সমাজতান্ত্রিক ‘বাস্তববাদ’-এর বিচার – সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

সমাজতান্ত্রিক ‘বাস্তববাদ’-এর বিচার – সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

The Trial Begins… Abram Tertz ; tr. by Max Hayward

New York, Pantheon Books.

On Socialist Realism Abram Tertz ; tr. by George Dennis

New York, Pantheon Books.

ছয় বৎসর পূর্বে কোনও একটি বিদেশি সাহিত্যপত্রে এব্রাম টার্টৎস ছদ্মনামে রচিত এক রুশ গল্প লেখকের বিচারের উদ্যোগ… বা The Trial Begins…উপাখ্যানটি যখন প্রথম পড়ি, তখন কল্পনা করতে পারিনি যে কাহিনিটির উপসংহারে বিদ্রুপিত তদন্তপদ্ধতি, বিচারানুষ্ঠান ও শাস্তিবিধান হুবহু স্বয়ং লেখকের ভাগ্যেই কিছুকাল পরে জুটবে। জানি না, এটাকে লেখকের পূর্বাশঙ্কা বলব না গল্পটিকে বাস্তব রূপদানের জন্য সোবিয়েত বিচারকদের এক উদ্ভট খেয়াল বলব। সম্প্রতি সোবিয়েত ইউনিয়নে আন্দ্রে সিনিয়াভস্কি ও য়ুরি দানিয়েল নামক দুজন সাহিত্যিক ‘মাতৃভূমি বিরোধী কুৎসারটনার’ অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে যথাক্রমে সাত ও পাঁচ বৎসরের জন্য ‘সংশোধনকারী শ্রমশিবিরে’ নির্বাসিত হয়েছেন। বিচারে প্রকাশিত হয়েছে যে The Trial Begins…এর রচয়িতা প্রথমোক্ত অপরাধী।

শাসকগোষ্ঠীর কাছে অবাঞ্ছিত সাহিত্য-রচনার অপরাধে লেখককে কারাগারে নিক্ষেপ, স্বদেশ থেকে বিতাড়ন বা হত্যার নজির ইতিহাসে নতুন নয়। বেশ কিছুকাল পূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অ-মার্কিনি কার্যকলাপ তদন্ত সংস্থার সম্মুখে সে দেশের কয়েকজন সন্মানিত নাট্যকার ও অভিনেতাদের কমিউনিস্ট বলে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। সোবিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতিতম কংগ্রেসের পর প্রকাশিত হয়েছে কীভাবে Boris Pilnyak, Isaak Babel ও Meyerhold-এর মতো কবি-সাহিত্যিক ও নাট্য প্রযোজকেরা স্তালিনের আমলে একে একে ‘অদৃশ্য’ হয়ে গেছেন। সম্প্রতি চিন থেকে যে সব খবর চুঁইয়ে আসছে, তা থেকে সন্দেহ হচ্ছে অনুরূপ ব্যবহার জুটেছে সে দেশের বিসংবাদী বুদ্ধিবিদদের ভাগ্যে। শুনেছি চৈনিক সৈন্যবাহিনীর মুখপত্র Liberation Army Daily-র সম্পাদকীয় স্তম্ভে অভিযোগ করা হয়েছে যে এই সব লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে হাঙ্গেরিতে ১৯৫৬ সালে ভিন্নমতাবলম্বী কমিউনিস্ট শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রতিষ্ঠিত ‘পেতোফি সার্কল’-এর প্রচারিত মতের প্রভাব পড়েছে। পেতোফি ছিলেন জনপ্রিয় হাঙ্গেরীয় কবি ; ১৮৪৯ সালের বিদ্রোহে শহিদ হন। তাঁর নামাঙ্কিত প্রতিষ্ঠানের সভ্যরা স্বদেশের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যাপকতর গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি জানিয়েছিলেন।

সুতরাং ‘পাশ্চাত্য গণতন্ত্র’ই হোক, ‘দক্ষিণপন্থী’ বা ‘বামপন্থী’ সমাজতন্ত্র-ই হোক, প্রতিষ্ঠিত মতবহির্ভূত সাহিত্য রচিত হলেই, তার বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠীর ভ্রূকুটি প্রতিহিংসাপরায়ণি হয়ে ওঠে। হতভাগ্যদের মধ্যে কেউ কেউ ত্রুটি স্বীকার করে আমলাতান্ত্রিক বিচারকমণ্ডলীর কাছ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছেন। মুক্তিপ্রাপ্তির এই সহজ পথ পরিহার করে সিনিয়াভস্কি ও দানিয়েল বিচারকক্ষে স্বমতে স্থিরসংকল্প থেকে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁরা স্বদেশের প্রতি অনুগত এবং কোনও অন্যায় করেছেন বলে বিশ্বাস করেন না। সাহিত্যের প্রকৃত বিচারক পাঠকসমাজ, ফৌজদারি আদালত নয় বলেই, সিনিয়াভস্কির রচনাকে সোবিয়েত ইউনিয়নের সরকারি সমালোচনার আলোকে না দেখে, নিরপেক্ষভাবে সাহিত্য রস বিচারের মাপকাঠিতে বিবেচনা করা উচিত।

বিচারের উদ্যোগ

একদা লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও জনপ্রিয় সাহিত্য-সমালোচক সিনিয়াভস্কি রচিত কাহিনিটি কিছুটা উদ্ভট, রসাত্মক বলে বর্ণনা করা যেতে পারে। প্রস্তাবনায় বর্ণিত হচ্ছে গভীর রাত্রে কোনও এক লেখকের (যিনি উত্তম পুরুষে এ কাহিনি বিবৃত করেছেন) গ্রেপ্তারের ইতিহাস। সাদা পোশাক পরিহিত সেপাইদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ লেখক দেখতে পেলেন তাঁর ঘরের দেওয়াল স্বচ্ছ কাচ হয়ে যাচ্ছে, আর শহরের উপরে আকাশে একটা বিরাট রক্তাপ্লুত মুঠো। তার বিশাল ছায়া যেন রাস্তাঘাট, বাড়ি-ঘরগুলোকে ফালি ফালি করে কেটে দিল-তাদের অভ্যন্তরে ঘুমন্ত মানুষগুলোকে প্রত্যক্ষ করা গেল। শুধু একজন মানুষই এই নিদ্রিত শহরে জেগে আছে; নিজের ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে শহরটার দিকে সে তাকিয়ে রয়েছে। আকাশ থেকে প্রভুর কণ্ঠস্বর ভেসে এল – এই লোকটিই তোমার গল্পের নায়ক-ভলাদিমির -আমার প্রিয় বশংবদ দাস। ওকে অনুসরণ করো, রক্ষা করো জীবন দিয়ে, মহিমান্বিত করে তোলো।

তারপর গল্পের শুরু। ভলাদিমির গ্লোবোভ সরকারি অভিশংসক। র্যাবিনোভিচ নামে এক স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে ভ্রূণ হত্যার অভিযোগ প্রস্তুতকরণে যখন গ্লোবোভ ব্যস্ত, ঠিক তখনই গ্লোবোভের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, মারিনা গোপনে গর্ভপাত ঘটায়। মারিনা রঙিন পুতুল বিশেষ ; দেহ-সৌষ্ঠব বজায় রাখবার জন্য মা হতে অনিচ্ছুক। নিজের সংসারে এই অদৃষ্টের পরিহাসে নিষ্ঠাবান ও আত্মতৃপ্ত গ্লোবোভ প্রায় হতবুদ্ধি। আবার অন্যদিকে তার প্রথম পক্ষের পুত্র সেরিওঝার কৈশোরের স্বভাবসম্মত বৈপ্লবিক কথাবার্তা ক্রমশই গ্লোবোভের পক্ষে অসুবিধাজনক হয়ে উঠছে। ন্যায় ও অন্যায় যুদ্ধ সংক্রান্ত প্রশ্ন তুলে সেরিওঝা তার বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অপ্রতিভ করে তোলে। তার টাটকা কিশোর দৃষ্টিতে সোবিয়েত সমাজব্যবস্থাতেও ধনবৈষম্য ও অন্যায় অপরাধের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সহপাঠিনীর সঙ্গে বসে সে রঙিন কল্পনার জালে বোনে ভবিষ্যতের আসল সাম্যবাদী সমাজ, যে সমাজে বন্দীশালা থাকবে না ; রাস্তায় শ্লোগান থাকবে মায়াকভস্কির কবিতা থেকে। একটা গোপন ষড়যন্ত্রের আবহাওয়া নিজের চতুর্দিকে তৈরি করে সেরিওঝা চিন্তা করে বিশ্ববিপ্লব কীভাবে সংগঠিত করা যায় এবং এই ভাবে দুরন্ত স্বপ্ন দিয়ে তার কিশোরকল্পনার ক্ষুধা মেটায়। শেষে এই কিশোরের একটি রচনা গিয়ে পড়ে মারিনার প্রেমিক কারিনস্কির হাতে। অকৃতকার্য বুদ্ধিবিদ কারিনস্কির ছিদ্রান্বেষী মানসিকতা সেরিওঝার রচনায় ‘ট্রটস্কিবাদের’ প্রভাব আবিষ্কার করে। সেরিওঝা ধরা পড়ে ও তার বিচার হয়। আইননিষ্ঠ দেশপ্রেমিক গ্লোবোভ তার ‘দেশদ্রোহী, প্রতিবিপ্লবী’ পুত্রকে ত্যাগ করেন।

উপসংহারে রয়েছে এক শ্রমশিবিরের বর্ণনা। তিনটি বন্দী কার্যরত – স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ র্যাবিনোভিচ, সেরিওঝা ও লেখক স্বয়ং। লেখকের বন্দী শিবিরে আগমনের হেতু বিচিত্র। যে প্রভুর আদেশে তিনি ভলাদিমির গ্লোবোভের গল্প লিখেছিলেন, তাঁর ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়েছে। সারাদেশব্যাপী তাঁর জীবনের পুর্নমূল্যায়ন চলছে। লেখকের বিরুদ্ধে অভিযোগ – কুৎসা-রটনা, অশ্লীলতা এবং রাষ্ট্রের গোপনীয়তা ফাঁস করা।

যাই হোক, র্যাবিনোভিচ মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে একটা পুরাতন মরচে পড়া ছোরা আবিষ্কার করে ফেলে। তার হাতলটা ক্রুশবিদ্ধ যিশুমূর্তির আকারে খোদাই করা। ছোরাটা তুলে ধরে র্যাবিনোভিচ বলে -‘ওরা ভগবানের বসার জন্য কেমন একটা জায়গা বেছেছে, দেখেছ? মারাত্মক অস্ত্রের হাতলে। …এক সময় ভগবান-ই ছিল লক্ষ্য, এখন কিন্তু ওরা তাকে উপলক্ষ বানিয়েছে ; সে একটা হাতল মাত্র। ছোরাটা ছিল উপলক্ষ, এখন সেটাই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দু’জনে জায়গা পালটেছে।’

তার অসংলগ্ন কথাগুলো শুনতে শুনতে লেখক অস্বস্তি অনুভব করেন; বলেন – ‘তোমার ওই সব ধর্মকথা ঢের শুনেছি। কে না জানে, ভগবান বলে কিছুই নেই? আমরা ভগবানে বিশ্বাস করি না। আমরা দ্বান্দ্বিকতায় আস্থাবান।’

র্যাবিনোভিচ পাগলের মতো ছোরাটা আকাশের দিকে তুলে বলে, ‘আরে আমি কি তোমার সঙ্গে তর্ক করছি নাকি? মোটেই না। আগে ছিল ভগবানের নামে! তারপর ভগবানের সাহায্যে! তারপর শুনলাম ভগবানের পরিবর্তে! ভগবানের বিরুদ্ধে! এখন শুনছি ভগবান-ও নেই, আছে শুধু দ্বান্দ্বিকতা। বেশ! তবে নতুন ছোরা ঢালাই করো এই নতুন উদ্দেশ্যে।’ এ কথাগুলো লেখকের কাছে এবার সত্যই উন্মাদের প্রলাপ বলে মনে হল।

এই সংক্ষিপ্তসার থেকে প্রতীয়মান হওয়া উচিত যে The Trial Begins… একটি বিস্ফোরক গল্প নয়। এ গল্প সোবিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশিত হলে সে দেশে প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা দেখা দিলে বলতে হয় যে সোবিয়েত সমাজব্যবস্থার ভিত্তিটা নেহাতই ঠুনকো। তাছাড়া বিচারে, সিনিয়াভস্কি বলেছিলেন যে, গল্পটা রচিত ১৯৫৬ সালে এবং বর্ণিত ঘটনার সময়কাল ১৯৫২ সালের শেষাংশ থেকে ১৯৫৩ সালের শুরু পর্যন্ত – অর্থাৎ ‘স্তালিন যুগের’ অন্তিম কয়েক মাস। এর ইঙ্গিত গল্পের মধ্যেও রয়েছে, যেমন ‘চিকিৎসকদের ষড়যন্ত্রের’ উল্লেখ এবং স্তালিনের শবানুগমন মিছিলের বর্ণনা। এই যুগের সোবিয়েত সমাজব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতির সমালোচনাকে যদি ‘মার্তৃভূমি বিরোধী কুৎসরটনা’ বলে অভিহিত করা হয় তাহলে ক্রুশ্চভের বক্তৃতা ও রচনাগুলিকেও সোবিয়েত ইউনিয়নে বে-আইনি বলে ঘোষিত করা উচিত।

যাই হোক, ইংরেজি অনুবাদে The Trial Begins… পড়ে গল্পটিকে খুব উচ্চস্তরের মর্মস্পর্শী শিল্পকর্ম বলেও আমার মনে হয়নি। একে কেন্দ্র করে বিচারের প্রহসন, অস্বাভাবিক ধরনের দীর্ঘমেয়াদী দণ্ডাদেশ এবং গল্পে বর্ণিত লেখকের ভাগ্য-বিড়ম্বনার সঙ্গে স্বয়ং লেখক সিনিয়াভস্কির দুর্দশাভোগের এমন অদ্ভূত সাদৃশ্য না ঘটলে গল্পটির এই পুনর্বীক্ষণের হয়তো কোনও প্রয়োজনই হত না।

যতদূর মনে পড়ে, Solzhenytsin-এর One Day in the life of Ivan Denisovitch-এর প্রকাশের পর, বিদেশি ভাষায় তার অনুবাদ ও প্রচারের দায়িত্ব স্বতঃস্ফূ র্তভাবে নিয়েছিলেন সোবিয়েত ইউনিয়নের সাহিত্যিকদের সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সিনিয়াভস্কিকে গোপনে ছদ্মনামে তাঁর রচনা বিদেশে পাঠাতে হয়েছিল এবং বিদেশি পত্র-পত্রিকাতেই তার প্রথম প্রকাশ। তাঁর বিরুদ্ধে এটাও একটা অভিযোগ। দু’জনের লেখাই স্তালিন-বিরোধী মনোভাবে আচ্ছন্ন ; অথচ দুজনের প্রতি দুধরনের ব্যবহার দেখছি। তার কারণ নিহিত রয়েছে Solzheytsin-এর উপন্যাসের থেকে সিনিয়াভস্কির গল্পের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র চরিত্রের মধ্যে। এবং এইখানেই The Trial Begins…-এর বৈশিষ্ট্য।

সিনিয়াভস্কির গল্পে বিদ্রুপবাণ কেবলমাত্র স্তালিন-যুগীয় শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধেই বর্ষিত হয়নি, সাধারণ নাগরিক জীবনে ব্যাপ্ত স্থূলরুচি, আত্মসন্তুষ্টি, সন্দেহপ্রবণতা ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধেও সরব। সমস্ত উপাখ্যান জুড়ে রয়েছে একটা আস্থাশূন্য উপহাসের ভাব। এ উপহাসের লক্ষ্য গল্পে বর্ণিত লেখক-ও। সিনিয়াভস্কির ভাষায়-(বিচারে জেরার উত্তরে প্রকাশিত) এই লেখকটি আসলে ‘ভীরু ও মাহাত্ম্য-কীর্তনবিলাসী।’ তাই উপসংহারে, গ্লোবোভের পদোন্নতির সংবাদ পেয়ে সে উল্লসিত হয়ে ওঠে। গ্লোবোভের নিয়মানুগত্য এবং নিজের সংসারে তার স্ত্রীর কাছে পরাজয় এবং শেষে তার সুবিধাবাদী মনোভাবের প্রকট প্রকাশ – এ সমস্তই স্তুতিচ্ছলে নিন্দিত হয়েছে। একই সুরে বর্ণিত হয়েছে গ্লোবোভের স্ত্রী মারিনার প্রতি কার্লিনস্কির প্রণয়াসক্তি। বহুদিনের সাধ্য সাধনার পর সে যখন একদিন রাত্রে মারিনাকে অবশেষে স্বগৃহে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, চরম মুহূর্তে উপলব্ধি করে যে সে শক্তিহীন। মারিনার শীতল দেহ ও হৃদয়হীন ঠাট্টার সন্মুখে কার্লিনস্কির নিজেকে উত্তেজিত করার চেষ্টা, পাঠকের কাছে হাস্যকর মনে হয়। সারা উপাখ্যান জুড়ে সে তার কাপট্য ও পুথিগত পাণ্ডিত্য দ্বারা পাঠক-সমাজকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তাই তার অন্তিম পরাজয়ে সে কারুরই সমবেদনা পায় না।

কখনও শ্রদ্ধা প্রকাশ বা কখনও দয়া প্রদর্শনের ছদ্মবেশে সর্বস্তরের মানুষের প্রতি সিনিয়াভস্কির এই জাতীয় পরিহাস নিঃসন্দেহে জনসাধারণবিরোধী মনোভাবের পরিচায়ক। কিন্তু The Trial Begins… পড়তে পড়তে যে সত্যটা বারবার অস্বস্তিকরভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তা হল – স্থূলবুদ্ধি জনসাধারণ ও তাদের নেতাদের স্বার্থপরতা, আত্মসন্তুষ্টি ও গুরুভক্তিই স্তালিনবাদের আমলাতন্ত্রকে সম্ভব করে তুলেছিল। দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর ধরে সাধারণ নাগরিকের স্বাধীন বিচারক্ষমতার উন্মেষে উৎসাহদান না করে, ঊর্ধ্বতন নেতার অব্যর্থতায় ভক্তি উৎপাদনে তাকে নিয়োজিত করার ফলে জনসাধারণের জীবনে যে বিকৃতি এসেছিল তার উল্লেখ সোবিয়েতে সরকারি স্তালিনবিরোধী বক্তৃতা বা Solzhenytsin-এর উপন্যাসেও দেখতে পাইনি।

সিনিয়াভস্কির গল্পে একমাত্র সুস্থ চরিত্র সেরিওঝা, হয়তো অপাপবিদ্ধ কৈশোরের প্রতিনিধি বলে। বয়স্কদের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির সঙ্গে তার তাজা দৃষ্টিভঙ্গি, স্বপ্ন দেখার সাহস, বারংবার ধাক্কা খায়। তার একটা সামান্য শিশুসুলভ পরিকল্পনা, যেটা কল্পনার স্তরেই হয়তো থেকে যেত, যেভাবে স্বভাবত উদাসীন বয়স্ক সমাজকে হঠাৎ উত্তেজিত করে তোলে, তার বর্ণনায় সিনিয়াভস্কির সেই উপহাসের সুরের সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভটত্ববোধের পরিচয়ও মেলে। এর ফাঁকে বেরিয়ে এসেছে এই কিশোরের প্রতি লেখকের মমত্ববোধ – যার প্রকাশ গল্পটিতে প্রাণের উত্তাপ এনেছে। সুতরাং The Trial Begins… এ সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী উপন্যাসের রচনার নিয়মানুযায়ী সাধারণ সোবিয়েত নাগরিকের প্রতি যেরকম অনিয়ন্ত্রিত প্রশংসার উচ্ছ্বাস নেই, তেমনি আবার অপ্রশমিত উপহাসের তিক্ততাও নেই।

সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ

সিনিয়াভস্কির বিচার শুধু The Trial Begins… এর পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেয়নি, লেখকের আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবন্ধের অস্তিত্বের সন্ধান দিয়েছে। বস্তুত, সিনিয়াভস্কির On Socialist Realism (এপ্রবন্ধটির রচনাও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে গণ্য হয়েছে) এই গল্পটির সম্পূরক। তাঁর চিন্তাশীলতার ছাপ গল্প থেকেও এই প্রবন্ধে অনেক বেশি পরিস্ফুট এবং সমালোচকরূপে তাঁর খ্যাতি প্রমাণিত করে। The Trial Begins… এর মতো গল্পের কেন প্রয়োজন, তার উত্তর মিলবে On Socialist Realism-এ।

উল্লিখিত প্রবন্ধের প্রথমাংশে আলোচিত হয়েছে সোবিয়েত সমাজের পরম উদ্দেশ্যমূলক (teleological) চরিত্র। সাম্যবাদই একমাত্র পরম-উদ্দেশ্য যাতে সোবিয়েত নাগরিক বিশ্বাসী। এর ফলে, লেখকের মতে, অতীতের প্রতি সহনশীলতা বা ঐতিহাসিক ঘটনার পক্ষপাতশূন্য বিচারের চেষ্টা ব্যাহত হয়। সমগ্র অতীতকে, সাম্যবাদের জয়যাত্রার বিভিন্ন স্তর বলে বিশ্লেষণের প্রবণতা দেখা দেয়; সব কিছুকেই সাম্যবাদের সীমাবদ্ধ পরিভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়; অন্য ব্যাখ্যার সম্ভাবনা বা কোনও ঘটনার ভিন্ন কারণ প্রদর্শনের চেষ্টা অবহেলিত হয়।

এই জাতীয় চরম উদ্দেশ্যে অটল ও উদ্ধত বিশ্বাসের ফলে মহৎ আদর্শের নামে অতি নিকৃষ্ট নিমিত্ত ব্যবহৃত হয়েছে। লেখকের ভাষায়

চিরকালের জন্য যাতে কারাগার অবলুপ্ত হয়, তাই আমরা নতুন কারাগার তৈরি করলাম। সমস্ত সীমান্ত যাতে বিলীন হয়ে যায়, তার জন্য নিজেদের চতুর্দিকে একটা চৈনিক প্রাচীর নির্মাণ করলাম। পরিশ্রম যাতে আনন্দদায়ক হয়, তাই বাধ্যতামূলক শ্রম প্রবর্তন করলাম। ভবিষ্যতে যাতে একবিন্দুও রক্তপাত আর না হয়, তার জন্য আমরা আরও হত্যা এবং আরও হত্যা করলাম।…অর্জিত সাফল্যের সঙ্গে মূল লক্ষ্যের কখনওই মিল থাকে না। লক্ষ্যে পৌঁছবার জন্য যেসব উপায় অবলম্বিত হয় তা রূপ পালটে অচেনা হয়ে যায়।

এ কথাগুলো ইদানীং অনেকেই অনেকভাবে বলেছেন। এ বক্তব্যের অনেক কিছু সম্বন্ধে আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু সিনিয়াভস্কির বিশেষত্ব যে তিনি এ থেকে তাঁর দেশের সাহিত্য এবং বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ সম্বন্ধে একটা নতুন সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন। সাম্যবাদের পরম আদর্শে অচলা ভক্তির ফলে সাহিত্যে প্রবর্তিত হল এক জাতীয় সদর্থক বা positive নায়ক, যার হৃদয়ে কোনও অন্তর্দ্বন্দ্ব বা দ্বিধা নেই, যে কখনও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে না, যার চরিত্রাঙ্কনে মাত্র একটি রঙেরই ব্যবহার।

এই জাতীয় নায়ক সৃষ্টির কঠিন নিয়মের গণ্ডীতে আবদ্ধ থেকেও সোবিয়েত সাহিত্য, সিনিয়াভস্কির মতে, হয়তো শিল্পকর্ম হয়ে উঠতে পারত। প্রাচীন যুগে ধর্মীয় সংকীর্ণতা দ্বারা নির্দেশিত হয়েও মহৎ শিল্পকর্ম রচনার নজির আছে। ‘সাহিত্য একনায়কত্বের নিদারুণ নিয়মতান্ত্রিকতা সহ্য করতে পারে, কিন্তু ভিন্ন রচনাশৈলীর সারমিশ্রণ বা eclecticism সাহিত্যে অচল।’

সোবিয়েত সমাজতান্ত্রিক বাস্তববামাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ এই eclecticism-এর পরিচায়ক। সিনিয়াভস্কির ভাষায়

সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের নিয়মানুসারে সদর্থক নায়ক সৃষ্টি করা এবং সঙ্গে সঙ্গে তাকে একটি psychological চরিত্র রূপে-ও সদর্থক নায়ক ও তার চরিত্রের মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ, সুর-চড়ানো রচনাশৈলী ও অলংকারপূর্ণ ভাষার বক্তৃতার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ জীবনের বাস্তববাদী বর্ণনা – এই জাতীয় পরস্পরবিরোধী প্রবণতার সঙ্গতি স্থাপন করতে গিয়ে একটা বিরক্তিকর সাহিত্যিক খিচুড়ি বেরিয়ে আসে। … মনে হয়, ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ’ – এই কথাটার মধ্যেই একটা অসঙ্গতি আছে। সমাজতান্ত্রিক শিল্পকর্ম – অর্থাৎ একটা উদ্দেশ্যমূলক শিল্প – কখনোই উনবিংশ শতাব্দীর বাস্তববাদের বিশেষ রীতিতে সৃষ্টি হতে পারে না। বাস্তব জীবনের প্রকৃত সত্যানুসারী বর্ণনা কখনোই পরম উদ্দেশ্যমূলক ভাষায় করা যেতে পারে না। সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ যদি বাস্তবিকই পৃথিবীর মহত্তর শিল্পরীতির পর্যায়ে উন্নীত হতে চায় এবং তার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম সৃষ্টি করতে চায়, তবে তার একমাত্র উপায় ‘বাস্তববাদ’কে বর্জন করতে হবে। একটা সমাজতান্ত্রিক অ্যানা ক্যারেনিনা বা একটা সমাজতান্ত্রিক চেরি অর্চার্ড লিখবার বেদনাদায়ক ও ব্যর্থ চেষ্টা পরিহার করতে হবে।

স্তালিন পুরস্কারপ্রাপ্ত অধিকাংশ সোবিয়েত উপন্যাস যদি কেউ পড়ে থাকেন, তাহলে বুঝতে পারবেন সিনিয়াভস্কির উপরোক্ত বক্তব্য কতখানি যুক্তিসংগত। স্তালিনোত্তর যুগে বা বিস্তালিয়ান সময়কালে, সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী সাহিত্যে সুর-চড়ানো বা অলংকারাধিক্য অনেকটা কমে যেতে বাধ্য হয়েছে। সিনিয়াভস্কির মতে

স্তালিনের মৃত্যুর পর, আমাদের শিল্প, আদর্শ ও জীবনের জয়গান আর উঁচু সুরে গাইতে পারে না, যা হওয়া উচিত, তাই বাস্তবে হয়েছে বলে দাবি করতে পারে না। যেসব সাহিত্য জীবনকে রঙিন করে দেখাতে চেষ্টা করে, তার মধ্যে কাপট্যের সুরটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবচেয়ে সার্থক সাহিত্যিক তাঁরাই, যাঁরা আমাদের সাফল্যগুলোকে নিখুঁত ভাবে বর্ণনা করেন এবং আমাদের অক্ষমতাগুলোকে যতদূর সম্ভব কৌশলে কোমল, উপাদেয় করে তোলেন। যে সাহিত্যকর্ম অতিমাত্রায় পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, অর্থাৎ বাস্তববাদের শরণাপন্ন হয়, তার বিপদ। যেমন ঘটেছিল দুদিনৎসেভের নট বাই ব্রেড অ্যালোন-এর ভাগ্যে।

সেই কারণে, সিনিয়াভস্কির মতে, বর্তমানে সোবিয়েত ইউনিয়নে যে সাহিত্য রচিত হওয়া উচিত তার চরিত্র হবে উদ্ভটরসাত্মক। এ শিল্পকর্মে থাকবে ‘মহৎ উদ্দেশ্যে প্রচারের পরিবর্তে প্রকল্প বা অনুমানাত্মক ঘটনার বিবরণ, সাধারণ জীবনযাত্রার বাস্তববাদী বর্ণনার পরিবর্তে অদ্ভুত অবাস্তবের প্রবর্তন। এই শিল্পই যুগমানসের সবচেয়ে যথোপযুক্ত প্রতিনিধি হতে পারে। হফম্যান ও ডস্টয়েভস্কির, গোইয়া, শগাল ও মায়াকভস্কির এবং আরও অন্যান্য বাস্তববাদী ও অবাস্তববাদী শিল্পী-সাহিত্যিকদের উদ্ভট রূপকল্প আমাদের দীক্ষিত করুক, অদ্ভুত ও অসম্ভবের সাহায্যে সত্যনিষ্ঠ হবার কর্তব্যে। এই সিদ্ধান্তে On Socialist Realism -এর উপসংহার।

উদ্ভট সাহিত্য

কিম্ভূতকিমাকার এই হাস্যকর জগৎ রচনার প্রয়োজন কেন? এ সমস্যার গভীরে সিনিয়াভস্কি প্রবেশ করেননি। অথচ শিল্পসাহিত্যে absurdity অথবা অদ্ভুত রসের ঐতিহ্য দীর্ঘকালব্যাপী এবং সারা পৃথিবী জুড়ে। আধুনিক কালে ইউরোপীয় নাট্যজগতে এটা একটা বিশেষ প্রবণতা রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। মনে হয় এর সূত্র রয়েছে একালের যুগধর্মে।

আসলে এ যুগটা একদিকে যেমন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের তীক্ষ্ণতার যুগ, অন্যদিকে ব্যক্তির অবলুপ্তির যুগও বটে। আত্মবিরোধী শোনালেও এ উক্তি সত্যবিরোধী নয়। কারণ, ব্যক্তিত্বের ক্রমবিকাশের অর্থই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের তীব্রতাবৃদ্ধি, বুদ্ধির চর্চার দ্বারা প্রতিটি মানুষের নিজস্ব স্বতন্ত্র ধ্যানধারণার সম্প্রসারণ এবং তার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ তার প্রতিবেশী থেকে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গ আত্মমগ্নতা। অন্যদিকে ব্যক্তি-মানুষের বীরত্বপ্রদর্শন বা একক কর্মের দ্বারা সমাজকে প্রভাবান্বিত করার সুযোগ বর্তমানে ক্রমশই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। গোষ্ঠীসৃষ্ট ব্যাপক শাসনব্যবস্থায় সে একটা সামান্য বলটু বিশেষ। একদা যে যুদ্ধ, ব্যক্তিবীরের সাহসপ্রদর্শনের মল্লভূমি ছিল, আজ তা কন্ট্রোলরুমে বসে মাত্র কয়েকটি বোতাম টেপায় পরিণত হয়েছে। সমাজের সর্বগ্রাসী শক্তির কাছে সাধারণ মানুষের অক্ষমতা ও অসার্থকতা ক্রমশই প্রকট হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিচ্ছিন্নতার ফলে, আধুনিক বুদ্ধিবিদ প্রয়োজনীয় দূরত্ব থেকে তার নিজের প্রতিবেশীদের অবস্থাটা অত্যন্ত মোহমুক্ত হয়ে নির্মমভাবে বিচার করতে সক্ষম। প্রাচীন গ্রিক নাটকে অতি সাহসী বীরও সর্বশক্তিমান ভাগ্যবিধাতার হাতে ক্রীড়নকতুল্য ছিল ; তার সংগ্রাম ও পরাজয়ের পরিণতির মধ্যে নাট্যকারেরা মহাকাব্যীয় বেদনা আবিষ্কার করতে পারতেন। আধুনিক নাট্যকার অনুরূপ অনুপস্থিত কোনও অতিপ্রাকৃতে আস্থাহীন। গোষ্ঠী-মানবের নিজেদেরই সৃষ্ট সমাজ ও শাসনব্যবস্থার সর্বগ্রাসী শক্তির কাছে ব্যক্তি-মানুষের অক্ষমতা ও অসার্থকতাবোধ আধুনিক আস্থাহীনতার জন্মদাতা। সদা পলায়মান এক উদ্দেশ্যের পিছনে অর্থহীন ছুটোছুটিকে দূর থেকে দেখলে হাসি পাবে। আধুনিক সাহিত্যিকের চোখে তাই এ যুগের মানুষের আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব ঠাট্টার উপাদান। এই সর্বব্যাপী উপহাসের আলিঙ্গন থেকে – নির্যাতক ও নির্যাতিত-কেউই বাদ যায় না। এবং যেহেতু মানুষের এই অকিঞ্চনত্ব দেশ ও কালের সীমা নিরপেক্ষ, উদ্ভটত্বের সাহিত্যিকেরা তাঁদের চরিত্রদের নিয়ে যান এক অবাস্তব আবহাওয়ায়, যেখানে বাস্তব জীবনের দৈনন্দিন আইন-কানুন অচল। আসলে এটা এক ধরনের বিমূর্ততা। অবাস্তব জগতের পরিকল্পনায় বর্তমান সমাজের অমানবিক আবহাওয়াটাকে অতিরঞ্জিত করা যায় এবং সাধারণ মানুষের অক্ষমতাটাকে তার অন্য সমস্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখানো যায়। কাফকার The Trial-এর কথা মনে পড়ে যায়।

অথবা, ধরা যাক, মানুষের চিরকালীন ধর্ম-‘প্রতীক্ষার কথা’। সারা জীবনব্যাপী এ প্রতীক্ষা হয়তো ভগবানের জন্য, বা কোনও আদর্শের সাফল্যের জন্য বা কোনও ব্যক্তিত্বের আবির্ভাবের আশায় কিংবা সব যন্ত্রণার শেষ-মৃত্যুর জন্য হতে পারে। দেশ ও কাল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে এই প্রতীক্ষার যন্ত্রণা, বৈচিত্র্যহীনতার বিরক্তি, ও হাস্যকর অর্থহীন পরিণতিকে যদি বিমূর্ত করে দেখাতে হয়, তাহলে হয়তো বেকেটের ওয়েটিং ফর গোডো-র মতো নাটকের জন্ম হয়।

কিংবা আধুনিক সমাজের বিভিন্ন প্রবণতাকে পরিহাসের জন্য উদ্ভট জগৎ সৃষ্টির নেপথ্যে হয়তো লেখকদের ছদ্মবেশ ধারণের অভিপ্রায় থাকতে পারে। সুকুমার রায়ের ‘শিব ঠাকুরের আপন দেশে’ বা ‘রাম গরুড়ের ছানা’র মতো আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ ছড়ার অন্তরালে যে ব্যঙ্গের অব্যর্থ লক্ষ্য রয়েছে, অনুরূপ বিদ্রুপ অবিষ্কার করা যায় উদ্ভটের বিমূর্ত ছদ্মবেশে যে জগৎ তৈরি হচ্ছে আধুনিক সাহিত্যিকদের রচনায়। Ionesco-র রাইনোসেরাস-এ আবহাওয়াটা অবাস্তব হলেও এত স্বচ্ছ যে তার আড়ালে আধুনিক সমাজব্যবস্থায় স্থূলচর্মী প্রবৃত্তির ক্রমবর্ধমানতা এবং ব্যক্তি-মানুষের মানসিক সংকটের প্রতিচ্ছবি খুঁজে নিতে সংবেদনশীল পাঠকের অসুবিধা হয় না।

যাই হোক, উদ্ভট সাহিত্য বিষয়ে এতগুলো কথা বলার দরকার হল এই জন্যই যেহেতু সিনিয়াভস্কির প্রবন্ধে এই সাহিত্যরীতির প্রয়োজনীয়তা উল্লিখিত হয়েছে, এবং তার প্রকাশের চেষ্টা তাঁর গল্প The Trial Begins…। এ চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে সফল হয়েছে বলা চলে না ; কারণ যে eclecticism-এর বিরুদ্ধে সিনিয়াভস্কি প্রতিবাদমুখর সে দোষে তাঁর নিজের এই গল্পও কিছু পরিমাণে দুষ্ট। অর্থাৎ উদ্ভটত্বের সুর The Trial Begins…এ ধারাবাহিক নয়। যে অবাস্তব আবহাওয়ায় প্রস্তাবনার শুরু হয়েছিল, তা মাঝপথে এসে হারিয়ে গিয়েছে। পরবর্তী ঘটনাগুলির যে বর্ণনা রয়েছে তা অতিমাত্রায় বাস্তবানুগ। তারপর অবশ্য, সেরিওঝার ষড়যন্ত্রকে কেন্দ্র করে শাসকমহলের উত্তেজনার আতিশয্যে কিছুটা অদ্ভুতের আভাস মেলে এবং উদ্ভটের সাড়া পাওয়া যায় দুটি পুলিশ কর্তার গোপন খবর জোগাড়ের আজগুবি পরিকল্পনার বর্ণনায় এবং শেষে উপসংহারে। কাফকা বা Ionesco-র তুলনায় সিনিয়াভস্কির জগৎ কিছুটা অসঙ্গতিপূর্ণ ও বাস্তব জগতের প্রভাবে অপমিশ্রিত ; সম্পূর্ণরূপে বিমূর্ত হতে পারেনি।

সিনিয়াভস্কির উপাখ্যানের দুর্বলতা এবং রচনাশৈলীর অনির্দেশ হয়তো কিছুটা তাঁর চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের ও দ্বিধার সঙ্গেও জড়িত থাকতে পারে। তাঁর প্রবন্ধটি, The Trial Begins… এবং অপর একটি গল্প সোবিয়েত ইউনিয়নের বাইরে প্রথম প্রকাশিত হয় বিদেশি বন্ধুদের সাহায্যে। স্বদেশে, স্বনামে এগুলি প্রকাশ না করে কেন ছদ্মনামে দেশের বাইরে পাঠালেন, তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সিনিয়াভস্কি বিচারকক্ষে বলেন

আমাদের সাহিত্যজগতে প্রচলিত রুচি ও শিল্পকর্ম বিচারের মানদণ্ড কী, সে বিষয়ে নিজে সাহিত্যসমালোচক হবার ফলে, আমার একটা সুস্পষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছিল। অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমার মনোভাব প্রচলিত ধারা থেকে স্বতন্ত্র ছিল। এ দেশে যা গ্রহণীয়, আমার শিল্পকর্ম তা থেকে সম্পূর্ণ অন্য চরিত্রের। রাজনৈতিক অর্থে নয়, সাহিত্যিক অর্থেই এ স্বাতন্ত্র্য। … আমি এ দেশের প্রকাশনা ব্যবসাটাকে ভালোভাবেই জানি বলে আমার লেখা আমি সেখানে দিই নি। সাহিত্য সমালোচক আন্দ্রে সিনিয়াভস্কি, যার লেখা এ দেশে ছাপা হত এবং গল্প লেখক এব্রাম টার্টৎস, যার রচনা বিদেশে প্রকাশিত হচ্ছিল – এ দুজনের পার্থক্যটা সম্বন্ধে নিশ্চয়ই আমি সচেতন ছিলাম। কিন্তু পার্থক্যটা খুব মৌলিক বা আমার মানসিকতাটা দ্বিধাবিভক্ত ছিল বলে আমার মনে হয়নি। এই কারণেই আমি নিজেকে প্রতারক ও ভণ্ড বলে মনে করি না।

এ যুক্তিটা কতখানি গ্রহণীয় সে তর্কের স্থান এ প্রবন্ধ নয়। কিন্তু নিঃসন্দেহে সিনিয়াভস্কি তাঁর রচনায়, সোবিয়েত সাহিত্যসমাজের এতদিনের অলঙ্ঘনীয় সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের রীতি থেকে স্বতন্ত্র রচনারীতির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ভিন্ন সমাজব্যবস্থা হলেও, সোবিয়েত ইউনিয়ন এ পৃথিবীরই অংশ এবং ধনতান্ত্রিক দেশের সাধারণ মানুষের মতো সোবিয়েত নাগরিকের মধ্যেও ক্ষুদ্রতা ও মহত্ব, অবসাদ ও আশাবাদ, নিঃসঙ্গতা ও গোষ্ঠীপ্রিয়তা – এই জাতীয় পরস্পরবিরোধী প্রবণতার অস্তিত্ব স্বাভাবিক। যে আদর্শ সমাজব্যবস্থা সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, অর্ধশতাব্দীব্যাপী আত্মত্যাগের পর সে দেশের মানুষ যদি দেখে যে, বিকৃতির রাহুগ্রাসে সে আদর্শ প্রায় লুপ্ত, মানুষকে মহৎ করে তুলবার একটা শুভ পরীক্ষায় অপমিশ্রণ ঘটেছে, তাহলে সোবিয়েত বুদ্ধিবিদদের মনে এ সন্দেহ উঁকি মারতে পারে যে, হয়তো মানুষ এখনও দেবতা হবার উপযুক্ত হয়নি, বামনের চাঁদে হাত দেবার চেষ্টার মতো তার সমস্ত পরিকল্পনাই হাস্যকর। তাই বিবেকবর্জিত রাজনীতিজ্ঞদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী অলংকারপূর্ণ প্রতিশ্রুতিতে ধনতান্ত্রিক সমাজের সচেতন চিন্তাশীলদের মতো কোনও সোবিয়েত সাহিত্যিকও আস্থাহীন হতে পারেন, ভাবতে পারেন যে, সমস্ত পরিকল্পনা থেকেও অনেক জটিল, যার জন্য এ পরিকল্পনা – অর্থাৎ মানুষ, তার মনটা এবং অতি বড় দৈবজ্ঞের ভবিষ্যদ্বাণীকেও সে ফাঁকি দেয়। এই কারণেই বোধহয় আজ সোবিয়েত ইউনিয়নে দীর্ঘকালব্যাপী প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যরীতির একনায়কত্বের অবসান সম্ভব। এবং যেহেতু সোবিয়েত ইউনিয়নে, অন্যান্য দেশের মতনই, আজও আমলাতন্ত্র ও রক্ষণশীলতা সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়নি, প্রতিষ্ঠিত রীতিবহির্ভূত সাহিত্য ছদ্মবেশী, অর্থাৎ ব্যাজস্তুতি এবং ছদ্ম-গাম্ভীর্যের আড়ালে বিদ্রুপাত্মক হতে বাধ্য।

৫ম বর্ষ ১ম সংখ্যা

(কার্তিক-মাঘ ১৩৭৩)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *