৩
শান্তিনিকেতন, ২০১৪
ভয়ংকর স্বপ্নটা তার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। অনেক চেষ্টা করে বিছানায় উঠে বসেছে মেয়েটা। তারপরে আবার শুয়ে পড়ল খাটে।
গুটিশুটি মেরে শুয়ে শুয়ে ফোঁপাতে লাগল বনমালা। বাচ্চাটার মনে হচ্ছিল দমবন্ধ হয়ে যাবে। হা করে কয়েকবার নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল সে। কিন্তু শ্বাসনালীটা কে যেন চেপে ধরেছে। অতল কালো জলে সে যেন তলিয়ে যাচ্ছিল। কিছুতেই ভেসে থাকতে পারছিল না।
ঠিক ওই সময়ই একটা হাত এসে পড়ল বাচ্চাটার মাথায়। কোমল গলায় জয়ন্ত বলল, “কী হয়েছে বোন? ভয় করছে? কষ্ট হচ্ছে?”
বনমালা ছিটকে সোজা হয়ে বসল। তারপরে দু-হাতে দাদাকে জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে লাগল, “ভীষণ ভয় করছে আমার। আমি আর পারছি না।”
ধীরে ধীরে বোনের মাথায় হাত বোলাতে লাগল জয়ন্ত। “কী হয়েছে রে বোন? আমাকে সব কিছু খুলে বল। তোর ভয়ের কিছু নেই। আমি তো আছি। তোর যে কোনও বিপদে বুক দিয়ে আগলে রাখব। কেউ তোর ক্ষতি করতে পারবে না।”
ধীরে ধীরে একটু শান্ত হল বনমালা। তারপরে বলল, “দাদা, আমি আবার সেই ভয়ংকর স্বপ্নটা দেখেছি। তারপরেই ঘুমটা ভেঙে গেল।”
“কোন স্বপ্ন?” একটু অবাকই হল জয়ন্ত। স্বপ্নের কথা কী বলছে মালা!
বনমালা বুঝতে পারল, দাদা কেন বিভ্রান্ত হচ্ছে। আগের স্বপ্নের কথা তো সে দাদাকে কিছুই বলেনি। ভুলে যেতে চেয়েছিল সেই ভয়ংকর স্বপ্ন। তাই কারও কাছে মুখ খোলেনি। মনের মধ্যে পুষে রেখে দিয়েছিল সেই রাতটার কথা।
রাতের পর রাত ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছিল সে। ভাবছিল, আবার না স্বপ্নটা দেখে। বন্ধুদেরও কিছু বলেনি। কে বিশ্বাস করবে তার কথা! কিন্তু এখন তো বলতেই হবে।
“দাদা, আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি একটু আগে। ভয়ংকর একটা স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে দেখলাম, একজন খুন হচ্ছে। এর আগেও একদিন এই ধরনের স্বপ্ন দেখেছিলাম।”
ভীষণ চমকে উঠল জয়ন্ত, “কী বলছিস তুই। কাকে খুন হতে দেখেছিস?”
হেঁচকি তোলার মতো আওয়াজ করল বনমালা। তারপরে থেমে থেমে বলল, “আমাদের ডান্স টিচারকে। ঈপ্সিতা মিস।”
সাদা হয়ে গেল জয়ন্তর মুখটা। তারপরে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল, “আগের স্বপ্নটা কী ছিল? ঈপ্সিতা মিসকেই তখন দেখেছিলিস?”
“না, অন্য একজনকে। তবে প্রায় একই রকম স্বপ্ন। একই ভাবে একজনকে খুন হতে দেখেছিলাম। লোকটার পেট ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে।” দাদার বুকে মুখ গুঁজে বলতে লাগল বনমালা, “লোকটা ছিল মজুমদার স্যার।”
আবার কেঁপে উঠল জয়ন্ত। একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে তার শিরা- উপশিরায়। এ সব কী বলছে মালা? স্বপ্ন দেখেছে মানে! সব কিছু যেন অবিশ্বাস্য ঠেকছে জয়ন্তর কাছে।
কয়েক মিনিট কোনও কথাই বলতে পারল না সে। ভাই-বোন যেন ছবির ফ্রেমে আটকে গিয়েছিল বেশ কয়েকটা সেকেন্ড। তারপরে ধীরে ধীরে জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “কে খুন করছে, তার মুখটা তুই দেখতে পেয়েছিলিস?”
“না রে দাদা। মুখটা কোনও সময়ই আমি দেখতে পাই না। শুধু যে খুন হচ্ছে, তার মুখটাই দেখতে পাই স্বপ্নে।”
বোনকে আরও জোরে বুকে চেপে ধরল জয়ন্ত। কিছুটা সময় চুপ করে রইল দুজনে।
তারপরে বনমালা ফিশফিশ করে জিজ্ঞেস করল, “এখন কী করব রে দাদা? বাবাকে বলব স্বপ্নের কথা?”
ছোটো বোনের মাথায় হাত বোলাতে লাগল জয়ন্ত, “না রে মালা। এইসব কথা কাউকে বলিস না। লোকে তোকে পাগল বলবে। পাগলাগারদে পাঠিয়ে দেবে। আর আমাদের দেখতে পাবি না তুই।”
বনমালা ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। দাদা এবার টেনে সোজা করে বসাল তাকে। তারপরে বোনের চোখে চোখ রেখে জয়ন্ত বলল, “আমাকে কথা দে, তুই এইসব কথা কাউকে বলবি না। কাউকে না।”
দাদার হাতে হাত রেখে বনমালা বলল, “তুই বারণ করেছিস দাদা, আমি আর কাউকে কিছু বলব না।
আস্তে আস্তে বোনকে খাটে শুইয়ে দিল জয়ন্ত। তারপরে নিজেও শুয়ে পড়ল মেয়েটার পাশে, “আমি আজ তোর কাছেই শুচ্ছি বোন। তুই ভয় পাস না।”
গুটিশুটি মেরে বিছানায় পড়ে রইল ভাই-বোন। ভোর হওয়ার অপেক্ষায়।
.
সকাল হতেই যে ঝড়টা উঠল শান্তিনিকেতনে, তার ঝাপটা এসে পড়ল সিংহবাড়িতেও। মিনতি মাসির কাছ থেকে বেলা দশটা নাগাদ খবরটা পেয়ে গেল জয়ন্ত। ঈপ্সিতা ম্যাডাম খুন হয়েছে। কেন জানি অবাক হল না সে। এইরকম একটা পরিণতিই যে ঘটবে, সেটা যেন বুঝতে পেরেছিল ছেলেটা। বয়সটা তার সতেরো হতে পারে, কিন্তু সংসারের এই পরিবেশ তাকে অনেক আগেই মানসিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক করে তুলেছে। অন্য কেউ হলে হয়তো মারাত্মক ভয় পেয়ে যেত। কিন্তু জয়ন্ত পেল না। একটুও ঘাবড়াল না সে। জয়ন্ত বুঝেছিল, এই পরিস্থিতিতে তাকেই মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।
আর দেরি না করে সে দ্রুত এগিয়ে গেল বোনের ঘরের দিকে। দেখতে হবে, বোনটা যেন উলটোপালটা কিছু করে না ফেলে।
.
ঝড়টা তখন একশো মাইল গতিতে বইছে শোভনাদের বাড়িতে।
ঘণ্টা দুয়েক পরে ধীরে ধীরে ঘুম ভেঙে উঠে বসেছেন শোভনা। তাঁর চোখের জল প্রায় শুকিয়ে এসেছে।
সমীরণ দত্তের ডাকে আবার হাজির হয়েছেন সেই ডাক্তার। চট করে একবার প্রেসার-টেসার মেপে পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করলেন তিনি। অর্থাৎ, প্রশ্ন করতে পারেন।
“ম্যাডাম,” যতটা সম্ভব মিষ্টি করে ডাক দিয়ে সমীরণ দত্ত বলতে শুরু করলেন, “আপনাদের ড্রাইভার বলছিল, আপনি যখন বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছিলেন, তখন কেউ একজন পাঁচিল ডিঙিয়ে পালিয়ে যায়। ঠিক তো?”
একটু ভেবে মাথা নেড়ে সায় দিলেন শোভনা।
“আপনি কি লোকটাকে চিনতে পেরেছিলেন?” প্রায় দমবন্ধ করে প্রশ্নটা করলেন ইন্সপেক্টর। অনেক কিছু নির্ভর করে আছে এই জবাবটার উপরে।
আবার মাথা নাড়লেন শোভনা, “হ্যাঁ, চিনতে পেরেছিলাম।”
সমীরণ দত্ত আর উত্তেজনা চেপে রাখতে পারলেন না, “কে ম্যাডাম, কে?”
সামান্য ভেবে শোভনা জবাব দিলেন, “ও তো আমাদের মালি। জয়দেব পাড়ুই। আমাদের বাগানটা দেখাশোনা করে ও।”
হৃৎপিণ্ডটা যেন লাফিয়ে গলার কাছে চলে এল সমীরণের। মালি, গাছ- গাছড়ার ব্যাপারে তাহলে জ্ঞান আছে। তাহলে কি…? প্রোমোশনটা বোধহয় হয়েই যাবে এবার।
উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠে ঘর থেকে বেরোতে যাচ্ছিলেন সমীরণ। কিন্তু কী যেন মনে হতে দাঁড়িয়ে গেলেন।
“ম্যাডাম, এই পাড়ুই কোথায় থাকে, আপনার কোনও ধারণা আছে?”
“আমি ঠিক জানি না, শেফালি জানে। শেফালিই ঠিক করে দিয়েছিল ওকে।”
“শেফালি মানে আপনাদের রান্না করার মাসি?”
মাথা নাড়লেন শোভনা। তাঁর আর কথা বলতে ভালো লাগছিল না। কী থেকে যে কী হয়ে গেল! হু হু করে উঠছে শোভনার বুকটা। অবিরত রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে অদৃশ্য এক ক্ষত থেকে।
“কিন্তু শেফালি কোথায়? ওকে তো সকাল থেকেই দেখা যাচ্ছে না।’ চোখ তুলে তাকালেন শোভনা, “সে কী! ওর তো এই বাড়িতে থাকার কথা আমার সঙ্গে তো সেরকমই কথা হয়েছে।”
সমীরণ দত্ত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বাইরে থেকে একটা গোলমালের আওয়াজ তাঁকে থামিয়ে দিল।
একজন কনস্টেবল এসে বলল, “স্যার, একটা মেয়ে আসতে চাইছে। বলছে এখানে রান্না করে।
“আরে শিগগিরই ওকে নিয়ে এসো,” উত্তেজিত হয়ে পড়লেন অফিসার।
মিনিট দুয়েকের মধ্যেই মাঝবয়সি একটি বউ ঘরে ঢুকল। পুলিশ অফিসার কিছু বলার আগেই শোভনা প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “তুই কোথায় গিয়েছিলি? বাড়িতে ছিলিস না কেন? তুই থাকলে আজ এমন সর্বনাশ হত না।
বাড়িতে ঢোকার আগেই ঈপ্সিতার খুনের খবরটা পেয়ে গিয়েছিল শেফালি। সে আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে বলে উঠল, “আমি কী করব দিদি? ঈপ্সিতা দিদিই তো দু-দিনের জন্য আমাকে ছুটি দিয়ে দিল। বলল, তুই বাড়ি যাসনি কয়েকদিন, একরাতের জন্য বাড়ি যা, আবার কাল বেলার দিকে আসিস। আমিও তো তাই বাড়ি চলে গিয়েছিলাম।”
শোভনা আবার কী বলতে যাচ্ছিলেন, তাঁকে বাধা দিলেন সমীরণ।
“আচ্ছা, এই ব্যাপারটা আমরা পরে দেখছি। আগে তুমি বলো তো ওই পাড়ুই লোকটা কোথায় থাকে?”
“মানে আমাদের জয়দেব পাড়ুই? ও তো নতুনগীত গ্রামে থাকে।”
“তুমি এসো আমাদের সঙ্গে।”
শেফালিকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে গেলেন সমীরণ। খানিকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও পুলিশের পিছন পিছন যেতে হল শেফালিকে। গাড়ির পিছনে শেফালিকে তুলে রওনা দিলেন সমীরণ দত্ত। পিছনে আর একটা জিপ। দুজন কনস্টেবলকে রেখে গেলেন বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য। ঈপ্সিতার বডি ততক্ষণে মর্গে পাঠানো হয়ে গিয়েছে।
আধঘণ্টার মধ্যেই নতুনগীত গ্রামে পৌঁছে গেল পুলিশের গাড়ি। আসার পথে জয়দেব পাড়ুই সম্পর্কে যা জানার তা জেনে নিয়েছেন সমীরণ দত্ত।
বছর চল্লিশেক বয়স হবে লোকটার। মালিরই কাজ করে থাকে। শান্তিনিকেতনে বেশ কয়েকটা বাড়িতে মালির চাকরি করে। শেফালির সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল। শোভনা দিদি যখন একজন বাগান পরিচর্যা করার লোকের খোঁজ করছিলেন, তখন জয়দেবের কথাই মনে পড়ে যায় শেফালির।
“ওর টাকারও প্রয়োজন ছিল। যে কারণে আমি দিদিকে বলেছিলাম,” জিপের পিছনের সিটে বসে বলছিল শেফালি।
“টাকার প্রয়োজন হয়েছিল কেন?” ড্রাইভারের পাশে বসা সমীরণ প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন।
“আগের চাকরিটা চলে গিয়েছিল। তাই একটু ঝামেলায় ছিল।”
“কেন? চুরিটুরি করেছিল নাকি?”
“না না স্যার। পাড়ুইদার কোনও দোষ ছিল না। আগের ভদ্রলোক তো খুন হয়ে গেলেন। তখন তো এমনিতেই চাকরিটা চলে গেল। পাড়ুইদা আর কী করবে বলুন?”
সমীরণের কানে শেষের কথাগুলো ঢোকেনি। তাঁর কানে একটা কথাই বাজছে-
“আগের ভদ্রলোক তো খুন হয়ে গেলেন।”
হাজারটা হাতুড়ি পড়ছিল সমীরণ দত্তের বুকে। কোনওমতে উত্তেজনা দমন করে তিনি বললেন, “ওই চঞ্চল মজুমদারের বাড়িতে কাজ করত নাকি পাড়ুই?”
“হ্যাঁ স্যার, ঠিক বলেছেন। নামটা চঞ্চল মজুমদারই ছিল। ওই বাড়িতে মালির কাজ করত পাড়ুইদা।”
সমীরণ দত্ত মনে মনে একবার ইষ্টনাম জপ করে নিলেন। তিনি ভাবতেই পারছেন না, ঈশ্বর তার প্রতি এতটা সদয় হয়েছেন। এ তো মেঘ না চাইতেই জল। একসঙ্গে জোড়া খুনের কেসের মীমাংসা হয়ে যাবে! এরপরে প্রোমোশন না হলে আর কবে হবে!
.
প্রথম ধাক্কাটা খেতে হল পাড়ুইয়ের বাড়িতে এসে। এই ধাক্কাটার জন্য অবশ্য প্রস্তুতই ছিলেন সমীরণ দত্ত। জয়দেব পাড়ুই বাড়িতে নেই। সকালে বেরিয়ে গিয়েছে আর ফেরেনি।
খুবই স্বাভাবিক। খুন করে পালানোর মুখে কেউ দেখে ফেললে কে আর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার জন্য বাড়িতে বসে থাকে!
তাঁকে এবার দ্রুত কয়েকটা কাজ করতে হবে। প্রথমেই ফোন করে ব্যাপারটা জানালেন ওসি-কে। তারপরে পাড়ুই বাড়িতে গিয়ে হানা দিলেন।
বউ আর দুই ছেলেকে নিয়ে জয়দেব পাড়ুইয়ের সংসার। ছোটো ছেলের বয়স বারো। সে মায়ের সঙ্গে এখানে থাকে। বড়ো ছেলের বয়স ষোলো। সে মুম্বইয়ে থাকে। সেখানে কোন একটা সোনার দোকানে কাজ করে।
ইন্সপেক্টর দত্তর প্রশ্নের জবাবে স্ত্রী বলল, প্রতিদিন যে সময় বেরোয়, এদিনও সেরকমই বেরিয়েছিল ভোরবেলায়।
“কোথায় যায়, কিছু বলেছিল?”
“সকালে তো ওই বাড়িটায় যায়, যে বাড়িটায় দুই মহিলা থাকে। ওই বাড়ির বাগানের দেখাশোনা করে। মাঝে মাঝে বিকেলেও যেত।”
“জয়দেব তো ওই মজুমদার বাড়িতেও কাজ করত, যে লোকটা খুন হয়ে গেল।”
“হ্যাঁ করত বাবু। শান্তিনিকেতনের অনেক বাড়িতেই করত। কিন্তু কেন এইসব প্রশ্ন করছেন বাবু?” পাড়ুই-পত্নীর চোখে উদ্বেগের চিহ্ন ধরা পড়ল। তারপরেই সে বলে উঠল, “মেয়েছেলে দুটো কিছু বলেছে নাকি ওর নামে? ওরা নিজেরাই তো খারাপ মেয়েছেলে, ওরা আর কী বলবে!”
মহিলার কথা শুনে থমকে গেলেন সমীরণবাবু।
“খারাপ মেয়েছেলে মানে?”
“আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে ওর বন্ধুরা জানে। ওই সামনের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা মারে মাঝে মাঝে।”
সমীরণ ছেলেটার দিকে তাকালেন। “তোর বাবার কোনও ছবি আছে?” ছেলেটা মাথা নাড়ল।
“নিয়ে আয় চট করে।”
মিনিট কয়েকের মধ্যে একটা বাঁধানো ছবি এনে দিল ছেলেটা। ভালো করে ছবিটা দেখে পাশে দাঁড়ানো সহকারীর হাতে তুলে দিলেন তিনি।
এবার পাড়ুইয়ের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তার আগে দুজন কনস্টেবলকে এখানেও মোতায়েন রাখতে হবে। যদি ব্যাটা ফিরে আসে।
সমীরণ দত্ত এগিয়ে গেলেন চায়ের দোকানটার দিকে। সেখানে এখনও কয়েকটা লোক জটলা করছে। পুলিশ আসতে দেখেই উঠে দাঁড়াল। সমীরণ দত্ত লোকগুলোর সামনে গিয়ে একটু কটমট করে তাকিয়ে বললেন, “জয়দেব পাড়ুইকে চিনতে তোমরা?”
লোকগুলো পরস্পরের দিকে তাকাল। তারপরে একজন বলল, “হ বাবু, চিনতাম। আমরা তো সব এক গাঁয়েরই লোক। চিনব না কেন।”
সমীরণ চোখের দৃষ্টি একটুও নরম না করে বললেন, “যে বাড়িটায় ও কাজ করত, সেই বাড়ির দুই মহিলাকে নিয়ে কখনও কিছু বলেছিল পাড়ুই?”
লোকগুলো একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে নিল। কিন্তু কিছু বলল না। সমীরণ দত্ত হুঙ্কার দিলেন—
“কিছু বলবে না অন্য ব্যবস্থা করব?”
এবার একটা লোক মুখ খুলল, “কী আর বলব বাবু? সে তো নোংরামির একশেষ। ওই মেয়েছেলে দুটো খুব খারাপ ছিল।”
“কী বলতে চাস কী? পরিষ্কার করে বল।
পুলিশ অফিসারের কড়া গলার সামনে একটু ঘাবড়ে গেল লোকগুলো। তারপরে একজন সাহস করে বলল-
“খারাপ মানে বাবু, ওরা নিজেদের মধ্যে খারাপ কাজ করত। যে কাজ একটা ছেলে আর একটা মেয়ে করে, সেই কাজগুলো ওই দুটো মেয়ে নিজেদের মধ্যে করত। পাড়ুই আমাদের বলেছে।”
হা করে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন সমীরণ দত্ত!
.
সন্ধ্যার মধ্যেই শাস্তিনিকেতন জুড়ে ভয়ংকর এক আতঙ্কের চাদর নেমে এল। পরপর দুটো খুনের খবরে কাঁপছে পুরো বোলপুর-শান্তিনিকেতন।
মানিক কিছুতেই শান্ত থাকতে পারছিল না। বোনকে আড়ালে ডেকে সে জিজ্ঞেস করল, “তুই কি কিছু দেখেছিস? তোর নাচের ম্যাডামের ওই বাড়িতে আর কেউ আসত?”
শতাব্দী ভয়ে ভয়ে জবাব দিল, “আমরা তো নাচ শিখে চলে আসতাম। আর তো কিছু জানি না। সত্যি বলছি।”
“ওই মেয়েটাও তো তোদের সঙ্গে নাচ শিখত?”
শতাব্দী বুঝল দাদা কার কথা বলছে, “হ্যাঁ, বনমালাও ওখানে নাচ শিখতে যেত।”
গম্ভীর হয়ে গেল মানিকের মুখটা। প্রথম খুনটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। এরপরে পুলিশের ওই জেরা। তাও তো ভাগ্যিস সেদিন শতাব্দীর পড়া ছিল না ওই বাড়িতে।
সেই রাতে কী করেছে সে? কতক্ষণ বাড়ির বাইরে ছিল? ওই বাড়িতে আবার গিয়েছিল কি না? কোথায় আড্ডা মেরেছে বন্ধুদের সঙ্গে? এরপরে বন্ধুদেরকেও জেরা করতে ছাড়েনি পুলিশ। যেন সবাই যোগসাজস করে একটা অপরাধ করেছে। মানিক এও বুঝতে পেরেছিল, পুলিশের খোচর লেগে গিয়েছিল তার পিছনে।
মানিক মনে মনে ভাবছিল, কী কুক্ষণে যে বোনকে ওই লোকটার কাছে পড়তে পাঠানো হয়েছিল। লোকটা নাকি ইংরেজি দারুণ পড়ায়, তার উপরে খুব কম পয়সায়। জানার পরে বাবা-মা আর দেরি না করে, একে-তাকে ধরে শতাব্দীর পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
আর তারপরে আবার এই খুনটা। এবার পরিস্থিতিটা আরও জটিল। মানিক জানে, এবার তারা খুনের রাতেই ওই বাড়িতে গিয়েছিল। শতাব্দী ওই দিনই নাচ শিখতে যায়। সে পরে বোনকে নিয়ে আসতে গিয়েছিল। পুলিশ সবই জেনে যাবে। ব্যাপারটা ক্রমেই ঘোরালো হয়ে উঠছে। মানিকের কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমতে লাগল।
আরও একটা খবর পাবে পুলিশ। বোনকে বাড়িতে রেখে সে রাতে বেরিয়ে গিয়েছিল। দুটো খুনের ক্ষেত্রেই একই ব্যাপার। অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিল সে। বারবার বন্ধুদের কথা পুলিশ নাও বিশ্বাস করতে পারে। মানিক একটু কেঁপে উঠল
সে আবার শতাব্দীর সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, “তুই কি কোনও কিছু দেখেছিস? মানে কারও সঙ্গে ম্যাডামের রাগারাগি হতে বা ওরকম কিছু?”
“না তো,” বলল শতাব্দী। তারপরে একটু ভেবে ঠোঁটটা বেঁকিয়ে বলল, “তবে মালাকে খুব পছন্দ করত ম্যাডাম। ওকে বেশি সময় দিত। আদর করত। আমাদের সেভাবে পাত্তা দিত না।”
বোনের কথার মধ্যে চাপা ক্ষোভটা ধরতে অসুবিধে হল না মানিকের। ছেলেটার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। আবার বনমালা। এই বড়োলোকের বাড়ির ছেলেমেয়েগুলো সবসময় বাড়তি সুবিধা পায়। তা সে টিচারদের কাছেই হোক কী অন্য ব্যাপারে।
যতই ভাবছে, মানিকের চোয়ালটা কঠিন হয়ে উঠছে। একদৃষ্টে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল শতাব্দী। মানিক আবার বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “পুলিশ যদি আবার কিছু জিজ্ঞেস করে, তাহলে বলবি, আমি গতকাল রাতে বাড়িতেই ছিলাম। কোথাও যাইনি। বুঝলি?”
মেয়েটা কী বুঝল, বোঝা গেল না। তবে মাথাটা নাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মানিক একটু ভাবল। তারপরে সে-ও বেরোনোর জন্য তৈরি হল। কোনও অঘটন ঘটার আগেই তাকে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাবা-মাকে বলে দিতে হবে রাতে তার বাড়ি থেকে না বেরোনোর ব্যাপারটা। বন্ধুদেরও বোঝাতে হবে।
অনেক কাজ মানিকের সামনে।
.
রাত ঘনিয়ে এসেছে শান্তিনিকেতনের বুকে।
নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে মূর্তিটা রাগে গরগর করছে। মুখ দিয়ে একটা বিজাতীয় আওয়াজ বার হচ্ছে। চোখ দুটো ঘুরছে বনবন করে। সারা জায়গাটা তছনছ করে ফেলেছে সে। কিন্তু যা খুঁজছে, তা পাচ্ছে না।
কোথায় গেল সেটা? কে লুকিয়ে রাখল? কার এত সাহস তাকে থামানোর চেষ্টা করে?
কিছুতেই হার মানবে না সে। কেউ তাকে থামাতে পারবে না। কেউ না!
মূর্তিটা টের পেল না, বিস্ফারিত দুটো চোখ আড়াল থেকে দেখে চলেছে তাকে!
