৪
শান্তিনিকেতন, ২০১৪
মজুমদার বাড়ির সামনে তখন পুলিশের গাড়ির সংখ্যা আরও বেড়েছে। পুলিশের ফটোগ্রাফার এসে ছবি তোলা শুরু করেছে। ভালো করে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখছিলেন অফিসার। তখনই অফিসার-ইন-চার্জের ফোনটা এল ভদ্রলোকের মোবাইলে।
“মিস্টার দত্ত, এই কেসটা তো খুব সেনসিটিভ হতে যাচ্ছে। আমি ইতিমধ্যেই এসপি সাহেবকে জানিয়ে দিয়েছি।”
“খুব ভালো করেছেন স্যার। এই বাড়িতে তো ভদ্রলোক ছাড়া কেউ থাকেন না। এফআইআর হয়নি এখনও, তাই আমরা ইউডি কেস বানিয়ে কাজ শুরু করেছি।”
যে সব ক্ষেত্রে এফআইআর হয় না সেসব ক্ষেত্রে পুলিশে ইউডি কেস বানিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারে। ইউ ডি— আনন্যাচারাল ডেথ। তারপরে এফআইআর হলে সেটা গ্রহণ করে নেওয়া হয়। পুলিশ অফিসাররা জানেন, এইসব মার্ডার কেসে আদালতের কাছে এফআইআর কতটা জরুরি। এফআইআর হতে দেরি হলে কেসের বাঁধুনি ঢিলে হয়ে যায়।
এই ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণটা নিয়ে কোনও সংশয়ই নেই। কোনও ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে যেভাবে যৌনাঙ্গ আর তলপেট ফালাফালা করা হয়েছে, তাতে মৃত্যুর কারণটা স্পষ্ট। রক্তক্ষরণেই মারা গিয়েছেন ভদ্রলোক। কিন্তু আর একটা বড়ো খটকা আছে।
সমীরণ দত্ত একবার চট করে হাতঘড়িতে সময়টা দেখে নিলেন। তারপরে বললেন, “স্যার, এখন এগারোটা বাজে। যদি আজই পোস্ট মর্টেমটা করিয়ে ফেলা যায়, তাহলে ভালো হয়। সন্ধ্যা হয়ে গেলে তো আর পোস্ট মর্টেম করা যাবে না।”
ওসি বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা। “ঠিক আছে, আর কিছু?”
“হ্যাঁ স্যার, আর একটা ব্যাপার। ভিসেরার টক্সিকোলজির রিপোর্টটা যদি একটু দ্রুত পাওয়া যায়, তাহলে খুব ভালো হয়। আপনি তো জানেন, লাইনে পড়ে গেলে স্যাম্পেলের কী হাল হতে পারে।”
ভালোই জানতেন ওসি। লাইনে পড়ে গেলে ঠিকঠাক রিপোর্ট পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। পোস্ট মর্টেম করার সময় মৃতদেহের শরীরের ভিতরের নরম অর্গ্যানগুলোর কিছু অংশ কেটে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। যেমন, লিভার, কিডনি, ইন্টেস্টাইন ইত্যাদি। তারপরে সেগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হয় ফরেন্সিক ল্যাবে। যেখানে টক্সিকোলজিস্ট সেসব পরীক্ষা করে দেখে। পরীক্ষা করে দেখা হয় বডি ফ্লুইডও, টিসুও।
ডাক্তারের কাছ থেকে পুলিশ সেই ভিসেরা স্যাম্পল নিয়ে পাঠায় বিশেষজ্ঞের কাছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সেইসব স্যাম্পল থানাতেই পড়ে রইল বেশ কয়েকটা দিন। তারপরে যখন পৌঁছোল তখন স্যাম্পল নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
অনেকক্ষেত্রে আবার ঠিকমতো সংরক্ষণ করা না হলেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তখন আর টক্সিকোলজিস্টের পক্ষে সেইসব স্যাম্পল থেকে কিছু জানা সম্ভব হয় না। রিপোর্টে লেখা থাকে, স্যাম্পল নষ্ট হওয়ার কারণে বলা যাচ্ছে না বিষক্রিয়া, মাদক বা নেশার অন্য কোনও দ্রব্য মৃত্যুর আগে শরীরে প্রবেশ করেছিল কি না।
আরও একটা সমস্যা দেখা দেয়। টক্সিকোলজিস্টের কাছে প্রায় প্রতিদিনই এইরকম ভিসেরা স্যাম্পল আসতে থাকে। লাইন পড়ে যায়। লাইনের শেষ মাথায় যে স্যাম্পল থাকে, তা টক্সিকোলজিস্টের কাছে পৌঁছোতে পৌঁছোতে নষ্ট হয়ে যায় বেশিরভাগ সময়ে। ফলে এক্ষেত্রেও কোনও লাভ হয় না। আধাখ্যাঁচড়া রিপোর্ট দিয়ে ছেড়ে দেয় বিশেষজ্ঞ।
বোলপুর হাসপাতালে ভিসেরা স্যাম্পল পরীক্ষা করার ব্যবস্থা নেই। সেগুলো পাঠাতে হবে কলকাতায়। অফিসার চাইছিলেন ওপর থেকে চাপ দিয়ে যদি লাইনের সবার আগে নিয়ে যাওয়া যায় এই ভিসেরা স্যাম্পলটি। টক্সিকোলজিস্টের রিপোর্ট পাওয়াটা যে ভীষণ জরুরি, তা লাশের অবস্থা দেখে বুঝতে পারছিলেন সমীরণ দত্ত।
চঞ্চল মজুমদারের দেহটা ছেতরে পড়েছিল সোফার সামনে। ঘাড়টা একদিকে কাত হয়ে আছে। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরিয়ে এসেছে। বমিও করেছেন ভদ্রলোক। কেন? কিছু খেয়েছিলেন নাকি ভদ্রলোক? এই প্রশ্নটার জবাব চাইছিলেন সমীরণ দত্ত।
.
অফিসার একটু অধৈর্য হয়ে হাতঘড়িটা আবার দেখে নিলেন।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়ার কাজটা শুরু হয়েছে। বাকি কাজগুলোও চলছে। নিখুঁতভাবে ঘরের ছবি তুলতে হবে। এর মধ্যেই সমীরণ দত্ত যতটা পারেন ঘরের মধ্যে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন।
সামনে একটা স্টাডি-টেবল টেরচা হয়ে রয়েছে। একটা হুইস্কির গ্লাস আর বোতলের টুকরো টুকরো অংশ মেঝেতে পড়ে। মৃত্যুর আগে হয়তো ছটফট করেছিলেন ভদ্রলোক। বোতলের গায়ে লেবেলটা দেখে অফিসার বুঝতে পারলেন, বেশ দামি মদ। ভদ্রলোক শৌখিন ছিলেন। এই টুকরোগুলোও পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হবে।
সামনে একটা ছোটো স্টাডি-টেবল। তার উপরে রাখা শেক্সপিয়ারের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’। একটা পেন আর একটা পেনসিল। অফিসার আর একবার ঘরের মধ্যে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।
কোনায় একজন মহিলাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এই মহিলাই প্রথম এসে মৃতদেহটা দেখতে পেয়েছিলেন। তারপরে তাঁর চেঁচামেচিতে লোক জড়ো হয়ে যায়। পুলিশে খবর যায়।
এই ভদ্রমহিলাকে একবার জেরা করা হয়েছে। রোজকার মতো তিনি সকাল আটটা নাগাদ রান্না করার জন্য এসেছিলেন। একবেলা রান্না করেই চলে যান, ওবেলা আসেন না। দুপুরের দিকে আর একজন এসে ঘরদোর পরিষ্কার, বাসনমাজার কাজগুলো সব করে দেয়। আর একজন আছে, যে বাগানের দেখভাল করে। সেই লোকটা সপ্তাহে দু-বার আসে।
ভদ্রমহিলা এসে দেখেন, সামনের বড়ো গেটটা খোলা। যেটা তালাবন্ধ থাকে। গেট ঠেলে ভিতরে এসে বারান্দায় উঠে আসেন তিনি। বারান্দায় কোনও রেলিং নেই। সামনেই বাবুর বসার ঘর। ওই ঘরের দরজা খোলাই ছিল। ভিতরে ঢুকেই ভয়ংকর দৃশ্যটা দেখতে পান মহিলা।
মহিলার সঙ্গে আরও একবার কথা বলতে হবে। তার আগে রুটিন কাজগুলো শেষ করতে হবে। বডি নিয়ে যেতে হবে মর্গে। ঘড়িতে আবার চোখ বোলালেন অফিসার। অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে। সাড়ে বারোটা বাজে।
আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট কেটে গেল সবকিছু মিটতে। তারপরে সেই মহিলার সামনে এসে দাঁড়ালেন অফিসার।
“তোমার বাবু কীরকম লোক ছিল হে?”
“বাবুর মতো ভালো লোক আর ছিল না,” আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলছিলেন ভদ্রমহিলা। “মাস ছয়েক হল কাজ করছি। বাবুকে কখনও মাথা গরম করতে দেখিনি। সবসময় হাসিমুখ লেগেই থাকত।”
“কারও সঙ্গে ঝামেলা-ঝগড়া হয়েছিল এর মধ্যে?” রুটিন প্রশ্নটা করলেন অফিসার। সমীরণবাবু বুঝে গিয়েছিলেন, এই হাই প্রোফাইল কেসে তাঁকেই ইনভেস্টিগেটিং অফিসার বানানো হবে। তাই শুরু থেকেই যতটা সম্ভব নিখুঁত কাজ করার উপরে জোর দিলেন তিনি।
“না না স্যার, কী যে বলেন! বাবুর কোনও শত্রুই ছিল না। এখানকার মানুষের দুঃখকষ্টে এগিয়ে আসতেন। আমাকেও বেশ কয়েকবার সাহায্য করেছিলেন, ওই রকম মানুষ হয় না।”
অফিসার গম্ভীর মুখে বাইরের দিকে তাকালেন। বড়ো গেটটার ফাঁক দিয়ে রাস্তার ওপারের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। ভিড় জমে গিয়েছে। এই মামলাটা নিয়ে জলঘোলা হবে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, খুনটা করা হয়েছে বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে। হাতের ছাপগুলো নেওয়া হয়ে গেলে ঘরের তল্লাশিও নেওয়া হবে। তবে ডাকাতির জন্য যে এই খুন নয়, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
“এই বাড়িতে কেউ আসত বলে জানো?”
একটু ভেবে মহিলা জবাব দিলেন, “বাবুর বাড়ির লোক তো কলকাতায় থাকে বলে শুনেছি। পাশের সিংহবাবুর সঙ্গে ওঁর খুব বন্ধুত্ব ছিল। তিনি মাঝে মাঝে আসতেন। এ ছাড়া হয়তো দু-একজন আসতে পারেন। আমি ঠিক জানি না।” তারপরেই মনে পড়তে বললেন, “ও হ্যাঁ, বাবুর কাছে কয়েকটা বাচ্চা ছেলে- মেয়ে পড়তে আসত।”
“তাই নাকি?” বলে উঠলেন অফিসার, “তুমি তাদের চেনো নাকি?”
মহিলা বলে উঠলেন, “একজনকে চিনি। এই পাশের সিংহবাড়ির মেয়েটা।” অফিসার মাথা নাড়লেন। তারপরে সহকারীকে নির্দেশ দিলেন, “ওর স্টেটমেন্টটা নিয়ে নিন। আমি একবার পাশের সিংহবাড়ি থেকে ঘুরে আসছি।” অফিসার আরও একবার ঘড়িটা দেখে নিলেন। দুটো বেজে গিয়েছে।
পাশাপাশি হলেও দুটো বাড়ির মধ্যে বেশ খানিকটা দূরত্ব আছে। দুটো বাড়িতেই বাগান আছে। এই অঞ্চলের বাড়িগুলো সেরকমই। বাগানওয়ালা বড়োলোকদের বাড়ি।
এক কনস্টেবলকে নিয়ে সিংহবাড়ির সামনে আসতেই ভদ্রলোককে দেখতে পেলেন অফিসার। বেশ লম্বা-চওড়া রাশভারী চেহারা, গম্ভীর মুখে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। একটু পিছনে অল্পবয়সি একটা ছেলে। সম্ভবত এই ভদ্রলোকেরই।
দীনেন্দ্র সিংহের সামনে দাঁড়িয়ে অফিসার বললেন, “আপনার সঙ্গে একটু কথা বলার আছে। বুঝতেই তো পারছেন, কেন?”
দীনেন্দ্র সিংহ মাথা নাড়িয়ে বাড়ির ভিতরে ডেকে নিলেন পুলিশকর্মীদের। তারপরে জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওঁদের জন্য একটু চা করতে বলো মিনতিকে।”
বারান্দায় রাখা চেয়ারে এসে বসলেন দীনেন্দ্রবাবু এবং সমীরণ দত্ত। কনস্টেবলটি একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল।
কথা শুরু করলেন অফিসার, “প্রাথমিকভাবে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলে নিতে চাই। তারপরে সরকারিভাবে আপনার স্টেটমেন্ট নেওয়া হবে।”
দীনেন্দ্রবাবু তাকিয়ে রইলেন অফিসারের দিকে।
“ভদ্রলোক কী রকম ছিলেন? চরিত্রগতভাবে?”
দীনেন্দ্রবাবুর ভ্রূটা কুঁচকে উঠল। চারপাশটা একটু দেখে সামনে ঝুঁকে এলেন অফিসার দত্ত, “ভদ্রলোকের যৌনাঙ্গ এবং তলপেটটা ধারালো কোনও বস্তু দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে, ভয়ংকর রাগ মেটানো হয়েছে। আ কেস অব রিভেঞ্জ। যে কারণে জিজ্ঞেস করছি।”
দীনেন্দ্রবাবু একটু ভাবলেন। তারপরে বললেন, “আমি তো এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতাম। বোটানি। মাঝে মাঝে কলকাতায় যেতে হত কোনও কোনও সেমিনারে যোগ দিতে। সেইরকম একটা সেমিনারেই আলাপ হয়েছিল মজুমদারবাবুর সঙ্গে। উনিও প্রফেসর ছিলেন। আমি যতটা চিনি, যথেষ্ট সজ্জন। এখানে আসার পরে একা একাই থাকতেন। পণ্ডিত মানুষ। কারও সঙ্গে কোনও ঝামেলা ছিল না।”
“ওর পরিবারের কী খবর? কলকাতায় থাকে?”
একটু ইতস্তত করে জবাব দিলেন দীনেন্দ্র সিংহ, “শুনেছি, পরিবারের সঙ্গে খুব একটা বনিবনা নেই। বউ আর মেয়ে কলকাতাতেই থাকে। একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘জীবনের সব হিসেব মেলাতে পারিনি।’ বুঝেছিলাম, ভদ্রলোকের পারিবারিক জীবনে কোনও সমস্যা আছে। আমি আর ঘাঁটাইনি।”
“বাড়ির লোকের ঠিকানাটা আছে আপনার কাছে? ওদের খবর পাঠাতে হবে।”
“না, আমি আর ওইসব নিয়ে কখনও কোনও কথাই তুলিনি।”
অফিসার আনমনে মাথা নাড়লেন। তারপরে বললেন, “আপনার মেয়ে তো ওর কাছে পড়তে যেত?”
অফিসারের দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে দীনেন্দ্রবাবু খুব সংক্ষেপে জবাব দিলেন, “হ্যাঁ।”
অফিসার বলে উঠলেন, “উনি খুব পণ্ডিত মানুষ ছিলেন বোধহয়?”
“হ্যাঁ, মজুমদারবাবুর মতো পণ্ডিত মানুষ খুব কমই হয়। একটা সময় কলকাতার নামী এক কলেজের ইংরেজি প্রফেসর ছিলেন। আমি বুঝেছিলাম, মেয়ে ওর কাছে পড়লে উপকৃত হবে। তাই ওঁকে অনুরোধ করি মেয়েকে আলাদা করে পড়াতে। আমার অনুরোধে উনি রাজি হয়ে যান।”
“আচ্ছা, কাল কি পড়তে গিয়েছিল?”
দীনেন্দ্রবাবু একটু ভাবলেন। তারপরে বললেন, “সপ্তাহে তিন দিন যায় পড়তে। কাল গিয়েছিল কি না….।”
দীনেন্দ্রবাবুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে অফিসার বলে উঠলেন, “আপনার মেয়ের সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে? কিছু দেখেছে কি না, যদি জানা যেত।”
আবারও ইতস্তত করলেন দীনেন্দ্রবাবু, “ও তো ক্লাস এইটে পড়ে। বাচ্চা মেয়ে। এই কিছুক্ষণ আগে স্কুল থেকে ফিরল। ও কি কিছু বলতে পারবে?”
“অনেক সময় বাচ্চারা এমন কিছু দেখে ফেলে, যা বড়োরা পারে না। একটু ডাকুন না, মিনিট পাঁচেক কথা বলব। ভদ্রলোক তো আপনারও বন্ধু ছিল। যদি কিছু জানা যায়।”
দীনেন্দ্রবাবু ছেলেকে ডাক দিলেন, “জয়ন্ত, মালার খাওয়া হয়েছে?”
“হ্যাঁ, বাবা। মালা নিজের ঘরে আছে।”
“ঠিক আছে। ওকে একটু ডেকে আনো তো। এই ভদ্রলোক কয়েকটা প্রশ্ন করবেন।”
জয়ন্ত একটু দূরেই দাঁড়িয়েছিল। সে দ্রুত বোনের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
মিনিট পাঁচেক পরেই বোনকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল জয়ন্ত। বনমালার মুখটা পাংশু হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছে।
বাচ্চা মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে অফিসার একটু কিন্তু কিন্তু করে জানতে চাইলেন, “তুমি কি তোমার স্যারের ঘটনাটা কিছু শুনেছ?”
বনমালা কোনওমতে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, শুনেছে।
অফিসার আর দীনেন্দ্র সিংহ একবার পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নিলেন। অফিসার তারপরে হেসে বনমালাকে বললেন, “তুমি এই চেয়ারটায় বসো।”
বনমালা সামনের চেয়ারে এসে বসল।
“আমি জানি তুমি খুবই দুঃখ পেয়েছ, যেটা খুবই স্বাভাবিক।”
বনমালা হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখটা মুছে নিল। তার মনে ঝড় বইছে। স্বপ্নের কথাটা কি বলে দেবে? এখনও কাউকে কিছু বলেনি।
বনমালার মুখের অবস্থা দেখে দীনেন্দ্র সিংহ বলে উঠলেন, “এই অবস্থায় ও কি আর কিছু বলতে পারবে? দেখছেন তো বড়ো আঘাত পেয়েছে।”
অফিসার বুঝতে পারলেন, দীনেন্দ্র সিংহ ঠিকই বলছেন। মেয়েটা এই অবস্থায় হয়তো কিছু বলতে পারবে না। তবু একটা চেষ্টা করা যাক।
গলাটা নরম করে সমীরণ দত্ত জানতে চাইলেন, “কাল তুমি পড়তে গিয়েছিলে?”
বনমালা জবাব দিল, “হ্যাঁ গিয়েছিলাম। স্যারের কাছে তিন দিন যেতে হত আমাকে।”
“আচ্ছা, কতক্ষণ ছিলে?”
এবার যেন একটু দ্বিধায় পড়ে গেল বনমালা, “কতক্ষণ ছিলাম? আমি সন্ধ্যা সাতটার সময় পড়তে গেলাম। স্যার পড়াচ্ছিলেন।”
পাশ থেকে জয়ন্ত বলে উঠল, “মালা তো স্যারের কাছে ওই ঘণ্টা দেড়েক পড়ে। সাতটা থেকে সাড়ে আটটা। কাল রাতে ওই সাড়ে আটটার সময় ফিরেছে। আমি গেটে দাঁড়িয়েছিলাম।”
“আচ্ছা,” অফিসার আবার তাকালেন মালার দিকে, “স্যার কাল ঠিকমতো পড়িয়েছিলেন?”
বনমালা আবার একটু ভেবে বললেন, “হ্যাঁ, স্যার যেভাবে পড়ান, সেভাবেই পড়িয়েছিলেন। আমরা কাল মার্চেন্ট অব ভেনিস পড়ছিলাম।”
“তুমি যখন ছিলে, তখন কেউ এসেছিল? অন্য কোনও লোককে দেখেছিলে কাছেপিঠে?”
আবারও মাথা নাড়ল বনমালা, “না, আমি তো কাউকে দেখিনি, স্যারের ঘরে কেউ থাকে না।”
অফিসার সামান্য সময় চুপ করে থাকলেন। তারপরে বললেন, “আমি শুনেছি, মজুমদারবাবুর কাছে আরও কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী পড়তে আসত। তুমি তাদের কাউকে চেনো?”
এবার চটপট জবাব দিল বনমালা, “হ্যাঁ, একজনকে চিনি। আমার বন্ধু শতাব্দী। ও আসে পড়তে।”
“আচ্ছা। তোমরা একসঙ্গে পড়ো?”
“না, স্যারের কাছে আমি একা যেতাম। শতাব্দীরা একটা ব্যাচে পড়ত। ওর দাদা ওকে দিয়ে যেত, নিয়ে যেত।”
অফিসার পকেট থেকে একটা ছোটো নোটবুক বার করলেন, “কোথায় থাকে শতাব্দী? ওর ঠিকানাটা বলতে পারবে?”
“ওই কোপাইয়ের দিকটায়,” জবাব দিল জয়ন্ত। তারপরে ঠিকানাটা বলল। অফিসার নোট করে নিলেন।
“আচ্ছা, ঠিক আছে। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। ভালো করে পড়াশোনা করো,” বনমালাকে কথাটা বলে উঠে পড়লেন অফিসার। তারপরে দীনেন্দ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাকে একবার থানায় যেতে হতে পারে স্টেটমেন্ট দিতে। আর যদি ওদের পরিবারের তরফে কেউ যোগাযোগ করে, তাহলে জানাবেন।”
“নিশ্চয়ই।”
.
অফিসার বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। বোনের হাত ধরে আবার ঘরের দিকে হাঁটা দিল জয়ন্ত। বনমালার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “কী রে, খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলি পুলিশের সামনে?”
বনমালা মাথা দুলিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।
“সেটা স্বাভাবিক। যা সব হচ্ছে। যাক গে, তুই আর ওসব নিয়ে ভাবিস না বোন।”
বনমালা ঘাড় নাড়ল। জয়ন্ত একটু ইতস্তত করে বলল, “আচ্ছা, শতাব্দীর সঙ্গে তোর কোনও কথা হয়েছে? তুই আর শতাব্দী কখনও একসঙ্গে স্যারের কাছে পড়িসনি?”
“না, একসঙ্গে তো আমরা কখনও পড়িনি। তবে…।”
“তবে কী?”
“এই কয়েকদিন আগে আমি একটু তাড়াতাড়ি পড়তে চলে গিয়েছিলাম। তখনও শতাব্দীদের ব্যাচটা পড়ছিল। আমি বারান্দায় বসেছিলাম। ওই সময় শতাব্দীর দাদা এসেছিল সাইকেল নিয়ে।”
“ও! আচ্ছা,” একটু গম্ভীর হয়ে গেল জয়ন্তর গলা, “শতাব্দীর দাদার সঙ্গে তোর কোনও কথা হয়েছিল?”
“না, না,” সবেগে মাথা নাড়ল বনমালা, “ওর দাদা খুব গম্ভীর। আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায় না। আমার তো বেশ ভয় লাগে।”
জয়ন্ত কোনও জবাব দিল না। বনমালা ঘরে ঢুকে আবার শুয়ে পড়ল। স্বপ্নের কথাটা কাউকে সে বলতে পারল না।
.
দিন দুয়েক পরে বোলপুর সাব-ডিভিশন হাসপাতালের ডাক্তারবাবুর ঘরে বসেছিলেন সমীরণ বাবু। পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টটা পেয়ে গিয়েছেন তিনি।
“মৃত্যুর সময়টা কখন আন্দাজ করতে পারছেন?”
“আমরা পেটের ভিতরে খাদ্যাংশ দেখে মৃত্যুর সময়টা আন্দাজ করি। খাবার হজম হতে লাগে মোটামুটি চার ঘণ্টা। পেটে কতটা পরিমাণে খাবার আছে সেই দেখে একটা মোটামুটি সময় বলা যায় মৃত্যুর।” ব্যাখ্যা করতে লাগলেন ডক্টর অমর চৌধুরী। “এখানে মৃতের পেটে কোনও খাদ্যাংশ পাওয়া যায়নি। রাত দশটায় যদি ডিনার করে, তাহলেও সব হজম হয়ে যাবে। ধরে নিচ্ছি, ডিনার করেই ভদ্রলোক শুতে গিয়েছিলেন। চার ঘণ্টা বাদ দিলে দাঁড়ায় রাত দুটো। তার আগে খুন হলে খাদ্যাংশ পাওয়া যেত পেটে। শরীর আর খাবার হজম করত না। তাহলে ধরে নিতে হবে দুটোর পরে খুন করা হয়েছে।”
সমীরণবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “ব্যাপারটা সেরকম নাও হতে পারে। ভদ্রলোক সম্ভবত রাতের খাবারটা খাননি। আমরা ফ্রিজে খাবার পেয়েছি, সেদিন ওই রান্নার ভদ্রমহিলা যে রান্নাটা করে গিয়েছিল। দুপুরের রান্না করা খাবারই রাতে গরম করে খেয়ে নিতেন চঞ্চল মজুমদার।”
“ও, তাহলে তো সমস্যা হয়ে গেল। মৃত্যুর সময় এগিয়ে যেতে পারে। রাইগর মর্টিসও পুরো সেট-ইন করে গিয়েছিল।”
“তবে মৃত্যুর সময় ভদ্রলোক হুইস্কি খাচ্ছিলেন, সেটা বোঝা গিয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, কখন খাচ্ছিলেন?”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপরে পুলিশ অফিসার বললেন, “রাত সাড়ে আটটার সময়ও উনি বেঁচে ছিলেন।”
“কী করে বুঝলেন?”
“ভদ্রলোক পাশের বাড়ির একটা বাচ্চা মেয়েকে পড়ান। ক্লাস এইটের স্টুডেন্ট। সেই মেয়েটা খুনের দিন রাতে পড়তে গিয়েছিল। সাড়ে আটটা নাগাদ ফিরে আসে বাড়িতে।”
“মেয়েটা কিছু দেখেনি?” উৎসুক হয়ে উঠলেন অমরবাবু।
“না, তবে খুব ঘাবড়ে গিয়েছে। ঠিক পরিষ্কার করে বলতে পারছিল না।”
“সেটা খুব স্বাভাবিক। টিচারের ওরকম নৃশংস মৃত্যু হয়েছে। বাড়িতে পুলিশ এসে কথা বলছে, ঘাবড়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। বড়োরাই ঘাবড়ে যেত। এক্ষেত্রে ঘাবড়ে না গেলেই অবাক হওয়ার ব্যাপার ঘটত।”
অফিসারও সায় দিলেন, “হ্যাঁ, ঠিকই। যাই হোক, পরে আর একবার মেয়েটার সঙ্গে কথা বলব। দেখা যাক, নতুন কিছু পাওয়া যায় কি না। আরও কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী আছে। একদফা কথা হয়েছে। প্রয়োজনে আবার বলব। দেখা যাক, কী হয়।”
অফিসার উঠে পড়লেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, “টক্সিকোলজিস্টের কাছ থেকে রিপোর্টটা আগামীকালই আশা করছি। সেরকম হলে আপনার সঙ্গে একবার কথা বলে নেব। পিএম রিপোর্টটা নিয়েও ডিটেলে কথা বলে নেব একবার।”
“স্বচ্ছন্দে।”
.
পরের দিন দুপুর একটা নাগাদ আবার ডাক্তারের কাছে চলে এলেন অফিসার। হাতে একটা খাম।
“টক্সিকোলজিস্টের রিপোর্টটা এসে গিয়েছে। একবার দেখুন তো। শরীরে একটা বিশেষ পদার্থ পাওয়া গিয়েছে।”
ডাক্তার হাত বাড়িয়ে রিপোর্টটা নিলেন। ভ্রূ কুঁচকে পড়তে থাকলেন রিপোর্টটা। পড়া শেষ করে অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন অফিসারের দিকে, “শরীরে তো গ্লাইকোসাইডসের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। কার্ডেনোলাইড ওলিয়েন্ড্রিন পাওয়া গিয়েছে। ওলিটেন্ড্রিন, ডিজিটক্সিজেনিন, নেরিন, ফলিনেরিনের চিহ্ন রয়েছে।”
“সহজ ভাষায় বলুন একটু। বিষ খাওয়ানো হয়েছিল কি? আর হলে ঠিক কী ধরনের বিষ?”
টেবলের উপরে রিপোর্টটা নামিয়ে রাখলেন অমর চৌধুরী। তারপরে বললেন, “এই কম্পোনেন্টগুলো অবশ্যই বিষাক্ত। বিশেষ করে কার্ডেনোলাইড ওলিয়েন্ড্রিন। বেশিমাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলে বমি হতে পারে, বুকে ব্যথা হতে পারে, একটা আচ্ছন্ন ভাব আসতে পারে। মাথা ঘোরাতে পারে, শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এমনকী, ঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে বা বেশ কয়েক দিন ধরে এই বিষ শরীরে প্রবেশ করলে মৃত্যুও হতে পারে।”
“তাই নাকি?” উত্তেজিত হয়ে উঠলেন অফিসার। “আমার সন্দেহ হচ্ছিল, বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। তা বিষটা কী, একটু সহজ ভাষায় বলুন না। জোগাড় করা কি খুব কঠিন?”
ডাক্তার ধীরে ধীরে চশমটা খুলে হাতে নিলেন। তার পরে কাচটা মুছে তাকালেন অফিসারের দিকে, “না, জোগাড় করা একেবারেই কঠিন নয়। যে পদার্থগুলো বললাম, তা পাওয়া যায় একটা বিশেষ গাছের ফুল, পাতা, ডাল, শিকড়ে। গাছটার নাম নেরিয়াম ওলিয়েন্ডার।”
অফিসার এবারও বুঝতে পারলেন না।
ডাক্তার স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “এটা একটা ফুল গাছ। শান্তিনিকেতনে পাওয়া কোনও কঠিন ব্যাপারই নয়। আমার বাগানেও এই গাছ আছে।”
অবাক হয়ে গেলেন অফিসার, “আপনার বাগানেও আছে? কিন্তু আমি তো এর নামই শুনিনি।”
ডাক্তার সামান্য হাসলেন, “অবশ্যই শুনেছেন। সাধারণ মানুষ এই গাছকে অন্য নামে চেনে।” একটু থামলেন ডাক্তারবাবু। তারপরে ধীরে ধীরে বললেন-
“ওলিয়েন্ডার মানে করবী গাছ। এই গ্রুপের একটা গাছের নাম তো আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে। রক্তকরবী!”
ডাক্তার অমর চৌধুরীর দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সমীরণ দত্ত!
