১২
শান্তিনিকেতন, ২০১৪
মাটির মধ্যে সজোরে খুরপিটা গেঁথে গালাগালি দিয়ে উঠল লোকটা।
“শালা, একেবারে সর্বনাশ করে দিচ্ছে আমাদের এলাকার,” রাগে গরগর করতে করতে বলল জয়দেব পাড়ুই।
তাকে ঘিরে তখন জনা তিনেক লোক বসা। জায়গাটা বোলপুরের কাছে নতুনগীত গ্রামে।
তাদের একজন জয়দেবকে শান্ত করার চেষ্টা করল, “আরে কী হয়েছে বলো না। এত খেপে গেলে কেন?”
মধ্য তিরিশের লোকটা আগুন চোখে তাকাল তার সঙ্গীদের দিকে, “ঘেন্না, ঘেন্নায় মরে গেলাম। চোখে দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কী ঘটছে!”
অন্য লোকগুলো উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল জয়দেব পাড়ুইয়ের দিকে। লোকটা কোনওমতে উগড়ে দিল কথাগুলো—
“দুটো মেয়েছেলে জড়াজড়ি করছে, একে অন্যের বুকে হাত বোলাচ্ছে, নিজেদের মধ্যে চুমু-চাপ্টা করছে, ভাবতে পারিস? আমি আর দেখতে পারিনি। চলে এসেছি। এরপরে বোধহয় কাপড়-চোপড়ও খুলে ফেলবে।”
“কী বলছ গো? দুটো মেয়ে নিজেদের মধ্যে এ সব করছে? তুমি ঠিক দেখেছ তো হে?”
“আরে হ্যাঁ, নিজের চোখে সব দেখলুম। আমি অন্ধ নাকি?”
আর একটা লোক বলে উঠল, “আমি কিন্তু এ সব শুনেছি। দুটো মেয়ে নিজেদের মধ্যেও এ সব করে। ওরা ছেলেদের সঙ্গে করে না।”
“ছি, ছি, কী হচ্ছে আমাদের বোলপুরে!” ঘৃণায় নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠল একজন। “আমাদের ছেলে-মেয়েরা এ সব দেখলে কী শিখবে বল! পুরো পরিবেশটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বাইরে থেকে আসা ওই লোকগুলোর জন্য।”
এই কথাটা সবাই একবাক্যে মেনে নিল। নেশা-ভাঙ করা, ছোটো ছোটো, খোলামেলা পোশাকে ঘুরে-বেড়ানো, এ সব তো ছিলই শান্তিনিকেতনের ওই ছেলে-মেয়েগুলোর মধ্যে। এর সঙ্গে এখন এইসব নোংরামিও জুড়ে গেল। এই পুরো বোলপুর অঞ্চল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ওই শান্তিনিকেতনের লোকগুলোর জন্য।
লোকগুলো গজরাতে লাগল রাগে। জয়দেব চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “ইচ্ছে করে এই বাইরের পাপগুলোকে কেটে ভাসিয়ে দিই কোপাইয়ের জলে।”
.
বাবার গলাটা পেয়ে আতঙ্কে প্রায় জমে গেল বনমালা। তার সঙ্গে কথা প্রায়ই বলে না বাবা। কাছে এলেও অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। যেন বনমালার মুখটাই দেখতে চায় না। সেই লোক ওই রকম করে চেঁচিয়ে উঠলে চমকে ওঠারই তো কথা—
“এটা কী করেছ তুমি? এত সাহস পেলে কোত্থেকে?”
বনমালা থরথর করে কেঁপে উঠল। চোখ দিয়ে টসটস করে জল পড়তে লাগল। বাবার গর্জন শুনে ততক্ষণে ছুটে এসেছে দাদা।
“কী হল বাবা, বকছ কেন মালাকে?” দুজনের মাঝে দেওয়াল হয়ে দাঁড়াল জয়ন্ত।
বাবা তখনও রাগে ফুঁসছেন।
“ওর চুলে ওটা কী গোঁজা? আমি বারণ করা সত্ত্বেও কেন ওই ফুলটা চুলে গুঁজেছে?” মালার দিকে ঘুরে তাকিয়ে জয়ন্ত বুঝতে পারল, বাবার রাগের কারণটা কী! মালাও ততক্ষণে বুঝে গিয়েছে।
যত ঝামেলার কারণ, চুলে গোঁজা ওই রক্তকরবী!
“কত বার না তোমাকে বলেছি, ওই ফুলে হাত দেবে না। ওই গাছে হাত দেবে না। কানে কথা যায় না তোমার?” কথা শেষ করে জয়ন্তর দিকে ঘুরে দীনেন্দ্র সিংহ বলে উঠলেন, “ওই ফুলটা এখনই সরাও ওর মাথায় থেকে। দূরে কোথাও ফেলে দেবে। আর তারপরে সাবান দিয়ে হাতটা ভালো করে ধুয়ে নেবে। ওই ফুল আমি দেখতে চাই না।” বলেই হনহন করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন তিনি।
জয়ন্ত এগিয়ে এসে বোনের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ঘরে। “চল, মন খারাপ করিস না। বাবা কত বার বলেছে, এই ফুলটা বিষাক্ত। তাও যে কেন কথা শুনিস না।”
বনমালা ঠোঁটটা ফুলিয়ে পিছন পিছন চলল।
.
তার কী দোষ। সে তো বন্ধুদের কতবার বলেছে বাবার কথাটা। রক্তকরবী দেখতে পেলেই বনমালা তার বন্ধুদের সতর্ক করে দিয়ে বলত, “ওই গাছটা ধরবি না একদম। বাবা বলে দিয়েছে, গাছটা ভীষণ বিষাক্ত।”
“ছাড় তো তোর বাবার কথা! সব জানে বুঝি,” হেসে উঠে বলেছিল অরণ্য। বাকিরাও তাল মিলিয়েছিল। শতাব্দী তো অরণ্যের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ফেলে, “জানিস, আমাদের বাড়িতেও কিন্তু রক্তকরবীর গাছ আছে। দাদা খুব পছন্দ করে। আমি বিষের কথাটা বলেছিলাম। দাদা তো হেসে উড়িয়ে দিয়েছে।”
“তাহলেই বোঝ,” অরণ্য আবারও হেসে ওঠে।
মালা আর কিছু বলেনি। এইরকম বেশ কয়েকবার হয়েছে। কিন্তু বন্ধুরা তার কথা পাত্তা না দিয়ে অনেক সময়ই রক্তকরবীর ফুল তুলে নিত গাছ থেকে।
বনমালাও বাদ যেত না। এই ফুলটা তাকে ভীষণভাবে টানে। দেখে মনে হয়, খুব চেনা ফুল। কোথায় যেন দেখেছে। কী রং! রক্তের মতো লাল। এই ফুলের ডাক মালা উপেক্ষা করতে পারত না। মনে পড়ে যেত মায়ের ওই ছবিটার কথা। মায়ের খোঁপাতেও তো রক্তকরবী গোঁজা।
তাই মাঝে মাঝে বাবার নির্দেশ উপেক্ষা করেই ফুল তুলে নিত। কিন্তু বাড়ি ঢোকার আগেই ফেলে দিত ফুলটা।
আজ ভুল হয়ে গিয়েছে। ফুলটা যে তার মাথায় গোঁজা, একেবারেই মনে ছিল না। যে কারণে বকা খেতে হল। যাই হোক। বিকেল হয়ে গিয়েছে। তাকে দ্রুত তৈরি হতে হবে। তারপরে দাদার সঙ্গে যাবে ঈপ্সিতা ম্যামের ক্লাসে নাচ শিখতে।
.
ঈপ্সিতা একবার ঘড়িটা দেখে নিলেন। এখনও আধঘণ্টা হাতে সময় আছে। কয়েকটা জিনিস কিনে দ্রুত ফিরতে হবে তাঁকে। শোভনা কয়েকদিনের জন্য কলকাতায় গিয়েছেন। সপ্তাহখানেক বাদে ফিরবেন। ছেলে এসেছে বেঙ্গালুরু থেকে। যে কারণে তাঁকে দোকানে আসতে হয়েছে।
তবে এখনও সময় আছে। সাড়ে পাঁচটার আগে বাচ্চাগুলো আসবে না। তাঁর কয়েকটা আঁকার জিনিস লাগবে। যেমন একটা বড়ো খাতা, একটা স্কেচপেনের সেট। এই দোকানটায় জিনিসগুলো আছে।
“ওই স্কেচপেনের সেটটা আর একটা বড়ো সাদা আঁকার খাতা দিন না আমায়,” বলে মানিব্যাগটা বার করতে গেলেন ঈপ্সিতা। দোকানদার মুখ ঘুরিয়ে অন্য একজন লোকের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ঈপ্সিতা আবার বললেন, “ওই জিনিস দুটো দিন।”
লোকটা অন্যদিকে তাকিয়েই জবাব দিল, “হবে না ওইসব জিনিস। এগুলো বিক্রি করব না।”
“মানে?” দুম করে মাথাটা গরম হয়ে গেল ঈপ্সিতার, “দোকানে সাজিয়ে রেখেছেন, অথচ বিক্রি করবেন না মানে কী?”
লোকটা এবার খিঁচিয়ে উঠল, “আপনাকে অত কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি? হবে না মানে হবে না।
লোকটার মেজাজ দেখে আর কথা বাড়ালেন না ঈপ্সিতা। তাঁকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে।
তবে ঈপ্সিতাও শান্ত হতে পারছিলেন না। এই ব্যাপারটা নিয়ে অবশ্য শোভনা তাঁকে আগেই সাবধান করে দিয়েছিলেন। অদ্ভুত একটা মানসিক প্রাচীর যেন উঠে গিয়েছে দু-পক্ষের মধ্যে। দু-পক্ষ বলতে, একদিকে শান্তিনিকেতন, যে দলে পড়ছে ছাত্র-ছাত্রীরা, অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, বাইরে থেকে এসে শান্তিনিকতনে বড়ো বড়ো বাড়ি বানিয়ে থাকা লোকেরা। অন্য দলে বোলপুর এবং সংলগ্ন এলাকা জুড়ে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষেরা। দু-দলের মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনধারণ— সবকিছুই অনেক আলাদা। আর এই বৈষম্যটাই দুটো দলের মাঝে এই অদৃশ্য প্রাচীরটা তুলে দিয়েছে।
ঈপ্সিতা অবশ্য একটা কথা বুঝতে পারেন। বিশ্বভারতীতে এত বিদেশি ছাত্র- ছাত্রী পড়তে আসে যে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা স্বাভাবিক। ছাত্র- ছাত্রীদের একটু খোলামেলা জীবনযাত্রা অনেকেরই আবার পছন্দ নয়। এই দ্বন্দ্বটা মাঝেমাঝেই প্রকাশ্যে চলে আসে। তখন হয় সমস্যা। বিশেষ করে মেয়েরা একা থাকলে অবহেলার চোখেই দেখা হয় তাদের।
কিন্তু কিছু করার নেই। শান্তিনিকেতনে থাকতে গেলে এইসব মেনে নিতেই হবে। তিনি আর অপেক্ষা করলেন না। একটা রিকশা ডেকে দ্রুত রওনা দিলেন বাড়ির দিকে।
বাচ্চাগুলো এসে বাইরে অপেক্ষা করবে, এটা মোটেই ভালো দেখাবে না।
.
ঘণ্টা দেড়েক পরে নাচের ক্লাস শেষ হল। শান্তিনিকেতনে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।
বনমালার পাশে এসে বসল শতাব্দী। তারপরে ফিশফিশ করে বলল, “কী রে মালা, পুলিশ আর এসেছিল তোর কাছে?”
গত দু-সপ্তাহ ধরে ওই একটা ভয়ংকর খুন নিয়েই হইচই চলছে শান্তিনিকেতনে। নানা লোকজনের সঙ্গে কথা বলছে পুলিশ। স্কুলে তো তারা দুজন রীতিমতো সেলিব্রিটি হয়ে গিয়েছে। বনমালা আর শতাব্দীকে যে পুলিশ জেরা করেছে! বন্ধুরা সবাই হামলে পড়ে জানতে চাইছে, পুলিশ কী কী প্রশ্ন করেছে?
শতাব্দীর প্রশ্নের জবাবে বনমালা বলল, “হ্যাঁ, আবার এসেছিল। আবারও সেই একই কথা জিজ্ঞেস করেছে।”
শতাব্দী বলে উঠল, “কী ভয়ংকর ব্যাপার বল। পুলিশ এসে আমার সঙ্গে, দাদার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছিল। মা-বাবার সঙ্গেও বলে। আমি তো ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। দাদা খুব রেগে গিয়েছিল।”
শতাব্দীর দাদা মানিক যে বেশ রাগী, সেটা বনমালা ভালোই জানে। তাদের চেয়ে অনেকটাই বড়ো। সে এড়িয়ে চলে মানিককে। সেই মানিকের গলাই পাওয়া গেল বাইরে থেকে। শতাব্দী উঠে পড়ল।
.
বাকিরা বেরিয়ে গিয়েছে। শুধু বসে বনমালা।
ঈপ্সিতা এসে বসলেন মেয়েটার পাশে। তারপরে ধীরে ধীরে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “তুই খুব সুন্দর নাচিস মালা। তোর কোনও চিন্তা নেই। তোকে আমি সবকিছু ভালো করে শিখিয়ে দেব, কেমন?” বলে বনমালার গালটা একটু টিপে দিলেন ঈপ্সিতা।
কোনও কথা না বলে মাথাটা নীচু করে বনমালা বলল, “ওকে আন্টি।”
ঈপ্সিতা উঠে দাঁড়ালেন, “দাঁড়া, তোর জন্য একটা কোল্ড-ড্রিঙ্কের বোতল বার করি। চুপচাপ বসে থেকে কী করবি।”
ঘরের মধ্যে গিয়ে দুটো বোতল আর দুটো গ্লাস নিয়ে চলে এলেন ঈপ্সিতা। তারপরে একটা গ্লাস আর ঠান্ডা পানীয়র বোতলটা বনমালার দিকে এগিয়ে দিয়ে ঈপ্সিতা বললেন, “এটা তোর জন্য। আমার জন্য এটা।” বলে বড়ো বোতল থেকে সোনালি তরল পদার্থ গ্লাসে ঢাললেন ঈপ্সিতা।
একটু ঝাঁঝালো গন্ধে বনমালা বুঝে গেল বোতলটা কীসের। সে বড়ো হয়েছে, জানে। বাড়িতে বাবাকেও যে এরকম বোতল থেকে খেতে দেখেছে। কয়েকদিন আগে খুন হয়ে যাওয়া মজুমদার জেঠুও এইরকম বোতল থেকে পানীয় ঢেলে খেতেন। বনমালা জানত, পানীয়টা মদ। ছোটোদের ভুলেও তাকাতে নেই।
গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে ঈপ্সিতা বললেন, “মালা, তুই একটা কাজ করিস। তুই পাঁচটার মধ্যে আমার কাছে চলে আসিস। আর তোর দাদাকে বলিস, একটু পরের দিকে আসতে। তোকে আলাদা করে শিখিয়ে দেব, কেমন?”
“আচ্ছা আন্টি,” বলে মাথা নাড়ল মালা। কোল্ড-ড্রিঙ্কসের বোতলের ছিপি খোলা থাকলেও সে পানীয়টা গ্লাসে ঢালেনি। তার আগেই বাইরে থেকে শোনা গেল দাদার গলা- “মালা, ক্লাস শেষ হলে চলে আয়।”
“ওই তো দাদা এসে গিয়েছে। আমি চলি।” বলেই লাফিয়ে উঠল মালা। তারপরে দ্রুত এগিয়ে গেল দরজার দিকে। পিছন থেকে ঈপ্সিতা বলে উঠলেন, “সাবধানে যাবি।”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাড়িটা ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু সে আর রান্নার মাসি আছে বাড়িতে। যে কদিন শোভনা কলকাতায় থাকবে, সে কদিন মাসি রাতে শোবে এই বাড়িতে। শোভনা ব্যবস্থা করে গিয়েছে।
.
ধীরে ধীরে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বাড়তে থাকা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন ঈপ্সিতা।
