প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ২.১০

১০

শান্তিনিকেতন, ২০২১

অমর চৌধুরীর সঙ্গে বনমালাদের দেখা হওয়ার পরের দিন।

পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টগুলোয় আবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন শর্মিষ্ঠা বসু। এবার তাঁকে সমীরণ দত্তর মুখোমুখি হতে হবে। প্রাক্তন একজন পুলিশ অফিসারকে ভাঙাটা আরও কঠিন কাজ। তাই সব দিক খতিয়ে দেখে মাঠে নামতে হবে।

অতীতের দুটো পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট তিনি খুঁটিয়ে খুটিয়ে পড়েছেন। মার্ডার ওয়েপনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় রিপোর্টে ওই হিল্ট মার্কটা নিয়ে মিথ্যে কথা লিখেছেন ডাক্তার। তার মানে ধরে নেওয়া যেতে পারে হিল্ট মার্ক ছিল না। একই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে দুটো খুনের ক্ষেত্রে। আসল অস্ত্রটা আর পাওয়া যায়নি। কারণ, পুলিশ আর খুঁজেই দেখেনি।

প্রবীর সেনের পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বলছে, শরীরে হিল্ট মার্ক পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, কোনও ছুরি ব্যবহার করা হয়েছে এক্ষেত্রে। আগের দুটো খুনের মতোই ওপর থেকে নীচে নেমেছে ফলাটা। গভীর ক্ষত। যার ফলে হিল্ট মার্কটা চলে এসেছে। শরীরে পুরো ফলাটাই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। খুব বড়ো ছুরি নয়। ধারালো কিচেন নাইফও হতে পারে!

খুনি যদি একই লোক হয়, তাহলে বলতে হবে সে অস্ত্রবদল করেছে। কিন্তু কেন? একটা খুব অপ্রচলিত বিষ ব্যবহার করল তিনবারই। কিন্তু অস্ত্রটা কেন বদলে দিল?

মিনিট দশেক ভাবার পরে রিপোর্টগুলো ফাইলে ভরে রাখলেন শর্মিষ্ঠা। আগে সমীরণ দত্তর সঙ্গে মোলাকাতটা করে আসা যাক। হয়তো ওখান থেকে কোনও ক্লু মিলতে পারে।

.

বোলপুর স্টেশনের কাছেই প্রাক্তন পুলিশ অফিসারের বাড়ি। আগেই ফোনে কথা বলে নিয়েছিলেন শর্মিষ্ঠা। তাই বাড়িতেই ছিলেন সমীরণ দত্ত। সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন শর্মিষ্ঠা বসুকে।

“আসুন, আসুন, আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম।”

দুজনে বসার পরে সমীরণবাবু জানতে চাইলেন, “চা না কফি?”

“চা-টাই চলুক।”

কাজের লোককে চায়ের কথাটা বলে শর্মিষ্ঠার দিকে তাকালেন সমীরণ দত্ত।

“এবার বলুন কী সাহায্য চান? ফোনে আপনার কথা শুনে মনে হল, এই নতুন মার্ডার কেসটা নিয়ে পরামর্শ চাইছেন।”

“ঠিকই ধরেছেন স্যার। আপনারা অভিজ্ঞ লোক। আপনারা পথ না দেখালে কীভাবে এগোব বলুন?”

আত্মপ্রসাদের হাসি হাসলেন অবসরপ্রাপ্ত অফিসার। “কোনও সমস্যা নেই। সাহায্য করতে পারলে খুশিই হব।”

“আপনার সময় তো একটা দারুণ কেসের সুরাহা করেছিলেন। ওই রক্তকরবী মার্ডারস।”

হাসিটা আরও চওড়া হল সমীরণ দত্তের, “জেনে গিয়েছেন তাহলে। সত্যি একটা কেস ছিল বটে। পুরো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট নড়ে গিয়েছিল। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। দ্রুত ওই কেসটা সলভ করতে না পারলে বোলপুর পুলিশের বেইজ্জতি হয়ে যেত।”

একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে শর্মিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে সমীরণবাবু বললেন, “কী সব দিন গিয়েছে তখন!”

শর্মিষ্ঠা একটু চুপ করে রইলেন। সমীরণবাবুকে গর্বিত হওয়ার সুযোগ দিলেন। তারপরে বললেন, “ওই ব্যাপারটা নিয়েই আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।”

“মানে? ওই কেসটা তো মিটে গিয়েছে কবে। আবার কী হল?” ভ্রূ কুঁচকে উঠল সমীরণবাবুর।

“না মেটেনি, মিস্টার দত্ত,” স্যার সম্বোধন ইচ্ছে করেই আর করলেন না শর্মিষ্ঠা, “অতীত আবার ফিরে এসেছে। প্রবীর সেনকেও প্রথমে রক্তকরবীর বিষ দেওয়া হয়েছিল। তারপরে একই ভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন করা হয়।”

মুখটা হা হয়ে গেল সমীরণ দত্তের। তারপরে দ্রুত সামলে নিলেন নিজেকে, “তার সঙ্গে অতীতের কী সম্পর্ক? ওই কেসেরই বা কী? হয়তো কপিক্যাট কোনও কিলার কাজটা করছে। আপনাদের ভুল পথে চালিত করার জন্য।

“কিন্তু কেন করবে, মিস্টার দত্ত? যখন সবাই জানে, খুনি মারা গিয়েছে পুলিশের গুলিতে? কেউ কি কোনও বার্তা দিতে চাইছে পুলিশকে? আপনাকে?

“মানে? কী বলতে চাইছেন আপনি?” উত্তেজিত হয়ে উঠলেন প্রাক্তন অফিসার।

শর্মিষ্ঠা বুঝলেন, অনেক খেলা হয়েছে। এবার সরাসরি ধাক্কাটা দিতে হবে।

“মিস্টার দত্ত, আপনাকে একটা প্রশ্ন করি। জয়দেব পাড়ুই কি সত্যিকারের খুনি ছিল? নাকি তখন আপনাদের একটা স্কেপগোট এতটাই প্রয়োজন ছিল যে ভালো মতো তদন্ত না করেই একজনকে খুনি সাজিয়ে দিলেন?”

প্রচণ্ড রাগে লাফিয়ে উঠলন সমরীণ দত্ত। তাঁর মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। প্রায় তোতলাতে তোতলাতে বলে উঠলেন, “গেট আউট অব মাই হাউস।”

সামান্য বিচলিত না হয়ে শর্মিষ্ঠা বললেন, “আপনি চুপ করে বসুন মিস্টার দত্ত। উত্তেজিত হবেন না। এই বয়সে উত্তেজনা হার্টের পক্ষে খারাপ।”

বিষদৃষ্টিতে মহিলা পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইলেন সমীরণবাবু।

ধীরে ধীরে পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে আনলেন শর্মিষ্ঠা বসু। তারপরে ডাউনলোড হয়ে থাকা একটা ভয়েস রেকর্ডিং চালিয়ে দিয়ে বললেন, “ভালো করে শুনুন রেকর্ডিংটা। আপনার বন্ধু সব স্বীকার করেছে।”

রেকর্ডিং যত শেষের দিকে এগোতে লাগল, তত রক্তশূন্য হয়ে যেতে লাগল সমীরণ দত্তর মুখ। একেবারে শেষে এসে তাঁর মুখ থেকে শুধু দুটো শব্দ বেরোল-

“হারামি! বেইমান!”

ফোনটা বন্ধ করে তাকালেন শর্মিষ্ঠা, “এবার চুপচাপ প্রশ্নের জবাব দিন। এই রেকর্ডিং বাইরে বেরোলে আপনার পেনশন তো যাবেই, জেলও হবে।”

কোনও কথা না বলে চুপ করে রইলেন অতীতের পুরস্কারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার। কাজের মেয়েটি চুপচাপ এসে দু-কাপ চা আর বিস্কুটের ট্রেটা রেখে গেল টেবলে।

চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে শর্মিষ্ঠা বললেন, “আপনারা তাহলে আসল খুনিকে ধরতে পারেননি?”

আবার লাফিয়ে উঠলেন সমীরণ দত্ত, “না, না ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, পাড়ুই-ই খুন করেছে। ওর খুনের মোটিভ ছিল। সুযোগ ছিল। স্পট থেকে পালাতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু কোনও এভিডেন্স ছিল না। তাই এভিডেন্স তৈরি করতে হয়।”

“ছুরিতে হাতের ছাপটা পাড়ুইকে মারার পরেই নেওয়া হয়েছিল?”

“হ্যাঁ, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। তখনও পাড়ুই মারা যায়নি।”

.

“কেটলিতে করবীর পাতা রাখাটাও তো আপনাদেরই কাজ?”

মাথা নীচু করে রইলেন সমরীণ দত্ত। জবাব দিলেন না।

“আপনারা যদি এতই নিশ্চিত ছিলেন যে পাড়ুই খুন করেছে, তাহলে এনকাউন্টার করলেন কেন? গ্রেফতার করলেন না কেন?”

এই প্রশ্নেও চুপ করে রইলেন সমীরণ দত্ত। জবাবটা দিয়েই দিলেন শর্মিষ্ঠা, “কারণ আপনারা জানতেন, এই কেস কোর্টে দাঁড়াবেই না, এত লুপহোলস রয়েছে কেসটায়। আসল খুনিকে আপনারা ধরতেই পারেননি মিস্টার দত্ত।”

উঠে দাঁড়ালেন শর্মিষ্ঠা বসু। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে শুধু বললেন,

“পাপ কখনও মুছে ফেলা যায় না মিস্টার দত্ত। একদিন না একদিন সেই পাপের চোরাবালিতে ঠিকই তলিয়ে যেতে হয়। ক্রাইম ডাজ নট পে।”

মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার!

.

গাড়িতে উঠে থানার দিকে ফিরছেন, তখনই রিঙ্কির বাবার ফোনটা এল তাঁর মোবাইলে।

“হ্যাঁ, বলুন।”

“রিঙ্কির আঁকা শেষ হয়ে গিয়েছে। আপনি একবার এসে দেখে যান।”

প্রান্তিকের দিকে জিপ ঘোরানোর নির্দেশ দিলেন শর্মিষ্ঠা।

.

আধঘণ্টা পরে রিঙ্কির আঁকা ছবিটা মন দিয়ে দেখছিলেন শর্মিষ্ঠা বসু। প্রবীর সেনের আঁকা ছবির সঙ্গে মিল আছে কি না, তা তাঁর পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু রিঙ্কিও খুব ভালো এঁকেছে। মুখটাকে প্রায় জীবন্ত করে তুলেছে। সত্যিই মেয়েটা সুন্দরী। এখন প্রশ্ন হল, এই মেয়েটি কে?

রিঙ্কির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে এলএসআই বলে উঠলেন, “তুমি সত্যিই খুব প্রতিভাবান। দারুণ এঁকেছ। কাল তৈরি থেকো। তোমাকে নিয়ে আমি বেরোব। আমার সঙ্গে দুপুরের খাবার খাবে। আর তোমার আঁকার জন্য যা যা জিনিস লাগবে, সব আমি তোমাকে কিনে দেব।”

“হুররে,” বলে লাফিয়ে উঠল রিস্কি।

.

থানায় পৌঁছেই সহকারীকে ডেকে পাঠালেন শর্মিষ্ঠা, “এই পেন্টিংটার গোটা পঁচিশেক ফটোকপি করুন, সঙ্গে আমার ফোন নম্বর দিয়ে দিন। তারপরে ছড়িয়ে দিন শান্তিনিকেতনে। দোকানে-বাজারে আর অবশ্যই ইউনিভার্সিটিতে। ছবিটা দেখে মেয়েটার বয়স অল্পই মনে হচ্ছে।”

.

কয়েকঘণ্টার মধ্যেই শান্তিনিকেতনে ছড়িয়ে পড়ল রিঙ্কির আঁকা ছবি। বিকেলের দিকে ইউনিভার্সিটিতেও ঘুরতে লাগল ছবিটা।

অনেকেরই বেশ চেনা চেনা লাগলেও ঠিক যেন ধরতে পারছিল না।

তারপরে বুঝতে পারল একটা মেয়ে। ফোর মাস্কেটিয়ার্সের একজন। ছবিটা হাতে নিয়ে চমকে উঠল শতাব্দী।

এ তো বনমালার মতো লাগছে। হুবহু নয়, কিন্তু অনেকটাই মুখের মিল আছে। আর খোঁপায় গোঁজা ওই রক্তকরবী।

ছবির সঙ্গে একটা ফোন নম্বরও দেওয়া আছে। কেউ কিছু জানলে ওই নম্বরে ফোন করার কথা বলা হয়েছে।

একটু সময় ভাবল শতাব্দী। ফোনটা সে কাকে করবে? মালাকে নাকি পোস্টারে দেওয়া ওই ফোন নম্বরে?

তারপরে তৃতীয় একটা নম্বর ডায়াল করল শতাব্দী। উলটো দিকে হ্যালো শুনেই দ্রুত বলে উঠল, “দাদা, তুই এখনই ইউনিভার্সিটির মেন গেটে চলে আয়। খুব জরুরি দরকার। একদম দেরি করিস না।”

মিনিট পনেরোর মধ্যেই হাজির হয়ে গেল মানিক। তাকে ছবিটা দেখিয়ে শতাব্দী বলে উঠল, “চিনতে পারছিস?”

মানিক এক ঝলক দেখেই বলে উঠল, “বনমালার ছবি না?”

“হুবহু নয়, তবে প্রচুর মিল আছে।’

“এটা কীসের পোস্টার?” কৌতূহলী হয়ে উঠল মানিক।

“পুলিশের লোক ছড়িয়ে দিয়েছে ক্যাম্পাসে। খোঁজ করছে মেয়েটার ব্যাপারে।”

ভাই-বোন পরস্পরের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল বেশ কয়েক সেকেন্ড।

দুজনের মনেই তখন ঝড় উঠেছে। পুলিশ তাহলে বনমালাকে খুঁজছে। নিশ্চয়ই ওই প্রবীর সেনের খুনের জন্য।

ভাগ্য তাদের সামনে একটা দারুণ সুযোগ এনে দিয়েছে। নিজেরা না জড়িয়েও আঙুলটা তোলা যাবে বনমালার দিকে। পুলিশি তদন্তও ঘুরে যাবে ওইদিকে। মানিক হাসল। শুধু পথের কাঁটাই সরানো নয়, অনেকদিনের জ্বালাটাও জুড়োনো যাবে। নিশ্চিন্ত মনে আবার ঘুমানো যাবে। যেরকম গিয়েছিল সাত বছর আগে পুলিশ ওই লোকটাকে গুলি করে মারার পরে!

“আর দেরি করিস না, ফোনটা কর, “ বোনের দিকে তাকিয়ে বলে ফেলল মানিক।

শতাব্দীও জানত, এই একটা ফোনে তার সামনের রাস্তাটাও পরিষ্কার হয়ে যাবে। বনমালা ফাঁদে পড়বে। যে ফাঁদ কেটে মেয়েটার পক্ষে বেরিয়ে আসা কঠিন।

মোবাইলটা হাতে নিয়ে পোস্টারে লেখা নম্বরটার উপরে চোখ রাখল শতাব্দী। তারপরে ডায়াল করা শুরু করল।

উলটো দিক থেকে এক মহিলা কণ্ঠ বলে উঠল, “হ্যালো, আমি শর্মিষ্ঠা বসু বলছি।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *