প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ১.৫

শান্তিনিকেতন, ২০২১

অরণ্যর ফোনটা পাওয়ার পর থেকে মনটা একটু বিষণ্ণ হয়েছিল বনমালার। সে মেয়ে। সে বুঝতে পারে কেন একটা ছেলে তার সঙ্গে আলাদা করে ডেকে কথা বলতে চাইছে। বিশেষ করে যেখানে তারা সবাই নিয়মিত দেখা করে।

বন্ধুত্বের গণ্ডি ভেঙে আরও একটু কাছে আসতে চাইছে অরণ্য। তাতে অবশ্য বনমালা অবাক হল না। ছোটোবেলা থেকেই তার প্রতি যে অরণ্যর একটা আলাদা টান আছে, সেটা বনমালা লক্ষ করেছিল। কিন্তু তখন তারা ছোটো ছিল। খুব কাছের বন্ধু। প্রায় একসঙ্গে ওঠাবসা ছিল। তারপরে একটা ঝড় আছড়ে পড়ে শান্তিনিকেতনে। তাদের দূরে ঠেলে দেয়। ক্লাস টুয়েলভের পরে অরণ্যকেও কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানেই পড়াশোনা। মাঝেসাজে অল্প কয়েকদিনের জন্য আসত। টুকটাক গল্প হত। তার বেশি কিছু নয়।

এবার ছবিটা অন্য। তাদের হাতে সময় আছে। মেলামেশাটাও বেশি হচ্ছে। আর তাই হয়তো মরিয়া হয়ে উঠেছে অরণ্য।

কিন্তু সে তো ওই চোখে দেখেনি ছেলেটাকে। সে আটকে যেতে চায় না কোনও গণ্ডিতে। বনমালার চোখ সুদূর কোনও দিগন্তে, যেখানে সে হারিয়ে যেতে চায়।

অরণ্যর মুখটা মনে পড়তে একটু খারাপই লাগল বনমালার। ভাবল, আলাদা করে দেখা করার দরকার নেই। কাটিয়ে দেবে। তাহলেই নিশ্চয়ই অরণ্য বুঝতে পারবে তার মনোভাব।

তারপরেই বাবার মুখটা ভেসে উঠল বনমালার মনে। গম্ভীর মুখে বলা সেই কথাগুলো কানে বাজতে লাগল মেয়েটার—“ছেলেটার সঙ্গে দেখা করা চলবে না তোমার।”

কঠিন হয়ে গেল বনমালার মুখ। লোকটা কে তাকে বারণ করার? কোনওদিন তো ভালো করে কথা পর্যন্ত বলেনি। যখন সে ছোটো ছিল, একটা গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলা হয়েছিল তাকে। কিন্তু এখন সে বড়ো, কী করবে না করবে সেটা সে নিজেই ঠিক করবে।

পরের দিন সকালে অরণ্যকে ফোনটা করল বনমালা।

“কোথায় দেখা করতে চাস তুই?”

অরণ্য সামান্য ভেবে জবাব দিল, “কোপাই নদীর ধারটায় চলে আয় না। সেই জায়গাটা, যেখানে তুই মাঝে মাঝে একা একা গিয়ে বসে থাকিস।”

সত্যিই তাই। কোপাইয়ের ওই জায়গাটা বনমালার খুব প্রিয়। যখন মন খুব খারাপ থাকে, তখন ওই নদীর ধারে চলে যায় সে। একা একা। বন্ধুরাও তার এই অভ্যাসের কথা জানে। ওই সময় তাই মালাকে একা ছেড়ে দেয় ওরা। কোপাইয়ের তীরে পসরা সাজিয়ে বসে থাকে অনেকেই, বাউলরা গান গায়। সেসব গান মাঝে মাঝে বসে শোনে বনমালা। কিন্তু তারপরেই চলে যায় একটু এগিয়ে। নির্জন একটা স্থানে। সেখানে বসে সে তলিয়ে যায় অন্য কোনও জগতে। তার বন্ধুরাও দু-একবার এই জায়গাটায় এসেছিল। কিন্তু বনমালা একা আসাই পছন্দ করে।

“ঠিক আছে। কখন আসব?”

“তুই বিকেল চারটে নাগাদ চলে আয় ওখানে। আমি থাকব। অসুবিধে হবে না তো?”

“ঠিক আছে। আমি যাব।”

ফোনটা নামিয়ে রেখে ঠিক শান্তি পাচ্ছিল না বনমালা। কাজটা কি ঠিক করল সে?

.

যাই হোক, এখন আর ভেবে লাভ নেই। কথা যখন দিয়েছে, তখন যেতেই হবে। বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হবে।

বাবা আগেই খাবার খেয়ে নিয়েছিলেন। দাদা একটু বেরিয়েছে। টেবলে একা বসেই ভাতের থালাটা টেনে নিল বনমালা।

মাছের ঝোলের বাটিটা বনমালার টেবলে রেখে মিনতি মাসি জিজ্ঞেস করল, “কীরকম হয়েছে রান্না?”

একটু অবাকই হয়ে গেল বনমালা। এইভাবে তো মাসি জিজ্ঞেস করে না।

“ভালোই তো হয়েছে। তুমি তো ভালোই রান্না করো। আজ হঠাৎ জিজ্ঞেস করছ?”

মিনতি মাসি একটু আমতা আমতা করে বলল, “না, না, এমনি আর কী। বিশেষ কোনও কারণ নেই।”

বনমালা বুঝতে পারল, মিনতি মাসি কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু ঠিক ভরসা পাচ্ছে না। সে ঘুরে তাকাল মিনতির দিকে, “কিছু বলবে আমায়? বলো না, কোনও সমস্যা নেই।”

মিনতি তাও দোনোমোনো করছিল। এবার চাপ দিল বনমালা, “তুমি বলবে কি না, বলো?”

মুখটা একবার আঁচলে মুছে মিনতি চাপা স্বরে বলে উঠল, “আমি না একটা গান শুনতে পাই।”

“মানে?” অবাক হয়ে মিনতির দিকে তাকিয়ে রইল বনমালা। “কার গান? কোথায় শোনো?”

মিনতি একটু ভয় ভয় চোখে বলল, “অনেক রাতে শুনতে পাই। আমি তো নীচতলায় শুই। তোমরা উপরে। নীচতলা থেকে শুনতে পাই, উপরে কেউ গান গাইছে!”

বনমালার বিস্ময় কাটছিল না, “কার গলা? চিনতে পেরেছ?”

মিনতি আবার ঘাড় নাড়ল, “না গো, গলাটা অচেনা। একটু ভারী গোছের মহিলা কণ্ঠ। আগে এই গলা শুনিনি। কাল মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তখন শুনতে পেয়েছি।”

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল বনমালা। তারপরে বলল, “উপরে তো আমরা তিনজন শুই। মেয়ে বলতে আমি। তুমি নিশ্চিত থাকো আমি মাঝরাতে উঠে গলা বদলে গান গাইনি।” তারপরে আর হাসি চাপতে পারল না। খিলখিল হাসতে হাসতেই বলল, “আর বাবা বা দাদা মাঝরাতে উঠে মেয়েলি গলায় গান গাইছে, এটা ঠিক হজম হল না।”

মিনতি মাসি একটু রেগেই গেল, “তোমরা তো আমার কোনও কথাই বিশ্বাস করো না। শুধু কালই নয়, আমি আগেও ওই গলাটা শুনেছি।”

“আচ্ছা, মাসি রাগ কোরো না। তোমার মাছের ঝোলটা দারুণ হয়েছে। এবার শাস্তিতে খেতে দাও দেখি।”

মাসি মুখটা হাঁড়ি করে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে।

.

কোপাই নদীর ব্রিজটার কাছে এসে সাইকেলের গতি বাড়াল বনমালা। চারটে বাজতে চলল। বেশি সময় সে ওই জায়গায় থাকতে চায় না। যদিও সূর্য অস্ত যেতে একটু দেরিই আছে।

এখনও রোদ বলে নদীর পারে পসরা সাজিয়ে বসতে পারেনি দোকানিরা। বাউলরাও গান ধরেনি।

বনমালা আরও এগিয়ে চলল। এরপরে নদীর ধারে শুরু হয়েছে হালকা জঙ্গল। রাস্তাটাও এবড়োখেবড়ো। আর একটু এগিয়ে সাইকেল থেকে নেমে পড়ল বনমালা। তারপরে সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে এগিয়ে চলল। মিনিট পাঁচেক পরেই নদীর পারে তার প্রিয় জায়গায় পৌঁছে গেল মেয়েটা। আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করেছিল অরণ্য।

“কী রে অরণ্য, হঠাৎ জরুরি তলব কেন?” সাইকেলটা স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে এগিয়ে এল বনমালা।

অরণ্য এগিয়ে এল, “আয় বোস, একটা কথা বলার জন্য তোকে ডেকেছি।”

একটা সাদা পাথরের উপরে গিয়ে বসল বনমালা। তিরতির করে বয়ে আসা হাওয়ায় একটু এলোমেলো হয়ে গেল তার হালকা নীল সালোয়ার আর সাদা ওড়নাটা। সেগুলো সামলে বনমালা বলল, “হ্যাঁ, সেটা তো বললি ফোনে, বল কী বলতে চাস?”

একটু নীচে কোপাই নদী বয়ে যাচ্ছে। এখনও বয়ঃসন্ধির কালেই রয়েছে কোপাই। ভরা যৌবনে পা দিতে আরও দেরি আছে। বর্ষা শুরু হলে বদলে যায় কোপাইয়ের চেহারা। আর সবুজের স্নিগ্ধ রঙে মায়াময় হয়ে ওঠে শান্তিনিকেতন। এখন তো সামনে শীত আসবে। আরও শীর্ণ হয়ে যাবে কোপাইয়ের চেহারা।

কোপাই নদীর থেকে চোখ সরিয়ে অরণ্যর দিকে তাকাল বনমালা, “খুব জরুরি দরকার ছিল? তোর কথা শুনে তো তাই মনে হল।

অরণ্য চট করে জবাব দিল না। তারপরে বনমালার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে বলল, “তোর কাছে দরকারি কথা বলে মনে হবে কি না জানি না। কিন্তু আমার কাছে অত্যন্ত দরকারি। এই কথাগুলো যদি তোকে বলতে না পারি, তাহলে জীবনভর নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।”

বনমালা কিছু না বলে তাকিয়ে রইল। অরণ্যকে দেখে মনে হচ্ছিল, কী বলবে যেন গুছিয়ে নিতে পারছে না। তারপরে শুরু করল, “তুই কোনওদিন বুঝেছিস কি না জানি না। তবে সেই ছোটো থেকেই আমার মন জুড়ে তুই-ই ছিলিস শুধু। শান্তিনিকেতন থেকে দূরে সরে গেলেও তোর কথা সবসময় মনে হত। তোকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। আর কষ্ট পেতাম।”

অরণ্য একটু থামল। এক ঝলক তাকিয়ে নিল বনমালার মুখের দিকে। তারপরে বলল, “সেই স্বপ্ন আমাকে কষ্ট দিত। আমার মনকে রক্তাক্ত করত। স্বপ্নে দেখতাম, যতবারই তোর কাছে আসার চেষ্টা করছি, তুই হারিয়ে যাচ্ছিস। কিছুতেই তোকে মনের কথা বলতে পারিনি। কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেই ঘুমটা ভেঙে যেত। দেখতাম বালিশ ভিজে গিয়েছে চোখের জলে। বুকের মধ্যে একটা তীব্র যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠছে।”

অরণ্য থামল। সে আর বনমালার মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। কোপাই নদীর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কোনওমতে বলল, “মালা, তোকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসি। তোকে ছাড়া আমি বাঁচব না।

শনশন করে একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। সেই হাওয়া যেন শিহরন তুলল বনমালার শরীরে। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সুযোগ পেল না। তার আগেই পিছন থেকে কে বলে উঠল-

“আরে বাহ, কোপাইয়ের জঙ্গলে তো ভালো লীলাখেলা চলছে।”

দুজনেই চমকে ঘুরে তাকাল।

দুটো ছেলে তাদের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। একটা ছেলেকে বনমালা আর অরণ্য দুজনেই চিনতে পারল।

সেই বাজারের মাংসের দোকানের ছেলেটা!

ওই ছেলে দুটো আরও কাছে এগিয়ে এল। তারপরে দোকানের ছেলেটা বলল, “লাল্টু দেখেছিস তো শান্তিনিকেতনের ছেলে-মেয়েগুলো আড়ালে কী করে! আমরা না এলে এদের লীলাখেলা আরও কতদূর গড়াত, কে জানে!”

লাল্টু বলে ছেলেটা খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল, “তা সজলদা, তোমার দোষ আছে। আমরা আড়ালে থেকে না হয় একটু দেখতামই। তুমি তো ওদের লীলাখেলায় বাধা দিলে।”

নিজের দুটো কান ধরে জিভটা বার করে সজল বলল, “সত্যিই তো খুব ভুল হয়ে গিয়েছে। সরি, সরি।’

দুটো ছেলেই হা হা করে উঠল। তারপরে বনমালার দিকে তাকিয়ে সজল বলে উঠল, “তা মামণি, তুমি তো মুরগি কাটা দেখতে ভয় পাও। এখানে একা একা ঘুরতে ভয় লাগে না?”

বনমালা জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু এগিয়ে এল অরণ্য। সজলের একেবারে সামনে গিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল, “আর একবার বলো তো কী বললে।”

সজলের থেকে প্রায় চার-পাঁচ ইঞ্চি লম্বা অরণ্য। চওড়াতেও সজলের প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু অরণার চেহারা দেখে নয়, সজল ঘাবড়ে গেল ছেলেটার দুটো চোখ দেখে। যেন আগুন জ্বলছে ওই দুটো চোখে। ধীরে ধীরে খুব শান্ত স্বরে অরণ্য বলল, “আর কোনওদিন যদি এইভাবে ওর সঙ্গে কথা বলো, তাহলে কেটে তোমাকে কোপাইয়ের জলে ভাসিয়ে দেব।”

একটুও উত্তেজিত হয়নি অরণ্য। খুব ঠান্ডাভাবে কথাগুলো বলল। আর সেটাই কাঁপিয়ে দিল সজল আর ওর সঙ্গীকে। লাল্টু আলতো করে সজলের হাতটা ধরে টানল, “ছেড়ে দাও সজলদা। এরা মরুক গে।”

বনমালাও এগিয়ে এল। অরণ্যর হাতটা ধরে বলল, “চলে আয়, অনেক হয়েছে। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে।” অরণ্য আর কথা না বলে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সাইকেলে উঠে বসল। তারপরে দুটো সাইকেল মিলিয়ে গেল কোপাইয়ের পাড়ে।

সেদিকে তাকিয়ে থুতু ছিটিয়ে সজল বলে উঠল, “শুয়োরের বাচ্চা! একদিন বাগে পেলে ওর মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলাদা করে দেব।”

.

কোপাই নদীর ব্রিজ ধরে যখন তারা ফিরে আসছে, দেখা হয়ে গেল শতাব্দী আর ওর দাদার সঙ্গে। উলটো দিক থেকে দুজনে আসছিল সাইকেল করে। বনমালা আর অরণ্যকে দেখে অবাক হয়ে শতাব্দী জিজ্ঞেস করল, “কী রে, তোরা দুজন কোথা থেকে আসছিস? আমাদের তো কিছু বললি না?”

বনমালা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “আরে না না, রাস্তায় দেখা হয়ে গেল অরণ্যর সঙ্গে।”

শতাব্দী একটু ভ্রূ কুঁচকে বলল, “তাই নাকি? তা ঠিক আছে। তোদের পার্সোনাল ব্যাপার আমাকে না জানালেও চলবে।”

বনমালা লজ্জায় লাল হয়ে বলল, “ধুর কী যে বলিস! পার্সোনাল ব্যাপার আবার কী! তোরা চললি কোথায়?”

“একটু কাজ ছিল। এখন বাড়ি ফিরছি। চললাম রে এখন। সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিল শতাব্দী আর ওর দাদা মানিক। এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি মানিক। এবার বছর পাঁচেকের ছোটো বোনের মুখের দিকে একবার তাকাল ছেলেটা। শতাব্দীর মুখটা গম্ভীর হয়ে আছে। বোন যে কী ভাবছে সেটা সে বুঝতে পারছে। ছোটোবেলা থেকেই ব্যাপারটা লক্ষ করেছে মানিক।

সে একটু চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “তোকে তো ছোটো থেকেই বলে আসছি ওদের থেকে দূরে থাক। ওই ছেলে-মেয়ে দুটো বড়োলোক বাড়ির। আমাদের ওরা বেশি পাত্তা দেয় না।”

শতাব্দী জবাব দিল না। উলটে সাইকেলের গতি বাড়িয়ে দিল। তার মুখটা থমথম করছে। এই ব্যাপারটা সে ছোটো থেকেই লক্ষ্য করেছে। বনমালার প্রতি একটা আলাদা টান আছে অরণ্যর। সেটা কখনওই ভালো লাগেনি শতাব্দীর। ছোটোবেলায় হিংসে হত। আর এখন দুজনকে একসঙ্গে দেখলে মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা আবেগ খেলা করে। ভীষণ কান্না পায় তার। আর রাগও হয় প্রচণ্ড। মনের মধ্যে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে শতাব্দীর।

সে মালার মতো অভিজাত নয়, সুন্দরী নয়। তাই তো তাকে দূরে সরে যেতে হচ্ছে। যতই বন্ধুত্বের একটা আবরণ থাকুক না কেন, ভাঙনটা মনে মনে টের পাচ্ছে শতাব্দী।

আর এর জন্য দায়ী ওই মেয়েটা।

অরণ্য যখন কলকাতায় পড়তে চলে গিয়েছিল, তখন একটু খুশিই হয়েছিল শতাব্দী। সে যেমন দেখতে পাবে না অরণ্যকে, সেরকম মালাও তো পাবে না। শতাব্দীর মনে একটা ক্ষীণ আশা ভেসে উঠত মাঝে মাঝে। দূরে সরে গেলে অরণ্য নিশ্চয়ই ভুলে যাবে মালাকে। ছোটোবেলা থেকে ওই দুজন যখনই কাছাকাছি এসেছে, মনের মধ্যে একটা তীব্র কষ্ট অনুভব করেছে শতাব্দী।

সে ভেবেছিল, বড়ো হলে কষ্টটা চলে যাবে। কিন্তু যায়নি। বরং, অরণ্য- বনমালাকে একসঙ্গে দেখলে সে জ্বলেপুড়ে মরে। কতদিন যে এই কষ্টটা সহ্য করতে হবে, কে জানে। একটা ব্যাপার এখন ভালোই বুঝতে পারে শতাব্দী। অরণ্যর মতো ছেলেকে সে কোনওদিন পাবে না। কিন্তু মালাকেও কাছে আসতে দেবে না সে। সাইকেলের প্যাডেলের উপরে ঝরে পড়তে লাগল শতাব্দীর ক্রোধটা।

.

সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরতেই দাদা সটান চলে এল বনমালার ঘরে। “মালা আজ কোপাইয়ের ওখানে তোর সঙ্গে একটা ছেলের ঝামেলা হয়েছিল?” দাদার মুখটা থমথম করছে। এতটা উত্তেজিত হতে দাদাকে কখনও দেখেনি সে।

“না না, ঝামেলা হতে যাবে কেন? ওই একটু কথা-কাটাকাটি। ওটা কোনও ব্যাপারই নয়,” তারপরে দাদার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই জানলি কী করে?”

“আমার এক বন্ধু ছিল ওখানে। সে দেখেছে। তোর সঙ্গে তো অরণ্যও ছিল।” মালা মাথা নাড়ল। দাদা এগিয়ে এসে হাত রাখল বনমালার কাঁধে, “শোন বোন, একটা কথা বলি। তোর সঙ্গে যদি কারও ঝামেলা হয়, সোজা আমাকে এসে বলবি। যা করার আমি করব। তুই কোনও ঝামেলায় জড়াবি না।

বনমালা সত্যি অবাক হয়ে গেল। “কী শুরু করলি বল তো! একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে এতটা উত্তেজিত হচ্ছিস কেন?”

জয়ন্তর মুখে কোনও পরিবর্তন হল না। সে একদৃষ্টিতে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই আমাকে কথা দে যা হবে আমাকে এসে বলবি। নিজে কখনও ঝামেলায় জড়াবি না। কথা দে।”

বনমালা সত্যিই হতভম্ব হয়ে যাচ্ছিল। দাদাকে এতটা সিরিয়াস হতে সে আগে দেখেনি। তাই আর কিছু না বলে জবাব দিল, “ঠিক আছে, কথা দিলাম। যা হবে তোকে বলব। কারও সঙ্গে ঝামেলায় জড়াব না।”

জয়ন্ত একটু শান্ত হয়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। হঠাৎ কী মনে হতে বনমালা পিছন থেকে বলে উঠল, “আচ্ছা, দাদা রাতে তুই মেয়েলি গলায় কোনও গান শুনতে পাস?”

ঘুরে তাকাল জয়ন্ত, “মানে? মেয়েলি গলায় গান মানে? কোথায় শুনব?”

“মাসি বলছিল, কয়েকদিন দোতলা থেকে রাতে কোনও মেয়ের গলায় গান শুনতে পেয়েছে,” চাপা হাসি হেসে বলল বনমালা। সে পরিস্থিতি একটু হালকা করে দিতে চাইছিল। কিন্তু জয়ন্তকে দেখে মনে হল সে বেশ বিরক্তই হয়েছে। একটু কঠিন গলায় বলল, “তুই এইসব ফালতু কথা শুনিস কেন? একটুও আসকারা দিবি না। তাহলে কোথায় যে কী বলে বসবে, কে জানে।”

বনমালা দ্রুত মাথা নাড়ল, “আরে না না। আমি পাত্তাও দিইনি।”

জয়ন্ত বেরিয়ে যাচ্ছিল। দরজার মুখে গিয়ে পিছনে ফিরল, “আর একটা কথা, তুই ওই অরণ্যর সঙ্গে আর একা একা দেখা করিস না। বন্ধুরা একসঙ্গে ঘোর, ঠিক আছে।”

বলে বনমালার দিকে আর না তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল জয়ন্ত।

.

দু-দিন পরে।

সন্ধ্যার মুখে শ্রীনিকেতনের মোড়টা বেশ জমজমাট। কয়েকটা দোকান আছে ওখানে। সেইরকম একটা দোকানের দিকে তাকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ভদ্রলোক!

লোকটার বয়স ষাটের কাছাকাছি। পাকা চুল। গালে কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি। পরনে একটা মলিন গেরুয়া রংয়ের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা। দেখে বোঝা যায়, বেশ কয়েকদিন ধোওয়া হয়নি সেটা।

হাতে একটা বড়ো রোল করা কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভদ্রলোক। তার চোখ দোকানে দাঁড়ানো মেয়েটার উপরে।

অনেকদিন তিনি অপেক্ষা করেছেন। অনেকদিন… একবার অন্যভাবে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু লাভ হয়নি। কিন্তু তাঁর মনে হচ্ছে, এবার কাজ দেবে। আর সেটা হলে সত্যিই মারাত্মক হবে সেই আঘাতটা।

বেশ কয়েকদিন ধরে মেয়েটাকে চোখে চোখে রাখছেন ভদ্রলোক। একটু ফাঁকা পাওয়ার অপেক্ষায়… আজ পেয়েছেন। ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন দোকানটার দিকে।

কয়েকটা টুকটাক জিনিস কিনে ব্যাগে ভরে রাস্তায় নামতেই পিছন থেকে ডাকটা শুনল বনমালা, “ম্যাডাম, একটু কথা ছিল আপনার সঙ্গে।”

মাথা ফেরাতেই বয়স্ক লোকটিকে দেখতে পেল বনমালা, “আমাকে কিছু বলছেন?”

“হ্যাঁ, আপনাকে একটা জিনিস দেখাতে চাই।” বলে লম্বা রোল করা কাগজটা বনমালার দিকে এগিয়ে দিলেন ভদ্রলোক। একটু অবাক হয়েই কাগজটা খুলে স্তম্ভিত হয়ে গেল বনমালা। তারপরে সন্দেহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “এটা আপনি পেলেন কী করে? কে আপনি?”

ভদ্রলোক এক পা এগিয়ে এলেন মালার দিকে, “এইরকম কাগজ বেশ কয়েকটা আছে আমার কাছে। আর আছে একটা অজানা কাহিনি। সেই কাহিনি শুনতে যদি আপনি আগ্রহ বোধ করেন, তবে আমাকে ফোন করবেন।” দম নিলেন ভদ্রলোক। তারপরে একটু বিষণ্ণ সুরে বললেন, “সত্যিটা আপনার জানা দরকার। যদি জানার ইচ্ছে আর সাহস থাকে, তাহলে ফোনটা করবেন। আমার নাম আর নম্বর ওই ‘কাগজে লেখা আছে। ব্যাপারটা আর কাউকে না জানালেই ভালো হয়।”

বনমালাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ভদ্রলোক হনহন করে মিশে গেলেন সন্ধ্যার অন্ধকারে।

বনমালা আবার কাগজটার দিকে তাকাল। একটা পেনসিল স্কেচ। তার মায়ের স্কেচ! হুবহু মায়ের মুখটা ফুটে উঠেছে এই কাগজে। আর একটা কোণে শিল্পীর নাম আর ফোন নম্বরটা লেখা।

শিল্পীর নাম প্রবীর সেন।

বনমালা প্রথমে মনে করতে পারছিল না, নামটা আগে শুনেছে কি না। তারপরেই বিদ্যুৎচমকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল সবকিছু।

ভদ্রলোকের নামটা সে আগে দেখেছে। প্রবীর সেন!

তার বাবার ঘরে মায়ের যে পেন্টিংটা টাঙানো আছে, সেটার আর্টিস্টের নামও প্রবীর সেন!

.

একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা দেখল একটা ছেলে। দুজনের মুখই ছেলেটা খুব ভালো করে দেখতে পেয়েছে। দুজনকেই সে চেনে। কিন্তু ওই লোকটা বনমালাকে কী বলছিল? চিনলই বা কী করে? ছেলেটার মনে হচ্ছে, লোকটার উপরে একটু নজর রাখা দরকার। ভিতরের কাহিনিটা একটু জানা দরকার।

কোথা থেকে কী বেরিয়ে আসবে কে জানে!

কেঁচো নয়, তার একটা কেউটে দরকার। যে কেউটে ছোবল মারতে পারবে। যে কেউটের সন্ধান সে অনেক বছর ধরে করছে।

ধীরে ধীরে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে ছেলেটাও হারিয়ে গেল অন্ধকারে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *