হ্যামলেট এক নয়, বহু – শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়

হ্যামলেট এক নয়, বহু – শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়

যুগভেদে লোকচৈতন্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই লোকচিন্তায় হ্যামলেট-মূর্তির তাৎপর্যের রূপান্তরের দীর্ঘ ইতিহাস হয়তো কোনওদিন সমাজতাত্বিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। আপাতত যোগ্যতা, স্থান ও কালের প্রতিকূলতায় সে প্রয়াসে স্পর্ধা হয় না। চিন্তার ইতিহাসের পটভূমিকায় শেকসপীয়রের এই কালজয়ী নায়কের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ইমেজ আরেকবার তুলে ধরে এই চরিত্রের তাৎপর্যের অনন্ত গভীরতার আভাস দেবার সাধেই এই প্রবন্ধের অবতারণা। যে-হেতু এই নায়ক দুর্বোধ্য, যেহেতু এই নায়ক সহজ সাবেকি ক্যাটেগরি-র ব্যাখ্যায় ধরাপড়ে না, সেইহেতু শেকসপীয়রের নাটককেই বাতিল করে দিয়ে একদা যিনি নিজে মানসিক শান্তি চেয়েছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই অর্ধশিক্ষিত অপরিণতবয়সিদের উচ্ছ্বসিত সাধুবাদ কুড়িয়েছিলেন, আজ বার্ধক্যে তিনি অনুতপ্ত, সেদিনের অপরিণত মানসিকতা স্বীকারেও কুণ্ঠিত নন (এলিজাবেথান ড্রাম্যাটিস্টস গ্রন্থের ভূমিকাস্বরূপ ১৯৬২ সালের জুনে রচিত এলিয়টের প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য)। [ মনে পড়ে, ম্যালভোলিয়ো বলেছিলেন, ‘বার্ধক্যের স্ববিরতা প্রাজ্ঞকে দুর্বল করে, কিন্তু মুর্খকে সুবুদ্ধি দেয়!’] প্রত্যেক পাঠকের কাছে যদি হ্যামলেটের অর্থ স্বতন্ত্র হয়, তাতে নাট্যকারের দুর্বলতা প্রমাণিত হয় না, বরং চরিত্রের জটিলতাই প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং সাহিত্যে এই জটিলতাই সদা কাম্য। একটি চরিত্রের মধ্যে এই অনেকগুলি চরিত্রই সত্য হতে পারে, যে কোনও একটি ব্যাখ্যা গ্রহণে আপত্তি নেই; কিন্তু এই তাবৎ তাৎপর্যের অস্তিত্বের চেতনাতেই বোধ হয় হ্যামলেট সবচেয়ে মূল্যবহ হয়ে উঠতে পারে। নয়তো একটি কম্পোজিট ইমেজ রচনার চেষ্টা করা যেতে পারে, এই প্রবন্ধের স্বল্প পরিসরেও সেই চেষ্টা থাকবে।

১. সপ্তদশ শতক।

সপ্তদশ শতকের চেতনায় হ্যামলেট অভিনীত নাটকের নায়ক। কেবলমাত্র (বা প্রধানত) মঞ্চেই তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে। শেকসপীয়রের নাটকের ঘটনাবলি ও বিচ্ছিন্ন উক্তি বা চিত্রকল্পের ছায়া সমকালীন নাটকে বা লেখায় বারবার ধরা পড়ে। নাটক বা চরিত্রের জনপ্রিয়তার এই রাশি রাশি প্রমাণের মধ্যে উত্তরকালের দার্শনিক বা চিন্তাশীল হ্যামলেটকে তেমন পাওয়া যায় না। বরং এই কালের চলতি ধারণার সঙ্গেই হ্যামলেটের যোগাযোগ দেখা যায়।

সমকালীনদের কাছে হ্যামলেট প্রতিশোধাত্মক নাটকের পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গেই যুক্ত। ব্যক্তিগত প্রতিশোধস্পৃহার বিরুদ্ধে খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের অনুশাসন এবং লোকচেতনায় মধ্যযুগীয় পৃথিবীর উত্তরাধিকারস্বরূপ এই স্পৃহার বাস্তব উপস্থিতি, সম্ভবত এই দুয়ের সংঘাতেই নাটকের যে ধারা শুরু হয়েছিল, হ্যামলেট-এর আদিভাষ্য সেই ধারারই অন্তর্গত। অথচ ১৬০২ সাল নাগাদ এই ধারার প্রতিষ্ঠিত গঠন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ট্যুর্নিয়র, ওয়েবস্টার, চ্যাপম্যান এবং বোমন্ট ও ফ্লেচারের নাটকে সেই আদি সংঘাত আবার এসে দেখা দিচ্ছে। হায়রেনিমোর মতে এই স্পৃহাকে মেনে নিয়ে কেবলমাত্র সুযোগ সন্ধানেই কালক্ষেপ আর সম্ভব নয়। ‘এথেইস্টস ট্রাজেডি’-তে (ট্যুর্নিয়র) দ্বিতীয় অঙ্কে মৃতের বিদেহী আত্মা পুত্র শার্লেমন্টকে সতর্ক করে দেয় ‘ধৈর্যে অপেক্ষা কর; দেখ ঘটনা কী মোড় ফেরে। রাজাদেরও যিনি রাজা, প্রতিশোধের ভার তাঁরই হাতে ছেড়ে দাও।’ শেষ অঙ্কে শার্লেমন্ট এই উপদেশের যাথার্থ্য স্বীকার করে। দ্বিতীয় কোয়াটোর বছরেই শেকসপীয়রের সম্প্রদায় কর্তৃক অভিনীত মার্সটনের দি ম্যালকন্টেন্ট নাটকে ম্যালেভোলি (অর্থাৎ ছদ্মবেশী আন্টোফ্রন্টো)মেন্ডোজাকে শেষ মুহূর্তে ক্ষমা করে। সমকালীনদের চোখে হ্যামলেট-পিতার নির্দেশের ভারে পর্যুদস্ত হ্যামলেটের মানসিক সংকট দুর্বোধ্য মনে হয়নি। সমকালীন উল্লেখগুলি বিচার করলে, প্রতিশোধ, মৃতপিতার আবির্ভাব এবং নায়কের ভূমিকা একই পরিস্থিতির অন্তর্গত, এই বোধের প্রমাণ মেলে। হ্যামলেটের চরিত্রে জটিলতার যোগ ঘটিয়ে শেকসপীয়র প্রতিশোধাত্মক নাটকের ঐতিহ্যের নতুন পর্বের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করলেও লোকচিন্তায় কিডের ‘উর-হ্যামলেট’-এর প্রতিশোধের স্বয়ম্ভু শক্তির মায়া তখনও কাটেনি; এবং সেই একই ধারণা শেকসপীয়রের নাটকের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। ১৬৩০ অবধি যাবতীয় উল্লেখেই এই সাবেকি ধারণার ছায়া। ১৬৮২, ১৬৯৮, ও ১৭০০ সালে যে তিনটি উল্লেখ পাওয়া যায়, সেগুলি তৃতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যের শেষে ইঁদুরের কলের সাফল্যে উৎফুল্ল হ্যামলেটের বাণীর স্মৃতিবহ – অর্থাৎ সরলতমপ্রতিশোধাত্মক পরিস্থিতির পরিমণ্ডল ছেড়ে শেকসপীয়রীয় ভাষ্যের বৈশিষ্ট্যে এবার দৃষ্টি পড়ছে ১।

প্রতিশোধ সংকল্পবদ্ধ নায়কের চরিত্রের সঙ্গে পরম্পরাগতভাবে যুক্ত বৈশিষ্ট্যগুলিও হ্যামলেটের চরিত্রের সঙ্গে মিশে যায়। হায়েরেনিমোর মতো হ্যামলেটও পাগল সাজে, ম্যালেভোলির মতো ‘ম্যালকন্টে ন্ট’ টাইপের গুণসম্পৃক্ত। হ্যামলেটের ব্যঙ্গাত্মক, তিক্ত, নিষ্ঠুর যেন দায়িত্বহীন, ও সময়ে সময়ে অশ্লীল উক্তি এই ম্যালকন্টেন্ট টাইপেরই বিশিষ্ট বাচনরীতির অঙ্গ। স্পষ্টভাষণের যে তিক্ততায় হ্যামলেট পোলনিয়াসকে আঘাত করে, মার্সটনের ম্যালেভোলি সেই একই রীতিতে পিয়েট্রোকে আক্রমণ করে ২। রাজসভার চাটুক্তি ও অবিশ্বাসিনী নারীকুলের প্রতি বিদ্বেষ এবং ‘মেমেন্টো মোরি’র গুরুভারে উভয়ের চিন্তাই কলুষিত। নবজাগৃতির কালের নতুন মানবিক চেতনা ও মধ্যযুগীয় গির্জার গোঁড়া শিক্ষার টানাপোড়েনেই বোধ হয় এই অতৃপ্ত ম্যালকন্টেন্ট টাইপের উদয়। নবজাগ্রত মানবিকবাদের স্বাধীন আত্মজিজ্ঞাসার পরিণতিস্বরূপ মানুষের জ্ঞান ও শক্তির সীমিত পরিধির চেতনা এসে পড়ে। তাই যে হ্যামলেট মৃত্যু ও সর্বব্যাপী পাপের চিন্তায় বিভোর ; সেই হ্যামলেটই প্রায় উদভ্রান্ত উচ্ছ্বাসে মুগ্ধ হয়ে বলে ‘মানুষ, সে কী আশ্চর্য রচনা’! ৩ বিশ্বলোক দর্শনে এই দুই চিত্রের বিরোধেই ম্যালকন্টেন্টের মানসিকতায় বিহ্বলতা তথা তীব্র অসহায় ক্রোধ। ডেকারের ”দি অনেস্ট হেবার”, জন রেনলডস-এর কবিতায়, এবং

ট্যুর্নিয়রের দি রিভেঞ্জার্স ট্র্যাজেডি ও দি এথেইস্টস ট্র্যাজেডি-তে করোটি হাতে মৃত্যুচিন্তার নিদর্শন ম্যালকন্টেন্ট হ্যামলেটের প্রতিষ্ঠার প্রমাণ স্বরূপ।

সমকালীন ধারণায়, ম্যালকন্টেট টাইপের মধ্যেই পাগলামির ক্ষীণ রেশ থাকে। পোলনিয়স ও গার্টুড্রের প্রথম ব্যাখ্যায় (প্রেমের কারণে কিংবা পিতার মৃত্যু ও মাতার সহসা বিবাহের কারণে) হ্যামলেট বিকৃতমস্তিষ্ক; ওফেলিয়ারও সেই ধারণা।৪ ডেনমার্কের সাধারণ মানুষদের মতোই ৫ এলিজাবেথীয় দর্শক সমাজও হ্যামলেটের মধ্যে ম্যালকন্টেন্টের স্বভাবজ পাগলামি দেখতে পান। হ্যামলেট সময়ে সময়ে যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্র প্রকাশ করে, তাতে এই ধারণা আহত হয় না, কারণ ম্যালকন্টেন্টের পাগলামি ঠিক ব্যাধি নয়, বরং নিউরোসিস বা তীব্র স্নায়বিক উত্তেজনা ও বুদ্ধিলোপের সীমান্তরেখায় অবস্থিত। ১৬০৪ সালে অ্যান্টনি স্কলোকরের ‘ডাইফ্যান্টাস ইন লাভ’ কবিতায় প্রেমে পাগল নায়কের চিত্রে হ্যামলেটের স্মৃতি আসে। ১৬১৮ সালে রিচার্ড বারবেজের মৃত্যুতে রচিত এক কবিতায়, ডেকারের দি ডেড টার্ম ও ল্যানর্থন অ্যান্ড ক্যান্ডল লাইট, চ্যাপম্যান, জনসন ও মারস্টনের ইস্ট ওয়ার্ড হো নাটকে এই একই চিত্র পাওয়া যায়! কখনও কখনও এই হ্যামলেটীয় প্রেমিক আতিশয্যহেতু হাস্যকর হয়ে ওঠে। এই পাগলামির সুচতুর চালেই হ্যামলেট প্রতিপক্ষকে পারস্ত করে, তাই দর্শকও হ্যামলেটের সফলতার অংশীদার হয়ে এই পাগলামিতে সহানুভূতির হাসি হাসে।

এই শতাব্দীর চিন্তার আরও একটি প্রদেশে হ্যামলেটের স্থান আছে। মানব চরিত্রে বিষাদের ভূমিকা সম্পর্কে এলিজাবেথীয় সমাজের ভাবনা রীতিমতো জটিল স্তরে পৌঁছেছিল। মানবদেহের মাইক্রোকসমসে চারটি হিউমরের মধ্যে বিষাদ অন্যতম (বিষাদ যেহেতু ক্ষিতির সঙ্গে যুক্ত, সেইহেতুই বোধ হয় মানুষের পার্থিব জীবনে প্রায় অনিবার্য)। বিষাদের প্রাবল্যে মানুষ বিষণ্ণ, তিক্ত অসংসৃষ্ট ও কুটিল হয়ে পড়ে। এই অবস্থারই নাম স্বাভাবিক বিষাদ। অস্বাভাবিক বিষাদ বা দগ্ধ বিষাদের৬ উৎস অন্যরূপ। যে কোনও হিউমার অত্যধিক উত্তেজনায় আপনাকে দহন করলে এই বিষাদের জন্ম হয়। স্যার টমাস এলিয়ট বলেন, ‘সর্বশ্রেণীর দগ্ধ বিষাদই মানুষের বুদ্ধি ও বিচারশক্তিকে ক্ষতবিক্ষত করে।’৭ টিমথি ব্রাইটের ‘ট্রিটিজ অভ মেলাংকলি’ গ্রন্থে ৮ এই মত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ‘অস্বাভাবিক বিষাদ মস্তিষ্কের যাবতীয় শক্তি ও কর্মের ইচ্ছাকে ধ্বংস করে’; বিষণ্ণ ব্যক্তি ‘প্রথমেই সন্দিহান হয়, দীর্ঘকাল চিন্তায় নিমগ্ন থাকে, সন্দিগ্ধচিত্ত থাকে, অধ্যয়ন ও চিন্তায় গভীরভাবে প্রবেশ করে’, বিষণ্ণজনের এই হিউমর ‘তাদের মধ্যে কর্মে অবহেলা, এবং অধ্যবসায়ের স্থলে দিগভ্রষ্ট চঞ্চলতা এনে দেয় কর্মে তাদের অনীহা বস্তুলোকের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুশীলনেই তাদের আনন্দ; আবেগের তীব্রতায় তারা সহজে ধরা পড়ে না, অথচ ধরা পড়লে চরমবিন্দু অবধি চলে যায়; ‘বিষাদের অন্ধকারে চন্দ্রসূর্য ঢাকা পড়ে, … তাবৎ গ্রহ নক্ষত্র …অন্ধকারে হারিয়ে যায়, কালো কুয়াশায় রাহুগ্রস্ত হয়”; এই বিষণ্ণ হিউমরে কল্পনার মানসচক্ষে বীভৎস সব চিত্র উদঘাটিত হয়, সাধারণ বুদ্ধি, কল্পনাশক্তি ও স্মৃতিশক্তি আহত হয়, নিজের বাসস্থানও বন্দীশালা মনে হয়; কিয়ৎকালের জন্য যাবতীয় গুরুত্বসহ বিষয় লঘু ও হাস্যকর বোধ হয়; দুঃখেও নাচগান আসে।৯ হ্যামলেটকে এমনি এক বিষণ্ণ চরিত্ররূপে চিনতে এলিজাবেথীয় দর্শকের কষ্ট হত না।

২. অষ্টাদশ শতক।

অষ্টাদশ শতকের চিন্তায়, হ্যামলেটের চরিত্র অন্তত প্রথমে বেটারটন ও গ্যারিকের অভিনয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ যুগের অভিনেতারা ও নাট্যরসিকেরা হ্যামলেটের বহুরূপীসম ভাব-পরিবর্তনে মুগ্ধ হন। শিল্পমাত্রই যে যুগে মহতী সেন্টিমেন্টের ধারক, সে যুগে সেন্টিমেন্টের রাজ্যে হ্যামলেটের মুক্তপক্ষ বিচরণই যে সবচেয়ে মূল্যবহ মনে হবে, তাতে বিস্মিত হবার কারণ নেই। অ্যারন হিল ‘দি প্রম্পটার’ পত্রিকায় নালিশ করেন – উইলকসের অভিনয়ে হ্যামলেটের ‘উচ্ছল’ দিককে পাওয়া যায়, বুথের অভিনয়ে তার ‘গম্ভীর’ দিক – অর্থাৎ ‘অর্ধমাত্র রাজপুত্র হ্যামলেট’। হ্যামলেটের চরিত্র ব্যাখ্যায় হিল লক্ষ করেন ‘আত্মনিমগ্ন, অথচ সৌজন্য স্নিগ্ধ মানবতা; স্বভাবত বিষাদ মগ্ন, কিন্তু ভদ্র শিক্ষার প্রসাদে তাঁর মনের অন্ধকার দীপ্ত হয়ে উঠেছে; বৃষ্টিধৌত মে মাসের সকালের মতো তাঁর বিষাদ আলোকস্নাত; দুঃখে তিনি ক্লিষ্ট নন, ছেলেখেলাতেও লঘু নন; একাকিত্বে গাম্ভীর্যে গভীর, জনসমক্ষে স্বেচ্ছায় পরিবর্তনশীল; যা চান তাই হতে পারেন ; কিন্তু যা হওয়া উচিত, তিনি কেবল তা-ই-নিহত পিতার শোকে সন্তপ্ত, মাতার লঘুতায় ক্ষুদ্ধ, খুল্লতাতের হীনতায় রুষ্ট।’ অভিনয়ে এই বিচিত্ররূপক্ষম চরিত্র রচনাই বেটারটন ও গ্যারিকের কৃতিত্ব।

গ্যারিকের অভিনয়ে পূর্ব শতাব্দীর হ্যামলেটের রুক্ষতা কেটে যায়। হ্যামলেটের বিষাদ এবার দার্শনিকের তন্ময় চিন্তা হয়ে উঠেছে। তার মৃত্যু চিন্তাও সমকালীন কবিতার ক্ষীণপ্রাণ স্টাইলাইজড মৃত্যুচিন্তারই অনুরূপ। ‘পিতৃভক্তি’ ও সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ভয়, এই দুই অনুভূতিই গ্যারিকের হ্যামলেটের বিষাদের উৎস। জনৈক প্রত্যক্ষদর্শী টম ডেভিসের সাক্ষ্যে জানা যায়, ‘গ্যারিক আশ্চর্য প্রয়াসে আবেগের স্পর্শে সেন্টিমেন্টের বিপুল ভাণ্ডার উন্মুক্ত ক’রে দেন।’ প্রত্যেকটি অনুভূতিকে বিচ্ছিন্নভাবে মুখজ ও দেহজ অভিনয়ে পুনঃসৃষ্টি করার দুর্লভ নিষ্ঠা গ্যারিকের ছিল বলে মনে হয়। এই অনুভূতিপ্রবণ রাজপুত্রকে রচনা করে তার উপর ‘ডেকোরাম’-এর ঔচিত্যবোধ চাপিয়ে দিতে গ্যারিক কুণ্ঠাবোধ করেননি। ব্যক্তিগত পত্রে গ্যারিক লেখেন,

‘আমি হ্যামলেট প্রযোজনা কালে পরিবর্তনের স্পর্ধা দেখিয়েছি। জীবনে এমন অপরিণামদর্শী কাজ আর করিনি; কিন্তু আমি তার আগেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, পঞ্চম অঙ্কের জজ্ঞাল থেকে এই মহৎ নাটককে মুক্ত না করে মঞ্চ থেকে আমার মুক্তি নেই। গ্রে ভডিগারের চতুরালি ও ফেনসিং ম্যাচ বর্জন করে আমি এই নাটক নামিয়েছি। আমার এই পরিবর্তন অপ্রত্যাশিত জনসমর্থনও লাভ করেছে।’১০

মঞ্চের বাইরের চিন্তাতেও আরও পরিচ্ছন্ন, আরও সংস্কৃত এক হ্যামলেটকে রচনা করা হয়। আর্ল অফ শাফটসবেরির বিচারে, হ্যামলেট ‘গভীর চিন্তার’ প্রবক্তামাত্র। নিকোলাস রো দেখান হ্যামলেট অরেস্টিসের চেয়ে মানবিক। স্বভাবতই মানবিক মহিমায় মহিমান্বিত যে হ্যামলেট-মূতিঁ রচিত হয়, লিউইস টেবলড তাতে হ্যামলেটের অশ্লীলতা ও অসৌজন্যকে ক্ষমা করতে পারেন না। তাঁর পরে হানমার ও ডক্টর জনসনও হ্যামলেটের ‘নিষ্ঠুরতায়’ আহত হন। এই যুগের হ্যামলেট-চিন্তার স্পষ্টতম চিত্র আছে স্যার টমাস হ্যানমারের রচনা বলে কথিত একটি প্রবন্ধে। হাউস অফ কমনস-এর স্পিকার হ্যানমারের কাছে হ্যামলেটের ‘বীরোচিত চরিত্র’, ‘পিতৃভক্তি’ ও ‘গুণান্বিত মানসিকতা’-র সঙ্গে তার পৌনঃপুনিক লঘুচিত্ততা, পাগলামি, অভদ্রতা, ওফেলিয়ার সঙ্গে কথায় অশ্লীলতা এবং প্রার্থনারত রাজার প্রতি নিষ্ঠুরতা কিছুতেই খাপ খায় না।

নাটকের সাক্ষ্য প্রমাণের ঊর্ধ্বে হ্যামলেটের মহত্বকে স্থাপন করার এই ব্যাপক চেষ্টার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ১৭৪৭ সালে হ্যামলেটকে ‘এভরিম্যান’ বলে প্রমাণ করে দেন, অর্থাৎ কার্যত হ্যামলেটের ‘বীরোচিত’ চরিত্র সাধারণতম দিনানুদৈনিক জীবনের একটি সাধারণ মানবচরিত্র বলে প্রতিপন্ন হয়। ‘হ্যামলেটে দেখি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, বুদ্ধিমান একটি যুবক, সংকল্প স্থির করেও সে তার সন্দেহ-দোটানা কাটিয়ে উঠতে পারে না। তার চরিত্রে এমন কিছুই নেই যা মানবজাতির মধ্যে অহরহ মেলে না।’ গাথরির বিচারে, হ্যামলেটের সংকট যে কোনও সাধারণ শিক্ষিত যুবকের সংকট।

১৭৭৬ সালে গ্যারিক মঞ্চ থেকে বিদায় নেন, ওই সঙ্গেই শেকসপীয়রীয় অভিনয়ের একটি বিরাট যুগের অবসান হয়। জর্জিয়ান থিয়েটারের অবসানের মধ্যেই শেকসপীয়রের নাটক মঞ্চের সীমা পেরিয়ে সমালোচকদের এক্তিয়ারের মধ্যে এসে পড়ে। অভিনেতাদের অভিনয়ে রচিত হ্যামলেট-মূর্তির আভাস ক্রমশই ঝাপসা হতে থাকে, এবং হ্যামলেট-চিন্তা নতুন খাতে বইতে থাকে। ১৭৭০ সালে ফ্রানসিস জেন্টলম্যান এবং ১৭৭২-এ ডক্টর জেমস বিটি হ্যামলেটের চরিত্রের জটিলতা এবং পরস্পরবিরোধী অনুভূতির টানাপোড়েন সম্পর্কে অবহিত হয়ে ওঠেন। হ্যামলেটের চরিত্র ব্যাখ্যার এই নতুন ধারার প্রথম কীর্তি উইলিয়ম রিচার্ডসনের প্রবন্ধে (১৭৭৪) হ্যামলেটের মানসিকতার ব্যাখ্যা। রিচার্ডসন বলেন, ‘একটি প্রোথিত অনুভূতিকে উচ্ছেদ করে প্রেমের স্থলে ঘৃণাকে এমনকি উদাসীনতাকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে মানব-প্রকৃতি বিপর্যস্ত হয়। … হ্যামলেটের দশাও অনুরূপ। নৈতিক সৌন্দর্য ও বিকৃতি সম্পর্কে সূক্ষ্ম বোধসম্পন্ন হ্যামলেট গুরুজনের মধ্যে বিচ্যুতি লক্ষ করেন।… ক্রুদ্ধ বিক্ষোভ অপরাধীকে শাস্তি দিতে এগিয়ে আসে। কিন্তু এই বিক্ষোভ যখন নৈতিক বোধের ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার প্রকৃতি ও ধারা ভিন্ন হ’তে বাধ্য। অনুভূতির প্রথম ধাক্কায় হয়তো তীব্র ও ত্বরিত প্রতিশোধের স্পৃহা আসে। কিন্তু ঔচিত্যানৌচিত্যবোধ এবং বিচারশক্তি এই সহিংস তীব্রতাকে খর্ব করে। সংঘর্ষলিপ্ত বলিষ্ঠ নীতিসমূহের সংঘাতে বিপর্যস্ত চিন্তাশীল মন তাই অনিশ্চিত ও দোলাচলচিত্তবোধ হয়।’ রিচার্ডসন হ্যামলেটের চরিত্রে ‘আত্মপ্রতারণা’র ঝোঁক লক্ষ্য করেছেন। প্রার্থনারত ক্লডিয়াস প্রসঙ্গে হ্যামলেটের তথাকথিত ‘নিষ্ঠুরতা’ এবং সময়ে সময়ে লঘুচিত্ততা ও পার্থিব জীবন সম্পর্কে অনীহা রিচার্ডসন ‘আত্মপ্রতারণা’ বলে ব্যাখ্যা করেন।১১ হার্টলির অ্যাসোসিয়েশনিজম-এর ধারায় সূক্ষ্ম মনস্তাত্বিক বিচারে হ্যামলেটের এই পুনর্মূল্যায়নে তার নাটকীয় চরিত্রের পরিবর্তে সামাজিক চরিত্র আরোপিত হল। টমাস রবার্টসন ও হেনরি ম্যাকেঞ্জি রিচার্ডসনের ব্যাখ্যায় মূল ধারা অনুসরণ করেন। ‘পাপপুণ্য সম্পর্কে সূক্ষ্ম স্পর্শকাতরতা,’ ‘অপার প্রাণময় কল্পনাশক্তি’ এবং ‘জ্ঞানের পরিবর্তে স্বজ্ঞা,’ আসন্ন রোম্যান্টিক জীবনধর্মের পূর্বাভাস, অষ্টাদশ শতাব্দীর অন্তিম পর্বে নব হ্যামলেট মূর্তিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘ডিলহেলম মাইস্টারে’ গ্যায়টের হ্যামলেট-বিচারও এই একই মৌলিক মনস্তত্বকেন্দ্রিক বিশ্লেষণ। অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘বীরোচিত’ হ্যামলেটকে গ্যয়টে সম্পূর্ণ বর্জন করেন – তিনি হ্যামলেটকে দেখেন ‘সুন্দর, নিষ্কলঙ্ক, মহান, নীতিনিষ্ঠ চরিত্র, অথচ বীর হয়ে উঠবার মতো স্নায়বিক শক্তি নেই – দুঃসহ অথচ অনিবার্য ভারের চাপে সে হারিয়ে যায়; প্রতিটি দায়িত্বই তার আছে পবিত্র দায়ভার।’ ‘শেকসপিয়র দেখালেন অক্ষম নায়কের উপর গুরুভার দায়িত্বের ভার।… এ যেন বহুমূল্যে পাত্রে রোপন করা ওক গাছ; যে পাত্রে কেবল ফুলের গুচ্ছই শোভা পায়, তাতে ওক গাছের শিকড় ছড়ানো; পাত্র ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।’১২ অভিজ্ঞতার নিষ্ঠুর রোষ ও পুষ্পপ্রতিম রোম্যান্টিক কবির সংঘাতজাত রোম্যান্টিক বিষাদ ও হ্যামলেটের বিষাদ এবার অভিন্ন হয়ে যায়। এই হ্যামলেটের প্রতি করুণা বোধ করা যায়, ধীরোচিত মর্যাদার সুযোগ থাকে না।

৩. রোমান্টিক পর্ব।

শেকসপীয়রের হ্যামলেট রোমান্টিক পর্বে খুব সহজেই রোম্যান্টিক কবির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। বৃহত্তর ও পূর্ণতর জীবনের আর্তি এবং সঙ্গে সঙ্গেই পার্থিব জীবনের যন্ত্রণা-নাইটিঙ্গেল হবার কামনা-এর সঙ্গে হ্যাটলেটের আত্মীয়তা আছে। একটি পত্রে কীটস হ্যামলেটের সঙ্গে স্রষ্টা শেকসপীয়রের আত্মীয়তা লক্ষ করেন, ফ্যানি ব্রনকে লেখা শেষ পত্রে (অগস্ট ১৮২০) লেখেন ‘আমারই মতো যন্ত্রণায় হামলেট ওফেলিয়াকে বলেছিল-নানারিতে যাও, যাও, যাও! আমিও সব কিছু এই মুহূর্তেই ছেড়ে দিতে চাই-আমি মরতে চাই। যে জান্তব পৃথিবীর সঙ্গে তুমি হাসছ, আমি সেই পৃথিবীকে দেখে অসুস্থ বোধ করি। আমি পুরুষকে ঘৃণা করি, নারীকে আরো বেশি।’ হ্যামলেটের ব্যর্থতার সঙ্গেই কীটসের যোগ। চার্লস ল্যাম ‘সলজ্জ, উদাসীন, নিঃসঙ্গ হ্যামলেটের’ যে চিত্র রচনা করেন, মঞ্চের বাস্তবতায় তার প্রাণহানি হবার আশঙ্কায় ‘হ্যামলেট’-এর মঞ্চায়নের বিরুদ্ধেই মত রাখেন। ‘হ্যামলেটের যা কিছু কর্ম, তার দশ ভাগের নয় ভাগ নিজের সঙ্গে নীতিবোধের মত-বিনিময়, তার নিঃসঙ্গ চিন্তার বাণীরূপ.. কেবল পাঠকের জন্যেই…।’ ‘চারশো লোকের ভিড়ে’ অভিনেতা কেমন করে এই অন্তরঙ্গ চিন্তাকে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করবেন? শেকসপীয়রীয় হ্যামলেটের ‘সী-চেঞ্জ’ এই পর্বেই সম্পূর্ণ হল-মঞ্চ থেকে একেবারে ঘরের কোণে।

রোম্যান্টিক হ্যামলেটের স্পষ্টতম বিশ্লেষণ কোলরিজের। হ্যামলেটের মনে চিন্তা ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভবের সুসমঞ্জস্য সম্পর্ক ভেঙে কেবল চিন্তার প্রাধান্যহেতু তার স্বভাবজ কর্মপ্রেরণা ভেঙে পড়ে। হ্যামলেটের চিন্তা ও কল্পনা তার বাস্তব অনুভূতির চেয়ে অনেক জীবন্ত। হ্যামলেটের দৃষ্টিতে স্বভাবতই বস্তুলোকের ঘটনাদি ঝাপসা হয়ে গেছে; মনের দর্শনে যা কিছু প্রতিফলিত হয়, কেবল তারই যা কিছু সারবত্তা। পৃথিবী থেকে এই দূরত্ব ও নিঃসঙ্গতা, এবং তার যন্ত্রণা রোম্যান্টিক কবিদের সকলেরই কাম্য। হের্ডার হ্যামলেটের মানসিকতাকে ‘মেটাফিজিকাল’ বলে বর্ণনা করেন, এবং উইটেনবার্গের শিক্ষার সঙ্গে এই মানসিকতার যোগসূত্র লক্ষ করেন।

তেঈনের ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসেও এই রোম্যাণ্টিক হ্যামলেটকেই দেখি ‘হ্যামলেটের কল্পনাশক্তি সুচিন্তিতভাবে কারও বক্ষে ছুরি বসাবার শক্তি ও আত্মপ্রত্যয় থেকে তাকে বঞ্চিত করে। অতর্কিত কোনও অনুভবের ইঙ্গিত মাত্রেই সে অমন একটা কাজ করতে পারে। হ্যামলেটের প্রয়োজন মুহূর্তের প্রেরণা তাকে ভাবতে হয়, অ্যারাসের আড়ালে রাজা লুকিয়ে আছেন, নয় তো বিষপ্রয়োগে নিজের মৃত্যু অবধারিত জেনে শত্রুকে তরবারির আয়ত্তে চাই। হ্যামলেট নিজে তার কর্মের নিয়ন্তা নয়, পরিস্থিতিই তাকে কর্মে টেনে আনে; সে হত্যার পরিকল্পনা আঁটতে জানে না; হত্যাই যদি করতে হয়, তবে তাও অনুদ্যোগে। অত্যন্ত জীবন্ত কল্পনাশক্তি অসংখ্য কল্পচিত্র সৃষ্টি করে শক্তিকে ব্যাহত করে, অডিনিবেশের তন্ময়তা শক্তিকে গ্রাস করে! হ্যামলেটের মধ্যে দেখবেন কবির আত্মা, যে আত্মা স্বপ্ন দেখতে জানে, কাজ করতে জানে না, আপনার কল্পনায় রচিত অশরীরী সৃষ্টির মায়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে, সেই কল্পলোককে এত স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করে যে বাস্তবে নিজেকে স্থাপন করতে পারে না; অদৃষ্টের ফেরে কবি না হায় সে হয়েছে রাজকুমার, আরও কুটিল অদৃষ্টের খেলায় তাকে হতে হল অপরাধের দণ্ডদাতা; প্রকৃতি যাকে প্রতিভার আধার করতে চেয়েছিল, ভাগ্যলক্ষ্মী তাকে উন্মাদনা ও দুঃখের অভিশাপে অভিশপ্ত করল। হ্যামলেট স্বয়ং শেকসপীয়র…।’১৩

রোম্যান্টিক চেতনায় সুন্দরের সঙ্গে বীভৎস ও ভয়ংকরের যে যোগ স্বীকৃতি পায়, হ্যামলেটকে সেই ভয়ংকর সৌন্দর্যের প্রতীক মনে করা যেতে পারে। নোভালিস থেকে জিদ অবধি অনেকেই আনন্দ ও যন্ত্রণার যে সম্পর্ক লক্ষ করেছেন, বোদল্যার ‘হিম টু বিউটি’-তে সেই একই মেডুসা সৌন্দর্যকে যখন আরাধনা কনে, তখন হ্যামলেটের চিত্র বার বার মনে আসে। বোদল্যার প্রশ্ন তোলেন সুন্দরের জন্ম কোথায়, অনন্ত স্বর্গধামে, না অতল পাতালে? তিনি বলেন ‘আসুরিক অথচ স্বর্গীয় তোমার চাহনিতে আশীবার্দ ও পাপ একই লগ্নে জন্ম নেয় তাই তুমি যেন সুরা।’ বোদল্যার আবার বলেন

তুমি কি পাতালের অন্ধকার থেকে উদয় হও, না নক্ষত্রলোক থেকে নেমে আসো? অভিশপ্ত অদৃষ্ট কুকুরের মতো তোমার পায়ে পায়ে ঘোরে! তুমি নির্বিচারে বীজ বুনে যাও-আনন্দের অথবা বিষাদের। তোমার শক্তিকে এখানে সবই বশ, তুমি অধিপতি, অথচ কখনও জেরার জবাব দেবে না। সুন্দর, তুমি মৃতকুলকে মাড়িয়ে যাও, তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি ফেলে। বীভৎসা তোমার মায়াবী রত্ন; হত্যা তোমার সাধের খেলনা, তোমার উদ্ধত বুকের পরে সে-কী লাস্যে নাচে!’১৪

মর্ত্যলোক সম্পর্কে হ্যামলেটের তিক্ত ঘৃণা, অথচ মর্ত্য প্রেমেই সে-ঘৃণার উৎস; অজান্তে পোলনিয়াসকে হত্যা করে সে ওফেলিয়ার মৃত্যুর কারণ হয়; প্রতিশোধের মুহূর্তে হ্যামলেট পূর্ণতায় পৌঁছায়, কারণ এই মুহূর্তের অভিমুখেই সে পদে পদে এগিয়েছে, অথচ হ্যামলেটের এই একমাত্র কীর্তিতেও আনন্দ ও বিষাদ মিশে একাকার হয়ে যায়। রোম্যান্টিক রূপকল্পে বিরোধী শক্তিবর্গের সমাহার রচনার মধ্যে জীবনের জটিলতর তাৎপর্য সন্ধানের চেষ্টা আছে, এবং বিরোধী শক্তিবর্গের সম্মিলন সৃষ্টিই কোলরিজের ‘এজেমপ্লান্টিক ইম্যাজিনেশন’-এর লক্ষ্য। এই সমন্বয়ের মধ্যে১৫ রোম্যান্টিকের আদর্শলোকের অসীমকে ধরতে চান-সসীম পৃথিবীর সংঘাতকে পেরিয়ে কোনও বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে লোকান্তরে অসীমের স্বাক্ষর আছে। র্যাঁবোর ‘ওফেলিয়া’ কবিতায় সেই আভাস আছে, ‘নদীর স্রোতের টানে তোমার মৃত্যু হল। নরওয়ের গিরিরাজি থেকে বাতাস এসে তোমার কানে কানে তিক্ত স্বাধীনতার কথা বলে গেল। … প্রমত্ত সাগরের কণ্ঠস্বর, প্রচণ্ড গর্জন, তোমার শিশু হৃদয়কে ভেঙে দিয়ে গেল- যে হৃদয় কোমল, একান্তভাবেই মানুষের। এপ্রিলের সকালে সেই বিষণ্ণ সুরূপ অভিজাতজন, তোমার পায়ের কাছে, সেই হতভাগ্য নীরব পাগল। স্বর্গ! প্রেম! মুক্তি! সেকী স্বপ্ন, আরে বোকা পাগল মেয়ে! আগুনের কাছে বরফ যেমন গলে, তুমিও তেমনি গলে গেলে। তোমার আশ্চর্য স্বপ্ন তোমার কণ্ঠ রোধ করল; ভয়ঙ্কর সেই অসীম তোমার নীল চোখে মায়া ধরালো।’১৬ ‘লারা’, ‘ম্যানফ্রেড’, ‘কর্সেয়ার’ প্রভূতি রচনায় এবং ব্যক্তি জীবনে বায়রন যে সেট্যানিক নায়ককে রচনা করেছিলেন র্যাঁবোর হ্যামলেটের সঙ্গে তার আত্মীয়তা আছে-নিষ্ঠুরতা ও বিপুল শক্তির (যে শক্তি সমাজ বন্ধনের ঊর্ধ্বে, সেইহেতু অসামাজিকও বটে) যোগেই অসীমের মূর্তি রচিত হয়। হ্যামলেট ম্যানফ্রেডের মতো বলতে পারে, ‘আমার আলিঙ্গন মৃত্যুর বার্তা। … আমি তাকে ভালবেসেছিলাম, তাকে বিনাশ করলাম।” ১৭ হ্যামলেট যাদের ভালবাসে তাদেরই উপর তার আঘাত সবচেয়ে নিষ্ঠুর। গার্ট্রুড ও ওফেলিয়া সেই নিষ্ঠুরতার সাক্ষী।

৪. আধুনিক কাল বিংশ শতাব্দী।

ভিক্টোরীয় যুগে এবং আমাদের শতকেও অ্যাকাডেমিক সমালোচনা হয় হ্যামলেট চরিত্র ছেড়ে নাটকের দিকেই সন্ধানী দৃষ্টি ফিরিয়েছেন; নয়তো শ্লেগেল ও কোলরিজের খাতেই হ্যামলেটের কালক্ষেপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাটকের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও চরিত্রবর্গ, এবং নাট্যকারের সমকালীন চিন্তালোকের সঙ্গে হ্যামলেট-চরিত্রের জটিল সম্পর্ক নির্দেশ ক’রেছে। প্রথম ধারায় স্টোল, কোলবে, স্পার্জিয়ন, গ্র্যানভিল বার্কার, মিউর, ব্র্যাড ব্রুক। বেথেল প্রমুখ এবং দ্বিতীয় ধারায় ডাউডেন, ব্র্যাডলি, ডোভার উইলসন, হ্যারিসন প্রমুখেরা আছেন। এঁদের কীর্তি প্রথমত সুপরিচিত, এঁদের মতামত বহুপঠিত, দ্বিতীয়ত এঁরা কেউই হ্যামলেটের নতুন কোনও মূর্তি রচনা করেননি। তাই এবার এ্যাকাডেমিক সমালোচনার বাইরেই আমরা নিদর্শন খুঁজব।

হ্যামলেটের ফ্রয়েডীয় মূর্তি রচনা করেন স্বয়ং ফ্রয়েড ও আর্নেস্ট জোনস ১৮। হ্যামলেটের কালক্ষেপকে এঁরা ‘হিস্টিরিকাল প্যারালিসিসের’ লক্ষণ বলে বিবেচনা করেন। হ্যামলেট চিন্তায় তন্নিষ্ঠ বলেই যে-কোনও কর্মের পূর্বেই আত্মজিজ্ঞাসায় লিপ্ত হয়, এবং কর্মে অক্ষম হয়, এই যুক্তির প্রতিবাদ করে ফ্রয়েড দেখান যে, হ্যামলেট সহসা উত্তেজনায় পোলনিয়াসকে হত্যা করে, এবং পরে সুপরিকল্পিতভাবেই কুটচক্রে রোজেনক্রান্টজ ও গিল্ডেনস্টার্নের মৃত্যু ঘটায়। কেবলমাত্র ক্লডিয়াসকে হত্যার প্রশ্নেই হ্যামলেটের টালবাহানা। হ্যালেটের যাবতীয় যুক্তিকেই ডক্টর জোনস ভিত্তিহীন বিবেচনা করেন। ডক্টর জোনস দেখান যে, পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের দায় হ্যামলেটের কাছে স্পষ্ট কিন্তু মাতার অজাচারের প্রশ্নেই হ্যামলেটের মানসিক যন্ত্রণা সবচেয়ে দুর্বিষহ। মনস্তাত্বিকদ্বয়ের সিদ্ধান্ত, শৈশবে মাতার সঙ্গে হ্যামলেটের সম্পর্কে গোপন কামের ভাব ছিল। পিতৃভক্তির আড়ালে পিতা সম্পর্কে প্রেমিকোচিত হিংসা চাপা পড়েছে। মাতাপুত্রের এই সম্পর্কের অস্তিত্ব সন্দেহে গার্টুর্ডের ইন্দ্রিয় পরবশ প্রকৃতি এবং পুত্রের প্রতি ভালোবাসা ১৯ ও পুত্রের কাছে দুর্বলতার ডক্টর জোনস সমর্থন পেয়েছেন। গার্ট্রুডকে শুনিয়ে ওফেলিয়ার কাছে অশ্লীল উক্তি উচ্চারণ হয়তো এইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়- এ হেন বঞ্চিত প্রেমিকের প্রতিশোধ- স্পৃহায় অন্য নারীর উপর নিজের শক্তির প্রদর্শন। হ্যামলেটের অশ্লীন উক্তিকে কোনও যৌন সঙ্কটের প্রতিফলন বলে বিচার না করলে হ্যামলেটের শিক্ষিত ও মার্জিত প্রকৃতির সঙ্গে এই শহালীনতাকে মেলানো যায় না। এই যুক্তির জের টেনে জোনস বলেন, মায়ের প্রেমে পিতার স্থান দখল করার দীর্ঘকাল অবদমিত সাধ ক্লডিয়াসের কর্মে নিজেরই অপূর্ণ সাধের বাস্তাবয়ন দেখে অচেতন উত্তেজনায় উত্তেজিত হয়। নিজের মনে যে অজাচারের সাধ ছিল, অন্য অজাচারে তাকেই প্রত্যক্ষ করেই হ্যামলেট এমন বিপর্যস্ত হয়। এই যৌন সংকটই অবদমনের নিষ্পেষণে তীব্র নারীদ্বেষের ছদ্মবেশে প্রকাশিত হয়। নিজের অপরাধ-বোধ ও মাতার স্বামীকে হত্যার প্রশ্নে আবার সেই পুরনো শৈশবসাধের অবদমিত জ্বালা হ্যামলেটকে বাধা দেয়। হ্যামলেটকে এইভাবে ইডিপাস কমপ্লেক্স নামধেয় বিকারের শিকার বলে প্রমাণ করা যায়।

ডি. এ্যচ, লরেনস হ্যামলেটকে ঘৃণা করেন।২০ এই চরিত্রের ভিত্তি আত্মঘৃণা ও প্রচণ্ড ভাঙনের এক অনুভূতি। শেকসপীয়রে এই আত্মগ্লানি যেন ‘শরীরে অপচারের অনুভূতি ও তারই বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিক্রিয়া।’ হ্যামলেট নিজেরই মধ্যে এই অপচার উপলব্ধি করে আত্মধিকারের পরিবর্তে আত্মগর্বে আত্মগ্লানিকে চাপা দেয়। তাই অশালীন নিষ্ঠুরতায় হ্যামলেট চারিদিকে কেবল অপচারের রূপকে নগ্ন করে তুলে ধরে। এতেই তার পাশবিক আনন্দ। ‘সমগ্র নাটকটিই দেহপিণ্ডের বিরুদ্ধে মনের প্রতিক্রিয়া, আত্মন-এর বিরুদ্ধে আত্মার প্রতিক্রিয়া, অভিজাততান্ত্রিক নীতির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক নীতির প্রতিক্রিয়া।’২১ মধ্যযুগীয় চিন্তার উত্তরফলস্বরূপ হ্যামলেট আত্মনকে পিতা বা রাজার মূর্তির মধ্যে উপলব্ধি করে। এই আত্মন পিতৃহত্যায় আহূত হয়েছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই নতুন রাজার মূর্তির মধ্যে মিশে গেছে। নারীর স্থান এই চিন্তায় সর্বদাই পুরুষের নীচে; সেই নারী অন্তত পরোক্ষেপও এই আত্মনের বিনাশে সহযোগী থেকেছে। তাই সমগ্র নারীজাতির প্রতি হ্যামলেটের ঘৃণা; অথচ ক্লডিয়াস সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া অত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয় না। মধ্যযুগে আত্মনের প্রাধান্যে মানুষ নিজের দেহকে সন্মান দিয়েছে, কারণ এই দেহে আত্মন আশ্রয় নেয়, এই আশ্রয়ে নিজেকে বিকশিত করে, নিজেকে বহুতে রূপান্তরিত করে। রাজ্যে রাজা, পরিবারে পিতা, এবং নিজের মধ্যে এই দেহপিণ্ডে আত্মন তার শক্তিকে উপলব্ধি করে। কিন্তু মধ্যযুগের এই বোধ নতুন খ্রিস্টীয় ধর্মের আক্রমণে আহত হল। খ্রিস্টের রাজরূপকে ছাপিয়ে ওঠে বেথলেহেমের শয্যায় শিশুরূপ এবং পরে ক্রুশবিদ্ধ অসহায় রূপ। আত্মনের মধ্যে সমগ্রকে গ্রহণ করে আত্মনকে সর্বশক্তিমান সর্বগৌরবমহীয়ান করে অসীম হয়ে ওঠার যে আদর্শ এতদিন ছিল সেই আদর্শে সন্দেহ এল। খ্রিস্টীয় ধর্মযাজক এলেন, বললেন আত্মন তথা দেহকে বিনাশ করেই অসীমের উদয় হতে পারে। হ্যামলেটের মনেও এই নতুন বোধ এসে ধাক্কা দিয়েছে। আত্মনের মহত্বে সন্দেহ জেগেছে বলেই রাজা ক্লডিয়াসের রাজরূপ তাকে ভোলাতে পারে না, সে প্রতিশোধের সংকল্প নেয়; অথচ রাজা-আত্মন অভিন্ন বোধের অবশেষ তাকে ছাড়ে না। এতেই হ্যামলেটের দোটানা। ক্লডিয়াসকে হত্যার সংকল্পে ও সেই সংকল্পসিদ্ধির মধ্যে হ্যামলেট আত্মনকে হত্যা করে, সেই কারণেই এই হত্যাকে ঘিরে ন্যায় ও নীতির এত প্রশ্ন, আত্মনকে ছাড়িয়ে বৃহত্তর অসীমে পৌঁছবার প্রয়াস। নবজাগৃতির এই সংকটেই মাতার সঙ্গে বা ওফেলিয়ার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের চিন্তায় হ্যামলেটের মনে এমন প্রচণ্ড ঘৃণা আসে; দেহজ সম্পর্কমাত্রই যেন অবর্ণণীয় কলঙ্ক। প্রবৃত্তি ও স্বজ্ঞার শাসন ছেড়ে আত্মিক-মানসিক চেতনার অভ্যুদয়ের সঙ্গেই হ্যামলেটের সংকটেরযোগ। এই প্রথম মানুষ নিজের দেহকে ও বিশেষত তার যৌনসত্তাকে ভয় করতে শিখল, সর্বশক্তি দিয়ে নিজের স্বাধীন স্বজ্ঞা-প্রবৃত্তিগত চেতনাকে গলা টিপে মারতে গেল। ঈডিপাস যৌনসত্তাকে ভয় করে না, যৌনতাকে ভয় করে না, ঘৃণাও করে না; সে ভয় করে নিয়তিকে। হ্যামলেট নিয়তিকে জানে না, যৌনতার ভয়ংকরতায় সে কাতর।২২ ‘ম্যানিফেস্টো কবিতায় হ্যামলেট-এর ‘টু বী অর নট টু বী’ প্রশ্নের জবাবে লরেনস বলেন ‘অস্তিত্বের এই তীব্র কামনাই চরম ক্ষুধা।’ নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে ‘এ যেন একরকম মৃত্যু অথচ মৃত্যু নয়”, আত্মনকে অতিক্রম করে অন্যের সঙ্গে যোগরচনা।

হ্যামলেটকে ঘিরে রোম্যান্টিক সমালোচকেরা যে অলোকসামান্য মহত্বের চিত্র রচনা করেছিলেন, এই শতাব্দীও তার মায়ায় আচ্ছন্ন। তাই বার্নাড শ বলেন, ‘যারাই ইতর লোভ বা উচ্চাশা কিংবা হীন বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে, তারাই তাদের প্রতারকদের কাছে দুর্বল ও ভীরু বলে প্রতিপন্ন হয়। কখনও কখনও তারা নিজেরাই নিজেদের সম্পর্কে ওই ভুল ধারণা করে। এটুকু যে বোঝে, তার কাছে হ্যামলেটের চরিত্রে কোনও অসঙ্গতি নেই।’২৩ এমনকি এলিয়টও যখন ‘লাভ সং অফ প্রুফ রুক’-এ প্রুফরুকের বিপরীতে প্রিনস হ্যালেটকে দাঁড় করান, তখনও প্রুফ রুক প্রভুদের হাতের খেলনা, বিনয়ী, পরের কাজে লাগলেই ধন্য, কৌশলী, সাবধানী, অতিসতর্ক, আড়ম্বরপ্রিয়, কিঞ্চিৎস্থূলবুদ্ধি, কখনও কখনও প্রায় হাস্যকর-কখনও কখনও প্রায় ‘ফুল’।২৪ এলিয়ট স্পষ্টতই পোলনিয়সকে স্মরণ করেন; হ্যামলেট-পোলনিয়সের এই বৈপরীত্যে হ্যামলেটের গুণাবলি স্পষ্টতর রেখায় ফুটে ওঠে। আধুনিক জর্মন কবি হলথুসেন ‘ব্যালাড আফটার শেকসপীয়র’ কবিতায় হ্যামলেট প্রসঙ্গে বলেন ‘এই সব কিছু তাকে চক্রব্যুহে ঘিরে ধরে সিংহাসন, সিঁড়ি, দর্পণ, মোড়া পর্দা। আমরা শুনি, সে ডাকে প্রেতাত্মাকে, নিদ্রাকে, মৃত্যুকে, সমাপ্তিকে।’ ‘শুধু ন্যায়ের জন্য’ হ্যামলেট নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়। ‘তার চিন্তা, তার ভয়ঙ্কর বিনিদ্র পৌরুষ, রোষ, সংযম, অগ্নিস্তম্ভ, অগ্নিগর্ভ রক্ত, মঞ্চকে সে কী প্রচণ্ড তেজে বিধ্বস্ত করে।’২৫ অগ্নিকল্প তেজে হীন নারকীয় পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত হ্যামলেটের এই চিত্রে তার অস্ত্র আত্মপ্রত্যয় ও নিষ্কলঙ্ক নিষ্ঠা; তার সহচর সাথি গ্লানি, শ্রান্তি, মৃত্যুকামনা, চিন্তার দুঃসহ ভার। বিংশ শতাব্দীর সর্বব্যাপী কাপুরুষতা, নৈতিক দৌর্বল্য ও লঘুচিত্ত-পলায়নপরতার বিপরীতে প্রিনস হ্যামলেট তার অষ্টাদশ শতকের বীর্যও ফিরে পায়। হ্যামলেট আর শুধু বিষণ্ণ অক্ষম কবি নয়।

পাস্তেরনাকের ‘হ্যামলেট’ কবিতায় হ্যামলেট জীবনের জটিলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়-যে জটিলতা আবার নিয়তির দুর্ভেদ্য রহস্যের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যায়। নিঃসঙ্গতা ও মিথ্যার কূলপ্লাবী অন্তরও এই জটিলতারই অন্তর্গত ‘আমি একা। চারিদিক মিথ্যায় ডুবে যায়। জীবন তো আর মাঠ পেরিয়ে যাবার মতো সহজ নয়।’ এই সঙ্গেই আছে মুক্তির জন্য প্রার্থনা (‘অপার করুণায় বিষপাত্র টেনে নাও’) এবং নত মস্তকে দায়িত্ব গ্রহণ২৬ । এই কবিতায় হ্যামলেটকে খ্রিস্টের সঙ্গে এক করে পাস্তেরনাক হ্যামলেটের যে মূর্তি সৃষ্টি করেন অন্যত্র তিনি সেই মূর্তি আরও স্পষ্ট করে আঁকেন ‘প্রেতাত্মার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই হ্যামলেট তার স্রষ্টার সাধ পূর্ণ করবে বলে নিজের সাধ বিসর্জন দেয়। এ নাটক স্পৃহার দুর্বলতার নাটক নয়, কর্তব্য ও আত্মত্যাগের নাটক। আপাতদৃশ্য ও বাস্তবের মধ্যে যখন অতল গহ্বরের ব্যবধান দেখা দেয়, তখন যে পৃথিবীর মিথ্যাচারের আবরণমোচন করতে অশরীরী প্রেতাত্মা এগিয়ে আসে, প্রতিশোধ দাবি করে তার অন্য কোনও বিশেষ গুরুত্ব নেই। বরং সত্যিই যা গুরুত্বপূর্ণ, হ্যামলেট তার নিজের কালের বিচারক নির্বাচিত হয় এবং প্রাচীনতর কালের সেবক বলে স্বীকৃত হয়।’২৭ হ্যামলেটের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সম্মুখে মিথ্যার সকল আবরণ মিথ্যা হয়ে যায়; সত্যদ্রষ্টা হ্যামলেটের তিক্ত বাণীও অনাবৃত সত্যের রুক্ষ্মতা নিয়ে এসেছে, আর কিছু নয়। হ্যামলেটের নিঃসঙ্গতাও সত্যদ্রষ্টার নিঃসঙ্গতা, এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠার গুরুভার দায়িত্ব তার একার স্কন্ধেই, সেই হেতুই বিবাদ ও যন্ত্রণার বেদনা।

৫. আরও একটি ব্যাখ্যা।

‘No one is likely to accept another man’s reading of Hamleté’– E M. W. Tillyard.

কলিন উইলসন যাকে ‘আউটসাইডার’ বলেন, হ্যামলেটের সঙ্গে তার আত্মীয়তা আছে। উইলসনের মাপকাঠিতে ফেলে হ্যামলেটকে মিলিয়ে দেবার চেষ্টা না করে বরং হ্যামলেটের চরিত্র থেকেই এই আউটসাইডারকে খুঁজতে গেলে বেশি লাভের সম্ভাবনা। হ্যামলেটের সঙ্গে আমাদের শতাব্দীর চিন্তার ধারার সম্পর্ক নির্ণয় হয়তো এই পথে সম্ভব। একথা বোধ হয় মনে রাখা বিধেয় যে, হ্যামলেটের চিন্তায় উৎসস্থল উইটেনবার্গ, এবং এই উইটেনবার্গ রেফোর্মেশনের জনক মার্টিন লুথারের নাম ও কীর্তির সঙ্গে যুক্ত। খ্রিস্টীয় গির্জার ব্যাখ্যা ও অনুশাসনের নিরাপদ আশ্রয় থেকে ব্যক্তিকে লুথার যে-মুহূর্তে মুক্তি দিলেন, সেই মুহূর্তেই তার উপর সত্যকে২৬ খুঁজে নেবার সম্পূর্ণ দায় এসে পড়ে। সেই দায় নিয়েই হ্যামলেট ডেনমার্কে ফেরে, এসে দেখে ডেনমার্ক ‘বন্দীশালা’। অসত্যের আবরণ ভেঙে সত্যকে খুঁজে তবেই তার মুক্তি সম্পূর্ণ হতে পারে। হ্যামলেটের সম্মুখে বৃহত্তম যে অসত্য দেখা দেয়, সে-অসত্য আত্মীয়বন্ধনের সত্যকে অস্বীকার করছে। যে-বন্ধনে হ্যামলেট নিজেও যুক্ত, সেই বন্ধনেরই এক প্রান্তে পচন ধরেছে, সেই ব্যাধির সংক্রমণ থেকে হ্যামলেট কেমন করে নিজেকে বাঁচাবে? এলিজাবেথীয় ইংরেজিতে ‘কাইন্ড’ কথাটির অর্থ ‘কিন’-এর সঙ্গে যুক্ত, ‘নেচার’ বা জন্মগত প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত নীতিবোধের সূচক। ‘কাইন্ডনেস’ দয়া বা করুণা নয়, জন্মমুহূর্তে আত্মীয়সমাজবন্ধনে স্থাপিত জীবনধর্মে; সেই জীবনধর্মও মূল্যবোধ থেকে ক্লডিয়াস ও গার্ট্রড বিচ্যুত হয়েছে। তাই তাদের চরিত্রও সেই বৃত্ত থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেছে; তারা আজ যথাক্রমে ‘আঙ্কল-ফাদার’, ‘আণ্ট মাদার’। এই পরিপ্রেক্ষিতে হ্যামলেট যখন ক্লডিয়াসকে ‘কাইন্ডনেস ভিলেন’ বলে বর্ণনা করে, কিংবা বলে, ‘I must becruel only to be kind’ কিংবা ‘ more than kin and less than kind’ তখন আত্মীয়বন্ধনের পবিত্র সূত্রে যে শৈথিল্য এসেছে, তাতেই হ্যামলেটের চাপা ক্ষোভ ধরা পড়ে (বেটরিকের বৈচিত্র্যে এই অংশগুলির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাও লক্ষণীয়)। একই কারণে এই নাটকে রোগব্যাধির ইমেজ-এর প্রাচুর্য। এই ইমেজগুলি প্রায়ই আবিলতার সঙ্গে যুক্ত।২৮ হ্যামলেটের মনের পরিচ্ছন্নতা যে সহসা কুলষিত হয়ে গেছে, ওফেলিয়ার কথায় তার আভাস আছে। ওই কুৎসিত রোগের সাক্ষাতে এসে, সংক্রমণের আতঙ্কে, রোগ থেকে পালাবার প্রাণান্ত চেষ্টায় রোগের বীভৎস রূপ তার চিন্তায় এমনভাবে ভর করে থাকে যে, হ্যামলেটের ভাষাও কুৎসিত হয়ে উঠতে থাকে। ডোভার উইলসন যখন হ্যামলেটের প্রথম স্বগত ভাষণে ‘সলিড’ বদলে ‘সালিদ’ করেন, তখন এই সমগ্র চিন্তার ধারা স্পষ্টতর হয়-মাতার অজাচারে হ্যামলেটের নিষ্কলঙ্ক দেহপিণ্ডে মালিন্যের কলঙ্ক লেগেছে। এতেই হ্যামলেটের অসহ যন্ত্রণা। এই সম্পর্ক থেকে সে নিজেকে সমূলে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চায়, ওই অসুস্থ মানুষগুলির সংস্পর্শেই তার ভয়। ক্লডিয়াস তাকে পুত্র বলে সম্বোধন করা মাত্রই হ্যামলেট যেন ঘৃণায় পিছিয়ে আসে-সে যেন ‘টু মাচ ইন দি সান’- ধ্বনিগুণে পুত্রত্বের সম্পর্কে ও সূর্যের খরতাপ তথা তার যাতনা অভিন্ন হয়ে যায়। আরও বলা যায় যে, যেহেতু দেহজ এক সম্পর্কের তাড়নায় ক্লডিয়াস ও গার্ট্রুড প্রকৃতির বিধিকে অমান্য করেছে, সেইহেতুই দেহ ও দেহের দাবি সম্পর্কে হ্যামলেটের এত ভয়- ‘নানারি’ দৃশ্যের ব্যাখ্যা এইভাবেই সম্ভব।

ম্যাক্রোকজম -মাইক্রোকজম-এর জটিল সম্পার্কে’ আস্থাশীল এলিজাবেথীয় হ্যামলেট সমাজদেহেও আনকাইন্ডনেস রূপ ব্যাধির সংক্রমণ দেখতে পায়। হ্যামলেট-পোলনিয়াসে বৈপরীত্য কোলরিজ লক্ষ করেছিলেন, এলিয়টও তাঁর কবিতায় করেছেন। হ্যামলেটের তাবৎ গুণের বিপরীত গুণের আধার পোলনিয়াস-শঠতা, গুপ্তচরবৃত্তি (পুত্রকন্যা কেউই বাদ যায় না), স্বার্থসার দাসবৃত্তি, এবং সততার বহিরঙ্গরূপের সঙ্গে তার ক্রুরতার অসঙ্গতি২৯ তার অপ্রশ্ন জীবনযাত্রা। তাই হ্যামলেটের হাতে পোলনিয়াসের মৃত্যুতে যেন নিয়তির হাত আছে। যে ব্যাধিকে স্পর্শ করতে হ্যামলেট প্রথম থেকে ঘৃণা বোধ করেছে, সহসা সেই ব্যাধির একটি শিকারকে নিজের অজান্তে হত্যা ক’রেই তার ওই ছোঁয়াচের ভয় কেটে যায়। তারপর হত্যায় আর হ্যামলেটের হাত কাঁপে না, রোজেনক্রান্টজ, জিল্ডেনস্টার্ন ও ক্লডিয়াসের বিদায় দিতে বেশি সময় লাগে না। পোলনিয়স হত্যার পর ওই দোটানা প্রায় কেটে গেছে; পোলনিয়সকে হত্যার পরই ছুরিকাসম বাণীতে মাতাকে আক্রমণ করাও সহজ হয়। হ্যামলেট এইবারই অ্যাভেঞ্জার হয়ে ওঠে। আউটসইডার অবশেষে কমিটমেন্ট-এ আসে।

সূ ত্র নি র্দে শ

১। Paul S. Conklin, A History of Hamlet Criticism, 1601–1827, Routledge, 1957.

২। ‘‘You are a fishmonger” (Hamlet II ii 174) ”Duke, thou art a becco, a corunto” (The Malcontent, I, iii, 93). এই নাটকদ্বয়ে শুধুমাত্র কথার সাদৃশ্যের তালিকা সূদীর্ঘ হয়ে ওঠে।

৩। H. J. C. Grierson, Crosscurrents in English Literature of the 17th Century, Chatto and Windus, 1958 Christianity was not dead, far from it ; and the dominant note of the 17th century was to be the conflict of the secular and the spiritual, the world, the Flesh, and the spirit, a conflict whcih troubled every sphere of life. কোরেজিয়োর ‘লিয়েতো’ স্বাক্ষর, মিকেলাঞ্জেলোর নবসৃষ্ট ‘অ্যাডাম মূর্তি,’ কিংবা লিয়োনার্দোর সেই কাহিনি-ফ্লব্যরেনসের রাজপথে খাঁচার পাখিকে ছেড়ে দেওয়ার গল্প – নবজাগৃতির সেই কল্পচিত্রকে ভেঙে জটিলতর অভিজ্ঞতারূপে এই কালকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা গ্রিয়ার্সন ও ডক্টর টিলিয়ার্ডের কাছে কৃতজ্ঞ।

৪। পরেগার্ট্রড বলেন, ‘Mad as the sea and wind’ (IV. i 7ff) কিন্তু এখানে গার্ট্রডের মনে স্পষ্ট নয়। তিনি হয় (ক) একথা এখনও সত্যিই বিশ্বাস করেন, নয়তো (খ) পুরনো ভাষ্যের জেরস্বরূপ হ্যামলেটকে আড়াল করছেন, নয়তো (গ) নিজেকে চোখ ঠেরে হ্যামলেটের ‘ছুরিকাসম’ আঘাত থেকে নিজেকে আড়াল করছেন, cf ”Mother, for love of grace, Lay not that flattering unction to your soul, That not your trespass bu my madness speaks.

৫। V. i. 160 ff.

৬। Melancholy adust.

৭। Castel of Health. 1547.

৮। শেকসপীয়র এই বইটি পড়েছিলেন, তার প্রমাণ দাখিল করে রিচার্ড লোয়েনিং। ডাউডেন থেকে শুরু করে ডোভার উইলসন প্রায় সকলেই এই প্রমাণ মেনে নিয়েছেন।

৯। Lily B. Compbell, Shakespeare’s Tragic. Heroes, Cambridge, 1930 M. I. O” Sullivan, Hamlet and Dr. Timothy Bright (PMLAA, XLII. 3.) J.D. Wilson, What Happens in Hamlet, 1950. AppendixE.

১০। ১০ জানুয়ারি, ১৭৭৬ তারিখে Sir W. Young-কে লেখা চিঠি। Quoted by W. S. Scott, The Georgian Theatre, Westhouse, 1946. শেকসপীয়রের অযোগ্য বলে শেকসপীয়রের রচনাকে বাতিল করার যুক্তিহীন রীতি ‘ডিসিণ্টিগ্রেশন’-এর শুরু বোধ হয় এইখান থেকেই।

১১। New Variorum Hamlet. Ed. H.H. Furness. Dover reprint, 1963. Appendix (Volume II). 1774-এর মূল প্রবন্ধের ১৭৮৪ সালের নতুন ভারটি ব্যবহার করেছি।

১২। কার্লাইলের অনুবাদ থেকে।

১৩। New Varlorum Hamlet, Appendix.

১৪। ডরোথি মার্টিন ও ফ্যানসিস স্কার্ফের দুটি স্বতন্ত্র ইংরেজি অনুবাদ মিলিয়ে ভাবানুবাদ। বিদেশি কবিতা পাঠের ক্ষেত্রে এই পন্থাই বোধ হয় আদর্শ।

১৫। ফ্লোব্যের বলেন, ‘La grande synthese.’

১৬। অলিভার বার্নার্ডের ইংরেজি অনুবাদ অনুসরণে।

১৭। Manfred, Act II. (মারিয়ো প্রাজ কর্তৃক উদ্ধৃত)

১৮। Sigmund Freud, The Interpretation of Dreams. Ernest Jones, Hamlet and ocdipus.

১৯। ‘The Queen his mother lives almost by his locks’, IV, Vil.

২০। And Hamlet how boring, how boring to live with,/Somean and self-conscious, blowing and snoring, / His wonderful speeches, full of other folks’ whoring.

২১। Twilght in Italy The Theatre.

২২। Puritanism and the Arts. (D.H. Lawrence, Selected Literary Criticism. Viking, 1956

২৩। Letter to Alfred Gruikshank, October 4, 1918> (Shaw on Shakespeare, Ed. Edwin Wilson. Dutton, 1961).

২৪। নাটকের প্রথমাংশে পোলনিরস Fool হয়ে দাঁড়ায়, তবে শেকসপীয়রের fool নয় তাই এলিয়টও বলেন, ‘Almost, at times, the Fool,’

২৫। প্যাট্রিক ব্রিজওয়াটারের ইংরেজি অনুবাদ অনুসরণে।

২৬। লিডিয়া পাস্তেরনাক স্লেটার, হেনরি কামেন এবং ম্যাকস হেওয়ার্ড ও মানিয়া হারারির তিনটি স্বতন্ত্র ইংরেজি অনুবাদ থেকে।

২৭। Pzsternak, On Translating Shakespeare (Soviet Literature, Sept. 1946; July 1956.)

২৮। স্পাজিয়নের অ্যানালিসিস থেকে আমি নিজস্ব উপসংহার টেনেছি। ইমেজের প্রকৃতির ইঙ্গিতটুকু কেবল স্পার্জিয়মের দান।

২৯। cf.’By indirections find directions out.’ ‘Trail of Policy’ ‘Leave wringing of your hands.’

২য় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা

(বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৭১)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *