মার্কসবাদের সমালোচনা – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
মার্কসবাদ সম্পর্কে, মার্কসবাদের সপক্ষে ও বিপক্ষে বিগত একশো বিশেষত পঞ্চাশ বছর ধরে এত যে আলোচনা হচ্ছে তা মার্কসীয় চিন্তাধারার মৌলিকতা, গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতার প্রমাণ। মার্কসবাদ বস্তুত কী? এই প্রশ্নে বিভিন্ন মার্কসবাদী পণ্ডিত ব্যক্তিরা ও প্রভাবশালী পার্টিগুলি ঐক্যমতে উপনীত হতে পারছেন না। তবু এ কথা অনস্বীকার্য যে, সমগ্র বিশ্ববাসীর বিশাল এক অংশ মার্কসবাদী সমাজব্যবস্থায় বসবাস করছেন এবং বিশাল আরেক অংশ মার্কসবাদে বিশ্বাসী। এই বিরাট ঐতিহাসিক ঘটনাটিই মার্কসবাদের আলোচনা ও পুনরালোচনার সপক্ষে মহোত্তম যুক্তি। মার্কসবাদের সমালোচনা নানা দিক থেকেই বোঝা যেতে পারে। ১. যারা মার্কসবাদের বিরোধী তাঁদের দিক থেকে ; কিংবা যাঁরা মার্কসবাদের সমর্থক তাঁদের দিক থেকে। ২. যাঁরা মার্কসবাদে বিশ্বাসী কিন্তু মার্কসবাদী সমাজব্যবস্থার বাস্তব ইতিহাসের প্রতি সম্পূর্ণ বা অংশত শ্রদ্ধাহীন তাঁদের দিক থেকে ; কিংবা যাঁরা মার্কসবাদের কোনও-না-কোনও বাস্তব রূপায়ণের সমর্থক (কিন্তু ক্ল্যাসিকাল মার্কসবাদ বলতে যা বোঝানো হয় তার প্রতি উদাসীন) তাঁদের দিক থেকে ; ৩. এমন অনেকে আছেন যাঁরা মার্কসবাদের একটি (বা কয়েকটি) দিক (যথা অর্থনীতি) গ্রহণ করেন, কিন্তু অন্য একটি (বা কয়েকটি) দিক (যথা দর্শন) গ্রহণ করেন না। এঁরা মার্কসবাদকে একটি অবিচ্ছেদ্য ‘সিস্টেম’ বা প্রস্থান বলে মনে করেন না। ৪. এমন অনেকে আছেন যাঁরা মার্কসবাদের মূল প্রবক্তাদের একজনের বক্তব্য গ্রহণ করেন, কিন্তু অপরজনের বক্তব্য গ্রহণ করেন না। ৫. মার্কসবাদের সমালোচনা প্রবক্তা ও সমালোচকদের বক্তব্য ধরেও করা যায়, আবার সমালোচ্য বিশয় ধরেও করা যায়। সমালোচনার এই যে বিভিন্ন দিকের দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করা হল তা যে সব পরস্পরবিরোধী তা নয়। আমার মতে মার্কসবাদের যে ত্রুটিগুলো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমি কেবলমাত্র সেই সমালোচ্য বিষয়গুলিরই পুনরালোচনার অবতারণা করব।
সত্যাসত্য বিনিশ্চয়।
হেগেলের ডায়ালেকটিককে সমালোচনা করে মার্কস যা বলছেন তা সর্বজনবিদিত। হেগেল তাঁর ডায়ালেকটিক -কে (পায়ের বদলে) মাথা দিয়ে হাঁটাতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ, জন-চৈতন্যের দ্বন্দ্বে হেগেল জড়ের স্থলে মৌলিক প্রাধান্য দিয়েছিলেন চৈতন্যকে। মার্কসের দাবি, তাঁর ডায়ালেকটিকে জড় তার প্রাপ্য প্রাধান্যের স্বীকৃতি পেয়েছে মার্কসীয় ডায়ালেকটিক (যা স্বাভাবিক) পা দিয়েই হাঁটে। ফরাসি দার্শনিক মেলো-পন্তি আপত্তি করে বলেছেন, মার্কসীয় ডায়ালেকটিক অনুসারে পা (অর্থাৎ জড়) শুধু হাঁটবার অধিকারই পায় না, চিন্তা করার শক্তিও (স্ব-চৈতন্যও) অর্জন করেছে।
সত্যাসত্যবিনিশ্চয় প্রসঙ্গ মূলত জ্ঞানতত্বের বিষয়। জ্ঞানের সঙ্গে জগতের, বিষয়ের সঙ্গে বিষয়ীর, এবং কর্মের সঙ্গে জ্ঞানের সম্পর্ক না বুঝে সত্যাসত্য নির্ণয় করা অসম্ভব। মার্কসবাদীর মতে, জগৎ জ্ঞান নিরপেক্ষ। জগৎ জ্ঞানে প্রতিবিম্বিত হয়। জগৎ সীমাহীন। জ্ঞানেরও সীমান্তও ক্রমবর্ধমান। জ্ঞানকে জ্ঞাতা-নিরপেক্ষ জগতের প্রতিবিম্ব বললে কিছু অসুবিধা আছে। তাতে মনে হতে পারে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী কান্টের মতো প্রচ্ছন্ন দ্বৈতবাদী-বিষয় বিষয়ীর, জ্ঞান-জগতের ও জ্ঞান-কর্মের মধ্যে অন্তর্নিহিত ও নিরবচ্ছিন্ন দ্বন্দ্ব অস্বীকার করে। মার্কসবাদী যদি বলেন বিষয় (তথাচ বস্তুজগৎ) বিষয়ীর (মনোজগতের) সৃষ্টি, তাহলে তার বস্তুবাদ (রিয়ালিজম) ক্ষুণ্ণ হয়। যদি তিনি বলেন বিষয়ীতে বস্তুজগতের প্রতিবিম্ব মাত্র তাহলে তার দ্বন্দ্ববাদ ক্ষুণ্ণ হয়। ঘনায়মান উভয় বিপদ এড়াতে গিয়ে মার্কসবাদী বলেন, বিষয়ীকে (জ্ঞাতাকে) নির্দ্বন্দ্ব, একক, নিঃসঙ্গ ভাবলে ভুল হবে ; আসলে সে সক্রিয় ও সমাজের প্রতিভূ কোনও এক শ্রেণীর মানুষ। জ্ঞানমাত্রই কর্ম প্রভাবিত এবং কর্মও জ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত। প্রশ্ন থেকে যায় কোনও একটি জ্ঞান-কর্ম যে যথার্থই জ্ঞান-কর্ম তার প্রমাণ কি? বিষয়ের প্রতিবিম্ব যে সত্য তা নির্ণয় করতে হবে কী ভাবে?
মার্কসবাদীদের মতে, জ্ঞানের প্রমাণ প্রত্যক্ষ। তবে নির্বিকল্প (ইমিডিয়েট) প্রত্যক্ষে আমরা জগতের বা বিষয়ের আভাস মাত্র পাই, যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারি না। যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে হলে প্রত্যক্ষ-লব্ধ অভিজ্ঞতাকে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে আরও নিয়বয়ব (অ্যাবস্ট্র্যাক্ট) ও সামান্য ( জেনারেল) করতে হবে। প্রত্যক্ষোত্তর এই নিরবয়ব ও সামান্য অভিজ্ঞতাকে বলা হয় যথার্থ (লজিকাল) জ্ঞান। যথার্থ জ্ঞানে বিষয়বস্তুর সারমর্ম ধরা পড়ে, স্থূলরূপে নয়। যথার্থ জ্ঞানের লক্ষ্য হল বিশেষ বিষয়বস্তুতে সামান্য বা সারধর্মকে আবিষ্কার করা। জ্ঞান লাভের প্রথম দ্বান্দ্বিক পর্যায়ে স্থূল জড়বস্তু ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষে রূপান্তরিত হয়, পরবর্তী পর্যায়ে প্রত্যক্ষলব্ধ বিষয় ধারণার মাধ্যমে উচ্চতর সামান্যধর্ম অর্জন করে। মার্কসবাদী জ্ঞানতত্বে এইভাবে বুদ্ধিবাদ ও প্রত্যক্ষবাদের বিরোধ নিরসনের চেষ্টা করা হয়।
মার্কসবাদী জ্ঞানকে প্রতিবিম্ব বললেও নিষ্ক্রিয় প্রতিবিম্ব বলে স্বীকার করেন না। প্রত্যক্ষ থেকে শুরু করে যথার্থ জ্ঞান পর্যন্ত সমস্ত প্রক্রিয়াটিই দ্বান্দ্বিক এবং উদ্দেশ্য নিয়ন্ত্রিত। জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে, বিচার ও ব্যবহারের মধ্যে মার্কসবাদী কোনও নির্দিষ্ট ভেদরেখা আছে বলে মানেন না। এই বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ। ব্যবহারের (প্রাকটিসের) ভূমিকা দ্বৈত জ্ঞানের ভিত্তি এবং সত্যের নির্ণায়ক (ক্রাইটেরিয়ান)। যে কোনও ব্যবহার অবশ্য জ্ঞানের ভিত্তি বা সত্যের নির্ণায়ক বলে স্বীকৃত নয়। প্রথমত বৌদ্ধিক (ইন্টেলেকচুয়াল) ব্যবহার এবং দ্বিতীয়ত ব্যক্তিগত ব্যবহার সত্যের নির্ণায়ক বলে পরিগণিত হবে না। যে ব্যবহার বাস্তব (মেটিরিয়াল) এবং সমাজায়ত সেই ব্যবহারই কেবলমাত্র সত্য নির্ণয়ের সহায়ক। বাস্তব ব্যবহারের ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে সেই ব্যবহারই বাস্তব বা বাস্তব দ্রব্য বা সেবা উৎপাদনে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শ্রেণীসংগ্রামে, শ্রেণীউদ্দেশ্যচেতন বৈজ্ঞানিক বা শিল্পকর্মে নিযুক্ত। মনুষ্যদেহের স্থূল ইন্দ্রিয়াদি থেকে শুরু করে সূক্ষ্ম ধ্যানধারণাদি সকল কিছুই ব্যবহারের ফলশ্রুতি। ব্যবহারের দ্বিতীয় কাজ হল সত্য নির্ণয় বা নিরূপণ করা। চিন্তা এককভাবে সত্য নির্ণয়ে অসমর্থ। ভাববাদীরা যে চিন্তার সার্বভৌমত্ব দাবি করেন মার্কসবাদীরা তা গ্রহণ করেন না। মনুষ্য-চিন্তা বিষয়গত সত্য লাভ করতে সমর্থ হয়েছে কি না তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি, মার্কসবাদীর মতে, ব্যবহারসাপেক্ষ। সত্য চিন্তা ব্যবহারিক সাফল্যদায়ক, সফল প্রবৃত্তির জনক। কোনও কোনও মার্কসবাদী ব্যবহার রূপে গবেষণাগারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও শিল্পসংক্রান্ত কার্যাবলির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তবে সতর্ক করার জন্য এ-ও বলা হয়েছে যে, সত্যনির্ণয়ের সব থেকে নির্ভরযোগ্য ব্যবহার গবেষণাগারে লভ্য নয়। রুটকেভিচ বলেন ‘পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ উভয়েই ব্যবহারের অন্তর্ভূক্ত কিন্তু ব্যবহারের সর্বোত্তম পরিচয় হল জনগণের শ্রমে ও রাজনৈতিক কর্মে – উৎপাদনে ও শ্রেণীসংগ্রামে।’ জর্জিয়েভের বক্তব্য আরও স্পষ্ট ‘ বৈপ্লবিক ব্যবহার ছাড়া মার্কসবাদী-লেনিনবাদী জ্ঞানতত্বের অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই।’ এ বক্তব্যে অতিশয়োক্তি থাকলেও ব্যবহারের যে অর্থকে মার্কসবাদী মৌল বলে মনে করেন তা স্মরণ করলে এ-বক্তব্য বুঝতে অসুবিধা হয় না। তা ছাড়া এ-বক্তব্যের এক একটি দিক নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য তা হল সত্যনির্ণয়ে চিন্তার সার্বভৌম দাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং চিন্তার ক্রিয়াশীলতার প্রতি যথোচিত গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু এ বক্তব্য এইভাবে না হলেও মার্কসবাদীদের পূর্বে (এবং পরে তো বটেই) অনেক দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানীই বলেছেন।
মার্কসবাদী জ্ঞানতত্বের আরেকটি অভিনন্দনযোগ্য দিক হল নিরপেক্ষ সত্য ও সাপেক্ষ সত্যের মধ্যে পার্থক্য অনুধাবন করা। নিরপেক্ষ সত্য বিষয়গত এবং সাপেক্ষ সত্য বিষয়ীগত। নিরপেক্ষ সত্য কিন্তু শাশ্বত নয়। সত্য একটি প্রবাহবৎ (প্রসেস) দ্রব্যবৎ এর অস্তিত্ব আছে কল্পনা করলে ভুল হবে। নিরপেক্ষ সত্য বিষয়গত সত্যের পূর্ণ বিস্তার ছাড়া আর কিছু নয়। কোনও বিষয়ী-চৈতন্যেই বিষয়গত সত্যের পূর্ণ বিস্তার প্রতিবিম্বিত হতে পারে না। সুতরাং মনুষ্যলভ্য সত্য মাত্রই বিষয়ী-সাপেক্ষ এবং অসম্পূর্ণ। ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ বিষয়ীগত ধারণা থেকে বিষয়গত সত্যের প্রতি এগিয়ে চলেছে। অসম্পূর্ণ বা খণ্ড সত্যে পূর্ণ বা অখণ্ড সত্য প্রকাশিত, যেমন বিশেষ জ্ঞানে সামান্য জ্ঞান প্রকাশিত। যেসব পূর্ণ ও অকাট্য সত্য ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে মার্কসবাদী লেনিনবাদী দর্শন, ধনবিজ্ঞান, সমাজতন্ত্র ও শ্রেণীসংগ্রামের তত্ব।
জ্ঞানতত্বে লেনিন-কথিত প্রতিবিম্ববাদ (কপি থিওরি) সহজ বস্তুবাদের নতুন একটি সংস্করণ মাত্র। ভাববাদ ও বিজ্ঞানবাদের বিরুদ্ধে সহজ বস্তুবাদের যে যুক্তিটি অনেকেই স্বীকার করেন তা হল বস্তু-জগৎ চৈতন্য নিরপেক্ষ। এই যুক্তিটি স্বীকার করলেই লেনিন যে প্রতিবিম্ববাদের কথা বলেছেন তা অবশ্য গ্রহণীয় হয় না। বার্কলি-র ভাববাদ বা মাখ-এর প্রত্যক্ষবাদ ক্রুটিপূর্ণ। কিন্তু লেনিনের সরল বস্তুবাদ উন্নততর বিকল্প নয়। এ কথা স্বীকার করা শক্ত যে শ্রুত শব্দ ধ্বনিতরঙ্গের কপি বা ইমেজ। জ্ঞান বিষয়ের প্রতিবিম্ব, নাকি প্রতীক – এই বিষয়ে মার্কসবাদীদের মধ্যেই মতভেদ আছে। কর্নফোর্থের রচনা দেখে মনে হয় না তিনি প্রতিবিম্ববাদ স্বীকার করেন। নিওনভ ও মিটিন এ-বিষয়ে যা বলেন তাতে সমস্যার গুরুত্ব ও লেনিন কথিত সমাধান যে আরও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ তা স্বীকৃত। প্রত্যক্ষীভূত বিষয় ও জগতে অবস্থিত চৈতন্য-নিরপেক্ষ বিষয়ের সামঞ্জস্য যে যান্ত্রিকভাবে কার্য-কারণ সম্বন্ধ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাবে না তা অনেক মার্কসবাদীই স্বীকার করেন। দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া দ্বারা এই আবয়বিক সামঞ্জস্য (আইসোমর্ফিজম) ব্যাখ্যার চেষ্টা যদিও হয়েছে, মনে রাখতে হবে, এই দ্বান্দ্বিক তত্ব সম্বন্ধেই গুরুতর জিজ্ঞাসা আছে। বলা হয়েছে, হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মতো মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিও প্রমাণশাস্ত্রের অন্যতম মৌলিক নীতি-(স্ব-বিরোধ নীতি) ভঙ্গের দোষে দুষ্য। মুশকিল হল, লেনিনের মতে, প্রমাণশাস্ত্রের এই নীতিগুলিও বিষয়ী-চৈতন্যে বিষয়ের প্রতিবিম্ব। প্রশ্ন থেকে যায় তা হলে মৌলিক নীতি সম্বন্ধে জ্ঞানলাভের জন্য যে দ্বান্দ্বিক নীতিগুলো অনুসৃত হয় তাদের স্বরূপ ও উৎপত্তি কীভাবে বুঝব? অনবস্থা দোষ ঘটছে না?
জগৎ যে জ্ঞান নিরপেক্ষ এ প্রতিপাদ্য বিষয়টি প্রমাণিত বলে স্বীকার করে মার্কসবাদী জ্ঞানতত্বের আলোচনা শুরু করা হয়েছে। জ্ঞানকে বিষয়ের প্রতিবিম্ব বলা অর্থহীন, যদি না বিনা সমালোচনায় স্বীকার করা হয় যে, বিষয়ী নিরপেক্ষ বিষয় বর্তমান। তাছাড়া প্রাথমিক আলোচনা না করেই আরও এমন ক’টি গৌণ তত্বকে মার্কসবাদীরা স্বীকার করেছেন যে তাও বহু-বিতর্কিত। যেমন, জ্ঞানের ঐতিহাসিক চরিত্র। এই তত্বটি মার্কসবাদী কর্তৃক স্বীকৃত ঐতিহাসিক বস্তুবাদেরই একটি দিক। জ্ঞানের ঐতিহাসিক চরিত্রে আমি নিজে বিশ্বাসী। জ্ঞানের ঐতিহাসিকতার সঙ্গে বস্তুবাদের কোনও অপরিহার্য সম্পর্ক নেই। যে-মাখকে লেনিন তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনিও জ্ঞানের ঐতিহাসিত চরিত্রে বিশ্বাসী। বিজ্ঞানকে যাঁরা জ্ঞান বলে স্বীকার করতে সম্মত এবং নিছক মতামত বলে উড়িয়ে দেন না তাঁরা সকলেই জ্ঞানের ঐতিহাসিকতায় আস্থাবান। যাঁরা মনে করেন জ্ঞান অনৈতিহাসিক এবং অপরিবর্তনীয় দ্রব্য, তাঁদের যুক্তিকে খণ্ডন না করে বিনা প্রশ্নে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ-নিঃসৃত জ্ঞানের ঐতিহাসিকতায় আস্থা স্থাপন করা অযৌক্তিক।
ব্যবহারকে জ্ঞানের ভিত্তি ও সত্যের নির্ণায়ক বলে মার্কসবাদী যে যুক্তি উত্থাপন করেছেন তা চক্রবৎ। ব্যবহারের স্বরূপ (অর্থাৎ প্রতিপাদ্য তত্বটি ব্যবহারে সমর্থিত হল কি না তা) নির্ণীত হচ্ছে ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতার দ্বারা। কিন্তু মুশকিল হল যে কোনও ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার সমর্থন কিংবা অসমর্থন তো মার্কসবাদী স্বীকার করবেন না। মাখও তো ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার উপর চূড়ান্ত আস্থাবান ; কিন্তু তিনি যেহেতু অভিজ্ঞতা-নিরপেক্ষ বস্তুজগতের (অর্থপূর্ণ) অস্তিত্বে অবিশ্বাসী তাঁর মত মার্কসবাদীর পক্ষে অগ্রাহ্য। আসল কথা, ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মধ্যে অন্তর্নিহিত এমন কিছু নেই যার জন্য ওই সমর্থন বা অসমর্থন অবশ্যগ্রাহ্য। তাই আবার ব্যবহারের গোত্র (আইডেন্টিটি) নির্ণয়ের প্রশ্ন ওঠে। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে আবার তো ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষের (অভিজ্ঞতার) ডাক পড়বে ; কারণ মার্কসবাদী তো আর নিখাদ বুদ্ধিকে জ্ঞানের ভিত্তি বলে স্বীকার করেন না। তাছাড়া মার্কসবাদী ব্যবহারের যে সংকীর্ণ সংজ্ঞা নির্দেশ করেছেন তার সপক্ষে যুক্তি ও ঐতিহাসিক প্রমাণ উভয়ই দুর্বল।
হেগেলের মতে, জ্ঞান ও জগতের মধ্যে অন্তর্লীন ঐক্য আছে। মার্কস তা স্বীকার করেননি। তাঁর মতে, এই ঐক্য ব্যবহারের মাধ্যমে স্থাপন করতে হবে। যে ব্যবহার দ্বারা এই ঐক্য স্থাপন করতে হবে সেই ব্যবহারও শিক্ষণীয় ; এবং এই শিক্ষা একমাত্র সর্বহারা শ্রেণী তার বৈপ্লবিক চৈতন্য দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম। জ্ঞান ও জগতের ঐক্যবিধায়ক সেই ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে এক মতবাদসাপেক্ষ ; মতবাদটি হল সর্বহারা শ্রেণীর বৈপ্লবিক ব্যবহারই কেবলমাত্র সত্যের কষ্টিপাথর। এই মতবাদ যিনি স্বীকার করবেন না তাঁর পক্ষে কি সত্যনির্ণয় অসম্ভব? মার্কসবাদী সত্যের তত্ব শেষ বিশ্লেষণে শ্রেণী সত্যের রূপ পরিগ্রহ করে। সত্যের এই তত্ব নিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিদের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক মতবাদসমুহের সত্যাসত্যবিনিশ্চয় করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ওই সব মতবাদ যে নিষ্ফল তা বলা শক্ত। সত্যের যে নিরপেক্ষ রূপের কথা মার্কসবাদী বলেন তার একটি ভাষ্য গ্রহণ করলে এই অসুবিধা দূর করা যায় না। কিন্তু সেই ভাষ্য মার্কসবাদীর পক্ষে গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা সন্দেহের বিষয়।
ধর্মাধর্মবিনিশ্চয়।
এই শিরোনামায় আমাদের আলোচ্য বিষয় মার্কসীয় নীতিশাস্ত্র (এথিক্স)। সংস্কৃত ধর্ম শব্দটির তাৎপর্য নিছক আধ্যাত্মিক নয়, সামাজিকও বটে। মার্কসের মতে, নীতিধর্মের সমাজ-নিরপেক্ষ কোনও স্বাতন্ত্র্য নেই। এ দিক থেকে বিচার করলে ধর্মাধর্মবিনিশ্চয় সত্যাসত্যবিনিশ্চয়ের উপর নির্ভরশীল। ‘কী আমার ধর্ম?’ ‘কী আমার কর্তব্য?’ – এই প্রশ্নের উত্তরে মার্কসবাদী বলবেন, ‘ তোমার ধর্ম, কর্তব্য তোমার ঐতিহাসিক অবস্থা ও উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে ; – এর কোনও সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর নেই।’ এই বক্তব্য নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদেরই প্রকাশ। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সর্বজনগ্রাহ্য কোনও নীতিধর্ম থাকতে পারে না। নেইও। সামন্ততান্ত্রিক বা বুর্জোয়া সমাজ পরস্পরবিরোধী শ্রেণীস্বার্থের দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ ও বিচার-বর্জিত। এই দ্বন্দ্ব ঐতিহাসিক ও অনিবার্য। সর্বহারা শ্রেণীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত না হলে এই দ্বন্দ্ব হ্রাস পাবে না; সাম্যবাদী সমাজ যে পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে সেই পর্যন্ত এই দ্বন্দ্ব সম্পূর্ণ তিরোহিত হবে না। মার্কসবাদীর বিশ্বাস, সর্বহারা শ্রেণীর আধিপত্য ও তার নেতৃত্বে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা ইতিহাসের অনতিক্রম্য বিধান। লক্ষণীয় হল, যে সমাজে যে নীতিই পরিদৃষ্ট হোক না কেন, মার্কসবাদীর মতে, তা অনতিক্রম্য। মানবিক প্রচেষ্টায় নীতিধর্ম সৃষ্টি বা বিনাশ কিছুই করা যায় না, শুধু এর আবির্ভাব-তিরোভাব ত্বরান্বিত বা বিলম্বিত করা যায়, কিংবা স্থায়িত্বকালের কিঞ্চিদধিক হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব। মার্কসবাদীর বক্তব্য বিবদমান ও শ্রেণীবিভক্ত মানবিক স্বার্থবুদ্ধিকে সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের দল ও রাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে শক্তির প্রশ্ন জড়িত। যে শক্তিশালী তার হাতেই যদি অনিবার্যভাবে ইতিহাসের বিধানে নিয়ন্ত্রণের অধিকার বর্তায় তাহলে শক্তিই হয়ে দাঁড়ায় অধিকারের উৎস। অনিবার্য ইতিহাসই যদি হয় অধিকার প্রদায়ক তাহলে মানুষের নতুন নতুন অধিকার অর্জনের সংগ্রাম ও তৎসংশ্লিষ্ট নীতিধর্ম প্রতিষ্ঠার প্রয়াসও অনেকটা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
মার্কসবাদী ঘটনা (ফ্যাক্ট) ও মূল্যের (ভ্যালু) দ্বৈততা স্বীকার করেন না। তাঁর মতে মূল্যগুলিও ঘটনা। এবং এই যুক্তিতে তিনি নীতিশাস্ত্রকে সমাজবিজ্ঞানের অংশবিশেষ বলে মনে করেন। ধর্মাধর্ম অর্থনৈতিক বুনিয়াদ (সম্বন্ধ) নির্ভর। মার্কসবাদীদের মতে, সাম্যবাদীর মৌল ধর্ম হল শোষক-শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংহত, সুশৃঙ্খল ও সম্মিলিত সংগ্রাম। যদিও এই সংগ্রামের উদ্দেশ্য শোষণ, দারিদ্র্য ও অসম্মান দূর করা, তথাপি, মার্কসাদীর মতে, এ কথা ভাবা ভুল হবে যে এই উদ্দেশ্য সর্বহারা শ্রেণীর প্রতি কোনও প্রেম-উদ্ভূত। শ্রেণীসংগ্রামের নীতিধর্মে ভাবাবেগের কোনও মৌল স্থান নেই। কারণ ভাবাবেগ, মনোভাব ও ধ্যান-ধারণাদি শ্রেণী-স্বার্থের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ-নির্ভর। মার্কসবাদীর এ কথা যদি যথার্থ, ধর্মাধর্ম বিচারের প্রশ্নটি বাহুল্য হয়ে দাঁড়ায়। বিচারের সঙ্গে দুটি বিষয় গভীরভাবে জড়িত প্রথমত মানদণ্ড এবং দ্বিতীয়ত বিষয়ী-নিরপেক্ষ বিচার্য বিষয়ের নৈতিক গুণাগুণ। আপেক্ষিকতাবাদী মার্কসপন্থীর পক্ষে সকল সমাজের পক্ষে সকল ঐতিহাসিক যুগে প্রযোজ্য একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের অস্তিত্ব স্বীকার করা অসম্ভব। আপেক্ষিকতাবাদীর পক্ষে (ঐতিহাসিক) বিষয়ী-নিরপেক্ষ বিচার্য বিষয়ের নৈতিক গুণাগুণের অস্তিত্ব স্বীকার করাও কঠিন। মার্কসবাদীর সপক্ষে এ-কথা বলা যেতে পারে যে, ঐতিহাসিক প্রগতির কথা যেহেতু তিনি স্বীকার করেন সেই হেতু যুগ নিরপেক্ষ কোনও একটি লক্ষ্যও (সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা) তিনি প্রকারান্তরে স্বীকার করেন, এবং এতে তাঁর আপেক্ষিকতাবাদের ত্রুটি কিঞ্চিৎ লঘু হয়। কিন্তু তখন প্রশ্ন উঠবে যাঁরা ইতিহাসের মার্কসবাদী ব্যাখ্যা গ্রহণ করেন না এবং স্বীকার করেন না যে ইতিহাসের অনতিক্রম্য লক্ষ্য সাম্যবাদী সমাজ তাঁরা আপেক্ষিকতাবাদের সমালোচনার বিরুদ্ধে মার্কসবাদীর যুক্তি কেন স্বীকার করবেন?
মার্কসবাদী বলেন, নীতিধর্মের প্রগতি শিল্পোৎপাদনের পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল ; শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রগতির অন্তরায় ; এই অন্তরায় দূরীভূত হলে শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি দেখা দেবে ; এবং শ্রেণীহীন সমাজের নীতিধর্ম শ্রেণীবিভক্ত সমাজের নীতিধর্মের তুলনায় প্রভূত উন্নতি হবে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজের শোষণ-সংঘাতে মানুষ স্বধর্মভ্রষ্ট, আত্মচ্যুত; মার্কসবাদীর বিশ্বাস, শ্রেণীহীন সমাজে মানুষের এই আত্মচ্যুতির অবসান ঘটবে, – মানুষ পুনরায় স্বধর্মে স্থিত হবে। এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে দুটি যুক্তি প্রদর্শিত হয়েছে। মানুষের আত্মপরিচয় কি ? এই প্রশ্নের সদুত্তর না মিললে আত্মচ্যুতির আলোচনা নিছকই বিতর্কবিলাস। যদিও তরুণ মার্কস এক সময়ে বলেছিলেন যে, মানুষের আত্মপরিচয় অনির্বচনীয়, তথাপি তাঁর রচনাবলির সামগ্রিক চরিত্র থেকে এই বক্তব্যই স্পষ্ট হয় যে, মানবচরিত্র তার সামাজিক, বিশেষত অর্থনৈতিক, সম্পর্ক-নির্ভর। শ্রেণী-সমাজের সৃষ্টি হলেই যদি মানুষ আত্মচ্যুত হয় এবং এই আত্মচ্যুত যদি হয় নীতিবিধায়ক অনিবার্য ইতিহাসেরই দান তাহলে এই আত্মচ্যুতির অবসান ঘটানোর চেষ্টার যুক্তি কি? শ্রেণী সৃষ্টির পূর্বে বা বিলোপের পর মানুষের আত্মস্বরূপ যা ছিল বা দেখা দেবে, তা সে যাই হোক, তাকে কি আমরা আদর্শ বলে গ্রহণ করতে পারি? বোধ হয় না ; কারণ তাতে অনৈতি হাসিক পরাতাত্বিক মানব-আত্মার মতোই প্রকারান্তরে স্বীকৃত হবে, এবং নীতিধর্মের ইতিহাসাপেক্ষিকতার মৌল বক্তব্য খণ্ডিত হবে। এই সমালোচনার অনুক্রমেই দ্বিতীয় সমালোচনাটি উচ্চারিত হয়েছে। তা হল এই শিল্পোন্নয়ন কি নৈতিক উন্নয়নের থেকে অভিন্ন – অর্থাৎ শিল্পোন্নয়ন হলেই কি নৈতিক উন্নয়ন অবশ্যম্ভাবী? নাকি, নৈতিক উন্নয়ন শিল্পোন্নয়নের লক্ষণ মাত্র? যদি শিল্পোন্নয়ন এবং নৈতিক উন্নয়ন অভিন্ন হয় তাহলে নৈতিক উন্নয়ন সাধনের জন্য ভিন্ন প্রচেষ্টা নিরর্থক। অঅর নৈতিক উন্নয়ন যদি শিল্পোন্নয়নেরই লক্ষ্য তাহলেও আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিল্পোন্নয়ন। ফলত (একটি অতি সংকীর্ণ প্রান্তিক তাৎপর্য ছাড়া) নৈতিক প্রচেষ্টার বিশেষ কোনও তাৎপর্য মার্কসবাদের সামগ্রিক কাঠামোয় স্বীকৃতি লাভ করতে পারে না। মানুষের আত্মচ্যুতির অবসান ঘটানো মার্কসবাদীর সতন্ত্র কোনও নৈতিক লক্ষ্য বলে পরিগণিত হতে পারে না।
মার্কসবাদীর মতে, নীতিধর্মের ইতিহাস শাসকশ্রেণীর ‘আইডিওলজি’ মাত্র। এই যুক্তি অনুসরণ করে সমালোচক বলতে পারেন মার্কসীয় ধর্মাধর্ম বিচারও একটি বিজয়ী (সর্বহারা) শ্রেণীর আইডিওলজি বিনা কিছু নয়। নীতির ক্ষেত্রে ডারউইনবাদীর বক্তব্য যে বিজয়ী তার আচরিত ধর্মই নীতিধর্ম। এ প্রসঙ্গে মার্কসবাদীর বক্তব্য ডারউইনবাদীর মতো হলে আভ্যন্তরীণ সংগতি বজায় থাকত। কিন্তু তাতে যে গুরুতর আপত্তি সৃষ্টি হবে তা ভেবে মার্কসবাদী তাঁর বক্তব্য কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে বললেন, সর্বহারা শ্রেণীর আইডিওলজি যে কোনও শ্রেণীর আইডিওলজি থেকে স্বতন্ত্র। সর্বহারা শ্রেণীর আইডিওলজিতে সত্য চৈতন্যের প্রকাশ ; অন্য সকল আইডিওলজি মিথ্যা চৈতন্যের প্রকাশ। চৈতন্যের এই মিথ্যাত্ব যুগসীমার মধ্যে প্রমাণ করা মার্কসবাদীর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ যে শ্রেণী যে রকম শিল্পোৎপাদনব্যবস্থা বহাল রাখে সেই যুগের নীতিধর্ম সেই শ্রেণীর আইডিওলজিই ঘোষণা করবে। পক্ষান্তরে, আপেক্ষিকতাবাদী মার্কসপন্থীর পক্ষে যুগ-নিরপেক্ষ আইডিওলজির কথা বলা ঐতিহাসিক বস্তুবাদ-বিরোধী এবং আভ্যন্তরীণ সংগতি-বর্জিত। মার্কসীয় চিন্তার এই অতি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে মার্কস ডারউইনপন্থী না হয়ে হেগেলপন্থী হয়ে গেলেন। হেগেল মনে করতেন, ইতিহাসের সকল যুগের, সকল উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের আত্মপ্রকাশ ক্রমেই (অনিবার্যভাবে) স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। মার্কসবাদীর মতের মধ্যেও এই বক্তব্য প্রচ্ছন্ন যে, শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস শ্রেণী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাম্যবাদী সমাজ অভিমুখে অনিবার্য ধাবমান এবং যে যুগে যে শ্রেণী এই চূড়ান্ত লক্ষ সম্বন্ধে যত বেশি সচেতন হতে পারেন সেই যুগে সেই শ্রেণীর চৈতন্যকে তত বেশি সত্যময় বলে মানতে হবে। বলা বাহুল্য, মার্কসবাদী এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করবেন না। কিন্তু অন্যথায় সর্বহারা শ্রেণীর চৈতন্য কেন যে সকল শ্রেণীর চৈতন্যের তুলনায় বেশি সত্যময় হবে তা বোঝা দুষ্কর।
সর্বহারা শ্রেণী ছাড়া অন্য সকল শ্রেণীর বিরুদ্ধে মার্কসবাদী মিথ্যা চৈতন্য এবং তদ্ভূত নীতিধর্মের যে সমালোচনা করেন তার পূর্ব-প্রকল্প (প্রিসাপোজিশন) হল যে, ওই সব শ্রেণী ইতিহাসের শেষ লক্ষ্য পূর্বাহ্নে বুঝতে পারে নি। এই পূর্বপ্রকল্পের পশ্চাদভূমিতে রয়েছে এই প্রত্যয় যে, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অভ্রান্ত।
ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি।
মার্কসবাদীর মতে, ইতিহাসের প্রকৃতি ও গতি (তরঙ্গ) একই নিয়ম নিয়ন্ত্রিত। উদ্দেশ্যসাধনের জন্য সামাজিক মানুষের কর্মাবলিই হল ইতিহাস। উদ্দেশ্যহীন মনুষ্য-কর্ম ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় নয়। মনুষ্য কর্ম মনুষ্য প্রকৃতি নির্ভর। মনুষ্য প্রকৃতি অর্থনৈতিক সম্পর্কনির্ভর। অর্থনৈতিক জীবনের পশ্চাতে রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। ইতিহাসের প্রাকৃতিক পশ্চাৎপট উল্লেখযোগ্য না হলেও অনস্বীকার্য। মার্কস মনে করতেন, যে- সকল অর্থনৈতিক গতির নিয়ম দ্বারা ইতিহাসের রূপ ও রূপান্তর নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সেই সব নিয়মগুলি বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলির মতোই নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য। তাঁর মতে, প্রকৃতিবিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞান মূলত একই নিয়মাবলির অধীন। এ কথার পরোক্ষ তাৎপর্য হল প্রাকৃতিক ঘটনাবলি যেমন মানুষের ইচ্ছা-নিরপেক্ষ, সামাজিক ঘটনাগুলিও প্রায় তেমন। প্রায় তেমন, কিন্তু ঠিক তেমন নয়। এই সীমিত পার্থক্যের মূলে রয়েছে মানুষের প্রযত্ন ও কর্মের সীমিত স্বাধীনতা। এ কথা ভাবলে ভুল হবে যে, মার্কসবাদী ইচ্ছার স্বাধীনতায় অবিশ্বাসী। কোনও দার্শনিকই স্বীকার করেন না যে, তাঁর বক্তব্যে মনুষ্য-স্বাধীনতার স্বীকৃতি নেই। আসল প্রশ্ন হল স্বাধীনতার কোন অর্থে তিনি বিশ্বাসী ?
ইতিহাস ও স্বাধীনতার প্রশ্ন দুটি ভিন্ন হলেও ভিকো ও হেগেল থেকে শুরু করে মার্কস, ক্রোচে ও টয়েনবি অনেকেই এক সঙ্গে আলোচনা করেছেন। মার্কস ব্যতীত আর ক’জনই বিজ্ঞান থেকে ইতিহাসের, প্রকৃতি থেকে মানুষের, স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী। মার্কসের ইতিহাসচিন্তার বিজ্ঞানধর্মী প্রেরণা জুগিয়েছেন কোঁত, মিল ও বার্কনে। ইতিহাস ও স্বাধীনতার সম্পর্কটি দু’ভাবে বোঝা যেতে পারে – স্থিতির ও গতির দিক থেকে। স্থিতির দিক থেকে প্রশ্নটি এইভাবে তোলা যায় স্বাধীনতার প্রাথমিক আধার কি ব্যষ্টি, নাকি সমষ্টি? এই প্রশ্নের উত্তরে হেগেল কোঁত ও মার্কস বলবেন, সমষ্টি, আর বাকি মিল ও ক্রোচে বলবেন ব্যষ্টি। অথচ মিল কোঁতের এবং ক্রোচে হেগেলের অনুরাগী। গতির দিক প্রশ্নটি এইভাবে তোলা যায় মানুষ কি তার ইচ্ছার স্বাধীন শক্তি দ্বারা ইতিহাসের গতি প্রতিহত বা পরিবর্তন করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরে মিল ও ক্রোচে বলবেন, হ্যাঁ, অনেকটাই পারে, আর মার্কস বললেন হ্যাঁ, সামান্যই। মানুষ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যে শ্রম করে সেই শ্রমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ। এমনি করেই প্রকৃতি বিজয়ী মানব-শ্রম হয় ইতিহাসধারার নিয়ামক। প্রকৃতি-মানব দ্বন্দ্ব যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে তাতে এই দ্বন্দ্ব রূপান্তরিত হয় শ্রেণীদ্বন্দ্বে; এই দ্বন্দ্বের পরিশেষে নতুন রূপে আবার দেখা দেবে প্রকৃতি-মানব দ্বন্দ্ব, সাম্যবাদী সমাজ।
মার্কসের মতে ইতিহাসের ধারায় কয়েকটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ লক্ষ করা যায়-আদিম সাম্যবাদ, সামন্ততন্ত্র, ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। শেষ তরঙ্গ সাম্যবাদ। ইতিহিাসের তরঙ্গ-তত্ব নতুন কিছু নয়। নতুন হল এই তরঙ্গের কারয়িত্রী শক্তি সম্বন্ধে মার্কসের বক্তব্য। ইতিহাস শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। শ্রেণীসংগ্রামই ইতিহাসে তরঙ্গ সৃষ্টির কারণ। প্রশ্ন উঠতে পারে শ্রেণীহীন অর্থাৎ শ্রেণীসংগ্রামহীন ইতিহাস কি সম্পূর্ণ নিস্তরঙ্গ হবে? মার্কসের বক্তব্য মানবের সঙ্গে প্রকৃতির দ্বন্দ্ব শ্রেণীহীন সমাজেও তরঙ্গ সৃষ্টি করবে। তরঙ্গ-তত্ব সম্বন্ধে অন্য অনেক প্রশ্নই তোলা হয়েছে। সকল সমাজের ইতিহাসেই কি নির্দিষ্ট সংখ্যক তরঙ্গ পরিদৃষ্ট হয়? এই তত্বটি কি ইতিহাস নির্ভর, নাকি ইতিহাস-নিরপেক্ষ? অনাগত ইতিহাস কি কোনওমতেই এই তত্ববিরোধী হতে পারবে না? এ-কথা জোর করে বললে কি মার্কসবাদ অনৈতিহাসিক ও পরাতাত্বিক দোষে দুষ্ট হবে না? মার্কসবাদী ইতিহাসতত্ব কি বিবরণমূলক নাকি ভাষ্যমূলক? বিবরণমূলক বক্তব্য তো সর্বদাই ভ্রমাত্মক প্রমাণিত হবার সম্ভাবনাপূর্ণ ; সেক্ষেত্রে মার্কসবাদী বক্তব্য অনাগত ভবিষ্যতেও সত্য বিবেচিত হবে – এই দাবি কি অবৈজ্ঞানিক নয়? আর ভাষ্যমূলক তত্ব যদি বিরোধী সাক্ষ্য প্রমাণাদিকে সর্বদা ভাষ্যান্তরে ঘটিয়ে সপক্ষে প্রদর্শন করাতে পারে তাহলে সেই ভাষ্য কি শূন্যগর্ভ এবং সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক নয়? এই প্রশ্নগুলির মধ্যে যে সমালোচনা প্রচ্ছন্ন রয়েছে তা একটু পরিষ্কার করে বলা যাক।
একটি যুগের বা দেশের ইতিহাস আরেকটি যুগের বা দেশের ইতিহাসের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট অবশ্যম্ভাবী সম্পর্কে আবদ্ধ, এমন কথা বলায় অনেক অসুবিধা রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট স্থান বা কাল সম্পর্কে আমরা যে অস্তিত্ববাচক (এক্সিস্টেনশিয়াল) উক্তি করি, তার সঙ্গে অপর একটি নির্দিষ্ট স্থান বা কাল সম্পর্কে অনুরূপ যে উক্তি করি এতদুভয়ের মধ্যে কোনও (লজিকাল) সম্বন্ধ নির্ণয় করা অসম্ভব। যদি তা করতে হয় তাহলে মানতে হবে যে উভয় উক্তিই একটি সাধারণ সত্যের বা নিয়মের প্রকাশ। ইতিহাসে এই রকম সাধারণ নিয়ম আছে দেখানো খুব কঠিন। যদি অতীত ইতিহাস থেকে আরোহী অনুমানে কোনও সাধারণ নিয়ম দাঁড় করানোও যায়, তা থেকে এ কথা বলা যাবে না যে, ভবিষ্যতেও এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। অথচ পরিকল্পনার জন্য ভবিষ্যৎবাণীর জন্য এমন একটি সাধারণ নিয়ম (মার্কসের ভাষায় অর্থনৈতিক গতির নিয়ম) আবশ্যক।
এই বিষয়ে অনেক সমালোচক মার্কসবাদীর বক্তব্য ও আচরণে কিছু অসংগতি আছে বলে মনে করেন। তাঁদের জিজ্ঞাস্য হল, ইতিহাস যদি নির্দিষ্ট তরঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে অনিবার্য গতিতে স্বীয় লক্ষ্যে ধাবিত হবেই তাহলে পরিকল্পিত অর্থনীতি ও রাজনীতির উপর মার্কসবাদীরা এত গুরুত্ব আরোপ করেন কেন? তাহলে কি আমরা এই বুঝব যে, মার্কসবাদীরা ইতিহাসের ঘটনাশ্রয়ী বর্ণনা দেন না, আদর্শাশ্রয়ী ভাষ্য দেন মাত্র, এবং কার্যক্ষেত্রে সেই ভাষ্যও মানেন না? কোনও কোনও সমালোচক সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির ইতিহাসের যে বিভিন্ন সংস্করণ বেরিয়েছে তাতে একই ঘটনার যে বিভিন্ন বর্ণনা প্রকাশিত হয়েছে তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে এই রকম সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে ওই সব ইতিহাস হয়তো ঘটনাশ্রয়ী নয়, ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের স্বার্থানুকূল ভাষ্য মাত্র। কোনও কোনও সমালোচকের বক্তব্য, মার্কসবাদী ইতিহাসতত্ব উৎসাহদায়ক শ্রেণীসংগ্রমের প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু ঘটনার নিরপেক্ষ বর্ণনাবর্জিত। ইতিহাস যদি হয় নীতিবিধায়ক এবং ইতিহাসের অনিবার্য গতি যদি হয় সাম্যবাদী সমাজ অভিমুখী, তাহলে মার্কসবাদী সংগতভাবেই অনুগামীদের উৎসাহ দিয়ে বলতে পারেন, ‘ইতিহাস আমাদের স্বপক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে উল্লিখিত যদি দুটিকে নিয়ে। যে ইতিহাস সর্বদেশে সর্বকালে বিবদমান দু’টি (মাত্র দু’টি?) পক্ষের একটির স্বপক্ষে সাক্ষ্য দেয় সেই ইতিহাসে (কিংবা যে তত্ব অনুসারে সে ইতিহাস রচিত হয় তাতে ) কোনও গুরুতর গলদ আছে।
‘সব ইতিহাসই শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস’- মার্কসবাদীর এই বক্তব্য অতি সরল। এই বাক্যটিকে শূন্যগর্ভ (টটোলজিকাল) সংজ্ঞাও বলা যেতে পারে। কোনও ইতিহাসই যদি শ্রেণীসহযোগিতার ইতিহাস না হয় সে ক্ষেত্রে শ্রেণীসংগ্রামের চরিত্রের উল্লেখ করা চলে ইতিহাসে কি? এই সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের কোনও হ্রাসবৃদ্ধি হয় না। দ্বিতীয়ত, ইতিহাসে শ্রেণীসহযোগিতার কোনও উদাহরণ নেই বললে অনেকেই তা স্বীকার করবেন না। কোনও কোনও সমালোচক বলেন, উদাহরণ নির্ণায়ক তত্ব যদি একপেশে হয় তাহলে বিরোধী উদাহরণ শুধু দুর্লভ নয়, সম্পূর্ণ অলভ্য। সর্বোপরি বলা হয় যে, শিল্পোন্নত সমাজে শ্রেণীবিন্যাস মার্কস যেমনটি ভেবেছিলেন তেমনটি হয়নি। শোষক ও শোষিত সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী ও বহির্ভূত এই দুটি শ্রেণীতে সকল সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে – মার্কসের এই ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়নি। বর্তমান ধনতান্ত্রিক সমাজের বিন্যাস অত্যন্ত জটিল। মাত্র দুটি শ্রেণী-সংবলিত মার্কসীয় মডেলে তার কার্যাবলির, গতি-প্রকৃতির সুষ্ঠু ব্যাখ্যা অসম্ভব। শিল্পোন্নত সমাজের মানবস্বার্থ দ্বিধা নয়, বহুধাবিভক্ত। তাছাড়া বহুধাবিভক্ত মানবস্বার্থের (তার মধ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ) দ্বন্দ্বকে দূর ক’রে সংহতি-বিধায়ক সামাজিক শক্তি ও সংস্থাও তো গড়ে উঠেছে। মার্কসবাদী তাঁর মৌল ইতিহাসতত্বের সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে বলেন, ‘সব শক্তি ও সংস্থাই শাসকশ্রেণীর স্বার্থসেবী।’ এ-বক্তব্য যদি হয় ইতিহাসের সংজ্ঞার মতো শূন্যগর্ভ (টটোলজিকাল) তাহলে বিতর্ক হবে বিতণ্ডা মাত্র। আর যদি বিভিন্ন দেশের ঘটনা দেখে সিদ্ধান্ত করতে হয় তাহলে স্বীকার করতে হয় যে, অনেক ধনতান্ত্রিক দেশে (এবং কোনও কোনও সমাজতান্ত্রিক দেশেও) অন্তত কিছু শক্তি ও সংস্থা আছে যা শ্রেণীস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে আন্তঃশ্রেণী সহযোগিতা বা সহাবস্থানের চেষ্টা করে। মার্কসবাদী নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন না যে, সমাজতান্ত্রিক দেশে (যেখানে এখনও শ্রেণী বর্তমান) আইনের শাসন একচক্ষু বা পক্ষপাতদোষে দুষ্ট। যারা বুদ্ধিজীবী, বিশেষত যারা শিল্পীসাহিত্যিক, তাদের সৃজনশীল বক্তব্য শ্রেণীস্বার্থের প্রতিধ্বনি নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, সে-সব ব্যক্তির শ্রম ধ্যান-ধারণাসংক্রান্ত তাদের বক্তব্য শাসক শ্রেণীর সমালোচনাপূর্ণ। ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি মূলত মানুষের ধ্যান-ধারণা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়; তার অর্থ এই নয় যে, ঐ ধ্যান-ধারণাগুলি সামাজিক ঐতিহ্য প্রভাবিত নয়। ধ্যান-ধারণাগুলি ইতিহাসের স্রষ্টাও বটে, সৃষ্টিও বটে। জীবনের বাস্তব ভিত্তি ও চৈতন্যের নানা প্রকাশের মধ্যে নিয়ত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা দ্বন্দ্ব চলছে। এই প্রক্রিয়া উভয়মুখী। মার্কসের বক্তব্য, এই উভয়মুখী প্রক্রিয়ার বাস্তব ভিত্তির প্রভাবই সমধিক। অনেক বস্তুবাদী সমালোচক দেখাতে চেয়েছেন যে, বস্তুবাদী হলেই যে তাকে বস্তু-চৈতন্যের দ্বন্দ্বে বস্তুর আধিপত্য মানতে হবে তা নয়। সত্তা হিসাবে বস্তু চৈতন্যের তুলনায় আদিম হতে পারে, কিন্তু শক্তি বা ক্রিয়াশীলতার দিক থেকে চৈতন্য সমধিক চৈতন্যশালী। এই বক্তব্য থেকে বিশ্লেষণ করে এ-ও দেখানো যেতে পারে যে, কায়িক শ্রম সর্বদাই যে বৌদ্ধিক শ্রমের তুলনায় অধিক প্রভাবশালী হবে এই যুক্তি অচল। সমাজতান্ত্রিক দেশের শাসকবর্গের শ্রেণীগত পরিচয় বিশ্লেষণ করেও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া শক্ত যে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সম্পূর্ণ করায় যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন বা দিচ্ছেন তাঁরা প্রধানত কায়িক শ্রমজীবী শ্রেণী-উদ্ভূত। শ্রমিকশ্রেণীর সংজ্ঞা শূন্যগর্ভ না করলে এদের সকলকে শ্রমিক বলা কঠিন। আর সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব অ-শ্রমিক শ্রেণী পালন করতে পারবে,- এই বক্তব্য গ্রহণে তো মার্কসবাদীর আপত্তি তীব্রতর হবে।
মার্কস ভাবতেন যে, ধনতান্ত্রিক সমাজের মানুষেরা ক্রমেই দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত (পোলারাইসড) হয়ে যাবে এবং শোষিত শ্রেণী আপেক্ষিকভাবে আরও শোষিত (পপারাইসড) হবে; এর ফলে শেষপর্যন্ত দুটি শ্রেণীর চূড়ান্ত সংগ্রাম হবে ও তার মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হবে। শান্তিপূর্ণভাবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, পোলারাইজেশন সম্বন্ধে মার্কসবাদী তত্বের বিরুদ্ধে দুটি যুক্তি ভেবে দেখবার মতো। প্রথমত, যদি একথা স্বীকার করা হয়, যা ঘটনা দৃষ্টে অনেকেই এখন স্বীকার করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী অর্থনৈতিক শক্তিনিচয়কে নিয়ন্ত্রণাধীন রাখতে সমর্থ, তাহলে শোষক ও শোষিত শ্রেণী অনিবার্যভাবে পোলারাইসড হবে এমন নিয়মিতবাদে বিশ্বাস করার পর্যাপ্ত হেতু নেই। দ্বিতীয়ত, বিচারবিভাগের স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীন সংবাদপত্র, শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এবং সর্বোপরি জাগ্রত জনমত বিরোধী স্বার্থের সমন্বয়ে সার্থক ভূমিকা গ্রহণ করেছে। পপারাইসেশন সম্বন্ধে মার্কসবাদী তত্বের বিরুদ্ধে কয়েকটি যুক্তি ভেবে দেখা দরকার। প্রথমত, জোয়ান রবিনসনের মতে, মার্কস এই সম্ভাবনার কথা ভাবেননি যে, কোনও কোনও সামাজিক অবস্থায় পরিবর্তনশীল মূলধন ও উদ্বৃত্ত মূল্যের আনুপাতিক সম্বন্ধ (অথবা শোষণের হার) অল্পবিস্তর স্থিরই থাকবে, অথচ মুনাফা নিম্নগামী হবে। উৎপাদন বাড়লে তাহলে মজুরি বাড়বে। (মার্কসের বিরুদ্ধে এই যুক্তি অবশ্য উন্নতিশীল দেশের ক্ষেত্রে ততটা প্রযোজ্য নয়, যতটা প্রযোজ্য শিল্পোন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে।) দ্বিতীয়ত, মার্কসের এই ধারণাও অভ্রান্ত নয় যে, শ্রেণী হিসেবে শ্রমিকদের মজুরি কখনওই স্থায়ীভাবে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নূন্যতম স্তরের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না, কারণ তাহলেই নাকি মুনাফার হার হ্রাস পাবে, আর সেক্ষেত্রে মূলধন বিনিয়োগ হ্রাস পেতে থাকবে। ফলত অর্থনৈতিক সংকট ঘনায়মান হবে। মার্কসের ইতিহাস-তত্বের মধ্যে যে সামগ্রিক অবশ্যম্ভাবিতার কথা বলা হয়েছে অর্থনৈতিক সংকটের অনিবার্যতা-তত্বে তার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। যে-উপাত্তের উপর মার্কসের ইতিহাসতত্ব প্রতিষ্ঠিত সেই উপাত্তের উপরেই মার্কসের মূল অর্থনৈতিক তত্বও প্রতিষ্ঠিত। উপাত্তটি হল মানুষ সামাজিক উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় ইতিহাসের সাধারণ নিয়মগুলির কার্যকারিতা মৌলিকভাবে পরিবর্তন করতে অসমর্থ। এই উপাত্তটি খণ্ডন করবার জন্য কাল পপার ও আইসারা বার্লিন যে-সব যুক্তি প্রদর্শন করেছেন তা মার্কসবাদের জিজ্ঞাসু পাঠকমাত্রেরই অবশ্যপাঠ্য।
মার্কসবাদ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
মার্কস তাঁর নিজের রচনাবলিকে বৈজ্ঞানিক বলে দাবি করতেন। মার্কসের রচনায় ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে পশ্চিম ইয়োরোপে যে-ধনতন্ত্র প্রচলিত ছিল তার অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বিশ্লেষণ এবং তৎকালীন ঘটনাশ্রয়ী কিছু কিছু অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাধারণ নিয়ম পাওয়া যায়। ধনতান্ত্রিক সমাজের অন্তনির্হিত ত্রুটি কোথায় এবং তার বাস্তবিক ও সম্ভাব্যপরিণাম সম্পর্কে তাঁর মতামত বিজ্ঞান-বুদ্ধির উজ্জ্বল উদাহরণ। একটি তত্বের বৈজ্ঞানিক চরিত্র নিম্নলিখিতভাবে বিচার করা যেতে পারে ১. তত্বের মধ্যে যৌক্তিক সংগতি আছে কি না; ২. তত্বের দ্বারা যে-জাতীয় ঘটনার ব্যাখ্যা করতে চাওয়া হয়েছে সে-জাতীয় ঘটনার (বস্তুসত্তা রক্ষা ক’রে – অর্থাৎ বিনা ভাষ্যে) কতটা ব্যাখ্যা সম্ভব হচ্ছে; ৩. বাস্তব ঘটনা দ্বারা তত্তটি কতটা পরীক্ষাযোগ্য (টেস্টেবল) সমর্থনযোগ্য (কনফার্মাবল) নয়; ৪. তত্বটি কত সরল এবং ৫. কতো সত্য। প্রথম ১. বিচারে যে মার্কসের চিন্তা উত্তীর্ণ তা অনেক সমালোচকই স্বীকার করেন। তবে যাঁরা মনে করেন দ্বান্দ্বিক যুক্তিশাস্ত্র – তা হেগেলীয়ই হোক কিংবা মার্কসীয়ই হোক – চিন্তার একটি মৌল নিয়ম (স্ব-বিরোধের নিয়ম) ভঙ্গ করে এবং সে-জন্য অন্তঃসারশূন্য, তাঁরা অবশ্য প্রথম বিচারেও মার্কসবাদকে উত্তীর্ণ স্বীকার করতে গর-রাজি। তাঁদের বক্তব্য প্রত্যেক ‘হাঁ’ -এ যদি তার ‘না’ থাকে এবং ‘না’ -এ যদি তার ‘হাঁ’ থাকে, তাহলে ইতি-নেতির পার্থক্য করা দুষ্কর এবং পার্থক্য যা সচরাচর টানা হয় তা এমন এক পরাতাত্বিক উপাত্তের উপর নির্ভরশীল যে সেই উপাত্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরীক্ষণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয় বিচার প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা (এক্সপ্লানেশন) ও ভাষ্যের (ইন্টারপ্রিটেশন) মধ্যে পার্থক্য মনে রাখা দরকার। অনেক সময় দেখা যায় যে, একটি তত্ব যে ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে পারবে ভাবা গিয়েছিল বস্তুত তা পারছে না। অর্থাৎ ঘটনার সম্ভাব্য (পূর্ব-কল্পিত) তাত্বিক রূপের সঙ্গে বাস্তব রূপের যদি অসংগতি দেখা দেয় তাহলে বুঝতে হবে তত্বটি (অন্তত অংশত) ভুল। তত্ব-বিরোধী ঘটনা সন্দর্শনে বৈজ্ঞানিক তাঁর তত্বের ভুল অংশ পরিবর্তন করে তত্বটি উন্নততর করার চেষ্টা করেন এবং করার সময়ে অবশ্যই লক্ষ রাখেন যাতে ১. শর্তটি (অর্থাৎ যৌক্তিক সংগতি) না ক্ষুণ্ণ হয়। মার্কসবাদের বিরুদ্ধে একটি সমালোচনা হল যে, বিরোধী ঘটনার সাক্ষ্য দেখেও মার্কসবাদী বিজ্ঞানীসুলভ শিক্ষার্থীর মনোভাব নিয়ে তাঁর তত্বের ভুল স্বীকার ও মূল তত্বের পরিবর্তন করতে নারাজ। তত্বের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার অসংগতি দেখা দিলে মার্কসবাদী নিম্নলিখিত দুটির একটি (কখনও কখনও দু’টিই) কৌশল অবলম্বন করেন। ক. ঘটনার নতুন ভাষ্য দেন; এবং তার ফলে তত্ববিরোধী ঘটনা তত্বানুকূল বলে, প্রমাণিত হয়ে যায়। খ. মূল তত্বকে অপরিবর্তিত রেখে মার্কসবাদী বিরোধী ঘটনাগুলিকে তত্বানুকূল দেখানোর জন্য একের পর এক নতুন নতুন তত্ব-কল্পনা (অ্যাড হক হাইপথেসিস) মূল তত্বের সঙ্গে সংযোজন করে দেন। এর ফলে প্রায়শই তত্বের যৌক্তিক সংগতি ১. এবং সরলতা ৪. ক্ষুণ্ণ হয়। যে-তত্বের মধ্যে সংগতি (কনসিসটেন্সি) এবং সরলতা (সিমপ্লিসিটি) নেই সেই তত্বকে ক্রমাগত সমর্থন (কনফম) করা যায় কিন্তু ৪. পরীক্ষা (টেস্ট) করা অসম্ভব। আর সে-ক্ষেত্রে সত্যাসত্যবিনিশ্চয়ের প্রশ্নটিও ৫. নিতান্তই একপেশে ব্যবহার নির্ভর হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক সত্যও (অঙ্কসহ) শ্রেণীস্বার্থের ভাষ্য-নির্ভর।
মার্কসবাদ যে উপরিউক্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির শর্তগুলি লঙ্ঘন করে থাকেন তা ধনতন্ত্রের গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে মার্কসবাদী তত্বের ইতিহাস বিশ্লেষণ ক’রে অনেক সমালোচক দেখাবার চেষ্টা করেছেন। একচেটিয়া ধনতন্ত্র স্থাপিত হবার পূর্ব থেকে পর পর্যন্ত ধনতন্ত্রের গতিপ্রকৃতিতে যে-সব বিরোধ বা সংকট অনিবার্যভাবে দেখা যাবে বলে মার্কসবাদী তত্ব অনুসারে ভাবা গিয়েছিল তা বস্তুত দেখা দেয়নি। ধনতন্ত্রের যে-সব সমস্যা ছিল এবং আছে তার মার্কসবাদেতর সদ্ব্যাখ্যা প্রদত্ত হয়েছে। একচেটিয়া ধনতন্ত্র সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র নেবেই – এই তত্বকে সমর্থন করাতে গিয়ে ‘একচেটিয়া ধনতন্ত্র’ ও ‘সাম্রাজ্যবাদ’ পদ দুইটির সংজ্ঞায় একাধিকবার পরিবর্তন ঘটাতে হয়েছে। তাছাড়া ‘ধনতন্ত্র’ ও ‘সাম্রাজ্যবাদের’ প্রকৃত স্বরূপ কী এই প্রশ্নের উত্তরদায়ক ভাষ্যেও মূল তত্বতে বাঁচাবার জন্য বার বার পরিবর্তন ঘটাতে হয়েছে। সাম্রাজ্য চলে যাবার পরেও প্রাক্তন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি যে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার আভ্যন্তরিণ সমস্যা (ভাষান্তরে সংকট) কাটিয়ে উঠতে পারবে এ সত্য মার্কস বা লেনিন ভাবেননি। এটা তাঁদের অদূরদর্শিতার প্রমাণ নয়। এটা ইতিহাসস্রষ্টা মানুষদের বুদ্ধি ও শ্রমের ফলশ্রুতি। বর্তমানে যে সমাজে ব্যবস্থাকে মার্কসবাদী ‘রাষ্ট্রীয় ধনতন্ত্র’ বলছেন আর গণতন্ত্রী-সমাজতন্ত্রী বলেছেন ‘জনকল্যামূলক রাষ্ট্র’ সে সমাজব্যবস্থার কথাও মার্কস বা লেনিনের পক্ষে ভাবা সম্ভব ছিল না। তথাপি ‘তাঁদের মূল তত্ব আজও সত্য’ বলার পশ্চাতে শ্রেণী স্বার্থবুদ্ধি থাকলেও বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি নেই। অবশ্য যদি বলা হয় ‘বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি ও শ্রেণী-স্বার্থপ্রণোদিত’ সেকথা আলাদা। যে মূল তত্বের মূল কখনোই খণ্ডিত হয় না, কেবলি সমর্থিত হয়, সে মূল পরাবিদ্যার ( মেটাফিজিক্যাল) বিষয় হতে পারে, বৈজ্ঞানিক বিষয় হতে পারে না। মার্কসবাদকে অভ্রান্ত প্রতিপন্ন করার জন্য পরাবিদ্যার নিরাপদ উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। মার্কস ও লেনিনকে বৈজ্ঞানিক চিন্তাবিদদের আসন থেকে নামিয়ে ভবিষ্যদ্বক্তার অত্যুচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে।
এবং এর ফলে তত্বের দিক থেকেই শুধু সমস্যা দেখা দেয়নি আরও বিপদ দেখা দিয়েছে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে। যে-সব দেশ নিজেদের মার্কসবাদী বলে নিজেদের দাবি করে সেই সব দেশের অগ্রগণ্য নেতারা ক. মার্কসবাদ, খ. সাম্রাজ্যবাদ, গ. মার্কসবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার উপায়, ঘ. অ-মার্কসবাদী (এমনকি মার্কসবাদী) দেশসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক, ঙ. মার্কসবাদী দেশসমূহের মধ্যে ঐক্য প্রভৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে বিরোধী মতে বিভক্ত। মার্কসবাদের একটি মূল তত্ব হল তত্ব ও ব্যবহারের মধ্যে অন্বয়। এই অন্বয় আজ গুরুতরভাবে বিনষ্ট। এই বিনষ্টির জন্য মার্কসের দায়িত্ব সামান্যই। মূল দায়িত্ব মার্কসবাদের সরকারি ভাষ্যকারদের। বিজ্ঞানীকে অভ্রান্ত ভবিষ্যদ্বক্তা রূপে প্রতিপন্ন করার সর্বগ্রাসী সরকারি প্রচেষ্টা শুরু হলে বিজ্ঞান রূপান্তরিত হয় শাশ্বত পরাবিদ্যায়, বুদ্ধিজীবীদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় অতল গূঢ় তত্বের সমর্থনে ভাষ্যের পর ভাষ্য প্রণয়ন, আর তাঁদের মর্যাদার উত্থান-পতন হয় ক্ষমতাসীন সরকারের কৃপা নির্ভর। সত্য যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থের সেবক নয়, সত্য যে সমাজায়ত – মুক্ত জিজ্ঞাসার ঘটনা-নির্ভর উত্তর – এ কথা একাধিক তিক্ত ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মার্কসবাদী মহলের একাংশে তত্বগতভাবে স্বীকৃত ; কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এই তাত্বিক স্বীকৃতির প্রতিফলন এখনও অস্পষ্ট। মার্কসবাদী ঠিকই বলেন যে, ‘সত্য শাশ্বত নয় ; নীতিধর্মও শাশ্বত নয়।’ সত্য ও নীতিধর্মের পরিবর্তনশীলতার মূলে রয়েছে মানব অভিজ্ঞতার ঐতিহাসিক চরিত্র। এই ঐতিহাসিক চরিত্র একদিকে যেমন প্রাকৃতিক বিবর্তন থেকে ভিন্ন, আরেক দিকে তেমনি ভিন্ন কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছা থেকে। সত্য যদি কর্তৃত্বের ইচ্ছা-নির্ভর হয় তাহলে কর্তৃত্বের পরিবর্তন হলেই সরকারি স্তরে সত্যের রূপান্তরণ অনিবার্য হয়ে ওঠে। রূপান্তরিত সত্যের সরকারি ভাষ্য প্রকাশ হতে স্বভাবতই সময় লাগে; সত্যসন্ধীর পক্ষে অন্তর্বর্তীকাল নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যক্তি বিজ্ঞানী যে সত্য লাভ করেন তা যদি সত্যের সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাভ না করে তাহলে শুধু কর্তৃত্বের জোরেই বৈজ্ঞানিক সত্য উপেক্ষিত হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বস্তুত এ রকম ঘটনা মার্কসবাদের ইতিহাসে একাধিকবার ঘটেছে। ঔচিত্য অনৌচিত্যের এই প্রশ্নেও বারবার উপেক্ষিত হয়েছে ধর্মা-ধর্মের শ্রেণীভাষ্যের প্রভাবে।
উপসংহার।
যে মতবাদই মানব জীবনের অনেক দিক সম্পর্কে সুচিন্তিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে সে মতবাদকেই বহু সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। মার্কসবাদও এই সাধারণ সত্যের ব্যতিক্রম নয়। মার্কসবাদের ত্রুটি তার শক্তি ও সাফল্যের অপ্রমাণ নয়। কিন্তু মার্কসবাদের গুরুত্ব শুধু তার ব্যবহারিক শক্তি ও সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাহলে মার্কসবাদকে নাৎসিবাদেরই সমপর্যায়ভুক্ত করা যেত। ইতিহাসের মার্কসবাদী ব্যাখ্যা গ্রহণ না করেও এ কথা বলা যায় যে, মার্কসবাদ দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের এক সুগভীর ঐতিহাসিক প্রয়োজন মিটিয়েছে ও মেটাচ্ছে। মার্কসবাদ ইতিহাসের নিয়তির অবদান নয় ঠিকই ; কিন্তু যে প্রয়োজন মার্কসবাদ মিটিয়েছে তার উপযুক্ত বিকল্প মানুষের মনীষা যথাসময়ে উপস্থাপন করতে পারেনি। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে মার্কসবাদের বিকল্প আজ ধীরে ধীরে দেখা দিচ্ছে। তত্বের ক্ষেত্রে এ বিপ্লব অনেক দিন ধরেই ছিল। মার্কসবাদের বৈশিষ্ট হল এই সত্যকে জনসমক্ষে তুলে ধরা যে, তাত্বিক বিকল্প যদি ব্যবহারযোগ্য বিকল্প না হয় তবে তার মূল্য স্বল্পই। মার্কসবাদীর অসুবিধা হল তার মতবাদে ‘বিকল্প’ মাত্রই বিবদমান কিংবা ভ্রান্ত, এবং তাই বিকল্পই নয়। যদিচ তত্বের স্তরে এ কথা আজ কোনও কোনও মহলে স্বীকৃত যে সমাজতন্ত্রের পথ বহুবিধ, কিন্তু ব্যবহারিক স্তরে এই স্বীকৃতির প্রমাণ খুবই দুর্বল।
৬ষ্ঠ বর্ষ ২-৩ সংখ্যা
(কার্লমার্কস ১৯৬৮)
