১৬
শান্তিনিতেকন, ২০১৪-২০২১
২০১৪। বনমালার বয়স তখন চোদ্দো।
সন্ধ্যাটা যেন ঝপ করে নেমে এসেছে। অন্ধকারটা অদ্ভূত ভারী লাগছে। যেন কয়েক মন ওজন চেপে বসেছে পৃথিবীর বুকে।
সাইকেলে বোনকে বসিয়ে নিঃশব্দে প্যাডেল করছিল জয়ন্ত। তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। একটা অজানা আতঙ্ক চেপে বসেছে জয়ন্তর বুকে। ঠিকমতো নিঃশ্বাসও ফেলতে পারছিল না ছেলেটা।
বোনের হাঁটুটা ছড়ে গিয়েছে। এখুনি হাঁটুতে ওষুধ লাগাতে হবে। রাতটা বড্ড বেশি হয়ে গিয়েছে। এত রাতে তারা বাইরে থাকে না। কিন্তু আজ…
.
আর বাড়তি একটা মুহূর্তও বাড়ির বাইরে কাটাতে চায় না সে। সাইকেলের
প্যাডেলে চাপ বাড়াতে লাগল জয়ন্ত
বনমালা চুপ করে বসে রইল কেরিয়ারে। তার পায়ে ব্যথা করছে। মাথাতেও যন্ত্রণা হচ্ছে। চোখ দুটো ভার হয়ে আসছে। কোনওমতে নিজেকে যেন জাগিয়ে রেখেছে ছোটো মেয়েটা।
.
জয়ন্ত-বনমালা বাড়ি ফেরার ঘণ্টাখানেক আগেই বোনকে নিয়ে ফিরে এসেছে মানিক।
চঞ্চল মজুমদার মারা যাওয়ায় একটা ডিউটি শেষ হয়েছে তার। কিন্তু আবার একটা নতুন ডিউটি শুরু হয়েছে। এই নাচের মাস্টারের কাছে বোনকে নিয়ে আসা-দিয়ে আসা। এই মহিলার বাড়িটা তাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরে। আর সেটাই স্বাভাবিক। এই এলাকাটা বড়োলোকের। তারা গরিব, নিম্নমধ্যবিত্ত। তাদের বাড়ি এই এলাকায় হওয়ার কথাই নয়।
সমস্যা হল, তার বোনটা ঘুরে ফিরে এই বড়োলোকেদের দিকেই বেশি করে ঘেঁষছে। যাদের সঙ্গে তার বোন বেশি মেশে, তাদের মধ্যে ওই বনমালা আর অরণ্য বেশ বনেদি বড়োলোক। পয়সাওয়ালা। বোনকে বারবার বুঝিয়েছে মানিক, এদের থেকে দূরে থাক। কিন্তু কে শোনে কার কথা।
দূর থেকে বোনের গ্রুপটাকে অনেকদিন দেখেছে মানিক। একটা জিনিস সে বুঝতে পেরেছে। অরণ্যর প্রতি একটা টান আছে তার বোনের। কিন্তু ছেলেটা বড্ড বনমালা ঘেঁষা। তার বোনকে খুব একটা পাত্তা দেয় না।
আর ওই মেয়েটা! বনমালা। মুখে হাসি লেগে থাকে। যেন কত ভালো। বোনের সঙ্গেও ভালোভাবে কথা বলে। কিন্তু মানিক জানে, এ সবই মুখোশ। বয়স অল্প হলেও ওই বনমালারা ভালোই জানে, কাদের কাছে থাকতে হবে আর কাদের থেকে দূরে।
অথচ ভাগ্যের কী পরিহাস! সেই বনমালার সঙ্গেই আবার একসঙ্গে ক্লাস করতে হচ্ছে বোনকে। আজও তো বনমালা বলে মেয়েটা বসেছিল নাচের মাস্টারনির ঘরে। শতাব্দীকে নিয়ে আসার সময় দেখতে পেয়েছিল মানিক।
বোনকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে সাইকেলটা নিয়ে আবার বেরিয়ে গেল মানিক তার মনটা অস্থির অস্থির করছে। বাড়িতে বসে থাকলে মাথা ঠান্ডা হবে না। মানিকের বাবা-মাও আর ছেলেকে বিশেষ বারণ-টারণ করতে যান না। একটু ভয়ই খান বছর উনিশের ছেলেকে
আরও একটা নিকশ কালো রাত ধীরে ধীরে নেমে আসতে লাগল শান্তিনিকেতনে।
.
২০২১। বনমালার বয়স যখন একুশ।
সন্ধ্যা যেন দ্রুত নেমে এল শান্তিনিকেতনের বুকে। ঠান্ডাটা হঠাৎ পড়েছে। চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে বনমালা। শরীরটা মাঝে মাঝেই কেঁপে কেঁপে উঠছে। মাথাটা কীরকম ভার ভার। শরীরটা আচ্ছন্ন।
দুজনে হেঁটে আসছিল শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন রোড ধরে। দু-দিন আগে প্রবীর সেনের বাড়ির ওই ঘটনার পরে বন্ধুকে কিছুতেই একা ছাড়তে রাজি নয় অরণ্য।
.
সেদিন অরণ্য যেরকম খেপে গিয়েছিল, তাতে প্রবীর সেনকে হাতে পেলে যে কী করত, ভাবতে শিউরে ওঠে বনমালা। অরণ্যর এই রাগটা ছোটোবেলা থেকেই দেখেছে বনমালা। তাকে কেউ কিছু বললেই খেপে যেত ছেলেটা। রুদ্রমূর্তি ধারণ করত।
তাই কোনওমতে অরণ্যর হাত ধরে টেনে এনেছিল বনমালা। শান্ত হতে অনেকটা সময় নেয় অরণ্য। তারপরে বলেছিল, “তুই আমায় ভালোবাসিস কি না জানি না, কিন্তু আমি বাসি। তোর যে ক্ষতি করতে চাইবে, তাকে আমি দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেব।”
বনমালা কিছু বলেনি। সেদিন অরণ্যের প্রস্তাবে সে কিছু একটা বলতে গিয়েছিল। কিন্তু ওই ছেলেটা এসে বাধা দেওয়ায় আর কিছু বলা হয়নি। তারপরে ঘটনা যেভাবে গড়িয়েছে, তাতে আর সুযোগ পায়নি কিছু বলার। আর এখন সে বলবে না। বনমালা বুঝতে পারছে, তার জীবনে একটা ঝড় আসতে চলেছে। সেই ঝড় কত ভয়ংকর হয়, সেটাই দেখার। ঝড়ের তাণ্ডব দেখার আগে আর একটা জীবনকে সে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে দেবে না।
“ওই লোকটার বাড়ি কেন গিয়েছিলি তুই?”
সেদিন কোনও কথাই বলেনি অরণ্য। ফুঁসতে ফুঁসতে চলে এসেছিল বাড়িতে।
আজ মালার পাশে হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্নটা করেই ফেলল সে।
কেন গিয়েছিল, সেটা এখনই বলতে চায় না বনমালা। আগে তাকে জানতে হবে, তারপরে।
“কী রে, কিছু বলছিস না কেন?” আবার বলে উঠল অরণ্য।
“লোকটা একটা কথা বলবে বলেছিল আমাকে। কথাটা কী, এখনও জানতে পারিনি।”
অবাক হয়ে বনমালার দিকে ঘুরে তাকাল অরণ্য, “মানে? তুই কি আবার ওই লোকটার কাছে যেতে চাস নাকি?”
বনমালা কোনও জবাব দিল না। সে জানে, তাকে আরও একবার যেতেই হবে লোকটার কাছে। সত্যটা না জেনে থাকতে পারবে না সে।
বনমালাকে চুপ করে থাকতে দেখে হাঁটা থামিয়ে দিল অরণ্য।
তারপরে বন্ধুর হাতটা ধরে বলল, “তুই কিছুতেই একা যাবি না লোকটার কাছে। এরপরে যখন যাবি, আমি সঙ্গে যাব।”
বনমালা কিছু না বলে একটু হাসল। অরণ্য যা বোঝার তাতেই বুঝে গেল।
মেয়েটা আবার যাবে ওই বাড়িতে। এবং, একাই। ভীষণ জেদি বনমালা।
অরণ্যর চোয়ালটা শক্ত হয়ে এল। তার ঘাড়ের রগটা দপদপ করছে রাগে।
.
২০১৪। সেই রাত…
দোতলায় নিজের ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়ল বনমালা।
বাড়ি ফেরার পরে তার হাঁটুতে ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছে দাদা। ব্যাগটাও তার কাছ থেকে নিয়ে নিয়েছে। বলেছে, “আমি এটা রাখছি। তুই ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নে।”
দাদাটা যে কী করে! নিজের ঘরে এসে হাতমুখ ধুয়ে নিল বনমালা। একটু পরেই মিনতি মাসি রাতের খাবার খেতে ডাকল।
আজ কিছুই মুখে তুলতে ইচ্ছে করছে না বনমালার। শরীরটা সত্যিই খারাপ লাগছে। মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। মুখে-মাথায় আর একটু জল ছিটিয়ে নিল বাচ্চা মেয়েটা। কিন্তু খেতে যেতেই হবে। বাবা জানতে পারলে তুলকালাম করবে। বাবাকে প্রচণ্ড ভয় পায় সে।
খাবার টেবিলে সে একাই। মিনতি মাসিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, দাদার শরীরটা ভালো নেই। খাবে না বলেছে। ঘরেই আছে।
ঠোঁটটা ফোলাল বনমালা। দাদার বেলায় সাতখুন মাপ। না খেলেও কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু তার বেলায় যত সমস্যা। বাবার ঘরের দিকে একবার তাকাল বনমালা। দরজা বন্ধ।
সে খাবার নিয়ে নড়াচড়া করতে লাগল। মিনিট দশেকের মধ্যে অল্প একটু খেয়ে উঠে পড়ল বনমালা।
দাদার ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার ভাবল, তার ব্যাগটা নিয়ে আসে। দরজা ঠেলা দিতে গিয়ে দেখল, ভিতর থেকে বন্ধ। এরকম তো হয় না কখনও। ভাবল, দাদাকে ডাকে। তারপরে মন বদলাল। হয়তো শরীরটা খারাপ, ঘুমিয়ে পড়েছে। তারও তো শরীরটা খারাপ লাগছে। যাক গে, যা হওয়ার কাল সকালেই হবে।
.
মানিক বাড়ি ফিরল বেশ রাত করে। শতাব্দী তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবা ঘরে। মা দরজা খুলে দিলেন। তারপরে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী রে খাবি না?”
“না,” একটু জড়ানো গলায় জবাব দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলল মানিক। টলোমলো পায়ে ছেলের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কী যে কপালে আছে কে জানে। ছেলে-মেয়ে দুটোকেই নিয়েই তো তাঁর যত চিন্তা।
.
২০২১। প্রবীর সেনের বাড়ি যাওয়ার চারদিন পরের ঘটনা…
বনমালা বাড়িতে ঢুকতেই এগিয়ে এল দাদা।
“কী রে কোথায় গিয়েছিলি? রাত হল যে ফিরতে?” দাদার গলায় উদ্বেগের স্বরটা বুঝতে সমস্যা হল না বনমালার।
সত্যি রাত হয়ে গিয়েছে। সাড়ে আটটা বাজে। তার মোবাইলটাও সাইলেন্ট মোডে ছিল। দাদা ফোন করলেও শুনতে পায়নি সম্ভবত।
প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল জয়ন্ত। বনমালার কিছু ভালো লাগছিল না। তার মাথাটা ভীষণ দপদপ করছে। একটা কালো পর্দা যেন তার মাথায় চেপে বসেছে। দাদার প্রশ্নের জবাবে বলে দিল, “দাদা, আমার মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। আমি ঘরে যাচ্ছি।”
দ্রুত নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল বনমালা। একদৃষ্টিতে বোনের চলে যাওয়াটা দেখল জয়ন্ত।
.
ঘরে ঢোকার পরে বনমালার মাথার যন্ত্রণাটা যেন আরও বাড়ছে। একটা অপরিসীম ঘৃণা তৈরি হচ্ছে ওই দীনেন্দ্র সিংহ লোকটাকে ঘিরে।
ক্রমশ লোকটার প্রতি ঘেন্না বাড়ছে বনমালার। প্রবীর সেনের মুখ থেকে তাকে পুরো কাহিনিটা শুনতেই হবে।
কী হয়েছিল তার জন্মের রাতে!
.
রাতে খাওয়ার টেবলে বসে আবার এমন একটা কথা বলল দাদা, যা শুনে রীতিমতো চমকে উঠল বনমালা।
“দিন চারেক আগে তুই প্রবীর সেনের বাড়িতে গিয়েছিলি?”
রুটির টুকরোটা ফেলে চমকে খাড়া হয়ে বসল বনমালা। “তুই কী করে জানলি? প্রবীর সেনকে তুই চিনিস?”
জয়ন্ত কিছু না বলে রুটিটা ডালের বাটিতে ভেজাতে মনোযোগী হল।
“কী হল? কিছু বলছিস না কেন? জবাব দে আমার কথার।”
জয়ন্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা তুলে তাকাল, “লোকটা একবার আমার কাছেও এসেছিল। আমাকেও মায়ের ছবি দেখিয়েছিল। আমাকে ওর বাড়ি যেতে বলেছিল। কিন্তু যাইনি।”
বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল বনমালা। তারপরে অস্ফুটে বলল, “তোর জানতে ইচ্ছে করে না সেই গোপন কাহিনি? কী ভয়ংকর সত্য লুকিয়ে আছে আমাদের জীবনে? কী হয়েছিল আমার জন্মের রাতে?”
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল জয়ন্ত। করুণ চোখে অল্পসময়ে তাকিয়ে রইল বোনের মুখের দিকে। তারপরে খুব আস্তে আস্তে বলল, “সেই ছোটোবেলা থেকে আমি আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে চলেছি রে বোন। আর সহ্য করতে পারছি না। আমাদের এই সংসারে আর বিষ ঢালতে রাজি নই আমি।”
দাদার অপস্রিয়মাণ চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল বনমালা। খেতেও ভুলে গেল সে।
.
২০১৪।
রাত তখন গভীর। হালকা নীল আলোটা জ্বলছে বনমালার ঘরে। একটা অপার্থিব, মোহময় জগৎ যেন তৈরি হয়েছে ছোট্ট মেয়েটাকে ঘিরে।
বিছানায় শুয়ে হঠাৎই এপাশ-ওপাশ করতে লাগল মেয়েটা। ঘেমে যাচ্ছে বনমালা। ছোট্ট মুখটা দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। কী যেন একটা বলার চেষ্টা করছে সে। গোঙাচ্ছে।
তারপরেই ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল বনমালা। আতঙ্কে তার মুখটা সাদা হয়ে গিয়েছে।
ওই স্বপ্নটা। ওই স্বপ্নটা। আবার ফিরে এসেছে ভয়ংকর স্বপ্নটা। আবার একটা খুন হতে দেখল সে।
কাঁপতে লাগল বনমালার ছোট্ট শরীর।
.
২০২১।
ঘুমোনোর আগে ঘরের নীল বাল্বটা জ্বালিয়ে দিল বনমালা। এই নীল বাল্বটা তার ছোটোবেলাকার সাথি। সে যখন ঘরে একা শুয়ে থাকত আর ভয়ে কাঁপত, তখন এই নীল বাল্বটা তাকে সাহস জোগাত। কী ভাগ্যিস, এত বছরেও নষ্ট হয়নি বাল্বটা।
বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিল বনমালা। তার মাথাটা দপদপ করছে। তাও ঘুমোনোর চেষ্টা করল সে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, বুঝতেও পারেনি।
হঠাৎ ভয়ংকর আতঙ্কে ঘুমটা ভেঙে গেল বনমালার। সে কুলকুল করে ঘামছে। হৃদস্পন্দন মারাত্মক বেড়ে গিয়েছে।
আতঙ্কে সাদা হয়ে গিয়েছে মেয়েটার মুখ।
.
আবার, আবার ফিরে এসেছে সেই স্বপ্নটা! সাত বছর বাদে!
ভয়াল, ভয়ংকর সেই স্বপ্নে অতি পরিচিত একজন মানুষকে খুন হতে দেখেছে বনমালা।
খাটে বসে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল মেয়েটা।
