প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব

রক্তকরবী মার্ডারস – ১.১৩

১৩

শান্তিনিকেতন, ২০২১

নিজের ঘরে ঢুকে অনেকটা সময় চুপ করে বসেছিল বনমালা। হাতে ওই ছবিগুলো।

আজ সে দোতলার ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখেছে। কোনও অনাহূত ব্যক্তিকে ঘরে চায় না সে। না বাবা, না দাদা। কিছুটা সময় সে একা কাটাতে চায়। নিভৃতে, একান্তে। এই ছবিগুলোর সঙ্গে। তার মায়ের সঙ্গে!

ছবিগুলো যখন তার হাতে তুলে দিয়েছিল লোকটা, চমকে উঠেছিল বনমালা। মায়ের ছবি! তারপরে লোকটার কথাগুলো তাকে আরও ধাক্কা দিয়ে যায়। লোকটার নামটাও!

.

অপলক দৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল বনমালা। সত্যি, লোকে ভুল বলে না। তার মুখের সঙ্গে অদ্ভুত একটা মিল আছে মায়ের। ছোটোবেলায় সে অত বুঝত না। কিন্তু এখন বুঝতে পারে। ওই রকম ভাবে শাড়ি পরলে, ওইভাবে খোঁপায় রক্তকরবী গুঁজলে, তাকেও মায়ের মতোই দেখাবে।

কনকমালার মতো!

মায়ের কথা সে অনেক শুনেছে সারদা মাসির মুখে। সেসব গল্প কিছুটা এখনও মনে আছে তার।

মা খুবই ডাকাবুকো ছিলেন। অন্যায় সহ্য করতে পারতেন না, প্রতিবাদ করতেন সবসময়। দুটো জিনিস প্রাণপ্রিয় ছিল মায়ের। এক, নাটক। দুই, ড্রেস ডিজাইনিং, শাড়িতে ও সালোয়ার কামিজে নকশা করা। গানটাও ভালো গাইতে পারতেন।

বাবার ঘরে মাঝে মাঝে লুকিয়ে ঢুকে পড়ার সুবাদে বইয়ের আলমারিটার দিকে চোখ পড়ে যেত বনমালার। সেখানে দেখত সাজানো আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বই, অনেক নাটকের বই। কয়েকবার সে ওই স্টোররুমটাতেও ঢুকেছিল। দেখেছিল, মায়ের সেলাইয়ের সাজসরঞ্জাম, মায়ের শাড়ি।

এরপরে সারদা মাসি তাকে ছেড়ে চলে যায়। মা যেন ক্রমে স্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকেন! চেষ্টা করেও কেন যেন মায়ের কথা মনে করতে পারে না বনমালা।

তারপরে…

একটা ভয়ানক ধাক্কা তার নিস্তরঙ্গ পৃথিবীতে হঠাৎ জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করেছে। লোকটার কথাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে বনমালার—

“সত্যিটা আপনার জানা দরকার। যদি জানার ইচ্ছে আর সাহস থাকে, তাহলে ফোনটা করবেন। আমার নাম আর নম্বর ওই কাগজে লেখা আছে।”

কীসের কথা বলছে ওই লোকটা? কী এমন গোপন কথা সে জানে? বনমালা শান্ত হতে পারছিল না।

প্রবীর সেন! নামটা আরও ধাক্কা দিয়ে গিয়েছে একটা কারণে। বাবার ঘরে মায়ের যে ছবিটা টাঙানো আছে, সেটা ওই প্রবীর সেনেরই আঁকা। নতুন এই ছবিগুলো আর ঘরের ওই ছবিটার আঁকার স্টাইল একই রকম

একটা কথা ভালো করেই বুঝতে পারছে বনমালা। যে সত্যিটার কথা বলছে লোকটা, সেটা তার মাকে ঘিরে। মানে, বাবা-মা দুজনকেই চিনত ওই প্রবীর সেন! কী সম্পর্ক ছিল ওই তিনজনের মধ্যে?

লোকটার আরও একটা কথা কাঁটার মতো বিঁধছে বনমালাকে। “কাউকে ব্যাপারটা বলার দরকার নেই।”

কাউকে বলতে যে এখানে তার বাবাকেই বোঝানো হয়েছে, সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারছে বনমালা।

তাহলে কি এই কাহিনির সঙ্গে তার বাবাও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে? এমন কোন সত্য বাবা গোপন করে এসেছে, যা জানাজানি হলে ঝড় উঠবে?

বনমালা আর ভাবতে পারছিল না। কিন্তু একটা ব্যাপার সে ঠিক করে নিয়েছে। প্রবীর সেনের সঙ্গে দেখা করতেই হবে।

মোবাইলটা হাতে তুলে নিল বনমালা।

.

প্রান্তিক স্টেশনের কাছেই বাড়িটা। প্রবীর সেন যেভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেভাবে চলে আসতে সমস্যা হয়নি বনমালার।

অত্যন্ত করুণ অবস্থা একতলা বাড়িটার। জরাগ্রস্ত একটি শরীর যেন কোনওমতে পৃথিবীর বোঝা টেনে নিয়ে চলেছে। যে কোনও মুহূর্তে মুখ থুবড়ে পড়বে।

দরজা খুলে বেরিয়ে আসা প্রবীর সেনকে দেখে সেরকমই একটা অনুভূতি হল বনমালার। ভদ্রলোক কি তার বাবারই সমবয়সি? হলে বলতে হবে, একটু বেশিই বুড়িয়ে গিয়েছেন বয়সের তুলনায়। তার বাবার শিরদাঁড়া এখনও ঋজু।

মলিন একটা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা অবস্থায় বেরিয়ে এসেছিলেন ভদ্রলোক। হাতজোড় করে বললেন, “ভিতরে আসুন ম্যাডাম।”

দরজার চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে পা রাখল বনমালা। তার জানার কোনও উপায় ছিল না যে প্রায় তিরিশ বছর আগে এই বাড়িরই চৌকাঠ ডিঙিয়ে একবারই ভিতরে পা রেখেছিলেন তার মা— কনকমালা।

বাইরেটার মতোই মলিন ভিতরের অংশটাও। যে ঘরে বনমালা এসে বসল, অলস বিকেলের আলো সেখানে ঢুকতে গিয়ে যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে। একটা মাত্র জানলা। আর সেই জানলা যেন ঘরের মলিন রূপটাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। আলোর চেয়ে ছায়া এসে পড়েছে বেশি।

সেইরকম আলো-আঁধারি একটা পরিবেশে বনমালার উলটো দিকে এসে বসলেন প্রবীর সেন।

কয়েক পলক বনমালার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক। তারপরে ধীরে ধীরে বললেন, “আপনাকে এই অবস্থায় বসে থাকতে

দেখে আপনার মায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আপনার মা-ও লাল রং খুব পছন্দ করতেন।

কেন জানি না, একটা শিরশিরানি বয়ে গেল বনমালার শরীরে। ওড়নাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে সে বলল, “আপনি কেন আমাকে ডেকেছেন? কী বলতে চান?”

প্রবীর সেন একটু সময় চুপ করে রইলেন। তার চোখ চলে গেল একটু দূরে থাকা একটা টেবলের উপরে। বনমালাও দেখতে পেল, বোতল আর গ্লাসটা। বুঝতে পারল, পানীয়টা কী! লোকটা কি এখন মদ্যপান করা শুরু করবে নাকি? তাহলে তো তাকে চলে যেতে হবে।

প্রবীর সেন যেন বুঝতে পারলেন বনমালার মনের কথা। একটু ম্লান হেসে বললেন, “স্বীকার করছি, মদই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। কুড়ি বছর ধরে আমি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছি। অল্প অল্প করে পাগল হয়ে যাচ্ছি। এই বোতলের পানীয়টাই আমাকে পুরো পাগল হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

একটু আনমনা হয়ে পড়লেন ভদ্রলোক। তারপরে বনমালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি চিন্তা করবেন না। এখন আপনি সামনে বসে আছেন। আমার আর মদের প্রয়োজন নেই।”

বনমালার চোখের দিকে তাকিয়ে অতীতে ফিরে গেলেন প্রবীর সেন। সময়টা আটের দশকের শুরুতে।

“আমরা তিনজন ছোটোবেলা থেকেই খুব বন্ধু ছিলাম। যদিও আপনার বাবা বয়সে আমাদের থেকে বছর দুয়েক বড়ো ছিল। একই স্কুলে পড়তাম। দীনেন্দ্ৰ আমাদের থেকে দুটো ক্লাস উঁচুতে পড়ত। আপনার মা আর বাবা-র বাড়ি দুটো কাছাকাছি ছিল। আমারটা একটু দূরে। এইভাবেই আমরা বেড়ে উঠছিলাম। হাসি-খুশি-গল্পে।”

টানা কথা বলতে গিয়ে হাঁফিয়ে যাচ্ছিলেন প্রবীর সেন। একটু দম নিয়ে বলতে থাকলেন, “আমার ছিল আঁকার প্রতি ঝোঁক। আপনার মা খুব ভালো নাটক করতে পারতেন। সেলাই, ডিজাইনের হাতটাও ভালো ছিল। আপনার বাবা আবার ছাত্র হিসেবে অনেক ভালো ছিল আমাদের থেকে। এইভাবেই আমরা বড়ো হয়ে উঠছিলাম।”

.

ধীরে ধীরে অতীতে ডুবে গেলেন প্রবীর সেন। কিন্তু একটা জায়গা তিনি আর বনমালার সামনে আনলেন না। সেই সন্ধ্যার ঘটনা। যখন কনকমালাকে একা পেয়ে চুম্বন করতে গিয়েছিলেন তিনি।

.

…সেই ঘটনার পর থেকে কনকমালার সামনে আসার সাহসই পাচ্ছিল না প্রবীর। মাস কয়েক পরে মুখোমুখি হয়ে যায় কনকের। কিন্তু মেয়েটা আর সে প্রসঙ্গ তোলেনি। সহজ হয়েই কথা বলেছিল তার সঙ্গে। কিন্তু প্রবীর বুঝতে পারছিল, কোথাও যেন একটা অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়ে গিয়েছে দুজনের মধ্যে। ছোটোবেলা থেকে যে মিষ্টি সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিল দুজনের মধ্যে, তা তেতো হয়ে গিয়েছে। প্রবীর জানে এই সম্পর্কের স্বাদ আর বদলাবে না।

সময় গড়াতে থাকে। প্রবীর লক্ষ করে দীনেন্দ্র আর কনকমালা আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। আর সে ভেসে যাচ্ছে দূরে। দীনেন্দ্র এখন আরও উদ্ধত হয়ে উঠেছে। আগে যাও বা তার সঙ্গে কথা-টথা বলত, এখন আর সেটাও বলে না। মানুষই মনে করে না তাকে।

সময় এগিয়ে চলল। পড়াশোনা শেষ করে দীনেন্দ্র তখন সহকারী প্রফেসরের চাকরি নিয়েছে বিশ্বভারতীতে। কনকমালা স্বপ্ন দেখছে তার চিরসাধের বুটিক খোলার। প্রবীর ওই টুকটাক আঁকার টিউশনি করে একটু-আধটু উপার্জন করার চেষ্টায় লাগল।

তারপরে তিনজনের জীবনেই মৃত্যুর ছায়া নেমে এল। কয়েক মাসের ব্যবধানে মাথার ওপর দিয়ে ছাতা সরে গেল তাদের। দীনেন্দ্রর বাবা মারা যাওয়ার মাস তিনেকের মধ্যে মাতৃহারা হল কনকমালা এবং প্রবীর। তিনজনই একা হয়ে পড়ল। অদ্ভুত এক সুতোয় যেন বাঁধা পড়ে গিয়েছিল তিনজনের জীবন। না চাইলেও একই রাস্তা দিয়ে ভাগ্য তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

তারপরে সুতোটা ছিঁড়ে গেল।

সেটা ছিল ১৯৯৬ সালের নভেম্বর মাস। সেই সময়ই খবরটা কানে আসে প্রবীরের।

বিয়ে করতে চলেছে দীনেন্দ্র এবং কনকমালা।

পৃথিবীটা ভেঙে পড়েছিল প্রবীরের। পাগলের মতো অবস্থা হয়েছিল তার। একবার ভেবেছিল, জীবনটা শেষ করে দেবে। একা একা বাড়িতে থাকতে থাকতে কতবার যে ছুরিটা হাতে তুলে নিয়েছিল সে, ইয়ত্তা নেই। কিন্তু কবজির শিরাটা কাটতে পারেনি। পারেনি, কারণ সে আদতে একজন কাপুরুষ। নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার সাহসটুকুও ছিল না তার।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেল। কনকমালার দূরসম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয়ের তদারকিতে এগোতে লাগল বিয়ের কাজকর্ম। বিয়ের দিন এগিয়ে এলেও কোনও আমন্ত্রণপত্র এল না প্রবীরের কাছে।

প্রবীর কি ভেবেছিল কনকমালা শেষ মুহূর্তে তার কথা মনে করবে? কোনও অলীক স্বপ্ন কি সে দেখেছিল? প্রবীর নিজেও জানে না। সে রাত জেগে নিজের ঘরে বসে শুধু ক্যানভাসে আঁচড় কেটে গিয়েছে।

.

কনকদের বাড়ির সামনে ছোটো একটা প্যান্ডেলে সেদিন সকাল থেকেই সানাইয়ের সুর খেলা করছিল। সন্ধ্যা ঘনানোর পরে একে একে জ্বলে উঠছিল কৃত্রিম আলোগুলো।

রাত বাড়তে থাকল, বিয়ের আমেজও জমে উঠল। খুব বড়ো কোনও অনুষ্ঠান নয়। তাও ভিড়টা বাড়ছিল রাত আটটা থেকে

সেই ভিড়ে দেখা গেল মলিন পোশাক পরা একটা লোককে। হাতে খবরের কাগজে মোড়া একটা বড়ো প্যাকেট।

লোকটা ধীর পায়ে প্রবেশ করল বাড়ির ভিতরে। তারপরে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল বড়ো ঘরটার দিকে। যেখানে কনের সাজে বসে আছে কনকমালা।

যেন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা কোনও রাজরানি।

সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে থাকল প্রবীর সেন। সে আবার হারিয়ে যাচ্ছে। কনকের রূপের আগুনের সামনে সে যেন তুচ্ছ কোনও পতঙ্গ। যে জানে ওই আগুনই তার মৃত্যুর কারণ হবে।

নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গেল প্রবীর। তারপরে দু-হাতে প্যাকেটটা তুলে দিল কনকমালার হাতে।

“ভালো থাকিস,” কনককে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল প্রবীর। আর করিডরে প্রায় ধাক্কা খেয়ে বসল দীনেন্দ্রর লম্বা শরীরটার সঙ্গে। বরযাত্রী তখনই এসে ঢুকেছে।

নিষ্পলক চোখে প্রবীরের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল দীনেন্দ্র। তারপরে প্রবীরের কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোর সঙ্গে একটু কথা আছে।”

বরযাত্রীদের কিছুটা অবাক করে দিয়ে প্রবীরকে প্রায় জোর করে টেনে নিয়ে গেল দীনেন্দ্ৰ।

তারপরে আড়ালে এসে হিসহিস করে দীনেন্দ্র বলল, “আর যদি কোনওদিন কনকের আশপাশে তোকে দেখি, তাহলে তোর দেহটা কেউ কোনওদিন খুঁজে পাবে না।”

ছোট্ট একটা ধাক্কা দিয়ে প্রবীরকে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে আবার বিয়ের মঞ্চের দিকে হাঁটা লাগাল দীনেন্দ্ৰ সিংহ।

.

…কথা বন্ধ করে হাঁপাতে লাগলেন প্রবীর সেন। বনমালা স্থির হয়ে বসেছিল। অতীতের একটা পর্দা সরে গিয়েছে তার চোখের সামনে থেকে। মায়ের এই কাহিনি সে আগে কখনও শোনেনি। এ তো বিয়ের আগের কাহিনি। এই কাহিনি শোনানোর মতো লোক তার জীবনে কোথায়?

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল প্রবীর। তারপরে এগিয়ে গেল সামনের টেবলটার দিকে। বোতল থেকে তরল পানীয় গ্লাসে ঢেলে লম্বা একটা চুমুক দিল।

বনমালা ভাবছিল তখনই উঠে পড়বে। কিন্তু এই গল্পের আসল অংশটাই তো এখনও শোনা হয়নি। যেটুকু শুনেছে সেটা একটা ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনি। কিন্তু এতে রহস্য নেই। কোনও গোপন কথাও নেই।

তাহলে গোপন কথাটা কী? কী সেই রহস্য, যার কথা বলছিল এই লোকটা?

সাহস সঞ্চয় করে প্রশ্নটা করেই ফেলল বনমালা, “কিন্তু গোপন কাহিনিটা তো শোনালেন না? কী সেটা?”

প্রবীর এবার এগিয়ে এসে ধপ করে বসে পড়লেন বনমালার পাশে। তারপরে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “সেটা শোনার মতো মনের জোর কি তোমার আছে?”

বনমালা গুটিয়ে যাচ্ছিল। তাও সাহস সঞ্চয় করে বলল, “বলুন, আমি শুনব।”

প্রবীর সেন চোখ বন্ধ করলেন। চোখ যখন খুললেন, চমকে উঠল বনমালা। কীরকম যেন ঘোলাটে হয়ে উঠেছে দৃষ্টি। বিড়বিড় করে কী যেন বলে চলেছেন। কথাগুলো বুঝতে পেরে আবারও চমকাল বনমালা। প্রবীর সেন বলে চলেছেন, “আমাকে ভুল বুঝিস না কনক, ভুল বুঝিস না। আমি তোকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। ওই লোকটা কিছুতেই তোকে কেড়ে নিয়ে যেতে পারবে না।”

তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াতে গেল বনমালা। তার আগেই মেয়েটার কাঁধদুটো চেপে ধরল লোকটা। প্রবীর সেন বলতে থাকলেন, “তুই কোথাও যাবি না কনক। তুই আমার, তুই আমার।

আতঙ্কে বড়ো বড়ো হয়ে উঠল বনমালার চোখ দুটো। এইরকম পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হয়, সে জানে না। সে কনকমালা নয়। প্রবীর তখন কাছে টানার চেষ্টা করছেন মেয়েটাকে। কিন্তু ভঙ্গুর শরীর আর মদের নেশায় শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন প্রবীর। তাঁকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে দরজার দিকে প্রায় দৌড় দিল বনমালা। পিছন থেকে শুনতে পেল প্রবীর সেন বলছেন—

“রহস্যটা শুনে যাবে না? কী হয়েছিল তোমার জন্মের রাতে?”

বনমালার তখন কোনও কিছু শোনার অবস্থা নেই। আতঙ্কগ্রস্তের মতো সে ছুটে বেরিয়ে এল রাস্তায়। আর তখনই ধাক্কা লাগল লম্বা শরীরটার সঙ্গে। দুটো শক্তিশালী হাত ধরে ফেলল মালাকে। তারপরে এক পরিচিত কণ্ঠস্বর বলল—

“কী হয়েছে রে মালা? লোকটা তোকে কিছু বলেছে নাকি?”

অরণ্যর গলা থেকে যেন ঝরে পড়ছিল তপ্ত লাভা। ভীষণ অবাক হয়ে বনমালা বলে উঠল, “তুই এখানে কী করছিস?”

সামনের দরজাটার দিক থেকে চোখ না সরিয়ে অরণ্য জবাব দিল, “তোর পিছন পিছন এসেছিলাম। কী হয়েছে বল?”

প্রবীর সেন ততক্ষণে ধীর পায়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। আর তারপরেই ঝটকাটা খেলেন তিনি।

ওটা কে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটার সঙ্গে? দীনেন্দ্র নাকি? সেই লম্বা-পুরুষালি চেহারা! এ তো ঠিক তরুণ বয়সের দীনেন্দ্র। শয়তানটা আবার তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রাণপ্রিয় মেয়েটাকে। কাঁপতে লাগলেন প্রবীর সেন।

বনমালা ততক্ষণে অরণ্যর হাতটা চেপে ধরেছে। ছেলেটা যে প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছে, সেটা বোঝাই যাচ্ছিল। বনমালার ভয় হতে লাগল, কোনও কেলেঙ্কারি না করে বসে অরণ্য।

সে অরণ্যর হাতটা ধরে টান দিল, “তুই এখনই চলে আয় ওখান থেকে। এক মুহূর্ত আর এখানে নয়।”

স্থিরদৃষ্টিতে আরও কয়েক মুহূর্ত প্রবীর সেনের দিকে তাকিয়ে থেকে উলটো দিকে হাঁটা দিল অরণ্য। তার শরীরটা রাগে কাঁপছে।

.

দরজাটা বন্ধ করে বোতলটা হাতে তুলে নিলেন প্রবীর সেন। এবার আর গ্লাসে ঢেলে নয়, একেবারে সোজা বোতল থেকে মুখে।

দীনেন্দ্র সিংহ তাকে সুস্থভাবে বাঁচতে দেবে না। তার জীবন ছারখার করে দিয়েছে। নষ্ট করে দিয়েছে। সে বেঁচে আছে একটা উদ্দেশ্য নিয়েই।

প্রতিশোধ। এমন বদলা নিতে হবে যা ভাবতেই পারবে না দীনেন্দ্র সিংহ। মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক হবে সেই প্রতিশোধ। প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাবে দীনেন্দ্রকে। মারার হলে কবে সে লোকটাকে মেরে দিতে পারত। কনকের মৃত্যুর পরেই। কিন্তু সে অপেক্ষা করেছিল। কুড়ি বছরের বেশি সময় ধরে চলেছে এই অপেক্ষার পালা।

এবার সময় এসেছে। আরও একবার বোতল থেকে চুমুক মারলেন তিনি। তারপরে দাঁতে দাঁত ঘষে বলে উঠলেন-

“দীনেন্দ্র সিংহ। তোমার জীবন আমি নরক বানিয়ে দেব। ছারখার করে দেব। দেখি, তুমি কী করতে পারো। আমিও দেখব, অর্থের জোর কীভাবে বাঁচায় তোমাকে!”

অন্ধকারেও জ্বলতে লাগল প্রবীর সেনের চোখ দুটো। সেই ঘৃণার আগুনের জন্ম এই পৃথিবীতে হয়নি। হয়েছে কোনও এক অজানা নরকে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *