প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ৩.৪

শান্তিনিকেতন, ২০২১

দশটা কুড়ি নাগাদ শান্তিনিকেতন থানায় পৌঁছলেন কমলেশ রায়।

নিজের টেবিলেই ছিলেন শর্মিষ্ঠা বসু। কমলেশকে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়ালেন, “ব্যাপার কী মিস্টার রায়? কী হচ্ছে একটু বলবেন?” শর্মিষ্ঠার গলায় একটু বিরক্তির আভাসও।

কমলেশ বলে উঠলেন, “সব বলছি আপনাকে। আপনি যে বিরক্ত হচ্ছেন, সেটাও বুঝতে পারছি। তবে আর জাস্ট পাঁচ মিনিট আমাকে দিন। তারপরে সব পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”

শর্মিষ্ঠা কিছু না বলে তাকিয়ে রইলেন।

“ওসি কি আছেন না বেরিয়ে গিয়েছেন?”

“স্যার বাড়ি গিয়েছেন। আমারও কাজ শেষ। শুধু আপনার জন্য বসে আছি। থানায় ডিউটি অফিসার আছে। কেন বলুন তো?”

“আমাদের একবার জয়ন্তর লকআপে যেতে হবে। শুধু আপনি আর আমি।”

শর্মিষ্ঠার কপাল কুঁচকে উঠল। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগে কমলেশ বলে উঠলেন, “আপনি আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছেন। প্লিজ, ওই লকআপে চলুন।”

শর্মিষ্ঠা কোনও কথা না বলে এক পুলিশ কর্মীকে নির্দেশ দিলেন জয়ন্তর লকআপ খোলার জন্য।

সেলে একাই ছিল জয়ন্ত। সেখানে ঢোকার আগে শর্মিষ্ঠাকে চাপা স্বরে কমলেশ বললেন, “আমি কয়েকটা কথা বলব জয়ন্তকে। আপনি শুধু ওর প্রতিক্রিয়াটা লক্ষ করবেন। তাহলেই সত্য-মিথ্যার পার্থক্যটা ধরে ফেলতে পারবেন। আর যেন কেউ না থাকে।”

শর্মিষ্ঠাকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সেলে ঢুকে এলেন কমলেশ। কনস্টেবলকে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত করে কমলেশের পাশে এসে দাঁড়ালেন শর্মিষ্ঠা।

জয়ন্ত চুপ করে বসেছিল। চোখ দুটো বোজা। হঠাৎ সেলে অন্য লোকের আভাস পেয়ে চোখ মেলে তাকাল। তার পরে সোজা হয়ে বসল।

কমলেশ ধীরে ধীরে জয়ন্তর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে বললেন, “আপনার মতো মানুষ আমি কখনও দেখিনি। আপনার ভালবাসাকে কুর্নিশ।”

একটু অবাক হয়ে কমলেশের মুখের দিকে তাকাল জয়ন্ত। তারপরে বলল, “আপনি কী বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

“জয়ন্তবাবু, আমি সব জেনে গিয়েছি। চারটি খুন আপনি করেননি। আপনি শুধু একটা খুন করেছেন। বাকি তিনটি খুন অন্য একজন করেছিল। যাকে বাঁচানোর জন্য পুরো দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিয়েছেন আপনি।”

জয়ন্ত কিছু বলার আগেই বিস্মিত শর্মিষ্ঠা বলে উঠলেন, “কী বলছেন আপনি এ সব? কে তিনটি খুন করেছে? কাকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে ফাঁসিকাঠে চড়াতেও তৈরি জয়ন্ত?”

“যাকে জয়ন্ত প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, তাকে। ওর বোন বনমালাকে।”

ঘরের মধ্যে যেন বজ্রপাত হল। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে একবার জয়ন্তের দিকে আর একবার কমলেশের দিকে তাকাতে থাকলেন শর্মিষ্ঠা।

এবার লাফিয়ে উঠল জয়ন্ত, “আপনি ভুল বলছেন। মালা কিছুই করেনি। সব খুন আমি করেছি, আমি।”

এগিয়ে এলেন শর্মিষ্ঠা। “এ সব আপনি কী বলছেন মিস্টার রায়? বনমালা খুন করবে? ওর বয়স তো ওই সময় তেরো কী চোদ্দো ছিল।”

কমলেশ কথার জবাব না দিয়ে জয়ন্তর কাঁধে হাত রাখলেন। তারপরে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ। বনমালা তিনটি খুন করেনি। তুমিও করোনি। কিন্তু সত্যিটা যে সবাইকে জানতে হবে।”

শর্মিষ্ঠার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি গলাটা একটু তুলে বললেন, “কী সব বলছেন আপনি? এই বলছেন বনমালা খুন করেছে। এই বলছেন করেনি। আর ইউ মেকিং ফান অব দ্য সিচুয়েশন? মজা করছেন আপনি?”

শর্মিষ্ঠার দিকে ঘুরলেন কমলেশ, “ম্যাডাম, আপনার বিরক্ত হওয়ারই কথা। সব আপনাকে বুঝিয়ে বলব। আমি অতীতে পুলিশকে অনেক কেসে সাহায্য করেছি। আই ডিজার্ভ অ্যান অডিয়েন্স। কিন্তু শুধু বোঝালে হবে না। আমি আপনাকে একটা জিনিস দেখাতেও চাই। নাহলে এই ঘটনার গভীরতা ধরতে পারবেন না।’

কমলেশ থামলেন। তারপরে একটা করুণ হাসি হেসে বললেন, “বাস্তব কতটা নির্মম আর কতটা নিষ্ঠুর হয়, সেটা আজ আপনাদের বুঝিয়ে দেব আমি।” কমলেশের গলার স্বর আর ব্যক্তিত্বে এমন কর্তৃত্বের আভাস ছিল যে শর্মিষ্ঠা থমকে গেলেন।

“দেখান, কী দেখাতে চান।”

“এখানে নয়, সিংহবাড়িতে।”

জয়ন্ত আর শর্মিষ্ঠা দুজনেই চমকে উঠলেন। পুলিশ অফিসার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কমলেশ দ্রুত বলে উঠলেন, “আমি আর আপনি জয়ন্তকে নিয়ে সিংহবাড়ি যাব। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, জয়ন্ত পালানোর চেষ্টা করবে না।”

শর্মিষ্ঠা পালটা বলে উঠলেন, “এই রাতে লকআপ থেকে কয়েদিকে বার করার কোনও এক্তিয়ার আমার নেই। বিশেষ করে ওসি যেখানে উপস্থিত নেই।”

কমলেশ চশমাটা খুলে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকালেন শর্মিষ্ঠার দিকে। তারপরে বললেন, “ম্যাডাম, আমি আপনার কর্তব্যজ্ঞানকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু এটা এমন একটা কেস, যেখানে আমাদের ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। আপনি চাইলে আমি এখনই বীরভূমের এসপি-র সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে পারি। উনি আমাকে চেনেন।”

একটু থামলেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “আমি আরও একটা গ্যারান্টি দিচ্ছি। আজ রাতে আপনি এমন একটা সত্য জানতে পারবেন, যা আপনার এতদিনের ধ্যান-ধারণাকে বদলে দেবে। তখন বুঝবেন, সিংহবাড়িতে না গেলে কত বড়ো ভুল করতেন।’

শর্মিষ্ঠা ভাবতে লাগলেন। জয়ন্তকে লকআপ থেকে বার করাটা ভীষণ ঝুঁকির কাজ। গোলমাল হলে শো-কজ থেকে চাকরি হারানোর ভয় পর্যন্ত আছে। আবার কমলেশবাবুর কথায় এমন একটা আকর্ষণ আছে, যা তাঁকে চুম্বকের মতো টানছে। তার উপরে এসপি-র ব্যাপারটাও ভুললে চলবে না।

শর্মিষ্ঠা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে চলুন। আপনার কথায় ভরসা করে কাজটা করছি। প্লিজ, ডোবাবেন না।”

“আপনি নিশ্চিন্তে ভরসা রাখতে পারেন।” আশ্বস্ত করলেন কমলেশ। তারপরে মোবাইল বার করে বললেন, “আমি একটা ফোন করে নিচ্ছি। ততক্ষণে আপনি জয়ন্তকে গাড়িতে তুলুন।”

ফোনে অরণ্যকে ধরলেন কমলেশ। বললেন, “খুব মন দিয়ে আমার কথা শোন। বনমালাকে নিয়ে তোকে সিংহবাড়িতে আসতে হবে।”

“বলছ কী কাকা!” অরণ্য প্রায় আঁতকে উঠল, “এই অবস্থায় ওকে নিয়ে কী করে আসব?”

“ঘাবড়াস না। দাদাকে বলে তোদের গাড়িতে নিয়ে আয়। তুই তো ড্রাইভ করতে পারিস। ওই দুই ভদ্রমহিলাকেও সঙ্গে নিয়ে নিস।”

“আর মালা আসতে না চাইলে? জোর করার কিন্তু কোনও প্রশ্নই নেই।”

“জোর করতে হবে না। মালাকে বলবি, কমলেশ কাকু থানা থেকে ওর দাদাকে নিয়ে ওদের বাড়িতে যাচ্ছে। দাদা ওর সঙ্গে একবার দেখা করতে চায়। তাই কাকা এই ব্যবস্থা করেছে।”

অরণ্য একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছিল। কাকা এমন ঝামেলায় ফেলে দেয় তাকে। কিন্তু কী আর করা যাবে। ফোনটা রেখে বনমালার ঘরের দিকে এগোল অরণ্য।

কমলেশ রায় ভুল বলেননি। দাদার নামটা শুনে এতটুকু ইতস্তত করেনি বনমালা।

পাঁচ মিনিট আগে পরে গাড়ি দুটো পৌঁছোল সিংহবাড়িতে। জয়ন্তকে নিয়ে কমলেশ, শর্মিষ্ঠা আগেই পৌঁছে গেলেন গন্তব্যস্থলে। শর্মিষ্ঠা আর জয়ন্তকে দোতলায় জয়ন্তের ঘরে অপেক্ষা করতে বললেন কমলেশ। আর নিজে দাঁড়িয়ে রইলেন বনমালাদের জন্য।

মিনিট পাঁচেক পরেই অরণ্যদের গাড়ি এসে থামল সিংহবাড়ির সামনে। প্রায় ছুটে এল বনমালা।

“কমলেশ কাকা, দাদাকে এনেছেন আপনি?”

মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে কমলেশ বললেন, “হ্যাঁ এনেছি, তুমি দোতলায় এসো।”

মহিলা কনস্টেবল দুজনকে নীচে থাকতে বলে বনমালা, অরণ্যকে নিয়ে দোতলায় উঠে এলেন কমলেশ। জয়ন্ত বসেছিল ওর নিজের ঘরে। দাদাকে দেখতে পেয়ে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল বনমালা।

তারপরে বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল ভাই-বোন।

আওয়াজ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন দীনেন্দ্র সিংহ। এবার এগিয়ে এলেন জয়ন্তের ঘরের দিকে। তাঁকে মাঝপথে থামালেন কমলেশ। তারপরে বললেন, “আপনার এই ঘরে আসার দরকার নেই। আপনি মিস বসুর সঙ্গে বনমালার ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করুন।”

শর্মিষ্ঠা এগিয়ে এসে দীনেন্দ্রকে বললেন, “আসুন, মিস্টার সিংহ। আমরা ওই ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করি।”

জয়ন্ত-বনমালা দুজনে একটু সামলে উঠলে কমলেশ বললেন, “এবার আমরা বনমালার ঘরে যাব। তোমরা সবাই এসো।”

কমলেশের পিছন পিছন বাকি তিনজন হাজির হল বনমালার ঘরে। ছেলে- মেয়ের দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন দীনেন্দ্ৰ।

ঘরের একটা কোণে রাখা খালি চেয়ারটার দিকে ইঙ্গিত করে বনমালাকে কমলেশ বললেন, “তুমি ওই চেয়ারটায় গিয়ে বসো। বাকিরা খাটে বসতে পারো।”

বনমালা বুঝতে পারছিল না, কমলেশ কাকা কী চাইছেন। কিন্তু তাও চেয়ারে গিয়ে বসল সে।

বনমালার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে কমলেশ বললেন, “তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই, তোমাকে একবার হিপনোটাইজ করেছিলাম আমি?”

মাথা নাড়ল বনমালা, “কিন্তু তাতে তো বিশেষ কিছু লাভ হয়নি।”

“হয়নি, কারণ পরিস্থিতিটা আমার অনুকূলে ছিল না। তুমিও অজানা এক পরিবেশে ছিলে। এটা তোমার নিজের ঘর। চেনা পরিবেশ। এখানে তোমার মনের দরজাটা খুলতে পারব বলেই আমার বিশ্বাস।”

বাকিদের দিকে ফিরলেন কমলেশ, “হিপনোটাইজের কথা বললাম বলে আপনারা আবার এটাকে ম্যাজিক ভাববেন না। হিপনোটাইজ আর কিছুই নয় অটোসাজেশন দেওয়ার একটা রাস্তা। আমি ওকে একটা কাজ করতে বলব। সেটা ওর মনে গেঁথে যাবে। তারপরে দেখা যাক কী হয়।”

সবাই চুপ করে রইল। ঘরে কমলেশ, বনমালা ছাড়া তখন রয়েছেন শর্মিষ্ঠা, অরণ্য, দীনেন্দ্র আর জয়ন্ত। পুলিশ কনস্টেবলদের নীচে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন কমলেশ। বড়ো লাইটটা নিভিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন হালকা নীল রংয়ের নাইট বাল্বটা।

ঘরের মধ্যে যেন একটা অপার্থিব পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেল। তবে পরিবেশটা বনমালার বড্ড চেনা। তার মনের মধ্যে টেনশনটা একটু কমে এসেছে। শান্ত হয়ে উঠছে সে।

কমলেশ এগিয়ে গিয়ে বসলেন মেয়েটার সামনে। বললেন, “তোমার মধ্যে যে সত্তা লুকিয়ে আছে, আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তুমি বাধা দেবে না। নিজের মনকে উন্মুক্ত করে দাও।”

বনমালার চেয়ারের সামনে আর একটা চেয়ার টেনে নিলেন তিনি। চশমাটা খুলে পাশে রাখলেন। তারপরে তর্জনীটা তুলে বনমালার চোখের সামনে খুব ধীরে ধীরে নড়াতে লাগলেন আর বিড়বিড় করতে লাগলেন, “ঘুমিয়ে পড়ো বনমালা, ঘুমিয়ে পড়ো। রিল্যাক্স। মনের ভিতরে যে লুকিয়ে আছে, তার সঙ্গে কথা বলতে দাও আমাকে।”

মিনিটখানেক ধরে একই কথা বলে যেতে লাগলেন কমলেশ। মেয়েটার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল। ঘাড়টা নীচের দিকে ঝুঁকে পড়ল। বনমালার মনে হল সে হারিয়ে যাচ্ছে… ডুবে যাচ্ছে কোন অতল সাগরে….

তারপরে সত্যিই সে ডুবে গেল গহিন কালো জলে… যার কোনও আদি নেই, কোনও অন্ত নেই।

বুকের কাছে নেমে এল বনমালার মাথা।

এবার বদলে গেল কমলেশ রায়ের কথা। তিনি একটু জোরের সঙ্গে বলতে লাগলেন, “বনমালার বড়ো বিপদ, বনমালার বড়ো বিপদ। আপনি বাঁচাবেন না ওকে?” একই সুরে কথাগুলো বলে যেতে লাগলেন তিনি।

তারপরে মাথা তুলল বনমালা বা অন্য কেউ! সেই আঁধো-অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারছিল না বাকিরা।

সবাইকে কাঁপিয়ে এরপরে একটা অচেনা গলা বলে উঠল, “কার এত সাহস আমার মেয়ের ক্ষতি করবে? কেটে ফেলব না তাকে!”

আতঙ্কের একটা জলপ্রপাত যেন আছড়ে পড়ল ঘরটায়। জয়ন্ত আর দীনেন্দ্র সিংহের চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। শর্মিষ্ঠা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার দিকে।

কমলেশ বলে চললেন, “আপনার মেয়ের ক্ষতি তো কেউ করতে চায় না।”

বনমালা বা অন্য কেউ সেই রকম ভয় ধরানো গলায় বলে উঠল, “চায় না মানে? ওই শয়তানগুলো তাহলে কী করেছিল? আমার বাচ্চা মেয়েটার সঙ্গে কী করেছিল ওরা?”

আওয়াজ ক্রমশ উচ্চগ্রামে চড়ছিল। দাঁতে দাঁত ঘষে সেই অন্য কেউ বলে চলল, “ওদের নোংরা হাতগুলো বাচ্চা মেয়েটার শরীরে খেলা করত। মেয়েটা কুঁকড়ে যেত, ভয়ে কাঁপত। রাতে বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদত। কিন্তু কাউকে সেই যন্ত্রণার কথা বলতে পারেনি। কাকেই বা বলবে। আমি থাকলে কি কখনও এইরকম হতে পারত?”

“কারা ওরা?”

“ওই শয়তান চঞ্চল মজুমদার। আর ওই ঈপ্সিতা। মেয়ে হলে কী হবে, নরকের কীট একটা। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চঞ্চল আমার বাচ্চাটার উপরে অত্যাচার করেছে। ওকে দিয়ে গ্লাসে মদ ঢালাত। তারপরে ফ্রকের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে, জামার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে…। মেয়েটা বাড়িতে এসে কাঁদত, আমার ছবির সামনে বসে বসে কাঁদত। আর মাকে ডাকত। তাই তো আমি এসেছি।”

“ঈপ্সিতাও একই কাজ করেছে?”

“হ্যাঁ, মেয়ে হয়েও মেয়ের সর্বনাশ করতে ছাড়েনি। যখন দেখেছে বাচ্চাটা প্রতিবাদ করছে না, তখন আরও বেশি করে সুযোগ নিয়েছে। নাচ শেখানোর ছলে আগে বাড়িতে ডেকে নিত, সবাই চলে গেলেও বসিয়ে রাখত। আর তারপরে…।”

“কী শাস্তি দিয়েছিলেন ওদের?”

“শেষ করে দিয়েছিলাম ওদের। মালা কখনও ওই কাজ করতে পারত না। কিন্তু আমি পারতাম। রক্তকরবীর গাছ থেকে বিষ আমিই বানিয়েছি। মদের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছি। তারপরে আমার কাপড় কাটার কাঁচি দিয়ে ওদের ছিন্নভিন্ন করেছি। আমার মেয়েকে ওরা দিনের পর দিন রক্তাক্ত করেছে। আমি ওদের একদিন করেছি।”

চেয়ারে বসা মূর্তিটা ফুঁসতে লাগল। শর্মিষ্ঠা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ঘরের বাকি দুজন আতঙ্কে জমে গিয়েছে। অরণার শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা হিমবাহ নেমে যাচ্ছিল।

“তাহলে প্রথমে বিষ খাইয়ে, তারপরে কাঁচি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে। ওই দুজনকে?”

“হ্যাঁ, কাঁচিটা আমার সেলাইয়ের জিনিসের সঙ্গেই ছিল। সুযোগমতো বনমালার ব্যাগে রেখে দিতাম। বিষের শিশিটাও। আমার মেয়েটা তো বোকা, সরল। কিছুই পারে না। আমি পুরো প্ল্যানটা করেছিলাম। তারপরে সুযোগ বুঝে ওদের মদের বোতলে বিষটা মিশিয়ে দিই। জানতাম, ওরা নিস্তেজ হয়ে পড়বে, প্রতিরোধ করতে পারবে না।”

চোখ তুলে কমলেশের দিকে তাকাল মূর্তিটা, “ওরা তখন জানোয়ারে পরিণত হয়েছিল। হুঁশ ছিল না কী খাচ্ছে। তারপরে বিষের ক্রিয়া শুরু হতেই কাজটা করি। মৃত্যুর সময় ওদের আতঙ্কে ভরা সেই দৃষ্টি কখনও ভুলব না। ভাবতে পারেনি একটা বাচ্চা মেয়ে এই কাজটা করবে। কিন্তু ওরা তো জানত না, বাচ্চাটার শরীরের আধারে তখন কে রয়েছে!

একটা খলখল হাসি কাঁপিয়ে দিল ঘরের প্রত্যেকটা মানুষকে। মূর্তিটা বলে চলল, “আমার মেয়েটাকে দুর্বল পেয়ে ওরা অত্যাচার করত। কিন্তু আমি দুৰ্বল নই। তাই তো আমি এসেছি। ওই শয়তানগুলোকে শেষ করে দিতে। সব মেয়ে দুর্বল হয় না। মেয়েরা শুধু মার খায় না, কোনও কোনও মেয়ে জবাব দিতেও জানে। রক্ত ঝরাতে জানে।”

পরের প্রশ্নটা করলেন কমলেশ, “কাঁচিটা কোথায় রাখতেন?”

“আমার ঘর থেকে নিয়ে বনমালার ব্যাগে রেখেছিলাম। দ্বিতীয়বার খুন করার পরে আর কাঁচিটা পাইনি। কেউ লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু কাঁচির আর প্রয়োজন হয়নি। আমার মেয়েকে আর কেউ ছোঁয়নি।

“আবার কেন ফিরে এলেন? প্রবীর সেনকে কেন মারলেন?”

“মেয়েটা বড়ো হয়ে গেলেও সেই বোকা, সরল রয়ে গিয়েছে। প্রবীর আমাকে পায়নি, তাই আমার মেয়েকে ভোগ করতে চেয়েছিল। প্রথমদিনই আমি বুঝে যাই। তারপরে আর এক রাতে ওর ঘরে গিয়েছিলাম আমি। পুরো তৈরি হয়ে। পাপের শাস্তি কড়ায় গণ্ডায় দিয়ে এসেছি।”

“আর অরণ্য? ওকে আক্রমণ করলেন কেন?”

“ও যে আমার মেয়েকে ছুঁয়েছিল, জড়িয়ে ধরেছিল। আমি থাকতে কেউ আমার মেয়েকে ছুঁতে পারবে না। যে ছোঁবে তাকেই কেটে ফেলব।” উত্তেজনায় মূর্তিটার বুক ওঠানামা করছিল। ঠান্ডার মধ্যেও ঘামছিলেন কমলেশ। তবুও তিনি পরের প্রশ্নটা করলেন, “আমিও তো আপনার মেয়েকে ছুঁয়েছি। তাহলে আমাকে মারলেন না কেন?”

মূর্তির গলার স্বরটা সামান্য বদলে গেল, “তুমি ওকে খারাপভাবে ছোঁওনি। তোমার স্পর্শটা অন্যরকম ছিল। মেয়েরা বুঝতে পারে। তাই তোমাকে কিছু করিনি।”

.

ঘরের মধ্যে অদ্ভুত একটা নীরবতা নেমে এল। শুধু মূর্তিটার ভারী শ্বাস নেওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নীরবতা ভাঙলেন কমলেশ। শান্ত স্বরে বললেন, “আপনি কিছু ভাববেন না কনকমালা। আর কেউ কোনওদিন আপনার মেয়ের ক্ষতি করবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”

ধীরে ধীরে সুর বদলে ফেললেন কমলেশ। ছড়া পড়ার মতো করে বলতে লাগলেন, “বনমালা জেগে ওঠো, বনমালা জেগে ওঠো।”

জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকল মূর্তিটা। তারপরে মাথাটা এলিয়ে পড়ল বুকে। চেয়ার থেকে উঠে বড়ো লাইটটা জ্বালিয়ে দিলেন কমলেশ।

ঘরের একজনও নড়ল না। সবাই যেন আতঙ্কে পাথর হয়ে গিয়েছে।

কমলেশ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন বনমালার দিকে। কয়েকবার তুড়ি বাজালেন বনমালার কানের কাছে। ধীরে ধীরে চোখ মেলল মেয়েটা। প্রথমে যেন বুঝতে পারল না কোথায় রয়েছে। তারপরে ধড়মড় করে উঠে পড়ল চেয়ার ছেড়ে, “কী হয়েছে? সবাই এ রকম করে বসে রয়েছে কেন? আমি কি কিছু করেছি?”

কমলেশ এগিয়ে এসে শান্ত করলেন বনমালাকে। তারপরে বললেন, “কিছু হয়নি বনমালা। তুমি অরণ্যর সঙ্গে নীচে যাও। ওখানে তোমার নার্স দু-জন রয়েছে। ওদের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যাও। আমরা একটু কথা বলে পরে যাচ্ছি।” তারপরে অরণ্যর দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন, “তুই বনমালাকে নিয়ে বাড়ি চলে যা। আমি না ফেরা পর্যন্ত তোরা সবাই ওর সঙ্গেই থাকবি।”

আতঙ্কে জমে গিয়েছিল অরণ্য। কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তার মনের ভাবটা বুঝতে অসুবিধে হল না কমলেশের। তিনি উঠে গিয়ে অরণ্যের কাঁধে একটু চাপ দিয়ে বললেন, “বাইরে নিয়ে যা বনমালাকে। চিন্তার কিছু নেই।” কাকার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বনমালাকে সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অরণ্য।

কমলেশ ফিরলেন বাকিদের দিকে। তারপরে বললেন—

“আপনাদের মনে নিশ্চয়ই অনেক প্রশ্ন জমা হচ্ছে। আমি চেষ্টা করছি সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *