১৪
শান্তিনিকেতন, ২০২১
সিংহবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময়ই শর্মিষ্ঠা বুঝেছিলেন, এই বাড়ির লোকগুলো মোটেই সহজ নয়। সবার মনের গভীরে একটা অন্ধকার সত্য লুকিয়ে আছে। সেই সত্যটাকে সামনে আনতে হবে তাঁকে।
.
পরের দিন কমলেশরা তখনও নতুনগীত গ্রামে পাড়ুই বাড়িতে গিয়ে পৌঁছোতে পারেননি। নিজের ডেস্কে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে গিয়েছিলেন শর্মিষ্ঠা।
তিনি নিশ্চিত, অতীতের দুটো খুনের ঘটনার সঙ্গে এই খুনটাও জড়িয়ে আছে। প্রবীর সেন এবং দীনেন্দ্র সিংহ এই নাটকের প্রধান দুই চরিত্র। একজন খুন হয়ে গিয়েছে, অন্যজন মদে ডুবে। সেই তিন বন্ধুর দুজনই আর ইহলোকে নেই।
গতকাল রাতে দীনেন্দ্র সিংহের মুখের ভাব দেখে শর্মিষ্ঠা বুঝে যান, তিন বন্ধুর মধ্যে কখনওই সুস্থ সম্পর্ক ছিল না। খুব সম্ভবত ত্রিকোণ প্রেমের কোনও কাহিনি তৈরি হয়েছিল। প্রবীর সেন অত্যন্ত সাদামাটা গরিব ঘরের একটা ছেলে। না ছিল শারীরিক সৌন্দর্য, না অর্থের জৌলুস। উলটো দিকে, দীনেন্দ্র সিংহ যেরকম বনেদি বড়োলোক, সেরকমই সুপুরুষ, ব্যক্তিত্ববান। কে রাজকন্যাকে জিতে নিয়েছিল, বুঝতে সমস্যা হয় না।
অতীতের খুন দুটোর ব্যাপারে তাঁকে আরও কিছু জানতে হবে।
ওসি প্রণব দাসের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।
ওসি-র ইঙ্গিতে উলটো দিকের চেয়ারে বসে শর্মিষ্ঠা বললেন, “ওই সিংহবাড়িটা বড়ো অদ্ভুত। ওই বাড়ির কেউই সোজা সরল নয়।”
প্রণববাবু হাসলেন, “বনেদি বড়োলোক ওরা। প্রভাবশালী। ওরা তো অদ্ভুত হবেই।”
“একটা ব্যাপার স্যার। আপনি কি জানেন, দীনেন্দ্র সিংহের ছোটোবেলার বন্ধু ছিল প্রবীর সেন?”
“তাই নাকি? ভেরি ইন্টারেস্টিং।” সোজা হয়ে বসলেন প্রণববাবু
“আমি কিন্তু একটা ত্রিকোণ প্রেমের ইঙ্গিত পেলাম। প্রবীর সেনকে সহ্য করতে পারত না দীনেন্দ্র।”
“তুমি কি বলছ এই ঘটনার সঙ্গে দীনেন্দ্র জড়িয়ে?”
“হতে পারে স্যার। আচ্ছা, একটা কথা জানার ছিল। সাত বছর আগে প্রথম খুনটা কোথায় হয়েছিল ঠিক? মানে শান্তিনিকেতনের কোন এলাকায়?”
একটু চুপ করে থেকে জবাব দিলেন প্রণব দাস, “সিংহবাড়ির পাশের বাড়িতে। দত্ত স্যারের সঙ্গে আমি ছিলাম তদন্তে।”
“মাই গড,” চমকে উঠলেন শর্মিষ্ঠা।”
“ওই অবসর নেওয়া প্রফেসর ছিল দীনেন্দ্র সিংহের বন্ধু। ওর কাছে ইংরেজি পড়তে যেত দীনেন্দ্র সিংহের মেয়ে বনমালা। খুনের রাতেও গিয়েছিল।’
স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন শর্মিষ্ঠা। তারপরে বললেন, “তখন মেয়েটার বয়স কত ছিল?”
“চোদ্দো বছর। ও কিছুই দেখেনি। যা ঘটেছে ওর চলে আসার পরে। বাচ্চাটাকে বেশ কয়েকবার জেরা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই এক কথা বলেছিল। বাচ্চাটা সত্যিই কিছু জানত না। নাহলে পুলিশি জেরার মুখে একবার না একবার সত্যি কথা বেরিয়ে যেত। ওইটুকু বাচ্চার পক্ষে জেরার মুখে দিনের পর দিন মিথ্যা বলে যাওয়া সম্ভব ছিল না।”
শর্মিষ্ঠা বুঝলেন, প্রণববাবু ঠিক কথাই বলছেন।
“পরের খুনটা কোথায় হয়েছিল?”
“ওটাও সিংহবাড়ির কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে।”
“এর সঙ্গেও কি বাড়ির কোনও সদস্যের যোগাযোগ ছিল?”
“ঈপ্সিতা বলে যে ভদ্রমহিলা খুন হয়েছিলেন, তিনি এখানে তাঁর বন্ধুর সঙ্গে থাকতেন। ঈপ্সিতা নাচের স্কুল চালাতেন।”
“সেখানে কি নাচ শিখতে যেত বনমালা?”
“হয়তো যেত। কিন্তু খুনটার পরপরই পাড়ুইয়ের ব্যাপারটা সামনে চলে আসে। সবার নজর চলে যায় পাড়ুইয়ের উপরে। ওই ব্যাপার নিয়ে আর খোঁজখবরও করা হয়নি।”
সেটা বুঝতেই পেরেছিলেন শর্মিষ্ঠা। সবাই তখন দ্রুত নিজের পিঠ বাঁচাতে নেমে পড়েছিল। যে কারণে একজন আসামির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সমীরণ দত্ত আর ডক্টর অমর চৌধুরী তাঁর কাছে যে সব ফাঁস করে দিয়েছে, সে ব্যাপারটা আর ওসি-কে জানাননি শর্মিষ্ঠা। ভদ্রলোক কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবেন, কে জানে।
অনুমতি নিয়ে উঠে পড়ছিলেন শর্মিষ্ঠা। তখন আর একটা কথা বললেন প্রণব দাস-
“ঈপ্সিতা এখানে শোভনা বলে এক ভদ্রমহিলার বাড়িতে থাকতেন। দীর্ঘদিনের বন্ধু। জানা যায়, দুজনে সমকামী ছিলেন। এবং দুজনের মধ্যে যৌন সম্পর্কও হত। পাড়ুই সেটা দেখে রাগে পাগল হয়ে যায়। কয়েকজন বন্ধুকে সে কথা বলেওছিল। মৃতের প্রতি সম্মান দেখানোর কারণে ওই সমকামী ব্যাপারটা আর মিডিয়ার সামনে আনা হয়নি।”
নিজের ডেস্কে ফিরতে ফিরতে শর্মিষ্ঠা ভাবছিলেন, এই রক্তকরবী মার্ডার কেসটা প্রতিদিন নিত্য নতুন চেহারা নিচ্ছে।
ডেস্কে বসে শান্তিনিকেতনের একটা ম্যাপ আনিয়ে নিলেন শর্মিষ্ঠা। আর পুরোনো ফাইল। দ্বিতীয় খুনের ঠিকানাটা দেখে নিলেন। তারপরে ম্যাপের উপরে একটা সার্কল বানালেন।
সিংহবাড়ির তিন কিলোমিটার রেডিয়াসের মধ্যে দুই ভিকটিমের বাড়ি। আরও একটা বাড়ি পড়ছে এই রেডিয়াসের মধ্যে। অরণ্য রায়দের বাড়ি।
এই ছেলেটা সম্পর্কেও খবর নিয়েছেন শর্মিষ্ঠা। বনমালার ছোটোবেলার বন্ধু। একসঙ্গে বড়ো হয়েছে। তারপরে ছেলেটা কলকাতায় হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে। কিছুদিন হল শান্তিনিকেতনে ফিরেছে। আর তারপরেই তৃতীয় খুন।
অর্থাৎ, প্রথম দুটো খুনের সময় যে সব চরিত্র শান্তিনিকেতনে আর ভিকটিমদের বাড়ির আশপাশে ছিল, তারা এবারও মজুত আছে।
শর্মিষ্ঠার মনে আর একটা প্রশ্ন খেলা করতে লাগল।
এরা ছাড়া আর কি কেউ ছিল, যার ওই দুই ভিকটিমের বাড়িতেই যাওয়ার সুযোগ ছিল? বিশেষ করে খুনের ঘটনার এক-আধদিনের মধ্যে? এমন কেউ যে এই দু-কিলোমিটার সার্কলের বাইরে পড়ছে?
দুজন ভিকটিমই শিক্ষক। দুজনের কাছেই নিশ্চয়ই আরও অনেক শিক্ষার্থী আসত। বনমালা ছাড়া আর কি এমন কেউ ছিল, যে চঞ্চল এবং ঈপ্সিতার কোচিংয়ে যেত?
শর্মিষ্ঠা বুঝে গেলেন, এই প্রশ্নের উত্তরটাও তাঁকে দ্রুত বার করতে হবে। প্রয়োজনে বনমালার সঙ্গে আরও একবার কথা বলতে হবে। এই প্রশ্নের উত্তরটা বনমালার কাছ থেকেই পাওয়া যাবে।
অরণ্যকে দেখে একটা কথা বুঝে গিয়েছেন শর্মিষ্ঠা। এই ছেলেটা বনমালাকে ভীষণই ভালোবাসে। এই বয়সের ভালোবাসা যেরকম অন্ধ হয়, সেরকমই মাত্রাছাড়া। এই ভালোবাসার আগুনে অনেকেই পুড়ে ছারখার হয়ে যায়।
মায়ের মতো মেয়ের জীবনেও কোনও ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনি নেই তো? এমন কেউ যে দূর থেকে বনমালাকে চায়? তার কাছে কেউ এলে সরিয়ে দিচ্ছে? নাকি ত্রিকোণ প্রেমে এবার অন্য কোনও অঙ্ক যোগ হয়েছে?
.
শর্মিষ্ঠার ভ্রূটা কুঁচকেই রইল। নিজের ডায়রিটা টেনে নিলেন তিনি। তিনটে হত্যার কয়েকটা পয়েন্ট আলাদা করে ডায়রিতে লিখে রেখেছেন। যে সব জায়গায় মিল পেয়েছেন, আর যে সব জায়গায় পাননি।
অমিল পাওয়া যাচ্ছে দুটো ব্যাপারে।
এক, সিংহবাড়িকে সেন্টার ধরলে খুনের বৃত্তটা বেড়ে গিয়েছে। সার্কলটা বেড়ে এখন প্রায় দশ কিলোমিটার ছড়িয়ে গিয়েছে।
দুই, হাতিয়ার বদলেছে। ধারালো অস্ত্র হলেও সেটা দু-রকমের অস্ত্র। দ্বিতীয়টা ধরেই নেওয়া যেতে পারে কোনও ছুরি। কিন্তু প্রথমটা কী ছিল? আর বদলে গেলই বা কেন? একটা জবাব হতে পারে, সাত বছর আগের হাতিয়ার আর খুনির কাছে নেই। তাই সে অন্য হাতিয়ার খুঁজে নিয়েছে। এই হাতিয়ারটা সে এবার সহজেই জোগাড় করতে পেরেছে, যেটা অতীতে পারেনি।
প্রশ্ন হল, অতীতে কী ছিল হাতিয়ারটা? এবং কীভাবে সেটা খুনি পেয়েছিল?
আরও একটা প্রশ্ন ঘুরছে শর্মিষ্ঠার মাথায়। খুনের সার্কলটা কেন বড়ো হল? বৃত্তটা কেন বাড়ল? শুধুই কি প্রবীর সেন বলে? নাকি অন্য কোনও কারণ আছে?
একটা থিওরি অবশ্য তৈরি করেছেন শর্মিষ্ঠা। কিন্তু সেটা এখনও পর্যন্ত থিওরির স্তরেই আছে। প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ করে উঠতে পারেননি।
সেটাই এখন তাঁকে করতে হবে। আর একটা ব্যাপার দেখতে হবে। অঙ্কে আর কোনও অতিরিক্ত ফ্যাক্টর যোগ হচ্ছে কি না। এমন কেউ যে তাঁর রেডারে এখনও আসেনি। শর্মিষ্ঠার ভ্রূটা কুঁচকেই রইল।
.
আরও একটা দিন কেটে গেল।
সে দিনটা নিজেকে ঘরেই আটকে রাখল বনমালা। অরণ্যকেও বলে দিল দেখা হবে না। কীভাবে অরণ্যর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? কীভাবে বলবে, নিজের পিতৃপরিচয় সে ঠিক করে জানে না!
মিনতি মাসি অতি সাধ্যসাধনা করে দু-মুঠো খাওয়াল বনমালাকে। তারপরে হাত জোর করে বলল, “তুমি ঘরে থাকো, ঠিক আছে। কিন্তু দয়া করে দরজা ভিতর থেকে বন্ধ কোরো না। ভেজিয়ে রাখো।”
মিনতি মাসির কথাটা শুনেছিল বনমালা।
রান্নাঘরে ঢুকে বিরসমুখে কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করলেন মিনতি মাসি। তার হয়েছে যত জ্বালা। ইচ্ছে করছে, কাজ ছেড়ে চলে যান। কিন্তু এই ছেলে- মেয়ে দুজনকে ছেড়ে যেতেও মন চায় না।
বোনের মতো দাদারও মতিগতি বোঝা ভার। সকাল থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, খায়নি-দায়নি। কখন ফিরবে কে জানে!
অনেক রাত করে ফিরেছিল জয়ন্ত। তারপরে সে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। ভাই-বোনের কেউই আর রাতে খেতে আসেনি। দীনেন্দ্র সিংহও নয়।
কার এক ভয়াল অভিশাপে সিংহবাড়ি যেন ক্রমে ডুবে যাচ্ছিল অন্ধকারে।
.
পরের দিন সকাল আটটা নাগাদ খবরটা পেলেন লেডি সাব ইন্সপেক্টর শর্মিষ্ঠা বসু।
কোপাইয়ের পাড়ে একটি মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে। লাশের পাশে মদের বোতল। তলপেট ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন!
