরের দিকে। কানপুর থেকে ২৪-২৫ কিলোমিটার দূরে চন্দনপুর। জায়গাটাকে ঠিক গ্রাম বলা যায় না। অনেকটা শহরতলির মতো। বেশ কয়েকটা স্কুল আছে, সিনেমা হল আছে।
এই জলসাটা অবশ্য চন্দনপুরে নয়, হচ্ছিল পলহেপুরে। দুটো জায়গা একেবারেই পাশাপাশি। এক কিলোমিটার মতো দূরত্ব। একটু জোরে সাইকেল চালালে মিনিট দশেক লাগে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে
রাত দুটো নাগাদ ফাঁকা রাস্তায় সাইকেলগুলো প্রায় উড়ছিল। মিনিট দশেকের মধ্যেই নিজেদের গ্রামে ফিরে এল চারটে ছেলে।
রঘুর বাড়িটাই সবচেয়ে কাছে। একটু ফাঁকা জায়গায়। দূরে ধানের খেত। তার পাশ দিয়ে রাস্তাটা চলে গিয়েছে গ্রামের আরও ভিতরে। রঘুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাকি তিনটে ছেলে শিস দিতে দিতে চলে গেল নিজেদের বাড়ির দিকে।
রঘুদের বাড়িটা একতলা। পাকা বাড়ি, টিনের ছাউনি। সামনে একটু জমি। বেড়ার দেওয়াল দিয়ে ঘেরা পুরো জমিটা। গেট খুলে সাইকেলটা নিয়ে শিস দিতে দিতে এগিয়ে চলল রঘু। তার মনটা আজ বেশ ফুরফুরে। জলসা দেখে মনটা মস্তিতে আছে। টুক করে কয়েক ঢোক দেশি মদও গলায় ঢালার সুযোগ পেয়েছিল। আর কী চাই!
সাইকেলটা বারান্দার সামনের একটা বাঁশে চেন দিয়ে আটকে গেট খুলে ভিতরে ঢুকে পড়ল রঘু। সে বাইরে থাকলে বাবা-মা গেটটা আটকায় না। জানে, ছেলের ফিরতে রাত হবে। কে আর অত রাতে উঠে ঝামেলা পোহায়। বিশেষ করে যেখানে শীতটা পড়তে শুরু করেছে। উত্তরপ্রদেশের শীত বলে কথা।
রঘুর অবশ্য বেশ গরম লাগছিল। একে ওই রকম শরীর গরম করা নাচ, তার উপরে দেশি দারু। গরম লাগার আর দোষ কী! সোয়েটারটা খুলে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে চলল রঘু। তাদের বাড়িতে তিনটে ঘর। রঘু একটায় থাকে, বাবা-মা একটায়। আর একটা ফাঁকাই থাকে।
বাবা-মায়ের ঘরটা পেরিয়ে আসার সময় খেয়াল করল, দরজাটা পুরো আটকানো নয়। একটু ফাঁক হয়ে আছে। আর সেই ফাঁক দিয়ে টিমটিমে একটা আলোর রেখা বাইরে ছিটকে আসছে।
তাদের গ্রাম চন্দনপুরে ইলেক্ট্রিসিটি এসে গিয়েছে। তবে মাঝে মাঝেই পাওয়ার কাট হয়ে যায়। তাই হ্যারিকেনের ব্যবস্থা রাখতে হয়। বাড়িতে ঢুকেই রঘু বুঝেছিল, লোডশেডিং চলছে। বারান্দায় একটা লন্ঠন রাখা। বাবা-মায়ের ঘরেও নির্ঘাত লণ্ঠন জ্বলছে।
রঘু একবার তাকাল ঘরটার দিকে।
.
রঘুর ঘুমটা যখন ভাঙল, সকাল হয়ে গিয়েছে। মোবাইলে একবার সময়টা দেখে নিল। সাড়ে সাতটা।
ঘর থেকে বেরিয়ে এল রঘু। মা-বাবাকে তো দেখা যাচ্ছে না।
ঘরের সামনে এসে দেখল, লণ্ঠনটা এখনও জ্বলছে। ঘরের দিকে এগিয়ে গেল রঘু। তারপরে নীচু স্বরে ডাক দিল, “মা।”
কোনও জবাব নেই। আবারও ডাক দিল। এবারও কোনও সাড়া নেই। এরকম তো কখনও হয় না।
ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকল রঘু। কম্বল গায়ে দিয়ে বাবা-মা বিছানায় শুয়ে আছেন। দেখে মনে হচ্ছে, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অবাক হয়ে এগিয়ে এল বিছানার দিকে
আর তারপরেই একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল রঘুর গলা থেকে।
ঘরের অল্প আলোতেও দেখতে সমস্যা হল না রঘুর। কম্বলটা একটু সরে গিয়েছে। যার ফলে বাবা-মায়ের বুক পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে দৃশ্যটা—
বিছানায় শুয়ে থাকা দুটো মানুষেরই গলা কাটা। রক্ত চুঁইয়ে এসে ভিজিয়ে দিয়েছে বিছানাটা।
রঘুর গলা থেকে আবারও একটা হৃদয়বিদারক আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
.
গ্রাম থেকে থানা আট কিলোমিটার দূরে। পুলিশ স্টেশন থেকে একজন সাব ইন্সপেক্টর আর দুজন কনস্টেবলের ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছোতে পৌঁছোতে সকাল দশটা হয়ে গেল।
দেখার বিশেষ কিছুই ছিল না। বিছানায় শুয়ে থাকা রঘুর বাবা-মাকে কেউ ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করেছে। গলার নলি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে।
সব দেখেশুনে সাব ইন্সপেক্টর অনিল দুরে বিরক্ত মুখে রঘুকে ডেকে পাঠাল, “এ সব কী করে হল?”
ততোধিক ব্যাজার মুখে রঘু জবাব দিল, “সেটা আমি কী করে জানব? আমি তো আজ সকালে এই অবস্থা দেখি। তারপরে চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করি।”
দুবে এবার বাইরে তাকিয়ে নিল। যারা জড়ো হয়েছিল, তাদের একটা অংশ এখনও রয়ে গিয়েছে।
যত ঝামেলা। লাশ সরাও, জেরা করো। যাই হোক, কাজ তো শুরু করতে হবে। প্রথমেই ছেলেটাকে ডেকে জেরা করা শুরু করল সে। রঘুর বক্তব্য মোটামুটি এইরকম—
পাশের গ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে জলসা দেখতে গিয়েছিল সে। গভীর রাত পর্যন্ত জলসা দেখে বাড়ি ফেরে। দুটো বেজে গিয়েছিল। বাড়িতে এসে দেখে বাবা- মায়ের ঘরে আলো জ্বলছে। অত রাতে আলো জ্বলে না। একটু অবাক হলেও আর কিছু ভাবেনি। ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
সকালে বাবা-মা কাউকে দেখতে না পেয়ে ঘরে ঢোকে। আর তারপরেই দেখে এই দৃশ্য। কোনওমতে চিৎকার করে লোক ডাকে।
“জলসা দেখতে কার কার সঙ্গে গিয়েছিলি?” কড়া গলায় প্রশ্ন করল দুবে।
“তিন বন্ধুর সঙ্গে। জলসা শেষ হলে আমরা একসঙ্গেই ফিরে আসি।”
“বাড়ির সামনে এসে কাউকে দেখতে পাসনি?”
“না স্যার, তবে অন্ধকার ছিল। আমি সেভাবে খেয়ালও করিনি। সাইকেল রেখে বারান্দায় উঠে পড়ি।”
“কিছু চুরি গিয়েছে বলে মনে হয়?”
“এখনও ভালো করে সব খুঁজে দেখিনি। তবে আমাদের ঘরে তো সেরকম কিছু ছিলও না।”
“ঠিক আছে, তুই বাড়ি থেকে কোথাও নড়বি না। এখন আপাতত লাশ দুটো সরানোর ব্যবস্থা করি।”
দুবে বাইরে বেরিয়ে এল। লাশ নেওয়া গাড়ি এসে গিয়েছে ততক্ষণে। দুটো লাশ তাতে তুলে দিয়ে বাইরে দাঁড়ানো লোকগুলোর দিকে তাকাল দুবেজি—
“কাল রাতে এই বাড়ির আশপাশে কাউকে ঘুরঘুর করতে দেখেছিলে তোমরা?”
লোকগুলো সবাই মাথা নাড়ল।
“রাতের দিকে কোনও আওয়াজ পেয়েছিলে?”
কেউ কোনও কথা বলল না। দুবে আবার গম্ভীর গলায় বলল, “কী হল, কথাটা কানে গেল না?”
এবার একজন মুখ খুলল, “আমরা স্যার অনেক দূরে থাকি। একমাত্র বিহারীলাল কাছাকাছি থাকে।” বলে একটা লম্বা লোকের দিকে ইঙ্গিত করল বক্তা।
“কী বিহারীলাল, কিছু বলছ না কেন?” ভ্রূ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল দুবে।
“সাহেব, আমার বাড়িটাও এখান থেকে একটু দূরে। ওই দেখুন,” বলে একটু দূরের একটা বাড়ির দিকে ইঙ্গিত করল লোকটা। তারপরে বলল, “ঠান্ডা পড়েছে, আমরা দরজা আটকে শুয়ে পড়েছিলাম। তবে…।”
“তবে কী?” কড়া গলায় প্রশ্ন করল পুলিশ অফিসার।
“আমি একবার বাথরুমে যাওয়ার জন্য উঠেছিলাম। তখন যেন মনে হল, ওই দিক থেকে একটা গলার আওয়াজ পেলাম।”
দুবে এগিয়ে গেল লোকটার দিকে, “কীরকম আওয়াজ?”
“মানে পরিষ্কার শুনিনি। মনে হল, কোনও মেয়ে কী যেন বলতে গিয়েছিল। তারপরে থেমে যায়। আর কিছু শুনতে পাইনি।”
“তখন কটা বাজে? খেয়াল করেছিলে?”
একটা চওড়া হাসি হাসল বিহারীলাল, “স্যারজি, এখন আমার কাছে মোবাইল আছে। রাতে উঠলে ওই মোবাইলের টর্চ জ্বেলে কাজ সারি। কালও তাই করেছিলাম। তখনই সময়টা দেখে নিই। তখন বেজেছিল রাত একটা।”
দুবে সময়টা নোট করে নিল। ছেলেটা তখনও ঘরের মধ্যে। সে আবার গিয়ে দাঁড়াল রঘুর সামনে।
“কাল তোরা কখন জলসা দেখতে গিয়েছিলি?”
“রাত এগারোটা। দুটোর সময় শেষ হয়। আমার বন্ধুরাও ছিল সঙ্গে।”
মাথা নাড়ল দুবে। আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে হবে তাকে।
.
দু-দিন পরে থানার দারোগার ঘরে এসে দাঁড়ায় দুবে।
“কত দূর এগোল ওই কেসটা?”
“স্যার, একটা ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কোপানো হয়েছে। ঠিক ছুরির মতো ফলা নয়, একটু চওড়া ফলা।”
“প্রশ্নটা হল, স্বামী-স্ত্রী পাশাপাশি শুয়েছিল। একজনকে ওইভাবে মারার সময় তো অন্যজন জেগে যাবে। চেঁচামেচি করবে।
“ঠিক স্যার। একটু দূরে যে লোকটার বাড়ি, সে বলেছিল, রাত একটা নাগাদ একবার মেয়েছেলের গলার আওয়াজ পেয়েছিল। তারপরে আর কোনও শব্দ শোনেনি।”
“হুম, ওই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলেছিলে?”
“হ্যাঁ স্যার। ওর বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলেছি। ওরা বলছে, একসঙ্গে জলসা দেখতে গিয়েছিল। তারপরে ফিরে আসে।”
দারোগা সাহেব একটু চুপ করে রইলেন। জানতে চাইলেন, “চুরিও তো যায়নি কিছু বলছ?”
“হ্যাঁ স্যার। ছেলেটা বলতে পারেনি কিছু খোয়া গিয়েছে কি না। আর বাড়িতে এমন কিছু ছিলও না যার জন্য দুজনকে ওইভাবে খুন করতে হবে।”
“ঠিকই বলেছ। খুনের কারণ অন্য। তুমি ওই ছেলেটা সম্পর্কে খোঁজখবর করো। আর বন্ধুদেরও আলাদা করে জেরা করো।”
“হ্যাঁ স্যার, সেটাই করছি।”
.
দু-দিন পরে রঘু সম্পর্কে যাবতীয় খবর মোটামুটি জোগাড় করে ফেলল দুবে। যার মধ্যে একটা বেশ ইন্টারেস্টিং। পাশের পাড়ার একটা মেয়ের সঙ্গে নাকি বেশ লটঘট চলছে রঘুর। মেয়েটার সঙ্গে প্রায়ই তাকে ঘুরতে দেখা যায়।
দুবে এবার থানায় ডেকে পাঠাল রঘুকে।
“কী রে, তুই নাকি প্রেম করে বেড়াস?”
রঘুর চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল। কপালে ভাঁজ পড়ল। খুব মন দিয়ে ছেলেটাকে দেখে যাচ্ছিল দুবে। কড়া গলায় আবার জিজ্ঞেস করল, “জবাব দিচ্ছিস না কেন?”
“সেরকম না কিছু। একজন মেয়েবন্ধু আছে। মাঝে মাঝে দেখা করি।”
“মেয়েটার নাম কি মালতী?”
“হ্যাঁ স্যার।”
দুবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রঘুর দিকে। তারপরে বলল, “ঠিক আছে, তুই বাড়ি যা। দরকার হলে আবার কথা বলব। এখন গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাবি না।
রঘু বেরিয়ে যেতেই একজন কনস্টেবলকে ডাক দিল দুবে। “শোন, তুই ওর উপরে কড়া নজর রাখবি। দেখিস, ছেলেটা যেন উবে না যায়।”
নির্দেশ দিয়ে উঠে দাঁড়াল অনিল দুবে। তাকে কয়েকটা কাজ দ্রুত করতে হবে। তার মধ্যে প্রথমটা হল, রঘুর বয়স কত জানতে হবে। স্কুলে পড়ে, সেখান থেকে বয়সের সার্টিফিকেটটা আগে দরকার। ব্যাপারটা তার ভালো ঠেকছে না।
.
দ্বিতীয় কাজটা করতে পাশের গ্রামের মালতীর বাড়িতে গিয়ে হাজির হল দুবে আর তার সঙ্গী। প্রথমে কাইমাই করলেও দুবের হুমকিতে কাজ হল।
মেয়েকে ডেকে বাবা চিৎকার করতে লাগল, “দ্যাখ, তোর জন্য আজ বাড়িতে পুলিশ এসেছে। এই ছেলেকেই নাকি তুই বিয়ে করতে চেয়েছিলি?”
মেয়েটা মুখ গোঁজ করে বলল, “তা এতে ওর দোষ কোথায়? বাবা-মা খুন হলে ও কী করবে?”
দুবে একটু ভ্রূ কুঁচকে বলল, “বিয়ের কথাও হয়েছিল নাকি?”
“আর কী বলব স্যার? ছেলেটা তো বাড়িতে এসে কী ঝোলাঝুলি শুরু করল। এখনও স্কুলে পড়ে, কিছু করে না। বাবার একটু জমি-জায়গা আছে, ব্যস। তবে এক ছেলে বলে আমরা শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গিয়েছিলাম।”
“তাই নাকি? তা বিয়েটা কবে ঠিক হয়েছে?”
“কোথায় আর ঠিক হল স্যার,” বাবার মুখটা কালো হয়ে গেল, “ছেলেটার বাবা-মা বুঝেছিল আমরা টাকাপয়সা দেব না পণ হিসেবে। তাতেই বেঁকে বসে। বিয়েতে রাজি হয়নি। এই তো, জিজ্ঞেস করুন না মেয়েকে।”
মালতীর দিকে তাকিয়ে দুবে প্রশ্ন করল, “কী হয়েছিল, পরিষ্কার করে বলো। একটুও লুকোবে না। না হলে বিপদ আছে।”
ভয়ে ভয়ে পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে মালতী বলে ফেলল, “ওর বাবা-মা রাজি হচ্ছিল না কিছুতেই। কিন্তু রঘু বলেছিল, চিন্তা না করতে। একটা না একটা রাস্তা ঠিক বার করে ফেলবে।”
.
এরপরে অন্য কাজটা। রঘুর তিন বন্ধুকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে জেরা। বেশ কয়েকবার জেরা করার পরে একটা ছেলের মুখ থেকে জানা গেল আর একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।
রঘু নাকি আগে একবার জলসা ছেড়ে বেরিয়েছিল। তখন সাড়ে বারোটা মতো হবে।
“কী হয়েছিল, সব ঠিক করে বল।” হুঙ্কার দিল দুবে।
“স্যার, জলসার মাঝে উঠে গিয়ে আমরা একটু দারু খাচ্ছিলাম। পাশের মাঠে ওই ব্যবস্থা ছিল। ওই সময় রঘু হঠাৎ বলল, তোরা বস, আমি একটু ঘুরে আসছি। আধঘণ্টা মতো লাগবে।”
“তারপরে?”
“রঘু সাইকেল নিয়ে চলে যায়। কিছুক্ষণ বাদে আবার ফিরে এসেছিল।”
“কটা বেজেছিল তখন?”
“স্যার, আমরা তখন একটু টাইট হয়ে গিয়েছিলাম। সময় তো দেখিনি। তবে ওই আধঘণ্টা-চল্লিশ মিনিটের মধ্যে ফিরে এসেছিল।”
দুবে ভ্রূ কুঁচকে বসে রইল।
.
সেদিন সন্ধ্যায় আবার দারোগার ঘরে হাজির হয়ে গেল সাব-ইন্সপেক্টর অনিল দুবে। খুলে বলল সবকিছু।
“আচ্ছা, এই কেস। প্রেমঘটিত ব্যাপার। বাবা-মা বাধা দিয়েছে। ছেলে জলসায় গিয়ে মাঝপথে ফিরে এসেছিল। তারপরে আবার ফিরে যায়। যথেষ্ট সময় পেয়েছে খুনটা করার।”
“হ্যাঁ স্যার। আমার তো তাই মনে হয়।”
“কয়েকটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে। ওর স্বীকারোক্তি আর মার্ডার ওয়েপনটা প্রয়োজন। কারণ, চাক্ষুস কোনও সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই।”
“ছেলেটাকে তুলে এনে জেরা করতে হবে স্যার। একটু চাপ দিলেই ভেঙে পড়বে।”
“হ্যাঁ, তুলে আনতে হবে।” হঠাৎ কী যেন মনে পড়তে বললেন, “ছেলেটার বয়স কত?”
“ষোলো পেরিয়ে গিয়েছে স্যার। সতেরোয় পড়ব পড়ব করছে।”
“যাক, একটা দিক দিয়ে নিশ্চিন্তি। কিন্তু তাও ছেলেটাকে তুলে আনার সময় একজন জুভেনাইল অফিসারকে নিয়ে যাবে সঙ্গে।”
“হ্যাঁ, স্যার,” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল দুবে।
দুই পুলিশ অফিসারই জানত, ষোলো বছর হয়ে যাওয়ার মর্মটা কী।
.
জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টে একটা বড়ো পরিবর্তন এসেছে ২০১৫ সাল থেকে। নির্ভয়া কাণ্ডের জেরে।
সবাই জানে, নির্ভয়া-কেসে একজন আসামি প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ার কারণে একেবারে অল্পে ছাড়া পেয়ে যায়। যা নিয়ে প্রচণ্ড তোলপাড় হয়েছিল। এরপরে ওই আইনে কিছু সংশোধন করা হয় জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট ২০১৫-র আওতায়। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন ছিল একটি—
যদি দেখা যায়, অপরাধীর বয়স ১৬ বছরের উপরে তাহলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবেই দেখা হবে। তবে এখানেও একটা কিন্তু আছে। এইসব অপরাধীদের ক্ষেত্রে তার মানসিক অবস্থানটাও খতিয়ে দেখতে হবে। দেখতে হবে, অপরাধী নিজের অপরাধের মর্ম বুঝতে পারছে কি না। সে অপরাধের গুরুত্ব বুঝে অপরাধটা করেছে কি না। মানে সহজ কথায়, তার মনটা কিশোর না একজন প্রাপ্তবয়স্কের।
আর সেটা বিচার করার দায়িত্ব দেওয়া হয় কোনও ডিগ্রি প্রাপ্ত সাইকিয়াট্রিস্ট বা কোনও সাইকো-ওয়েলফেয়ার কর্মীকে। সেই কর্মী বা চিকিৎসক যদি রায় দেন, অপরাধী বুঝেশুনে অপরাধটা করেছে, তাহলে কঠিন সাজা হতে পারে কেস বুঝে।
জুভেনাইল অ্যাক্টে তিন রকম অপরাধের কথা বলা আছে।
এক, পেটি অফেন্স। ছোটোখাটো অপরাধ। যেমন, মারামারি, চুরি, জালিয়াতি, ইত্যাদি। এতে অপরাধীর তিন বছর পর্যন্ত সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে।
দুই, সিরিয়াস অফেন্স। গুরুতর অপরাধ। খুনের চেষ্টা, প্রতারণা, শারীরিক ক্ষতি করা। এ সব ক্ষেত্রে তিন থেকে সাত বছরের জেল হয়।
তিন, হিনিয়াস ক্রাইম। মানে একেবারে ঘৃণ্য অপরাধ। এই অপরাধের ক্ষেত্রে ষোলো বছরের উপরে বয়স হলে সর্বনিম্ন সাজা হতে পারে সাত বছর বা তার বেশি। শুধু যাবজ্জীবন আর মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নিয়ম নেই জে জে অ্যাক্টে।
পুলিশ বুঝে গিয়েছিল, রঘুর বয়স ষোলো পার হওয়াতে তার বিরুদ্ধে কেস সাজাতে সমস্যা হবে না।
.
দু-ঘণ্টার মধ্যে থানায় তুলে নিয়ে আসা হল রঘুকে। তারপরে চলল জেরার পালা।
মালতী এবং বন্ধুদের বক্তব্য-শোনার পরেও যেন ভাঙছিল না রঘু। বারবার একটা কথাই বলে যাচ্ছিল ছেলেটা, “ওরা ঠিক বলছে না। মালতীর সঙ্গে আমার মেলামেশা ছিল কিন্তু এমন কিছু নয়। আর বন্ধুরা মাল খেয়ে ছিল। আমি হিসি করতে গিয়েছিলাম। করেই চলে আসি।”
আধ ঘণ্টা ধরে একই কথা শোনার পরে ধৈর্যচ্যুতি ঘটল দুবের। সপাটে একটা চড় কষিয়ে দিল সে। চেয়ার থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল রঘু। তারপরে স্থির হয়ে রইল।
একটু ঘাবড়ে গেল দুবে। মেরেছে, চড়টা কি খুব জোরালো হয়ে গেল? ছেলেটা মরে গেল নাকি?
তখনই নড়ে উঠল রঘুর শরীর। তারপরে ধীরে ধীরে উঠে বসল ছেলেটা। তার মুখটা পালটে গিয়েছে। চোখে একটা বন্য হিংস্রতা। দাঁতে দাঁত ঘষে বলে উঠল, “আমাকে মারলি, তোর এত সাহস? একেবারে খুন করে ফেলব।”
বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থেকে দুবে কোনওমতে বলতে পারল, “রঘু, তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? কী আবোল-তাবোল বকছিস?”
“কে রঘু! আমি রঘু নই।” বলেই হাসতে লাগল ছেলেটা। অদ্ভুত ভয় ধরানো হাসি। সেই হাসি শুনতে শুনতে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল অনিল দুবের!
