২
শান্তিনিকেতন, ২০২১
মোবাইল হাতে নিয়ে যে সময়টা দেখবে, তারও সাহস ছিল না বনমালার। সে থরথর করে কাঁপছিল।
যে খুন হচ্ছে, তার মুখটা সে চেনে। কিন্তু তার থেকেও আতঙ্কের একটা ব্যাপার আছে।
স্বপ্নটা আবার ফিরে এসেছে। সাত বছর পরে!
.
ছোটোবেলায় এই ভয়ংকর স্বপ্ন তার জীবন প্রায় ছারখার করে দিয়েছিল। তার শৈশবটা একটা ভয়াবহ কালো অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছিল। মানসিকভাবে ভীষণই ভেঙে পড়েছিল ছোট্ট মেয়েটা। তখন দাদাকেই পাশে পেয়েছিল বনমালা। দাদা না থাকলে সে বোধহয় পাগল হয়ে যেত।
এখন তার একুশ বছর বয়স। ছোটোবেলার স্মৃতিগুলো কীরকম যেন আবছা হয়ে এসেছে। বিশেষ করে ওই স্বপ্নগুলোর স্মৃতি। বড়ো হয়ে যাওয়ার পরে তার মনে হত, শৈশবে ওই সব কিছুই হয়নি। সবটাই তার কল্পনা। সে আর বিশেষ কিছু মনেও করতে পারে না। মাঝে মাঝে একটু একটু স্বপ্নের কথা মনে পড়ে তার, কিন্তু সে খুবই সামান্য।
বড়ো হয়ে এই ব্যাপারে দাদার সঙ্গে কোনওরকমই কথা বলেনি বনমালা। বাবার সঙ্গে কথা বলার তো প্রশ্নই নেই। দাদাও কোনওদিন কিছু বলেনি।
তবে বনমালার এইটুকু মনে আছে দুটো খুন হয়েছিল। এবং সে জন্য তাদের বন্ধুদের অনেক খেসারত দিতে হয়েছিল। ভেঙে যেতে বসেছিল বন্ধুত্ব।
প্রথম প্রথম একটু আতঙ্কে থাকত বনমালা। এই বুঝি আবার কোনও রাতে ভয়ংকর ওই স্বপ্ন দেখে সে। কিন্তু রাতের পর রাত কেটে গেল। মাসের পর মাস। এমনকী, বছরও পার হয়ে গেল। স্বপ্ন আর ফিরে এল না। বনমালার এখন মনে হয়, স্বপ্নগুলো সে খুনের পরে দেখেছিল। খুনের ব্যাপারটা মনে এতটাই ধাক্কা দিয়ে গিয়েছিল যে, সেটা পরে স্বপ্নে ফিরে আসে। খুনির মুখ দেখেনি, কারণ খুনিকে সে চিনত না।
যত সময় গড়িয়েছে, তত সেই ধারণাটাই বদ্ধমূল হয়েছে বনমালার মনে। তার কোনও অলৌকিক ক্ষমতা নেই। খুনের আগে খুনের কথা সে জানতে পারেনি। খুনের কথা জানার পরে সে দুঃস্বপ্ন দেখেছিল।
ধীরে ধীরে সব কিছুই ফিকে হতে শুরু করে, মনের কোনও কুঠুরিতে তালাবন্ধ হয়ে হারিয়ে যায় সেই ভয়ংকর দিনগুলো।
আজকের রাতটা পর্যন্ত তালাটা বন্ধই ছিল। কিন্তু সেই তালা আজ কেউ খুলে দিয়েছে।
স্বপ্নটা ফিরে এসেছে!
.
বিছানার পাশে রাখা জলের বোতলটার দিকে কোনওমতে হাত বাড়িয়ে দিল বনমালা। তারপরে ঢকঢক করে কিছুটা জল খেয়ে নিল। তার শরীরটা গুলিয়ে উঠছে।
কী করবে সে? দাদাকে ডাকবে? ছোটোবেলায় তাই করত। কিন্তু এখন তো বড়ো হয়ে গিয়েছে। সন্তর্পণে মোবাইলে সময়টা দেখল বনমালা। রাত সাড়ে বারোটা। ভোর হতে এখনও অনেক দেরি।
ধীরে ধীরে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল বনমালা। তার অজান্তেই গুটিয়ে গেল শরীরটা। হাঁটু দুটো বুকের কাছে। মাথাটা এসে ঠেকল জোড়া হাঁটুতে। যেন মাতৃজঠরে থাকা একটি ভ্রূণ!
বনলতা বুঝতে পারছিল, এতদিন ধরে সে যা তত্ত্ব খাড়া করেছিল, এই একটা স্বপ্ন সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে চলে গিয়েছে।
সে তো খুনের খবর কিছু পায়নি। তাহলে স্বপ্নটা দেখল কেন? সেই একইভাবে খুনের দৃশ্য। একটা অস্ত্র ধরা হাত ফালাফালা করে দিচ্ছে লোকটাকে।
তাহলে কি সত্যিই কোনও অলৌকিক ক্ষমতা আছে তার? কোনও অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা? কোনও অতিপ্রাকৃতিক শক্তি কি তাকে আগাম জানান দিচ্ছে যে, তার পরিচিত কেউ ভয়াবহভাবে মরতে চলেছে?
বনমালা আর ভাবতে পারছিল না। তার অবশ্য আরও একটা কথা মনে হচ্ছে। এই লোকটা তার পরিচিত। ইদানীং যা ঘটছে, তাতে তার মানসিক অবস্থা একেবারেই ঠিক নেই। আর সবকিছু মিলিয়েই এই ভয়ংকর স্বপ্নটা সে দেখেছে। খুনটা সত্যি হয়নি। সবই তার অবচেতন মনের কল্পনা।
বনমালা জানে, তার এই ধারণা সত্যি কি না, আর কয়েকঘণ্টার মধ্যে বুঝে যাবে। যখন ভোরের আলো ফুটবে।
তাকে জানতেই হবে।
.
সেই রাতটা যে কীভাবে কেটেছে, বনমালা নিজেও বোঝেনি। মাঝে মাঝে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছিল তার। আর কোনও একটা মায়াজগতে চলে যাচ্ছিল সে। এক অজানা, অচেনা জগৎ। সেখানে সে যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল। আর অগুনতি হাত এগিয়ে আসছিল তার দিকে। সেই হাতগুলো তার মাথায়, কপালে আদর করে দিচ্ছিল। কে যেন ফিশফিশ করে বলছিল, ভয় কী রে! আমি তো আছি!
আবার চটকা ভাঙতেই বাস্তবে ফিরে আসছিল সে। কঠিন এক বাস্তব।
ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটল। এত ভোরে সে কখনও বাড়ি থেকে বেরোয় না। কিন্তু আজ বেরোতেই হবে।
বাড়ির কেউ তখনও ওঠেনি। কোনও আওয়াজ না করে সাইকেলটা বার করল বনমালা। তারপরে ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যেন উড়ে চলল গন্তব্যস্থলের দিকে।
আধঘণ্টার মধ্যেই চেনা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। দিন পাঁচেক আগে এই বাড়িটা থেকে প্রায় পালিয়ে চলে এসেছিল সে। প্রবীর সেন যে ওরকম আচরণ করবে, ভাবতেও পারেনি। বনমালা মানসিকভাবে খুব শক্তিশালী নয়। লোকটার আক্রমণে ঘাবড়ে গিয়েছিল মারাত্মক। কোনওমতে ধাক্কা মেরে বেরিয়ে আসে। ওই সময় অরণ্য না থাকলে যে সে একা কী করত, কে জানে।
কিন্তু আবার তাকে ফিরে আসতে হয়েছে বাড়িটায়। এবারও একা। এবার কোনও বিপদ হলে যে অরণ্যের সাহায্য পাওয়া যাবে না, সেটা সে ভালোই জানে। তবু আসতে হয়েছে তাকে। নিজের মানসিক সুস্থতা প্রমাণ করতে।
সাইকেলটা গেটের সামনে রেখে চারদিকে একবার দেখে নিল বনমালা। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
সে একটা জিন্স আর পাতলা লাল জ্যাকেট পরে এসেছে। জ্যাকেটটার সুবিধে হল একটা হুড়ি আছে। হুডিতে মাথা-মুখ যতটা সম্ভব ঢেকে প্রবীর সেনের বাড়িতে আবার পা রাখল বনমালা।
বারান্দায় উঠে সোজা একটা ঘর। কিন্তু প্রবীর তাকে সেই ঘরে নিয়ে যায়নি। নিয়ে গিয়েছিল বাঁ-দিকের ঘরটায়। যেখানে লোকটার আঁকার সরঞ্জাম ছিল। প্রবীর সেনের স্টুডিও।
দরজাটা ভেজানো। আস্তে আস্তে দরজাটা খুলে ঘরের ভিতরে পা রাখল বনমালা। আর সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল, যুক্তি-তক্কো দিয়ে সে যা থিওরি খাড়া করেছিল, তা খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে। পার্থিব কোনও যুক্তি দিয়ে তার জীবনের ঘটনা বিচার করা যাবে না। মানুষের চেনা জগতের বাইরেও যে একটা জগৎ আছে, তার প্রমাণ পেয়ে গেল বনমালা। সেই অতিপ্রাকৃতিক বা অলৌকিক শক্তি যে তাকে ঘিরে রেখেছে, সেটাও যেন অনুভব করতে পারছিল মেয়েটা।
চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল বনমালা। আবার খুলল। কিন্তু ঘরের দৃশ্য বদলাল না।
ওই তো মেঝেয় চিৎ হয়ে পড়ে আছে প্রবীর সেন। ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে তার তলপেট। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘর। লোকটা বমিও করেছে মরার আগে। ধীরে ধীরে ঘরের ভিতরে চোখ বোলাল বনমালা।
একটা আধখাওয়া মদের বোতল রয়েছে টেবলের উপরে। এর আগের দিনও ওখানেই ছিল বোতলটা। গ্লাসটা অবশ্য মাটিতে পড়ে। অবশিষ্ট কিছু মদ গড়িয়ে পড়েছে গ্লাস থেকে।
বনমালার শরীরটা গুলিয়ে উঠছিল। পা দুটো কাঁপছিল ভয়ংকরভাবে। মেয়েটা বুঝতে পারছিল, যে কোনও মুহূর্তে জ্ঞান হারাবে সে। কোনওমতে নিজের শরীরটা টেনে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার মুহূর্তেই চোখ পড়ল ঘরের কোণে।
কতগুলো কাগজ ডাঁই করে রাখা। একটা কাগজ দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছে বনমালা। একটা পেন্টিং। পেন্টিংটা সে চেনে। তার মায়ের।
বেরিয়ে আসার জন্য পা বাড়াতেই থেমে গেল বনমালা। বিদ্যুৎচমকের মতো একটা কথা মনে পড়ে গিয়েছে তার। পেন্টিংটা তার মায়ের হলেও ছবিটা প্রায় তার মুখের মতোই। তার পরিচিত কেউ দেখলে একবারেই বলে দেবে এটা বনমালার ছবি।
ঠান্ডা স্রোতটা ঘাড়ের পিছন থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে লাগল বনমালার। এই ছবিগুলো পুলিশের হাতে পড়বেই। ছড়িয়ে যাবে শান্তিনিকেতনে। আর তারপরে তাকে খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না পুলিশের। সে আগে একবার দেখা করে গিয়েছে প্রবীর সেনের সঙ্গে। খুনের দিন আবার হাজির হয়েছে প্রবীরবাবুর ঘরে। এরপরে পুলিশ তাকে সন্দেহ করবে না তো কাকে করবে!
হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল বনমালা। কী করবে, বুঝে উঠতে পারছিল না। তারপরে নিজের সবটুকু মানসিক জোর খাটিয়ে এগিয়ে গেল ঘরের কোণে।
সব মিলিয়ে গোটা দশেক পেন্টিং রাখা রয়েছে। তার মধ্যে সাতটাই মায়ের। দ্রুত ছবিগুলো তুলে জ্যাকেটের মধ্যে গুঁজে নিল বনমালা। তারপরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘরটা খুঁজে দেখল, আর কোথাও কিছু আছে কি না।
নেই। ছবি আঁকার ইজেলটা রয়েছে এক কোণে। সে পাশের ঘর দুটোয় উঁকি দিয়ে এল। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, আর কোনও পেন্টিং আছে কি না। বোধহয় নেই। আর যেন না থাকে— ঈশ্বরের কাছে আকুল প্রার্থনা করতে লাগল বনমালা। সে আর এখানে এক মুহূর্ত থাকতে পারছে না। তার সাহস উবে গিয়েছে। এই মুহূর্তে পালাতে হবে বাড়িটা ছেড়ে।
হুডিটা ভালো করে মাথায় টেনে দ্রুত প্রবীর সেনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল বনমালা। তারপরে আর এক মূহূর্ত অপেক্ষা করল না। সাইকেলে বসে সমস্ত শক্তি দিয়ে প্যাডেল করতে লাগল মেয়েটা।
বনমালার তখন কোনওদিকে দেখার ক্ষমতা ছিল না। তাই সে দেখতে পেল না, রাস্তা দিয়ে দাঁতন করতে করতে আসা একটা লোক তাকে প্রবীর সেনের বাড়ি থেকে বেরোতে দেখল। দেখল, ঝড়ের গতিতে সাইকেলটা দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
লোকটা ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওইদিকে। তারপরে কী মনে হতে প্রবীর সেনের বাড়িতে গিয়ে ঢুকল। এই পাগলা মাস্টারকে সে ভালোই চেনে। তার মেয়েকে আঁকা শেখায়। একাই থাকে মাস্টার। দুপুরের দিকে একজন মাসি এসে রান্নাটা করে দিয়ে যায়। কিন্তু এই সাত-সকালে কে এল।
লোকটা এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে।
“মাস্টার, ও মাস্টার! ঘুম ভাঙল নাকি?”
কোনও জবাব এল না। লোকটা এবার বারান্দায় উঠে এল। বাঁদিকে মাস্টারের ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা। লোকটা এগিয়ে চলল সেদিকে। তারপরে চৌকাঠের কাছে এসেই স্থাণু হয়ে গেল। লোকটার মুখটা আতঙ্কে সাদা হয়ে গিয়েছে। কয়েক মুহূর্ত পরে ভয়াবহ একটা চিৎকার করে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল লোকটা।
কোথায় গেল ওই সাইকেল আরোহী? কোথাও দেখা যাচ্ছে না সেই লোকটাকে। দূরের কুয়াশা তখন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। কিন্তু লাল জ্যাকেট পরা লোকটার চিহ্ন নেই।
বনমালা তখন বাড়ির প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। তার বুকটা হাঁপরের মতো ওঠা-নামা করছে। কোনওদিন যে সে এরকম দুঃসাহসিক কাজ করতে পারে, সেটা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি বনমালা।
কী ভাগ্যিস, কেউ তাকে দেখতে পায়নি। ছবিগুলোও সম্ভবত সব নিয়ে আসতে পেরেছে। কিছুটা শান্তি পেল বনমালা। সে যে ওই বাড়িতে গিয়েছিল, তা জানতে পারবে না পুলিশ। এই আতঙ্কের মধ্যে একটু অন্তত স্বস্তি পেল মেয়েটা।
বনমালা বড্ড সরল। তাই বুঝতেও পারল না, সে না থাকলেও তার চিহ্ন ওই ঘরে রয়ে গিয়েছে।
বনমালার হাতের ছাপ!
