১৫
শান্তিনিকেতন, ২০০०
“জয় সোনা, এদিকে আয়,” মায়ের ডাকটা শুনে টলমল পায়ে এগিয়ে এল বাচ্চাটা। তারপরে কোলের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
“আস্তে, আস্তে বাবা, লেগে যাবে যে,” ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে বলল কনকমালা।
“কেন মা, তোমাল শরীল খারাপ?” আধো-আধো গলায় প্রশ্ন করল জয়। যার ভালো নাম জয়ন্ত।
বছর তিনেকের ছেলেকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে কনকমালা ফিশফিশ করে বলল, “জানিস, তোর একটা সঙ্গী আসছে। ভাই বা বোন।”
“তী মজা তী মজা!” হাততালি দিয়ে উঠল জয়, “ছোট্ট বনু ভালো। মজা হবে।” ছেলের মুখে মুখ ঘষতে ঘষতে কনকমালা বলে উঠল, “তুই বনুর খেয়াল রাখবি তো বাবা?”
“হ্যাঁ, মা। তুমি তিন্তা কোরো না।”
.
তাদের বিয়ে হয়েছে তিন বছর। প্রথম বছরেই জয়ের জন্ম। তারপরে দুটো বছর কেটে যায়। দীনেন্দ্র ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের পড়াশোনা আর অধ্যাপনা নিয়ে। কনকমালাকে ডুবে যেতে হয় সন্তান প্রতিপালনে। তাকে একাই সব সামলাতে হচ্ছিল। সঙ্গী হিসেবে অবশ্য পেয়েছিল সারদা মাসিকে।
দিন গড়াতে লাগল, বছর ঘুরতে লাগল। কনকের সেই বুটিক খোলার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। তাও সে সেলাই মেশিনটা নিয়ে বসে কখনও কখনও। কাঁচি দিয়ে জামাকাপড় কেটে সেলাই মেশিনে ফেলে চেষ্টা করে নতুন নকশা ফোটানোর। কিন্তু ভিতরের সেই তাগিদটা যেন হারিয়ে গিয়েছে। স্বপ্ন ক্রমে ধূসর হয়ে আসছে।
মাঝে মাঝে রবীন্দ্র রচনাবলী খুলে বসে। কখনও কখনও গান গেয়ে ওঠে। আর মাঝে মাঝেই ডুবে যায় সেই নাটকটায়, যাতে সে নন্দিনীর চরিত্রে অভিনয় করেছিল— রক্তকরবী।
এই বাড়িতে রক্তকরবীর প্রবেশ নিষিদ্ধ। দীনেন্দ্র যেন ওই ফুলটাকে সহ্যই করতে পারে না। এই বাড়িতে একটা মাত্র রক্তকরবী আছে, আর সেটা আছে তাদের শোওয়ার ঘরের দেওয়ালে।
প্রবীরের আঁকা ছবিটায়। তার খোঁপায় গোঁজা।
.
সেদিন প্রবীরের দেওয়া উপহারটা পরে খুলেছিল কনকমালা। আর বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে দেখেছিল প্রবীরের সৃষ্টি। সে যেন সত্যি জীবন্ত হয়ে উঠেছে ওই রং- -তুলির কাজের মধ্য দিয়ে। আর খোঁপায় গোঁজা ওই রক্তকরবীর দিকে তাকালে মনে হবে সত্যিকারের একটা ফুল লাগানো আছে পেন্টিংয়ে।
ছবিটা নষ্ট করে ফেলতে চেয়েছিল দীনেন্দ্র। কিন্তু করতে দেয়নি কনকমালা। রুখে দাঁড়িয়েছিল স্বামীর বিরুদ্ধে। এই একবারই কনকের জেদের সামনে মাথা নোয়াতে হয় দীনেন্দ্রকে। একরাশ ঘৃণা নিয়ে সে তাকিয়ে থাকত প্রবীরের আঁকা ওই ছবিটার দিকে। কিন্তু কিছু করার সাহস পায়নি। কনকমালাকে কিছুটা হলেও ভয় পায় দীনেন্দ্র। জানে মেয়েটার তেজ কতটা।
.
মাঝে মাঝেই বিদেশ চলে যেতে হত দীনেন্দ্রকে। ছেলেকে নিয়ে একাই থাকত কনকমালা। তারপরে এল সেই দিনটা।
দিন কয়েক আগেই স্বামী ফিরেছে বিদেশ থেকে। রাতে খাবার পরে খাটে শুয়ে বিশ্রাম করছিল দীনেন্দ্র। তখনই পাশে এসে দাঁড়াল কনকমালা।
“তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।”
“হ্যাঁ, বলো,” হাতের ম্যাগাজিনটা থেকে চোখ না তুলে বলল দীনেন্দ্ৰ।
চুপ করে রইল কনকমালা। কোনও সাড়া না পেয়ে স্ত্রীর দিকে তাকাল দীনেন্দ্র, ‘কী ব্যাপার, কী বলবে বলো।”
“আমি আবার মা হতে চলেছি।”
তড়াক করে সোজা হয়ে বসল দীনেন্দ্র
“কী বলছ কি তুমি! এ সব আবার কখন হল?”
“মানে,” অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কনকমালা, “তুমি জানো না কখন হয়েছে?”
একদৃষ্টে কনকমালার চোখের দিকে তাকিয়ে দীনেন্দ্র বলল, “আমি জানি না! তুমি বলে দাও।”
কেউ যেন শপাং করে একটা চাবুক মারল কনকমালার পিঠে। তার মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেল।
“এই কথাটা তুমি আমায় বলতে পারলে দীনেন্দ্র? মুখে এতটুকু আটকাল না? “ দীনেন্দ্র চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দিল, “আমাকে তো গত কয়েকমাসে বেশ কয়েকবার বিদেশে থাকতে হয়েছে, তাই কখন কী ঘটেছে, আমার মনে নেই।”
আর কোনও কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল দীনেন্দ্র। অপমানে, লজ্জায় কাঁপতে লাগল কনকমালার শরীর। ছোট্ট জয় তখন সুখনিদ্রায় ডুবে আছে। সে টেরও পেল না কীভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে একটা সম্পর্ক।
.
ভাঙনের সেই শুরু। দুজনের মধ্যে কথাবার্তাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। কনকমালা আরও ডুবে গেল ছেলেকে নিয়ে। দীনেন্দ্র দিনের প্রায় পুরো সময়টাই দিয়ে দিল শিক্ষকতায়। বাড়িতে থাকলেও বউয়ের বদলে বই হয়ে থাকল তার সঙ্গী।
মাঝে সে শুধু একবার জিজ্ঞেস করেছিল, “প্রবীরের সঙ্গে দেখাটেখা হয়? ওটা আসে নাকি এদিকে?”
ঘেন্নায় কোনও জবাব দেয়নি কনকমালা। সে বুঝতে পারছিল, দীনেন্দ্ৰ কোনদিকে ইঙ্গিত করছে। এই সন্তানের বাবা কি প্রবীর, সেটাই জানতে চাইছে তার স্বামী।
.
ধীরে ধীরে সময় বয়ে যেতে লাগল। কনকমালা বুঝতে পারল সন্তান জন্মানোর সময় আসন্ন। তার চিকিৎসক ইদানীং বাড়িতে এসেই দেখছে কনকমালাকে। দীনেন্দ্রর অর্থ আর প্রতিপত্তিকে এদিকের সবাই খাতির করে।
সেদিন দুজনেই হাজির ছিল। দীনেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে প্রবীণ ডাক্তার বললেন, “আর দেরি কোরো না হে। দিন দুয়েকের মধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি করে দিও।” তারপরে খসখস করে প্রেসক্রিপশনে কয়েকটা ওষুধের নাম লিখে দিলেন তিনি, “কয়েকটা নতুন ওষুধ দিলাম। চালু করে দিও।”
ডাক্তারের সঙ্গে উঠে পড়ল দীনেন্দ্রও। “চলুন, আপনার সঙ্গে আমিও যাব। ওষুধগুলো একেবারে নিয়ে আসি।”
দুজনেই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
ছেলেকে কোলে টেনে চুপ করে বসে রইল কনকমালা। ঘর ফাঁকা হতেই বিছানায় এসে বসল সারদা মাসি।
তার দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে কনকমালা বলল, “সারদা মাসি, আমার খুব ভয় করছে। কী করব, বুঝতে পারছি না।”
দুর্গা প্রতিমার মতো মেয়েটার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সারদা মাসি বলল, “তুমি কিছু ভেবো না কনক। আমি তো আছি। কিচ্ছু হবে না।”
সারদা মাসির স্পর্শ পেয়ে হু হু করে কেঁদে ফেলল কনকমালা। মাত্র কয়েকমাসে তার জীবনটা যে এত বিবর্ণ হয়ে যাবে, কখনও ভাবতে পারেনি মেয়েটা।
.
ভোরের দিকে হঠাৎ পেটে যন্ত্রণা শুরু হল কনকমালার। সঙ্গে বমি। দেখতে দেখতে একেবারে নেতিয়ে পড়ল মেয়েটা। কোনও হুঁশই যেন ছিল না।
দীনেন্দ্রর দু-হাত ধরে সারদা মাসি বলে উঠল, “বাবা, তুমি এখনই ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। আমার ভালো লাগছে না।”
মিনিট দশেকের মধ্যেই কনকমালাকে নিয়ে গাড়িটা ছুটতে লাগল স্থানীয় হাসপাতালের দিকে।
শান্তিনিকেতনের আকাশে তখন ধীরে ধীরে সূর্য উঠছে।
.
জয়কে কোলে নিয়ে একমনে ঠাকুরের নাম জপ করে যেতে লাগল সারদা মাসি, “ঠাকুর, মেয়েটার যেন কিছু না হয়। মেয়েটাকে তুমি বাঁচিয়ে রেখো।”
প্রার্থনায় সাড়া দিলেন না ঈশ্বর।
সন্ধ্যার দিকে সেই মর্মান্তিক খবরটা পেল সারদা মাসি।
সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছে কনকমালা।
নিজের মেয়েকে হারানোর মতো যন্ত্রণায় বিদ্ধ সারদা মাসি ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল। সে জানে নির্দোষ একটা মেয়েকে চলে যেতে হল অপবাদের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে।
এই মৃত্যুর দায় কেউ এড়াতে পারে না। রাগে ক্ষোভে যন্ত্রণায় মাসি বলে যেতে লাগল, “কেউ পার পাবি না। একদিন না একদিন পাপের শাস্তি ঠিক পেতেই হবে।”
.
গভীর রাতে বাড়ি ফিরল দীনেন্দ্র। কনকমালাকে দাহ করে। যারা তার সঙ্গে এসেছিল, তাদের মধ্যে একজন সারদা মাসিকে বলে গেল, মৃত্যুর আগে কনকমালা এক মেয়ের জন্ম দিয়েছে। বাচ্চাটা কয়েকটা দিন হাসপাতালেই থাকবে। তারপরে ফিরিয়ে আনা হবে বাড়িতে।
.
ভোর হতে মাত্র কয়েকঘণ্টা বাকি তখন। কিন্তু ওই কয়েকঘণ্টা যে কত ভয়ংকর হতে পারে, সেটা সেদিন বুঝেছিল সারদা মাসি।
বন্য পশুর মতো নিজের ঘরে দাপিয়ে বেরিয়েছিল দীনেন্দ্র। ভয়ংকর রকম গর্জন করছিল মুখ দিয়ে। নিজের মনে কথা বলে যাচ্ছিল। ছুড়ে ছুড়ে ভাঙছিল ঘরের জিনিসপত্র। যেন এক দানব হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে।
ওই কয়েকঘণ্টা ছোট্ট জয়কে বুকে করে বসেছিল সারদা মাসি। আর ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ঠাকুরের নাম জপ করে গিয়েছিল।
ভোর হতেই কোথায় চলে গিয়েছিল দীনেন্দ্র। ফিরল সেই রাত করে।
আর তখনই ঘটল আর একটা ভয়ংকর ব্যাপার।
হঠাৎ বাড়িতে ঢুকে এল একটা লোক। রোগা করে, পাঞ্জাবি পরা। বীভৎস গলায় চিৎকার করতে করতে সে বলছিল, “কোথায় গেলি তুই দীনেন্দ্র! আমার কনকমালাকে তুই মেরেছিস। তোকে আমি ছাড়ব না। ছিঁড়ে ফেলব দু-হাতে।”
উম্মাদের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল দীনেন্দ্র। তার চোখ দুটোও জ্বলছে। চেহারায় লোকটার চেয়ে অনেক বড়ো দীনেন্দ্র। তার একটা ঘুসি খেয়েই মাটিতে ছিটকে পড়ল প্রবীর সেন।
আর প্রবীরের বুকের ওপর বসে দু-হাতে গলা টিপে ধরল দীনেন্দ্র।
আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে একটু দূর থেকে সব দেখছিল সারদা মাসি। এবার সে ছুটে এল। হাত জোড় করে বলতে লাগল, “ওকে তুমি ছেড়ে দাও। ও যে মরে যাবে। তুমি জেলে গেলে এই বাচ্চা দুটোর কী হবে!”
আস্তে আস্তে সংবিৎ ফিরে পেল দীনেন্দ্র সিংহ। তার হাতের নিষ্পেষণ শিথিল হয়ে এল। প্রবীরের গলা থেকে দুটো হাত সরিয়ে নিয়ে দীনেন্দ্র বলল, “এটাই শেষবার। এরপরে যদি তোকে দেখতে পাই, তাহলে আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবি না।”
আরও একবার অসহায় আক্রোশে গুমড়োতে গুমড়োতে বেরিয়ে এল প্রবীর সেন।
.
বেডরুমে এসে প্রবীরের আঁকা কনকমালার ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে রইল দীনেন্দ্র। ছবির কোনায় লেখা ওই নামটা তাকে ক্রমাগত রক্তাক্ত করে চলেছে।
সে এগিয়ে গেল ছবিটাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দেবে বলে। কিন্তু পারল না। অদৃশ্য কোনও হাত তাকে যেন থামিয়ে দিল।
কনকমালার মুখটার দিকে তাকিয়ে হাহাকার করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল দীনেন্দ্র সিংহ।
ছবির রক্তকরবীর রংটা যেন তখন আরও লাল হয়ে উঠেছে।
