ঐতিহ্য, শিল্প ও আধুনিকতা – শচীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়
এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য দুটি এক, পদসমূহের বিচার ও তাদের স্বতন্ত্র প্রকৃতি নিরূপণ; দুই, পদত্রয়ের সম্বন্ধে বিচার। হয়তো লেখার সময় এই অভিপ্রেত আনন্তর্য সর্বদা রক্ষিত হয়নি, কোথাও কোথাও উদ্দেশ্যমিশ্রণ ঘটেছে। কিন্তু আশা করি তার জন্য বক্তব্য বিচারের হানি হয়নি।
মানবসভ্যতা ও সংস্কৃতির বিচার বা বিশ্লেষণে দুটি সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় ধারণা হল, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা। বস্তুত, মানববিবর্তন মানবপ্রকাশেরই বিবর্তন; আত্মপ্রকাশের উদ্দেশ্য, সার্থকতা ও স্বরূপ নির্ণয় ও অনুধাবন, ওই দুই ভাবধারা ব্যতীত নিতান্তই অসার। মানবসভ্যতার ইতিহাস এক ব্যাপক আত্মানুসন্ধানের ইতিহাস। কেবল মুঠো মুঠো বালি জমিয়ে সেতুবন্ধনের জন্য ইতর প্রাণী হলেই চলে, কিন্তু মানুষ তার প্রগতির পথে ক্রমাগত পরিচয় দিয়েছে তার চাতুর্যের, স্বপ্নের, সাহসের ও ধ্রুব অন্বেষণের। কালাবচ্ছিন্ন দেশদেশান্তরে প্রক্ষিপ্ত অস্থিখণ্ড ও নানা জীবাশ্মের সঞ্চয়ে নৃতত্ববিদের কাছে মানুষের যে পরিচয়, প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষ তদপেক্ষা পূর্ণতর, মহত্তর। মানবসত্যের কিয়দংশ অবশ্যই অভিব্যক্ত ভূপৃষ্ঠে প্রাণধারণের সংগ্রাম, কিন্তু অনেকাংশ নিহিত তার পুরাণে, কাব্যে, শিল্পে, গুহাচিত্রে। পরিবেশ যেমন তাকে নিয়মিত প্রভাবিত করেছে, সেও তেমনই ক্রমাগত তার সৃজনশীল কল্পনার সাহায্যে সৃষ্টি করেছে নব নব পরিবেশ। মূলত মানুষই একাধারে সৃষ্টি ও স্রষ্টা। বিষয়চৈতন্যে মগ্ন থেকেও মানুষ অনন্তকাল ধরে সচেতন ও জিজ্ঞাসু। এই কারণেই বোধ হয় মানুষ অজ্ঞাত, অপরিচিত, এমনকি ভয়াবহ অযুত তথ্যাবলির মধ্যে থেকেও বিপর্যস্ত হয়নি, পরন্তু উদ্বৃত্তের অনুপ্রেরণায় নব নব মূল্য উদ্ভাবনের দ্বারা পরিপার্শ্বের অসংখ্য ঘটনারাজ্যে এনেছে সংগঠন, সাথর্কতা ও সংহতি।
পরবর্তী মানুষ যে কেবল পূর্বপুরুষের কল্পনাশক্তির এই সৃজনশীল প্রয়োগ ও তার সাফল্য সংরক্ষণ করে ঐতিহ্য অর্জন করেছে তা নয়, বিচিত্র মূল্যাদর্শ সৃষ্টি করে ও যুগোপযোগী পরিবর্তন সাধন করে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য সে নতুন ঐতিহ্য সৃষ্টি করে গেছে। মানবসমাজের ঐতিহ্যের ইতিহাস তাই উন্মেষশালিনী প্রতিভা ও বিবর্তমান মূল্যাদর্শের ইতিহাস। এই মূল্যাদর্শ বজায় রাখা বা কর্মক্ষেত্রে মূল্যমান প্রয়োগ করার মাধ্যমেই পরিবর্তন প্রগতির মর্যাদা পায়। কিন্তু মূল্যবোধ স্বতঃই নির্বাচন প্রবৃত্ত করে। আমাদের প্রচলিত বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠানের সবটুকুই আমরা সংরক্ষণ করি না – কিছু গ্রহণ করি, কিছু বর্জন করি। ঐতিহ্যের অন্যতম একটি সামাজিক বৈশিষ্ট্য, কৃত নির্বাচনের সংগতি ও সার্থকতা প্রদান। ঐতিহ্যের মাধ্যমেই দ্রুত পরিবর্তনশীল জগতে মানব-সম্ভাবনার পূর্ণ রূপায়ণ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ। অর্থাৎ মানবসত্তার বিকাশ ও বিবর্তন অংশত অন্তর্নিহিত হলেও, অনেকাংশে পরিবেশ ও পরিপার্শ্ব নির্ভর। ‘আমি কী’, এ প্রশ্ন হয়তো নিঃসন্দেহে ‘ব্যক্তিগত’, কিন্তু আমার ‘ব্যক্তিস্বরূপ’, অপরাপর ব্যক্তি সম্বন্ধের ফলস্বরূপ। জনৈক পাশ্চাত্য মনস্তাত্বিক মনে করেন ‘মানুষের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কোনও কিছু জানতে হলে, তার জীবনের বিভিন্ন স্তরে তার সমাজ, সংস্থা ও ঐতিহ্যের লীলা সম্পর্কে জানা আবশ্যক।’ বস্তুত, আমাদের প্রতিটি ক্রিয়াকলাপের সার্থকতা সমাজনিরপেক্ষ তো নয়ই, পরন্তু ঐতিহ্যনির্ধারিত। অর্থাৎ ব্যক্তিসত্তা প্রকৃতপক্ষে একক, স্বয়ম্ভু ও ইতিহাস-বহির্ভূত কোনও ঘটনা নয়, নিতান্তই অপরাপর ব্যক্তি ও বিষয় সমৃদ্ধ। আমাদের কর্মের বা ভাবের পারস্পরিক আদান-প্রদান যে সম্ভব হচ্ছে তার অন্যতম কারণ ব্যক্তিবহির্ভূত এক সাধারণ (common) ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি। অবশ্য এ থেকে যেন কেউ সিদ্ধান্ত না করেন যে একই যুক্তিবলে আমরা একটি বৃহত্তম সাধারণ ঐতিহ্য স্বীকার করব, যাকে বলা যায় ‘মানব ঐতিহ্য’। ঐতিহ্য সদাই গোষ্ঠীবিশেষ অপেক্ষিত যথা, সংস্কৃতি – তা কখনওই সর্ববৈশিষ্ট্য অতিক্রান্ত হতে পারে না। ঐতিহ্যের ল. সা. গু.-করণ অনৈতিহাসিক ও সেই কারণে অর্থহীন। তেমনই এ প্রবন্ধে মানুষের সাধারণ ধর্মে সংশয়ক্ষেপ অভিপ্রেত নয়। যেটুকু বিবক্ষিত তা হল ঐতিহ্য ভাষা, পরিবেশ, ধর্ম, পুরাণ ইত্যাদির সঞ্চিত সার, অতএব কোনও সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীবিশেষের বৈশিষ্ট্য থেকে তা ন্যায়ত মুক্ত হতে পারে না এবং সেটি আকাঙ্ক্ষিতও নয়। মানবহিতকামী কিছু উদারচরিত সমাজসেবী মহামানবতীর্থের স্বপ্নে বিভোর হয়ে এক ও অদ্বিতীয় সমবায়ী ঐতিহ্যে আস্থা স্থাপন করতে চান অহেতুক। প্রকৃতপক্ষে উক্ত সমাজনায়করা ‘প্রভেদমাত্রই বিরোধ’ এই প্রমাদবশত এক নিরবলম্ব, বিমূর্ত সামান্য ধারণাকে ঐতিহ্যস্বরূপ ভেবে সাম্প্রতিক মানবসভ্যতার সংকট ও সমস্যা অবসানের কল্পনা করেন। অথচ ঐতিহ্যের সম্পদশালিতা তার বৈচিত্র্যে, কার্যকর প্রভাব তার বৈশিষ্ট্যে। বহুকে গুণহীন ঐক্যে পর্যবসিত করে দ্বন্দ্বের অবসান করার অর্থ ঐতিহ্যকে নিষ্ফল ও উৎকর্ষহীন করে তোলা। যদিও রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী বা বুদ্ধদেবের মর্মবাণী সর্বমানবের, তথাপি তাঁদের বক্তব্যের প্রকৃত তাৎপর্য কেবলমাত্র তাঁদের স্ব স্ব সংস্কৃতির পটভূমিতেই গৃহীত হতে পারে। এর মূল কারণ অবশ্য এই যে, ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি কোনওটিই তৎ তৎ ভাষা নিরপেক্ষ নয়। বর্তমান স্বদেশে ভয়াবহ সাংস্কৃতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এই কটি কথা অবশ্য স্মরণীয়। নচেৎ, সংস্কৃতিনাশের সমূহ সম্ভাবনা। কতিপয় বিদ্যালোকপ্রাপ্ত তথাকথিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর দল ক্রমাগত এক সর্বনাশা ধারণা প্রচার করছেন যে সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য এবং উভয়ের মূল ভিত্তি যে ভাষা তা চয়ন ক্রয়ের বিষয়। আন্তর্জাতিক মনোভাব বা অবাস্তব এক সর্বজনগ্রাহ্য মানব ঐতিহ্যের দোহাই পেড়ে তাঁরা প্রচণ্ড পাশ্চাত্যধাবনের লালসা মেটাতে চান। শিক্ষার ক্ষেত্রে এঁরা দেশি ভাষা ত্যাগ করে ইংরাজি ভাষা, চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে প্যারিস-নিউইয়র্কের ঘরানা, সমগ্র দেশের উপর চাপাতে চান। এঁদের ধারণা ঐতিহ্যের বাজার থেকে খুঁটে খুঁটে ভালো ভালো পণ্য এনে ঘর সাজানোর দায়িত্ব তাঁদের উপরই ন্যস্ত। বস্তুত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বা ভাষা কুলে জন্মের মতো দৈবায়ত্ত (given), গুটিকয়েক বাবুদের রুচি ও পৌরুষ চয়িত নয়। ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ ঐতিহ্য বদল করতে উৎসুক হলেও হতে পারেন, সেটা সম্ভব কী অসম্ভব তা নিতান্তই ব্যক্তিগত শ্রম ও আকাঙ্ক্ষার বিষয়, কিন্তু সারা দেশের ঐতিহ্য পোশাকের মতো বদল করার প্রচেষ্টা অবৈজ্ঞানিক ও উন্মাদকল্পনা। জনৈক ভারতীয় শিল্পী কোথা থেকে শুরু করবেন এটা অনির্দিষ্ট হতে পারে (এমনকি এটাও গুরুতর বিতর্কের বিষয়), কিন্তু ভারতীয় শিল্প কোন খাতে প্রবাহিত হবে, কোন ধাপ থেকে, কোন ধারা স্বীকার করে, অগ্রসর হবে তা একান্তই সুনির্দিষ্ট (অর্থাৎ দেশজ ঐতিহ্যই একমাত্র ধারা-নির্দেশক), কয়েকজন বিশেষ প্রতিভার দাবিদারদের শলা-পরামর্শের উপর আদৌ নির্ভরশীল নয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, নানা কমিটি, নানা সভাসমিতি ও আলোচনার উত্তেজনা ও উল্লাসের তাড়নায় এই সরল ও সুস্পষ্ট সত্য প্রায়শই বিস্মৃত হই। ফলে কী শিল্পে, কী শিক্ষায়, কী সমাজপরিকল্পনায় আধুনিকতার নামে পাশ্চাত্য সাম্প্রতিকতার ব্যাপক অনুকরণের জিগির তুলছি। এই আত্মঘাতী সংস্কারের হাত থেকে মুক্ত হতে হলে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার বৈজ্ঞানিক অর্থ ও ভাবপ্রসার জানা একান্ত প্রয়োজন। মূল কথা হল, প্রয়োগলভ্য ঐতিহ্য সর্বদাই বিশিষ্ট, কেননা বিশেষ সমাজ-নির্ভর।
ব্যাপক অর্থে, অতীতের তাবৎ উত্তরাধিকারই ঐতিহ্য বলে গণ্য হতে পারে। এ অর্থে, কতিপয় অভিনব আচার-ব্যবহার ব্যতীত সকল সামাজিক প্রথাই ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃত হওয়া উচিত। কিন্তু বস্তুত তা হয় না। আমাদের পুরাকাল থেকে যা কিছু হয়ে আসছে তাকেই ঐতিহ্য বলে মানতে গেলে এক বিপুল ভার বহন করতে হয়। ফলে আমরা অতীতের কিছু গ্রহণ করি এবং অধিকাংশ অপ্রয়োজনীয়বোধে বর্জন করি। অর্থাৎ অতীতের সব কিছুই ঐতিহ্য বলে মানা সম্ভব ও স্বাভাবিক নয়। সামাজিক জীব আমরা ; ব্যক্তি হিসাবে পরিগণিত হলেও পারস্পরিক ভাব আদানপ্রদান, ব্যবহারিক সামঞ্জস্য ইত্যাদি ব্যতিরেকে অভিব্যক্তি বা আত্মপ্রকাশ অসম্ভব। এই পারস্পরিক, সামাজিক সমঝাওতার জন্য চাই এক সর্বজনগ্রাহ্য (তৎ তৎ সমাজে) নিয়মতন্ত্র। ব্যক্তিবুদ্ধির নিয়ামক এ সকল সামাজিক বিধি না থাকলে স্বৈরাচারের দুর্বিপাক থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। ঐতিহ্যের কাজ এই জাতীয় সামাজিক সামঞ্জস্য সংরক্ষণ। এই কারণেই অতীত থেকে যা পাই সব কিছুকে না মেনে, সেটুকুই রক্ষা করি যা ব্যক্তি হিসাবে আমাদের পারস্পরিক সামঞ্জস্য রক্ষায় সাহায্য করে। আর যে মুহূর্তে আমরা এই নির্বাচন ও বিচারে প্রবৃত্ত হই, সেই মুহূর্তে মূল্যমান প্রয়োগ ও তদ্দ্বারা মূল্যায়নে বাধ্য হয়। অর্থাৎ অতীতের কোনও কিছুই যখন মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় মনে করি, তখনই আমরা পক্ষপাত প্রদর্শন করি। ফলে অতীতের সব কিছুই নয়, কেবল যে উত্তরাধিকারের প্রতি এই মূল্য-পক্ষপাত প্রদর্শন করি, তাই ঐতিহ্যরূপে সমাজে স্বীকৃত হয়। অর্থাৎ ঐতিহ্য ও শ্রেয়োবোধ অঙ্গাঙ্গী জড়িত। এই কারণেই শিল্প ও ঐতিহ্যের যোগ নিবিড়। অতীতের যে প্রথাগুলির প্রতি আমরা (প্রচলিত জীবনযাপনে) সপ্রশংস স্বীকৃতি জানাই, কেবল সেগুলিকেই ঐতিহ্যের মর্যাদা দিই। অতএব ঐতিহ্য ও ইতিহাস ভিন্ন। বিদেশি কবি ও সমালোচক টি. এস. এলিয়টের মতে ‘ঐতিহ্য কেবল অতীতের ঐতিহাসিক চেতনাই নয়, অতীতকে বর্তমানে সঞ্জীবিত রাখা২।’
সমাজতত্ববিদ ম্যাক্স রাডিনের (Max Radin) বক্তব্যে এ ধারণা খুবই পরিস্ফুট। তিনি বলেন
ঐতিহ্য যেহেতু এই মূল্যবোধে আশ্রিত, অতএব মানুষের সৃজনশীল সত্তাংশেই ঐতিহ্য সর্বাধিক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত। ফলে সমাজে একজন বৈজ্ঞানিকের তুলনায় একজন শিল্পী অধিকতর পরিমাণে ঐতিহ্যনির্ভর। এ প্রবন্ধের অন্যতম প্রধান বক্তব্যও তাই শিল্প ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ প্রদর্শন ও তদুদ্দেশ্যে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার বিরোধহীনতা প্রমাণ।
২
শিল্পের ধর্ম প্রকাশ। প্রকাশের মর্ম সঞ্চার। এক্ষেত্রে শিল্পের সংজ্ঞা নিয়ে জটিল প্রশ্নের অবতারণা করা যায় সন্দেহ নেই, কিন্তু মূল সমস্যা সেক্ষেত্রে বৃদ্ধিই পাবে। এ প্রবন্ধে লক্ষ্য যারপরনাই সীমিত। মূল অভিপ্রায় শিল্পে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক নিরূপণ ; এই সূত্রে শিল্পের স্বরূপ চিন্তায় কিছু মনোক্ষেপ অনিবার্য, কিন্তু তা নিতান্তই মূল উদ্দেশ্যের পরিপূরক হিসাবে। আপাতত আমরা ধরে নিচ্ছি যে অপ্রকাশিত শিল্প (art) নিতান্তই ব্যক্তিগত ও ব্যষ্টিনির্ভর, সমাজ ও সমষ্টিগতভাবে তার বিচার একেবারেই সম্ভব নয়। অপর পক্ষে, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা দুটিই সমাজসাপেক্ষ ধর্ম। অতএব রসিকবর্গের কাছে পরিবেশিত শিল্পই আমাদের আলোচ্য হতে বাধ্য। এই পরিবেশন প্রকাশ ব্যতিরেকে অকল্পনীয়। ‘প্রকাশ’ শব্দটির অর্থ-বৈচিত্র্যবিপুল, সেহেতু প্রকৃত অর্থ নির্ধারিত না হলে, দুর্বোধ্যতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা। দার্শনিক আলোচনায় ‘স্বপ্রকাশ’ শব্দটি অতি আদরণীয়। কিন্তু ইতরজনের ব্যবহৃত অর্থে প্রকাশ মাত্রই ‘কিছুর মাধ্যমে অপর কিছু প্রকাশিত’। যেমন বস্তুর রূপ ‘আলোক-মাধ্যমে প্রকাশিত’। শিল্পকে যখন প্রকাশ বলে অভিহিত করা হচ্ছে, তখন এই অর্থেই করা হচ্ছে। এই সূত্রে উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্রনাথ শিল্প-আলোচনায় ‘প্রকাশ’ শব্দটির একটি বিশেষ দার্শনিক তাৎপর্য মেনেছেন৪, তাই প্রচলিত অর্থে রবীন্দ্রসাহিত্যে ‘প্রকাশ’ শব্দটি গ্রহণ করার নানা অসুবিধা। বরং পাশ্চাত্য দার্শনিক বেনেদেত্তো ক্রোচে তাঁর ‘এসথেটিকস’ বইয়ে ‘art is expression’ বলতে প্রকাশের সাধারণ অর্থই মেনেছেন। অর্থাৎ যে অর্থ-ভূমিকায় নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলি বৈধ ও তাৎপর্যময় ১. কী প্রকাশিত, ২. কীভাবে প্রকাশিত, ও ৩. প্রকাশের উদ্দেশ্য, সিদ্ধি বা লক্ষ্য কী? প্রচলিত পদ প্রয়োগ করলে বলতে হয়, প্রথম প্রশ্নটি শিল্পের বিষয়বস্তু-সূচক, দ্বিতীয়টি মাধ্যম-সূচক (আঙ্গিক ও পদ্ধতি এর অন্তর্ভুক্ত) ও তৃতীয়টি শিল্পের সার্থকতা-সূচক। দুর্ভাগ্যবশত, শিল্প আলোচনায় ‘প্রকাশ’ শব্দটির ব্যবহার কখনও কোনও একটিকে, আবার কখনও সম্মিলিতভাবে ওই তিনটিকেই বোঝানো হয়। এই কারণে অপ্রকৃত ও অপ্রাসঙ্গিক বিরোধ এবং বৈষম্য বর্জন করতে হলে, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে যথাযথ বিশ্লেষণপূর্বক ‘প্রকাশ’ শব্দটির প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা নিষ্পন্ন হওয়া উচিত। সহজ করে বলা যায়-শিল্পের রূপ বা / এবং অবয়ব প্রকাশ, আবার অন্তরাত্মাও প্রকাশ। অতএব সমস্যা হল, প্রত্যক্ষ-লভ্য রূপটি প্রকাশ, না রূপটি প্রকাশের বহিরাবরণ মাত্র? নানা দার্শনিক ও তত্ববিদ এ নিয়ে বহু আলোচনা করেছেন। এইজন্য বিস্তার নিষ্প্রয়োজন। উপরন্তু আমরা এই প্রবন্ধে শিল্পানুভব নিয়ে আদপেই লিপ্ত নই, আমাদের বিচার্য হল শিল্পের অর্থ কী, এবং বিধি-নিষেধের সঙ্গে শিল্পী ও শিল্পের সম্পর্ক কী? ঐতিহ্য আলোচনায় পূর্বেই ইঙ্গিত দিয়েছি যে ঐতিহ্য কার্যত, পরস্পরের আদানপ্রদানের বিধি-মঞ্চ; অতএব যদি এই মত প্রতিষ্ঠা করতে পারি যে বিধি (rules) ব্যতীত শিল্প অসম্ভব, তাহলে ঐতিহ্যের সঙ্গে শিল্পের সম্বন্ধ-প্রকার ও সম্বন্ধ-নিগূঢ়তা যথাযথ নিরূপিত হবে।
প্রকাশ কথাটির অর্থ বিশদ বুঝতে হলে, বিশেষ বিশেষ শিল্পের ক্ষেত্রে শব্দটির অভীপ্সা ও তাৎপর্য বিচার আবশ্যক। কাব্যশিল্পে প্রকাশ অর্থ কী? কবিতার শ্রুত বা দৃষ্ট শব্দ-চিহ্নসমূহ, না তদন্তর্নিহিত কোনও ভাবসত্য? কাব্যবিষয় কি লিখিত বা উদ্ধৃত শব্দ না শিল্পীমনের কল্পনায় উদ্ভাসিত কোনও তত্ব বা সত্য বা ভাব? উপরে শেষোক্ত তিনটি পদকে এক অর্থে ব্যবহার করছি, কেননা তাদের অর্থভিন্নতা আমাদের উদ্দেশ্যসাধনে নিষ্প্রয়োজন। ভাববাদী বা অর্থবাদীরা বলবেন, কাব্যের অর্থ বা ভাবচেতনায় অন্তর্নিহিত এবং প্রকৃত প্রকাশ এটিই ; ভাবের বহিরানয়ন কেবলমাত্র টেকনিক বা ব্যবহারিক ক্রিয়া, সৃষ্টি নয়। সৃষ্টি ও প্রকাশ অভিন্ন এবং উভয়ই শিল্পীর ব্যক্তিমানস। সংক্ষেপে, সৃজনশীল কল্পনা। অপর পক্ষে, অবয়ববাদীরা বলবেন, শিল্পে আবরণ ও আবৃতের (form & content) পার্থক্য অযৌক্তিক ও অযাচিত-ইন্দ্রিয়জ প্রত্যক্ষে যা লভ্য তাই সৃষ্টি বা প্রকাশ। এতৎপ্রকার বিভেদজন্য শিল্পতত্ব বিচারে বিভিন্ন মতাদর্শ প্রচলিত। যে জড়বস্তু-মাধ্যমে শিল্পের প্রকাশ, সেই জড়-পিণ্ড যে শিল্পবস্তু নয় এ কথা বোধহয় সকলেই মানবেন। অর্থাৎ কাব্য-পুথি, পট-বস্ত্র বা ভাস্কর্যপ্রস্তর নিতান্তই প্রাকৃতিক সামগ্রী, তারা কদাপি শিল্পবস্তু নয়। কিন্তু পূর্বে যে আমি অবয়ববাদীদের কথা বলেছি, তাঁরা কি তবে এই অসম্ভব মত পোষণ করেন যে জড়পদার্থগুলিই শিল্প-বস্তু? অবশ্যই নয়। তাঁরা বলেন ‘উপস্থাপিত বিষয়জন্য যে অবয়বসমূহ, তৎসকাশে যে ইন্দ্রিয়জ অনুভব তাই এবং কেবল তাই শিল্পপ্রকাশ।’ বস্তুত, এই দুই বিসম্বাদী দলের প্রকৃত পার্থক্যের স্বরূপ নির্ণয় জনৈক পাশ্চাত্য দার্শনিক অতি সুন্দরভাবে করেছেন। উক্ত দার্শনিকের মতে, ‘ভাববাদীরা স্রষ্টার ব্যক্তিমানসের উপর জোর দেন, অপর পক্ষে অবয়বাদীরা জোর দেন শিল্পসৃষ্টির সঞ্চারধর্মিতার উপর।৫’ অর্থাৎ প্রথম পক্ষ একদেশদর্শী কেননা তাঁরা শিল্পসৃষ্টি বিচারে কেবল প্রকাশধারার বিশ্লেষণ করে থাকেন এবং দ্বিতীয় পক্ষ একই প্রকার দোষ করেন প্রকাশিতের প্রাধান্য স্বীকারে। অথচ, শিল্প এই দুই নিয়ে-এক সামগ্রিক ঐক্যবদ্ধ প্রকাশ। এবার আমাদের মূল বক্তব্যে আসা যাক।
শিল্প প্রকাশ, প্রকাশমাধ্যম-নির্ভর। অতএব এই মাধ্যম জ্ঞানায়ত্ত না হলে, বা তার ব্যবহারবিধি রপ্ত না থাকলে শিল্পী প্রকাশকৃপণ ও ফলত অনুর্বর হয়ে পড়বেন। শিল্পমাত্রই অবয়ব-সমন্বিত প্রকাশ। অবয়ব মাত্রই মাধ্যম-নির্ভর। অর্থাৎ চিত্রকরের প্রকাশানুভব বর্ণে, আলোকে; কবির শব্দে, ধ্বনিতে; সংগীতকারের সুরে, স্বরে ইত্যাদি। এক্ষেত্রে যদি কেউ পরাদার্শনিক হয়ে বলেন, যে শিল্প এতাদৃশ মাধ্যম-নিরপেক্ষ, নিরবয়ব এক অরূপ ভাবপাথার, এবং পরবর্তী মাধ্যমচয়নের দ্বারা শিল্পে ওই আদি নিরবলম্ব ভাবই প্রকাশিত হয়, তাহলে বলতে বাধ্য হব যে, এ মত এতই অবাস্তব ও অযৌক্তিক যে এই মত স্বীকৃতি তো দূরস্থান, এ মতবাদ বোঝাই দুঃসাধ্য। এ মত মানলে বলতে হয়, শিল্পসৃষ্টি গুটিকয় অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির অকৈতব সাধনার বিষয়- প্রকাশে তার বিকার ও ব্যর্থতা। বস্তুত, এই মত নানা অসুবিধা সৃষ্টি করে। প্রথমত, এ মত বিচারবিরোধী। অথচ শিল্পে বিচার থেকে নিরস্ত হলে, স্বভাবতই উৎকর্ষজ্ঞাপন আবেদন প্রকাশও বন্ধ করতে হয়। এবং তা করার অর্থ, শিল্পরস আস্বাদন একান্তই ব্যক্তিগত রুচি-নির্ভর করা ও তুলনামূলক আলোচনার দ্বার রুদ্ধ করা। দ্বিতীয়ত, এ মত ঘটনাবিরোধী, কেননা শিল্প-ইতিহাসে দেখি, শিল্পীরা এর বিপরীত ব্যবহারই দেখিয়েছেন। তৃতীয়ত, এ জাতীয় ‘মাধ্যম-নিরপেক্ষ’ ভাব কল্পনাসাধ্য নয় এবং এই ভাবের স্বরূপনির্ধারণ সাধ্যাতীত। ফলে প্রকাশ ও প্রকাশ্যের যথার্থ সম্বন্ধ নিরূপণ অসম্ভব। অতএব এই অযাচিত কষ্টকল্পনার মধ্যে না গিয়ে আমরা শিল্পকে মূলত সাবয়ব, মাধ্যম-সাপেক্ষ প্রকাশ বলে মানাই যুক্তিযুক্ত মনে করি। ন্যায়ত, এটাও মানতে হবে যে শিল্পী তাঁর চেতনায় শিল্পসৃষ্টির বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন প্রকার বিষয় বা বস্তু বা ভাবের স্বধর্ম-নিরূপণ (identifying) করতে অসমর্থ হলে প্রকাশে অক্ষম হবেন। কোনও কিছুর স্বধর্ম-নিরূপণ কিন্তু কর্তার অহেতুক ইচ্ছা বা অভীপ্সার উপর নির্ভর করে না। যেমন, একটি ফুলকে ‘ফুল’ বলে জানতে হলে ফুলের স্বধর্ম-নিরূপণ অবশ্যকর্তব্য। অথচ এ জাতীয় ধর্ম-নিরূপণ অন্তে নির্ভর করে প্রচলিত বা / এবং পরিকল্পিত বিধির উপর। চেয়ার-কে ‘ফুল’ বলে যদি অভিহিতও করি, তথাপি তার ধর্ম-নিরূপণ পদ্ধতি অব্যাহত থাকে। অর্থাৎ বস্তু-অভিধা কোনও-না-কোনও নিরূপিতব্য ধর্ম-সাদৃশ্যের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ কতিপয় বিধি অনুসরণ না করলে, এবং স্ব-ইচ্ছায় বিভিন্নকালে একই বস্তুতে ভিন্ন ধর্ম আরোপ করলে, ধর্ম-ধ্রুবত্বের অভাবে কোনও পরিগ্রহ বা ভাব-সঞ্চার অসম্ভব। অতএব, শিল্পী সামাজিক জীব হিসাবে ও কিয়দংশে স্বীয় সুবিধার্থেও বটে, এইরূপ বিধি স্বীকার ও প্রয়োগে বাধ্য।
শিল্প প্রকাশ প্রকাশ বিভিন্ন সামগ্রী ও মাধ্যম-নির্ভর। শিল্পী এই সামগ্রী রাশি ও মাধ্যমগুলি সঠিক নিরূপণের জন্য বিধিনির্ভর। স্ব স্ব কল্পনায় বিধি লাভ হয় না। বিধিমাত্রই সমাজে প্রচলিত ও স্বীকৃত। অতএব বিধি ঐতিহ্যনির্ভর। ফলত শিল্পও অন্তে ঐতিহ্যনির্ভর। ধরা যাক, সাহিত্য। সাহিত্যমাধ্যম শব্দ ও ভাষা; শব্দ ও ভাষার যথাযথ প্রয়োগ, বিধিনিয়ন্ত্রিত। মূলকথা, শিল্পকে প্রকাশ মানলে, প্রকাশের নিমিত্ত ঐতিহ্য-পরিপুষ্ট প্রচলিত বিধি ও নিয়মাবলি মানতে বাধ্য। একথা অবশ্যই আমার বক্তব্য নয় যে, ঐতিহ্যের আগম কেবলমাত্র বিধি-আশ্রয়ী; ভার বৈশিষ্ট্য, বর্ণনা-তাৎপর্য ইত্যাদি নানা কারণেই শিল্পীকে ঐতিহ্যের শরণ নিতে হয়। আমি মাত্র এটুকুই বলতে চাই যে শিল্পীর পক্ষে নূ্যনতম অথচ অবশ্যস্বীকার্য যে চেতনা তা বিধি-ভিত্তিক। অন্তত এই কারণে শিল্পী, তা তিনি যতই প্রতিভাধর বা ব্যষ্টিশাসিত হন না কেন, ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে পারেন না।
এখানে অবশ্য নিম্নরূপ প্রশ্ন উঠতে পারে। সাহিত্য উপন্যাস, নাটক এগুলিকে ভাষার নিয়মাবলি বা বিশেষ করে অর্থ ও প্রয়োগবিধি যতটা প্রযোজ্য, কবিতায় ততখানি নয়। এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু তা সত্বেও কবিতারও মাধ্যম ভাষা; ফলে ভাষাগত বিধি-সূত্র সম্পূর্ণ অস্বীকার করা তো চলে না। শব্দার্থ হয়তো রূপক, ব্যঞ্জনা ইত্যাদির দ্বারা অধিকতর প্রভাবিত। কিন্তু শব্দের রূপকার্থ কদাপি স্বয়ম্ভর নয়, লক্ষণার্থের উপর নির্ভরশীল। রূপক, ব্যঞ্জনা ইত্যাদির আশ্রয়ে অর্থবিস্তার হয়, কিন্তু মূলে তো সেই লক্ষণার্থ।
অর্থাৎ মাধ্যম-নিরূপণ ও প্রয়োগ সংক্রান্ত বিধি শিল্পী মানতে ও জানতে বাধ্য এবং যেহেতু বিধি, সেই হেতু ঐতিহ্যনির্ভর। অতএব অন্তত এই কারণে শিল্প ঐতিহ্য ব্যতিরেকে সম্ভব নয়।
শিল্প ও প্রকাশ অভিন্ন, আমরা পূর্বেই স্বীকার করে নিয়েছি; প্রকাশ সম্পর্কিত যে তিনটি সম্ভাব্য প্রশ্ন উল্লিখিত হয়েছিল, তার তৃতীয় বা শেষ প্রশ্নটি, অর্থাৎ ‘প্রকাশের (শিল্পের) উদ্দেশ্য কী’, অনন্তর এটির সঙ্গে বিধিবৃত্তির অনিবার্যতা বিচার করব। শিল্প যেহেতু প্রকাশ, সেই হেতু শিল্পের মূল উদ্দেশ্য- ‘ভাব-অনুভূতি সঞ্চার’। অর্থাৎ শিল্পীকে একটি বিশেষ কালের, বিশেষ দেশের রসিকবৃন্দের কথা ভাবতেই হবে। এবং সেক্ষেত্রে রসিক ও রসস্রষ্টার মধ্যে যদি সমপর্যায়ের কোনওপ্রকার বিধিসাদৃশ্য না থাকে, তাহলে প্রকৃতই বিপর্যয়। নিরবধি কাল ও বিপুলা পৃথিবী যদি ধরেও নিই, তাহলেও ‘সমানধর্মী’র প্রয়োজন। জনৈক পাশ্চাত্য সমালোচক ও সাহিত্যিকের মতে – ‘The poet and the critic must be composed of the same peers.’। এই সমধর্মিতা তো কেবল কতকগুলি ব্যক্তিধর্ম নয় – সমান প্রতিক্রিয়া-সামর্থ্য। শিল্পীর প্রত্যাশার যাথার্থ্য কেবলমাত্র নিয়মানুগ ও বিধি-অনুগত ব্যবহার-নির্ণীত। প্রজ্ঞাবান ইতালীয় দার্শনিক ও শিল্পতত্ববিদ ক্রোচে তাঁর এসথেটিকস গ্রন্থে এ বিষয়ে একটি শিক্ষাপ্রদ উদাহরণ দিয়েছেন। তথাকথিত কোনও অসভ্য সম্প্রদায় একটি চিত্রিত ক্যানভ্যাসকে পারাপার-তরণী ভেবে জলে ব্যবহার করতে যায়। এ দৃষ্টান্ত থেকে এটা স্পষ্ট হয়, যে শিল্প ও সঞ্চার সমধর্মী সংস্কৃতি ও পরিবেশের অপেক্ষা রাখে। উল্লিখিত দৃষ্টান্তে অসভ্য সম্প্রদায়টির স্বীয় ঐতিহ্য থাকা সত্বেও চিত্রশিল্পীর ঐতিহ্য থেকে তা এতই ভিন্নতর যে পারস্পরিক সমধর্মিতার অভাবে শিল্পানুভবের এই নিদারুণ ব্যর্থতা সম্ভব হল। এই সমধির্মিতার ক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তা অবশ্যই অনেকাংশে নির্ভর করে, রসিক ও রসস্রষ্টার মধ্যে বিধিপালনের সাদৃশ্যের উপর। আজ জগৎ অনেক সংকীর্ণ, সেহেতু এক দেশের শিল্পী অন্য দেশে বা অন্যতর ঐতিহ্য-পরিপুষ্ট সংস্কৃতিতেও কদর পান, কিন্তু তা নেহাৎই সমধর্মিতা ভিত্তি করেই। অদ্যাবধি ভাবা কঠিন যে কোনও চিনা গায়ক, তা তিনি যতবড় কুশলী শিল্পীই হন না কেন, ভারতের কোনও অজগ্রামে আদৃত হবেন। সমধর্মিতার অর্থ বস্তুত কতকগুলি সদৃশ বিধির সচেতন ও অবচেতন প্রতিপালন। কল্পনা, ভাবাবেগ এগুলি বিশেষ করে এমনই সমাজপুষ্ট যে এ জাতীয় প্রতিক্রিয়া প্রায়শই বিধিভিত্তিক। এস্থলে ‘বিধি’ শব্দটির কিঞ্চিৎ বিশ্লেষণ একান্ত প্রয়োজনীয়। ‘বিধি’ পদটি এই প্রবন্ধে খুবই প্রসারিত অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ, বিধি বলতে, আজ্ঞা, নিষেধ ও প্রচলিত ব্যবহারবৃত্তি বোঝানো হচ্ছে। প্রথা, নিয়ম ও গোষ্ঠীনির্ভর চারিত্রিক প্রতিক্রিয়া-এই তিন ধরনের চেতনাকেই ‘বিধি’র অর্থের অন্তর্ভুক্ত করছি। আসলে তথাকথিত স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়াসমূহকে যতটা স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়, বস্তুত তারা তা নয়, অনেকখানিই সমাজে বহুদিনের অভ্যাস-নির্ধারিত। শিল্পী স্বয়ং কিয়ৎপরিমাণে এই বিধি ভাবিত না হলে সৃষ্টিকার্যে উদ্বুদ্ধ হতে পারে না। স্রষ্টাকে যদি সর্বদা স্মরণ করতে হয় যে তাঁর সৃষ্টির প্রত্যেক ক্রিয়া ও উপকরণের জন্য টীকা-ভাষ্য তাঁকেই উপস্থাপিত করতে হবে, তাহলে তিনি তৎক্ষণাৎ সকল অনুপ্রেরণা হারিয়ে সৃষ্টি থেকে নিরস্ত হবেন। তদুপরি, টীকা-ভাষ্যও সাধারণভাবে কতকগুলি বিধি স্বীকৃতির উপর নির্ভর করে। মোটকথা, জ্ঞানত ও অজ্ঞাতে কতকগুলি ব্যবহারিক সাদৃশ্য-জন্যই শিল্প-প্রকাশ ও ভাবসঞ্চার আদপে সম্ভব, নচেৎ নয়। ঐতিহ্য এই ব্যবহারিক সাদৃশ্যের কারণ-মঞ্চ। এই কারণে শিল্প ও ঐতিহ্য অঙ্গাঙ্গী সম্পৃক্ত।
এ তো গেল শিল্প ও ঐতিহ্যের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। এতদ্ব্যতীত ঐতিহ্য-সংরক্ষণ ও শিল্পীর সৃজনশীল চেতনার এক জাতীয় প্রকারগত সাযুজ্য বর্তমান। পূর্বেই বলা হয়েছে ঐতিহ্য, জীবনযাপনে ব্যাপক অর্থে একটি সংহত মূল্যাদর্শ দেয়, যা ব্যক্তির বিভিন্ন কার্যে মূল্যায়নে সহায়তা করে, অথচ যে মূল্যায়ন সামাজিক ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যবিধায়ক। সৃজনশীল চেতনা তথ্য সৃষ্টি করে না, নতুন বিষয় সৃষ্টি করে না, সৃষ্টি করে এক অভিনব মূল্যাদর্শ অথচ যা সঞ্চিত মূল্যাদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত – কী সংঘাতে, কী সহযোগিতায়। অর্থাৎ শিল্পীর সৃজনক্রিয়া মূল্যায়নহেতু শিল্পীকে ঐতিহ্যের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হয়। মূল্যবোধ তো স্বতন্ত্র তথ্য আবিষ্কার নয়, তথ্যজগতে ও ভাবজগতে নির্বাচন প্রয়োগ। ফলে সহানুভূতির আবেদন সেক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী। অর্থাৎ সাধারণ বা বিশেষ সংবেদন উত্থাপন দ্বারা সদৃশ গণগোষ্ঠীতে ভাবসামঞ্জস্য ও বিচারসমতার নিশ্চয়তা, মূল্যায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য। সংক্ষেপে ‘আমি যাকে ভালো বলি, তুমিও তাকেই বল’-এ আবেদন মূল্যায়নের প্রধান অনুপ্রেরণা। আমরা পরে দেখব যে, এই কাররেই শিল্পবস্তু (art object) কোনও বিশিষ্ট সত্তা বা ভাবসৃষ্টি নয়, এক সমগ্র চৈতন্যদর্শ (model) সৃষ্টি। এই মর্মে তাই শিল্পে ঐতিহ্যের প্রভাব গভীর।
স্বভাবতই সমালোচকবৃন্দ শিল্পে ঐতিহ্যের প্রভাব পরিস্ফুট বলেই মনে করেছেন। তথাপি এই প্রবন্ধে সর্বজনস্বীকৃত মতেরই দীর্ঘ পুনরালোচনা আপাতদৃষ্টিতে বর্জনীয় পুনরুক্তি মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বহুভাষিত হয়েও ঐতিহ্যের প্রকৃত অর্থ বিশ্লেষণ না করার জন্য ও শিল্প এবং ঐতিহ্যের পারস্পরিক সম্বন্ধের বৈজ্ঞানিক বিচারের অভাবে, শিল্প কোন ক্ষেত্রে এবং কিভাবে ঐতিহ্যকে আত্মসাৎ করতে পারে, তার সুস্পষ্ট ধারণা হয় না। ফলে প্রায়ই ঐতিহ্যের নামে শিল্পে প্রাচীন ইতিহাসকেই বরণ করি। এ জাতীয় প্রমাদের দৃষ্টান্ত প্রচুর। চিত্রশিল্পে অবনীন্দ্রনাথ, সংগীতে কসরৎ-পারদর্শী, সাহিত্যে সনাতনপন্থী সমালোচকদের হাতে রবীন্দ্রনাথের লাঞ্ছনা-এ সবই একই ভুলের উদাহরণ। অর্থাৎ ঐতিহ্যের একটি ব্যক্তিনিরপেক্ষ, কালনিরপেক্ষ অবশ্যস্বীকার্য কাঠামো আছে যার বাইরে ভাবপ্রকাশ অসার্থক, বস্তুত অসম্ভব। প্রাচীন কতকগুলি ধারণা ও বিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করা কোনোক্রমেই ঐতিহ্যবরণ নয়।
৩
সনাতনপন্থীরা যদি ইতিহাসকে ঐতিহ্য বলে ভুল করেন, তাহলে অতিশয় আধুনিকতার বাসনায় বিরোধী গোষ্ঠী পরিবর্তনমাত্রই প্রগতি এই ভুল বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে চান। ঐতিহ্যের যে অর্থ আমরা গ্রহণ করেছি তা যথার্থ হলে, আধুনিকতা কেবল সমকালীনতা নয়, এক প্রগতিশীল মূল্যমান নির্ণয়; ধারাবাহিকতা অস্বীকার জন্য যে অনুর্বর অভিনবত্ব, সেই অর্থহীন, উদ্দেশ্যশূন্য পরিবর্তন নয়, আধুনিকতা তাই, যা ঐতিহ্যগত আদর্শকে নব কলেবর দান ও ফলত সমকালীন সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক প্রকাশলিপ্সাকে সংহত ও সংগঠিত করে। সংক্ষেপে, আধুনিকতা মাত্র বৈচিত্র্যই নয়, সার্থক বৈশিষ্ট্য; সামান্যকে বাদ দিয়ে বৈশিষ্ট্য অর্থহীন। ঐতিহ্য উক্ত সামান্যের পটভূমি। অর্থাৎ ঐতিহ্য ও আধুনিকতা পরস্পরবিরোধী নয়, পরস্পর সম্পূরক। আধুনিকতার প্রকৃত দ্বন্দ্ব আনুষ্ঠানিকতার (Institutions) সঙ্গে। বস্তুত আধুনিকতা তো কোনও ব্যক্তিবিশেষের খেয়ালখুশির চাল নয়, সমাজে স্বীকৃত প্রগতিশীলতা। ফলে আধুনিকতাই সমাজস্বীকৃতির মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঐতিহ্য। একটি কথা অবশ্যবিবেচ্য এইজন্য যে, শিল্পে প্রায়শই আধুনিকতার অভিমানে ঐতিহ্যের প্রতি অযাচিতভাবে বিরূপ মনোভাব পোষিত হয়। এই মনোভাবের সবটাই অবশ্য কৃত্রিম বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। ঐতিহ্য বিধি-মণ্ডিত। শিল্প মুক্তিচেতনাজন্য ও মুক্তি-আকাঙ্ক্ষী। বিধি অনুসরণ তাই মুক্তিপথের বাধা মনে হতে পারে। ফলে অনেক সময় শিল্পী ও সমালোচকগণ ঐতিহ্যকে বন্ধন ভাবেন; এ ভাবনা কিয়দংশে খুবই স্বাভাবিক, যদিও ভ্রান্ত। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা শিল্পে আধুনিকতার স্বরূপ বিশ্লেষণ না করে ঐতিহ্যের প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করছি, ততক্ষণ পূর্বপক্ষের ধারণা ভ্রান্ত হলেও উপেক্ষণীয় নয়।
‘আধুনিক’ শব্দের একটি প্রধান অর্থ ‘সাম্প্রতিক’। অর্থাৎ আধুনিক পদটি কালনিরপেক্ষ নয়। এক অর্থে সম্প্রতিকালে যে শিল্প সৃষ্ট, তাই ‘আধুনিক শিল্প’। এই অর্থে ‘আধুনিক’ পদটি পরিগৃহীত হলে প্রচলিত ব্যবহার-রীতি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়। যদিও আধুনিক পদটির কালাবচ্ছেদকতা সাধারণভাবে অনস্বীকার্য, তথাপি মাত্র সেই অর্থেই পদটি আমরা ব্যবহার করি না। আধুনিক শব্দটি ব্যবহৃত রীতি অনুসারে, একটি গুণগত বৈশিষ্ট্যও আরোপিত হয়। এযুগে বাস করেও কোনও শিল্পী সনাতন পদ্ধতি অনুসরণ করলেও, তাঁর সৃষ্ট শিল্পবস্তুকে আমরা কদাপি আধুনিক বলব না। দ্বিতীয়ত, কেবলমাত্র ‘অভিনবত্ব’ থাকলেই ‘আধুনিক’ শব্দটির আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ হয় না; যদিও এটি একটি অবশ্যগণ্য অর্থ। অর্থাৎ ‘আধুনিক শিল্প’ নিঃসন্দেহে অভিনবত্ব অবগাহী, কিন্তু ‘অভিনব শিল্প’ হলেই তাকে ‘আধুনিক শিল্প’ নিঃসন্দেহে অভিনবত্ব-অবগাহী, কিন্তু ‘অভিনবত্ব যদি রসিক মহলে স্বীকৃত ও প্রগতিশীল ধারণার জনক হিসাবে পরিগণিত হয়, তবেই সেই অভিনবত্ব শিল্পে আধুনিকতার মর্যাদা পায়। তদুপরি এই অভিনবত্ব ভাব ও রূপ উভয়ক্ষেত্রেই রসসঞ্চারী হওয়া বাঞ্ছনীয়। নচেৎ আধুনিকতা ও আঙ্গিক-মগ্নতা একার্থক হয়ে পড়ে ও শিল্পমুক্তির ছদ্মনামে শিল্পের সত্যনাশে সহায়ক হয়। একথাও অবশ্য স্মরণীয় যে, তৎকালীন রসিকসমাজে স্বীকৃতি-সাপেক্ষতা সবর্দা নির্ভরযোগ্য নয়। পরবর্তী যুগের রসিকসমাজ প্রাচীন কোনও শিল্পীর কার্যে সার্থক আধুনিকতা আবিষ্কার করতে পারেন। যথা, ফরাসি দেশে অঁরি রুশোর চিত্রঙ্কন তৎকালীন প্যারিসে বহুনিন্দিত ও পরিহসিত হওয়া সত্বেও স্বীয় বৈশিষ্ট্যে পরবর্তীকালে বিশেষ সমাদৃত হয়। কিন্তু এ সম্ভাবনা থাকলেও সমকালীন রসিকসমাজে সঞ্চারিত হওয়ার আবশ্যকতা একেবারে অস্বীকৃত হলে, স্বৈরাচারপন্থী অভিনবত্বে শিল্পজগতে দুর্যোগ ও দুর্বোধ্যতার অবধি থাকবে না।
মোট কথা ‘সাম্প্রতিকতা’ ও ‘অভিনবত্ব’ আধুনিকতার (শিল্পবিচারে) আংশিক ব্যাখ্যাই দেয় মাত্র। এ ছাড়াও ‘আধুনিক শিল্প’ বলতে আমরা জীবন, সমাজ ও সত্তা সম্পর্কে এক সামগ্রিক ধর্মসাপেক্ষতা বুঝি যেটির প্রকৃত ব্যাখ্যা করতে হলে, অন্তত কিছুটা শিল্পের স্বরূপ ব্যাখ্যাত হওয়া নিতান্ত প্রয়োজন। অবশ্য এই বিশিষ্ট অর্থোদগমের অপেক্ষা না করেও ব্যাপক অর্থে বলতে পারি যে আধুনিক শিল্প পরিবেশনে এযাবৎকালের শিল্পধারা প্রকাশের এক নতুনও বিস্তৃত ধারায় প্রবাহিত হয়। আর এই কারণেই প্রাক-বিস্তৃতির পরিপ্রেক্ষিত বর্জন করে শিল্পকে আধুনিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা অর্থহীন ও অবাস্তব। এই প্রাক-পরিপ্রেক্ষিত আত্মগত করেই প্রগতি। অর্থাৎ ঐতিহ্যকে আত্মসাৎ করে, তাকে বর্জন করে নয়, শিল্প আধুনিকতার মহত্বলাভ করতে পারে। এর অর্থ, আধুনিকতার স্তরে, শিল্প ও শিল্পীকে এক নতুন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐতিহ্য সদাই বিধি-ভিত্তিক। অথচ, সাম্প্রতিকতা ও অভিনবত্ব ব্যতীত আধুনিকতার তৃতীয় এক অর্থ আছে। এই অর্থে আধুনিক শিল্প নিয়তই শুদ্ধতাসন্ধী ও তদর্থেই মুক্তিপ্রার্থী। শিল্পে প্রগতির পথ ক্রমবর্ধমান মুক্তি অর্জনের পথ। কিন্তু কি থেকে মুক্তি? অবশ্যই বন্ধু থেকে মুক্তি; বিধিনিয়মের জটিলতা ও বাহুল্য থেকে মুক্তি। অথচ ঐতিহ্য মানতে হলে, এ মুক্তি পরাহত নয় কি? এ প্রবন্ধে প্রতিপন্ন করা চেষ্টা করব যে এ সমস্যা কেবল আপাত-বিরোধের সমস্যা। আর তাই জন্য প্রয়োজন, সংক্ষেপে শিল্পস্বরূপ বিশ্লেষণ।
৪
আমরা পূর্বেই দেখেছি শিল্প প্রকাশ। কিন্তু কী প্রকাশ করে? অর্থাৎ প্রকাশকে প্রতীকধর্মী (Symbolic) ভাবা নিতান্তই স্বাভাবিক। প্রাচীন দার্শনিকদের রীতি অনুযায়ী শিল্পকে সৌন্দর্যের, সুষমার বা আনন্দের প্রকাশ বলা একেবারেই অচল, কেননা এ জাতীয় অর্থহীন বাকবিস্তারে শিল্পসমস্যার কিছুমাত্র সমাধান হয় না। তাছাড়াও আনন্দ, সৌন্দর্য বা তাদৃশ ভাবপদার্থ, প্রকাশের ফলস্বরূপ, প্রকাশের আধেয় নয়। শিল্পী কোনও একটি বিষয়, একটি আবেগ বা একটি ভাব প্রকাশ করেন না; তিনি নানা বিচিত্র বিষয় প্রকাশ করেন। বস্তুত শিল্প-বিষয়ক এ জাতীয় প্রাচীনপন্থী সংজ্ঞা কেবলই পুনরুক্তি… তার তাৎপর্য বিচার দুরূহ। প্রকৃতপক্ষে শিল্পের সংজ্ঞা কখনও সম্ভব নয়; এবং প্রয়োজনীয়ও নয়। শিল্প বা আর্ট এমন বিচিত্র কার্য-কারণের সমাহার যে তাদের সম্মিলিত কোনও সাধারণধর্ম অন্বেষণ মূঢ়তা ও অযথা কালক্ষেপণ। বিভিন্ন শৈল্পিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে যে সাদৃশ্য তা কোনও একটি সামান্যধর্ম-জন্য নয়, ভিন্ন ভিন্ন প্রকার ও স্তরের সামান্যধর্ম-সমাহার। একেই জনৈক পাশ্চাত্য দার্শনিক৬ ‘family resemblance’ বলেছেন। আর্টের একটি বিখ্যাত সংজ্ঞা দিয়েছেন শিল্প-সমালোচক ক্লাইভ বেল। তাঁর মতে ‘art is distortions’। এই বাক্যটি বিশ্লেষণ করলেই আর্টের সংজ্ঞা কখন কীভাবে পুনরুক্তির প্রশ্রয় দেয়, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে। সমালোচকের মতে শিল্প= বিকার। কিন্তু যে কোনও বিকার বা distortion তো নয়। একতাল মৃত্তিকা বা একখণ্ড প্রস্তরকে যে কোনোভাবে বিকৃত করলেই তা আর্ট হয় না। অগত্যা মানতে হয় কেবলমাত্র শিল্পোচিত বিকার (artistic distortion)-ই শিল্প। অর্থাৎ অন্তে সংজ্ঞার্থ দিতে হয় সংজ্ঞেয় (definicndum) পদের সাহায্য নিয়ে ও ফলে অহেতুক চক্রন্যায়ে আবর্তিত হতে হয়। আর্টকে ‘হার্মনি’ বলারও এক অসুবিধা। প্রকৃতপক্ষে ‘শিল্প’ ভিন্ন ভিন্ন কার্য – চিত্রণ, সংগীত, সাহিত্য, ভাস্কর্য ইত্যাদি। এর সবগুলি প্রকাশ করতে যদিও ‘শিল্প’ বা ‘আর্ট’ এই সামান্য, পদ ব্যবহার করি, তৎসত্বেও এই পদের পরিপূরক কোনও একটি অর্থসামান্য বা সংজ্ঞা অন্বেষণ অযথা নৈয়ায়িক লিপ্সা চরিতার্থতার অপচেষ্টা। অবশ্য সংজ্ঞাকথন অসম্ভব বলে হতাশ হবার কোনও কারণ দেখি না। বস্তুত একক ধর্মসাদৃশ্য না থাকলেও, সব কটি ক্রিয়ারই এক উদ্দেশ্য বা সার্থকতা-সাদৃশ্য আছে বা থাকতে পারে। এই সাদৃশ্য শিল্পে কী প্রকার? কেউ কেউ বলেন শুদ্ধ ‘অনুভবসিদ্ধি’; কেউ বলবেন-‘ভাবসিদ্ধি’ ( যেমন, কলিংউড);কারও মতে বিশ্বে নিহিত ‘তত্বসিদ্ধি’ (Reality)। এই তত্ব কেউ ‘জড়ে’ আরোপ করেন, আর কেউ বা ‘চিৎ’-এ। আবার তথাকথিত বাস্তববাদীরা (Realists) এই দুইয়ের সমন্বয়ে যে বাস্তবজীবন, পরিপার্শ্ব ও পরিবর্তনশীল সমাজচেতনা, তাতে আরোপ ক’রে থাকেন। প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক হাবার্ট রিড এই শেষোক্ত মতের প্রবক্তা। মার্কসবাদীরা তো বটেই। প্রথমটিকে সাবজেকটিভ (subjective) ও তৎপরবর্তী মতগুলিকে সচ্ছন্দে অবজেকটিভ (objective) বলা যেতে পারে। শিল্পের সার্থকতাবিষয়ক আলোচনাগুলি মোটামুটি উক্ত মতগুলির যে কোনও একটির অন্তর্ভুক্ত করা চলে। অতএব উক্ত মত ক’টি বিচার করলে আমরা নূন্যাধিক শিল্পের সার্থকতা ও উদ্দেশ্যের সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে এক যথার্থ দৃষ্টি লাভ করতে পারি। প্রথমেই যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হল এই মতগুলির ব্যাপ্তি দোষ।
প্রথমে উল্লিখিত মতটি, অর্থাৎ ‘শিল্পের অনুভবসিদ্ধি’-শিল্পকে অতিমাত্রায় ব্যক্তিতান্ত্রিক করে তোলে। শিল্প যদি শিল্পীর কোনও বিশেষ অনুভবের প্রকাশ মাত্র হয় তাহলে শিল্পের অন্যতম প্রয়োজনীয় যে ধর্ম, অর্থাৎ নিখি হৃদয়সংবেদ্যতা, তার হানি হয়। ব্যক্তির ক্ষণ-নিরূপিত কালে যে অনুভব তা এতই ব্যক্তিগত যে তার সঞ্চার বড়ই কঠিন, এমনকি অসম্ভব বলেলও অত্যুক্তি হয় না। দ্বিতীয়ত, কোনও বিশেষ অনুভবের প্রকাশ এতই তথ্যনির্ভর যে শিল্প স্বতঃই আবেদনাত্মক (prescriptive) না হয়ে, অন্যায় রকম বর্ণনাত্মক (descriptive) হয়ে ওঠে ও শিল্পধর্ম হারায়। এবং সেক্ষেত্রে শিল্প ও ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়ে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ঘটনাচিত্র ও ঐতিহাসিক উপন্যাসে এই ক্ষীয়মাণ সীমারেখার গোলযোগ প্রকট হয়ে পড়ে। কোনও চিত্রশিল্পী যখন একটি গাছ আঁকেন, তখন কোনও এক মুহূর্তে, কোনও এক স্থানে লব্ধ ওই বিশেষ গাছটির বিশিষ্ট অনুভব প্রকাশ শিল্পীর উদ্দেশ্য কদাপি নয়; কেননা শিল্পচেতনার প্রয়োজনীয় বিস্তার এতে নেই। শেষত, এই ক্ষণনির্দিষ্ট এক বিশিষ্ট অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিল্পীর সম্পূর্ণ একাত্মতাবোধ আসতেই পারে না। প্রতিনিয়তই তাঁর অনুভব-বৈচিত্র্য তাঁকে ওই মুহূর্তের নির্দিষ্ট অনুভব থেকে স্বতঃই বিচ্ছিন্ন করে দেবে। অতএব, শিল্পের উদ্দেশ্য অনুভবসিদ্ধি, এ মত স্বীকার করার বহু অসুবিধা।
দ্বিতীয় মতটি অর্থাৎ, শিল্প ভাবসিদ্ধি ভাববাদী দার্শনিকদের অতি প্রিয়। এই মত মানলে শিল্পে দার্শনিক ব্যাখ্যার প্রচুর সুযোগ বৃদ্ধি হয়। পৃথিবীর সত্তারাশির ভাববাদী ব্যাখ্যাকারবৃন্দ প্রায়ই অনুভব-সত্য ও চিন্তা-সত্যের মধ্যেকার স্তরে শিল্প-সত্যের স্থান নির্ণয় করেছেন। অনেকে আবার মনে করেছেন, যেমন রবীন্দ্রনাথ বা বহুলাংশে বের্গসঁ, যে মূল যে ঐক্যবদ্ধ সমাগ্রিক সত্য তা একমাত্র শিল্পেই উদ্ভাসিত। কিন্তু এই মতের মস্ত অসুবিধা শিল্পী ও রসিকের মধ্যে যথাক্রমে জাগ্রত ও সঞ্চারিত ভাবের অভিন্নতা নিরূপণ। শিল্পীর ভাব ও রসিকের ভাব ভিন্ন হলে শিল্পীর অভিপ্রেত ভাবসিদ্ধি হবে না। দ্বিতীয়ত এই মতানুসারে ভাব ও রূপের চিরন্তন দ্বন্দ্ব অপ্রতিহত থাকে। কেননা, যে রূপে যে ভাব শিল্পে প্রকাশিত, সেই ভাব ও সেই রূপের মধ্যে কোনও আবশ্যিক (necessary) সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অর্থাৎ একই ভাব অন্যরূপে বা অন্যজাতীয় রূপে প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। এবং তা না পারলে ভাব ও রূপের সমাগ্রিক সম্মিলনে শিল্পে যে অবিচ্ছেদ্য ঐক্য বর্তমান তার ব্যত্যয় হয়। ভাব ও রূপ পরস্পর-নিরপেক্ষ থাকে; ন্যায্যত, এই মতাবলম্বীদের মতে সংগীত বা চিত্রকলায় ভাবগত পার্থক্য নাও থাকতে পারে, কেবল রূপগত পার্থক্যের ভিত্তিতেই তারা ভিন্ন ভিন্ন শিল্প। এ কথা মেনে নেওয়া নিতান্তই কঠিন। রূপ-নিরপেক্ষ ভাব অকল্পনীয়। অতএব এ মতও গ্রাহ্য মনে হয় না।
‘শিল্পের উদ্দেশ্য তত্বসিদ্ধি’ এই তৃতীয় মতটির যৌক্তিক অসারতা সহজেই অনুমেয়। প্রথমত, তত্বপ্রকাশের বাহন শিল্প নয়, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি। ফলে সার্থকতা বিচারে, ‘তত্বসিদ্ধি’ সাদৃশ্যজন্য, বিজ্ঞান, দর্শন ও শিল্প তুলনীয় প্রকাশ হিসাবে গণ্য হতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে উৎকর্ষের মান নির্ণয় কঠিন, কেননা এই মতানুসারে যে মান শিল্পে প্রাযোজ্য, নূ্যনাধিক সেই মানই বিজ্ঞানে প্রয়োগ করতে হবে। এ কথা অবশ্যই অবাস্তব। কেননা, তত্ববিষয়ে যে জাতীয় প্রশ্ন করা যায়, শিল্পে সে প্রশ্ন নিতান্তই অর্থহীন। যথা – কোনও তত্ব ভুল কী নির্ভুল এ প্রশ্ন বৈধ, কিন্তু শিল্পে এ প্রশ্ন অচল। তত্বে প্রামাণ্য বিষয়ক প্রশ্ন সমীচীন ও অনুমোদিত, কিন্তু শিল্পে নিতান্তই হাস্যকর, সে তত্ব শুদ্ধ চিৎ-ই হোক, বা শুদ্ধ জড়-ই হোক। যাঁরা শুদ্ধ তত্বকে ‘জীবন, সমাজ, পরিপার্শ্ব’ ইত্যাদি অস্পষ্ট ও সংশয়াত্মক পদে পর্যবসিত করে শিল্পের উদ্দেশ্যসাধনে বিশ্বাসী, তাঁরা প্রায়শই বিচারবুদ্ধি পরিত্যাগ করে, সংস্কারবুদ্ধির প্রশ্রয় দিতে বাধ্য হন। হয় তাঁরা বলবেন যে, আমাদের নিত্য ও নৈমিত্তিকভাবে যাপিত জীবনের ইতিহাসই শিল্পপ্রকাশ ; সেক্ষেত্রে শিল্পে বিবরণের প্রাধান্য দেওয়া হবে ও ফলত সৃজনশীলতার হানি হবে। পরিপুষ্ট ও বহু উৎকৃষ্ট প্রচলিত শিল্পধারাকে এঁরা নিরন্তর উপেক্ষা ও অন্তে শিল্প হিসাবে অস্বীকার করবেন। নচেৎ, চেষ্টাকল্পিত তত্বসার আরোপ করে শিল্প ও জীবনের মধ্যে সামান্যতম ও ক্ষীণ সম্পর্ক উপস্থিত না করা পর্যন্ত সমালোচকবৃন্দ তৃপ্তি পাবে না। তথাকথিত মার্কসীয় ভঙ্গির শিল্পসমালোচনা অনেকাংশে এই পর্যায়ে পড়ে। এ ছাড়াও, উক্ত মতে, শিল্পীর সামাজিক জীবন ও শিল্পীর মনের গভীর যে ব্যক্তিগত জীবনবোধ (personal reserve, যদি না এই দুইয়ের পার্থক্য শুরুতেই অস্বীকৃত হয়)-এই দুইয়ের বিরোধের মীমাংসা সাধন অসম্ভব। অতএব, শিল্পীর ও শিল্পের যে একাত্মতার দাবি তা কেবলই অস্বীকৃত হবে ও শিল্পী দ্বৈত ব্যক্তিত্বের শিকার হবেন। ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত বিরল নয়। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গ্রিক মনীষী প্লেটো তাই তাঁর পরিকল্পিত রাষ্ট্র থেকে শিল্পীদের নির্বাসিত করে বিরোধের অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন।
বস্তুত, শিল্প যে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত একথা এতই স্পষ্ট ও স্বতঃসিদ্ধ যে, একথা প্রচারে কোনও অভিনব জ্ঞানসঞ্চার হয় না। শিল্পসৃষ্টি, নিঃসন্দেহে জীবনেরই একটি ক্রিয়া, অতএব জীবনের সঙ্গে যুক্ত, এটুকুই মাত্র বক্তব্য হলে বলা অনাবশ্যক। অবশ্যই জীবনতত্ব পারদর্শীরা এটুকু মাত্র বলেন না, তাঁরা বলতে চান (যদিও অনেকসময় পরিস্ফুট হয় না) শিল্প উৎসারিত সামাজিক জীবনের ব্যবহারিক ক্রিয়াকলাপের মধ্য থেকে এই হেতু শিল্পের আদিম বশ্যতা এই ব্যবহারিক জীবনের নিকট। এটা যদি সত্যও হয় যে, শিল্প সর্বদাই শিল্পনিরপেক্ষ জীবব্যবহারের জন্য, তাহলেও এটা অস্বীকার করা যায় না, ক্রমশ এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রকারভিন্নতা এতই অধিক হয়ে ওঠে যে একটির দ্বারা অপরটি পূর্ণভাবে ব্যাখ্যাত হতে পারে না – এবং ব্যাখ্যার চেষ্টাও অর্থহীন। মূল কথা, শিল্পচর্চার জন্ম-ইতিহাস যাই হোক, তার কর্ম-ইতিহাস তাকে এক স্বতন্ত্র সত্তায় রূপান্তরিত করে। এই সুস্পষ্ট সত্যটি স্বীকারে কিছু পণ্ডিতবর্গের কেন অস্বাভাবিক সংকোচ, বোঝা দায়। আলোচিত মতের অর্থ কেউ যদি করেন যে শিল্পে শিল্পীর জীবন নয়, জীবন-বোধ প্রকাশিত, তাতে আপত্তির কোনও কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু ‘জীবন’ ও ‘জীবন-বোধ’ স্বতন্ত্র।
পরিসর স্বল্প, তাই বিভিন্ন মতগুলির সংক্ষিপ্ত আলোচনায় হয়তো যথার্থ ন্যায়-বিচার সম্ভব হয়নি, কিন্তু যথাসাধ্য মূল অসুবিধাগুলি স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। অতঃপর আমরা দেখার চেষ্টা করব, এই মতগুলির সাধারণ কোনও ধর্ম আছে কিনা এবং থাকলে সেই ধর্ম সমন্বয়ে, শিল্পের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কোনও নতুন ধারণায় উপস্থিত হওয়া যায় কিনা।
এই প্রবন্ধের সর্বত্র ‘শিল্পী ও শিল্পের একাত্মতা’ কথা ক’টি বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধারণাটিই প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন মতগুলির মধ্যে একটি সামান্য ধর্ম সূচিত করে। শিল্প প্রকাশ এবং প্রকাশে যেহেতু শিল্পী স্বকীয় ভঙ্গি প্রয়োগ করেন, অতএব শিল্পে শিল্পীর প্রকাশ থাকবেই। উপরে উল্লিখিত সকল মতাবলম্বী ব্যক্তিবৃন্দ একথা মানতে দ্বিধা করবেন না যে, শিল্পে শিল্পীর প্রকাশ অনিবার্য, তা সে তিনি যে ধারণাই প্রকাশিতব্য মনে করুন না কেন। এই কারণে এই ধারণাটি আমরা শিল্পজগতে সর্বজনগ্রাহ্য বলে ধরে নিতে পারি। অর্থাৎ পাশ্চাত্য সমালোচকদের পরিভাষার বলা যায়-‘আর্ট-এ কিছু পরিমাণ সাবজেকটিভিটি থাকতে বাধ্য’। চিত্রশিল্পী সেজান (Cesanne) তাঁর এক পত্রে লিখেছেন ‘সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান দায়িত্ব শিল্পে দ্রষ্টার প্রকৃত অনুভবের প্রতিরূপ প্রকাশ৭।’ শিল্পীর মতে ‘এটাই শিল্পে, শিল্পীর সমগ্র ব্যক্তিত্ব প্রকাশের সর্বোত্তম পন্থা’। অর্থাৎ, সেজান শিল্পে অনুভবসিদ্ধির মাধ্যমেই ব্যক্তিত্ব প্রকাশ সর্বোৎকৃষ্ট হয় বলে মনে করতেন। মোট কথা, শিল্পের উদ্দেশ্যসিদ্ধি সম্পর্কে শিল্পী বা সমালোচক যে ধারণাই পোষণ করুন, শিল্পে আত্মপ্রকাশ হয় ও বিশ্বাস আধুনিকতার একটি বিশিষ্ট অবদান। এই আত্মপ্রকাশ অবশ্যই শিল্পীর আত্মজীবনীর প্রকাশ নয়, শিল্পীর জীবনাদর্শের প্রকাশ। এই আত্মপ্রকাশ আবার একে অর্থে সমগ্র মানবপ্রকাশ৮। এই অর্থেই জীবনী না বলে জীবনাদর্শ বলছি। ফলে শিল্পী তাঁর শিল্পপ্রকাশের সঙ্গে এক রহস্যগভীর একাত্মতা বোধ করেন। ‘রহস্যগভীর’ বলছি এই জন্য যে, খুব প্রচল অর্থে এই জাতীয় একাত্মতা নির্বাচ্য নয়।
দ্বিতীয় এক সামান্য ধর্ম এবার উদঘাটনের চেষ্টা করা যাক। শিল্প বা আর্ট মূলত অনুভব বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক। ভাব, ধারণা বা তত্বভিত্তিক নয়। অন্তে সিদ্ধি যাই হোক না কেন, শিল্পের মূল অনুপ্রেরণা প্রাথমিকভাবে অনুভবের তীব্রতা। এ অনুভব ইন্দ্রিয়জ কী ইন্দ্রিয়াতীত এ বিচার স্বতন্ত্র দার্শনিক ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। কিন্তু অনুভব (রবীন্দ্রনাথ ব্যবহৃত ‘উপলব্ধি’ অর্থেও গ্রাহ্য) যে শিল্পের মূল অবলম্বন বা সামগ্রী এ বিষয়ে মতানৈক্য থাকা অনুচিত। অনন্তর এই দুটি সামান্য ধর্মকে একত্র করলে শিল্পসিদ্ধি বিষয়ক উল্লিখিত মতগুলি ছাড়া আর একটি মৌলিক ধারণায় উপনীত হই। অর্থাৎ, ‘শিল্প শিল্পীর অনুভবের জগৎ (sense-model) প্রকাশ করে’। শিল্পে শিল্পীর অনুভবের জগৎ প্রকাশিত, এটা ঠিক অভিপ্রেত অর্থ বহন করে না। বস্তুত আমাদের বক্তব্য হল, শিল্পে শিল্পী তাঁর অভিনব জীবনাদর্শ অনুভব-মাধ্যমে প্রকাশ করেন। ইংরাজি ভাষায় ‘model’ শব্দটির যা দ্যোতনা, আমাদের নিছক তাই বক্তব্য। অর্থাৎ, শিল্পী তাঁর প্রত্যেক শিল্পকার্যে sense বা experience-model রচনা করেন। অতঃপর জগৎ শব্দটি ব্যবহার না করে আমি ‘মডেল’ শব্দটিই ব্যবহার করব। মডেলের ব্যবহার প্রায় সব শাস্ত্রেই অধুনা করা হচ্ছে। মডেল এমন একটি বিধিনিয়ন্ত্রিত কাঠামো যার মধ্যে সদৃশ বিষয়গুলি নির্বিশেষে স্থান পায় ও আপন নির্দিষ্ট অবস্থান জন্য এক সামগ্রিক সার্থকতা অর্জন করে। গাণিতিক বিজ্ঞানে মডেল ব্যবহার সর্বাধিক। মূল কথা, মডেল এমন একটি নির্দেশ-মণ্ডল যার মধ্যে অধিকারী বিশেষগুলি অন্তর্ভুক্ত হয়ে, পরস্পর বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ করে এক ঐক্যবদ্ধ নীতি-পরিচালিত হয় ও এক সর্বজনীন সার্থকতা লাভ করে। শিল্পে ‘মডেল’ শব্দটি আমরা এই অর্থেই ব্যবহার করছি। একটি সফল মডেলের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল, এক বিশেষ বিষয়, সামান্যের বিস্তার লাভ করে। একটু বিশদ করা যাক। একটি বিশেষ বিষয় তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে অবশ্য সার্থকতাপ্রদ। ধরা যাক, একটি টেবিল, তার স্বধর্ম নিরূপণের দ্বারা নিশ্চিতই তার বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি বুদ্ধিগত হয়। কিন্তু সব কটি গুণই টেবিলকে অপরাপর বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখে। অথচ, এই টেবিলকে যখন আধুনিক জীবন ও সভ্যতার মধ্যে বিশেষ পর্যায়ে রেখে দেখি, তখন ওই বিশিষ্ট বিষয়টি এক বিস্তৃততর সার্থকতা ও অপরাপর বহু বিষয়ের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধতা লাভ করে। এতে টেবিলটির ধর্ম বৃদ্ধি হয়তো হল না, কিন্তু নিঃসন্দেহে সার্থকতা প্রসার হল। এই অর্থে শিল্পীও তাঁর শিল্পে একটি বিশেষ অনুভবকে কেন্দ্র করে এমন এক মডেল উপস্থিত বা সৃষ্টি করেন যাতে মাত্র ওই অনুভবটিরই নয়, সমগ্র অনুভব জগতের অভিনব দৃষ্টিভঙ্গির জন্য, সার্থকতা প্রসার হয়।
শিল্পপ্রবাহ লক্ষ করলে দেখা যায়, বিশেষ করে আধুনিক যুগে, শিল্পী বস্তুসার বা বিশেষ তত্বপ্রচারের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। শিল্পীর উৎসাহ অভিনব অভিজ্ঞতা বা অনুভবে। তাঁর তীব্র ও প্রগাঢ় অনুভবে তিনি তন্ময় হয়ে যান। সেটা সত্য বা তথ্য এটি বিচার করা শিল্পীর ধর্ম নয়। তিনি অভিজ্ঞতার এই তীব্রতাকে এক বিশেষ বা তজ্জাতীয় অনুভবের মডেলে রূপান্তরিত করতে চান। সাধারণ অবস্থায় বা সাধারণ চেতনায় অভিজ্ঞতা বা অনুভবগুলি প্রায়শই হয় সামাজিক রীতি বা তত্ব অনুগ। তাই অভিজ্ঞতা নূতন হলেও সর্বদা অভিভূত করে না। কিন্তু শিল্পী-চেতনায় অকস্মাৎ কোনও ইন্দ্রিয়ানুগ অনুভব (এ অনুভব শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ, সাক্ষাৎকার, আকৃতি, বর্ণ যাই হোক না কেন) বা অভিজ্ঞতা আনে এমন এক তীব্রতা (intensity) যার প্রাবল্যে শিল্পী বিহ্বল বা অবশ হয়ে পড়েন। তাঁর এযাবৎ লব্ধ অভিজ্ঞতা রাশিকে এই একটি ক্ষণের অভিজ্ঞতা যেন প্লাবিত করে দেয়। এই ব্যাকুল অসহায়তা থেকে শিল্পী উত্তীর্ণ হতে চান। হয় তাঁকে এই নব অভিজ্ঞতা অস্বীকার করতে হয়, দমন করতে হয়, না হয় এযাবৎ সঞ্চিত সকল অভিজ্ঞতা ও ভাবাদর্শকে এই নবলব্ধ অভিজ্ঞতার কাঠামোয় নতুন করে সাজাতে হয়। এই অভিনব সজ্জাই মডেল সৃষ্টি। শিল্পী তৎকালীন অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে অভিন্ন মনে করেন এবং তাঁর সমগ্র জীবনাদর্শ ওই অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে শিল্পে ফুটিয়ে তোলেন। সংগীত, চিত্রণ, সাহিত্য, ভাস্কর্য তাই একটি বা কয়েকটি অনুভব-জাত হলেও, প্রকাশ করে এক সর্বব্যাপী জীবনাদর্শ। মহৎ শিল্প তাই কালোত্তীর্ণ ও দেশোত্তীর্ণ (সীমিত অর্থে) হতে পারে। অনুভব যত প্রগাঢ়, শিল্পে প্রকাশিত জীবনাদর্শ বা মডেল ততই ব্যাপক। অর্থাৎ অভিজ্ঞতাটি শিল্পীর কাছে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না, এক বৃহত্তর ঐক্যবদ্ধ জগতের সন্ধান দেয়। প্রকাশিত মডেলে শিল্পী নিজের ও তৎ মাধ্যমে সকল মানুষের জীবনাদর্শ পরিবেশন করতে চান। এরই নাম সঞ্চার (communication)। এই অর্থে তাই শিল্পী মাত্র বিবরণ বা বর্ণনায় উৎসাহী নন, তাঁর শিল্পে প্রকাশিত মডেলের প্রতি স্বীকৃতির আবেদনও (prescription) থাকে। বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিকও হয়তো মডেল সৃষ্টি করেন কিন্তু সেগুলি বিবরণমূলক (descriptive) ও তত্বভিত্তিক; শিল্পীর মতো অনুভব-ভিত্তিক মডেল রচনায় তাঁরা অসমর্থ।
এইবার শিল্পের এই বিশ্লেষণ অনুসারে পূর্বস্থাপিত শিল্প সমস্যা অর্থাৎ ঐতিহ্য শরণ ও মুক্তিচেতনার আপাতবিরোধ বিচার করা যাক। কোনও মডেলে যেমন অন্তর্নিহিত সংহতি ও ঐক্য থাকা আবশ্যক, তেমনই আবশ্যক মডেলটির অপরাপর মডেলের সঙ্গে ধারাবাহিকতার সম্পর্ক। নচেৎ মডেলটি আয়ত্ত হবে না। মডেল যতই ব্যাপক, যতই অভিনব হোক না কেন, অপরাপর সৃষ্ট মডেলের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলে, যাঁদের কাছে আবেদন করা হবে তাঁরা মডেলটির বৈশিষ্ট্য ধরতে অসমর্থ হবেন এবং ‘না গ্রহণ, না বর্জন’ নীতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হবেন। তাতে অভিপ্রেত সঞ্চার ব্যাহত হয়। শিল্পসৃষ্টি তত্বজিজ্ঞাসা নয়। শিল্পে এমনই এক অপরোক্ষতা আছে যে এক্ষেত্রে বিচার-সংশয়ের অবকাশ নেই। একটি সৃষ্ট মডেল হয় আমি গ্রহণ করি, নয় বর্জন করি। শিল্পে সংশয়বাদীরা অরসিকের দলে পড়বেন। এই জন্য নতুন মডেল সৃজনকালে শিল্পী সর্বদাই ঐতিহ্যকে আত্মসাৎ করেন, নতুবা ভাব আদান-প্রদানের রাস্তা বন্ধ। শিল্পী যদি এমন মডেল সৃষ্টি করেন যা পূর্বাপর সব মডেল থেকে বিচ্ছিন্ন, তাহলে সে মডেলে রসিকবৃন্দ বিমূঢ় বোধ করতে পারেন, কিন্তু সার্থক সঞ্চারের অভাবে শিল্পীকৃত মডেলের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। দর্শক বা শ্রোতার অধিকৃত মডেল থেকে শিল্পীর মডেল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হলে পরস্পরের মধ্যে কোনও যোগাযোগ থাকবে না। এই কারণেই শিল্প ঐতিহ্যনির্ভর; এবং একমাত্র এই অর্থেই শিল্পের সঙ্গে সামাজিক জীবনবোধের সম্পর্ক। অবশ্য এ কথাও ঠিক যে প্রচলিত মডেলের অতিসদৃশ মডেল অনুকরণের নামান্তর, তাতে আধুনিকতা আনয়ন তো দূরস্থান শিল্পকর্মই অসম্ভব হয়ে পড়ে। শিল্প যেমন মডেল হিসাবে ঐতিহ্য মারফত বিধি মানতে বাধ্য, তেমনই অপরপক্ষে কেবল বিধিনিয়ন্ত্রিত হলে শিল্পসৃষ্টি অসাধ্য। অতএব মধ্যম পন্থাই সর্বোৎকৃষ্ট। আমরা পূর্বেই বলেছি, বিধির দুটি অবশ্য দিক হল- ‘আজ্ঞা’ ও ‘নিষেধ’। শিল্পী তাঁর সৃষ্টিতে নিষেধের দিকটা বহুলাংশে অস্বীকার করেন। নিষেধ দিয়ে যে গণ্ডি টানা হয়েছে, নতুন মডেলে শিল্পী সেই গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃততর মডেল পরিবেশন করেন। নিষেধ অমান্যের সঙ্গে সঙ্গে আজ্ঞাগুলিকেও ব্যাপকতর অর্থে প্রয়োগ করতে হয়। এখানেই শিল্পে মুক্তিচেতনার স্থান। এখানে বলা কর্তব্য যে, মডেলের যে বিধি-নিয়ম তা কিন্তু সবই ঐতিহ্যবাহিত নয়, বেশ কিছু সংখ্যক বিধি মডেলের নিজস্ব সংগঠন জন্য। এই জন্য মডেল যত জটিল, শিল্প ততই বদ্ধ! অতএব মডেল সরল হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং শিল্পধারায় আধুনিকতার এক মহৎ প্রচেষ্টা শিল্পের মডেল সহজ ও সরল করা। অর্থাৎ বর্জনীয় বাহুল্য বর্জন করার অর্থ, বহু অপ্রয়োজনীয় বিধির শাসন থেকে মুক্তি। এই অর্থেই শিল্পে ‘শুদ্ধিকরণ’ শব্দ ব্যবহার করেছিলাম। অর্থাৎ চিত্রশিল্পে ‘শুদ্ধ দৃষ্টি’, সংগীতশিল্পে ‘শুদ্ধ ধ্বনি’, নাটকে ‘শুদ্ধ সংলাপ’-ক্রমাগত শুদ্ধিকরণের এই প্রচেষ্টা আধুনিক শিল্পের এক সার্থক অবদান। শিল্পীকে ঐতিহ্য মানতে হয় বলে তিনি বিধি-নিয়ম হয়তো অস্বীকার করতে পারেন না, কিন্তু ঐতিহ্য-আদিষ্ট নিষেধ অমান্য করে আজ্ঞাগুলির অর্থ বিস্তার দ্বারা ওই rule গুলিকে ব্যাপকতর ক্ষেত্রে প্রয়োগসাধ্য করেন। এই কৃতিসাফল্যেই শিল্পীর প্রতিভার প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, শিল্পী যুক্তি অর্জন করেন প্রচলিত মডেলগুলির অনাবশ্যক জটিলতা বর্জন করে। শিল্পে যত সামগ্রী ও ভাবনার ভিন্নতা, ততই মডেল জটিলতর। ভাব ও রূপ, বর্ণ ও রেখা, শব্দ ও অভিধা, সুর ও স্বর ইত্যাদি নানা সামগ্রী-পার্থক্য শিল্পীকে সৃজনকার্যে বাধা দেয়। আধুনিক শিল্পে তাই আমরা দেখি শিল্প এই পার্থক্যের লোপ সাধন করে মুক্তি অর্জনের প্রচেষ্টা করছে। এই হেতু শিল্পে ক্রমবর্ধমান আধুনিকতা ও সামগ্রী-বিভিন্নতার লোপসাধন প্রায় একার্থক। এইভাবে শিল্পী অযথা বিধিবাহুল্য হ্রাস করে ঐতিহ্যকে অনেক সরল করতে সক্ষম হন। মুক্তি ও ঐতিহ্যচেতনার বিরোধ হ্রাস পায়। সামগ্রী-বিভিন্নতা যত কম, অনুভব বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ততই স্বল্প এবং অনুভব সঞ্চার ততই তীব্র, শুদ্ধ ও অপচয়হীন। এই অর্থে আধুনিক শিল্প অনেক প্রত্যক্ষ ও প্রখর (direct ও intense)। শিল্পে ক্রমশ তাই প্রতীকধর্মিতা হ্রাস পাচ্ছে ও প্রত্যক্ষধর্মিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি দৃষ্টান্ত দিলে পরিষ্কার বোধ হবে। অ্যারিস্টটলের আমলে নাটকের সামগ্রী হিসাবে ষড়ঙ্গ মানতে হত- কাহিনি, চরিত্র, সুর, উচ্চারণ, মোক্ষণ, মঞ্চ ইত্যাদি। আধুনিক নাটকে এই সামগ্রী-ভিন্নতা লোপ করে ঐক্যময় এক ‘মানব পরিবেশ’ (human situation) উপস্থাপিত হচ্ছে। এই সূত্রে এ্যাবসার্ড নাট্যকারগণ স্মরণীয়, বিশেষ করে বেকেট। সংগীত চিত্রশিল্প ভাস্কর্যে এই একই ধারার পুনরাবৃত্তি।
উল্লিখিত শিল্পসমস্যার বিরোধ তাই প্রথমে আপাতবিরোধ বলে অভিহিত করেছিলাম। অর্থাৎ ঐতিহ্য মেনেও আধুনিক শিল্পের মুক্তি-অভিযান সফল হতে পারে ও হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত সমর্থনের জন্যই আমরা আধুনিকতা ও শিল্পস্বরূপ ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছিলাম।
মূল কথা ক’টি পুনরায় উপসংহারে উল্লেখ করছি। শিল্প যেহেতু প্রকাশ এবং প্রকাশ যেহেতু সঞ্চারধর্মী এবং সঞ্চার-সম্ভাবনা যেহেতু ঐতিহ্যসাপেক্ষ, অতএব শিল্পীমাত্রই ঐতিহ্য স্বীকারে ন্যায়ত বাধ্য। বিধি-আড়ম্বর বা বাহুল্য বর্জন করে আধুনিক শিল্প মুক্তিপ্রার্থী, কিন্তু সম্পূর্ণ সম্পূর্ণ বিধিনিরপেক্ষ হতে চাওয়া আত্মধ্বংসী মনোবৃত্তির পরিচায়ক হবে। শিল্পী অনুভব-মডেল সৃষ্টি করেন তাঁর ঐতিহ্যমণ্ডলের মধ্যেই। কিন্তু মডেলের সংহতি, সরলতা ও অভিনবত্ব শিল্পমুক্তির পথ খুলে দেয়।
সূ ত্র নি র্দে শ
১। Erik H. Erikson, Young Man Luther, 1958, p.18
২। T.S.Eliot, ‘Tradition and the Individual Talent” Selected Essays, London 1932, p. 14
৩। Encyclopoedia of Social Sciences, vol, p. 62 (1944 Edn)
৪। শচীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, পবিত্রকুমার রায়, নৃপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্র-দর্শন, বিশ্বভারতী দর্শন ভবন, শান্তিনিকেতন, ১৯৬৯।
৫। R. Wollheim, Art and Its Objects & Row, U.S.A., 1968, p. 32
৬। L. Wittgenstein, Philosophical Investigations.
৭। H.Read, The Philosophy of Modern Art. Meridian Books New York, 1957, p 191
৮। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য।
৭ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা
(পৌষ-মাঘ ১৩৭৬)
