৮
শান্তিনিকেতন, ২০১৪
চঞ্চল মজুমদার খুন হওয়ার একদিন পরে
কোপাই নদীর ব্রিজটা পার হয়ে একটু এগিয়ে ডানদিকে যে রাস্তাটা চলে গিয়েছে, সেটা দিয়ে অল্প এগোলেই একতলা সাদা বাড়িটা। খুবই সাদামাটা একটা বাড়ি। দেখলেই বোঝা যায়, বাড়ির মালিকের আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল নয়।
সেই বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশের জিপটা।
ভিতরে একটা চেয়ারে বসে সমীরণ দত্ত। তার উলটো দিকের চেয়ারটায় একটা ছোটো মেয়ে বসে। তার পিছনে মেয়েটির বাবা-মা আর দাদা দাঁড়িয়ে।
শতাব্দীর দিকে তাকিয়ে গলার স্বরটা যতটা সম্ভব কোমল করে সমীরণ দত্ত বললেন, “আচ্ছা, তুমি শেষ কবে মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়তে গিয়েছিলে?”
শতাব্দী একটু ভেবে বলল, “গত কাল যাওয়ার কথা ছিল। তার আগে গিয়েছিলাম গত পরশু। মানে স্যার মারা যাওয়ার আগের দিন।”
সমীরণ দত্ত মাথাটা একটু দোলালেন, “তোমরা যখন পড়তে গিয়েছিলে, তখন অন্য কাউকে দেখেছিলে? মানে অচেনা কোনও লোক?”
শতাব্দী আবার একটু ভাবল। “না, স্যারের বাড়িতে যারা নিয়মিত আসত, তাদেরই দেখেছি। নতুন কাউকে তো দেখিনি।”
“কত দিন হল পড়ছ তোমরা?”
“এই মাস চারেক।
“তোমরা তো ব্যাচে পড়ো। এর বাইরে স্যার আর কাউকে পড়াতেন?” উত্তরটা জানা থাকলেও মেয়েটা কী বলে, সেটাই দেখতে চাইছিলেন ইন্সপেক্টর।
কিন্তু উত্তরটা শতাব্দী দিল না, দিল মেয়েটার দাদা। “বনমালা পড়ত। ও একা যেত ওখানে।”
“তোমার নাম?” ছেলেটার দিকে চোখ তুলে তাকালেন অফিসার।
“মানিক।”
“তোমার সঙ্গে চঞ্চল মজুমদারের আলাপ ছিল?”
“দু-একবার কথা হয়েছে। আমি তো বোনকে ওখানে দিয়ে আসতাম, নিয়ে আসতাম। ওই সময় স্যারের সঙ্গে বার কয়েক কথা হয়েছিল।
“ইন্টারেস্টিং,” মানিকের দিকে ঘুরে বসলেন সমীরণ দত্ত, “তার মানে তোমার ওখানে যাওয়া-আসা ছিল। কোনও অচেনা লোককে বাড়ির আশপাশে দেখেছিলে কখনও?”
“না স্যার,” মানিক যেন তৈরি ছিল প্রশ্নটার জন্য, “আমি তো ওখানে খুব অল্প সময়ের জন্য থাকতাম। বোনকে দিয়েই চলে আসতাম। আর ছুটি হওয়ার সময় যেতাম। পাঁচ মিনিটও অপেক্ষা করতে হত না।”
একটু ঠান্ডা চোখে মানিকের দিকে তাকিয়ে রইলেন সমীরণ দত্ত। তারপরে বললেন, “ঠিক আছে।” এরপরে বাবা-মায়ের দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন,
“আপনার মেয়ে ওখানে ব্যাচে পড়তে যেত কেন? ওর বন্ধুর সঙ্গেও তো পড়তে পারত, মানে বনমালার সঙ্গে?”
আবারও কথা বলে উঠল মানিক, “কী যে বলেন স্যার! বনমালা বড়োলোক বাড়ির মেয়ে। তার উপরে শুনেছি, চঞ্চল স্যার বনমালার বাবার বন্ধু ছিল। ওর মেয়েকে আমার বোনের সঙ্গে কীভাবে পড়তে পাঠাবে!” মানিকের মুখে একটা তির্যক হাসি খেলে গেল। তারপরে চাপা স্বরে বলল, “স্যার, আমি যতদূর জানি, খুনের দিন ওই বনমালারই শুধু ওখানে পড়তে যাওয়ার কথা ছিল। তবে আর কেউ গিয়েছিল কি না, জানি না।”
অফিসার কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন মানিকের দিকে। ছেলেটাকে আগে রগচটা ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বেশ ধূর্তও।
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন সমীরণ দত্ত। বাকি ছাত্র-ছাত্রীদের ঠিকানা তিনি শতাব্দীর থেকে আগেই নিয়ে নিয়েছিলেন। এবার ওদিকটা দেখতে হবে।
“ঠিক আছে, আমি এখন যাচ্ছি কিন্তু প্রয়োজন পড়লে আবার আসব।” তারপরে মানিকের দিকে ফিরে বললেন, “তোমার যদি আর কোনও কথা মনে পড়ে, তাহলে সোজা থানায় চলে আসবে। ঠিক আছে?”
“নিশ্চয়ই স্যার।”
জিপে ওঠার পরে সহকারীর দিকে তাকিয়ে সমীরণ দত্ত বললেন, “এই বাড়ির ছেলেটার উপরে নজর রাখার ব্যবস্থা করুন। ওই মানিক বলে ছেলেটা। মালটা কিন্তু বেশ ঘোড়েল।”
পুলিশের জিপ কোপাইয়ে ব্রিজে ওঠার সময় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল সমীরণ দত্তর মাথায়— খুনের রাতে আর কে গিয়েছিল ওই বাড়িতে? বনমালা চলে আসার পরে? তিনি নিশ্চিত, দ্বিতীয় বা তৃতীয় ব্যক্তির পায়ের ধুলো ওই সময় পড়েছিল মজুমদার বাড়িতে। যে বা যারা এখনও ছায়ার মধ্যেই রয়েছে।
.
পুলিশের জিপটা দূরে মিলিয়ে যেতেই রাগত চোখে বাবা-মায়ের দিকে তাকাল মানিক, “তোমাদেরই দোষ। কী দরকার ছিল ফুটুনি মেরে ওই মাস্টারের কাছে শতাব্দীকে পড়তে পাঠানোর? গরিবের ঘোড়া রোগ হলে যা হয়। হলো তো এবার! ঠ্যালা সামলাও।”
বাবা আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করলেন, “মাস্টার তো খুবই ভালো পড়াত। আর কম পয়সায় পড়িয়ে দিচ্ছে। মেয়েটার তো লাভ হচ্ছিল।”
কী আর বলবেন বাবা-মা। ছেলেটাকে তো মানুষ করতে পারলেন না। বখে গিয়েছে পুরো। তাই নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে মেয়েটাকে ভালোভাবে পড়ানোর চেষ্টা করছেন। একটা ভালো স্কুল, একটা ভালো মাস্টার। যতটা তাঁদের পক্ষে সম্ভব।
মানিক আর কিছু বলল না। সোজা নিজের ঘরে ঢুকে গেল। তারপরে বোনকে ডাকল, “একটু শুনে যা তো।”
শতাব্দী ঢুকতেই বলল, “মাস্টারটা কীরকম লোক ছিল বল তো? কারও সঙ্গে কখনও ঝামেলা-টামেলা করেছিল?”
শতাব্দী জবাব দিল, “সে তো জানি না। তবে বেশ রাগী ছিল। কিন্তু আমাদের বকাঝকা করলেও বনমালাকে বেশ ভালোবাসত। একদিন ও বাইরের বারান্দায় বসেছিল। আমরা পড়া শেষ করে বেরোচ্ছিলাম। মালার মাথায় হাত বুলিয়ে স্যার কী মিষ্টি-মিষ্টি করে কথা বলছিল তখন!” শতাব্দী একটু মুখ ভেঙিয়ে বলল কথাগুলো।
“সে তো বলবেই। বড়োলোকের মেয়ে বলে কথা,” একটু বিকৃত সুরে বলে উঠল মানিক, “তুই যে কেন ওই ছেলে-মেয়েগুলোর সঙ্গে মেলামেশা করিস! আমি তো তোকে বলেছি, ওরা আমাদের মতো বাড়ির লোককে পাত্তা দেয় না।”
শতাব্দী চুপ করে রইল। কী বলবে সে। দাদাকে কী করে বোঝাবে তার মনের কথা।
সে তো একজনকেই দেখতে শুধু ওদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে। অরণ্যকে। সে চায় অরণ্য তার সঙ্গে বেশি করে কথা বলুক। একটু মিষ্টি করে কথা বলুক। কিন্তু ছেলেটা যেন কীরকম। তার দিকে সেভাবে তাকায় না। সে যেচে কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অরণ্য বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি। ছেলেটা শুধু বনমালার কাছাকাছি থাকতে চায়। শতাব্দী কতবার ভেবেছে ওদের থেকে দূরে চলে আসে। বন্ধুত্ব ভেঙে দেয়। কিন্তু পারেনি। পারেনি ওই একটা ছেলের জন্য।
আর কোনও কথা না বলে মেয়েটা বেরিয়ে যাচ্ছিল দাদার ঘর থেকে। তখনই মানিকের একটা কথা মনে পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “আচ্ছা শোন, পুলিশকে ওই কথাটা বলার দরকার নেই।”
“কোন কথাটা?” শতাব্দী ঠিক বুঝতে পারল না।
“ওই যে চড় মারার ঘটনাটা।
শতাব্দী একবার নিজের গালে হাত বুলিয়ে বলল, “ঠিক আছে, বলব না।” তারপরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মানিক ধীরে ধীরে একটা বিড়ি ধরাল। তার মনে পড়ে যাচ্ছিল সপ্তাহ দুয়েক আগের ঘটনাটা।
.
সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে। চঞ্চল স্যারের কাছে পড়া শেষ করে বেরিয়ে এসেছে শতাব্দী আর ওর বন্ধুরা। বাকি তিনটে ছেলে-মেয়ে কাছাকাছিই থাকে। ওরা হাঁটা দিল বাড়ির পথে। শতাব্দী এগিয়ে এল দাদার সাইকেলের দিকে। তখনই মানিকের চোখে পড়ল বছর পাঁচেকের ছোটো বোনের মুখটা। বিকেলের ক্ষীণ হয়ে আসা আলোতেও বোঝা যাচ্ছে শতাব্দীর চোখে জল।
“কী হয়েছে রে?” কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল মানিক।
“কিছু না,” শতাব্দী এড়িয়ে যেতে চাইলেও ফোঁপানিটা কান এড়াল না মানিকের। সে সাইকেলটা স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে বোনের দিকে এগিয়ে এল।
“কী হয়েছে বল আমাকে।”
শতাব্দী একটু দোনোমোনো করে বলেই ফেলল, “আমি আজ পড়া পারিনি স্যার রেগে আমাকে একটা চড় মেরেছে।”
মানিকের মাথায় চড়াৎ করে রক্ত উঠে গেল। সে এমনিতেই মাথা গরম ছেলে। মারামারি করতে দু-বার ভাবে না। তার আড্ডার ছেলেরা সেজন্য তাকে একটু সমঝে চলে। তার বোনের গায়ে কেউ হাত দেবে, সেটা সে সহ্য করতে পারে না। দুনিয়া একদিকে, বোন আর একদিকে….
তখনই চঞ্চল মজুমদারের বাড়ির গেটের দিকে হাঁটা দিল মানিক। আজ ওই বুড়োটার হাত ভেঙে দেবে সে। এত সাহস!
শতাব্দী তার দাদাকে ভালোই চিনত। জানত, রেগে গেলে কীরকম ভয়ংকর হয়ে যায়। সে দু-হাত দিয়ে টেনে ধরল মানিককে, “দাদা তোর পায়ে পড়ি। তুই স্যারকে কিছু বলিস না। আমার পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। স্কুল থেকেও বার করে দিতে পারে।”
মানিকের কানে প্রথমে কিছুই ঢুকছিল না। তার মাথায় দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। কিন্তু শতাব্দীর হাত ছাড়াতে পারল না। একটু একটু করে শান্ত হল মানিক। সে বুঝতে পারল বোন ঠিকই বলেছে। আস্তে আস্তে আবার সাইকেলের কাছে ফিরে এল মানিক। তবে মনের ভিতর আগুনটা জ্বলতেই থাকল।
.
বিড়িতে একটা টান মেরে উঠে দাঁড়াল মানিক। কয়েকটা দিন তাকে একটু সাবধানে থাকতে হবে।
.
দিন দুয়েক পরে সন্ধ্যার দিকে পাড়ার কাছাকাছি চায়ের ঠেকে এসে বসল মানিক। শান্তিনিকেতন জুড়ে তখন আলোচনা একটাই। চঞ্চল মজুমদারের খুন।
চায়ের ভাঁড়ে মানিকের চুমুক দেওয়া দেখতে বাপি বলে ছেলেটা বলে উঠল, “ওস্তাদ, পুলিশ তো খুব বাওয়াল দিচ্ছে। তোমাকে জেরা করেছে। আমাদেরও কয়েকজনকে প্রশ্ন করছিল এসে। জানতে চাইছিল, ওই রাতে তুমি কোথায় ছিলে, এইসব! আমরা বলে দিয়েছি, তুমি রাত পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে আড্ডা মেরেছিলে।”
সবই জানে মানিক। এও জানে তার বন্ধুরা পুলিশকে কী বলেছে।
শান্ত গলায় মানিক জবাব দিল, “শুধু আসেইনি, আমার পিছনে খোচরও লাগিয়েছে।”
“আরেব্বাস। তোমাকে সন্দেহ করছে নাকি?”
“করলেই বা কী! আমি তো সেই রাতে লোকটার বাড়ির ধারেকাছে ছিলাম না।” চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল মানিক।
“সে তো বটেই,” বলে উঠল বাপি। তারপরে একটু ভেবে জানতে চাইল, “খুনটা কে করেছে বলে মনে হয় তোমার?”
চা শেষ করে ভাঁড়টা ফেলে দিয়ে বিড়িটা বার করল মানিক, “ওরা শালা বড়োলোক। কে জানে কোথায় কী করেছে। কারও রাগ ছিল, কুপিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছে।”
বাপি আর কিছু বলল না। পয়সাওয়ালা লোকেদের যে মানিক দেখতে পারে না, সেটা সে ভালো করেই জানে। খুব একটা চালাক-চতুর না হলেও বাপি বোঝে, নিজের অক্ষমতার জ্বালা রাগের মধ্যে দিয়েই প্রকাশ করে মানিক।
.
আধঘণ্টা বাদে মানিক হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। বোনটাকে একটু চোখে চোখে রাখতে হবে। যা ঘটেছে, সেটা যে খুব ভয়ংকর, তা টের পাচ্ছে মানিক। কে জানে, জল কতটা ঘোলা হবে। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
বাড়ির কাছাকাছি এসেই কুকুরগুলোর ডাক শুনতে পেল সে। একটা কুকুরকে গোটা চারেক কুকুর ঘিরে ধরে কামড়াতে যাচ্ছে।
একটা বড়ো ঢিল তুলে কুকুরগুলোকে তাড়িয়ে দিল মানিক। এই জিনিসটা সে একেবারে সহ্য করতে পারে না। দুর্বলের উপরে সবলের অত্যাচার। তিন-চারজন মিলে একজনকে মারা।
কুকুরগুলোকে তাড়িয়ে কঠিন মুখে বাড়িতে ঢুকে গেল মানিক
