মার্কসবাদ ও বিপ্লব – অমিয়ভূষণ চক্রবর্তী
মার্কসের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে এঙ্গেলস বলেছিলেন মার্কসের সব চেয়ে বড় পরিচয় তিনি বিপ্লবী। এঙ্গেলস আরও বলেছিলেন যে ধনতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার পতন ঘটানো, সেই ব্যবস্থা যে রাষ্ট্র-যন্ত্রের জন্ম দিয়েছে তাকে ধ্বংস করা এবং আজকের দিনের শ্রমিকশ্রেণীকে শোষণমুক্ত করাই ছিল মার্কসের জীবনের ব্রত। এঙ্গেলসের মৃত্যুতে লেনিন বলেছিলেন যে ইয়োরাপের শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবের বিজ্ঞান ও কর্মপদ্ধতির সৃষ্টি করেছিলেন দু-জন পণ্ডিত ও যোদ্ধা। মার্কসবাদ মার্কস আর এঙ্গেলসের যৌথ সৃষ্টি। পরে লেনিন, স্তালিন ও মাও-সে-তুং-এর চিন্তা এবং সংগ্রাম এই মতবাদটিকে আরও বিকশিত করে শ্রমিক-শ্রেণীর পরিবেশ ও যুগ-পরিস্থিতির উপযোগী শাণিত অস্ত্র হিসেবে তার সক্রিয়তা অটুট রেখেছে। মার্কসবাদের জন্ম থেকে আমাদের কাল অবধি তার বিস্তৃতির সংক্ষিপ্ত আলোচনা এই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু। মার্কসবাদের জন্মের মূলে কোন প্রেরণা কাজ করেছিল? প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করার প্রেরণা। মার্কসের বিখ্যাত উক্তি এই প্রসঙ্গে স্মরণীয় দার্শনিকেরা জগৎকে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে জগৎটাকে বদলে দেওয়া। মার্কস পূর্বাচার্যদের কথা সবিনয়ে বলেছেন, কিন্তু অবিনীত সত্য কথা যদি বলি তাহলে বলতে হয় যে মার্কসের পূর্বে জগৎ ও জীবনের গতিপ্রকৃতি ও রূপান্তরের সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অন্য কোনও দার্শনিক উপস্থিত করতে পারেননি। সেই বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা মার্কসবাদেরও অবিস্মরণীয় দান। সমাজব্যবস্থাকে বদলাবার কথা কিন্তু মার্কসের বহু যুগ আগে উৎপীড়িত এবং উদার মানুষের মনে জেগেছে। অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অতি প্রাচীন জিনিস। আধুনিক যুগে তা আরও সংহত রূপ নিয়েছে, চিন্তা ও কল্পনাকে আকুল করে তুলেছে। আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার অনগ্রসরতার জন্য শ্রমিকশ্রেণীর সংগঠন ও সচেতনতার দুর্বলতার জন্য সমাজ-কাঠামোর সঠিক বিশ্লেষণ এগোয়নি এবং তাই শুভকামনায় উদ্বেল মনের কল্পনা রঙিন স্বপ্নে মুখর হয়েছে, সমাজে কোন শক্তির জয়ী হবে এবং কোন সংগ্রামের পথে শোষণকে ধ্বংস করবে তার আবিষ্কার ও ব্যাখ্যা সম্ভব হয়নি। যাঁরা সমাজবাদের স্বপ্নই শুধু দেখতেন, রাত্রির অন্ধকার বৃন্ত থেকে ফুটন্ত সকালকে ছিঁড়ে আনবার কথা ভাবতে পারতেন না, সেই ইউটোপিয়ান সোশ্যালিস্ট বা কল্পজগৎ-বিহারী সমাজবাদীরা শ্রমিকশ্রেণীকে দেখতেন এক উৎপীড়িত অসহায় জনসমষ্টি হিসেবে। কেউ কেউ অপেক্ষা করে থাকতেন এক অমিত-বিক্রম মহামানবের জন্য যিনি স্বল্পায়াসে বা অনায়াসে বিশ্বমানবের বন্ধনশৃঙ্খল নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। ইতিহাসের যারা প্রকৃত স্রষ্টা সেই জনতার উপর এই স্বপ্নচারী সমাজবাদীদের কোনও আস্থা ছিল না। মার্কস ও এঙ্গেলসই প্রথম সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে শ্রমিকশ্রেণীর ভূমিকাকে উপলব্ধি করলেন এবং প্রচার করলেন। তাঁরা প্রচার করলেন যে শ্রমিকশ্রেণীই হচ্ছে সেই সামাজিক শক্তি যা সমাজবিপ্লব ঘটিয়ে বহুবাঞ্ছিত রূপান্তরের মাধ্যমে মানুষকে নতুন জীবনে পৌঁছে দিতে পারে।
মার্কসের বিপ্লব-চিন্তা ১৮৪৪ থেকে সুস্পষ্ট রূপ নিতে আরম্ভ করে। তাঁর এই সময়ের লেখা প্রবন্ধে বুর্জোয়া বিপ্লব ও সোশ্যালিস্ট বিপ্লবের সংজ্ঞা তিনি সর্বপ্রথম মোটামুটিভাবে উত্থাপন করেন। হেগেলের দর্শন সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি এই উপলব্ধিতে পৌঁছালেন যে প্রগতিশীল দর্শনের কাজ হচ্ছে ধর্মবিরোধী সংগ্রামকে সেই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে পরিণত করতে হবে যে সমাজব্যবস্থা ধর্মকে জন্ম দেয় এবং লালন করে প্রবল করে তোলে। উপলব্ধি করলেন যে ‘স্বর্গ’ না হয়ে ‘মর্ত’ হোক সমালোচনার বিষয়বস্তু, ধর্মতত্বের সমালোচনার মোড় ঘুরিয়ে তাকে করা হোক রাজনীতির সমালোচনা। মার্কস এই প্রসঙ্গে এ-কথাও বললেন যে সে-সমালোচনাকে করতে হবে জোরদার এবং বৈপ্লবিক। কিন্তু আমাদের সতর্ক করে দেবার জন্য আশ্চর্য স্বচ্ছতার সঙ্গে তক্ষুনি বললেন বিপ্লবী বলপ্রয়োগের প্রয়োজনের কথা। তাঁর সেই উক্তি সমালোচনাসর্বস্ব মেকি বিপ্লবীদের মুখের সামনে উদ্যত তর্জনীর মতো ‘বলাবাহুল্য, সমালোচনা-অস্ত্রটি অস্ত্রের দ্বারা সমালোচনার প্রয়োজন মেটাতে পারে না, বস্তুশক্তিকে বস্তু-শক্তিই পরাজিত করতে পারে, তবে থিয়োরি বা মতবাদও জনতার মনকে আঁকড়ে ধরা মাত্র বস্তু-শক্তি হয়ে ওঠে১।’ প্রশ্ন উঠতে পারে মতবাদ কখন মনকে আঁকড়ে ধরতে পারে? উত্তরে মার্কস বলেছেন যখন মতবাদ জনস্বার্থে সংগ্রামী হয়ে ওঠে। মতবাদের মধ্যে জনসাধারণ তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনগুলোকে প্রতিফলিত দেখলেই সেটাকে আপনার জিনিস বলে জড়িয়ে ধরে। একটা মন-গড়া আইডিয়া বা আদর্শ নিয়ে সামনের দিকে জোর করে এগোতে গেলে কোনও ফল হবে না, যদি-না বাস্তব পরিস্থিতি থেকেই সেই আদর্শের জন্ম হয়। মার্কস বললেন নতুন জীবনদর্শন হবে সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণীর দাবি-দাওযার সংগ্রামের দর্শন-সে-দর্শন সত্যিকার সার্থকতায় তখনই পৌঁছাবে যখন সর্বহারারা নিশ্চিহ্ন হবে, অর্থাৎ তারা যখন হবে সর্বজয়ী। দর্শনের বাস্তব হাতিয়ার হচ্ছে সর্বহারারা আর সর্বহারাদের মনের হাতিয়ার হচ্ছে দর্শন।
তরুণ মার্কসের মনের এই দুর্নিরীক্ষ্য ভবিষ্যতের মর্মভেদের প্রয়াস সমাজচিন্তায় নতুন আলোকপাত। তাঁর পথের সবটা তখনও আলোকিত হয়ে ওঠেনি। আলোছায়ার মধ্যে পথের রেখা ফুটে উঠতে শুরু করেছে মাত্র। বিপ্লবী মার্কসের আবির্ভাব হয়েছে। জনসাধারণ এবং বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণীকে সম্বোধন করে মার্কস সমাজ বদলাবার প্রস্তাব ও নির্দেশ তাদের সামনে উপস্থিত করেছেন।
মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের বিপ্লবত্বকে আরও বিকশিত করে তুললেন তাঁদের পবিত্র পরিবার গ্রন্থটিতে। বার্লিন থেকে প্রকাশিত ব্রুনো বাউয়ার ও তাঁর ভাইদের এবং তাঁদের সহগামীদের লেখার জবাব হিসেবে পবিত্র পরিবার বইখানি বাউয়ার-গোষ্ঠীকে বিদ্রুপ করল এবং সুযুক্তিপূর্ণ কঠোর সমালোচনা করল। জবাবটি অনেক দেরিতে বার হয় বলে কেউ কেউ বলেন যে এ যেন মরা গাধাকে পেটানোর ব্যাপার। কিন্তু বাউয়াররা তেমন জমাতে পারেননি বলে তাঁদের মরা গাধা বলা বোধ হয় একটু বাড়িয়ে বলা, আর জাতীয় গাধা যে সহজে মরে না আধুনিক চিনের অতন্দ্র সাংস্কৃতিক বিপ্লব তার প্রমাণ। নতুন দর্শনের ওই সংগ্রামী ভূমিকা কত যুগ ধরে যে চালাতে হবে তা আজকের দিনের চিনও সঠিকভাবে বলতে পারছে না, মার্কসের পক্ষে সে-আমলে বলা তো আরও অসম্ভব ছিল। মার্কস-এঙ্গেলস দেরিতে হলেও জবাব দিয়ে ঠিকই করেছিলেন। সে-জবাবের মধ্য দিয়ে মার্কসবাদের বিপ্লব সম্পর্কে বক্তব্য আগের চাইতে আরও খানিকটা এগিয়েছিল।
ব্রুনো বাউয়ারের দল বলেছিলেন যে আধুনিক কাল পর্যন্ত ইতিহাসের সব বড়ো বড়ো আন্দোলন শুরু থেকেই বিপথে পরিচালিত হয়েছে এবং ব্যর্থতার অভিশাপ বহন করেছে, কারণ জনতা সেগুলোতে উৎসাহ নিয়ে জড়িয়ে পড়ে অথবা পরম আগ্রহে সেগুলোকে সমর্থন করে। অথবা সেই আন্দোলনগুলোর দুঃখময় অপমৃত্যু ঘটে এই জন্য যে, যে-ধারণাকে কেন্দ্র করে তারা গড়ে উঠেছিল সে-ধারণাকে একটু ভাসা-ভাসা ভাবে উপলব্ধি করলেই হত, অর্থাৎ সেই আন্দোলনগুলো নির্ভর করেছিল জনতার অবুঝ হাততালির ওপর। এই পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশ্লেষণ থেকে বাউয়াররা এই সত্যে পৌঁছেছেন বলে মনে করেন যে ‘বুদ্ধি’ আর ‘জনতা’ পরস্পরবিরোধী, অর্থাৎ বাউয়ারদের মতো ‘বুদ্ধিজীবীরা’ মনে করেন যে জনতা আত্মপ্রতারণায় অভ্যস্ত এবং মেরুদণ্ডের অভাবে অসুস্থ।
এই দৃষ্টিভঙ্গির দরুন বাউয়ার-গোষ্ঠীর প্রচারপত্রে সব ‘গণ-আন্দোলনকেই ঘৃণার ঝুল-কাল মাখিয়ে সঙ সাজানো হত। ‘পবিত্র’ এই পরিবারকে আক্রমণ করে মার্কস দেখালেন যে বুদ্ধিজীবীদের ‘আইডিয়া’ ‘বৃন্তহীন পুষ্পসম আপনাতে আপনি বিকশি’ ওঠে না, জনস্বার্থের জমিতে তার শেকড় না থাকলে সে আইডিয়া শুকিয়ে মরতে বাধ্য। বাউয়ারের ফরাসি বিপ্লবের বিরূপ সমালোচনার উত্তরে মার্কস বললেন সে-বিপ্লব বুর্জোয়া স্বার্থের দিক থেকে ‘বিপথে পরিচালিত’ হয়নি, বুর্জোয়া স্বার্থসিদ্ধি ভালোভাবেই করেছে। স্বার্থসিদ্ধি হওয়ার পর ফরাসি বিপ্লবের প্রগতির ভূমিকা আর রইল না-জনস্বার্থের দিক থেকে বিপ্লব ব্যর্থ হল। এ-ব্যর্থতা অনিবার্য, কারণ বিপ্লবের মূল প্রেরণা আর জনস্বার্থের মধ্যে বিরোধ ঘটল।
রাষ্ট্র বুর্জোয়া সমাজের বিচ্ছিন্ন অণুগুলোকে এক সঙ্গে গেঁথে রাখে-বাউয়ারের এই তত্বকে আক্রমণ করে মার্কস বললেন যে চরম অজ্ঞ লোকেরাই শুধু বলতে পারে যে রাষ্ট্র বুর্জোয়া সমাজকে ধরে রাখে, তার সংহতিকে রক্ষা করে। আসল কথাটা এর উল্টো-বুর্জোয়া সমাজই রাষ্ট্রকে ধরে রাখে।
ব্রুনো বাউয়ার ইতিহাসের জ্ঞানের ক্ষেত্রে শিল্প ও প্রকৃতির গুরুত্বকে তাচ্ছিল্য করেছিলেন। জবাব দিতে গিয়ে মার্কস বললেন যে বাউয়ারের মতো বিদ্বানরা ইতিহাসবিদ্যার দ্বারপথেও এসে পৌঁছাননি, কারণ তাঁরা ইতিহাসের অগ্রগতির প্রবাহ-পথ থেকে মানুষের প্রকৃতির প্রতি, প্রকৃতি-বিজ্ঞানের প্রতি এবং শিল্পের প্রতি তত্বগত ও ব্যবহারগত মনোভাবকে বার করে দিয়েছেন। বাউয়ারের দার্শনিকতা যেমন মননকে অনুভূতি থেকে পৃথক করে এবং মনকে দেহ থেকে পৃথক করে ঠিক তেমনি তা ইতিহাসকে প্রকৃতি-বিজ্ঞান থেকে আর শিল্প থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং মনে করে ইতিহাসের জন্মস্থান ঊর্ধ্ব আকাশের কুহেলিকাময় মেঘলোকে, মাটির পৃথিবীতে বস্তু-উৎপাদনের কঠিন কঠোর কর্মক্ষেত্রে নয়।
পবিত্র পরিবার বইখানিতে মার্কস এবং এঙ্গেলস শ্রমিকশ্রেণীর ইতিহাস নির্দিষ্ট বিপ্লব-ব্রত বিবৃত করেছেন। দেখিয়েছেন যে আদিম সাম্যবাদী সমাজের ইতিহাস বাদ দিলে মানুষের সমগ্র ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে শোষকদের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম। ঘোষণা করেছেন যে সর্বহারারাই ধনতন্ত্রের কবর খোঁড়ে। সর্বহারাদের বৈপ্লবিক ভূমিকার প্রায় পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে গিয়ে তার সম্পূর্ণ বিরোধী শক্তি শ্রমিকশ্রেণীর অস্তিত্বও রক্ষা করে চলতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের অলঙঘ্য নির্দেশে শ্রমিকশ্রেণীও নিজের অসহনীয় অস্তিত্ব ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে তার বিরোধী শক্তি ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে ধ্বংস করতে বাধ্য। কারণ সেই শক্তিই সর্বহারাকে সর্বহারা করে রেখেছে। এই যে পারস্পরিক বিরোধের সম্পর্ক, এর ভেতর সম্পত্তির মালিক হচ্ছে সংরক্ষণশীল এবং সর্বহারা শ্রেণী হচ্ছে ধ্বংসপন্থী। মালিকশ্রেণী বিরোধের সম্পর্ক অটুট রাখতে খুবই সক্রিয়, কারণ বিরোধ-রক্ষা মানেই সম্পদ-রক্ষা। অপর পক্ষ অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণী বিরোধের সম্পর্কটাকে ধ্বংস করতে চায়, কারণ বিরোধকে চুরমার করতে পারলে তাদের যুগযুগান্তের শেকলও গুঁড়িয়ে যাবে। ধনিক শ্রেণী সৃষ্টি করে সর্বহারাকে, সৃষ্টি করে সর্বহারার নিজের দেহ মনের যন্ত্রণা সম্বন্ধে চেতনাকে, অমানুষদের অমনুষ্যত্ব সম্বন্ধে বোধকে এবং সেই অমানুষিক অবস্থাকে শেষ করে দেবার সংকল্পকে।
ইতিহাসের বৈপ্লবিক রূপান্তরের কাজে সর্বহারার ভূমিকাকে সবার উপরে স্থান দিয়ে মার্কস তাদের দেবতা করে তুলেছেন-এই অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর উত্তর এই পরিপূর্ণভাবে বিকশিত সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণীর জীবন ও জীবিকা-ব্যবস্থা সমসাময়িক সমাজের অমানুষিক অবস্থার কেন্দ্রবিন্দু, সর্বহারার মধ্যেই মানুষের সর্বরিক্ত রূপ প্রস্ফুট, আবার এই সর্বহারারাই তত্বের দিক থেকে নিজেদের রিক্ততা সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠেছে এবং অবস্থার অনিবার্য চাপে বাধ্য হচ্ছে অমানুষতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে, সুতরাং এই সর্বহারাদের মুক্তি তাদের নিজেদেরই আনতে হবে। যে-অবস্থা তাদের সৃষ্টি করেছে সেই অবস্থাকে নিঃশেষে ধ্বংস না করে সর্বহারারা নিজেদের মুক্ত করতে পারে না, আর তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে ধ্বংস করা মানে বৃহত্তর সামাজিক জীবনের সমস্ত অমানুষিক বিধিব্যবস্থাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা-যে-অমানুষিক বিধিব্যবস্থা বা অব্যবস্থা সর্বহারাদের নিজেদের অবস্থার মধ্যেই জমাট হয়ে দেখা দেয়।
আরও বিশদ করে বললেন কঠোর পরিশ্রম এদের পক্ষে এমন একটি বিদ্যালয় যে তা এদের কঠোর করে তোলে-সেখানকার শিক্ষা নিষ্ফল হয় না। সাময়িকভাবে কোনও একজন শ্রমিক বা অপর আরেকজন শ্রমিক, এমনকি গোটা শ্রমিকশ্রেণী লক্ষ্য সম্পর্কে কী কল্পনা করল সেটা আসল কথা নয়। আসল কথা হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণী আসলে কী এবং সে আসলে যা তার দরুন ইতিহাস তাকে কোন কর্তৃব্যের পথে প্রবলভাবে ঠেলে দিচ্ছে। শ্রমিকশ্রেণীর ঐতিহাসিক কর্তব্য আগে থেকে নির্ধারিত আছে-সে-কর্তব্য সুস্পষ্ট এবং অলঙঘ্য হয়ে আছে শ্রমিকদের নিজেদের অবস্থার মধ্যেই, বুর্জোয়া সমাজের গোটা সংগঠনের মধ্যেই। বার বার করে মার্কস ও এঙ্গেলস বললেন যে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সর্বহারাদের এক বিরাট অংশ ইতিমধ্যেই শ্রমিকশ্রেণীর ইতিহাস-নির্দিষ্টভূমিকা সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠেছে এবং সেই সচেতনতাকে পরিপূর্ণ স্বচ্ছতার স্তরে উন্নীত করবার জন্য অবিরাম চেষ্টা করে চলেছে।
এহ পবিত্র পরিবার বইটির কাছাকাছি সময়ে লেখা ইংল্যান্ডের শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থা এঙ্গেলসের নিজস্ব গবেষণার ফল। বুর্জোয়া শ্রেণীর শাসনে ইংল্যান্ডের শ্রমিকশ্রেণীর দুর্গতির বীভৎসতার বাস্তব চিত্র এই বইটিতে আঁকা হল। তবে সর্বহারার লাঞ্ছনার ছবি আছে বলেই যে মার্কসীয় সাহিত্যে এই বইটি মূল্যবান তা নয়। কারণ এঙ্গেলসের আগেও দুর্গতদের বর্ণনা অনেকেই পরিবেশন করেছেন-যেমন বুরে, গ্যাসকেল প্রমুখ এবং তাঁদের লেখা থেকে এঙ্গেলস উদ্ধৃতি দিয়েছেন প্রচুর। বইখানির গুরুত্ব এই জন্যই যে ইংল্যান্ডের ধনতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার বিশ্লেষণ করে এঙ্গেলস সে-ব্যবস্থার ক্ষয়িষ্ণু রূপ আর শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তিসংগ্রামের উপর জোর দিলেন। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সূত্র প্রয়োগ করে তিনি দেখালেন যে শ্রমিকশ্রেণী তার জন্মদাতা ধনতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থাকে ধ্বংস করবেই করবে। ঘোষণা করলেন শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে সমাজতন্ত্রবাদের সংযুক্তির মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ডের সর্বহারার শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
এই বইখানি লেখা শেষ ক রে এঙ্গেলস মার্কসের সঙ্গে ব্রাসেলজে দেখা করলেন। ১৮৪৫-এর বসন্তকাল। এঙ্গেলস এই সময়ের কথা লিখতে গিয়ে লিখেছেন যে তখন মার্কস তাঁর ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার মূল কাঠামোটা তৈরি করে ফেলেছেন এবং তখন থেকে তাঁরা দু-জনে এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির বহুবিস্তারিত প্রয়োগের যুক্ত প্রয়াসে ব্রতী হলেন২।
তাঁদের যুক্ত উদ্যোগে ‘জার্মান ভাবাদর্শ’ বইখানির সৃষ্টি হল। বইখানির উদ্দেশ্য অবৈজ্ঞানিক জার্মান দর্শনের আলোচনা অর্থাৎ মার্কস-এঙ্গেলসের ‘অতীত দার্শনিক বিবেক’ সম্পর্কে সমালোচনা। কারণ তাঁরা গোড়ার দিকে হেগেলপন্থী ছিলেন। এই প্রবন্ধে আমরা আপাতত ‘জার্মান ভাবাদশ’ বইখানির দ্বিতীয় খণ্ডের সঙ্গে জড়িত। কারণ, সেখানেই তথাকথিত ‘যথার্থ সমাজতন্ত্রবাদ’ সম্বন্ধে সমালোচনা আছে। কিছু মানবতা, সম্পত্তিবানদের বিরুদ্ধে কিছু প্রোলেতারীয় আক্রমণ, শ্রমিক-সংগঠন, অবনত শ্রেণীগুলোর উন্নয়নের জন্য কিছু করুণ চেহারার গোবেচারি সমিতি গঠন এবং অর্থনীতি ও সমাজের প্রকৃত চরিত্র সম্বন্ধে সর্বব্যাপী অজ্ঞতা-এই নিয়ে ‘যথার্থ সমাজতন্ত্রবাদ’। বিখ্যাত ‘কম্যুনিস্ট ইস্তাহার’ও এই খাঁটি সমাজতন্ত্রবাদের কঠোর সমালোচনা পরবর্তীকালে করেছিল।
বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদের তত্ব এই বইখানিতে আরও কিছুটা বিশদ হল, দেখানো হল যে বস্তু-নির্ভর কতকগুলো নিয়মের উপরই সর্বহারাদের বৈপ্লবিক কার্যক্রমের ভিত্তি। মার্কস ও এঙ্গেলস প্রমাণ করলেন যে মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার সীমানার বাইরের স্ব-নির্ভর অর্থনৈতিক নিয়মের ক্রিয়ার ভিত্তিতে শ্রমিকশ্রেণীর বৈপ্লবিক আন্দোলনের ফলে বিশ্বে সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠা হবেই-কোনও শক্তিই তাকে প্রতিহত করতে পারবে না। অনাগত সাম্যবাদী সমাজের মোটামুটি চেহারাটা ‘জার্মান ভাবাদর্শ’ ফুটিয়ে তুলল।
প্রায় একই সময়ে লেখা প্রবন্ধ হচ্ছে ‘ফয়ারবাখ প্রসঙ্গে’। এই প্রবন্ধে যে-কথাটা জোরের সঙ্গে বলা হয়েছে সেটা হচ্ছে এই যে শুধু মনন-চিন্তন যথেষ্ট নয়, তত্বের সঙ্গে প্রয়োগের প্রয়াসকে যুক্ত করতে হবে, কারণ ব্যবহারিক প্রয়োগের সঙ্গে বৈপ্লবিক তত্বের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। তত্বকে আকাশস্থ নিরালম্ব হয়ে থাকলে চলবে না, তত্ব হবে জীবনের রণক্ষেত্র ভাঙা-গড়ার দুর্জয় অস্ত্র। ইতিপূর্বে এই প্রবন্ধের গোড়ার দিকে আমরা মার্কসের যে-উক্তিটি উদ্ধৃত করেছি তা ফয়ারবাখের প্রয়োগবিমুখতার প্রসঙ্গেই ব্যবহৃত হয়েছিল-বিপ্লবী দর্শনের প্রকৃত ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে মার্কস বলেছিলেন দার্শনিকেরা শুধু জগৎকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন; কিন্তু আসল কথা হল জগৎকে পরিবর্তন করা। সমাজকে শুধু জানলে হবে না, পুরোনো সমাজকে ভাঙো, নতুন সমাজ গড়ার কাজে হাত লাগাও-এই হল মার্কসের আহ্বান।
এবারে দেখতে হয় মার্কস ও এঙ্গেলস বিপ্লবী গ্রন্থ প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবীদের ঐক্যের সূত্র গ্রন্থনের কাজে কীভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক সম্যুনিস্ট আন্দোলনের সাংগঠনিক উৎস খুঁজতে গেলে দেখব ইউরোপের তিনটি প্রধান রাজধানীতে-প্যারিস, ব্রাসেলজ ও লন্ডনে-প্রবাসী জার্মান সংগঠনগুলোই এর মূলে ছিল। অবশ্য তারা অন্য দেশের প্রতিনিধিদেরও কোনও কোনও ক্ষেত্রে সঙ্গে পেত। এই জার্মান সংগঠনগুলো কিন্তু প্রায়ই জার্মানির কল্পনা-সর্বস্ব ‘কম্যুনিস্ট’ ভাইটলিং-এর তাত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির অনুসরণ করত।
বিপ্লবী দর্শন ও কর্মধারার আলোচনায় ভাইটলিং এবং তাঁর সঙ্গে ফরাসি দেশের প্রুধঁ এসে পড়বেই। আমাদের মনে রাখতে হবে যে মার্কস ও এঙ্গেলসের বিপ্লবী দর্শনকে শ্রমিক জনসাধারণের কাছে পৌঁছাতে দুটি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হচ্ছিল। এক, বুর্জোয়াশ্রেণীর ভাবাদর্শের বিরুদ্ধে। দুই, পেতি-বুর্জোয়াশ্রেণীর নানা রকমের সমাজতন্ত্রবাদের বিরুদ্ধে। তথাকথিত সমাজতন্ত্রবাদের প্রচার শ্রমিকশ্রেণীকে শ্রেণী-দ্বন্দ্বের পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের মধুকুঞ্জে স্বপ্ন-শয়নে এলিয়ে দিত। শ্রমিকশ্রেণীর শত্রু বুর্জোয়া শোষকদেরই এতে লাভ হত। ভিলহেলম ভাইটলিং ছিলেন কাল্পনিক সাম্যের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ঋষি। তাঁর এবং তাঁর সহগামীদের মুখরোচক প্রচারে বলা হত ভালোবাসা আর ভ্রাতৃভাবের কথা-উদ্দেশ্য হল সর্বহারা ও সর্বস্বাপহারকদের মধ্যেকার বৈরিতাকে প্রলেপের সাহায্যে সর্বহারার পক্ষে খানিকটা সহনীয় করে তোলা এবং শ্রেণীদ্বন্দ্বের পরিবর্তে শ্রেণী-সহযোগিতার পরিবেশ রচনা করা। প্রুধঁর দর্শনের সঙ্গেও সংঘর্ষের প্রয়োজন ছিল। তাই প্রুধঁর ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ প্রবন্ধের উত্তরে ১৮৪৭-এ মার্কসের লিখতে হল ‘দারিদ্র্যের দর্শন।’ এই প্রবন্ধটিতে মার্কস ধনতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ উপস্থিত করলেন এবং মার্কসীয় অর্থনীতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হল। শ্রমিকশ্রেণীর বন্ধন-মুক্তি সম্বন্ধে বললেন শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির শর্ত হচ্ছে প্রত্যেক শ্রেণীর অবলুপ্তি। সর্বহারা ও বুর্জোয়াদের মধ্যে যে-বিরোধ তা অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর, কারণ এই বিরোধকে তার চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারলেই পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব ঘটবে। শ্রেণীহীন সমাজ যেদিন আসবে শুধু সেদিনই শ্রেণীতে-শ্রেণীতে সংঘর্ষের অবসান হবে। যতদিন তা না হচ্ছে ততদিন প্রতিটি সামাজিক রূপান্তরের পূর্ব-মুহূর্তে সমাজবিজ্ঞানের চূড়ান্ত কথা হচ্ছে ‘জয়লাভ অথবা মৃত্যু! রক্তাক্ত সংগ্রাম অথবা অবলুপ্তি! প্রশ্নটা এই রকম নির্মমভাবেই সামনে এসে দাঁড়ায়।’ উদ্ধৃতিটি মার্কস নিলেন জর্জ সাঁদ থেকে। প্রুধঁর প্রবন্ধের উত্তরের উপসংহারে এই রকম সংহারের কথাই মার্কসকে বলতে হল-কারণ, বুর্জোয়া দার্শনিকদের মুখের মতো জবাব এটাই।
‘দর্শনের দারিদ্র্য’ প্রসঙ্গে একটি বক্তব্য উত্থাপন করা বাকি আছে। আমরা ইতিপূর্বে বলেছি যে মার্কসীয় অর্থনীতির ভিত্তি রচিত হল এই প্রবন্ধে। সঙ্গে সঙ্গে বলা ভালো যে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির বিশ্লেষণ করে মার্কস এখানে প্রমাণ করে দেখালেন যে শোষণ, দারিদ্র্য, সংকট, মন্দা ধনতন্ত্রবাদের নিত্যসঙ্গী। ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের উৎসাদনের মধ্য দিয়েই মানবসমাজ এই অভিশাপগুলো থেকে মুক্ত হবে। সর্বহারার বিশ্বজোড়া ঐতিহাসিক ভূমিকার ব্যাপারে তিনি অর্থনৈতিক সংগ্রামের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করলেন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের তাৎপর্যও তুলে ধরলেন এবং সর্ববারার শ্রেণী-সংগ্রামের কৌশলের প্রথম আভাস দিলেন।
বিপ্লবী গ্রন্থ থেকে বিপ্লবীদের গ্রন্থন বা সংঘবদ্ধ করার প্রসঙ্গ তুলে একটু দূরে সরে গেছি। যথাস্থানে ফিরে আসা যাক।
বিপ্লবীদের সংগঠন হিসেবে কম্যুনিস্ট লিগ নামের প্রতিষ্ঠানটি সুপরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানটির জন্মের সূত্র ধরে পেছনের দিকে গেলে আমরা দেখব যে জার্মান উদ্বাস্তুদের গোপন সমিতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম হয়েছিল সে-যুগের পৃথিবীর বিপ্লবের কেন্দ্র প্যারিসে। জন্ম-তারিখ ১৮৩৪, নাম নির্বাসিতদের লিগ। ১৮৩৬-এ অপেক্ষাকৃত জঙ্গি কর্মীদের চেষ্টায় পুনর্গঠিত হয়ে নাম হল ন্যায়পরায়ণদের লিগ। লিগের সভ্যরা ১৮৩৯-এর অভ্যুত্থানে ফরাসি বিপ্লবীদের পাশে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করেন। লিগের নেতারা নির্বাসিত হলে পর তার কেন্দ্রীয় দপ্তর প্যারিস থেকে লন্ডনে উঠে যায়। এঙ্গেলস লিখেছেন যে লন্ডনে আসার পর থেকে এই লিগ একটি জার্মান সংগঠন থেকে ক্রমে এক আন্তর্জাতিক সংগঠনের রূপ নেয়। ‘সব মানুষ ভাই ভাই’-সভ্যদের কার্ডের উপর এই কথা ছাপানো থাকত।
মার্কস ও এঙ্গেলসের ইংল্যান্ডের চার্টিস্টদের এবং ফ্রান্সের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যেমন যোগ ছিল তেমনি এই ন্যায়পরায়ণদের লিগের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখে তাঁরা চলতেন, কিন্তু গোড়ার দিকে তাঁরা লিগের সভ্য হতে আপত্তি জানান। আপত্তির কারণ এই যে লিগের ভ্রান্ত কাল্পনিক সাম্যবাদী তত্ব এবং সংকীর্ণ গোপন সংগঠনের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক তত্ব এবং পদ্ধতির প্রবর্তন করা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করতেন এবং সেই উদ্দেশ্যে তাঁরা ব্রাসেলজে জার্মান শ্রমিক সঙঘ বলে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন-একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেন। উদ্দেশ্য ক্রমে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠন। ব্রাসেলজে ‘কম্যুনিস্ট পত্রালাপ সমিতি’ নামে একটি সমিতিও স্থাপিত হল। তারপর ব্রাসেলজের এই সমিতি ইংল্যান্ডের চার্টিস্টাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, লিগের লন্ডন শাখার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এবং তার প্যারিস শাখার সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করে। জার্মানির কয়েকটা কম্যুনিস্ট গোষ্ঠীর সঙ্গেও কথাবার্তা হয়। লন্ডনেও একটি সহযোগী পত্রালাপ সমিতি স্থাপিত হয়। নতুন মতবাদ, অর্থাৎ মার্কসবাদ দ্রুত প্রসার লাভ করে। ন্যায়পরায়ণদের লিগের একজন প্রতিনিধি ১৮৪৭-এর বসন্তকালে ব্রাসেলজে এসে মার্কসের সঙ্গে এবং প্যারিসে এঙ্গেলসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মার্কস ও এঙ্গেলস এবারে লিগে যোগ দিতে রাজি হলেন। ১৮৪৭-এর গ্রীষ্মকালে লন্ডনে লিগের প্রথম কংগ্রেস হল। মার্কস ও এঙ্গেলসের পরিকল্পনা অনুযায়ী ন্যায়পরায়ণদের লিগের পুনর্বিন্যাস হল। লিগ গোপন সমিতির ঐতিহ্য বর্জন করল। তার নতুন নাম হল ‘কম্যুনিস্ট লিগ’। পুরোনো দিনের আহ্বাবাণী ‘সব মানুষ ভাই ভাই’ বর্জন করে কম্যুনিস্ট লিগ নতুন ডাক দিল ‘সব দেশের শ্রমিকরা, জোট বাঁধো!’ এই বাণী-পরিবর্তনের মার্কসীয় তাৎপর্য লক্ষ করবার মতো। ‘সব মানুষ ভাই ভাই’ আর ‘বসুধৈব কুটুমকম’ একই জিনিস-ধোঁয়াটে মানবতার ঘোলাটে প্রচার। আসলে সব মানুষ তো ভাই ভাই নয়। শোষক মানুষ আর শোষিত মানুষ ভাই ভাই নয়। মুষ্টিমেয় অথচ বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী শোষকরা বিশ্বের শোষিত জনসাধারণের পরম শত্রু, তাদের শত্রু মনে করতে হবে, শত্রুর মতো তাদের ঘৃণা করা মুক্তিকামী মানুষের পবিত্র কর্তব্য, তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী প্রতিষ্ঠানের তাই সঠিক স্লোগান হল ‘সব দেশের শ্রমিকরা, জোট বাঁধো!’ সংক্ষিপ্ততার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ক্ষিপ্ততার খানিকটা কথা এখানে বাদ থেকে গেল, সে-কথা হচ্ছে ‘উপড়ে ফেলো শোষকদের শাসন-ক্ষমতা!’ শুধু মানবতাবাদে আমাদের চলবে না, প্রোলেতারীয় মানবতাবাদ চাই-এই বোধ জাগাবার জন্যই মার্কস ও এঙ্গেলস নতুন স্লোগান উচ্চারণ করলেন। যথাসম্ভব সুস্পষ্ট ভাষায় বিপ্লবের লক্ষ এইভাবে ঘোষিত হল ‘লিগের লক্ষ হচ্ছে বুর্জোয়া শ্রেণীকে ক্ষমতাচ্যুত করা, সর্বহারার শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, শ্রেণী-সংঘর্ষভিত্তিক পুরোনো বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করা এবং শ্রেণীহীন ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি-শূন্য নতুন সমাজব্যবস্থার ভিত্তিস্থাপন।’
লিগের দ্বিতীয় কংগ্রেস হয় ১৮৪৭-এর ডিসেম্বরে, লন্ডনেই। মার্কস সেখানে তাঁর নতুন তত্ব বিবৃত করেন এবং প্রস্তাবিত নতুন নীতিগুলো সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। মার্কস ও এঙ্গেলসের উপর ভার পড়ে সম্মেলনে গৃহীত আদর্শ ও কার্যক্রম অনুযায়ী একটি ম্যানিফেস্টো বা ইস্তাহার রচনা করবার।
সমসাময়িক জার্মানিতে সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে বুর্জোয়াশ্রেণীর যে সংগ্রাম চলছিল মার্কস ও এঙ্গেলস তাতে সর্বহারাদের বুর্জোয়াদের সঙ্গে যোগ দিতে বললেন, কারণ বুর্জোয়াদের তখনকার ভূমিকা ছিল প্রগতিশীল। বিপ্লবী মার্কসবাদ যে গোঁড়া মতবাদ নয়, কর্মক্ষেত্রে পথনির্দেশ করাই তার কাজ-এঙ্গেলসের এই বিখ্যাত কথাটির অনেক প্রমাণের মধ্যে এটি একটি প্রমাণ। কম্যুনিস্ট লিগের কাজ ছাড়াও মার্কস ও এঙ্গেলস ব্রাসেলজে গণতান্ত্রিক সমিতি বলে একটি সমিতি গড়তে উদ্যোগী হলেন। লক্ষ্য গণতান্ত্রিকদের আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তোলা। তাঁরা বিনা দ্বিধায় সংকীর্ণতা-বিরোধী এই আদর্শ প্রচার করলেন যে সর্বহারাদের কর্তব্য হচ্ছে প্রত্যেক প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমর্থন করা। জার্মানির বুর্জোয়া বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণীকে উৎসাহিত করাই ছিল মার্কস-এঙ্গেলসের উদ্দেশ্য।
লিগের প্রস্তাবিত কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রথমে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হল লন্ডনে, ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারিতে-ফ্রান্সের ফ্রেব্রুয়ারি বিপ্লবের পূর্ব-মুহূর্তে। যে-বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদের মূল কথাগুলো তাঁরা ইতিপূর্বে মোটামুটি প্রচার করেছেন সেগুলোকেই আরও সুস্পষ্ট ও সংহত করে মার্কস ও এঙ্গেলস এই ইস্তাহারে প্রকাশ করলেন। তার সঙ্গে থাকল বিপ্লবের অনিবার্যতা সম্বন্ধে সুদৃঢ় প্রত্যয়ের ঘোষণা। ১৮৮২-তে প্রকাশিত রুশ সংস্করণের ভূমিকায় আছে যে এই ইস্তাহারের উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক বুর্জোয়া সম্পত্তির অনিবার্য আসন্ন ধ্বংসের কথা প্রচার করা।
কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কর্মসূচি, সর্বহারাদের সংগ্রামের পথপ্রদর্শক বিপ্লব-তত্ব ও প্রয়োগপদ্ধতির চুম্বক। যুক্তি-প্রমাণ উপস্থিত করে এতে দেখানো হল যে শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতার দরুন শ্রমিকদের বিচ্ছিন্নতা কেটে যায় এবং তার পরিবর্তে গড়ে ওঠে বৈপ্লবিক ঐক্য-সান্নিধ্যের ফলে। সুতরাং বুর্জোয়া শ্রেণী নিজেরাই তাদের কবর খোঁড়বার লোক সৃষ্টি করে চলেছে। এই শ্রেণীর পতন এবং সর্বহারাদের উত্থান দুই-ই অনিবার্য।
পার্টি এবং আশু দাবিদাওয়া সম্পর্কে ইস্তাহারে যে-কথাগুলো আছে তার সংশোধন পরবর্তীকালে কার্যক্ষেত্রে হয়েছে, কিন্তু ঐতিহাসিক দলিলটিতে করা হয়নি, পুরোনো স্মৃতির আধার বলে সেটাকে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কম্যুনিস্টদের বিশেষ ভুমিকা সম্পর্কে ইস্তাহারে যা বলা হয়েছে সেটাই কম্যুনিস্ট পার্টিগুলোর পক্ষে প্রযোজ্য। সকল সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণীকে নেতৃত্ব দিতে পারে একমাত্র কম্যুনিস্টরাই। কারণ তারাই হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর সর্বাগ্রগামী অংশ, কারণ তারা বৈপ্লবিক তত্বের অস্ত্র হাতে পেয়ে যুদ্ধের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছে। সেই তত্বের সাহায্যে তারা পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করতে পারে, সংগ্রামের অগ্রগতি ও ফলাফল সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা করতে পারে।
সর্বহারা বিপ্লবের প্রথম ধাপ হচ্ছে শাসনক্ষমতা দখল করা, গণতন্ত্রের সংগ্রামে জয়ী হওয়া। এই কথা বলে এই ইস্তাহারে মার্কস ও এঙ্গেলস বলছেন সর্বহারা শ্রেণী তার রাজনৈতিক আধিপত্যকে ব্যবহার করবে ক্রমে ক্রমে বুর্জোয়া শ্রেণীর হাত থেকে সব মূলধন ছিনিয়ে নিতে, রাষ্ট্রের হাতে উৎপাদনের সমস্ত যন্ত্রকে কেন্দ্রীভূত করতে এবং উৎপাদনের শক্তি যত দ্রুত সম্ভব বৃদ্ধি করতে। এইভাবে ক্রমবিকাশের ফলে যখন শ্রেণীগুলো নিশ্চিহ্ন হবে, উৎপাদনের উপর সমাজের সামগ্রিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন রাজনৈতিক ক্ষমতা নিষ্প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াবে। কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতা আসলে এক শ্রেণীর অপর শ্রেণীকে দাবিয়ে রাখবার ক্ষমতা। দাবিয়ে রাখার প্রয়োজন শেষ হলে সাম্যবাদী সমাজ দেখা দেবে, আমরা এমন একটি সমাজে বাস করব যেখানে প্রত্যেক মানুষের অবাধ বিকাশই হবে সবার অবাধ বিকাশের পূর্ব-শর্ত।
প্রোলেতারীয় আন্তর্জাতিকতার ঘোষণাও কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টোর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। মার্কস ও এঙ্গেলস বললেন যে প্রোলেতারীয় বিপ্লবের ফলে জাতি-সমস্যার সমাধান হবে, অর্থাৎ একজাতির উপর আরেক জাতির শোষণ পীড়নের অবসান ঘটবে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে পোল্যান্ডের ১৮৩৯-এর অভ্যুত্থানের কথা। ম্যানিফেস্টো লেখার কাছাকাছি সময়ে মার্কস ও এঙ্গেলস সেই অভ্যুত্থানের একটি স্মারক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে গিয়ে বলেছিলেন সর্ববারার সার্থক বিপ্লব উৎপীড়িত জাতিগুলোর মুক্তি এনে দেবে। এঙ্গেলস জাতি-সমস্যার সমাধানের এই বিখ্যাত সূত্রটি সেদিন তুলে ধরেছিলেন ‘কোনও জাতিই স্বাধীন হতে পারে না যদি সে অন্য জাতিদের পীড়ন করে।’
কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টোর বহু-উচ্চারিত শেষ কথাগুলো উদ্ধৃত করে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের এই পর্বের কথা শেষ করি
কম্যুনিস্টরা তাদের মতামত ও লক্ষগুলোকে গোপন করতে ঘৃণা বোধ করে। তারা খোলাখুলি ঘোষণা করে যে তাদের লক্ষে পৌঁছানো যায় কেবলমাত্র বলপ্রয়োগের সাহায্যে বর্তমান সমাজব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে। শাসকশ্রেণীগুলো কম্যুনিস্ট বিপ্লবের ভয়ে কেঁপে উঠুক। শেকল ছাড়া সর্বহারাদের আর কিছু হারাবার নেই। একটা গোটা দুনিয়া জয় করবার আছে।
‘সব দেশের শ্রমিকরা, জোট বাঁধো!
ফ্রান্সের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পূর্ব-মুহূর্তে কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশিত হয়েছিল, এ-কথা বলেছি। ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ‘বুর্জোয়া রাজা’ লুই ফিলিপকে গদিচ্যুত করে। বুরবঁ রাজবংশের পতনের পর তিনি গদিতে বসেছিলেন ফ্রান্সের ব্যাংক-মালিকদের নায়েব হিসেবে। শ্রমিকশ্রেণীর বিরাট চাপে লুই-র পতনের পর প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হল। বিত্তবানরা ক্ষমতা দখল করল। যাদের বিপ্লবী আক্রমণে লুই-র স্বৈরতন্ত্র ধ্বংস হল সেই শ্রমিকশ্রেণীকে নিরস্ত্র করাই হল বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রের প্রথম কাজ। শ্রমিকরা প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করল, কিন্তু ওই বছরের জুন মাসের শ্রমিক-অভ্যুত্থান পরাজিত হল। ক্রমে লুই ফিলিপের সময়কার মতো পুঁজির বড়ো বড়ো মালিকদের হাতেই আবার রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরে গেল।
বিত্তবানদের নিজেদের মধ্যেকার মতান্তরের সুযোগ নিয়ে এক ভাগ্যান্বেষী, সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বংশধর, লুই বোনাপার্ট নিপীড়িত কৃষক জনতার সমর্থনের উপর নির্ভর করে ১৮৫১ তে আকস্মিকভাবে ক্ষমতা দখল করল এবং সার্বভৌম শাসক হয়ে বসল। লুই বোনাপার্ট তার ভাগ্যান্বেষী-বাহিনী নিয়ে যে শাসন কায়েম করল ইতিহাসে তার নাম হচ্ছে ‘দ্বিতীয় সাম্রাজ্য’–লুই নিজেকে ঘোষণা করল সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন বলে।
ফ্রান্সের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সময় মার্কস ব্রাসেলজ থেকে নির্বাসিত হলেন, কারণ বেলজিয়ামের সরকার বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রগতিতে আতঙ্কিত হয়েছিল। ভালই হল, মার্কস ফ্রান্সের বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দেবার জন্য প্যারিসে এলেন। জার্মানিতে তখন বিপ্লব আসন্ন। এই সময় বিপ্লবী অভিযাত্রী বাহিনী গঠন করে অন্য দেশে বিপ্লব করতে যাবার উন্মত্ত আগ্রহ প্যারিসকে উত্তপ্ত করে তুলেছিল। মার্কস এবং তাঁর সহকর্মীরা জার্মান কবি হেরভেগের ‘জার্মান মুক্তি-বাহিনী’ গঠন করে প্যারিস থেকে জার্মানি আক্রমণ করার উদ্ভট পরিকল্পনাকে প্রবলভাবে বাধা দিলেন। কারণ মার্কসবাদের পরিষ্কার নির্দেশ বিপ্লব বাইরে থেকে আমদানি করা যায় না।
১৮৪৮-এর এপ্রিল মাসে মার্কস এঙ্গেলস এবং তাঁদের খুব ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা প্যারিস থেকে জার্মানিতে গেলেন। সেখানে তখন বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। তাঁরা ঘাঁটি করলেন কোলোনে। কম্যুনিস্ট লিগ এখানে সংগঠনের কঠিন কাজে ব্রতী হল। জার্মান শ্রমিকশ্রেণী তখন খুবই দুর্বল, অসংগঠিত এবং রাজনীতিবোধের দিক থেকে বেশ অপরিণত। সুতরাং পার্টি গঠনের উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। তাই মার্কস ও এঙ্গেলস অন্য গণতান্ত্রিক সংগঠনের মাধ্যমে কাজ শুরু করলেন এবং ‘নয়ে রাইনিশে ৎসাইতুং’ নামে একটি কাগজ বার করলেন। এই পত্রিকায় মার্কস ও এঙ্গেলস আঠারোশো আটচল্লিশ ও ঊনপঞ্চাশের ঝোড়ো দিনগুলোর গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। তখন প্যারিস ও ভিয়েনায় পথে পথে আর জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, হাঙ্গারি, পোল্যান্ড ও চেকদের অঞ্চলে শহরে-জনপদে জনতার যে সংগ্রাম চলছিল তা তাঁরা তাঁদের পত্রিকায় তুলে ধরছিলেন, যাতে আগুন আরও ছড়ায়। মার্চ মাসের অগ্নিময় সংগ্রামের ফলে জার্মান শ্রমিকশ্রেণীর কাঁধে পা দিয়ে বুর্জোয়ারা ক্ষমতা দখল করল এবং শোষিত শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকের ব্যবহার শুরু করল —কৃষকসমাজ এবং অ-জার্মান জাতিগুলোর উপর হিংস্র নীতি চালাতে লাগল। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘নয়ে রাইনিশে ৎসাইতুং’ সুস্পষ্ট ও প্রচণ্ড প্রতিবাদ ঘোষণা করে চলল। প্যারিসের শ্রমিকদের ১৮৪৮-এর জুনের অভ্যুত্থান —ফ্রান্সের ইতিহাসে বুর্জোয়া ও প্রৌলেতারিয়েতের মধ্যে প্রথম গৃহযুদ্ধ। এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে ‘নয়ে রাইনিশে’ বিদ্রোহীদের আশ্চর্য বীরত্বের প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠল।
ক্রমে ইয়রোপের সর্বত্র প্রতি-বিপ্লব মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগল। মার্কস আর এঙ্গেলস তো শুধু তাত্বিক নন, তাই তাঁরা জনতাকে হতাশা থেকে রক্ষা করবার জন্য সংগঠিত করে তুলতে নানা অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। প্রাশিয়ার সরকার জাতীয় পরিষদকে যখন বের্লিন থেকে ব্রান্ডেনবুর্গে স্থানান্তর করবার হুকুমনামা জারি করল মার্কসের উদ্যোগে তখন আঞ্চলিক গণতান্ত্রিক কমিটি জনসাধারণকে আহ্বান জানাল সরকারকে অর্থসাহায্য না করতে এবং সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে সরকারি ট্যাক্স আদায়ের জবরদস্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে। কিন্তু জাতীয় পরিষদ বাতিল হয়ে গেল। বুর্জোয়া আর পেতি-বুর্জোয়াদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য প্রাশিয়ায় প্রতি-বিপ্লব জয়ী হল। মার্কস বিপ্লবের নতুন জোয়ার আসবে আশা করে প্যারিসে চলে এলেন। জার্মানির পালাটিনেট অঞ্চলে তখনও বিদ্রোহীদের সঙ্গে প্রতি-বিপ্লবীদের লড়াই চলছিল। এঙ্গেলস সেখানে স্বেচ্ছাসৈন্যের একটি বাহিনীতে নাম লিখিয়ে চারটি খণ্ডযুদ্ধে যোগ দিলেন।
১৮৪৯-এর জুনে ফ্রান্সের পেতি-বুর্জোয়াদের নিষ্ফল সংগ্রামের পর সরকার মার্কসকে নির্বাসিত করল। তিনি লন্ডনে চলে গেলেন এবং এঙ্গেলস ও কম্যুনিস্ট লিগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও লন্ডনে এলেন।
ফ্রান্সে শ্রেণীসংগ্রাম ১৮৪৮-৫০ এবং লুই বোনাপার্টের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার (অর্থাৎ ‘কু দেতা বা আকস্মিক ক্ষমতা-দখল) –মার্কসের এই দুখানি প্রবন্ধ-সংকলনে ফ্রান্সের যে-বৈপ্লবিক সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় আমরা এইমাত্র উপস্থিত করলাম তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ আছে। এই লেখাগুলোতেই মার্কস সর্বপ্রথম ইতিহাস-বিশ্লেষণে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ প্রয়োগ করলেন।
মার্কসের বিশ্লেষণ থেকে আমরা যে ঐতিহাসিক তথ্য আমাদের প্রয়োজনে মনের মধ্যে সঞ্চয় করব তা এই ১৮৪৮-এর বিপ্লবের চালিকাশক্তি ছিল শ্রমিক-শ্রেণী, কিন্তু তারা বুর্জোয়া শ্রেণীতেই গদি দখল করতে সাহায্য করেছিল। বুর্জোয়ারা ক্ষমতা পেয়ে শ্রমিকদের আক্রমণ করল, তাদের বিচ্ছিন্ন করে পরাজিত করল। তবে এর ফলে বুর্জোয়ারা বিপ্লবের বিরুদ্ধেই কাজ করল, বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং পরিণামে নিজেদের হাতেও শাসনকর্তৃত্ব রাখতে পারল না। পেতি-বুর্জোয়া ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি’ নিতান্তই ফাঁপা জিনিস–পার্লামেন্টে গলাবাজির সাহায্যে ইতিহাসের গতি-নিয়ন্ত্রণ করবে, এই স্বপ্নে সে বিহ্বল। পার্লামেন্ট সম্বন্ধে এই মোহ জনস্বার্থ-বিরোধী–‘পার্লামেন্টারি বাতুলতা’ হল এর সঠিক নাম।। বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র হচ্ছে পুঁজিবাদীদের শাসন-শোষণের যন্ত্র—বুর্জোয়াশ্রেণীর অবাধ স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠাই তার লক্ষ্য। ইতিপূর্বে সব বিপ্লবই রাষ্ট্রের শক্তিকে সুদৃঢ় করেছে, কিন্তু প্রোলেতারীয় বিপ্লবের লক্ষ্য হবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙে ফেলা। কৃষক সমাজকে শ্রমিকশ্রেণীর বন্ধু হিসেবে বিপ্লবের পথে টানতে হবে, শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীই বিপ্লবকে সফল করতে পারে। লুই বোনাপার্ট কৃষকদের সাহায্যেই বিপ্লবকে বিপর্যস্ত করে স্বৈরাচারী শাসক হতে পেরেছিলেন।
জার্মানি বিপ্লব ও প্রতি-বিপ্লব– মার্কস ও এঙ্গেলসের লেখা এই বইখানিতে ১৮৫১-৫২তে জার্মানিতে যে বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটেছিল সে-গুলোর আলোচনা আছে। মার্কস ও এঙ্গেলসের বস্তুবাদী বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে এই বিপ্লব জার্মানির সামন্তদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিপ্লব।। শ্রমিক, কৃষক, শহুরে পেতি-বুর্জোয়া ও বুর্জোয়ারা গোড়ার দিকে প্রাশিয়ান রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং অন্যান্য জার্মান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইতে নামে। বিপ্লব যখন চলতে থাকে তখন বুর্জোয়া-শ্রেণী বেশ কিছু পেতি-বুর্জোয়াদের সঙ্গে নিয়ে বিপ্লবের শত্রুদের পক্ষে যোগ দেয়, কৃষকরা উদাসীন ভাব দেখায়, শ্রমিকশ্রেণী একা লড়াই করে হেরে যায়।
১৮৫০-এ লেখা এঙ্গেলসের জার্মানিতে কৃষক যুদ্ধ বইখানি ১৫২৫-এর জার্মান কৃষক বিদ্রোহের বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণ থেকে সিদ্ধান্ত হল কৃষক যুদ্ধের মতো বিপ্লবী অভ্যুত্থানের সাহায্যের উপর আধুনিক জার্মানির শ্রেণী-সংগ্রামের সার্থকতা নির্ভর করে।
মার্কস ও এঙ্গেলসের স্পেনের বিদ্রোহ বইখানি স্পেনের ১৮৫৪-৫৬-র ঘটনাবলির ব্যাখ্যা। লেখকরা বলছেন যে সামন্ত আভিজাতদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনীতে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং শ্রমিকরা সেই বিদ্রোহে সাহায্য করে। শেষে বুর্জোয়া ও সৈন্যবাহিনীর অফিসাররা বিশ্বাসঘাতকতা করে, শ্রমিকরা নিঃসঙ্গ অবস্থায় যুদ্ধ করে পরাজিত হয়।
মার্কস ও এঙ্গেলসের ঐতিহাসিক প্রবন্ধ ও গ্রন্থের সামান্য এই পরিচয় দেওয়ার উদ্দেশ্য এই যে প্রকৃত বিপ্লবীদের বুঝতে হবে সমাজ-বিবর্তনের কোন স্তরে বিপ্লব সম্ভব, বিপ্লবের সর্বহারা শ্রেণীর মিত্র কে, শত্রু কে, বিপ্লবে কারা সাধারণত খানিক দূর এগিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে, কৃষক সমাজের সর্বহারাদের বিপ্লবে ভূমিকা কি।
একদিকে লেখার কাজ চলছে, অপর দিকে মার্কস ও এঙ্গেলস কঠোর পরিশ্রম করছেন অগ্রণী শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে, শ্রমিকশ্রেণীকে ভবিষ্যতের বিপ্লবের জন্য তৈরি করতে এবং কম্যুনিস্ট লিগকে শক্তিশালী করতে। প্রাশিয়ান সরকার আতঙ্কিত হয়ে ধরপাকড় শুরু করল। কম্যুনিস্ট লিগের অনেকে ধরা পড়াতে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হওয়াতে ১৮৫২তে কম্যুনিস্ট লিগ ভেঙে দেওয়া হল।
মার্কস এরপর প্রধানত অর্থনীতির অনুশীলনে মন দিলেন। কিন্তু পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রবন্ধ লেখাও ছিল—বিশেষ করে ‘নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউনে’। এই সব প্রবন্ধে মার্কস ভারতের প্রসঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন, চিন ও এশিয়ার মুক্তিসংগ্রামের কথা বলেন, এশিয়ায় সামাজিক বিপ্লব না ঘটলে বিশ্ব মানবের মুক্তি অসম্ভব বলে ঘোষণা করেন। চিনের বিপ্লবকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন ‘সবচেয়ে প্রাচীন সাম্রাজ্যের পতন আমরা শীঘ্রই দেখতে পাব, এশিয়াতে নবযুগের শুরু হতে আর দেরি নেই।’ ১৮৫৭-র ভারতীয় মহাবিদ্রোহকে মার্কস ও এঙ্গেলস সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক বিরাট গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে দেখেছিলেন এবং ভারত, চীন ও অন্যান্য উপনিবেশের বিদ্রোহকে সাম্রাজ্যবাদী দেশের ভেতরকার বিপ্লবী আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা প্রচার করেছিলেন।
১৮৬১-৬৬ র আমেরিকার গৃহযুদ্ধ সম্বন্ধে তাঁদের বক্তব্য এই গৃহযুদ্ধ আমেরিকার গণতান্ত্রিক বিপ্লবের আরেকটা ধাপ মাত্র। আমেরিকার বিপ্লবী কর্তব্য হল বিপ্লবী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া, নিগ্রোদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া, আর দাসদের মুক্তি দেওয়া। আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণীর চাপেই দাসদের মুক্তি সম্ভব হয়েছিল—লিনকনের গর্ভনমেন্ট এই চাপ ছাড়া বেশি এগোত না। ব্রিটিশ শ্রমিকশ্রেণীর চাপে বৃটিশ গর্ভনমেন্ট ইচ্ছা সত্বেও দাস-মালিকদের সাহায্য করতে পারেনি।
মার্কস ও এঙ্গেলসের এই লেখাগুলোর উল্লেখ করছি এই জন্য যে এগুলো প্রমাণ করে যে যেখানেই বিপ্লবী শক্তির অভ্যুদয় হয় সেখানেই সহযোদ্ধার হাত বাড়িয়ে দেয় মার্কসবাদীরা। যেমন ১৮৬৭-র আইরিশ বিদ্রোহের পর মার্কস প্রথম আন্তজাতিকের জেনারেল কাউন্সিলে প্রস্তাব করেছিলেন যে ব্রিটিশ ও আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণীকে আয়ার্ল্যান্ডের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি স্বীকার করতে হবে এবং ব্রিটিশ শ্রমিকশ্রেণীকে শাসকশ্রেণীর প্রভাব থেকে সরে এসে আইরিশ-দের স্বাধীনতার সংগ্রামে তাদের সঙ্গে বিনা দ্বিধায় যোগ দিতে হবে।
তাই ব্রিটিশ রাজনীতির নগ্নরূপ, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের ভণ্ডামি ও ধাপ্পাবাজি মার্কস প্রকাশ করে দেন এবং বামপন্থী চার্টিস্টদের উৎসাহ দিতে থাকেন। কিন্তু তখন ইংল্যান্ডে কিছু করা দুই কারণে কঠিন ছিল এবং ১৮৪৮-৪৯-এর বিপ্লবের ব্যর্থতার পর সর্বত্রই প্রতিক্রিয়ার প্রবল আক্রমণ হল; দুই উপনিবেশ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা সঞ্চয় করে ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা শ্রমিকশ্রেণীর উপরের স্তরের লোকদের টাকাকড়ি দিয়ে কিনে নিল।
মার্কস অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে যে অর্থনৈতিক গবেষণা করে যাচ্ছিলেন সাময়িকভাবে তা এখন পাশে সরিয়ে রাখলেন। অস্ট্রিয়ার বিরদ্ধে খণ্ডিত ইতালির একীকরণ ও মুক্তি আন্দোলনে এবং খণ্ডিত জার্মানির একীকরণ আন্দোলনে তিনি মন দিলেন। মার্কস বললেন, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী ও সম্প্রাসরিত করতে হবে, তার মধ্যে টেনে আনতে হবে সাধারণভাবে পেতি-বুর্জোয়াদের, বিশেষভাবে কৃষকদের এবং অবশেষে সব বিত্তহীন শ্রেণীগুলোকে৩।
জার্মানির একীকরণ আন্দোলন সফল হবে সাধরণ মানুষের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে –এই ছিল মার্কসের মত। সুবিধাবাদী শ্রমিকনেতা লাসালে তার বিরোধিতা করলেন। লাসালের মতে রাষ্ট্র সব শ্রেণীর ঊর্ধ্বে, শ্রমিক আন্দোলন শান্তিপূর্ণ হবে এবং আইনের চৌহদ্দির মধ্যে নিজেকে সব সময় আটকে রাখবে। শ্রেণী-সংগ্রাম, স্ট্রাইক, ট্রেড ইউনিয়ন ভালো নয়, আর কৃষকরা হল ‘একটা প্রক্রিয়াশীল জনসমষ্টি’–এই ধরনের সব ধারণা ছিল লাসালের। তিনি সমাজতন্ত্রবাদের চরম শত্রু বিসমার্কের সঙ্গে গোপন চুক্তি করলেন এই বলে যে সর্বজনীন ভোটাধিকার যদি বিসমার্ক দেন তবে লাসালে শ্রমিকশ্রেণীকে দিয়ে তাঁর স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র নীতি সমর্থন করিয়ে দেবেন। মার্কস তাঁর ‘ক্রিচিক অব গৌথা প্রোগ্রামে’ লাসালের ভ্রান্ত ও শয়তানি মদবাদের সমালোচনা করেন।
তখন রাশিয়ায় সবে রাত কাটছে। প্রথম উষার আলো মার্কসের চোখ এড়াতে পারল না। তিনি অভিনন্দন জানালেন, বললেন, রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন আর আমেরিকায় দাসপ্রথাকে কেন্দ্র করে গৃহযুদ্ধ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় আন্তর্জাতিক ঘটনা।
জারের সাম্রাজ্যে যেমন ভাঙন ধরেছিল বোনাপার্টের ‘দ্বিতীয় সাম্রাজ্যে’ও তেমনি শান্তি ছিল না। ফরাসি-প্রুশীয় যুদ্ধে তাঁর সাম্রাজ্যের কবরের ওপর ‘জাতীয় প্রতিরক্ষার গভর্নমেন্ট’ প্রতিষ্ঠা হল। ১৮৭১ এর প্যারিসের শ্রমিকশ্রেণী প্যারিসকে রক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নিল। ‘জাতীয়’ সরকার প্রাশিয়ার কাছে আত্মসমর্পন করল কিন্তু শ্রমিকশ্রেণী নিজেদের শাসন-যন্ত্র গড়ে তুলল—ইতিহাসে যার নাম চিরঅম্লান সেই ‘প্যারিস কম্যুন’ জন্ম নিল। যে ভুলত্রুটির জন্যে কম্যুনের পতন হল তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কৃষক সমাজকে কম্যুনের পক্ষে আনা যায়নি। ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ বইখানিতে মার্কস ফরাসি-প্রুশীয় যুদ্ধের বিশ্লেষণ করলেন। প্যারিস কম্যুন সম্পর্কে মার্কস বললেন অবশেষে আবিষ্কৃত হল শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব কী রূপ নেবে —তাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কী রকম হবে। কম্যুনই হবে প্রোলেতারীয় একনায়কত্বের রাজনৈতিক সংগঠন। কম্যুন প্রমাণ করল যে শ্রমিকশ্রেণী বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্রকে দখল করে ব্যবহার করতে পারে না, তাদের উচিত হচ্ছে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে চুরমার করা এবং তার জায়গায় নিজস্ব শক্তি প্রয়োগের উপযোগী যন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। এ-কথা শুনে আমাদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগবে আইনসভায় সংখ্যাগুরু হয়ে মন্ত্রিত্ব আয়ত্ত করে সর্বহারার যে কল্যাণ আমরা চাই তা করা যাবে কি? আরেকটা প্রশ্নও ঠেকানো যাবে না এ হেন কল্যাণ-কর্মের কোনও ঐতিহাসিক নজির আছে কি?
প্যারিস কম্যুনের আগেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতি বা প্রথম আন্তর্জাতিক মার্কসের প্রাণান্ত পরিশ্রমে সংগঠিত হয়েছিল। কারণ পুঁজিবাদের ক্রমবিকাশ, সর্বহারার অবস্থার ক্রমাবনতি, ১৮৫৭-র বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট, বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এবং জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের অগ্রগতি বিপ্লবী চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, ব্যাপক করেছিল। ফ্রান্সের প্রুধঁ-পন্থীরা, ইংল্যান্ডের ঔইন-পন্থী ও সুবিধাবাদী ট্রেড-ইউনিয়ন নেতারা, ইতালির মাটসিনি ও জার্মানির লাসালের অনুসরনকারীরা মার্কস-এঙ্গেলসের বিরুদ্ধে কাজ করে যেতে লাগল। কিন্তু মতাদর্শগত সংগ্রামে মার্কসবাদের শত্রুরা শেষ অবধি পরাজিত হল। স্বপ্নচারী ও আপসপন্থীদের বৈপ্লবিক আন্দোলনে পরাজয় অনিবার্য। এই সময় রাশিয়ার বাকুনিন-পন্থীরাও মার্কসবাদের বিরোধী ছিলেন। বাকুনিন ছিলেন নৈরাজ্যবাদী এবং মার্কসের শ্রেণী-সংগ্রাম ও প্রাোলেতারীয় একনায়কত্বের তত্ব মানতেন না।
প্যারিসের শ্রমিকশ্রেণীর অস্থিরতা দেখে আন্তর্জাতিকের সভায় মার্কস অসময়ে, অপ্রস্তুত অবস্থায় তাদের বিদ্রোহ করার বিরুদ্ধে সাবধান করে দিলেন। কিন্তু যখন প্যারিস কম্যুনের খবর লন্ডনে পৌঁছাল তখন তিনি ফরাসি শ্রমিকনেতৃত্বকে ‘হঠকারী’ বলে গালাগাল করলেন না, বরং পৃথিবীর দেশে দেশে শত শত চিঠি পাঠালেন কম্যুনকে সমর্থন করে, তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে এবং কম্যুনকে রক্ষা করবার সংগ্রামে যুক্ত হবার আহ্বান জানিয়ে। খাঁটি বিপ্লবী চরিত্র একেই বলে। লেনিন ১৯০৫এ বলেছিলেন ‘বর্তমান আন্দোলনে আমরা সবাই কম্যুনের কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছি।’ মার্কস বললেন ফরাসি বিপ্লবের পরের ধাপ হবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চুরমার করা–সর্বত্রই গণবিপ্লবকে এই কাজটি করতে হবে। কম্যুনের শিক্ষা এই। ইংল্যান্ড ও আমেরিকা সম্বন্ধে অবশ্য মার্কসের অন্য আশা ছিল। স্তালিন তাঁর লেনিনবাদের সমস্যাবলি গ্রন্থে বলছেন ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় বুর্জোয়া গণতন্ত্র শান্তিপূর্ণ বিবর্তনের পথে প্রোলেতারীয় গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হবে মার্কস এ-রকম সম্ভাবনার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তিনি এ-কথা ভেবেছিলেন যখন একচেটিয়া পুঁজি এবং সাম্রাজ্যবাদের আবির্ভাব হয়নি এবং ওই দেশগুলো তাদের বিকাশের বিশেষ পরিবেশের দরুন আমলাতন্ত্র ও সমরবাদ কৃষ্টি করেনি। লেনিনকে উদ্ধৃত করে স্তালিন বলেছিলেন যে ১৯১৭ সালে প্রথম সাম্রাজ্যবাদী মহাযুদ্ধের যুগে মার্কসের ইংল্যান্ড আর আমেরিকা সম্বন্ধে ওই কথা আর খাটে না। এখন রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করা ছাড়া অন্য পথ নেই। স্তালিন এ-কথা বলে উপসংহারে বললেন সশস্ত্র প্রোলেতারীয় বিপ্লবের নীতি বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করবার নীতি –একটি অনিবার্য নীতি। তিনি আরও বললেন অবশ্য সুদূর ভবিষ্যতে যদি অধিকাংশ গুরুত্বসম্পন্ন পুঁজিবাদী দেশে সর্বহারারা জয়ী হয়ে যায়, যদি এখনকার পুঁজিবাদী বেড়াজালের বদলে সমাজবাদী পরিবেষ্টনী সৃষ্টি হয় তবে কোনও কোনও পুঁজিবাদী দেশের পক্ষে শান্তিপূর্ণ অগ্রগতির পথ উন্মুক্ত হওয়া খুবই সম্ভব–সে-দেশের পুঁজিবাদীরা ‘প্রতিকূল’ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দরুণ সর্বহারাশ্রেণীকে ‘স্বেচ্ছায়’ বেশ খানিকটা গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সুবিধা দেওয়া সুবিবেচনার কাজ মনে করবে। কিন্তু এ-অনুমান সুদূর ও সম্ভাব্য এক ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে প্রযোজ্য। আসন্ন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলতে গেলে এ-রকম অনুমানের কোনও ভিত্তি নেই। আবার লেনিনকে উদ্ধৃত করে স্তালিন বললেন বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে বলপ্রয়োগে ধ্বংস করে এবং তার জায়গায় একটি নতুন যন্ত্র বসানো ছাড়া সর্বহারার বিপ্লব অসম্ভব।
মার্কস-এঙ্গেলস থেকে আমরা লেনিন-স্তালিনে পৌঁছে গেছি। পৃথিবীর অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আমরা সাম্রাজ্যবাদের যুগে প্রবেশ করেছি। সুতরাং বিপ্লব সম্বন্ধে ধারণা ও কর্মকৌশল যুগ-পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু পরিবর্তিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী। লেনিনবাদ হচ্ছে এই সাম্রাজ্যবাদের যুগের মার্কসবাদ।
মার্কস এবং লেনিনের মধ্যে যুগের ব্যবধানের জন্য তফাৎ দাঁড়াল এই যে মার্কস বলেছিলেন বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পূর্ণ না করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পৌঁছানো যাবে না। মার্কস এই শিক্ষাও দিয়েছিলেন যে বুর্জোয়া বিপ্লবের সংগ্রামক্ষেত্র থেকে শ্রমিকশ্রেণী সোজা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে পদক্ষেপ করবে, বুর্জোয়া শ্রেণীকে তাদের শক্তিকে সংহত করবার সুযোগ দেবে না, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে দেবে না। মার্কসের এই তত্বকে কখনও কখনও স্থায়ী, অব্যাহত, অবিরাম বিপ্লবের তত্ব বলা হয়। ১৮৪৮-৫০-এর বৈপ্লবিক সংগ্রামের যুগে মার্কস শ্রমিকশ্রেণীকে শিক্ষা দিয়েছিলেন যে সাহায্য দিয়ে আর ধাক্কা দিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণীকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সংগ্রামে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বিপ্লব সফল হলে বুর্জোয়া শ্রেণী ক্ষমতা দখল করবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের গড়ে তুলতে হবে তাদের স্বতন্ত্র শ্রেণী-সংগঠন, তাদের নিজেদের পার্টি। এই পার্টি নিজেদের দাবি দাওয়ার ভিত্তিতে বিপ্লব চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না শ্রমিকশ্রেণী ক্ষমতা দখল করতে পারে। মার্কসের শিক্ষাকে সাম্রাজ্যবাদের যুগের ঐতিহাসিক পরিস্থিতি অনুযায়ী বিকশিত করে তুলে লেনিন ১৯০৫-এর রুশ বিপ্লবের সময় এই শিক্ষা দিলেন যে বুর্জোয়া-বিপ্লবে নেতৃত্ব শ্রমিকশ্রেণীর নিজের হাতে নিতে হবেই এবং প্রধান মিত্র হিসেবে কৃষকদের বিপ্লবী সংগ্রামে যুক্ত করতে হবে। বুর্জোয়া বিপ্লব বুর্জোয়াশ্রেণীকে গদিতে বসাবে না, শ্রমিক ও কৃষকের হাতে ক্ষমতা এনে দেবে। শ্রমিক-কৃষকদের অর্জিত এই ক্ষমতার নাম দিলেন লেনিন ‘শ্রমিক ও কৃষকদের বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব’। লেনিন আরো বললেন যে শ্রমিকশ্রেণী ক্ষমতা দখল করে যে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করে তা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নততর গণতন্ত্র। ১৯০৫-এর রুশ বিপ্লবে লেনিন যে নতুন পথ ধরলেন তা তাঁর ‘দুই কৌশল’ বইখানিতে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করা আছে। ওই পথ ধরেই অক্টোবরের মহান বিপ্লব সম্পন্ন হয়, ফেব্রুয়ারির বুর্জোয়া-বিপ্লবের পর এগিয়ে গিয়ে অক্টোবরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করা হয়। লেনিন ও স্তালিন হাতেকলমে প্রমাণ করলেন যে সাম্রাজ্যবাদের যুগে একটি মাত্র ধনতান্ত্রিক দেশেও সমাজতন্ত্রের বিজয় লাভ সম্ভব। সার্থক রুশ বিপ্লব বিশ্ব-ইতিহাসে নতুন যুগের সুচনা করল —সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগ।
বিপ্লবী আন্দোলনের গৃহশত্রু সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লেনিনকে অবিরাম সংগ্রাম করতে হয়েছিল। পুরোনো সংশোধনবাদী বের্নস্টাইন, কাউটস্কি, অর্থনীতিবাদী ও মেনশেভিকরা আর ট্রটস্কি এবং বুখারিন থেকে আরম্ভ করে আধুনিক কালের ত্রুুশ্চভ, তোরে, তোগলিয়াত্তি, আর লিউ শাও-চি –সবাই মার্কসবাদের বিপ্লবী তত্বের সংশোধন করে আসছে। আজকের পৃথিবীতে দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদই বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধানতম আভ্যন্তরীণ শত্রু। আধুনিক সংশোধনবাদীরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের তত্ব প্রচার করে দেশে দেশে মুক্তি আন্দোলনের বিপুল ক্ষতি করছে। এমনকি উপনিবেশবাদের অবসান হয়েছে এই সুখবর পরিবেশন করে তারা সাম্রাজ্যবাদের নয়-উপনিবেশিক কৌশলকে আঁচল দিয়ে আড়াল করে মুমূর্ষু সাম্রাজ্যবাদকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে জাতীয় মুক্তিবাদের দ্বন্দ্বকে তারা মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছে না।
প্রসঙ্গের টানে একটু ভাবীকালে চলে গেছি, এবারে ফিরি। স্তালিন এমিল লুডভিগকে বলেছিলেন যে তিনি নিজেকে লেনিনের শিষ্য হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করছেন। সত্যিই তাই। রুশ বিপ্লবে তিনি ছিলেন লেনিনের সুযোগ্য সহযোগী। লেনিনবাদ অনুসরণ করে তিনি উৎপীড়িত জাতিদের বিপ্লবী আন্দোলনে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সাহায্য করতেন। সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করবার ব্যাপারে আর বিশ্বময় সমাজতন্ত্রকে জয়ী করার সংগ্রামে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে তিনি উচ্চ মূল্য দিতেন। জাতীয় মুক্তির সমস্যা মূলত কৃষিবিপ্লবের সমস্যা এবং জাতীয় মুক্তির বিপ্লবে কৃষিবিপ্লবই হচ্চে মৌলিক ও চুড়ান্ত কার্যক্রম-এই ছিল তাঁর বিখ্যাত তত্ব। চীন বিপ্লবে তাঁর দান বিপুল। তিনি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন যে চিন বিপ্লবের প্রধান ঝোঁক হতে হবে কৃষক সমাজের উপর শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, লক্ষ লক্ষ কৃষকের অভ্যুত্থান ঘটানো, শ্রমিক-কৃষককে সশস্ত্র করা এবং সশস্ত্র প্রতি-বিপ্লবের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো। স্তালিন শেষবারের মতো যে-কংগ্রেসে যোগ দিতে পেরেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের কম্যুনিস্ট পার্টির সেই ১৯৫২-র অক্টোবরের ঊনবিংশ কংগ্রেসে তিনি বলেছিলেন কম্যুনিস্টরা জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পতাকা উচ্ছে তুলে ধরুন এবং এগিয়ে যান।’
চিনের বিপ্লব সর্বহারার বিপ্লব সম্পর্কে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ক্রমবিকাশের এক নতুন স্তর। লেনিন কম্যুনিস্টদের সেই সব বিজিত দেশ ও উপনিবেশগুলোর উপযোগী করে মার্কসবাদকে ব্যাখ্যা করতে উৎসাহিত করেছিলেন যেখানে কৃষকরা হচ্ছে জনসংখ্যার বিরাট সংখ্যাগুরু অংশও। মাও-ৎসে-তুং-এর নেতৃত্বে চীনের কম্যুনিস্ট পার্টিই লেনিনের শিক্ষাকে যথার্থ সার্থকতার গৌরবে উজ্জ্বল করে তুলেছে। মাও ৎসে-তুং এর মতবাদই সাম্রাজ্যবাদের পতনের যুগের মার্কসবাদ।
মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ক্রমবিকাশে মাও ৎসে-তুং-এর দান হচ্ছে এই বিপ্লব তত্ব যে সব দেশে জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষিই প্রধান স্থান দখল করে আছে সেখানে কৃষকসমাজকেই প্রধান বিপ্লবী শক্তি বলে গ্রহণ করতে হবে। শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে এই বিপ্লবী কৃষকসমাজ জাতীয় মুক্তি ও গণতন্ত্র জয় করে নেবে এবং সরাসরি সমাজতন্ত্রে পৌঁছাবে। সে সব দেশে কৃষকদের শুধু শ্রমিকশ্রেণীর সবচেয়ে বড়ো মিত্র মনে করা হয় না, শুধু সর্বহারাদের বিপ্লবী শক্তির সব চেয়ে বড়ো আধার বলে মনে করা হয় না, অধিকন্তু মনে করা হয় বিপ্লবের প্রধান শক্তি। সে-সব দেশে বিপ্লবকে সফল করতে যে-পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয় তা হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে অভ্যুত্থান। গ্রামাঞ্চলের উপর নির্ভরতা। গ্রামাঞ্চল থেকে শহর ঘেরাও। দীর্ঘকাল-স্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রাম। সুদৃঢ় মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি গঠন। বিপ্লবী শ্রমিক-কৃষক ফৌজ গড়ে তোলা। ব্যাপক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় যুক্তফ্রন্ট গঠন-যে ফ্রন্টের ভিত্তি হবে শ্রমিক-কৃষক।
ভিয়েতনামে চিন বিপ্লবের তত্বের সার্থক প্রয়োগ ওই তত্বের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। মাও ৎসে-তুং-এর কথার প্রতিধ্বনি করে হোচি মিন বলেছেন ‘ঔপনিবেশিক ও আধা ঔপনিবেশিক দেশে বিপ্লব প্রথমত এবং প্রধানত কৃষিবিপ্লব। ব্যাপক ও সুদৃঢ় জাতীয় ফ্রন্ট গঠন করবার মৌলিক ভিত্তি হবে কৃষকসাধারণ এবং শ্রমিকশ্রেণীর মৈত্রী।’ তাই হো চি মিন বলছেন ‘চিনের কম্যুনিস্ট পার্টি আধা ঔপনিবেশিক ও আধা-সামন্তবাদী দেশের পক্ষে আদর্শ কম্যুনিস্ট পার্টি৫।’১৯৬৩-তে ভিয়েতনাম ওয়ার্কা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নবম অধিবেশনে লে দুয়ান-এর স্বীকৃতি শুনুন
এই তত্বের (চিনের বিপ্লবের তত্বের) অনুশীলন ও সৃজনশীল প্রয়োগের ফলেই আমরা ভিয়েতনামি কম্যুনিস্টরা আমাদের দেশের বিপ্লবী লক্ষ্যকে জয়যুক্ত করেছি। অতীতে লেনিন বলেছিলেন যে রাশিয়ার বিপ্লবী রণকৌশল বিশ্বের সব কম্যুনিস্টদের পক্ষেই আদর্শ রণ-কৌশল, আজ আমরাও বলতে পারি যে চিনের বিপ্লবী রণ-কৌশল এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অগণিত কম্যুনিস্টদের পক্ষে আদর্শ রণ-কৌশল৬।
কিউবার বিপ্লবে নাকি মার্কসবাদের ভূমিকা কেন, কোনও সুসংহত তত্বেরই ভূমিকা ছিল না। গুয়েভারা বলেছেন ‘এই বিপ্লবের প্রধান অভিনেতাদের কোনও সুসমঞ্জস তাত্বিক মুল্যমান ছিল না’। তিনি এ কথাও বলেছেন যে স্বাভাবিকভাবেই মার্কসবাদী হয়ে যাওয়া উচিত৭। তিনি বোধ হয় বলতে চান যে কাজের মধ্য দিয়ে আপনা থেকেই মার্কসবাদসম্মত পথ এসে যায়। গুয়েভারা আরও বলেছেন যে হাতে-কলমে যারা বিপ্লব করে তারা বিজ্ঞানী মার্কসের দ্বারা পূর্ব-রচিত নিয়ম পালন করে। গুয়েভারা হয়তো বোঝাতে চান যে অজ্ঞাতেই এই ধরনের বিপ্লবীরা মার্কসীয় বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসরণ করেন। মার্কসবাদের অনুশীলনের আবশ্যিকতা তিনি স্বীকার করেন না। কাস্ত্রো-পন্থী তাত্বিক দ্যব্রে বলেছেন ‘এটা একটা সৌভাগ্যের কথা বলতে হবে যে ওরিয়েন্টের উপকূলে নাববার আগে ফিদেল মাও ৎসে-তুং-এর সামরিক বিষয়ের লেখাগুলো পড়েননি। তাই তিনি উপস্থিতমতো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এক সামরিক তত্বের মূল নীতি উদ্ভাবন করতে পেরেছিলেন৮। গুয়েভারা বলেছেন যে গুটিকয়েক বিপ্লবী কিউবায় অসাধ্য সাধন করেছেন। ব্যাপারটা এই দাঁড়াচ্ছে যে মাও ৎসে-তুং-এর তত্বের প্রয়োজন নেই, কিছু নির্ভীক দেশপ্রেমিক সশস্ত্র হয়ে গেরিলা বাহিনী বা ‘ফোকো’ গঠন করে শহর থেকে গ্রামে অভিযান চালালেই সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে—এই তাঁদের মত। কিন্তু গণচেতনাকে না জাগিয়ে রোমাঞ্চকর বিপ্লবী অভিযানের উপর আস্থা বৈজ্ঞানিক মার্কসবাদসম্মত নয়। ও-পথে বিপ্লবের সার্থকতাও আসে না। বলিভিয়ায় গুয়েভারার ব্যর্থ আত্মদান তার প্রমাণ। বলিভিয়ার অভিযান সম্পর্কে কাস্ত্রো করুণ সুরে বলছেন যে অভিযাত্রীদের বাঁচতে হলে নিজেদের শক্তির উপরই নির্ভর করতে হবে৯। জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এ-পরিণাম অবশ্যম্ভাবী। খোদ কিউবার আজকের চিত্র দেখুন ‘…কিউবার জমির বেশি অংশই সেই ক্ষুদে মালিকদের হাতে যারা অপরের কায়িক শ্রম থেকে মুনাফা লোটে…কৃষি-উৎপাদনে সমাজতান্ত্রিক নয় ধনতান্ত্রিক পদ্ধতি গড়ে উঠেছে….আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বুর্জোয়া শ্রেণীকে নেতৃত্বের আসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি …বরং বুর্জোয়া শ্রেণী আরও নিরাপদ হচ্ছে এবং নতুন নতুন ক্ষমতার আসন দখল করছে১০।
আজকের দিনের মার্কসবাদ অর্থাৎ মাও ৎসে-তুং-এর মতবাদ প্রয়োগ করলে কিউবার এ-রকম ভয়ংকর পরিণাম হত না। দক্ষিণ ভিয়েতনামে মাও-এর চিন্তাধারায় উদ্দীপ্ত গেরিলাদের বিজয়যাত্রার সঙ্গে বলিভিয়ার গেরিলাদের নাভিশ্বাসের তুলনা করলেই আমরা সঠিক পদ্ধতির প্রমাণ পেতে পারি।
এখন জিজ্ঞাস্য ভারত কোন পথে? ১৯২৫-এ স্তালিন বলেছিলেন ভারতবর্ষের বুর্জোয়া শ্রেণীর আপসপন্থী অংশটা ভারতীয় বিপ্লবের বিরুদ্ধে, মজুর-কিষাণের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। বলেছিলেন ভারতের মতো উপনিবেশে শ্রমিকশ্রেণীকেই মুক্তি আন্দোলনের নেতা করে তুলতে হবে, নেতৃত্ব থেকে বুর্জোয়া আর তাদের প্রতিনিধিদের সরিয়ে দিতে হবে১১। এরপর সি পি আই মহাযুদ্ধের আগে পর্যন্ত প্রায় চোদ্দো বছরে কী করলেন? যুদ্ধ এল। শ্রী পি.সি. যোশি পলিটব্যুরোর প্রস্তাব উদ্ধৃত করে বললেন ‘যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতার জন্য আমাদের সংগ্রাম তখনই সমস্ত জাতির মধ্যে ছড়াইয়া পড়িবে এবং প্রকৃতপক্ষে সফল হইয়া উঠিবে, যখন কংগ্রেস সংগ্রামের নেতৃত্ব লইবে১২।’ এরপর টীকা অনাবশ্যক। মহাযুদ্ধের সুযোগে মুক্তিসংগ্রামের সুবিধা সম্পর্কে আরেক জন সি পি আই নেতা শ্রী জি. অধিকারী বললেন ‘ভারতে ব্রিটিশ ও আমেরিকান ফৌজ মুক্তি ফৌজ হইতে বাধ্য১৩।’ এখানে টীকা আরও অন্যবশ্যক। তারপর এল ১৯৪৭-এর মেকি স্বাধীনতা–অশ্লীল আপসের অপজাত সন্তান।
ফর এ লাস্টিং পিস, ফর এ পিপলস ডেমোক্র্যাসি-তে ১৯৫০-এর ২৭-জানুয়ারি সম্পাদকীয় স্তম্ভে বলা হল ভারতের উপর চাপানো হয়েছে এক কৃত্রিম স্বাধীনতা। …এই অবস্থায় ভারতের কম্যুনিস্টদের কাজ হচ্ছে চিন এবং অন্যান্য দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করা। আশু কর্তব্য হল শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে ‘ইঙ্গ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে’ ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠন করা। ১৯৪৯-এর এশিয়া ও ঔশিয়েইনিয়া-অঞ্চলের ট্রেড ইউনিয়ন সম্মেলনে চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে বলা হল ‘সাম্রাজ্যবাদ ও তার গোলামদের পরাজিত করবার জন্য চীনের জনগণ যে পথ গ্রহণ করেছেন, জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনে ও নয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিভিন্ন ঔপনিবেশিক ও আধা ঔপনিবেশিক দেশগুলোর জনসাধারণেরও উচিত সেই একই পথ গ্রহণ করা।’
কিন্তু আমাদের দেশের ‘সরকারি’ কম্যুনিস্ট নেতৃত্ব তেলেঙ্গানা থেকে নকশালবাড়ি পর্যন্ত সে-পথের উপর প্রতি-বিপ্লবী আক্রমণ চালিয়েছেন এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের ধ্বজদণ্ডকে বসিয়েছেন বিপ্লবী মেরুদণ্ডের জায়গায়। অতীতে অখণ্ড সি পি আই মাও ৎসে-তুংকে ‘সূক্ষ্ম আবরণে ঢাকা সংশোধনবাদী’ বলেছিলেন ১৪। আজ দক্ষিণ ও বাম একই সুরে এবং প্রায় একই ভাষায় মাওৎসে-তুংকে সংকীর্ণতাবাদী বিচ্যুতির জন্য দায়ী করছেন। তবে ভরসার কথা গ্রামে গ্রামান্তরে কৃষি বিপ্লবের পথে চলার কঠিন অভিযান শুরু হয়েছে— ‘ তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে।’ শহুরে কংসের নিধন-যজ্ঞের আসল প্রস্তুতি চলছে দূর গোকুলে।
সূত্রনির্দেশ
১। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, গ্রন্থাবলি, রুশ সংস্করণ, ১ম খণ্ড, পৃ ৩৯২।
২। মার্কস-এঙ্গেলস নির্বাচিত রচনাবলি, ২য় খণ্ড, মস্কো, ১৯৫৫, পৃ ৩৪৩।
৩। লেনিন, রচনাবলি, চতুর্থ রুশ সংস্করণ, ২১ খণ্ড, পৃ ১২৮।
৪। পূর্বাঞ্চলের কম্যুনিস্ট সংগঠনগুলির সর্ব-রুশীয় দ্বিতীয় কংগ্রেসে ভাষণ লেনিন রচনাবলি, ৪র্থ রুশ সংস্করণ, ৩০ খণ্ড, পৃ ১৩৯-৪০।
৫। হো চি মিন নির্বাচিত রচনাবলি।
৬। লে দুয়ান বর্তমানের কতকগুলি আন্তর্জাতিক সমস্যা প্রসঙ্গে।
৭। সি.ডব্লিউ, মিলজ মার্কসবাদী।
৮। দ্যব্রে বিপ্লবের মধ্যে বিপ্লব, পৃ ২০ (পি. এল পত্রিকার ১৯৬৭-র নভেম্বর-ডিসেম্বর সংখ্যার উদ্ধৃতি থেকে)।
৯। ইনফরমেশন ফ্রম কিউবা, অক্টোবর, ১৯৬৭।
১০। ওয়ার্ল্ড রেভলিউশন, প্রথম খণ্ড, প্রথম সংখ্যা (পি. এল পত্রিকার ১৯৬৭-র নভেম্বর-ডিসেম্বর সংখ্যার উদ্ধৃতি থেকে)।
১১। প্রাচ্য দেশের শ্রমজীবীদের কম্যুনিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সভায় বক্তৃতা ১৮ মে, ১৯২৫।
১২ পি.সি. যোশি কমিউনিস্টদের জবাব পৃ ১৬
১৩। ‘স্তালিনের বক্তৃতা’র ভূমিকা –জি. অধিকারী পৃ ৮
১৪। কম্যুনিস্ট, ২য় খণ্ড, ৪র্থ সংখ্যা, পৃ ৭৭।
৬ষ্ঠ বর্ষ ২-৩ সংখ্যা
(কার্লমার্কস ১৯৬৮)
