বাংলা সাহিত্যে দান্তে – রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত

বাংলা সাহিত্যে দান্তে – রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত

দান্তে যখন ডিভাইন কমেডি রচনা করেন (১৩১৫-১৩২১খ্রি) বাংলা কাব্যের বয়স তখন প্রায় এক শতাব্দী। বৌদ্ধ অধ্যাত্মবাদের ‘ইরোটিক’ উপাদান ওই কাব্যে তাঁদের কাছে অস্পষ্ট লাগবে না যাঁরা পারাদিজো-তে বেয়াত্রিচে কর্তৃক ক্যাথলিক কবিকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞার পথে পরিচালনা করতে লক্ষ করেছেন। পরম মোক্ষের সহায়িকারূপে বৌদ্ধ সহজিয়া কবির যোগিনী বা সহজ-সুন্দরীকে সেই পাঠকের কাছে বিস্ময়কর না মনে হতে পারে যিনি দান্তের স্বর্গসুখদ কল্পনায় গঠিত মহিয়সী মহিলার ভূমিকাটি অনুধাবন করতে পেরেছেন। কিন্তু যে ভাবরাশি মিলে ডিভাইন কমেডি গড়ে উঠেছে তার থেকে তান্ত্রিক মিস্টসিজমের সমগ্র দার্শনিক প্রেক্ষাপট একেবারে আলাদা। বেয়াত্রিচের আবির্ভাব হয়েছে ত্রুবাদুরদের বিনম্র প্রেমকে মধ্যযুগীয় খ্রিস্টধর্মের সূক্ষ্ম অধ্যাত্ম প্রয়োজনে নিষ্কাম করে নিয়ে। যোগিনীর পটভূমিতে রয়েছে তান্ত্রিক সাধনার মূলাপ্রকৃতি তন্ত্রের ধারণা যা এক ‘ইরোটিক মিথ’-এ রূপকপ্রাপ্ত। দান্তের মহিয়সী রমণী এমন এক ব্যক্তি যে একটি ভাবের মধ্যে সূক্ষ্ম রূপ লাভ করেছে ; বাঙালি বৌদ্ধ কবির যোগিনী একটি ভাব যা ব্যক্তিরূপ পরিগ্রহ করেছে। নিজ সাধনার সহায়তার জন্য সহজিয়া কবির অবশ্য প্রয়োজনীয় এই যে এক নারী সঙ্গিনীর সঙ্গে নিবিড় যোগ তা এক দুর্জ্ঞেয় অধ্যাত্মতন্ত্র এবং দান্তের স্বর্গীয় রমণীর ধারণা দিয়ে তা বোঝা যায় না। যদি সহজিয়া কবিরা ভিতা নুওভা-য় বেয়াত্রিচে-র উপর রচিত কবিতাগুলির সঙ্গে ও পারাদিজো-র সেই সর্গসমূহের সঙ্গে পরিচিত থাকতেন যেখানে বেয়াত্রিচে স্বর্গাভিমুখে দান্তের পথপ্রদর্শিকারূপে আবির্ভূতা হচ্ছেন, তার মধ্যে তাঁরা সহজ-সুন্দরীর কোনও খ্রিস্টীয় প্রতিরূপ দেখতে পেতেন না। কিন্তু যদি তাঁদের বলা হত যে ‘কনভিভিও’-র রমণী কোনও পার্থিব নারীর স্বর্গীয় রূপ নয়, দর্শনের রূপকমূর্তি মাত্র, তাহলে তাঁরা একটা বিস্তীর্ণ অধ্যাত্মতন্ত্রের অংশরূপে তার তাৎপর্য নির্ণয় করতে পারতেন। তাই এ কথা একেবারেই অসম্ভব মনে হয় যে প্রাচীন বাঙালি সহজিয়া কবি দান্তে-রচিত বেয়াত্রিচের বিগ্রহে সৃষ্টিশীলভাবে সাড়া দিতে পারতেন, এমন কী যদি ইতিহাসের কোনও ভিন্ন গতিতে তিনি তার সঙ্গে পরিচিতও থাকতেন।

দান্তের স্বর্গীয় রমণীর সঙ্গে আমাদের মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবির রাধারও কোনও সাদৃশ্য নেই। কারণ বৈষ্ণব দর্শনে রাধা হচ্ছেন মানুষের দৈবীভক্তির রূপক, আর সূক্ষ্মতর বিশ্লেষণে তিনি ও কৃষ্ণ ঐশ্বরিক প্রেমনাট্যের পরমাত্মার দ্বৈত বিভাগের প্রতিনিধি। যখন বৃন্দাবনের ষড় -গোস্বামীর অন্যতম জীব গোস্বামী ষোড়শ শতকে রচিত তাঁর সংস্কৃত গ্রন্থ ‘প্রীতিসর্ন্দভ’তে প্রীতি বা প্রেম ভক্তি ব্যাখ্যা করেছিলেন তখন তিনি মহাসুখ বা ঈশ্বর সাক্ষাৎকারের হেতুরূপে হ্লাদিনীশক্তি বা সক্রিয় সুখের তত্ব উপস্থিত করেন। অধুনা এমন ব্যক্তির সংখ্যা আমাদের মধ্যে কম নয় যাঁরা একে দান্তের বেয়াত্রিচে-অর্চনার অন্তস্থ ‘ইরোটিক’ তত্বের সঙ্গে তুলনা করবেন। অবশ্য তুলনাটি ভ্রান্ত হতে বাধ্য। যাঁরা প্রাচীন খ্রিস্টীয় ‘ফাদার’দের বিশেষত অরিগেন-এর অনুসরণে হিব্রু সং অব সংস-এ সলোমন ও শুলামাইট কুমারীর কাহিনিতে খ্রিস্ট ও গির্জার রূপক দেখবেন তাঁরা এই ধরনের ব্যাখ্যায় মধ্যযুগের খ্রিষ্টিয় কবিতার মধ্যস্থ স্বর্গীয় রমণীর রূপক দর্শনে উৎসাহিত বোধ করবেন। কিন্তু ভিতা নুওভা ও ডিভাইন কমেডি-র বেয়াত্রিচে কোনও রূপক নয় তিনি এক কুমারী, যেমন সং অব সংস-এর নায়িকাও এক কুমারী। দান্তের রমণী যে আলোক ও প্রেমরূপে মহিমান্বিতা তা হল শ্রেষ্ঠ অধ্যাত্ম-কল্পনার লীলা এবং তার কিছুই সং অব সংস-এর রচয়িতার মধ্যে ছিল না। কিন্তু বৈষ্ণব দার্শনিক ও কবির রাধা বা প্রধানা গোপিনী পরমাত্মার এক আবশ্যিক গুণের সুস্পষ্ট রূপক। যেমন বঙ্কিমচন্দ্র মন্তব্য করেছেন, ব্রহ্মবৈবর্ত-পুরাণের রাধা হচ্ছেন বেদান্তের মায়া, সাংখ্যের প্রকৃতি ও বিষ্ণু-পুরাণের শ্রী। জীব গোস্বামীর ‘প্রীতি-সন্দর্ভ’-র হ্লাদিনী শক্তি দ্বৈতবাদী বৈষ্ণব দর্শনের মুলাপ্রকৃতি তন্ত্রের এই রূপকের সঙ্গে অভিন্ন। জঘন্য চর্চায় স্থূল আসক্তির অনুমোদনরূপে এই মতবাদ যখন নিন্দিত হয় তখন কোনক্রমেই স্বর্গীয় রমণীর আদর্শ সেখানে স্থান পায় না।

বাংলা সাহিত্যে দান্তের প্রভাব কেন খুব গভীর বা ব্যাপক হতে পারেনি তার কারণ বুঝতে চেষ্টা করলে এ ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সেই প্রভাবের পটভূমিকে বোঝার চেষ্টাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগের খ্রিস্টীয় কবিতায় এমন সব একালীন মানবিক উপাদান আছে যা ভারতীয় কাব্যকে কেবল তার আধুনিক পর্বেই প্রভাবিত করতে পারে। আমাদের মধ্যযুগের ভাবধারা ইতালির মধ্যযুগের ভাবধারা থেকেও আরও বেশি মধ্যযুগীয়। স্বর্গীয় রমণীর এই বোধগম্য মানবিক ভিত্তি ছাড়াও দান্তের কবিতায় দুটি জিনিস আছে যা আমরা আমাদের মধ্যযুগের কাব্যে দেখি না তা হচ্ছে কবির তীব্র সামাজিক সংস্রব, যা প্রকাশ পায় একটি ব্যাপক মানবস্থিত প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত পাপের সম্পর্কে সমান তীব্র সচেতনতা। আমাদের মধ্যযুগের ‘ভক্তি’-কাব্য সম্পূর্ণতই ধর্মাশ্রিত কাব্য, ভক্তি ও মুক্তির কাব্য তা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভীষ্টের সমগ্রতার কোনও ছক দেখায় না। ফলত আমাদের মধ্যযুগের ভক্ত-কবি একমাত্র যে পাপের কথা জানেন তা হচ্ছে ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাপ। তাঁর সুখের বিশ্বে কোনও দুরাচারী ও উদ্ধারযোগ্য যাতনা ভোগের কোনই স্থান নেই। নরকের বিষাদের কোনও ধারণাই বৈষ্ণব কবির নেই তিনি জানেন কেবল ভাসমান মেঘের কোমল ছায়া যা উজ্জ্বলতর দিনের প্রতিশ্রুতি দেয়।

সুতরাং দান্তে তাঁর মানবতাবাদ, নৈতিক আবেগ ও বিষাদের গভীর বোধের কিছুটা দিতে পেরেছিলেন আমাদের আধুনিক কবিদের একজনকে। সে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বাঙালি কবির উপর ইতালীয় প্রভাব বেশ অসম্ভব প্রভাব বলেই মনে হয়, এমন কি সাহিত্যিক ঋণের বিচক্ষণ আবিষ্কর্তার কাছেও। কারণ এই সমগ্র শতাব্দী ধরেই ভারতীয় কাব্যে পাশ্চাত্য প্রভাব প্রধানত ইংরাজি সাহিত্যের প্রভাব। ঊনবিংশ শতাব্দীতে হয়তো শেকসপীয়রের পরিবর্তে রাসিন-ই বাঙালি কবির প্রেরণাদাতা হতেন, যদি অষ্টাদশ শতাব্দীতে ক্লাইভের পরিবর্তে দুপ্লে জয়লাভ করতে পারতেন। কিন্তু ভারতীয় কাব্যক্ষেত্রে দান্তে ও তাসো-র কোনও অবদানের সুযোগ ছিল সুদূরপরাহত। কেননা ইতালীয় কোনও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অস্তিত্ব ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত কলকাতায় ইংরাজি অনুবাদেও ইতালীয় কবিতা সম্পর্কে লোকের সামান্যই ধারণা ছিল, অবশ্য রে. এইচ এফ কেরি-র ডিভাইন কমেডি ১৮১৪-তে প্রকাশিত হয়, এবং টমাস ক্যাম্পবেলের লাইফ অব পেত্রার্ক চতুর্থ দশকে ইংল্যান্ডে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

গত শতকের ষষ্ঠ দশকে যখন বাঙালি কবি ইউরোপীয় সাহিত্যের দিকে ফিরল তখন স্বভাবতই তার দৃষ্টি পড়ল ইংল্যান্ডের কাব্যের উপর। নব্য ধারায় কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পদ্মিনী উপাখ্যান (১৮৫৮ খ্রি)-এর ভূমিকায় ইংরাজি পদ্যের কাছে তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন ও সহযোগী কবিদের কাছে চমৎকার এক আদর্শরূপে একে তুলেও ধরেছেন। এর চার বছর আগে প্যারাডাইস লস্ট-এর কয়েক সর্গ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি কর্তৃক অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছিল (১৮৫৪ খ্রি); অবশ্য ইংরাজি রচনার প্রথম পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর হচ্ছে ১৮৪০-এর আগে কোনও সময়ে প্রকাশিত তারাশঙ্কর তর্করত্নের রাসেলাস।

তাই এটা লক্ষ করলে অবাক লাগে যে প্রথম ইউরোপীয় কবির প্রশস্তিমূলক কবিতা রচিত হয়েছিল দান্তের ওপর। এবং দ্বিতীয় এ জাতীয় কবিতা পেত্রার্ক-এর ওপর রচিত। দু’টিই ভার্সাই’তে রচিত মাইকেল মধুসূদনের সনেট এবং কলকাতায় ১৮৬৬-তে প্রকাশিত তাঁর চতুর্দশপদী কবিতাবলির মধ্যে সংকলিত। আমাদের সাহিত্যে ইংরাজি উপাদানের উপর সংগত গুরুত্ব প্রদানের ফলে ঊনবিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবির মধ্যে এই ইতালীয় উপাদান বেশ কিছুটা উপেক্ষিত রয়ে গেছে। শতাব্দীর অষ্টম দশকে যখন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালি দেশপ্রেমিককে ‘ইতালীয় ঐক্যের দূত’ মাৎসিনির আদর্শ অনুকরণে উদ্বুদ্ধ করছিলেন সে সময়ে আদিতম বাংলা স্বদেশি গানগুলির অন্যতমটির বয়স দশ বছরের বেশি। তা হচ্ছে ভার্সাইতে রচিত ও Vincenzo Filicaia-র বিখ্যাত সনেট Italia-র দ্বারা প্রভাবিত একটি সনেট – চতুর্দশপদীপদাবলিতে ‘ভারতভূমি’ নামে তা পরিচিত। কবিতার শীর্ষে মাইকেল ইতালীয় সনেটটির প্রথম দুটি চরণ motto হিসাবে উদ্ধৃত করেছেন ও তার নীচে নিজকৃত বঙ্গানুবাদ দিয়েছেন। স্পষ্ট বোঝা যায় তিনি ইতালীয় ভাষায় কবিতাটি পড়েছেন এবং চাইল্ড হ্যারলডস পিলগ্রিমেজ-এর চতুর্থ সর্গে এর বায়রন-কৃত অনুবাদের ওপর তাঁকে নির্ভর করতে হয়নি। তিনি যে আধুনিক কালের সর্বশ্রেষ্ঠ গীতিকবি- মেকলের এই অতিরঞ্জিত প্রশস্তির দ্বারা মাইকেল Filicaia (১৬৪২-১৭০৭)-র প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকতে পারেন। এই বাঙালি কবি নিজের কল্পনার দাবিতে কেমন করে ইতালীয় আদর্শের বিভিন্ন রূপকল্পকে মানিয়ে নিয়েছেন তা স্মরণীয়। Filicaia -র সনেটে একটি চরণ আছে Che in fronte scritti per gran doglia porti। বায়রন এর স্বচ্ছন্দ অনুবাদ করেছিলেন  On thy sweet brow is sorrow ploughed by shame। মাইকেল লিখেছেন ‘রতন সিঁথি গড়ায়ে কৌশলে, / সাজাইলা পোড়া ভাল তোর লো, যতনি।’ বলা হয়েছে Filicaia-র এই সনেটটির স্থান ‘ইতালীয় সাহিত্যে প্রায় সেই রকম, Vaudois-র হত্যাকাণ্ড নিয়ে রচিত মিলটনের সনেটটির স্থান ইংরাজি সাহিত্যের যেমন।’ মাইকেলের এই সনেট যদিও স্বাদেশিক সংগীতরূপে তত জনপ্রিয় নয়, তথাপি এর গুরুত্ব হচ্ছে এই ধরনের আদি কবিতাসমূহের মধ্যে এটি অন্যতম এবং কবির উপর ইতালীয় প্রভাবের উদাহরণ হিসাবে উল্লেখের উপযুক্ত।

১৮৬৫-র মে মাসে যখন ইতালিতে দান্তের জন্মের ষষ্ঠ শতবার্ষিক উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছিল তখন সেই উপলক্ষে কবিগুরু দান্তের ওপর মাইকেলের সনেটটি রচিত। তিনি নিজের সুন্দর হস্তাক্ষরে এই বাংলা সনেটটি ও তার সঙ্গে নিজকৃত ফরাসি অনুবাদ ইতালির রাজার কাছে প্রেরণ করেছিলেন, সেই সঙ্গে ফরাসি ভাষায় ইতালি-রাজকে একটি পত্রও দিয়েছিলেন। সেই সংক্ষিপ্ত পত্রটি ১৮৬৫-র ৫মে তারিখে লেখা

মহাশয়

জনৈক সামান্য পদ্যকার, যে নিজেকে কবি আখ্যা দিতে সাহস করে না, গঙ্গার তীরে যাহার জন্ম এবং ইতালীয় কাব্যের জনকের একজন পরম অনুরাগী, – হে মহামহিম, এই পত্রের সহিত সে একটি বাংলা সনেট আপনাকে উপহার দিবার অধিকার গ্রহণ করিতেছে। আপনার আনুকূল্যে সমগ্র ইতালি যে মাল্যের দ্বারা যশস্বী দান্তের সমাধিটি অলংকৃত করিবে, ক্ষুদ্র এই প্রাচ্যদেশীয় ফুলটিও যেন তাহার সহিত যুক্ত হয় – এই তাহার ইচ্ছা।

যখন তিনি নিজেকে ইতালি-রাজের কাছে সামান্য পদ্যকার রূপে পরিচিত করেন তার পূর্বেই তিনি আপন মাতৃভাষায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও সনেটের প্রবর্তক রূপে, তাঁর কালের বাংলা কাব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবিরূপে এবং ইউরোপীয় আদর্শে নাটকের লেখকরূপে স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছেন। ওই পত্রে যে বিনয় প্রকাশ পেয়েছে তা মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ ইতালীয় কবির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধের দ্যোতক। এর সঙ্গে তুলনা করা যায় একই উপলক্ষে দান্তের উপর টেনিসন-এর কবিতায় প্রকাশিত বিনয়ের, যার মধ্যে টেনিসন নিজেকে কল্পনা করেছেন ‘wearing but the garland of a day’।

মাইকেলের সনেটটি অবশ্য প্রচলিত কাব্যপ্রশস্তি অপেক্ষা গভীরতর কিছু নয় ‘নিশান্তে সুবর্ণ-কান্তি নক্ষত্র যেমতি / (তপনের অনুচর) সুচারু কিরণে / খেদায় তিমির-পুঞ্জে ; হে কবি, তেমতি / প্রভা তব বিনাশিল মানস-ভুবনে / অজ্ঞান! জনম তব পরম সুক্ষণে। / নব কবি-কুল-পিতা তুমি, মহামতি, / ব্রহ্মাণ্ডের এ সুখণ্ডে। তোমার সেবনে / পরিহরি নিদ্রা পুনঃ জাগিলা ভারতী। / দেবীর প্রসাদে তুমি পশিলা সাহসে, / সে বিষম দ্বার দিয়া আঁধার নরকে / যে বিষম দ্বার দিয়া, ত্যজি আশা, পশে / পাপ, প্রাণ, তুমি, সাধু, পশিলা পুলকে, / যশের আকাশ হতে কভু কি হে খসে / এ নক্ষত্র? কোন কীট কাটে এ কোরকে ?’

এই প্রশস্তিতে দু’টি বিষয় লক্ষ করার যোগ্য। এটি এমন একজন কবির প্রশস্তি যিনি মূলত নবজাগরণের প্রভাত নক্ষত্ররূপে, কাব্যে নতুন যুগের উদ্বোধকরূপে উল্লিখিত। দ্বিতীয়ত, এটি কবির প্রশস্তি যাঁকে কাব্যলক্ষ্মী নরকে বিচরণের অনুমতি দিয়েছেন। প্রাচ্যদেশে পরবর্তী নবজাগৃতির কবিরূপে মাইকেল স্বয়ং তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য মেঘনাদবধ কাব্য-এ ‘নিম্নে আঁধার অবতরণে’ অগ্রসর হয়েছেন এবং এ বিষয়ে দান্তের কাছেই তিনি শিক্ষাপ্রাপ্ত।

ইতালির রাজা দান্তের প্রতি এই ভারতীয় প্রশস্তিতে বিশেষ মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং আপন সচিবের সহায়তায় তাঁর এই উত্তর পাঠিয়েছিলেন

মহামহিম সম্রাট গভীর পরিতোষের সহিত শ্রবণ করিয়াছেন যে ইতালীয় প্রতিভার গভীর ও মহান সংগীত গঙ্গার তীরেও প্রতিধ্বনি তুলিয়াছে এবং প্রাচ্যদেশীয় যে ফুলটি আপনি অ্যালিগিএরি-র সমাধিতে স্থাপন করিতে ইচ্ছা করিয়াছেন তাহাকে তিনি স্বাগত জানাইতেছেন এবং মনে করিতেছেন যে প্রাচ্যের সহিত ইউরোপের মিলনের যোগসূত্ররূপে ইতালি তাহার শুভজনক ভাগ্যকে চরিতার্থ দেখিতে পাইবে, সেই সময়ের অধিক বিলম্ব নাই।

মাইকেলের সনেটের সবগুলি অবশ্য সমান সফল নয়, কিন্তু তারা কখনওই ছন্দোবন্ধে বা প্রকাশগত পরিমিতিতে দরিদ্র নয়। দান্তে অপেক্ষা পেত্রার্ক-ই ছিলেন তাঁর আদর্শ। দান্তে ও পেত্রার্ক-এর সনেট থেকে মাইকেলের সনেটের মৌল পার্থক্য যত না রূপাঙ্গিকগত তার চেয়ে বেশি মেজাজগত। একথা সত্য যে পেত্রার্ক-এর সনেট আঙ্গিকগত শুদ্ধিতে এ জাতীয় কবিতার মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু পেত্রার্ক ও দান্তে উভয়েরই প্রকাশের গভীর অভিজ্ঞতা ছিল এবং তাঁদের রূপদক্ষতা ইউরোপীয় কাব্যে যে কারণে অনন্য তা হচ্ছে তাঁরা সনেটের হ্রস্ব পরিসরে এত অধিক প্রকাশে সক্ষম। বিশেষ করে পেত্রার্ক-এর ছিল বিচলিত ও নিরুপায়ভাবে বিক্ষিপ্ত অন্তরাত্মা এবং দেহ ও আত্মার পরস্পরবিরোধী দাবির চাপ থেকে এসেছে তাঁর গীতিস্বভাবের তীব্রতা। তাঁর সনেটের বিষাদাচ্ছন্ন সুর এই নৈতিক পীড়নের কাব্যরূপী অভিব্যক্তি এবং অভিজ্ঞতার যে গভীরতা এগুলির মধ্যে উচ্চারিত হয়েছিল তা ইউরোপের কল্পনাকে বেশ নাড়া দিতে পেরেছিল। ইউরোপে মাইকেলকে বেশ কঠোর জীবন যাপন করতে হয়েছে, কিন্তু ইতালীয় কবিদের আত্মিক ও নৈতিক পীড়ন তাঁর ছিল না। অধিকন্তু বাস্তব বা কল্পনার কোনও বেয়াত্রিচে অথবা লরা-ও তাঁর ছিল না। তিনি তাঁর ফরাসি স্ত্রীর সঙ্গে বাস করতেন, তাঁকে আন্তরিক ভালোবাসতেন, কিন্তু তাঁকে সম্বোধন করে কোনও সনেট রচনা করেননি। প্রেমমূলক দুটি মাত্র সনেট তিনি রচনা করেছেন কিন্তু তারা কোনও গভীর ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশ করেছে মনে হয় না। চতুর্দশপদী কবিতাবলির এক শ’ দু’টি সনেট বিবিধ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়েছে – দান্তে, পেত্রার্ক, টেনিসন, ভিক্টর হুগো ইত্যাদি বিশিষ্ট ইউরোপীয় লেখকদের ওপর কিছু, বাল্মীকি, কালিদাস ও জয়দেব প্রমুখ সংস্কৃত কবিদের নিয়ে কিছু এবং কয়েকজন বাঙালি কবি ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ইত্যাদি বন্ধুদের নিয়ে লেখা। অন্যান্য বিষয় হচ্ছে পৌরাণিক বা সাহিত্যিক, কিন্তু কোনওটাই তাঁকে গীতিকাব্যিক আত্মকথনে প্রবৃত্ত করেনি। আত্মিক দিক থেকে তিনি সম্ভবত পেত্রার্কীয় হতে অক্ষম, আবার দান্তের গভীর বিষাদে প্রবেশেও অসমর্থ। তবু মাইকেল নিজের অভিপ্রায় অনুযায়ী ভাব প্রকাশের উপায় হিসাবে সনেট রীতিকে একটি নিখুঁত মাধ্যম করে তুলতে অবশ্যই সফল হয়েছেন। নিজ কাব্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় রূপাঙ্গিক অবলম্বন করার সহজ দক্ষতা তাঁর ছিল এবং তা তিনি সরাসরি তাঁর ইতালীয় গুরুদের কাছ থেকেই গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের ইংরাজ অনুকারীদের কাছ থেকে নয় – বাংলা কাব্যের ইতিহাসে এটাই গুরুত্বপূর্ণ। পেত্রার্ক-কে নিয়ে রচিত সনেটটিতে মাইকেল বলেছেন ইতালীয় কবি কাব্যের খনিতে এই ক্ষুদ্র মণি পেয়েছিলেন ও একে স্বর্ণমন্দিরে বাণীর চরণে প্রদান করেছিলেন। মাইকেল আপন কাব্য-ঐতিহ্যে একে পাননি, কিন্তু যে দক্ষতার সঙ্গে একে মৃত্তিকান্তরিত করেছিলেন তাতে বোঝা যায় ভারতীয় কবি ইতালীয় কাব্যের দ্বারা কতখানি সৃষ্টিশীলভাবে উদ্দীপ্ত হতে পেরেছিলেন।

মাইকেল যখন তাঁর প্রথম নাটক রচনা করেন তিনি স্বীকার করেছিলেন যে ‘এতে বিদেশি ভঙ্গি কিছুটা আছে’। কিন্তু সাহিত্যে বিদেশি প্রভাব বিষয়ে একটি থিয়োরি তাঁর ছিল যাতে একদিকে পাশ্চাত্য সাহিত্যের অনুকরণ এবং অন্যদিকে অভিপ্রায় ও অবয়বের সৃজনমূলক সমন্বয়, এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রচিত হয়েছে। বন্ধু গৌরদাস বসাককে লিখিত এক পত্রে তিনি প্রশ্ন করেন ‘প্রাচ্যের ভাবধারায় পূর্ণ বলে কি তুমি মূর-এর কবিতা অপছন্দ করো অথবা এশীয় ভঙ্গির জন্য বায়রনের কবিতা, বা তার জর্মানত্বের জন্য কার্লাইলের গদ্য?’ একই পত্রে তিনি লেখেন ‘মনে রেখ আমি আমার দেশবাসীর সেই অংশের জন্য লিখছি যারা আমারই মতো চিন্তা করে, যাদের মন কম বেশি পরিমাণে পাশ্চাত্য ভাবাদর্শে ও চিন্তাধারায় পরিপ্লুত ; সংস্কৃত মাত্রেরই দাস সুলভ প্রশস্তি করতে করতে যে শিকল তৈরি হয়েছে তাকে ছিঁড়ে ফেলতে হবে, এই হচ্ছে আমার মতলব।’ ঊনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁসের সর্বাগ্রবর্তী সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বরূপে তাঁর নবীন ভাবরাজি ও আবেগকে ধারণ করতে সক্ষম এমন রূপাঙ্গিকগত নবীনতার প্রবর্তন করা প্রয়োজন হয়েছিল এবং তিনিই প্রথম বাঙালি কবি যিনি নূতন আদর্শের সন্ধান করেন কেবল ইংরাজি সাহিত্যে নয়, সমগ্রভাবে ইউরোপীয় সাহিত্যে ও বিশেষভাবে ইতালীয় কাব্যে। এভাবে পাশ্চাত্য-প্রভাবিত সাহিত্যে যে আমাদানি করা বস্তু তা তিনি মনে করতেন না। তাঁর একটি পত্রে তিনি বলেছেন ‘সাহিত্য, সংক্রান্ত বিষয়ে আমার এতই আত্মগরিমাবোধ যে বিশ্বের সম্মুখে আমি ধার করা বসনে দাঁড়াতে অক্ষম।’ যখন তিনি তাঁর মহাকাব্যখানি রচনা করছিলেন তখন আর এক পত্রে তিনি লেখেন ‘আমি বাল্মীকি, ব্যাস, ভার্জিল, দান্তে, তাসো ও মিলটনের ছাড়া কারও কাব্য পাঠ করিনি। এই সব কবিগুরু যে কাউকে প্রথম শ্রেণীর কবিতে পরিণত করতে পারেন যদি প্রকৃতি তার উপর প্রসন্না হন।’ এই চিঠির তারিখ ১ জুলাই ১৮৬০ এবং নিজের স্বীকৃতি অনুসারে তিনি তখন পর্যন্ত ইতালীয় ভাষায় কোনও বুৎপত্তি লাভ করেননি। অবশ্য তার এক বছরের মধ্যেই তিনি তা শিখে ফেলেন। ১৮৬০-এর অগস্টে লিখিত এক পত্রে তিনি লেখেন ‘আমি ইতালীয় অত্তেভো রাইমা-র মতো একটি স্তবক গঠন করতে ও তা দিয়ে একটি রোমান্টিক কাহিনি লিখতে চাই।’ তিনি তখন ঐ ভাষা পাঠ করার মতো জ্ঞান অবশ্যই অর্জন করতে আরম্ভ করেছেন। প্রায় এক বছর পরে একটি তারিখহীন পত্রে তিনি বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লেখেন ‘আমি সদ্য মূল তাসো পড়ছি, জনৈক ইতালীয় ভদ্রলোক আমাকে এক কপি উপহার দিয়েছেন। ওঃ কী মধুর কাব্য! ঈশ্বর যদি আমাকে আরও কয়েক বছর নিষ্কৃতি দেন, আমি একটি কাব্য লিখব, অত্তেভো রাইমা বা আট চরণের এই রকম স্তবকে একটি রোমান্টিক আখ্যান। হয়তো ওই ছন্দে তোমার ‘সিংহল বিজয়’ লিখব।’ অবশ্য সে কাব্য কখনওই লেখা হয়নি এবং মনেও হয় না এ জাতীয় ছন্দে তাঁর কোনও স্বাভাবিক আকর্ষণ ছিল। তাঁর স্বচ্ছন্দ অমিত্রাক্ষর নিশ্চয়ই ক্রমশ তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে অন্য যে কোনও ছন্দের পরীক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে।

যাই হোক, মাইকেলের কাব্যে দান্তের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব হচ্ছে তাঁর মেঘনাদবধ কাব্য-এর অষ্টম সর্গে। এখানে তিনি রামায়ণ থেকে এক গুরুতর ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন, এবং এ উদ্ভাবনের মূলে আছে ভার্জিল ও দান্তের প্রভাব। ইতালি-রাজের কাছে প্রেরিত তাঁর দান্তে বিষয়ক কবিতাটির লিপিতে মাইকেল দান্তে প্রসঙ্গে বায়রনের কথা উদ্ধৃত করেছেন ‘ইতালির মহান কবি পিতা’ (‘the great poet-sire of Italy’) এবং তারপর ইনফেরনো থেকে দু-চরণ তুলে দিয়েছেন যা মেঘনাদবধকাব্য-র অষ্টম সর্গের ভেতরে আক্ষরিকভাবে অনূদিত হয়েছে। চরণ দুটি নরকের দ্বারে খোদাই করা লিপি থেকে নেওয়া

Through me among the people lost for aye.

All hope abandon, ye who enter here.

(এই পথ দিয়া যায় পাপী দুঃখ-দেশে চির দুঃখ ভোগে; –

হে প্রবেশি, ত্যাজি’ স্পৃহা প্রবেশ এ দেশে!)

এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলা মহাকাব্যখানির অষ্টম সর্গ নরকের ও তার অধিবাসী ভ্রষ্টাচারীদের বিবরণে পূর্ণ এবং বাংলা কাব্যে দান্তের প্রভাবের এটিই আদিতম উদাহরণ। সংস্কৃত রামায়ণের ষষ্ঠ অধ্যায়ে লক্ষ্মণের ত্রাণের জন্য একটি পর্বত থেকে হনুমান কর্তৃক বিশল্যকরণী আনীত হয়েছিল। মাইকেল ব্যতিক্রম সৃষ্টি করেছিলেন রামচন্দ্রকে নরকে অবতরণ করিয়ে মৃত পিতার কাছ থেকে সঞ্জীবনী ভেষজ লাভের পরিকল্পনা করে। সংস্কৃত রামায়ণে এক শ্লোক আছে যা বাঙালি কবিকে নিজ কাব্যে এই নতুন আখ্যান সংযোগের সূত্র প্রদান করে থাকতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্মণ মারাত্মক আঘাত পাওয়ার পর রামচন্দ্র ভাইকে মৃত মনে করে বলেছেন

যথৈব মাম বনম ষান্ত মনুষতি মহাদ্যুতিম অহমপ্যানুষস্যামি তথৈব ইনম যমক্ষয়ম।

(আমি আমার ভাইকে মৃত্যুদেশে অনুসরণ করব যেমন সে আমাকে বনে অনুসরণ করেছে)

কিন্তু মূল রামায়ণে রামচন্দ্র নরকে অবতরণ করেননি। মাইকেল দান্তের ইনফেরনো-র সাদৃশ্যে আখ্যান উদ্ভাবন করেছেন যা তাঁকে পাপ ও শাস্তির বিবরণের একটা আদর্শ প্রদান করেছে। মাইকেল ভার্জিলের ঈনিদ-এর ষষ্ঠ সর্গের দ্বারাও নিশ্চয় প্রভাবিত হয়ে থাকবেন যেখানে ঈনীস কুমেনসিবিল-এর সহযোগে নরকে অবতরণ করে। চরম যন্ত্রণাদায়ক নারকীয় নিগ্রহের চিত্র হিসাবে বাংলা মহাকাব্যখানির অষ্টম সর্গ ভার্জিল অপেক্ষা দান্তের কাছেই অধিক ঋণী। এবং এর কারণ দান্তের রচনার সঙ্গে পরিচয় হেতু কবির অন্তর্জগৎ নৈতিক আবেগের তীব্রতা লাভ করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি মানস বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ নৈতিক দৃষ্টির প্রয়োজন বোধ করেছিল – তার অনুভূতিশক্তি এসেছিল যুগের আবেগগত অনুপ্রাণনা থেকে এবং তার সংঘাত ও জটিলতা, কাব্যের মধ্যে তাকে মূর্ত করে তোলার ভাবনা এসেছিল ডিভাইন কমেডি থেকে।

দান্তের উপর মাইকেলের সনেট রচনার প্রায় তেরো বছর পর বাংলা সাহিত্যপত্র ভারতী-তে ‘বিয়াত্রীচে দান্তে ও তাঁহার কাব্য’ নামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি প্রবন্ধ ও তৎসহ ডিভাইন কমেডি ও ভিতা নুওভা থেকে অনূদিত কিছু কাব্যাংশ প্রকাশিত হয়। কিন্তু মোটের উপর দান্তের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বিশেষ সফলভাবে আলোড়িত হতে পারেননি। এ সম্পর্কে ১৯২৪ সালে চিনদেশে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতায় তিনি স্বীকার করেছেন-

তরুণ বয়সে আমি দান্তের কাব্য পাঠে সচেষ্ট হই, দুর্ভাগ্যবশত একটি ইংরাজি অনুবাদের মাধ্যমে। আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হই এবং এ ব্যাপারে নিবৃত্ত হওয়াই পবিত্র কর্তব্য বলে বোধ করি। সেই থেকে দান্তে আমার কাছে বন্ধই রয়ে গেলেন।

এটা সহজেই বোঝা যায়, কারণ রবীন্দ্রনাথের নৈতিক দৃষ্টিতে নরকের কোনও স্থান ছিল না – তাঁর কাছে কল্যাণের অর্থ ঐশ্বরিক করুণাপ্রভাবে স্বর্গলোকে উত্তরণ নয়, বরং তা হচ্ছে পূর্ব নির্দিষ্ট সৃষ্টিশৃঙ্খলার অবদান; যন্ত্রণাদায়ক কঠোর নিগ্রহের সুখপ্রসূ উপসংহার নয়, বরং স্বর্গীয় বিধানে নির্ধারিত মানবাত্মার এক উন্নয়ন যেখানে পাপের কোনও স্থান নেই। এই ব্যাপারটির প্রতি উব্লিউ বি. ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের ইংরাজি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। ১৯১২-তে লন্ডনে প্রদত্ত এক বক্তৃতায় বলেছিলেন যে ভারতীয় কবির জগৎ থেকে পাপবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত টমাস এ কেম্পিস-এর জগৎ একেবারে পৃথক। এর প্রায় বিশ বছর পরে নরওয়ের লেখক জোহান বয়ার বলেছিলে যে, রবীন্দ্রনাথই যেন, সেই ভারতবর্ষ যে ইউরোপের কাছে নতুন এক স্বর্গীয় প্রতীক নিয়ে এল- ক্রুশ নয়, কমল।’ তথাপি অংশত ব্রহ্মনীতিবাদে পাপ চেতনার জন্য এবং অংশত ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় জীবনধারার আত্মিক জটিলতার জন্য মাঝেমধ্যে ও সীমাবদ্ধ পরিমাণে রবীন্দ্র-চিত্তেও পাপ ও প্রায়শ্চিত্তের উপলব্ধি ছিল। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ১৮৯৭-এ রচিত ও কাহিনি-র অন্তর্ভুক্ত হয়ে ১৯০০-তে প্রকাশিত নাট্যকাব্য ‘নরকবাস’। এ এক রাজার কাহিনি যিনি তার পুরোহিতের নিষ্ঠুর আদেশে নিজ শিশুপুত্রকে অগ্নিযজ্ঞে আহুতি দিয়ে আপন রাজধর্মের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। পরে অনুতপ্ত পিতা উপলব্ধি করতে পারেন এই পুত্রাহুতি কেবল তাঁর রাজকীয় আত্মাভিমান ছাড়া কিছুই নয় এবং নিজ গৌরববৃদ্ধির জন্য তিনি পিতৃস্নেহের পবিত্র নীতিই লঙ্ঘন করেছেন। যখন তিনি স্বর্গাভিমুখে চলেছেন তখন পথে নরকে তাঁর পুরোহিতকে দেখতে পেলেন এবং নিজেকেও সমতুল্য পাপী বিবেচনা করে নরকবাসের সিদ্ধান্ত করলেন। এখানে নরকের বর্ণনায় ইনফেরনো-র ভয়ংকরতার কিছুটা ফুটেছে। এডওয়ার্ড টমসন এটা লক্ষ করেছেন ও বলেছেন Nothing could be better than the atmosphere of vagueness a misty region of voices of Dante’s Hell, with which ‘A Sojourn of Hell’ opens.

হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ছায়াময়ী’ (১৮৮০-তে প্রকাশিত-র ভূমিকায় কবি বলেছেন দান্তের কাছে তাঁর ঋণের পরিমাণ আখ্যাপত্রে মুদ্রিত motto থেকে স্পষ্ট হবে। সে motto স্পেন্সার-এর কবিতা থেকে উদ্ধৃত

I follow here the footing of thy feet

That with thy meaning so I may thee rather meete.

ক্যালকাটা গেজেট পত্রিকা কাব্যখানির কথা উল্লেখ করেছিলেন এই মন্তব্যসহ

‘কাব্যখানির প্রকৃতি এর নাম থেকেই ব্যাখ্যাত হয়েছে। এর মধ্যে নরকের বিভীষিকার চিত্র রয়েছে।’ কাহিনি হচ্ছে এই –

এক পিতা তাঁর প্রিয় দুহিতার মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত হয়ে শ্মশানভূমিতে বীভৎস প্রেত ও পিশাচদলের সাক্ষাৎ লাভ করেন-মৃত্যুর পরে মানবাত্মার পরিণাম কী, এই পীড়াদায়ক জিজ্ঞাসায় তাঁর অন্তর বিক্ষুব্ধ হতে থাকে। এমন সময় এক দেবীর আবির্ভাব ঘটে, তিনি শোকাতুর পিতাকে কন্যার সৎকার করতে অনুরোধ করেন। সৎকারের পর এই দেবী লোকটিকে মৃত্যুলোকে নিয়ে গেলেন – সেখানে নীরো, এ্যান্টনি, ক্লিওপেট্রা প্রমুখ অনেক নিগৃহীত পাপাত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটল। অতঃপর এই স্বর্গীয় পথপ্রদশিকার সহায়তায় তিনি মর্তলোকে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং সহসা দেখতে পেলেন সেই দেবী তাঁরই কন্যা। এই আখ্যান বাস্তবিকই হিন্দু মানসে ডিভাইন কমেডি-র প্রভাবের এক চমৎপ্রদ উদাহরণ।

সম্ভবত দান্তে আমাদের কবিতায় ও কথাসাহিত্যে গভীরতর ও ব্যাপকতর প্রভাব হয়ে উঠবে যখন ভারতীয় ধর্মীয় কল্পনা মানুষের ব্যক্তিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যের দিকে তাকিয়ে নৈতিক বিশ্বের সংজ্ঞা প্রদানের নতুন চেষ্টা করবে। সে উদ্যমে কবিতা ও দর্শনে এক সন্ধি স্থাপিত হবে এবং তা প্রায় অনিবার্যভাবে আমাদের চিত্তকে দান্তের সৃষ্টির দিকে আকর্ষণ করতে থাকবে।

700th Anniversary of the Birth of Dante A souvenir (Department of Modern European Languages, University of Delhi), 1965 থেকে ড. রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্তের অনুমতিক্রমে তাঁর ‘Dante in Bengali Literature’ প্রবন্ধের অনুবাদ।

৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা

(দান্তে বিশেষ সংখ্যা ১৩৭৩)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *