প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ৩.৫

শান্তিনিকেতন, ২০২১

মাথা নীচু করে বসে আছে জয়ন্ত। তার শরীরের কাঁপুনি দেখে মনে হচ্ছে, ছেলেটা কান্না চাপার প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছে।

পাথরের মতো বসে রয়েছেন দীনেন্দ্র সিংহ। যেন শরীরে প্রাণ নেই। হঠাৎ জেগে উঠলেন তিনি। খাট থেকে ধীরে ধীরে উঠতে যাচ্ছিলেন, কঠোর গলায় কমলেশ বলে উঠলেন, “আপনি বসুন। আপনাকে শুনতে হবে জয়ন্তর কথাগুলো।”

রোবটের মতো ফের ধুপ করে বিছানায় বসে পড়ল অত বড়ো মানুষটা। নিজের উপরে যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন দীনেন্দ্র সিংহ।

জয়ন্তর দিকে ফিরলেন কমলেশ, “আমি জানি, তোমার মনে অনেক কথা জমে আছে। সেই ছোটোবেলা থেকে অনেক বিষ বুকে নিয়ে তুমি নীলকণ্ঠ হয়ে আছ। আজ সেই বিষ উগড়ে দেওয়ার সময় হয়েছে। বলে ফেলো সব কিছু। হালকা করো নিজেকে। এই পাপের বোঝা শুধু তোমার একার নয়, আমাদের সকলের। সমাজ, পুলিশ, অভিভাবক, সাধারণ মানুষ— সবার।”

জয়ন্তর কাঁধে হাতটা রাখলেন কমলেশ। অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকো জয়ন্ত। তুমি অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট দিচ্ছ না। কেউ তোমার কথা রেকর্ড করছে না। তুমি যা বলবে, তা এই ঘরের বাইরে যাবে না।”

আরক্ত দুটো চোখ তুলে তাকাল জয়ন্ত। তারপরে বলা শুরু করল সাত বছর আগের এক কাহিনি। যখন জয়ন্তর বয়স সতেরো আর বনমালার বয়স চোদ্দো…

.

যে রাতে প্রথম দৃশ্যটা দেখেছিল জয়ন্ত, রাগে-দুঃখে-ঘেন্নায় কাঁপতে শুরু করেছিল সে।

তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। কলেজ থেকে বাড়িতে ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছে সেদিন। না হলে বনমালার সঙ্গেই চঞ্চল স্যারের বাড়িতে যেতে পারত। এসে দেখে মালা যথারীতি চলে গিয়েছে পড়তে।

স্যারের কাছে তারও একটু যাওয়া প্রয়োজন। ইংরেজিতে একটু সাহায্য লাগবে। বাবার বন্ধু, বনমালার শিক্ষক। জয়ন্ত নিশ্চিত ছিল, স্যার তাকে সাহায্য করবেন। সে আগেও কথা বলে দেখেছে। মানুষটা বড্ড ভালো। বলে রেখেছেন কোনও দরকারে সোজা চলে আসতে।

চঞ্চল মজুমদারের বাড়ির বড়ো গেটটা খোলাই ছিল। সেই রাস্তা দিয়ে একটু হেঁটে বারান্দা। বারান্দার গেটটাও খোলা। বারান্দায় বনমালার চটি। জয়ন্ত জানে সামনে বড়ো ঘরটায় মালাকে পড়ান স্যার। ঘরের দরজাটা বন্ধ। কিন্তু জানলাটা খোলা।

জয়ন্ত এগিয়ে গেল দরজায় ধাক্কা দেবে বলে। আর তখনই কানে এল একটা অদ্ভুত আওয়াজ। চাপা স্বরে কে যেন আওয়াজ করছে। অদ্ভুত একটা শব্দ।

অবাক হয়ে গেল জয়ন্ত। ঘরের দরজায় ধাক্কা না দিয়ে সে গিয়ে দাঁড়াল জানলার সামনে। উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করল কী হচ্ছে ভিতরে। জানলার পর্দাটা হাওয়ায় মাঝে মাঝেই উড়ছে তাই দেখতে অসুবিধে হল না জয়ন্তর।

সোফার উপরে বসে আছেন চঞ্চল স্যার। বনমালাকে কোলে নিয়ে!

আর স্যারের হাত দুটো খেলা করছে তার বোনের বুকে। স্যারের শরীরটা ধীরে ধীরে উঠছে আর নামছে। সেই সঙ্গে বনমালার শরীরও। চঞ্চল স্যারের মুখ দিয়ে একটা জান্তব গোঙানি বেরিয়ে আসছে। নরকের একটা কীট যেন আদিম তৃপ্তি লাভ করছে।।

বনমালার মুখটা ঝুঁকে পড়েছে নিজের বুকের উপরে। চুলগুলো নেমে এসেছে কাঁধ বেয়ে। প্রায় নিথর হয়ে রয়েছে মেয়েটার ছোট্ট শরীর।

জয়ন্তর আর সহ্য করার ক্ষমতা রইল না। কাঁপতে কাঁপতে সে ফিরে এল বাড়িতে।

কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না জয়ন্ত। বাবাকে বলবে? কিন্তু কী বলবে? যা দেখেছে, তা নিজের মুখে বলবে কী করে? আর বলেই বা কী হবে? বাবা তো মদের বোতলেই ডুবে থাকেন। মালাকেও সহ্য করতে পারেন না। বললে হয়তো মালাকেই মারতে উঠবেন। নিজের বন্ধুকে কিছুই বলবেন না। জয়ন্ত জানে, বাবা এই ঘটনা কিছুতেই কাউকে জানাবেন না। তাহলে যে তাঁর আত্মসম্মান নষ্ট হয়ে যাবে।

পাগল হয়ে যাচ্ছিল জয়ন্ত।

ঘণ্টাখানেক পরে বনমালা যখন ফিরে এসেছিল, বোনের মুখের দিকে তাকাতে পারেনি সে। কিন্তু একটু অবাক হয়ে গেল বোনের কোনও ভাবান্তর না দেখে। এত বড়ো একটা ঘটনার কোনও চিহ্ন নেই মেয়েটার মুখে। কিছুই যেন জানে না বনমালা।

.

দু-দিন ধরে আগুনে পুড়তে হয়েছে জয়ন্তকে। মাঝে দু-একবার চঞ্চল স্যারের প্রসঙ্গ বনমালার সামনে তুলেছিল জয়ন্ত। কিন্তু মেয়েটা একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছে। যেমন, স্যার খুব ভালো পড়ান। সে ইংরেজিতে এবার ভালো নম্বর পাবে, এইসব। জয়ন্ত বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে। সে কি তাহলে ভুল দেখেছে?

জয়ন্ত ঠিক করল, আর একটা দিন দেখবে সে। তারপরে যা করার করবে।

দু-দিন পরে আবার সন্ধ্যাবেলা চঞ্চল স্যারের বাড়িতে পড়তে গেল বনমালা।

আধঘণ্টা পরে অতি সন্তর্পণে চঞ্চল মজুমদারের বাড়িতে গিয়ে হাজির হল জয়ন্ত। আবার এসে দাঁড়াল জানলার সামনে। ধীরে ধীরে পর্দার ফাঁক দিয়ে উকি দিতে চেষ্টা করল ভিতরে।

সোফায় বসে মদের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন চঞ্চল স্যার। পাশে মদের বোতল। চঞ্চল স্যারের একটা হাত মালার কাঁধে। গ্লাস ফাঁকা করে চঞ্চল স্যার কোলের কাছে টেনে নিলেন মালাকে। তারপরে বোতল থেকে আবার গ্লাস ভর্তি করে নিলেন। চুমুক দিলেন গ্লাসে। মালা তখন চঞ্চল স্যারের কোলে মুখ গুঁজে রয়েছে।

জয়ন্ত সরে এল জানলার পাশ থেকে। তার মনে একটা সাংঘাতিক ঝড় উঠেছে। মালা এ সব কী করছে! তাহলে কি তার বোন স্বেচ্ছায় এই জঘন্য কাজে শামিল হয়েছে? ভাবতে পারছিল না জয়ন্ত। সে ধীরে ধীরে বসে পড়ল বারান্দায়।

কতক্ষণ যে কেটে গিয়েছিল জয়ন্ত বলতে পারবে না। হঠাৎ ঘরের ভিতর থেকে একটা গোঙানির শব্দ ভেসে আসতে লাগল। এই শব্দটা আগের দিনের মতো নয়। এবার যেন যন্ত্রণা পেয়ে কেউ গোঙাচ্ছে।

দ্রুত জানলার ফাঁকে চোখ রাখল জয়ন্ত।

চঞ্চল স্যারের শরীরটা সোফা থেকে গড়িয়ে পড়েছে মেঝেয়। বমি করছে স্যার। তারপরে আচ্ছন্নের মতো মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ল। মুখ থেকে একটা গোঙানির মতো আওয়াজ বেরোচ্ছে।

এতক্ষণে বনমালার উপরে নজর গেল জয়ন্তর। মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়েছে। টেবলে রাখা স্কুলব্যাগটা হাতড়াচ্ছে। তারপরে বার করে আনল একটা বড়ো কাঁচি। দুটো ফলা জোড়া। সেই কাঁচিটা হাতে নিয়ে ঝুঁকে পড়ল চঞ্চল মজুমদারের শরীরের উপরে। হাঁটু গেড়ে বসল সামনে।

দু-হাত উঁচুতে তুলল বনমালা। তারপরে কাঁচি সমেত হাত বারবার এসে আঘাত করতে লাগল চঞ্চল মজুমদারের তলপেটে। আঘাত করতে করতে বিকৃত সুরে বনমালা তখন বলছে, “তোর পাপের শাস্তি আমি দিলাম, তোর পাপের শাস্তি আমি দিলাম।”

আগের দিনের দৃশ্যটা সহ্য করতে পারেনি জয়ন্ত। এই দিনের দৃশ্যটা তো আরওই পারল না। কোনওমতে সে পালিয়ে এল নিজের বাড়িতে।

তারপরে নজর রাখছিল গেটের দিকে। কখন বাড়িতে ফেরে বনমালা। মিনিট দশেক পরেই ফিরে এল বোন। ব্যাগটা তার জামার সামনে ধরা। কীরকম যেন একটা যান্ত্রিক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে মেয়েটা। মুখটা নামানো, খোলা চুল কাঁধের দু-পাশে ঝুলছে। তাদের বাড়ি এমনিতেই ফাঁকা। বাবা নিজের ঘরে, মিনতি মাসি রান্না করছে। ওই অবস্থায় তাই কেউ দেখল না বনমালাকে। সোজা নিজের ঘরে ঢুকে গেল সে।

মিনিট দশেক পরে মিনতি মাসি নীচ থেকে ডাক দিলেন, “মালা, ফিরলে নাকি? চট করে খেয়ে যাও।”

“যাই মাসি,” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল বনমালা। সুস্থ স্বাভাবিক একটা মেয়ে। আধঘণ্টা আগে যে ভয়ংকর কাণ্ডটা করে এসেছে, তার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই মেয়েটার চেহারায়। জয়ন্ত খেয়াল করে দেখল, মালা পোশাকটাও বদলে ফেলেছে।

বোন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই জয়ন্ত ঢুকল বনমালার ঘরে। দ্রুত পড়ার ব্যাগটা হাতড়াল। একটা খাপে দুটো বই রাখা আর পেন্সিল বক্স। অন্য খাপটায় রক্তমাখা কাঁচি। আর একটা কাচের বোতল। দুটো জিনিসই বার করে নিল সে। জামাটা কোথায়? তারপরেই চোখ পড়ল ঘরের সঙ্গে লাগানো বাথরুমে। জামাটা ভালো করে ধুয়ে রেখে দিয়েছে মালা। যদিও ভালো করে দেখলে বাথরুমে এবং পোশাকে হালকা রক্তের ছিটে দেখা যাবে। কিন্তু কে আর ভালো করে দেখবে?

দুটো জিনিস নিয়ে দ্রুত নিজের ঘরে চলে এল জয়ন্ত। কাঁচিটা ভালো করে ধুয়ে মায়ের জিনিসের সঙ্গে স্টোররুমে রেখে দিল। কাঁচিটা যে মায়ের, সেটা বুঝতে সমস্যা হয়নি জয়ন্তর। শিশির তরল পদার্থটা সে বাথরুমে ঢেলে দিল। তারপরে আবার মালার ঘরে ফিরে ব্যাগের খাপ থেকে রক্তটা মুছে ফেলল।

সেই রাতে আর খেতে পারেনি জয়ন্ত। তার শরীর ভীষণভাবে গুলিয়ে উঠছিল। ভয়ংকর সেই দৃশ্যটা কিছুতেই মুছে ফেলতে পারছিল না সে। তবে একটা জিনিস জয়ন্ত বুঝেছিল। বনমালা নিজের ইচ্ছেয় ওই জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়নি। বরং সে প্রতিশোধ নিয়েছে।

তার ছোট্ট বোনটা যে এ রকম দুঃসাহস দেখাতে পারে, কোনওদিন ভাবেনি জয়ন্ত। কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার বিদ্ধ করছিল জয়ন্তকে। এইরকম একটা কাণ্ড ঘটানোর পরে কীভাবে এত শান্ত, স্বাভাবিক আছে বনমালা? কিছুই বুঝতে পারছে না জয়ন্ত। কিন্তু একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে। যে করে হোক বোনকে বাঁচাতেই হবে।

রাতে ঘুম আসার প্রশ্নই ছিল না। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল। তখনই পাশের ঘর থেকে বোনের ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজটা জয়ন্তর কানে এল। ধীরে ধীরে বোনের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল জয়ন্ত। তারপরে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।

বোনের ঘরে হালকা নীল আলোটা জ্বলছে। সেই আলোয় বিছানায় বোনের গুটিশুটি মারা শরীরটা দেখতে সমস্যা হল না জয়ন্তর। বোনের যন্ত্রণা সে আর সহ্য করতে পারল না। এগিয়ে এসে বোনের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “কী রে বোন, কষ্ট হচ্ছে? ভয় লাগছে?”

বনমালা আরও জোরে ফুঁপিয়ে উঠল। জয়ন্ত তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “আওয়াজ করিস না বোন। বাবা জেগে যাবে। আমি আজ রাতে তোর পাশে শুচ্ছি। তুই ভয় পাস না।”

জয়ন্ত এসে শুয়ে পড়ল বোনের পাশে। বোনের মতোই গুটিশুটি মেরে। তার আবছা মনে পড়ে যাচ্ছে অনেক বছর আগেকার একটা দিনের কথা। যখন মা বেঁচে ছিল। মা তাকে বলেছিল, “তুই বনুর খেয়াল রাখবি, রাখবি তো বাবা?

ছোট্ট জয়ন্ত কী জবাব দিয়েছিল, তা এখনও মনে আছে বড়ো জয়ন্তর।

কোনওমতে নিজের কান্না সংবরণ করল জয়ন্ত। তারপরে বোনের মতো করেই শুয়ে রইল। দুজনেরই হাঁটুটা মোড়া বুকের কাছে। মাথাটা ঝুঁকে এসে ঠেকেছে হাঁটু দুটোয়। ঠিক যেমন করে মায়ের গর্ভে ন-মাস ধরে বেড়ে ওঠে শিশুরা…

.

…..জয়ন্ত চুপ করল। মিনিটখানেক কেউ কোনও কথা বলল না। কথা বলার মতো অবস্থাতেও ছিল না কেউ। কমলেশ রায়ের মতো পোড়খাওয়া মানুষও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছেন।

.

তারপরে মুখ খুললেন কমলেশই।

“আর ঈপ্সিতার কেসটা কী হল?”

জয়ন্ত জবাব দিল, “ঈপ্সিতার ঘটনাটা আমি চোখে দেখিনি। মালাকে আনার জন্য মহিলা আমাকে দেরি করে যেতে বলছিলেন। কয়েকদিন হল তাই দেরিতে যাচ্ছিলাম। একজন মহিলা মালার কোনও ক্ষতি করতে পারে, কল্পনাও করিনি। পরে শুনেছি, ওই সময় বাড়িতে একাই থাকতেন তিনি।” একটু চুপ করে থেকে ফের বলা শুরু করল জয়ন্ত, “এক রাতে বোনকে আনতে গিয়ে চমকে উঠেছিলাম। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল বোন। লম্বা চুলে মুখ ঢেকে গিয়েছে। আমাকে যেন চিনতেই পারল না।”

শর্মিষ্ঠা আর কমলেশ তাকিয়ে রইলেন জয়ন্তর মুখের দিকে। দীনেন্দ্র সিংহের শরীরে যেন কোনও সাড় নেই। জয়ন্ত বলে চলল-

“আমার তখনই মনে হচ্ছিল, কিছু একটা অঘটন ঘটেছে। কিন্তু ঈন্সিতা ম্যাডামের ঘরে যাওয়ার সাহস ছিল না আমার। এর মধ্যে আবার হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল বোন…”

.

ছুটে গিয়ে বোনকে মাটি থেকে টেনে তুলল জয়ন্ত। কয়েকবার মাথা ঝাঁকানি দিল বনমালা। তার শরীরটা কাঁপছে। তারপরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। দাদার মুখের দিকে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে রে দাদা? আমি মাটিতে বসে কেন? পায়ে ব্যথা করছে।”

জয়ন্ত তাড়াতাড়ি টেনে তুলল বোনকে, “কিছু হয়নি। তুই পড়ে গিয়েছিলি। তাড়াতাড়ি বাড়ি চল, ওষুধ দিতে হবে।”

বনমালা যেন খেই হারিয়ে ফেলেছিল। একটু আনমনে বলল, “আমার কি নাচ শেখা হয়ে গিয়েছে? ম্যাম আমাকে একটা কাজ দিয়েছিল। কী কাজ, মনে করতে পারছি না।”

জয়ন্ত আর দেরি করল না। বোনকে টেনে সাইকেলের কেরিয়ারে বসিয়ে দ্রুত প্যাডেল করা শুরু করল।

বাড়িতে ফিরে একটা দৃশ্য দেখে তার হাড়হিম হয়ে গেল। অন্ধকারে বুঝতে পারেনি। কিন্তু এখন ভালো করে দেখতেই ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে। বনমালার লাল রঙের সালওয়ারে লেগে রয়েছে রক্তের ছিটে।

সে বোনকে নির্দেশ দিল, “যা পোশাকটা বদলে আয়, দেরি করিস না। আর ব্যাগটা আমাকে দে।” মালার ব্যাগটা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যায় জয়ন্ত। যা আশঙ্কা করেছিল সেটাই। ব্যাগের মধ্যে রয়েছে সেই রক্তমাখা কাঁচি আর একটা কাচের বোতল। দুটোই সরিয়ে নিল সে। মালা যখন নীচে গিয়েছে, রক্তলাগা সালোয়ারটা নিয়ে বাথরুমে ধুয়ে দিল ভালো করে। বোনের চোখে সম্ভবত রক্তের দাগগুলো পড়েনি। তারপরে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল নিজের ঘরে।

জয়ন্ত বুঝতে পারছিল এই আতঙ্ক বুকে নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে তাকে। এ যেন এক দ্বৈত বনমালা। একদিকে অত্যাচারিত হচ্ছে, আর একদিকে খুন করছে! ঈপ্সিতাকে খুন করার কারণটা অবশ্য এতদিন পরিষ্কার ছিল না জয়ন্তের কাছে। আন্দাজ করে নিয়েছিল।

পরে বনমালার দ্বিতীয় রূপ একবার সে দেখে ফেলেছিল। যখন পাগলের মতো স্কুলব্যাগে কাঁচিটা খুঁজছিল বনমালা। কিন্তু সে তো বনমালা ছিল না!

এই ভয়ংকর সত্য কারও সামনে সে কখনও বলতে পারবে না। বললেই বোনকে চিরতরে হারাবে সে। সেটা হতে দেবে না জয়ন্ত।

পরের দিন কাঁচি আর বোতলটা কোপাইয়ের জলে বিসর্জন দিয়ে এল বনমালার দাদা…।

.

আবার নীরবতা। কমলেশই ফের নীরবতা ভাঙলেন, “তারপরে আর কিছুই ঘটেনি?”

না। কী ভয়ংকর আতঙ্কে তখন দিন কাটত আপনি ভাবতেও পারবেন না। তার মধ্যে আবার ওই স্বপ্নটা দেখা শুরু করে মালা। আমি প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কী করব।” দম নেওয়ার জন্য একটু থামল জয়ন্ত। তারপরে বলতে থাকল—

“মালাকে সবসময় চোখে চোখে রাখতাম। ওই দুটো ঘটনার পরে অবশ্য বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ওর। তারপরে তো পুলিশ ওই লোকটাকে খুনি বলে চিহ্নিত করল। ব্যাপারটাও ধীরে ধীরে থিতিয়ে এল।”

“কিন্তু সাত বছর পরে আবার একটা খুন। এবার প্রবীর সেন। তাই তো?”

“হ্যাঁ, প্রবীর সেনের বাড়িতে বনমালা গিয়েছিল জেনেই আমার ভয় করছিল। আবার না জানি কী হয়। ঠিক সেটাই হল। আর এবার আরও ভয়ংকর ব্যাপার হল। বনমালাকে খুঁজতে পুলিশ চলে এল আমাদের বাড়িতে।”

টানা কথা বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিল জয়ন্ত। একটু দম নেওয়ার জন্য থামল সে। তারপরে বলল, “বুঝতে পারলাম, এবার মালা বাঁচতে পারবে না। ছোটোবেলায় পুলিশের নজর পড়েনি, তাই কিছু হয়নি। কিন্তু পুলিশ এবার ঠিক হত্যাকারীকে খুঁজে বার করবে। মালা তো আর নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করেনি।”

“তখনই ঠিক করলে বোনের খুনগুলোর দায় নিজের মাথায় নেবে?” ব্যথিত গলায় প্রশ্ন করলেন কমলেশ।

“সেটা ছাড়া মালাকে বাঁচানোর কোনও রাস্তা ছিল না। এও জানতাম, শুধু গুন করেছি বললেই পুলিশ মেনে নেবে না। পুলিশের হাতে এমন প্রমাণ তুলে দিতে হবে, যাতে ওরা আমাকেই খুনি ভাবে।”

আড়চোখে একবার শর্মিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে ফের প্রশ্ন করলেন কমলেশ-

“আর তাই সজলকে টার্গেট হিসেবে বেছে নিলে?”

“হ্যাঁ, জানতাম ছেলেটা ভালো নয়। মালার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। আর তখন মালাই ওকে মেরে দেবে। পুলিশের ফাঁদেও পড়ে যাবে। তাই সজলকেই সরিয়ে দেব ঠিক করি।”

একটু আনমনা হয়ে পড়ল জয়ন্ত। তারপরে বলল, “সজলকে লোভ দেখিয়ে নদীর পাড়ে ডেকে আনি। তারপরে কী হয়েছে, আপনারা জানেন। যেরকম চেয়েছিলাম, সেরকমই হল। পুলিশের নজরটা পুরো আমার উপরে নিয়ে এলাম। আমার কথা মেনে নেওয়া ছাড়া রাস্তা ছিল না পুলিশের সামনে। সাত বছর আগের ওই খুন দুটোর আর কোনও ব্লু-তো ওদের কাছে ছিল না।”

“ওই খুন দুটোর জন্য তো হত্যাকারী বলে একজনকে পুলিশ মেরে দিয়েছিল। তারপরেও কেন…”

কমলেশকে কথা শেষ করতে দিল না জয়ন্ত, “দুটো কারণ। জানতাম, দুটো খুন করলেও যা শাস্তি পাব, চারটে খুন করলেও তাই। আর আমি চেয়েছিলাম ভণ্ড পুলিশের মুখোশটাও যেন খুলে যায়। একটা নিরপরাধ লোককে মেরে পুলিশ যেন বেঁচে না যায়।”

থামল জয়ন্ত। তারপরে কমলেশদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরও একটা ব্যাপার। চারটে খুন মানে আমাকে সিরিয়াল কিলার হিসেবে প্রতিপন্ন করতে পুলিশের সমস্যা হবে না। কেস দাঁড়িয়ে যাবে। মোটিভ নিয়েও সমস্যা হবে না। পাগল খুনির আবার মোটিভ কী! বনমালার নাম আর কোনওদিন সামনে আসবে না। কিন্তু আপনি সব গন্ডগোল করে দিলেন।”

কমলেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। তারপরে জয়ন্তর কাঁধে হাত রেখে দৃঢ় স্বরে বললেন, “তুমি যে আত্মত্যাগটা করলে, তা বৃথা যাবে না। কিন্তু সত্যটা সামনে আসা দরকার। অন্তত কয়েকজনের সামনে।”

স্থির হয়ে বসে থাকা শর্মিষ্ঠা আর দীনেন্দ্র সিংহের দিকে তাকিয়ে কমলেশ বললেন, “এবার আমি আপনাদের একটি নির্যাতিতা মেয়ের কাহিনি বলব। বনমালা সিংহের কাহিনি।”

চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন কমলেশ রায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *