দাস ক্যাপিটাল ও আমি – ক্রিস্টোফার হিল

দাস ক্যাপিটাল ও আমি – ক্রিস্টোফার হিল

উনিশশো তিরিশের যুগে আমার প্রাক-স্নাতক জীবনে আমি ক্যাপিটাল প্রথম পড়ি এবং গ্রন্থখানি তখন বেশ দুরূহ বলে মনে হয়। কিন্তু তৎপরবর্তী তিন-চার বছরে মার্কসের অনেক ইতিহাসবিষয়ক রচনা আমার মনে প্রবল উৎসাহের সঞ্চার করে। উদ্দীপনার মাত্রা এতখানি হয়েছিল যে পরীক্ষার, প্রশ্নপত্রের উত্তর লেখার সময় আমাকে বেশ সচেতন থাকতে হত, কেননা সে যুগের সনাতনপন্থী অক্সফোর্ডে মার্কসবাদ একটা নোংরা শব্দ বলে বিবেচিত হত। তাই আমি আমার মতামত আড়াল করার জন্য প্রথমে যা সত্যিই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম সেটা লিখতাম, তারপরেই একটু থেমে জুড়ে দিতাম ‘এটা হল একটা মত, কিন্তু সেই সাথে আমরা অবশ্যই বিস্মৃত হব না যে …’, এইভাবে লিখে পরীক্ষকের কাছে প্রমাণ করতে চাইতাম যে আমি মামুলি উত্তরটাও জানি, যদিও তা আমি স্বীকার করি না। অনুরূপ অবস্থায় এই কৌশল ব্যবহার করতো আমি আমার ছাত্রদের প্রায়ই উপদেশ দিতাম। তারপর থেকে অদ্যাবধি ইতিহাস বিষয়ে আমার আগ্রহ রয়ে গেছে প্রধানত সপ্তদশ শতকের বিপ্লবকে অনুধাবনের চেষ্টায় ; কারণ এই বিপ্লবকে ইংলন্ডের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ বলে সর্বদাই আমার মনে হয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ড সম্পর্কে আমার প্রথম কৌতূহল জাগ্রত হয়েছিল ‘মেটাফিজিকাল’ কবিতা সম্পর্কে আমার প্রাক–স্নাতক পর্বের তীব্র ভাবাবেগ থেকে। সেই কবিদের মধ্যে ছিলেন জন ডান, জর্জ হার্বার্ট, ক্রশ, ভন, মার্ভেল, ট্রেহার্ন। তিরিশের যুগে এই দার্শনিক কবিগোষ্ঠীর সম্পর্কে আমাদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হল বিরোধ ও সংঘাত সম্পর্কে এই কবিদের বোধ ও তাঁদের কবিতায় আপাত-সংগতিহীন ভাবধারার পাশাপাশি সন্নিধান

Here is dust and dirt, oh here

The lilies of his love appear. (Vaughan)

O who shall from this dungeon raise)

A soul enslaved so many ways?…)

A soul hung up as’t were in chains)

Of nerves and arteries and veins),

Tortured, besides each other part),

In a vain head and double heart? (Marvell))

যে যুগের তীব্র সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাত উদ্ধৃত অংশে প্রতিধ্বনিত তার সঙ্গে আমরা যে যুগে বাস করছি তার যথেষ্টই সাদৃশ্য রয়েছে। যে কালে পাঠ্যপুস্তকে ‘অর্থনৈতিক কারণ’, ‘ধর্মীয় কারণ’ ইত্যাদিকে সত্যিকারের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন ও গৌণ বলে মনে করা হত তখনই আমার ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ইতিহাসের মার্কসীয় বিচারের মূল শক্তি নিহিত আছে এর দৃষ্টিভঙ্গিতে, পদ্ধতিতে – যে পদ্ধতিতে সমাজকে সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করা হয়, দর্শন সাহিত্য ও বিজ্ঞানকে তার সামাজিক উৎসের নিরিখে বিচার করা হয়। বা উদ্ধৃত কাব্যাংশে বর্ণিত যে ‘দ্বৈত হৃদয় ‘ (‘double heart’) সম্পর্কে দার্শনিক কবিরা তীব্র সচেতন ছিলেন এবং যে গভার সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে ১৬৪২ সালে ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধের উদ্ভব হয়-এ দুয়ের মধ্যে অন্তর্নিহিত যোগসূত্র নির্ণয় করাই হল প্রকৃত মার্কসবাদী বিচারপদ্ধতি – এ ধারণা আমার হয়েছিল।

মার্কস সম্পর্কে আমার কৌতূহলের প্রথম কারণ, তাঁর ভাবধারা আমায় ‘দার্শনিক’ কবিতাবলি বুঝতে সাহায্য করেছিল এবং একথা আমি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলতে চাই, কেননা মার্কসের এই বিশেষ গুণটির যথোচিত সমাদর আজও হয়নি। যাঁরা কখনও তাঁর কোনও লেখা পড়েননি, তাঁরা মার্কসকে একজন অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদী (economic determinist) হিসেবে জানেন, যিনি মানুষকে অর্থনীতির অন্ধ শক্তির ক্রীড়নক হিসেবে দেখেছিলেন। যাঁরা মার্কসের লেখা পড়ে তার মর্মার্থ উপলব্ধি করেছেন তাঁরা জানেন যে তিনি ঠিক এ রকম কিছু ছিলেন না। তিনি ছিলেন (অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে) একজন প্রতিভাধর ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও মননসাধনার ইতিহাস সম্পর্কে যাঁর অন্তর্দৃষ্টি তাঁর অর্থনৈতিক ইতিহাসের চাইতে কোনও অংশে কম উজ্জ্বল ছিল না। তিনি লিখেছেন ‘মানব ইতিহাসের মূল সূত্র হল জীবন্ত ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব’। ‘সক্রিয় মানুষের কর্মশক্তির পরিণামই হল উৎপাদনশক্তি।’

দর্শন ও মননের ক্ষেত্রে মার্কসীয় চিন্তায় প্রভাবিত কয়েকটি অত্যুৎকৃষ্ট রচনা ইংরেজি ভাষায় লেখা হয়েছে। জর্জ টমসন, বেঞ্জামিন ফ্যারিংটন, জোসেফ নিডহাম, এরিখ হবসবম, আইজাক ডয়েৎচার, ই এইচ কার, এডওয়ার্ড টমসন, সি বি ম্যাকফারসন, ফ্রেডরিক আনটাল ও অন্যান্য অনেকের কথা স্মরণ রেখেই একথা বলছি। এবং মার্কস নিজেই তার সূত্রপাত করে গেছেন। ১৮৫৯ সালে তিনি লিখেছেন

সমস্ত পুরাণকাহিনিই (mythology) কল্পনার সহায়তায় প্রাকৃতিক শক্তিসমূহকে আয়ত্তে আনে ও আকার দেয় ; এইভাবে মানুষ প্রাকৃতিক শক্তির উপর প্রভূত্ব বিস্তার করতে থাকলেই পুরাণের অবলোপ ঘটে। মুদ্রণশালার বিকাশে যশোদেবীর অবস্থা কী দাঁড়িয়েছে! গ্রিক শিল্প যে কতকগুলি সামাজিক বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত, এ ধারণা অর্জনে কোনও অসুবিধা হয় না। বরং কেমন করে আজও তা একটা সৌন্দর্য উপভোগের উৎস ও কোনও কোনও দিক থেকে দুরায়ত্তসাধ্য শিল্পদর্শ রূপে বিরাজ করছে সেটা বুঝতে পারাই কঠিন।

ক্যাপিটাল বইটিতে মার্কস লিখেছেন নিকৃষ্টতম স্থপতির থেকে উৎকৃষ্টতম মৌমাছির পার্থক্য এই যে, স্থপতি বাস্তবে রূপায়ণের আগে তার ঈপ্সিত কাঠামোটির রূপ কল্পনায় ঠিক করে নেয়।

মার্কস ছিলেন একজন বস্তুবাদী। ধর্মতাত্বিক ও পেশাদার দার্শনিকেরা কোনওদিন যে প্রশ্ন তোলেন নি মার্কস তা আগেই ধরে নিয়েছিলেন। যেমন এই বস্তুজগতের অস্তিত্ব আছে, এবং আমাদের ভাবরাশি এই বস্তুজগৎ থেকেই উৎসারিত। তিনি যুক্তির দ্বারা বোঝালেন যে মানুষ যেভাবে তার জীবিকা উপার্জন করে, যেভাবে ধন উৎপাদন ও বন্টন হয়, তার দ্বারাই নির্ধারিত হয় সমাজের কাঠামো। ‘মানুষ শুধু মাত্র সামাজিক জীব নয়, বরং এমন একটি জীব যে কেবলমাত্র সমাজের মধ্যেই ব্যক্তি হিসেবে বিকশিত হতে পারে।’ ‘মানুষ নিজেই তার নিজস্ব ইতিহাস রচনা করে।’ ১৮৫২ সালে মার্কস লিখেছেন ‘কিন্তু যেমন ইচ্ছে তেমন করে নয় ; তার পছন্দমতো অবস্থায়ও নয়, বরং অতীত থেকে প্রাপ্ত ও আগত সামাজিক পরিবেশেই তারা এটা করে। মৃত অতীত যুগের সব ঐতিহ্য দুঃস্বপ্নের মতো জীবন্ত বর্তমানের মগজে এসে ভর করে।’ ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিবিধ প্রকৃতি থেকে, মানুষের সামাজিক অবস্থান থেকে স্পষ্ট ও বিশিষ্টভাবে গঠিত আবেগ, অধ্যাস, চিন্তাধারা ও জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির একটা সম্পূর্ণ উপরিতল (superstructure) মাথা তোলে। সমগ্র শ্রেণী এর বাস্তব ভিত্তি ও অনুরূপ সামাজিক সম্পর্কের মধ্য থেকেই একে সৃষ্টি ও গঠন করে। যে কোনও একজন ব্যক্তি, যিনি শিক্ষা ও ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে এগুলিকে লাভ করেন, কল্পনা করতে পারেন যে তাঁর ক্রিয়াকর্মের উৎস ও প্রকৃত অভিপ্রায় এর দ্বারাই নির্ণীত হয়। …ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ যেমন মানুষ সম্পর্কে যা ভাবে ও বলে তার সঙ্গে তার স্বভাব ও কর্মের পার্থক্য দেখতে পায়, তেমনি বা তার চাইতেও বেশি করে, কোনও ঐতিহাসিক সংগ্রামে নিযুক্ত দলগুলির সাংগঠনিক রূপ ও আদর্শকে তাদের প্রকৃত স্বার্থ ও নিজেদের সম্পর্কে ধারণা থেকে তাদের বাস্তব অবস্থাকে পৃথক করে দেখতে পাওয়া দরকার।’ অন্যথায়, সমাজ-বিশ্লেষণে সচেষ্ট ঐতিহাসিক, মার্কস একটি বিখ্যাত উক্তির দ্বারা যা বর্ণনা করেছেন, সেই ‘কালের বিভ্রম’ (‘the illusion of the epoch’)-এর শিকার হয়ে পড়বেন।

কিন্তু যদিও, ‘উৎপাদনব্যবস্থার মালিকের সাথে প্রকৃত উৎপাদনকারীর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক … সমগ্র সামাজিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত রহস্য ও গোপন ভিত্তিসমূহকে উদঘাটিত করে, যেহেতু এই সম্পর্ক ‘অসংখ্য বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জাতিগত বৈশিষ্ট্য, ঐতিহাসিক প্রভাব প্রভৃতির দ্বারা জড়িয়ে আছে, সেজন্য এগুলিকে খুব সযত্নে বিশ্লেষণের দ্বারা নির্ণয় করতে হবে।’

বিগত শতাব্দীতে ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলিতে ইতিহাসচর্চায় মার্কসবাদের প্রভাব যতটা লক্ষ করা যায় অন্য কোনও শাখায় ততটা নয়। অর্থনৈতিক ইতিহাসকে মার্কস প্রকৃতপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত করেন। তাঁর আগে অর্থনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে এমন কোনও গ্রন্থ লেখা হয়নি যে সম্পর্কে আজকের কোনও ছাত্র কৌতূহলী হতে পারে, অথচ, যাঁরা মার্কসের ভাবধারার সাথে একমত নন, তাঁরাও স্বীকার করবেন যে, তিনি আজও অবশ্যপাঠ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

একশো বছর আগের পূর্বসূরীদের থেকে বর্তমানের সকল ঐতিহাসিকেরই অতীত সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তাঁরা মেনে নিয়েছেন যে, কোনও সমাজব্যবস্থায় ধনসম্পদ যেভাবে উৎপাদন ও বন্টন হয় তা সমাজের সর্বস্তরের কাঠামো ও জীবনযাত্রাকে অবশ্যই প্রভাবিত করে। এই ভাষ্য শেষ পর্যন্ত মার্কস থেকেই এসেছে। দৃষ্টিভঙ্গির এই আমূল পরিবর্তনের জন্য দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফল হল ঐতিহাসিক বিকাশের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক শ্রেণীগুলির ভূমিকাকে ক্রমশই স্বীকার করে নেওয়া। যদিও ঐতিহাসিকেরা ইংল্যান্ড ফ্রান্স ও রাশিয়ার বিপ্লব সম্পর্কে তাঁদের বিচার-বিশ্লেষণে একমত হবেন না, তবে তাঁরা সকলেই একশো বছর আগের মতো কোনও ব্যক্তিবিশেষের ভালো-মন্দ, বুদ্ধি-নির্বুদ্ধির ভিত্তিতে এসব ঘটনাকে বিশ্লেষণ করবেন না, বরং সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসের ভিত্তিতেই বিশ্লেষণ করতে সচেষ্ট হবেন।

বিগত শতকের ঐতিহাসিকেরা মানুষের চিন্তার ও মতাদর্শের সামাজিক উৎস স্বীকার করে নিয়েছেন। যে দু’জন সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ঐতিহাসিকের আমলে আমি বড় হয়েছি তার মধ্যে টনি (Tawney) স্পষ্টতই মার্কসের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, এবং নামিয়ার (Namier) সম্পর্কে স্যার জন নীল (মার্কসবাদী নন) লিখেছেন যে ইতিহাসচর্চায় তিনি যে, নতুন দিগদর্শন করেছেন তার মূলে কিছু পরিমাণে আছেন মার্কস। একদা স্যার ঈশাইআ বার্লিন (Sir Isaiah Berlin) মার্কসকে সমাজবিদ্যার জনক বলে অভিহিত করেছিলেন, যেমন মার্কস স্বয়ং সপ্তদশ শতাব্দীর ইংরেজ স্যার উইলিয়াম পেটিকে (Sir William Petty) রাষ্ট্রীয় অর্থশাস্ত্রের (political economy) জনক বলে আখ্যাত করেছিলেন।

এর সাথে সাথে ঐতিহাসিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক নতুন আপেক্ষিকতাবাদের সৃষ্টি হল। ঊনবিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিকেরা যে নৈতিক মানকে চূড়ান্ত বলে ভাবতেন, তার নিরিখেই ইতিহাসকে বিচার করতেন। আধুনিক ঐতিহাসিকেরা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, সমাজের পরিবর্তনের সাথে সাথে নৈতিকতারও পরিবর্তন হয়। এই জাতীয় ক্ষেত্রে বোধহয় মার্কসবাদের ইতিবাচক প্রভাবের চাইতে নেতিবাচক প্রভাবের অংশই বেশি।

যে উৎসগুলিকে ভিত্তি করে ইতিহাস রচিত হয় বিগত শতাব্দীতে, সেখানেও এক বিপ্লব ঘটে গেছে। আগে এই উৎসাবলির প্রধান অংশ যেখানে ছিল সাহিত্যগত-যেমন, লোকগাথা, জীবনী, চিঠিপত্র, স্মৃতিকথা, সংবাদপত্র-এখন সে উৎস প্রধানতই দলিল-ভিত্তিক সরকারি নথিপত্র, ধর্মযাজকদের পাঁজিপুথি, সনদ, খোদাই, লিপি প্রভৃতি; বা এমন কী প্রত্নতত্বভিত্তিক যন্ত্রপাতি, কলকবজা ঘরবাড়ি ও জমি। এই পরিবর্তনকে আমরা সরাসরি মার্কসের প্রভাব বলে অভিহিত করতে পারি না, যদিও তা মার্কসের ঐতিহাসিক চিন্তাধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তাঁর নিজস্ব রচনায়, বিশেষত ক্যাপিটাল গ্রন্থে, মার্কস সরকারি পুথিপত্র ও ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের কার্যবিবরণীকে খুব প্রশংসনীয়ভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ‘ডকুমেন্ট’ সম্পর্কে আধুনিক কালে শ্রদ্ধার যে বন্যা এসেছে তাতে তিনি অংশ নিতেন কি না সে প্রসঙ্গ ভিন্ন, তবে সরকারি প্রকাশনা সম্পর্কে-তা সময় ও জীর্ণতার বিচারে যতই শুদ্ধিলাভ করুক না কেন-মার্কসের বরাবরই একটা সংশয় ছিল। ইতিহাস সংক্রান্ত তাঁর সেরা লেখাগুলিতে সাহিত্যের থেকে সুনির্বাচিত উদ্ধৃতি, শ্লেষ ও বিরোধোক্তি এবং লেখার ভঙ্গিতে কল্পনাশক্তির পরিচয় থাকাতে লেখক হিসেবে তিনি আধুনিক ‘ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিসম্পন্ন’ ঐতিহাসিকদের (যাদের লেখার ধরনই এমন যেন মনে হয় সেগুলো পড়ার উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি) থেকে স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছিলেন। ক্যাপিটাল গ্রন্থে মার্কস তাঁর যুক্তিকে প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে সজীব করে তুলেছেন। যাঁদের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন তাঁরা হলেন হোমার, সোফোক্লিস, হেরাক্লিটাস, থুসিডাইডিস, জেনোফেন, আইসোক্রেটস, প্লেটো, আরিস্টটল, ডিয়োডোরাস, সিকুলাস, লুক্রসিয়াস, আপ্পিয়ান, সেক্সটাস, এম্পিরিকাস, জোসেফাস, বাইবেল গ্রন্থ, সেন্ট জারোম, লুথার, দান্তে, শেকসপিয়র, মিলটন, গ্যেটে, সারভানতেস, মলিয়ের, ড্রাইডেন, বালজাক, স্যার টমাস মোর, বেকন, হবস, স্পিনোজা, ভিকো, বার্কলে, মন্টেস্কিউ, রুশো, বোলিংব্রোক, বার্ক, হেগেল, মমসেন, ডারউইন প্রমুখ-ডারউইনকে তো মার্কস ক্যাপিটাল গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের একটি খণ্ড উপহারই দিয়েছিলেন।

পরিশেষে, যেহেতু মার্কস অর্থনৈতিক বিষয়ের উপরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করতেন এবং যার সাথে শেষ পর্যন্ত মানুষের সর্বপ্রকার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপকে সংযুক্ত করতে চাইতেন, সেজন্য আধুনিক অর্থে ইতিহাসের সামগ্রিকতা বলতে যা বোঝায়, যার উল্লেখ আমি আগেই করেছি, সে সম্পর্কে মার্কসের দিকে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও ফিরে তাকাই।

ঊনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের বিবর্ণ উদারনীতির প্রতিক্রিয়ায় অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক ও দার্শনিক এক অন্ধ হতাশার কবলে পড়েন। প্রকৃতির উপর মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রভুত্বের ফলে, অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তাকে অধিকতর বিনষ্টি সাধনের অশুভ শক্তিও জুগিয়েছে। মানুষ আণবিক বোমা এবং এক জরাগ্রস্ত সভ্যতা তৈরি করেছে। যে মানবতাবাদ মানুষের ক্ষমতা সম্পর্কে বিশ্বাসী হতে শেখায় তা হল একজাতীয় অলস আত্মপ্রবঞ্চনা হতাশাই একমাত্র যুক্তিসংগত, ঈশ্বরই একমাত্র পরমার্থ – মানুষের অপরিবর্তনীয় দৈন্য সম্পর্কে এই দৃষ্টিভঙ্গির যেটুকু সারমর্ম তার কিছুমাত্রই নতুন নয়। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানবজাতির নৈতিকতার অধঃপতন সূচিত হবে, রুশো-র এই ধারণাকে মার্কস ও এঙ্গেলস গ্রহণ করেন। ইতিহাস হল, এঙ্গেলসের ভাষায়, ‘নিষ্ঠুরতমা’ দেবীর বিবরণী – আদিম সমাজে মানুষ যে অধিকার ও সাম্য উপভোগ করত তা থেকে সে কেমনভাবে বিচ্যুত হল সে কথাই এই কাহিনিতে বিবৃত। কিন্তু এ হল ইতিহাসের দ্বৈত প্রক্রিয়ার একটি দিক। অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য মানুষকে তার সাম্যবোধ বিসর্জন দিয়ে মূল্য দিতে হয়েছিল, একথা বলে মার্কস রুশো-র অন্তর্দৃষ্টির উপর এক নতুন তাৎপর্য আরওপ করলেন। উৎপাদন-ব্যবস্থার উপর সমাজের অধিকাংশ লোক কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলল এবং মুষ্টিমেয় কয়েকজন সুবিধাভোগী ভাগ্যবানের হাতে সেই ক্ষমতা গিয়ে জড়ো হওয়াতে এই মত প্রচলিত হয়ে পড়ল যে, শাসকশ্রেণীর স্বার্থের উপরেই সমাজের সকলের স্বার্থ নির্ভরশীল। মার্কস বিশ্বাস করতেন যে, ঐতিহাসিক নিয়মে (যদি তা প্রথমেই কোনও আকস্মিক বিপর্যয় না ঘটায়) কীভাবে মানুষ এক শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থার মধ্যে তার হৃত অধিকার শেষ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করবে সে কথা তিনি তাঁর লেখার মধ্যে দেখিয়ে গেছেন। এই সমাজ এক উন্নতর ব্যবস্থার উপরে ভিত্তি করে গড়ে উঠবে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে অসাম্য ও নির্যাতন চলেছে তার মধ্য থেকেই এই বিকাশ সম্ভবপর হবে। মানুষের প্রতি মানুষের এই নির্যাতন ব্যক্তিগত সম্পত্তিবোধের উৎপত্তির সাথে সাথে বেড়ে ওঠে এবং আদিম সাম্যবাদের মধ্যে লোপ পায়। লাভ ও লোকসান হল একই পদ্ধতির দুই বিপরীত দিক ‘Fair is foul and foul is fair)’।

ঊনবিংশ শতাব্দীর বুর্জোয়াদের স্থূল আশাবাদ থেকে সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে এই গভীর ধারণা অনেকখানি পৃথক। ইতিহাস হচ্ছে এক ট্রাজেডি, কিন্তু তার একটি অর্থহীন ট্রাজেডি হওয়ার দরকার কী। আমরাও শুধু দর্শক নই আমাদের সক্রিয় ভূমিকা আছে সেই নাটকে। আণবিক শক্তিকে কেবলমাত্র ভালো বা মন্দ বলা চলে না মানবজাতির উপর এর ফল কী রকম হবে সেটা নির্ভর করে কীভাবে একে ব্যবহার করা হবে তার উপর এবং তাও আবার নির্ভর করে সামাজিক সংগঠনের উপর। সমাজের সংগঠন আমি, আপনি ও অন্য লক্ষ লক্ষ লোকের উপর নির্ভর করে। মার্কস আজীবন দারিদ্র্যের মধ্যে কাটিয়েছেন, নির্বাসিত ও দেশান্তরিত হয়ে বিপ্লবী সংগ্রামকে সংগঠিত করেছেন এমন একটি অভীষ্ট ফল লাভের আশায়, যাকে তিনি অবশ্যম্ভাবী সত্যরূপে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন – এ সমস্তই একটা বিরাট প্যারাডক্স মনে হয়। কিন্তু যখনই আমরা বুঝতে পারি যে, মার্কস একজন নির্দেশ্যবাদী (determinist) ছিলেন না, তখনই আর এর মধ্যে কোনও প্যারাডক্স থাকে না।

একটি সামগ্রিক কর্মের বিচারে আমি হয়তো এতক্ষণ একটি অংশের প্রতিই অধিক মাত্রায় মনোনিবেশ করেছি। আমারই মতো যাঁরা মার্কসের লেখা গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন তাঁদের অধিকাংশই তাঁকে একজন সুলেখকরূপে শুধু বিচার করেন না, বা ইতিহাসতত্বে তাঁর গভীর প্রভাবই দেখেন না, সামাজিক বৈষম্য ও অন্যায়ের তীব্র সমালোচক হিসেবে মার্কস তাঁর বলিষ্ঠতম আঘাত হেনেছেন, এটাই সকলে জানেন। তিরিশের যুগে যদিও তাঁরই সাহায্যে আমি ‘দার্শনিক কবিতাবলি’ বুঝতে সক্ষম হয়েছিলাম, তবুও সে সময়ে তাঁর এই দিকটিই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হত।

মার্কসের আগে শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অজস্র প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু এ-বিষয়ে মার্কসের নতুন অবদান হল এই যে, তিনি ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের কার্যবিবরণী থেকে প্রচুর তথ্য তাঁর যুক্তির সপক্ষে জোগাড় করেছিলেন এবং তাঁর অর্থনৈতিক গবেষণাকে ঐতিহাসিক তথ্য সংবলিত করে তুলেছিলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে পীড়নকে কোনও ব্যক্তিবিশেষের দুষ্কর্ম হিসেবে না দেখে, একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার-যার কোনও আইনগত প্রতিরোধ নেই – পরিণাম হিসেবে তিনি দেখলেন। ক্যাপিটাল বইটির প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় মার্কস লিখেছিলেন ‘ব্যক্তিগতভাবে মানুষ নিজেকে যত বড় করেই তুলুক না কেন, সর্বদাই সে সামাজিক ব্যবস্থার অধীনস্থ হয়ে থাকে বলে অন্য যে কোনও লোকের চাইতে আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি কোনও সামাজিক সম্পর্কের জন্য কোনও ব্যক্তিবিশেষকে কম দায়ী করি।’ তদানীন্তন ইংল্যান্ডের যে অবিচারগুলিকে মার্কস তাঁর সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে নির্মমভাবে চিত্রিত করেছিলেন, বস্তুতপক্ষে তার অনেকগুলি – শ্রম সময়ের দীর্ঘতা, শিশু শ্রমিকের শোষণ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা – পরবর্তীকালে ট্রেড ইউনিয়ন ও মানবহিতৈষী কার্যাবলির জন্য আইন প্রণয়নের দ্বারা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের জন্যই মার্কস আজীবন পরিশ্রম করেছিলেন, এবং এই পরিবর্তনকে তিনি অন্তরের সাথে স্বাগত জানাতেন। আমার মনে হয়, তিনি আরও ভাবতেন যে, আমাদের সমাজব্যবস্থার মধ্যেই কোনও একটা গলদ নিহিত আছে যে জন্য একদল লোক অন্যের পরিশ্রমের দ্বারা মুনাফা অর্জন করে নিচ্ছে, যে ব্যবস্থাকে চালু রাখার জন্য মাঝে মাঝে বেকারি বা যুদ্ধ প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কিন্তু মার্কস ছিলেন এমনই এক বিরাট প্রতিভা যে তাঁর ব্যক্তিত্বের যে কটি দিক সম্পর্কে অপেক্ষাকৃতভাবে কম আলোচনা হয়েছে সেগুলিও স্মরণযোগ্য যেমন, তাঁর প্রিয় আদর্শ ছিল de omnibus dubitandum), সব কিছুকেই আমাদের সন্দেহ করতে হবে। এবং তাঁর অদম্য বাধাহীন হাসির উচ্ছ্বাসের জন্য তাঁর কন্যা তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করতেন। এমন ক’জন আছেন, যিনি আজ থেকে একশো বছর আগেও ভাবতেন যে, সমাজে নারীর ‘মর্যাদা কতখানি সেই মাপকাঠিতে সামাজিক অগ্রগতি পরিমাপ করা যায়’ ; যিনি মনে করতেন ‘যার ভিত্তিতে প্রাণদণ্ডাজ্ঞা উপযুক্ত ও বিচারসহ হতে পারে এমন কোনও নীতি স্থির করা একেবারে অসম্ভব না হলেও খুবই কঠিন’; বা ‘শিশুরাই তাদের পিতামাতাদের মূল্যবোধে শিক্ষিত করে তুলবে’! এসব কারণে তিনি আজও আমাদের অনেক রাজনীতিকের থেকেই অগ্রগামী।

এতক্ষণ আমি প্রধানত যৌবনে আমার উপর মার্কসের প্রভাবের কথা বললাম, এখন বৃদ্ধ মার্কস সম্পর্কে একটি কাহিনি বিবৃত করে আমি আমার বক্তব্য শেষ করব। যতই বয়সে ও বুদ্ধিতে পরিণত হচ্ছি ততই এর প্রাসঙ্গিকতা আমরা অনুভব করছি। একদা মার্কস এইচ এম হিনডম্যানের সাথে গল্প করছিলেন, সে সময় হিনডম্যান বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের সহনশীলতা কীভাবে বেড়ে যায়, পরিহাসচ্ছলে তার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। তাঁর কথা শুনে মার্কস সবিস্ময়ে বললেন, ‘সত্যিই কি তুমি সহনশীল হয়েছ? সত্যিই?’ সত্যিই কি আমরা আমাদের বয়সের সাথে সাথে অসাম্য, অবিচার, দারিদ্র্য ও বোমাবর্ষণে নৃশংস গণ্য হত্যা সম্পর্কে আরও সহনশীল হয়ে পড়ছি? সত্যিই কি তাই ?

DR. CHRISTOPHER HILL) ‘এক্ষণ’-এর জন্য পাঠিয়েছেন এই লেখাটি-Das Kapital and I)। অনুবাদ সুনীত সেনগুপ্ত।

৬ষ্ঠ বর্ষ ২-৩ সংখ্যা

(কার্লমার্কস ১৯৬৮)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *